| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
নতুন নকিব
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দল-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না- বিদ্রোহী রন-ক্লান্ত। আমি সেই দিন হব শান্ত।
চলে গেলেন ‘ছড়াসম্রাট’ সুকুমার বড়ুয়া
নিজের বাড়ির সামনে ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া। ছবি, অন্তর্জাল থেকে সংগৃহিত।
আজ ২ জানুয়ারি, ২০২৬। চলে গেলেন ‘ছড়াসম্রাট’ উপাধিতে ভূষিত একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি, ছড়াকার ও লেখক সুকুমার বড়ুয়া। এই গুণী মানুষটির কত ছড়া পড়েছি আমরা ছোটবেলায়! তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯৩৮ সালের ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার ছায়া সুনিবিড়, শান্ত সবুজ মধ্যম বিনাজুরি গ্রামে।
তাঁর জীবন নাটকীয়তায় ভরা। খেয়ে না খেয়ে থাকার মতো তীব্র অভাবের সংসারে জন্ম নিয়েছিলেন তিনি। ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরের কোনো এক দিন, সুকুমার বড়ুয়া তখন মাত্র ৫ বছরের শিশু। পরিবার-পরিজনের জন্য খাদ্য সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন বাবা সর্বানন্দ বড়ুয়া। কিন্তু আর ফিরে আসেননি কোনোদিন। সেই যাওয়াই তাঁর চিরদিনের জন্য চলে যাওয়া। চিরদিনের জন্য নিরুদ্দেশ হয়ে যান সুকুমারের বাবা।
তারপর সুকুমারের জীবনে নেমে আসে ঘনঘোর অন্ধকার। স্কুলে যাওয়ার তীব্র ইচ্ছে থাকলেও সে সুযোগ তিনি খুব কম সময়ই পেয়েছেন। বাবা নিরুদ্দেশ হওয়ার পর মা কিরণ বালা তাঁকে নিয়ে উত্তর গুজরায় মামাবাড়িতে চলে যান। সেখানেও তাঁরা খুব গরিব ছিলেন। মামা ছিলেন পুলিশের কনস্টেবল। তাঁর পাঠানো দেড় টাকায় চলতো পুরো পরিবার। ওখান থেকেই তিনি প্রথম শ্রেণি পাস করেন। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে বেশি দিন থাকতে পারেননি।
মা তাঁকে পাঠিয়ে দেন বৌদ্ধ বিহারে, যেখানে পড়ালেখা, খাওয়াদাওয়া ও থাকার নিশ্চয়তা ছিল। কিন্তু সেখানেও বেশি দিন থাকা হয়নি। কয়েক বছর আগে এক সাক্ষাৎকারে সেই স্মৃতি বলতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত হয়েছিলেন সুকুমার। তিনি বলেছিলেন, “বিহারের প্রধান খুব রাগী ছিলেন। কথায় কথায় পেটাতেন। একদিন সামান্য কথার ভুলে এমন মার দিলেন যে আমার মাথা ফেটে গেল।” নিজের হাত মাথার ওপর তুলে দেখিয়ে বলেছিলেন, “এখনো সেই দাগ আছে।”
এরপর ভাগ্য তাঁকে কত মানুষের ঘরে, কত ঘাটে নিয়ে গেছে। তার বর্ণনা বড় করুণ। গ্রাম থেকে শহরে এসে সুকুমারের পুঁজি ছিল মাত্র আড়াই ক্লাস। জাস্ট পড়তে ও লিখতে পারেন। শুরু করেন জীবনযুদ্ধ। কখনো গৃহকর্মী, কখনো বাবুর্চি হিসেবে কাজ করেছেন। জীবিকা নির্বাহের জন্য একটা সময় তিনি ফলমূল, আইসক্রিম, বুট বাদাম ইত্যাদি ফেরী করে বিক্রি করেছেন। সেই সব কাজের ফাঁকে পত্রিকার পাতায় চোখ বোলাতেন। স্কুলে গিয়ে পড়া আর হয়নি সুকুমার বড়ুয়ার। তবে বই পড়া কখনো থামেনি তাঁর।
এই ছড়াকারের ঢাকার জীবন অনেকেরই জানা। প্রথম দুই বছর তিনি বিভিন্ন মেসে বাবুর্চির কাজ করেছেন। ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈব রসায়ন বিভাগে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে যোগ দেন। পরে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে নিযুক্ত হন। সর্বশেষ, ১৯৯৯ সালে স্টোরকিপার হিসেবে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
তাঁর ছড়াগুলো বুদ্ধিদীপ্ত, তীক্ষ্ণ ও শানিত। কিন্তু কোমল শব্দে লেখা। প্রায় ৬০ বছর ধরে ছড়া লিখে তিনি ‘ছড়ারাজ’, ‘ছড়াশিল্পী’, ‘ছড়াসম্রাট’, এমন নানা উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। ব্যঙ্গাত্মক, হাস্যরসাত্মক, নৈতিক শিক্ষামূলক রচনার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও রাজনৈতিক বার্তাও তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছে।
হ্যাঁ, এই গুণী ব্যক্তিত্ব চলে গেলেন আজ। ৮৮ বছর বয়সে। ভোর ৬টা ৫৫ মিনিটে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গহিরায় জে কে মেমোরিয়াল হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন। ফুসফুসে পানি জমে যাওয়ায় শেষ কয়েকদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
ছড়া সাহিত্যে তাঁর বৈচিত্রপূর্ণ সৃষ্টি অনেক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘পাগলা ঘোড়া’, ‘ভিজে বেড়াল’, ‘চন্দনা রঞ্জনার ছড়া’, ‘এলোপাতাড়ি’, ‘নানা রঙের দিন’, ‘চিচিং ফাঁক’, ‘কিছু না কিছু’, ‘প্রিয় ছড়া শতক’, ‘নদীর খেলা’, ‘ছোটদের হাট’, ‘মজার পড়া ১০০ ছড়া’, ‘যুক্তবর্ণ’, ‘চন্দনার পাঠশালা’, ‘জীবনের ভেতরে বাইরে’। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে এগুলো আনন্দ ও চিন্তার খোরাক যোগাবে। তাঁর ছড়ার মতোই তাঁর স্মৃতি চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের মাঝে।
তাঁর ছড়াগুলো বুদ্ধিদীপ্ত, তীক্ষ্ণ ও শানিত, কিন্তু কোমল শব্দে লেখা। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে তার রচিত কয়েকটি ছড়া এখানে উদ্ধৃত করা হলো:
এমন যদি হতো
এমন যদি হতো
ইচ্ছে হলে আমি হতাম
প্রজাপতির মতো।
নানান রঙের ফুলের পরে
বসে যেতাম চুপটি করে
খেয়াল মতো নানান ফুলের
সুবাস নিতাম কতো।
এমন হতো যদি
পাখি হয়ে পেরিয়ে যেতাম
কত পাহাড় নদী।
দেশ বিদেশের অবাক ছবি
এক পলকের দেখে সবই
সাতটি সাগর পাড়ি দিতাম
উড়ে নিরবধি।
এমন যদি হয়
আমায় দেখে এই পৃথিবীর
সবাই পেত ভয়।
মন্দটাকে ধ্বংস করে
ভালোয় দিতাম জগৎ ভরে
খুশির জোয়ার বইয়ে দিতাম
এই দুনিয়াময়।
এমন হবে কি?
একটি লাফে হঠাৎ আমি
চাঁদে পৌঁছেছি!
গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে
দেখেশুনে ভালো করে
লক্ষ যুগের অন্ত আদি
জানতে ছুটেছি।
মুক্তিসেনা
ধন্য সবাই ধন্য
অস্ত্র ধরে যুদ্ধ করে
মাতৃভূমির জন্য।
ধরল যারা জীবনবাজি
হলেন যারা শহীদ গাজি
লোভের টানে হয়নি যারা
ভিনদেশিদের পণ্য।
দেশের তরে ঝাঁপিয়ে পড়ে
শক্ত হাতে ঘায়েল করে
সব হানাদার সৈন্য
ধন্য ওরাই ধন্য।
এক হয়ে সব শ্রমিক কিষাণ
ওড়ায় যাদের বিজয় নিশান
ইতিহাসের সোনার পাতায়
ওরাই আগে গণ্য।
ঠিক আছে
অসময়ে মেহমান
ঘরে ঢুকে বসে যান
বোঝালাম ঝামেলার
যতগুলো দিক আছে
তিনি হেসে বললেন,
ঠিক আছে ঠিক আছে।
রেশনের পচা চাল
টলটলে বাসি ডাল
থালাটাও ভাঙাচোরা
বাটিটাও লিক আছে
খেতে বসে জানালেন,
ঠিক আছে ঠিক আছে।
মেঘ দেখে মেহমান
চাইলেন ছাতাখান
দেখালাম ছাতাটার
শুধু কটা শিক আছে
তবু তিনি বললেন,
ঠিক আছে ঠিক আছে।
নেই
দিনদুপুরে ঘর-ডাকাতি
পানি তোলার লোটাও নেই
সর্ষে-তেলের বোতল গায়েব
তেল তাতে এক ফোঁটাও নেই।
সরু চালের ভাণ্ড উজাড়
চাল তাতে আর মোটাও নেই
তিনটে গেল মিষ্টি কুমোড়
তার কোনো এক বোঁটাও নেই।
ছাগল বাঁধার দড়ি গেছে
দড়ির মাথায় খোঁটাও নেই,
আরেক মাথায় ছাগল ছিল
এখন দেখি, ওটাও নেই।
শাখা
ক-শাখা, খ-শাখা
গ-শাখা, ঘ-শাখা
দুপুরের ছুটিতে
নুন দিয়ে শশা খা
পরীক্ষায় ফেল হলে
হাঁ করে মশা খা।
ডাটা সংবাদ
পুঁইয়ের ডাঁটা লাউয়ের ডাঁটা
বায়োডাটার ঝোল,
ডাটা প্রসেস করতে হলে
কম্পিউটার খোল।
ডাঁটার পাগল বুড়োবুড়ি
ক্যালসিয়ামে ভরা,
শজনে ডাঁটায় গুণ বেশি তাই
বাজার ভীষণ চড়া।
উচ্চতর ডিগ্রি নিতে
ডাটাই পরম ধন,
সারা বছর খেটে করেন
ডাটা কালেকশন।
ডালের সাথে মাছের সাথে
যেমন ডাঁটা চলে,
গবেষকের ডাটা আবার
অন্য কথা বলে।
আনিকা ও শারিকা
ওই আমাদের আনিকায়
মিষ্টি বাখরখানি খায়
সর্দি হলে বরফ দিয়ে
গরম গরম পানি খায়।
তার যে সাথি শারিকায়
ভাত দিয়ে তরকারি খায়
তাড়াতাড়ি চলতে গিয়ে
মাথায় মাথায় বাড়ি খায়।
তাঁর আরেকটি ছড়া :
শিয়াল নাকি লোভ করে না
পরের কোনো জিনিসটার,
কী পরিচয় দিল আহা
কী সততা কী নিষ্ঠার!
তাই সে হল বনের মাঝে
এডুকেশন মিনিস্টার।
তাঁর একটি প্রতিবাদী ছড়া, যেটি লিখেছিলেন পাকিস্তান আমলে, ১৯৬৯ সালে। আইয়ুব খানের দুঃশাসনের প্রতি ইঙ্গিত করে। যখন সারা দেশজুড়ে বৈরী পরিস্থিতি, ঠিক সেই সময়ের সমাজ বাস্তবতাকে তুলে ধরলেন ছন্দের কারিশমায়:
চিচিং ফাঁক হে চিচিং ফাঁক
বনময়ুরের পুচ্ছ পরে,
নাচছিল সব শকুন-কাক
দমকা ঝড়ে হঠাৎ করে
ঘটিয়ে দিলো ঘোর বিপাক,
চিচিং ফাঁক হে চিচিং ফাঁক।
গোলাগুলির মহান দশক
রোগীর ঘরে বাড়ল মশক
তোমার পাতে কোরমা-পোলাও,
আমরা না পাই কচুর শাক
চিচিং ফাঁক হে চিচিং ফাঁক।
হাসতে মানা কাঁদতে মানা
হানার উপর চলছে হানা
স্বাধীন দেশের আজবরীতি
মুখ থেকেও রুদ্ধবাক্
চিচিং ফাঁক হে চিচিং ফাঁক।
এমনি করে আজব দেশে
মানুষগুলো যাঁতায় পেষে
হঠাৎ করে জ্বললো আগুন
পালায় শকুন, কাকের ঝাঁক
চিচিং ফাঁক হে চিচিং ফাঁক।
২|
০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৫
সৈয়দ কুতুব বলেছেন: পরপারে ভালো থাকুক কবি সাহেব।
©somewhere in net ltd.
১|
০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৬
রাজীব নুর বলেছেন: তার মৃত্যুতে আমি শোকাহত।