| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
নতুন নকিব
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দল-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না- বিদ্রোহী রন-ক্লান্ত। আমি সেই দিন হব শান্ত।
সুরাহ আল-ইখলাস: তাওহীদের সারাংশ এবং এর অসীম ফজিলত
ছবি সংগৃহীত।
প্রিয় পাঠক বন্ধুগণ, সুরাহ আল-ইখলাস কুরআন মাজীদের একটি অমূল্য রত্ন, যা আমাদের হৃদয়ে তাওহীদের আলো জ্বালিয়ে দেয়। এই সংক্ষিপ্ত সুরাহটি আমাদেরকে আল্লাহর একত্বের গভীরতা অনুভব করায় এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষণে তাঁর উপর নির্ভর করতে শেখায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসসমূহ থেকে আমরা জানি যে, এর তিলাওয়াত শুধু সওয়াবের উৎস নয়, বরং আখিরাতের সাফল্যের চাবিকাঠি। আজ আমরা এই সুরাহর পরিচয়, অর্থ, তাফসীর এবং ফজিলত নিয়ে আন্তরিকভাবে আলোচনা করব, যাতে আমরা সকলে এর আলোকে আমাদের জীবন গড়ে তুলতে পারি।
সুরাহ আল-ইখলাসের পরিচয় এবং নামকরণ
সুরাহ আল-ইখলাস (সুরাহ নং ১১২) কুরআনের একটি মক্কী সুরাহ, যাতে মাত্র চারটি আয়াত রয়েছে। এটি আল্লাহর খাঁটি একত্ববাদের সারাংশ, যা ইসলামের মূল ভিত্তি। এই সুরাহটিকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়, যেমন সুরাহ তাওহীদ (কারণ এতে তাওহীদের মূলনীতি সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত), সুরাহ সামাদ (দ্বিতীয় আয়াতে “الصَّمَدُ” শব্দের কারণে) এবং সুরাহ আল-ইখলাস (কারণ এটি আল্লাহর প্রতি খাঁটি নিষ্ঠা শিক্ষা দেয়)। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই সুরাহকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন এবং এর ফজিলত সম্পর্কে অসংখ্য হাদিসে উল্লেখ করেছেন।
অবতরণের প্রেক্ষাপট
এই সুরাহটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে, যখন মুশরিকরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহর বংশপরিচয় জিজ্ঞাসা করেছিল। তারা বলেছিল, “আপনার প্রতিপালকের বংশপরিচয় কী?” এর উত্তরে আল্লাহ তাআলা এই সুরাহ নাযিল করেন, যাতে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয় যে আল্লাহ কোনো বংশগত সত্তা নন; বরং তিনি চিরন্তন, স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং তুলনাহীন। এটি শিরকের মূলোৎপাটন করে এবং তাওহীদের পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞা উপস্থাপন করে।
সুরাহ আল-ইখলাসের আয়াত এবং অর্থ
এই সুরাহটি আল্লাহর একত্ব, স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং অতুলনীয়তা প্রকাশ করে। আয়াতসমূহ নিম্নরূপ:
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ
(বলুন, তিনি আল্লাহ, একক ও অদ্বিতীয়।)
اللَّهُ الصَّمَدُ
(আল্লাহ স্বয়ংসম্পূর্ণ, যাঁর প্রয়োজন সকলের কিন্তু কারো প্রয়োজন তাঁর নেই।)
لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ
(তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাঁকে জন্ম দেননি।)
وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ
(এবং কেউ তাঁর সমকক্ষ নয়।)
সংক্ষিপ্ত তাফসীর
এই চারটি আয়াতে আল্লাহ তাআলার সত্তাগত একত্ব, নির্ভরশীলতামুক্ত অস্তিত্ব, পিতা-পুত্র সম্পর্কের সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি এবং সৃষ্টির সাথে কোনো তুলনার অযোগ্যতা স্পষ্টভাবে ঘোষিত হয়েছে। এটি শিরক, তাশবীহ এবং তাজসীমের মূলোৎপাটন করে। তাফসীর অনুসারে, এই সুরাহটি আল্লাহর সত্তা, গুণাবলী এবং অতুলনীয়তা বর্ণনা করে, যা আমাদেরকে শিরক থেকে দূরে রাখে এবং খাঁটি বিশ্বাসের পথ দেখায়। এটি পড়লে হৃদয়ে তাওহীদের গভীরতা অনুভূত হয়, যা আমাদের জীবনকে আলোকিত করে।
সুরাহ আল-ইখলাসের ফজিলত: হাদিসের আলোকে
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই সুরাহকে কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমান বলে উল্লেখ করেছেন। এর ফজিলত এত মহান যে, এটি পড়লে জান্নাতে প্রাসাদ নির্মাণ, পাপ মোচন, সুরক্ষা এবং আল্লাহর ভালোবাসা লাভ হয়। নিম্নে সহীহ হাদিস থেকে ধারাবাহিকভাবে ফজিলত বর্ণনা করা হলো।
1. কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমান:
হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একবার এক ব্যক্তি অন্য একজনকে সুরাহ আল-ইখলাস বারবার পড়তে শুনলেন। পরদিন তিনি এটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানালেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنَّهَا لَتَعْدِلُ ثُلُثَ الْقُرْآنِ.
অর্থাৎ, "যাঁর হাতে আমার প্রাণ, এটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমান।" -সহীহ বুখারী ৫০১৩
এই হাদিসটি সুরাহটির মহিমা প্রকাশ করে, যা রাতে পড়লে সম্পূর্ণ কুরআন পড়ার সওয়াবের এক তৃতীয়াংশ পাওয়া যায়।
2. জান্নাতে প্রাসাদ নির্মাণ:
হযরত মুয়াজ ইবনে আনাস আল-জুহানী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ قَرَأَ قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ عَشْرَ مَرَّاتٍ بُنِيَ لَهُ قَصْرٌ فِي الْجَنَّةِ وَمَنْ قَرَأَهَا عِشْرِينَ مَرَّةً بُنِيَ لَهُ قَصْرَانِ وَمَنْ قَرَأَهَا ثَلَاثِينَ مَرَّةً بُنِيَ لَهُ ثَلَاثٌ.
অর্থাৎ, "যে ব্যক্তি সুরাহ আল-ইখলাস দশবার পড়বে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করবেন।" -মুসনাদ আহমদ ১৫১৮৩, সহীহ বলে আল-আলবানী গ্রেড করেছেন।
এটি মুসনাদ আহমদের একটি বিখ্যাত হাদিস, যা সুরাহটির ফজিলত সরাসরি উল্লেখ করে। আরও বিস্তারিতভাবে, যদি কেউ বিশবার পড়ে তাহলে দুটি প্রাসাদ, এবং ত্রিশবার পড়লে তিনটি প্রাসাদ নির্মিত হয়। হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, "তাহলে আমরা আরও বেশি পড়ব।" রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আল্লাহ সবচেয়ে উদার এবং সর্বোত্তম প্রতিদান দাতা।" -মুসনাদ আহমদ, দারিমী
3. পাপ মোচন এবং জান্নাতে প্রবেশ:
হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ قَرَأَ قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ مِائَةَ مَرَّةٍ حِينَ يَأْخُذُ مَضْجَعَهُ عَلَى جَنْبِهِ الْأَيْمَنِ قَالَ اللَّهُ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَا عَبْدِي أَدْخُلِ الْجَنَّةَ عَنْ يَمِينِكَ.
অর্থাৎ, "যে ব্যক্তি ডান পাশে শুয়ে সুরাহ আল-ইখলাস একশোবার পড়বে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে বলবেন, 'হে আমার বান্দা, ডান দিক দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করো।'" -তিরমিজী
আরও এক হাদিসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি এটি একশোবার পড়বে, তার পঞ্চাশ বছরের পাপ মাফ হয়ে যাবে (নির্দোষকে হত্যা বা সম্পত্তি দখলের পাপ ছাড়া)। -তিরমিজী
4. সুরক্ষা এবং আল্লাহর ভালোবাসা লাভ:
হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত,
كَانَ إِذَا أَوَى إِلَى فِرَاشِهِ كُلَّ لَيْلَةٍ جَمَعَ كَفَّيْهِ ثُمَّ نَفَثَ فِيهِمَا فَقَرَأَ فِيهِمَا {قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ} وَ {قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ} وَ {قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ} ثُمَّ يَمْسَحُ بِهِمَا مَا اسْتَطَاعَ مِنْ جَسَدِهِ يَبْدَأُ بِهِمَا عَلَى رَأْسِهِ وَوَجْهِهِ وَمَا أَقْبَلَ مِنْ جَسَدِهِ يَفْعَلُ ذَلِكَ ثَلاَثَ مَرَّاتٍ.
অর্থাৎ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি রাতে শোয়ার সময় সুরাহ আল-ইখলাস, ফালাক এবং নাস পড়ে হাতে ফুঁ দিয়ে শরীর মাসেহ করতেন। এটি শয়তান, জাদু এবং অনিষ্ট থেকে সুরক্ষা দেয়। -সহীহ বুখারী
আরও এক হাদিসে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে এই সুরাহ পড়তে শুনে বললেন,
حُبُّكَ إِيَّاهَا أَدْخَلَكَ الْجَنَّةَ.
অর্থাৎ, "এটি তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেছে।" -ইমাম মালিকের মুয়াত্তা
অন্য হাদিসে উল্লেখ আছে, যে এটি তিনবার পড়বে, সে যেন সম্পূর্ণ কুরআন পড়ার সওয়াব পাবে। (সুনান নাসাই)
5. আরও হাদিসসমূহ:
হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِنَّهَا تَعْدِلُ ثُلُثَ الْقُرْآنِ.
অর্থাৎ, "সুরাহ আল-ইখলাস কুরআনের এক তৃতীয়াংশ।” -সহীহ মুসলিম
আরেক হাদিসে এসেছে,
مَنْ قَرَأَ كُلَّ يَوْمٍ مِائَتَيْ مَرَّةٍ قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ مَحِيَ عَنْهُ ذُنُوبُ خَمْسِينَ سَنَةً إِلَّا أَنْ يَكُونَ عَلَيْهِ دَيْنٌ.
অর্থাৎ, যে ব্যক্তি এটি দু'শোবার পড়বে, তার পঞ্চাশ বছরের পাপ মোচন হয়। -তিরমিজী
ঘরে প্রবেশ করার সময় সুরাহ আল-ইখলাস এবং দুরুদ পড়লে রিজিক বৃদ্ধি পায়।
إِذَا دَخَلْتَ مَنْزِلَكَ فَسَلِّمْ إِنْ كَانَ فِيهِ أَحَدٌ، أَوْ لَمْ يَكُنْ فِيهِ أَحَدٌ، ثُمَّ سَلِّمْ عَلَيَّ، وَاقْرَأْ {قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ} مَرَّةً وَاحِدَةً.
মুসনাদ আহমদে সুরাহ আল-ইখলাসের ফজিলত
মুসনাদ আহমদ ইবনে হাম্বল রাহিমাহুল্লাহর সংগ্রহে সুরাহ আল-ইখলাসের ফজিলত বিশেষভাবে উল্লেখিত। উপরোক্ত হাদিস (নং ১৫১৮৩) ছাড়াও, এতে আরও হাদিস রয়েছে যেখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে এই সুরাহ পড়া জান্নাতের প্রাসাদ নির্মাণ করে। এই কিতাবে সুরাহটির তাওহীদী মাহাত্ম্য এবং পড়ার সওয়াবের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। শায়খ শুয়াইব আল-আরনাউতের মতে, কিছু হাদিস দুর্বল হলেও সহীহ হাদিসসমূহ যথেষ্ট প্রমাণ।
উপসংহার: আমলের উপর জোর
প্রিয় ভাই-বোনেরা, সুরাহ আল-ইখলাস শুধু পড়ার জন্য নয়, বরং তাওহীদের উপর আমল করার জন্য। এর ফজিলতগুলো আমাদেরকে নিয়মিত তিলাওয়াত করতে উৎসাহিত করে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর প্রতি খাঁটি নির্ভরতা গড়ে তুলতে আহ্বান জানায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসসমূহ থেকে বোঝা যায় যে, এটি পড়লে দুনিয়া ও আখিরাতের সাফল্য লাভ হয়। আসুন, আমরা সকলে এই সুরাহকে দৈনন্দিন আমলে অন্তর্ভুক্ত করি, অর্থ বুঝে পড়ি এবং তাওহীদের আলোকে জীবন গড়ে তুলি। আল্লাহ আমাদের সকলকে এর ফজিলত লাভের তাওফীক দান করুন। আমীন।
রেফারেন্সসমূহ
বুখারী, হাদিস 5013
সহীহ মুসলিম, হাদিস 811
মুসনাদ আহমদ, হাদিস 15183
সহীহ বুখারী, হাদিস 7375
মুয়াত্তা মালিক, হাদিস 492
সহীহ বুখারী, হাদিস 5017
সুনান তিরমিজী, হাদিস 2891
সুনান নাসাঈ, হাদিস 992
১৫ ই জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:২৫
নতুন নকিব বলেছেন:
আলহামদুলিল্লাহ, এটি আমার সবচেয়ে প্রিয় সূরাহ।
শুভকামনা জানবেন।
©somewhere in net ltd.
১|
১৫ ই জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:০৭
আহলান বলেছেন: সুবহানাল্লাহ।