| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
নতুন নকিব
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দল-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না- বিদ্রোহী রন-ক্লান্ত। আমি সেই দিন হব শান্ত।
কুরআন-হাদিসের আলোকে মুনাফিকের চরিত্র, আলামত ও পরিচয়
ছবি, অন্তর্জাল থেকে সংগৃহিত।
মুনাফিক কাকে বলে?
মুনাফিক শব্দটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এমন একটি দ্বিমুখী সাপের প্রতিচ্ছবি, যা বাহ্যিকভাবে নিরীহ কিন্তু অন্তরালে লুকানো ভয়ঙ্কর বিষের ছড়াছড়ি। আরবী ‘নিফাক্ব’ (نفاق) শব্দ থেকে ‘মুনাফিক্ব’ (منافق) শব্দটি উদ্ভূত হয়েছে, যা বাংলায় সাধারণত নিফাক ও মুনাফিক বলে পরিচিত। এর আভিধানিক অর্থ হলো কোনো কিছুতে প্রবেশ করে অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া, যেন একটি গর্তে ঢুকে অন্য গর্ত দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া। এতে প্রতারণা এবং কপটতার স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। মুনাফিককে এজন্য মুনাফিক বলা হয় যে, সে তার কুফরী বিশ্বাসকে অন্তরে লুকিয়ে রেখে বাহ্যিকভাবে ঈমানের ছদ্মবেশ ধারণ করে।[1]
শারঈ পরিভাষায়, যে ব্যক্তি মুখে ঈমানের স্বীকারোক্তি করে কিন্তু হৃদয়ে কুফরী এবং ইসলামবিদ্বেষ লুকিয়ে রাখে, তাকে মুনাফিক বলা হয়। ইবনু জুরাইজ বলেছেন, মুনাফিক সেই ব্যক্তি, যার কথা ও কাজ, গোপন ও প্রকাশ্য, ভিতর ও বাহির এবং বাহ্যিক ও অদৃশ্য সবকিছু পরস্পরের সম্পূর্ণ বিপরীত।[2]
এই কপটতা মানুষের চরিত্রকে এমনভাবে খেয়ে ফেলে যে, সে নিজেকে সৎ মনে করলেও অন্তরে একটি অন্ধকার ছায়া লুকিয়ে থাকে, যা সমাজ ও নিজের জন্যই বিপজ্জনক।
মুনাফিকের প্রকারভেদঃ
নিফাক বা কপটতা দুই প্রকার, যা কুরআন-হাদিসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। এগুলো বুঝলে আমরা নিজের অন্তরকে আরও ভালোভাবে রক্ষা করতে পারি:
(১) বিশ্বাসগত নিফাক (বড় মুনাফিকী): এটি সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এবং মারাত্মক, যেন একটি গভীর বিষ যা অন্তরকে পুরোপুরি ধ্বংস করে। এ ধরনের মুনাফিকরা অন্তরে ইসলামকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে, কিন্তু বাহ্যিকভাবে মুসলমান সাজার ভান করে সমাজে মিশে থাকে। এরা চিরস্থায়ী জাহান্নামী, যেন জাহান্নামের সবচেয়ে নিচের স্তরে তাদের ঠিকানা।[3] হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িম (রহ.) বলেছেন, ‘এক শ্রেণীর যিনদীক্ব রয়েছে যারা বাহ্যিকভাবে ইসলাম ও রাসূলগণের অনুসরণের কথা প্রকাশ করে এবং মনের মাঝে কুফর এবং আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলগণের প্রতি শত্রুতা লুকিয়ে রাখে। এরাই মূলত মুনাফিক এবং এদেরই আবাসস্থল হবে জাহান্নামের নিম্নতম স্তরে।’[4]
(২) কর্মগত নিফাক (ছোট মুনাফিকী): এটি অন্তরে ঈমান থাকলেও কাজে-কর্মে মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে, যেন একটি ছোট বিষ যা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। যেমন মিথ্যা বলা, অঙ্গীকার ভঙ্গ করা, আমানতের খেয়ানত করা ইত্যাদি। এটি ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না, কিন্তু এটি একটি গুরুতর পাপ যা অন্তরকে দুর্বল করে। আমলগত মুনাফিক জাহান্নামের চিরস্থায়ী অধিবাসী হবে না, বরং সে অন্য সকল কবীরা গুনাহগারদের মতো। আল্লাহ তাআলা চাইলে ক্ষমা করে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, আর চাইলে তার পাপের কারণে শাস্তি দিয়ে পরিশেষে জান্নাতের অধিবাসী করবেন।[5]
এই প্রকার নিফাক থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব যদি আমরা সচেতনভাবে নিজেকে সংশোধন করি।
মুনাফিকের আলামতসমূহ:
কুরআন ও সুন্নাহতে মুনাফিকদের চরিত্র এমনভাবে বর্ণিত হয়েছে যেন একটি জীবন্ত ছবি, যা আমাদের সতর্ক করে। এতে মুমিনদেরকে তাদের থেকে সাবধান করা হয়েছে, এবং আল্লাহ তাআলা স্বতন্ত্র সূরা (মুনাফিকূন) নাযিল করে তাদের প্রকাশ করেছেন। নিম্নে তাদের কয়েকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলো, যা আমাদের অন্তরকে আলোকিত করবে এবং সতর্কতা জাগাবে:
১. মিথ্যা বলা, অঙ্গীকার ভঙ্গ করা, আমানতের খেয়ানত করা এবং ঝগড়াকালে বাজে কথা বলা:
এই চারটি চরিত্র মুনাফিকের সবচেয়ে সুস্পষ্ট চিহ্ন, যেন একটি বিষাক্ত চক্র যা তার জীবনকে ঘিরে রাখে। আব্দুল্লাহ বিন আমর (রা.) হতে বর্ণিত, নবী করীম ﷺ বলেছেন,
أَرْبَعٌ مَنْ كُنَّ فِيْهِ كَانَ مُنَافِقًا خَالِصًا، وَمَنْ كَانَتْ فِيْهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَتْ فِيْهِ خَصْلَةٌ مِنَ النِّفَاقِ حَتَّى يَدَعَهَا إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ
অর্থাৎ, ‘চারটি আচরণ যার মধ্যে থাকবে, সে নিরেট মুনাফিক বলে গণ্য হবে। আর যার মধ্যে সেগুলোর একটি আচরণ পাওয়া যাবে, যা পরিহার না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকীর একটি আচরণ বিদ্যমান থাকবে। (১) যখন সে কথা বলে, মিথ্যা বলে। (২) যখন অঙ্গীকার করে, তা ভঙ্গ করে। (৩) যখন সে প্রতিশ্রুতি দেয়, তা অমান্য করে। (৪) যখন সে বিতন্ডা করে, বাজে কথা বলে’।[6]
এই চারটি বৈশিষ্ট্য যার মধ্যে একত্রিত হয়, সে সুস্পষ্ট মুনাফিক হিসাবে পরিগণিত হয়, যদিও সে নামাজ-রোজা পালন করে এবং নিজেকে মুসলমান বলে দাবী করে। এটি তার চরিত্রকে এমনভাবে দুর্বল করে যে, তার কোনো আমলই আল্লাহ তাআলার কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না।
২. আল্লাহ তাআলার আয়াতসমূহে ঠাট্টা করা:
মুনাফিকরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার আয়াত তথা কথা ও বিধিবিধানসমূহ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে, যেন তারা কুরআনকে একটি খেলনা মনে করে। তাদের এই আচরণের সমালোচনা করে আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَحْذَرُ الْمُنَافِقُوْنَ أَنْ تُنَزَّلَ عَلَيْهِمْ سُوْرَةٌ تُنَبِّئُهُمْ بِمَا فِيْ قُلُوْبِهِمْ قُلِ اسْتَهْزِئُوْا إِنَّ اللهَ مُخْرِجٌ مَّا تَحْذَرُوْنَ
অর্থাৎ, ‘মুনাফিকরা ভয় করে যে, মুসলমানদের উপর না জানি এমন কোন সূরা নাযিল হয়ে যায় যা তাদের অন্তরের কথাগুলি ওদেরকে জানিয়ে দেয়। বলে দাও, তোমরা উপহাস করতে থাক। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা সেই সব বিষয় প্রকাশ করে দিবেন, যেসব বিষয়ে তোমরা ভয় করছ’ (তওবা-মাদানী ৯/৬৪)।[7]
এই ঠাট্টা তাদের অন্তরের অন্ধকারকে প্রকাশ করে, এবং আল্লাহ তাআলা তাদেরকে শেষ পর্যন্ত প্রকাশ করে দেন।
৩. মুমিনদের সাথে ঠাট্টা করা:
মুনাফিকরা মুমিনদের সাথে মিলিত হয়ে ঈমানের দাবি করে, কিন্তু গোপনে তাদের উপহাস করে, যেন তারা একটি মুখোশ পরে অভিনয় করে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِذَا لَقُوا الَّذِيْنَ آمَنُوا قَالُوا آمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا إِلَى شَيَاطِيْنِهِمْ قَالُوا إِنَّا مَعَكُمْ إِنَّمَا نَحْنُ مُسْتَهْزِئُوْنَ، اللهُ يَسْتَهْزِئُ بِهِمْ وَيَمُدُّهُمْ فِيْ طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُوْنَ
অর্থাৎ, ‘তারা যখন ঈমানদারদের সাথে সাক্ষাৎ করে তখন বলে, আমরা ঈমান এনেছি, আবার যখন তাদের দুষ্টু নেতাদের সঙ্গে একান্তে মিলিত হয় তখন বলে, আমরা তোমাদের সঙ্গেই আছি। আমরা তো ওদের সাথে উপহাস করি মাত্র। বরং আল্লাহ তাআলা তাদের উপহাসের বদলা নেন এবং তাদেরকে তাদের অবাধ্যতার মধ্যে ছেড়ে দেন বিভ্রান্ত অবস্থায়’ (বাক্বারাহ-মাদানী ২/১৪-১৫)।[8]
ইবনুল ক্বাইয়িম (রহ.) বলেন, মুনাফিকরা প্রত্যেকেই দ্বিমুখী আচরণকারী। এক মুখে তারা মুমিনদের সাথে মিলিত হয়। অন্য মুখে তারা ভোল পাল্টিয়ে তাদের কাফের ভাইদের সাথে মিলিত হয়। তাদের জিহবাও দু’টো। এক জিহবা দিয়ে তারা মুসলমানদের সাথে উপর উপর কথা বলে, আর অন্য জিহবা তাদের গোপন অবস্থার ভাষ্যকার।[9]
এই দ্বিচারিতা তাদেরকে একটি জীবন্ত প্রতারক করে তোলে।
৪. কাফেরদের সাথে সম্প্রীতি বজায় রাখা:
মুনাফিকদের সখ্যতা ও সম্প্রীতি মুমিনদের সাথে নয় বরং কাফেরদের সাথে, যেন তারা গোপনে শত্রুর সাথে হাত মিলিয়ে মুমিনদের ক্ষতি করে। কাফেরদের সাথে তাদের এই দহরম মহরমের জন্য আল্লাহ তাআলা বলেন,
بَشِّرِ الْمُنَافِقِيْنَ بِأَنَّ لَهُمْ عَذَاباً أَلِيْماً- الَّذِيْنَ يَتَّخِذُوْنَ الْكَافِرِيْنَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُوْنِ الْمُؤْمِنِيْنَ أَيَبْتَغُوْنَ عِندَهُمُ الْعِزَّةَ فَإِنَّ العِزَّةَ لِلّهِ جَمِيْعاً
অর্থাৎ, ‘তুমি মুনাফিকদের সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি’। ‘যারা মুমিনদের ছেড়ে কাফেরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারা কি তাদের কাছে সম্মান কামনা করে? অথচ সকল সম্মান কেবল আল্লাহ তাআলারই জন্য’ (নিসা ৪/১৩৮-১৩৯)।[10]
এখানে আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে লক্ষ্য করে বলেছেন, হে রাসূল! যারা আমার সাথে কুফরী করে এবং আমার দ্বীনের মধ্যে যারা নাস্তিকতার বীজ বপন করে মুমিনদের বাদ দিয়ে, তাদের সাথে যারা বন্ধুত্ব করে তারা মুনাফিক। এই মুনাফিকদের তুমি কঠিন শাস্তির সুসংবাদ দাও।[11]
এই বন্ধুত্ব তাদেরকে মুমিন সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।
৫. নামাজে অলসতা ও নামাজকে বোঝা মনে করা:
মুনাফিকরা ইবাদতে, বিশেষ করে নামাজ আদায়ে অত্যন্ত অলস্য প্রদর্শন করে, যেন নামাজ তাদের কাছে একটি ভারী বোঝা। তারা কেবল লোক দেখানোর জন্য নামাজ আদায় করে, অন্তরে কোনো ভক্তি না রেখে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ الْمُنَافِقِينَ يُخَادِعُونَ اللهَ وَهُوَ خَادِعُهُمْ وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلَاةِ قَامُوا كُسَالَى يُرَاءُونَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللهَ إِلَّا قَلِيلًا
অর্থাৎ, ‘নিশ্চয়ই মুনাফিকরা আল্লাহ তাআলার সাথে প্রতারণা করে। আর তিনিও তাদের বদলা নেন। যখন তারা নামাজে দাঁড়ায়, তখন অলসভাবে দাঁড়ায়। তারা লোকদের দেখায় এবং আল্লাহ তাআলাকে খুব কমই স্মরণ করে’ (নিসা-মাদানী ৪/১৪২)।[12]
নবী করীম ﷺ বলেছেন,
لَيْسَ صَلاَةٌ أَثْقَلَ عَلَى الْمُنَافِقِينَ مِنَ الْفَجْرِ وَالْعِشَاءِ
অর্থাৎ, ‘মুনাফিকদের উপর সবচেয়ে ভারী নামাজ হল ফজর ও এশার নামাজ’।[13]
এই অলসতা তাদের অন্তরের শূন্যতাকে প্রকাশ করে, যা মুমিনের জন্য একটি সতর্কবাণী।
৬. নামাজ বিলম্বিত করা:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
تِلْكَ صَلاَةُ الْمُنَافِقِ يَجْلِسُ يَرْقُبُ الشَّمْسَ حَتَّى إِذَا كَانَتْ بَيْنَ قَرْنَىِ الشَّيْطَانِ قَامَ فَنَقَرَ أَرْبَعًا لاَ يَذْكُرُ اللهَ فِيْهَا إِلاَّ قَلِيْلاً
অর্থাৎ, ‘মুনাফিকের নামাজ হল, যে বসে বসে সূর্য ডোবার অপেক্ষা করে। অতঃপর সূর্য যখন শয়তানের দুই শিঙের মাঝ বরাবর হয় অর্থাৎ একেবারে ডুবে যাবার উপক্রম হয় তখন চারটা ঠোকর মারে (অতি দ্রুত চার রাকআত আসর পড়ে)। তাতে সে আল্লাহ তাআলাকে নামমাত্র স্মরণ করে’।[14]
ইবনুল ক্বাইয়িম (রহ.) বলেছেন, তারা নামাজকে আউয়াল ওয়াক্ত থেকে বিলম্বিত করে মরণাপন্ন ব্যক্তির দম বন্ধ হওয়ার উপক্রমের মুহূর্তে (একেবারে শেষ মুহূর্তে) আদায় করে। ফজর আদায় করে সূর্যোদয়ের মুহূর্তে এবং আসর আদায় করে সূর্যাস্তের সময়ে। কাক যেমন ঠোকর মারে তারাও তেমনি (সিজদার নামে) ঠোকর মারে। তা দৈহিকভাবে নামাজ হলেও আন্তরিকতাপূর্ণ নামাজ নয়। এ নামাজ আদায়কালে তারা শিয়ালের মত এদিক-ওদিক তাকাতে থাকে। কেননা তাদের বিশ্বাস হয়, এভাবে নামাজ আদায়ের জন্য তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হতে পারে এবং কৈফিয়তের জন্য তলব করা হতে পারে।[15]
এটি তাদের নামাজকে একটি যান্ত্রিক কাজে পরিণত করে।
৭. নামাজের জামাতে শরীক না হওয়া:
জামাত থেকে বিরত থাকাও মুনাফিকীর একটি লক্ষণ, যেন তারা মুসলিম সমাজ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখে। আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন,
وَلَقَدْ رَأَيْتُنَا وَمَا يَتَخَلَّفُ عَنْهَا إِلاَّ مُنَافِقٌ مَعْلُومُ النِّفَاقِ وَلَقَدْ كَانَ الرَّجُلُ يُؤْتَى بِهِ يُهَادَى بَيْنَ الرَّجُلَيْنِ حَتَّى يُقَامَ فِى الصَّفِّ
অর্থাৎ, ‘নিশ্চয়ই আমি আমাদের মধ্যে দেখেছি যার মুনাফিকী সুবিদিত এমন লোক ছাড়া নামাজের জামাত থেকে কেউ পিছিয়ে থাকত না। এমনকি হাঁটতে পারে না এমন লোককেও দু’জনের কাঁধে ভর দিয়ে (মসজিদে এনে) লাইনের মাঝে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হত’।[16]
এটি তাদের সমাজবিরোধী মনোভাবকে প্রকাশ করে।
৮. অহংকার প্রদর্শন:
মুনাফিকরা অহংকারী হয়ে থাকে, যেন তারা নিজেকে সবার উপরে মনে করে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِذَا قِيْلَ لَهُمْ تَعَالَوْا يَسْتَغْفِرْ لَكُمْ رَسُوْلُ اللهِ لَوَّوْا رُؤُوْسَهُمْ وَرَأَيْتَهُمْ يَصُدُّوْنَ وَهُم مُّسْتَكْبِرُوْنَ
অর্থাৎ, ‘যখন তাদের বলা হয়, তোমরা এস আল্লাহ তাআলার রাসূল তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবেন। তখন তারা মাথা ঘুরিয়ে নেয়। আর তুমি তাদের দেখবে, তারা দম্ভভরে মুখ ফিরিয়ে চলে যায়’ (মুনাফিকূন ৬৩/৫)।[17]
এই অহংকার তাদেরকে তওবার পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
৯. দোদুল্যমান মনোভাব:
আল্লাহ তাআলা বলেন,
مُذَبْذَبِيْنَ بَيْنَ ذَلِكَ لاَ إِلَى هَـؤُلاء وَلاَ إِلَى هَـؤُلاَءِ
অর্থাৎ, ‘এরা দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছে। না ওরা মুমিনদের দিকে, না ওরা কাফেরদের দিকে’ (নিসা ৪/১৪৩)।[18]
অত্র আয়াতের মর্মার্থ হল, মুনাফিকরা তাদের দ্বীন সম্পর্কে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তারা কোন বিশ্বাসেই স্থির হতে পারে না। না তারা মুমিনদের সাথে জাগ্রত জ্ঞানের উপর আছে, না কাফেরদের সাথে অজ্ঞতার উপর আছে। তারা বরং দুইয়ের মাঝে অস্থিরমতি হয়ে বিরাজ করছে।[19]
ইবনু ওমর (রা.) হতে বর্ণিত, নবী করীম ﷺ বলেছেন,
مَثَلُ الْمُنَافِقِ كَمَثَلِ الشَّاةِ الْعَائِرَةِ بَيْنَ الْغَنَمَيْنِ تَعِيرُ إِلَى هَذِهِ مَرَّةً وَإِلَى هَذِهِ مَرَّةً
অর্থাৎ, ‘মুনাফিকের উদাহরণ দু’টি পাঁঠার মাঝে একটি গরম হওয়া বকরির মত। সে একবার এটার কাছে যায়, আরেকবার অন্যটার কাছে যায়’।[20] এই অস্থিরতা তাদের জীবনকে একটি বিভ্রান্ত যাত্রায় পরিণত করে।
১০. মুমিনদের সাথে ধোঁকাবাজি:
আল্লাহ তাআলা বলেন,
يُخَادِعُوْنَ اللهَ وَالَّذِيْنَ آمَنُوْا وَمَا يَخْدَعُوْنَ إِلاَّ أَنفُسَهُمْ وَمَا يَشْعُرُوْنَ
অর্থাৎ, ‘তারা আল্লাহ তাআলা ও ঈমানদারগণের সাথে প্রতারণা করে। অথচ এর মাধ্যমে তারা কেবল নিজেদের সাথেই প্রতারণা করে। কিন্তু তারা তা বুঝতে পারেনা’ (বাক্বারাহ ২/৯)।[21]
মুনাফিকদের তাদের রব ও মুমিনদের সাথে ধোঁকাবাজি এই যে, তারা মুখে কালেমা উচ্চারণ করে এবং আল্লাহ তাআলাকে বিশ্বাসের কথা বলে। কিন্তু অন্তরে আল্লাহ তাআলার প্রতি সন্দেহ ও অবিশ্বাস লুকিয়ে রাখে। সরাসরি আল্লাহ তাআলাকে অস্বীকার করলে তার বিধান মৃত্যুদন্ড অথবা বন্দীত্ব। এই উভয় শাস্তি থেকে দুনিয়াতে নিজেদের বাঁচানোর জন্য তারা মুখে ঈমান যাহির করে এবং অন্তরে কুফর লুকিয়ে রেখে আল্লাহ তাআলা ও আল্লাহ তাআলার প্রতি বিশ্বাসীদের ধোঁকা দিতে চেষ্টা করে।[22]
এই প্রতারণা শেষ পর্যন্ত তাদের নিজের ধ্বংস ডেকে আনে।
১১. তারা যা করেনি তার জন্যও প্রশংসা কামনা করে:
আল্লাহ তাআলা বলেন,
لاَ تَحْسَبَنَّ الَّذِيْنَ يَفْرَحُوْا بِمَا أَتَوْا وَّيُحِبُّوْنَ أَن يُحْمَدُوْا بِمَا لَمْ يَفْعَلُوْا فَلاَ تَحْسَبَنَّهُمْ بِمَفَازَةٍ مِّنَ الْعَذَابِ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيْمٌ
অর্থাৎ, ‘যেসব লোকেরা তাদের কৃতকর্মে খুশী হয় এবং তারা যা করেনি, এমন কাজে প্রশংসা পেতে চায়, তুমি ভেব না যে, তারা শাস্তি থেকে বেঁচে যাবে। বস্ত্তত তাদের জন্য রয়েছে মর্মান্তিক আযাব’ (আলে ইমরান ৩/১৮৮)।[23]
আবু সাঈদ খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে মুনাফিকদের কিছু লোক ছিল, যারা রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন কোন যুদ্ধে বের হতেন, তখন তাঁর সাথে অংশ না নিয়ে পিছনে থেকে যেত। তারা এভাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে না যাওয়ায় আনন্দ প্রকাশ করত। অতঃপর রাসূল ﷺ যখন মদীনায় ফিরে আসতেন তখন তারা তাঁর সামনে নানা অজুহাত পেশ করত। তারা এসব অজুহাতের জন্য আল্লাহ তাআলার নামে কসমও করত। সেই সঙ্গে তারা যে কাজ করেনি, সেই কাজ করেছে মর্মে তাদের প্রশংসা করা হলে তারা খুব খুশি হত এবং এরূপ কাজ না করেও প্রশংসা পেতে তারা খুবই উন্মুখ থাকত। এতদপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা উক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন।[24]
এই প্রশংসাকামিতা তাদের চরিত্রকে আরও নিচে নামিয়ে দেয়।
১২. অন্তরে ব্যাধি:
মুনাফিকের আকিদা-বিশ্বাসে সন্দেহ, অস্বীকৃতি ও মিথ্যা থাকার কারণে তাদের কলবকে অসুস্থ কলব বলা হয়েছে কুরআনে, যেন একটি রোগ যা অন্তরকে খেয়ে ফেলে। আল্লাহ তাআলার ভাষায়,
فِيْ قُلُوْبِهِم مَّرَضٌ فَزَادَهُمُ اللهُ مَرَضاً وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيْمٌ بِمَا كَانُوْا يَكْذِبُوْنَ
অর্থাৎ, ‘এদের (মুনাফিকদের) মনের মধ্যে রয়েছে মারাত্মক ব্যাধি। অতঃপর (প্রতারণার কারণে) আল্লাহ তাআলা এদের ব্যাধি আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের মিথ্যাবাদিতার কারণে তাদের জন্য রয়েছে পীড়াদায়ক শাস্তি।’ (বাক্বারাহ ২/১০)।[25]
ইবনুল ক্বাইয়িম (রহ.) বলেছেন, দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও খেয়াল-খুশির ব্যাধি তাদের মনে জেঁকে বসে, যা তাদের মন-মানসিকতা কলুষিত করে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা তাদের ব্যাধি আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন।[26]
এই ব্যাধি তাদেরকে সত্য থেকে দূরে রাখে।
১৩. ফাসাদ সৃষ্টিকারী কিন্তু নিজেদের সংশোধনকারী দাবি করা:
মুনাফিকরা সমাজে বিভিন্ন ধরনের ফ্যাসাদ ও অশান্তি সৃষ্টি করে থাকে, অথচ তারা প্রচার-প্রপাগান্ডায় নিজেদের শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী বলে পরিচয় দেয়, যেন তারা একটি মিথ্যা ছবি আঁকেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ قَالُوا إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ الْمُفْسِدُونَ وَلَٰكِنْ لَا يَشْعُرُونَ
অর্থাৎ, ‘আর যখনই তাদের বলা হয়, পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করো না, তারা উত্তরে বলে আমরাই তো সংশোধনকারী ও শান্তিকামী। সাবধান! এরাই ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারী, কিন্তু তাদের সে অনুভূতি নেই।’ (সুরা বাকারা: ১১-১২)।[27]
মুনাফিকরা ইসলাম ও সামাজিক শান্তির বিরোধিতা করে অশান্তি সৃষ্টি করে। কিন্তু নিজেদের ভ্রষ্টতা ও অজ্ঞতার কারণে অনুভব করতে পারে না।[28]
এটি তাদের দ্বিমুখিতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
১৪. মুমিনদের নির্বোধ মনে করা:
মুনাফিকরা নিজেদের বুদ্ধিমান ও চালাক মনে করে। আর মুমিন, মুত্তাকি ও নেককারদের নির্বোধ ও বোকা বলে মনে করে, অথচ আল্লাহ তাআলার কাছে তারাই বোকা ও নির্বোধ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ آمِنُوا كَمَا آمَنَ النَّاسُ قَالُوا أَنُؤْمِنُ كَمَا آمَنَ السُّفَهَاءُ أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ السُّفَهَاءُ وَلَٰكِنْ لَا يَعْلَمُونَ
অর্থাৎ, ‘যখন তাদের বলা হয়, অন্য লোকদের ন্যায় তোমরাও ঈমান আনো, তখন তারা বলে, আমরা কি সেই নির্বোধ লোকদের মতো ঈমান আনব? আসলে তারাই তো নির্বোধ, কিন্তু তাদের সে জ্ঞান নেই।’ (সুরা বাকারা: ১৩)।[29]
এই অপমান তাদের অন্তরের ঈর্ষা প্রকাশ করে।
১৫. প্রত্যেক মুনাফিক উপহাসকারী:
উপহাস করা খুব বাজে স্বভাব। এটি মুনাফিকদের চরিত্রে লেগে থাকে। তারা মুমিন ও কাফির সবার সঙ্গে মেশে। মুমিনদের সঙ্গে মিশে মুমিনদের পক্ষের লোক বলে দাবি করে। আবার কাফিরদের সঙ্গে মিশে বলে আমরা তোমাদেরই লোক। মূলত কারো সঙ্গে তাদের আন্তরিক ও গভীর ভালোবাসা নেই। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ آمَنُوا قَالُوا آمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا إِلَىٰ شَيَاطِينِهِمْ قَالُوا إِنَّا مَعَكُمْ إِنَّمَا نَحْنُ مُسْتَهْزِئُونَ اللهُ يَسْتَهْزِئُ بِهِمْ وَيَمُدُّهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُونَ
অর্থাৎ, ‘যখন তারা মুমিনদের সঙ্গে মিলিত হয় তখন বলে, আমরা ঈমান এনেছি, আবার যখন নিরিবিলি তাদের শয়তানদের (কাফির নেতাদের সঙ্গে) মিলিত হয় তখন বলে, আমরা তো তোমাদের সঙ্গেই আছি। আমরা তাদের (মুমিনদের) সঙ্গে শুধু ঠাট্টা-তামাশা করছি মাত্র। বস্তুত আল্লাহ তাআলা তাদের সঙ্গে তামাশা করছেন (তাদের তামাশার জবাব দিচ্ছেন) এবং তাদের তাদের অবাধ্যতার বিভ্রান্তিতে ঘুরে বেড়ানোর অবকাশ দিচ্ছেন।’ (সুরা বাকারা: ১৪-১৫)।[30]
এই উপহাস তাদেরকে আল্লাহ তাআলার রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
১৬. তারা বধির, মূক ও অন্ধ:
মুনাফিকরা হক কথা শোনার ব্যাপারে বধির, তারা হক কথা শোনে না, সত্য কথা বলার ব্যাপারে মূক ও বোবা এবং সত্য কথা বলে না। সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার ব্যাপারে অন্ধ। আল্লাহ তাআলা ওসব সুবিধাভোগীদের অবস্থা বর্ণনা করেন,
صُمٌّ بُكْمٌ عُمْيٌ فَهُمْ لَا يَرْجِعُونَ
‘তারা বধির, বোবা ও অন্ধ। তারা (হকের দিকে) আদৌ ফিরে আসবে না।’ (সুরা বাকারা: ১৮)।[31]
এটি তাদের অন্তরের অন্ধত্বকে চিত্রিত করে।
১৭. সন্দেহপ্রবণ, দ্বিধাগ্রস্ত ও সুবিধাবাদী:
মুনাফিকরা সুবিধা ভোগের জন্য ইসলামে দাখিল হয়; কিন্তু ইসলামের বিধিবিধান পালন ও ইসলামের আনুগত্যের কষ্ট স্বীকার করতে রাজি নয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
أَوْ كَصَيِّبٍ مِنَ السَّمَاءِ فِيهِ ظُلُمَاتٌ وَرَعْدٌ وَبَرْقٌ يَجْعَلُونَ أَصَابِعَهُمْ فِي آذَانِهِمْ مِنَ الصَّوَاعِقِ حَذَرَ الْمَوْتِ وَاللَّهُ مُحِيطٌ بِالْكَافِرِينَ
অর্থাৎ, ‘(তাদের উদাহরণ হলো) বর্ষণমুখর ঘন মেঘের মতো, যাতে রয়েছে ঘোর অন্ধকার, বজ্রের গর্জন ও বিদ্যুতের চমক; বজ্রধ্বনিতে মৃত্যুভয়ে তারা তাদের কানে আঙুল ঢুকিয়ে দেয়; আল্লাহ তাআলা এসব সত্য প্রত্যাখ্যানকারী লোকদের সর্বদিক দিয়ে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন। অর্থাৎ তারা আল্লাহ তাআলার আয়ত্তের ভেতরে আছে, তিনি তাদের সম্পর্কে জানেন।’ (সুরা বাকারা: ১৯)।[32]
এই দ্বিধা তাদেরকে সত্য থেকে দূরে রাখে।
১৮. সুসময়ের সঙ্গী:
মুনাফিকরা মুসলমানদের সুখ-শান্তি দেখলে ইসলামের ছায়াতলে চলে আসে। আর যখন মুসলমানরা দুখ-কষ্ট ও বিপদাপদে পতিত হয়, তখন নীরবে কেটে পড়ে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
يَكَادُ الْبَرْقُ يَخْطَفُ أَبْصَارَهُمْ كُلَّمَا أَضَاءَ لَهُمْ مَشَوْا فِيهِ وَإِذَا أَظْلَمَ عَلَيْهِمْ قَامُوا
অর্থাৎ, ‘বিদ্যুৎ চমক যেন তাদের দৃষ্টিশক্তিকে ছিনিয়ে নেয়। যখনই তারা তাদের একটু আলো দেয়, তারা পথ চলে, আর যখনই অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়, তখনই থমকে দাঁড়ায়।’ (সুরা বাকারা: ২০) অর্থাৎ সুসময়ে ইসলামের ছায়াতলে চলে আসে, আর যখন বিপদ দেখতে পায়, তখন সিটকে পড়ে এবং পূর্বের নিফাকিতে অবিচল ও অটল থাকে।[33]
১৯. আল্লাহ তাআলার পথে বাধা সৃষ্টিকারী:
মুনাফিকরা মানুষদের আল্লাহ তাআলার দিকে আসতে দেয় না। নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
اتَّخَذُوا أَيْمَانَهُمْ جُنَّةً فَصَدُّوا عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ إِنَّهُمْ سَاءَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
অর্থাৎ, ‘তারা তাদের শপথগুলোকে ঢাল হিসেবে গ্রহণ করেছে, ফলে তারা আল্লাহ তাআলার পথ থেকে বিরত রেখেছে। নিশ্চয় তারা যা করে তা খারাপ।’ (সুরা মুনাফিকুন: ২)।[34]
২০. খেয়াল-খুশির প্রলোভন:
যাদের ঈমান দুর্বল, তারা নারীদের প্রতি প্রলুব্ধ হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِيْ فِيْ قَلْبِهِ مَرَضٌ
অর্থাৎ, ‘আল্লাহ তাআলাকে ভয় করলে তোমরা অন্য পুরুষের সাথে কথা বলার সময় নম্র আওয়াযে কথা বলো না। এমন করলে যাদের মনে ব্যাধি আছে তারা তোমাদের প্রতি প্রলুব্ধ হবে।’ (আহযাব ৩৩/৩২)।[35]
এটি তাদের ঈমানী দুর্বলতা ও মুনাফিকী নির্দেশ করে।
২১. মানুষকে আল্লাহ তাআলার পথের পথিকদের জন্য ব্যয়ে বাধা দান:
আল্লাহ তাআলা বলেন,
هُمُ الَّذِيْنَ يَقُوْلُوْنَ لاَ تُنْفِقُوْا عَلَى مَنْ عِندَ رَسُوْلِ اللهِ حَتَّى يَنْفَضُّوْا وَلِلَّهِ خَزَائِنُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِيْنَ لَا يَفْقَهُوْنَ
অর্থাৎ, ‘এই মুনাফিকরা তো সেসব লোক, যারা (আনছারদের) বলে, আল্লাহ তাআলার রাসূলের (মুহাজির) সাথীদের জন্য তোমরা কোন রকম অর্থ ব্যয় করো না। (তাহলে আর্থিক সংকটের কারণে) তারা রাসূলের কাছ থেকে সরে পড়বে। অথচ আসমান ও যমীনের ধনভান্ডার সমূহ তো আল্লাহ তাআলার। আসলে মুনাফিকরা কিছুই বুঝতে চায় না।’ (মুনাফিকূন ৬৩/৭)।[36]
যায়েদ বিন আরকাম (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসে (বুখারী হা/৪৯০০; মুসলিম হা/২৭৭২), মুনাফিকরা মুহাজিরদের জন্য খরচ না করতে বলে, যাতে তারা সরে যায়।[37]
২২. লজ্জাশীলতা এবং ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব:
নবী ﷺ বলেছেন,
خَصْلَتَانِ لَا تَجْتَمِعَانِ فِي مُنَافِقٍ حُسْنُ سَمْتٍ وَلَا فِقْهٌ فِي الدِّينِ
অর্থাৎ, ‘দুটি গুণ মুনাফিকে একত্র হয় না: ভালো আচরণ এবং ধর্মীয় জ্ঞান।’ (সুনান তিরমিযী হা/২৬৮৪)।[38]
মুনাফিকরা বাহ্যিকভাবে সুন্দর দেখালেও ভালো আচরণ এবং ইসলামের গভীর জ্ঞান থাকে না। তারা শুধু দেখানোর জন্য কাজ করে।[39]
২৩. জিহাদকে অপসন্দ করা এবং তা থেকে পিছুটান দেয়া:
মুনাফিকরা জিহাদ থেকে পিছনে থাকার জন্য অজুহাত পেশ করে, যেন তারা সত্যের লড়াই থেকে পালিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَئِنْ قُتِلْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوْ مُتُّمْ لَمَغْفِرَةٌ مِنَ اللَّهِ وَرَحْمَةٌ خَيْرٌ مِمَّا يَجْمَعُونَ
অর্থাৎ, ‘যদি তোমরা আল্লাহ তাআলার পথে নিহত হও বা মারা যাও, তাহলে আল্লাহ তাআলার ক্ষমা ও রহমত তাদের সঞ্চিত ধন-সম্পদ থেকে উত্তম।’ (আলে ইমরান ৩/১৫৭)।[40]
মুনাফিকরা যুদ্ধ না করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং ভীতিকর গুজব ছড়ায়।[41]
২৪. মুমিনদের ক্ষয়ক্ষতিতে উল্লসিত হওয়া:
মুনাফিকরা মুমিনদের বিপদে আনন্দিত হয়, যেন তাদের অন্তরে ঈর্ষা ও শত্রুতার আগুন জ্বলে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنْ تُصِبْكَ حَسَنَةٌ تَسُؤْهُمْ وَإِنْ تُصِبْكَ مُصِيبَةٌ يَقُولُوا قَدْ أَخَذْنَا أَمْرَنَا مِنْ قَبْلُ وَيَتَوَلَّوْا وَهُمْ فَرِحُونَ
অর্থাৎ, ‘যদি তোমার কোনো সুখ-সমৃদ্ধি ঘটে তাহলে তাদের খারাপ লাগে। আর যদি তোমার কোনো মুসিবত ঘটে তাহলে তারা বলে, আমরা তো আগে থেকেই আমাদের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। অতঃপর তারা আনন্দিত অবস্থায় চলে যায়।’ (তওবা ৯/৫০)।[42]
২৫. অসৎকর্মের আদেশ এবং সৎকর্মে নিষেধ:
আল্লাহ তাআলা বলেন,
الْمُنَافِقُونَ وَالْمُنَافِقَاتُ بَعْضُهُمْ مِنْ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمُنْكَرِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمَعْرُوفِ وَيَقْبِضُونَ أَيْدِيَهُمْ نَسُوا اللَّهَ فَنَسِيَهُمْ إِنَّ الْمُنَافِقِينَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
অর্থাৎ, ‘মুনাফিক পুরুষ ও নারী পরস্পরে সমান। তারা অসৎ কাজের আদেশ দেয় ও সৎকাজে নিষেধ করে এবং তাদের হাত সমূহ বন্ধ রাখে। তারা আল্লাহ তাআলাকে ভুলে গেছে। ফলে আল্লাহ তাআলা তাদের ভুলে গেছেন। নিশ্চয় মুনাফিকরাই হল পাপাচারী’ (তওবা-মাদানী ৯/৬৭)।[43]
মুমিনরা যেখানে ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধ করে থাকে, সেখানে মুনাফিকরা তার বিপরীতে মানুষকে অন্যায় কথা ও কাজের আদেশ দেয় এবং ন্যায় কথা ও কাজ করতে নিষেধ করে। ‘তারা তাদের হাত সমূহ বন্ধ রাখে’ অর্থ তারা আল্লাহ তাআলার পথে ব্যয় থেকে কৃপণতা করে।[44]
এটি তাদের পাপী স্বভাবকে প্রকাশ করে।
উপসংহার:
মুনাফিকীর এই ভয়াবহ আলামতসমূহ জানা ও চিনতে পারা প্রত্যেক মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে সে সমাজে লুকিয়ে থাকা প্রতারণা ও কপটতা থেকে নিজেকে হেফাজত করতে পারে এবং সর্বোপরি নিজের অন্তরকে এসব ধ্বংসাত্মক দোষ থেকে পবিত্র রাখার সচেষ্ট হয়। এই আলামতগুলো যেন একটি সত্যিকারের আয়না, যা প্রতিনিয়ত আমাদের ঈমান, নিয়ত ও আমলের অবস্থা পরখ করে দেখায়। যদি কোনো মুমিন নিজের মধ্যে এর কোনো একটি লক্ষণও অনুভব করেন, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে অনুতপ্ত চিত্তে আল্লাহ তাআলার দরবারে তওবা করা এবং নিজের চরিত্রকে সংশোধনের জন্য অবিরাম দোয়া ও আমলের মাধ্যমে সচেষ্ট হওয়া অপরিহার্য। নিম্নে কয়েকটি নির্ভরযোগ্য দোয়া উল্লেখ করা হলো, যা নিফাক থেকে হেফাজত ও অন্তরের দৃঢ়তার জন্য সর্বদা পড়া উচিত:
يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِيْ عَلَى دِيْنِكَ
হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী আল্লাহ! আপনি আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর দৃঢ় ও স্থির রাখুন।
اَللّٰهُمَّ مُصَرِّفَ الْقُلُوبِ صَرِّفْ قُلُوبَنَا عَلَى طَاعَتِكَ
হে আল্লাহ! হে অন্তরসমূহের পরিচালক! আপনি আমাদের অন্তরসমূহকে আপনার আনুগত্য ও ইবাদতের দিকে ফিরিয়ে দিন।
اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنَ النِّفَاقِ وَالْكِبْرِ وَالرِّيَاءِ وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ وَالْبَخَلِ
হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি নিফাক (কপটতা), অহংকার, লোকদেখানো, কৃপণতা এবং কাপুরুষতা থেকে।
হে আল্লাহ! আপনি আমাদের সকলকে প্রকাশ্য ও গোপন সকল প্রকার মুনাফিকী থেকে রক্ষা করুন, আমাদের অন্তরকে পূর্ণ ঈমান ও ইখলাস দান করুন এবং আমাদেরকে সরল পথে অটল রাখুন। আমীন, ইয়া রব্বাল আলামীন।
রেফারেন্স:
[1]. ইবনু মানযূর, লিসানুল আরب ১০/৩৫৭; ইবনু ফারিস, মু‘জামু মাকায়িসিল লুগাহ ৫/৪৫৫।
[2]. ইবনু কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম ১/১৭৬।
[3]. সূরা আন-নিসা ৪/১৪০, ১৪৫।
[4]. মুহাম্মাদ বিন আবুবকর ইবনুল ক্বাইয়িম দিমাশক্বী (৬৯১-৭৫১ হি.), তরীকুল হিজরাতায়েন ওয়া বাবুস সা‘আদাতায়েন, পৃ. ৫৯৫।
[5]. তাফসীর ইবনু কাছীর, সূরা আন-নিসা ৪/১৪০-১৪৫।
[6]. বুখারী হা/৩৪; মুসলিম হা/৫৮।
[7]. সূরা আত-তাওবাহ ৯/৬৪; তাফসীর ইবনু কাছীর।
[8]. সূরা আল-বাকারাহ ২/১৪-১৫।
[9]. মাদারিজুস সালিকীন ১/৩৫০।
[10]. সূরা আন-নিসা ৪/১৩৮-১৩৯।
[11]. জামি‘উল বায়ান ৯/৩১৯।
[12]. সূরা আন-নিসা ৪/১৪২।
[13]. বুখারী হা/৬৫৭; মুসলিম হা/৬৫১; মিশকাত হা/৬২৯।
[14]. মুসলিম হা/৬২২; মিশকাত হা/৫৯৩; রাবী আনাস (রা.)।
[15]. মাদারিজুস সালিকীন ১/৩৫৪।
[16]. মুসলিম হা/৬৫৪; মিশকাত হা/১০৭২।
[17]. সূরা আল-মুনাফিকুন ৬৩/৫।
[18]. সূরা আন-নিসা ৪/১৪৩।
[19]. তাফসীর ইবনু কাছীর, সূরা আন-নিসা ৪/১৪৩।
[20]. মুসলিম হা/২৭৮৪; মিশকাত হা/৫৭।
[21]. সূরা আল-বাকারাহ ২/৯।
[22]. জামি‘উল বায়ান ১/২৭২।
[23]. সূরা আলে ইমরান ৩/১৮৮।
[24]. বুখারী হা/৪৫৬৭; মুসলিম হা/২৭৭৭।
[25]. সূরা আল-বাকারাহ ২/১০।
[26]. মাদারিজুস সালিকীন ১/৩৫০।
[27]. সূরা আল-বাকারাহ ২/১১-১২।
[28]. তাফসীর ইবনু কাছীর, সূরা আল-বাকারাহ ২/১১-১২।
[29]. সূরা আল-বাকারাহ ২/১৩।
[30]. সূরা আল-বাকারাহ ২/১৪-১৫।
[31]. সূরা আল-বাকারাহ ২/১৮।
[32]. সূরা আল-বাকারাহ ২/১৯।
[33]. সূরা আল-বাকারাহ ২/২০।
[34]. সূরা আল-মুনাফিকুন ৬৩/২।
[35]. সূরা আল-আহযাব ৩৩/৩২।
[36]. সূরা আল-মুনাফিকুন ৬৩/৭।
[37]. বুখারী হা/৪৯০০; মুসলিম হা/২৭৭২।
[38]. সুনান তিরমিযী হা/২৬৮৪।
[39]. তাফসীর আল-কুরতুবী, সূরা আল-মুনাফিকুন।
[40]. সূরা আলে ইমরান ৩/১৫৭।
[41]. তাফসীর ইবনু কাছীর, সূরা আলে ইমরান ৩/১৫৭।
[42]. সূরা আত-তাওবাহ ৯/৫০।
[43]. সূরা আত-তাওবাহ ৯/৬৭।
[44]. তাফসীর ইবনু কাছীর, সূরা আত-তাওবাহ ৯/৬৭।
©somewhere in net ltd.
১|
১৬ ই জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৮
অগ্নিবাবা বলেছেন: নকিব ভাই, আমি কোন ক্যাটাগরিতে থাকবো? আপনার বর্ননা অনুসারে নিজেকে মোনাফেকের দলে রাখতে পারলাম না, কারন আমি ইসলামের বাইরে এসে ইসলামের সমালোচনা করি। আমি তাহলে কোন ক্যাটাগরির? মুর্তাদ? শাতিমে রাসুল? কাফের? মুশ্রিক মালাউন?? ইসলামী মতে আমার ক্যাটাগরি জানতে চাই, আমি বকাজঝকা করব না, শুধু জানতে চাই।