নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

নিজেকে লেখক বলে পরিচয় দিতে সংকোচ হয়; লেখালেখি ইবাদতসদৃশ সাধনা বলেই লিখি। নিজেকে জানা, বিশ্বকে অনুধাবন করা এবং সর্বোপরি মহান স্রষ্টার পরিচয় অন্বেষণই আমার নীরব যাত্রার পাথেয়। দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়-সৃষ্টিকূলকে ভালোবাসায় আগলে রাখার শিক্ষাই ইসলামের মূল বাণী।

নতুন নকিব

যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দল-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না- বিদ্রোহী রন-ক্লান্ত। আমি সেই দিন হব শান্ত।

নতুন নকিব › বিস্তারিত পোস্টঃ

গভীর রাতের যে আহ্বান পাল্টে দেয় জীবন

১৬ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:৩৬

গভীর রাতের যে আহ্বান পাল্টে দেয় জীবন

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

ভূমিকা: এক ফাঁকা রাতের গল্প

রাত গভীর হয়ে গেছে। ঘড়ির কাঁটা তিনটার ঘরে। ঘরের সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন, পুরো বাড়িতে নিস্তব্ধতা। আপনি বিছানায় শুয়ে আছেন, কিন্তু চোখ ঘুমের বদলে আটকে আছে ফোনের ঠান্ডা নীল আলোয়। একটার পর একটা রিল চোখের সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে, হাসির ভিডিও, কারো ভ্রমণের ছবি, কারো রান্নার রেসিপি। অথচ মন কিছুতেই সায় দিচ্ছে না। আঙুল স্ক্রল করেই চলেছে, কিন্তু ভেতরে একধরনের ক্লান্তি জমে উঠছে, একধরনের ফাঁকা অনুভূতি, যার কোনো নাম নেই, যার কোনো ব্যাখ্যা নেই।

আপনি হয়তো নিজেও জানেন না, কী খুঁজছেন। কিন্তু অন্তর জানে, এই স্ক্রিনের আলোয় যা খোঁজা হচ্ছে, তা এখানে নেই।
অথচ ঠিক এই মুহূর্তে, এই একই সময়ে, আসমান থেকে এক আহ্বান ভেসে আসছে। এমন এক আহ্বান, যা প্রতি রাতে আসে, নিঃশব্দে, কিন্তু সুস্পষ্টভাবে। যিনি এই আহ্বান দেন, তিনি স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা। তিনি নিজেই বলছেন, আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেব। আমার কাছে চাও, আমি দেব। আপনার হাতের ফোন যে শূন্যতা পূরণ করতে পারছে না, সেই ডাক হয়তো তা পূরণ করে দিতে পারত, যদি আপনি একটু থেমে শুনতেন।

যে ডাক প্রতি রাতে আসে

রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الْآخِرُ، يَقُولُ: مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ، مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ، مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ

অর্থ: আমাদের রব সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা প্রতি রাতে যখন রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে, তখন দুনিয়ার আকাশে অবতীর্ণ হন এবং বলেন, কে আছ, যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব। কে আছ, যে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দেব। কে আছ, যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। (সহিহ বুখারি, হাদিস ১১৪৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৭৫৮)

একবার গভীরভাবে ভেবে দেখুন এই দৃশ্যটি। মহাবিশ্বের প্রতিপালক, যিনি আরশে সমাসীন, যাঁর ক্ষমতার সামনে গোটা সৃষ্টিজগৎ বিন্দুমাত্র, তিনি প্রতি রাতে বিশেষভাবে নেমে আসেন, শুধু একটি কথা বলার জন্য: "আছ কি কেউ, যে আমাকে ডাকবে?" এই আহ্বান কোনো সাধারণ ঘোষণা নয়। এটি একজন প্রেমময় প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তাঁর বান্দার প্রতি এক করুণ আকুতি, যেন তিনি নিজেই চাইছেন তাঁর বান্দা তাঁর কাছে কিছু চাক, যাতে তিনি তাকে দিতে পারেন।

অথচ আমরা তখন কী করি? কেউ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকি, কেউবা রাত জেগে থাকি ঠিকই, কিন্তু সেই জাগরণ ব্যয় হয় ফোনের স্ক্রিনে, অর্থহীন কনটেন্টে, যা শেষ পর্যন্ত কোনো তৃপ্তি দেয় না। যে সময়টা আমাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় হতে পারত, তা নীরবে হারিয়ে যায়। আর আমরা টেরও পাই না।

চাদর আবৃত নবীর প্রতি নির্দেশ

সুরা মুজ্জাম্মিলের শুরুতেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে বলেন,

يَا أَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ، قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًا، نِصْفَهُ أَوِ انْقُصْ مِنْهُ قَلِيلًا، أَوْ زِدْ عَلَيْهِ وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا

অর্থ: হে চাদর মুড়ি দেওয়া মানুষ, রাতে দাঁড়াও, তবে অল্প কিছু সময় বাদে। অর্ধরাত অথবা তার চেয়ে একটু কম, অথবা তার চেয়ে একটু বেশি। আর কোরআন পড়ো ধীরে ধীরে, স্পষ্ট উচ্চারণে। (সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত ১-৪)

এই আয়াত নাজিল হয়েছিল নবুয়তের একেবারে সূচনালগ্নে। কল্পনা করুন সেই দৃশ্য, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বিশ্রামে ছিলেন, গায়ে চাদর জড়িয়ে, হয়তো সদ্য প্রাপ্ত ওহির ভার আর নতুন এক দায়িত্বের ভয়ে অন্তর কিছুটা অস্থির। ঠিক তখনই আসমান থেকে ডাক এলো, "হে চাদর মুড়ি দেওয়া মানুষ, শুয়ে থেকো না, ওঠো।" এই ডাক কোনো কঠোর আদেশ নয়, বরং এক গভীর মমতাময় আহ্বান, যা একজন মানুষকে ভবিষ্যতের বিশাল দায়িত্বের জন্য প্রস্তুত করার লক্ষ্যে দেওয়া হয়েছিল। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা যেন বলতে চাইলেন, যে বিশাল দায়িত্ব তোমার সামনে অপেক্ষা করছে, তার শক্তি তুমি ঘুমে খুঁজে পাবে না, খুঁজে পাবে রাতের নির্জনতায়, সিজদার মাটিতে।

আয়াতের শেষ শব্দটিতেও একটি সূক্ষ্ম, গভীর নির্দেশনা লুকিয়ে আছে। "তারতিল" শব্দের অর্থ কেবল ধীরে ধীরে পড়া নয়; এর প্রকৃত অর্থ হলো প্রতিটি শব্দের গভীরে প্রবেশ করে তার অর্থ হৃদয় দিয়ে অনুভব করা, প্রতিটি আয়াতের সামনে থমকে দাঁড়িয়ে ভাবা। দিনের কোলাহলে, ব্যস্ততার ভিড়ে এই গভীর অনুভূতি প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু রাতের নীরবতায়, যখন পৃথিবী ঘুমিয়ে থাকে, তখন কোরআনের প্রতিটি শব্দ যেন নতুন করে জীবন্ত হয়ে ওঠে।

রাতের ইবাদত অন্তরে যে ছাপ ফেলে

কয়েক আয়াত পরেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা বলেন,

إِنَّ نَاشِئَةَ اللَّيْلِ هِيَ أَشَدُّ وَطْئًا وَأَقْوَمُ قِيلًا

অর্থ: নিশ্চয় রাতের বেলা ওঠা অন্তরে গভীরভাবে ছাপ ফেলে এবং তা কথা স্পষ্টভাবে অনুভব করার জন্য অধিক উপযোগী। (সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত ৬)

তাফসিরবিদগণ লিখেছেন, "নাশিআ" শব্দের মূল অর্থ জন্ম নেওয়া, গড়ে ওঠা, অঙ্কুরিত হওয়া। এই শব্দচয়নেই একটি গভীর ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে, রাতের ইবাদত মানুষের অন্তরে এমন কিছু "জন্ম দেয়", যা দিনের ব্যস্ততায় কখনোই জন্ম নিতে পারে না। দিনে আমাদের মন থাকে হাজারো চিন্তায় বিভক্ত, কাজের চাপ, মানুষের কথা, দুনিয়ার হিসাব-নিকাশ। কিন্তু রাতের সেই নির্জন মুহূর্তে, যখন চারপাশ নিস্তব্ধ, যখন কেউ দেখছে না, তখন মন থাকে শান্ত, অবিভক্ত, একাগ্র। এই একাগ্রতাই সেই বীজ, যা থেকে জন্ম নেয় প্রকৃত অন্তর্দৃষ্টি, প্রকৃত বিনয়, প্রকৃত সংযোগ।

যে মানুষ রাতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লার সামনে দাঁড়ায়, কাঁদে, চায়, তার হৃদয়ে এক পরিবর্তন ঘটে যায়, যা দিনের কোনো সেমিনার, কোনো লেকচার, কোনো বইয়ে পাওয়া যায় না। এই পরিবর্তন শব্দে বর্ণনা করা কঠিন, কিন্তু যিনি একবার অনুভব করেছেন, তিনি জানেন, এই অনুভূতিই জীবনের দিক বদলে দেয়।

যাদের পার্শ্ব বিছানা থেকে দূরে সরে যায়

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা প্রকৃত মুমিনদের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে বলেন,

تَتَجَافَىٰ جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا

অর্থ: তাদের পার্শ্বদেশ বিছানা থেকে দূরে সরে যায়, তারা তাদের রবকে ডাকে ভয় ও আশা নিয়ে। (সুরা সাজদাহ, আয়াত ১৬)

কী অসাধারণ এক চিত্রকল্প! এখানে বলা হয়নি যে তারা "রাতে জেগে ওঠে", বলা হয়েছে তাদের পার্শ্বদেশ, অর্থাৎ তাদের শরীরের পাশ, বিছানা থেকে "দূরে সরে যায়"। যেন বিছানার আরাম আর তাদের অন্তরের আকুতির মধ্যে এক টানাটানি চলে, আর শেষ পর্যন্ত জিতে যায় সেই আকুতি। এই মানুষগুলো আরাম ছেড়ে ওঠেন, কিন্তু কোনো বাধ্যবাধকতায় নয়, তারা ওঠেন দুটি অনুভূতির টানে: ভয় (খাওফ) এবং আশা (তামা)। এক হাতে জাহান্নামের ভয়, অন্য হাতে জান্নাত ও আল্লাহর রহমতের আশা, এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়েই তারা প্রতি রাতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লাকে ডাকেন।

আর সুরা জারিয়াতে বলা হয়েছে,

كَانُوا قَلِيلًا مِّنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ، وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ

অর্থ: তারা রাতের সামান্য অংশই ঘুমাত। আর রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত। (সুরা জারিয়াত, আয়াত ১৭-১৮)

এই আয়াতে একটি বিষয় গভীরভাবে লক্ষ করার মতো। এই মানুষগুলো সারা রাত ইবাদতে কাটানোর পরও, নিজেদের কোনো বড় "অর্জন" মনে করেননি। বরং রাতের শেষ প্রহরে এসে তারা ক্ষমা চেয়েছেন, যেন সারারাতের ইবাদতও তাদের কাছে যথেষ্ট মনে হয়নি, যেন তারা জানতেন, নিজেদের আমলের ওপর ভরসা করা যায় না। তারা জানতেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লার কাছে পৌঁছানোর একমাত্র পথ হলো তাঁর অসীম অনুগ্রহ, নিজের আমলের বড়াই নয়।

আর এই প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরেকটি অসাধারণ হাদিসে বলেছেন,

رَحِمَ اللَّهُ رَجُلًا قَامَ مِنَ اللَّيْلِ فَصَلَّى وَأَيْقَظَ امْرَأَتَهُ فَإِنْ أَبَتْ نَضَحَ فِي وَجْهِهَا الْمَاءَ، رَحِمَ اللَّهُ امْرَأَةً قَامَتْ مِنَ اللَّيْلِ فَصَلَّتْ وَأَيْقَظَتْ زَوْجَهَا فَإِنْ أَبَىٰ نَضَحَتْ فِي وَجْهِهِ الْمَاءَ

অর্থ: আল্লাহ সেই পুরুষের প্রতি রহম করুন, যে রাতে উঠে নামাজ পড়ে এবং তার স্ত্রীকে জাগিয়ে দেয়; যদি সে (ঘুম থেকে উঠতে) অস্বীকার করে, তবে তার মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়। আর আল্লাহ সেই নারীর প্রতিও রহম করুন, যে রাতে উঠে নামাজ পড়ে এবং তার স্বামীকে জাগিয়ে দেয়; যদি সে অস্বীকার করে, তবে তার মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ১৩০৮)

এই হাদিসে কী গভীর এক ভালোবাসার চিত্র ফুটে উঠেছে! রাতের এই ইবাদত শুধু একা একা করার বিষয় নয়, বরং এটি এমন এক নিয়ামত, যা স্বামী-স্ত্রী একসাথে ভাগ করে নিতে পারেন। একজন আরেকজনকে আলতো করে ডেকে দেওয়া, প্রয়োজনে মুখে পানির ছিটা দিয়ে জাগিয়ে দেওয়া, এই ছোট্ট কাজটুকুও আল্লাহর রহমত অর্জনের কারণ হয়ে যায়। কী সুন্দর একটি পারিবারিক দৃশ্য, যেখানে দুজন মানুষ একসাথে রাতের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে যান তাদের রবের সামনে।

তাহাজ্জুদ, এক বিশেষ উপহার

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেন,

وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَّكَ عَسَىٰ أَن يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُودًا

অর্থ: রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ পড়ো, এটি তোমার জন্য অতিরিক্ত ইবাদত। হয়তো তোমার রব তোমাকে প্রশংসিত স্থানে অধিষ্ঠিত করবেন। (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত ৭৯)

তাহাজ্জুদ ফরজ নয়, এটি এমন এক বিশেষ উপহার, যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা তাঁর প্রিয় বান্দাদের জন্য আলাদাভাবে সংরক্ষিত রেখেছেন। যে ইবাদত বাধ্যতামূলক নয়, তা যখন কেউ ভালোবেসে, স্বেচ্ছায় আদায় করে, তার মূল্য হয় অন্যরকম। আর এর প্রতিদানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা রেখেছেন "মাকামে মাহমুদ", অর্থাৎ প্রশংসিত মর্যাদা, যা কিয়ামতের দিন বিশেষভাবে প্রকাশ পাবে, যখন সমস্ত সৃষ্টি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শাফায়াতের অপেক্ষায় থাকবে।

নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে বলেছেন, ফরজের পরে সবচেয়ে উত্তম নামাজ হলো রাতের নামাজ।

أَفْضَلُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ صَلَاةُ اللَّيْلِ

অর্থ: ফরজের পর সর্বোত্তম নামাজ হলো রাতের নামাজ। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১১৬৩)

আর যখন কেউ ঘুম থেকে উঠে তাহাজ্জুদের জন্য দাঁড়ান, তখন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেখানো এক অসাধারণ দোআ দিয়ে শুরু করা সুন্নত,

اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ، أَنْتَ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَنْ فِيهِنَّ، وَلَكَ الْحَمْدُ، أَنْتَ قَيِّمُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَنْ فِيهِنَّ، وَلَكَ الْحَمْدُ، أَنْتَ رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَنْ فِيهِنَّ، أَنْتَ الْحَقُّ، وَوَعْدُكَ الْحَقُّ، وَلِقَاؤُكَ حَقٌّ، وَقَوْلُكَ حَقٌّ، وَالْجَنَّةُ حَقٌّ، وَالنَّارُ حَقٌّ، وَالنَّبِيُّونَ حَقٌّ، وَمُحَمَّدٌ ﷺ حَقٌّ، وَالسَّاعَةُ حَقٌّ، اللَّهُمَّ لَكَ أَسْلَمْتُ، وَبِكَ آمَنْتُ، وَعَلَيْكَ تَوَكَّلْتُ، وَإِلَيْكَ أَنَبْتُ، وَبِكَ خَاصَمْتُ، وَإِلَيْكَ حَاكَمْتُ، فَاغْفِرْ لِي مَا قَدَّمْتُ وَمَا أَخَّرْتُ، وَمَا أَسْرَرْتُ وَمَا أَعْلَنْتُ، أَنْتَ الْمُقَدِّمُ وَأَنْتَ الْمُؤَخِّرُ، لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ.

অর্থ: হে আল্লাহ! সকল প্রশংসা আপনারই। আপনিই আসমানসমূহ, পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে—সবকিছুর নূর। সকল প্রশংসা আপনারই। আপনিই আসমানসমূহ, পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে—সবকিছুর ধারক, রক্ষণাবেক্ষণকারী ও পরিচালনাকারী। সকল প্রশংসা আপনারই। আপনিই আসমানসমূহ, পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে—সবকিছুর রব। আপনিই সত্য। আপনার প্রতিশ্রুতি সত্য। আপনার সাক্ষাৎ সত্য। আপনার বাণী সত্য। জান্নাত সত্য। জাহান্নাম সত্য। নবীগণ সত্য। মুহাম্মদ ﷺ সত্য। কিয়ামত সত্য। হে আল্লাহ! আমি আপনারই কাছে আত্মসমর্পণ করেছি। আপনার ওপরই ঈমান এনেছি। আপনারই ওপর ভরসা করেছি। আপনারই দিকে প্রত্যাবর্তন করেছি। আপনারই সাহায্যে (সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য) বিতর্ক করেছি। আপনারই নিকট বিচার প্রার্থনা করেছি। অতএব, আপনি আমার পূর্বের ও পরের, গোপন ও প্রকাশ্য—সব গুনাহ ক্ষমা করে দিন। আপনিই যাকে ইচ্ছা অগ্রগামী করেন এবং যাকে ইচ্ছা পশ্চাৎপদ করেন। আপনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। (সহিহ বুখারি, হাদিস ১১২০; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৭৬৯)

এই দোআটি যখন গভীর রাতের নীরবতায়, একাকী দাঁড়িয়ে পড়া হয়, তখন প্রতিটি শব্দ যেন হৃদয়ে গিয়ে বাজে। "তুমিই সত্য", এই স্বীকারোক্তি দিনের ব্যস্ততায় মুখে বলা সহজ, কিন্তু রাতের নির্জনতায়, যখন দুনিয়ার সব মিথ্যা চাকচিক্য দূরে সরে যায়, তখন এই স্বীকারোক্তি অন্তর থেকে বের হয়ে আসে।

জাগ্রত অন্তর আর ঘুমন্ত অন্তর কি সমান হতে পারে

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা একটি গভীর প্রশ্ন রেখেছেন কোরআনে,

أَمَّنْ هُوَ قَانِتٌ آنَاءَ اللَّيْلِ سَاجِدًا وَقَائِمًا يَحْذَرُ الْآخِرَةَ وَيَرْجُو رَحْمَةَ رَبِّهِ قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ

অর্থ: যে ব্যক্তি রাতের বেলা সিজদায় ও দাঁড়িয়ে ইবাদতে রত থাকে, আখিরাতকে ভয় করে এবং তার রবের রহমতের আশা রাখে, সে কি তার সমান, যে এমন করে না? বলো, যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান? (সুরা যুমার, আয়াত ৯)

এই প্রশ্নের উত্তর আসলে প্রতিটি মানুষেরই জানা, কারণ এটি এত স্পষ্ট যে কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। যে মানুষ রাতে দাঁড়িয়ে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে, আর যে মানুষ শুধু ঘুমিয়েই কাটিয়ে দেয়, এই দুজন কখনো এক হতে পারে না, না দুনিয়ায়, না আখিরাতে। তবু আমরা প্রতিদিন যেন এই সহজ সত্যটাই ভুলে যাই। আমরা ভাবি, ঘুমই বুঝি স্বাভাবিক, ইবাদত বুঝি বাড়তি বোঝা। অথচ প্রকৃত সত্য হলো উল্টো, যে অন্তর রাতে জাগ্রত থাকে আল্লাহর স্মরণে, সেই অন্তরই প্রকৃতপক্ষে জীবিত, আর যে অন্তর শুধু দুনিয়ার ঘুমে বিভোর, তা এক অর্থে মৃতপ্রায়।

সিজদাতেই সবচেয়ে কাছে

নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

أَقْرَبُ مَا يَكُونُ الْعَبْدُ مِنْ رَبِّهِ وَهُوَ سَاجِدٌ فَأَكْثِرُوا الدُّعَاءَ

অর্থ: বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী থাকে সিজদার অবস্থায়, সুতরাং সিজদায় বেশি বেশি দোআ করো। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪৮২)

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা তো এমনিতেই আমাদের ঘাড়ের ধমনির চেয়েও নিকটবর্তী, এই নৈকট্য তাঁর মহাজ্ঞান ও ক্ষমতার নৈকট্য, যা সবসময় বিদ্যমান। কিন্তু বান্দার পক্ষ থেকে সেই নৈকট্য সবচেয়ে গভীরভাবে অনুভব করার মুহূর্তটি হলো সিজদা। যখন একজন মানুষ কপাল মাটিতে ঠেকিয়ে দেয়, নিজের সর্বোচ্চ অহংকারকে সর্বনিম্ন অবস্থানে নামিয়ে আনে, তখন সেই বিনয়ের মুহূর্তেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লার রহমত সবচেয়ে নিবিড়ভাবে বান্দাকে ঘিরে ধরে। আর তাই এই মুহূর্তটিকেই নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেছে নিতে বলেছেন দোআর জন্য, কারণ যে মুহূর্তে বান্দা সবচেয়ে কাছে, সেই মুহূর্তেই চাওয়া সবচেয়ে বেশি ফলপ্রসূ হয়।

কীভাবে শুরু করবেন এই যাত্রা

হয়তো এতক্ষণ পড়ে মনে হচ্ছে, তাহাজ্জুদ বুঝি অনেক কঠিন, অনেক বড় কারো জন্য নির্ধারিত। কিন্তু বাস্তবতা তা নয়। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই বলেছেন, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো তা, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে অল্প। শুরুটা হতে পারে খুবই ছোট।

প্রথমত, ঘুমাতে যাওয়ার আগে নিয়ত করুন যে রাতে উঠবেন, এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লার কাছে দোআ করুন তিনি যেন আপনাকে জাগিয়ে দেন।

দ্বিতীয়ত, ফোনটি বিছানা থেকে দূরে রাখুন, যাতে ঘুম ভাঙার পরও সহজে হাতের নাগালে না আসে।
তৃতীয়ত, শুরুতে দুই রাকাতই যথেষ্ট। সংখ্যার পেছনে না ছুটে, একাগ্রতা আর আন্তরিকতার দিকে মনোযোগ দিন।
চতুর্থত, যদি একদিন উঠতে না পারেন, নিরাশ হবেন না। আবার চেষ্টা করুন। এই পথ ধীরে ধীরে অভ্যাসে পরিণত হয়, একদিনে নয়।

শেষ কথা: এবার একটু থামুন

রাত তিনটায় যখন আঙুল আবার ফোনের স্ক্রিনের দিকে যেতে চাইবে, তখন একবার থামুন। শুধু একবার। মনে করুন, ঠিক তখনই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা ডাকছেন, "কে আছ, যে আমাকে ডাকবে?" এটি কোনো রূপকথা নয়, কোনো কল্পনা নয়, বরং সহিহ হাদিসে বর্ণিত এক জীবন্ত বাস্তবতা, যা প্রতি রাতে ঘটে চলেছে, আপনার জন্যই।

উঠে দাঁড়ান। অজু করুন। দুই রাকাত হলেও নামাজ পড়ুন। সিজদায় মাথা রাখুন, আর বলুন, "হে আল্লাহ, আমি এসেছি। ক্ষমা করে দাও, আশ্রয় দাও, শান্তি দাও।" যে শূন্যতা স্ক্রিন কখনো পূরণ করতে পারেনি, সিজদার সেই প্রশান্তি ঠিক সেই জায়গাটাই ভরিয়ে দেবে। কারণ মানুষের অন্তর তৈরিই হয়েছে আল্লাহকে স্মরণ করার জন্য, আর যতক্ষণ না সেই স্মরণে সে ফিরে আসে, ততক্ষণ কোনো স্ক্রিন, কোনো বিনোদন তাকে প্রকৃত প্রশান্তি দিতে পারবে না।

আজ রাতেই, একবার চেষ্টা করে দেখুন।

তথ্যসূত্র

১. সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত ১-৪
২. সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত ৬
৩. সুরা সাজদাহ, আয়াত ১৬
৪. সুরা জারিয়াত, আয়াত ১৭-১৮
৫. সুরা বনি ইসরাইল (আল ইসরা), আয়াত ৭৯
৬. সুরা যুমার, আয়াত ৯
৭. সহিহ বুখারি, হাদিস ১১৪৫
৮. সহিহ মুসলিম, হাদিস ৭৫৮
৯. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১১৬৩
১০. সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪৮২
১১. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ১৩০৮
১২. সহিহ বুখারি, হাদিস ১১২০; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৭৬৯ (তাহাজ্জুদের দোআ)

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.