| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
আমার জীবনে কখনও এমন কিছু ঘটে নি, যা ব্যাখ্যা করা যায় না। ছোটবেলায় নানারকম কুসংস্কার এবং অপযুক্তি দিয়ে নাকাল হলেও, বয়স বাড়ার সাথে সাথে ধীরে ধীরে এসবকে বিতাড়িত করেছি। আর এই পথচলায় নানাজনের বিরুদ্ধতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তারা তাদের পছন্দমতো বিজ্ঞানকে বেছে নেন, আর কিছু ছেড়ে দেন “অনেক কিছু ব্যাখ্যা করা যায় না” অথবা “বিজ্ঞান এখনও এর নাগাল পায় নি” এই হিসাবে। দৈনন্দিন জীবনে এই ধরনের যেসব অপযুক্তির মুখোমুখি হই, সেসবের জবাব সবসময় মৌখিকভাবে ভালো করে দেয়া যায় না। বাকপটু আর নাছোড় মানুষের কাছে হাল ছেড়ে দিয়ে বলতে হয় “খুব তুমি জিতছো”। কিন্তু মনের ভেতর নানারকম যুক্তি-তর্ক চলতে থাকে। তো সেসবই আমি এখানে গুছিয়ে লিখব।
(১)
বিজ্ঞান তো বদলায়!
বিজ্ঞান এবং যুক্তি দিয়ে কিছু প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে সবচেয়ে বড় যে অভিযোগের সম্মুখীন হতে হয় তা হলো, “বিজ্ঞান আজ এক কথা বলে, কাল অন্য কথা বলে”। সুতরাং, বিজ্ঞানের উপর ভরসা করা যাবে না। আসলে বিজ্ঞান বলতে আমরা কী বুঝি? আর বিজ্ঞান কি আদৌ কিছু বলতে পারে? বলে বৈকি! এবং চপলা কিশোরীর মতো সে বচন আবার পাল্টিয়েও ফেলে! এই যেমন আগে “বিজ্ঞান” বলেছিল সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে, পরে জানা গেছে যে, না পৃথিবীই সূর্যের চারদিকে ঘোরে। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, বিজ্ঞানের ওপর মোটেও ভরসা করা যায় না!
কিন্তু কথা হলো, এই যে এখন আমরা জানি, “পৃথিবীই সূর্যের চারদিকে ঘোরে” এটা আসলে কীভাবে জানলাম? কীভাবে নিশ্চিত হলাম যে পৃথিবীই সূর্যের চারদিকে ঘোরে? কেন এটাকে ধ্রুবসত্য হিসেবে মেনে নিলাম? আমরা কোথা থেকে জানলাম? আমরা কীভাবে নিশ্চিত হলাম যে আর পঞ্চাশ বছর পরে আবার এর উল্টোটা প্রমাণিত হবে না? কার কথায় আমরা আশ্বস্ত হচ্ছি? বিজ্ঞান?
আসলে বিজ্ঞান কিছু বলে না। প্রকৃতি যে নিয়মের শৃঙ্খলে বাঁধা, আমরা তা বোঝার চেষ্টা করি। আমরা সত্যের কাছাকাছি পৌঁছুতে চাই। পৌঁছুনোর এই প্রক্রিয়ায় আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নিয়ম বুঝতে পারি। দিন যত যায়, আমরা সেই নিয়মগুলি আরো নিখুঁতভাবে বুঝতে চাই। এর পরিক্রমায় তৈরি হয় সুত্র, তত্ত্ব আর কখনও নিশ্চিত হতে না পারলে দেয়া হয় হাইপোথিসিস। এই পথচলাটাই বিজ্ঞান। আর আমাদের এগুতে হয় যুক্তিনির্ভর ভাবনা ব্যবহার করে।
পরমাণু মডেলের ইতিহাসটাই এর সবচেয়ে সুন্দর উদাহরণ। ডাল্টন প্রথমে ভাবলেন পরমাণু একটা অবিভাজ্য নিরেট বল। থমসন দেখালেন এর মধ্যে ইলেকট্রন আছে, তাই মডেল হলো তরমুজের মতো, চারদিকে ইলেকট্রন বসানো একটা ধনাত্মক ভর। রাদারফোর্ড পরীক্ষা করে দেখলেন কেন্দ্রে একটা ছোট্ট নিউক্লিয়াস আছে, বাকিটা প্রায় ফাঁকা। বোর বললেন ইলেকট্রন নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘোরে, সৌরজগতের মতো। শেষে কোয়ান্টাম মেকানিক্স এসে দেখাল, ইলেকট্রনের কোনো নির্দিষ্ট কক্ষপথ নেই, বরং একটা সম্ভাব্যতার মেঘের মধ্যে সে থাকে। প্রতিটা মডেলই আগেরটার চেয়ে বাস্তবতার কাছাকাছি। এইভাবেই এগোয় বিজ্ঞান, ভুল স্বীকার করে করে সত্যের দিকে।
যে মানুষগুলি তাদের “অপছন্দনীয় বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব” (যেমন বিবর্তনবাদ) নাকচ করতে চান, তারা নিয়মিতভাবেই সূর্য আর পৃথিবীর প্রদক্ষিণ সংক্রান্ত সেই অতীত বিভ্রান্তির কথা সামনে আনেন। কিন্তু “কালোজিরা আর মধু”র উপকারিতা সম্পর্কে তারা বিজ্ঞানের রেফারেন্স ঠিকই দেন। কোন গবেষণায় এই খাদ্যগুলির বিশেষ উপকারিতা পাওয়া গেছে তা বয়ান করেন। এই ক্ষেত্রে তারা ঘোরতর বিজ্ঞানমনস্ক!
এই প্যাটার্নটা আসলে একটা পরিচিত মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা। একে বলে কনফার্মেশন বায়াস)। মানুষ স্বভাবতই এমন তথ্য খোঁজে আর গ্রহণ করে যা তার আগে থেকে থাকা বিশ্বাসকে সমর্থন করে, আর যা বিশ্বাসের বিপরীতে যায় তা এড়িয়ে যায় বা সন্দেহ করে। শুধু বিজ্ঞান বিষয়ক বিতর্কেই এমন ঘটে না। রাজনীতি, ধর্ম, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সব জায়গাতেই এই প্রবণতা কাজ করে।
(২)
বিজ্ঞান এখনও জানে না
আমি এমন অনেকজনকেই চিনি, যারা হিজামা নামক একটি চিকিৎসাব্যবস্থা নেন। শরীরের বিভিন্ন অংশে ছোট-বড় নানারকম কাপ বসিয়ে রক্ত টেনে নেয়া হয়। বলা হয় যে এতে দূষিত রক্ত বের হয়ে আসে এবং শরীর খুব ভালো লাগে। শুধু তাই না, এতে নানারকম রোগেরও উপকার হয়। যেমন হার্টের অসুখ, ডায়াবেটিস, কিডনি, লিভার ইত্যাদির সমস্যা, গেঁটে বাত, ঘাড়ের ব্যথা এমন কী টাকও! আমি অবশ্য টাকের জন্যে হিজামা নেয়া একজনকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম কী ফল পেল, সে গালামন্দ করে জানিয়েছিল যে অযথা তার পয়সা নষ্ট হয়েছে।
তো, নিয়মিত হিজামা নেয় এবং ভালো বোধ করে এরকম বেশ কজনকে বোঝানোর চেষ্টা করিয়েছিলাম যে এটা আসলে কোনো বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা না। তারা আমার কাছে জানতে চেয়েছে আমি এটা কোথা থেকে জেনেছি। সোর্স দেখালে তারা হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। এসব ওয়েস্টার্ন মিডিয়ার সোর্সে তারা বিশ্বাস করে না। ওয়েস্টার্ন মিডিয়া যেভাবে দেখাতে চায় আমরা সেভাবেই দেখি। তারা বলে যে আমাদের উচিত ওয়েস্টার্ন মিডিয়ার প্রভাবমুক্ত হয়ে নিজস্ব জ্ঞানের উৎস তৈরি করা।
আরেক ধরনের যুক্তি দেখায় তারা। শুধু হিজামার ক্ষেত্রে না, নিজে বিশ্বাস করে, কিন্তু বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত না, এমন সবক্ষেত্রে তারা বলে, “বিজ্ঞান এখনও এটা আবিষ্কার করতে পারে নি, কিন্তু একসময় ঠিকই করবে।”
এমন কী হোমিওপ্যাথির মতো মিমাংসিত অপচিকিৎসা সম্পর্কেও তারা এ কথা বলে।
এখানে দার্শনিক কার্ল পপারের ফলসিফায়েবিলিটি (Falsifiability) ধারণাটি পেশ করা যেতে পারে। “কোনো দাবী তখনই বৈজ্ঞানিক বলে গণ্য হয়, যখন সেই দাবীকে ভুল প্রমাণ করার একটা সুনির্দিষ্ট উপায় থাকে। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে-এই দাবীকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ভুল বা সঠিক প্রমাণ করা সম্ভব, এবং সেটাই ঘটেছে। বিজ্ঞান নিজেকে সংশোধন করতে পারে বলেই সেটা বিজ্ঞান।
কিন্তু "একসময় বিজ্ঞান এটা আবিষ্কার করবে" এই ধরনের দাবীর কোনো ফলসিফায়েবল কাঠামো নেই। একে কখনো ভুল প্রমাণ করা যায় না, কারণ এটা ভবিষ্যতের একটা অনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি। যে দাবীকে কখনোই ভুল প্রমাণ করা যায় না, সেটা বৈজ্ঞানিক দাবী নয়, সেটা বিশ্বাসের দাবী। তাই "একদিন প্রমাণ হবে" না বলে যেটা অপ্রমাণিত, তা প্রমাণ করার দায় বিশ্বাসকারীর ওপরেই বর্তায়!
(৩)
যেখান থেকে তথ্য নাও, তা কতটা ভ্যালিড?
প্রশ্ন হলো, আমরা কোথা থেকে তথ্য নেব, আর কী বিশ্বাস করব? নিউটন অথবা আইনস্টাইনের থিওরির মতো সুপ্রতিষ্ঠিত, বহুবার যাচাই করা বৈজ্ঞানিক জ্ঞান নিয়ে ইন্টারনেটে যে তথ্য পাওয়া যায়, সেটা নির্দ্বিধায় রিলায়েবল। উইকিপিডিয়া বা গুগলের প্রথম পাতায় থাকা সুপ্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক তথ্যও সাধারণত বিশ্বাসযোগ্য হয়ে থাকে। খুবই সাদামাটা আর বোরিং লাগলেও এটাই বাস্তবতা। আর যেসব বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ নতুন বা কম, সেখানে অসঙ্গতি বা অসম্পূর্ণতা থাকতে পারে। এই জায়গাগুলোতে কমনসেন্স খাটিয়ে বুঝতে হয়।
কোনো দাবী শুনলেই দেখা উচিত, এটা কি এমন কিছু, যা নিয়ে বহু বছর ধরে হাজারো বিজ্ঞানী স্বাধীনভাবে গবেষণা করেছেন, একে অপরের কাজ বারবার যাচাই করেছেন, এবং শেষ পর্যন্ত একটা জায়গায় এসে একমত হয়েছেন? নাকি এটা কারো একার দাবি, একটা-দুটো বিচ্ছিন্ন "গবেষণা"র রেফারেন্স, বা মুখে মুখে ঘুরে বেড়ানো একটা কথা, যার পেছনে কোনো পুনরাবৃত্তিযোগ্য প্রমাণ নেই?
মাধ্যাকর্ষণ, বিবর্তন, জীবাণুতত্ত্ব, বিবর্তন- এসব নিয়ে দ্বিমত করার মতো কোনো গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক অবস্থান আজ আর নেই। এগুলো দীর্ঘ সময় ধরে অসংখ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে, ভুল প্রমাণ করার বহু চেষ্টা প্রতিহত করে ঐকমত্যের জায়গায় এসেছে।
কিন্তু নতুন কোনো দাবী, বিশেষ করে যেটা এখনও বড় পরিসরে যাচাই হয়নি, সেখানে সতর্ক থাকতে হয়। একটা গবেষণা মানেই চূড়ান্ত সত্য না। বিজ্ঞানের ইতিহাসেই এমন উদাহরণ ভুরি ভুরি আছে, যেখানে একটা প্রাথমিক গবেষণার ফল পরে বাতিল হয়ে গেছে, কারণ সেটা যথেষ্ট নমুনা নিয়ে হয়নি, বা অন্য কেউ একই পরীক্ষা করে একই ফল পায়নি। "একটা গবেষণায় দেখা গেছে" আর "বহু গবেষণার সম্মিলিত সিদ্ধান্ত" এক জিনিস না। এই পার্থক্যটা গুলিয়ে ফেললেই বিপত্তি বাধে।
যে মানুষ প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানকে ভুল বলে উড়িয়ে দেন, সেই একই মানুষ কিন্তু একটা বিচ্ছিন্ন, অযাচাইকৃত দাবীকে গ্রহণ করতে এক মুহূর্তও দ্বিধা করেন না। তার পছন্দের সাথে মিলতে হবে আর কী! হিজামা সেবা নেয়া একজনকে আমি আমার তথ্যের উৎস সম্পর্কে এই কথা বলেছিলাম। সে হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেছিল, একাডেমিক জগতে কত চুরি-চামারি ঘটে, আমার ধারণাই নেই। নিউটন আর ক্যালকুলাস সংক্রান্ত উদাহরণ দিয়ে বলেছিল যে সে কীভাবে ক্যালকুলাসের ক্রেডিট নিজের নামে বসিয়ে নিয়েছিল।
ভাই, ক্রেডিট যেই নিক! মুসলমানের ক্রেডিট খ্রিস্টান নিক, আর লিবনিজেরটা নিউটন, যুগের পর যুগ ধরে আমরা সত্যের কাছাকাছি আসারই চেষ্টা করছি। বাংলা সিনেমার অতি নাটকীয় সংলাপের মতো শোনাতে পারে, তবে আসলেই সত্যের জয় হবেই। ওয়েস্টার্ন দুনিয়া এক সত্য জানবে আর ইস্টার্ন দুনিয়া এক সত্য, তা হয় না!
(৪)
ওয়েস্টার্ন মিডিয়ার কথায় বিশ্বাস করো না
তারা বলে, পশ্চিমা মিডিয়া আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তাদের এজেন্ডা আছে, তারা যা দেখাতে চায় আমরা সেটাই দেখি, তাই তাদের কোনো সোর্স বিশ্বাস করা যায় না। কথাটা পুরোপুরি মিথ্যা না। মিডিয়ার পক্ষপাত থাকে, রাজনৈতিক স্বার্থ থাকে, ভুল সংবাদও ছাপা হয়, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।
কিন্তু এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। বিবিসি বা সিএনএন কোনো রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে কী বলল, সেটা এক জিনিস। আর নেচার বা সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত একটা গবেষণা কী বলছে, সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। প্রথমটা সাংবাদিকতা, দ্বিতীয়টা বিজ্ঞান। সাংবাদিকতায় পক্ষপাত থাকতেই পারে, কিন্তু একটা পিয়ার-রিভিউড গবেষণাপত্র "পশ্চিমা" বলে সন্দেহজনক হয়ে যায় না। ওখানে গবেষকরা নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী, একজনের ভুল আরেকজন ধরিয়ে দেয়ার জন্যে মুখিয়ে থাকেন, কারণ ওটাই তাদের ক্যারিয়ার গড়ার পথ। কেউ যদি অন্যের ভুল প্রমাণ করে দিতে পারেন, সেটা তার জন্যে বিরাট কৃতিত্ব, লুকানোর কোনো কারণ নেই।
আর "পশ্চিমা বনাম আমাদের" এই বিভাজনটা আসলে একটা মিথ্যা দ্বিত্ব। যেন বিজ্ঞান একটা সাংস্কৃতিক সম্পত্তি, কারো নিজস্ব পরিচয়ের প্রতীক। অথচ মাধ্যাকর্ষণ, রক্তসংবহন, বা একটা ভাইরাসের গঠন, এসব কোনো দেশের একচেটিয়া সত্য না। ক্যালসিয়াম হাড়ে থাকে, এটা বাংলাদেশেও সত্য, আমেরিকাতেও সত্য, চীনেও সত্য। কেউ যদি বলেন "এটা পশ্চিমা বিজ্ঞান, তাই মানব না", তাহলে তাকে প্রথমে বলতে হবে ঠিক কোন গবেষণা, কোন পদ্ধতি, কোন তথ্যের কোথায় ভুল আছে। শুধু উৎসের নাম দেখে খারিজ করাটা যুক্তি না, এটা একটা আগে থেকে ঠিক করে রাখা সিদ্ধান্তকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা মাত্র।
ভুয়া গবেষণার মাধ্যমে কোনো তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে পারে সত্যিই। আমি নিজেও বিভ্রান্ত হতে পারি। কিন্তু এসব কখনই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এই যেমন অ্যান্ড্রু ওয়েকফিল্ডের কথাই ধরা যাক। ১৯৯৮ সালে ল্যানসেট জার্নালে তিনি একটা গবেষণা ছাপান, দাবি করেন এমএমআর টিকা দিলে শিশুদের অটিজম হয়। এই একটা কাগজ গোটা বিশ্বে টিকা নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। বহু মা-বাবা সন্তানকে টিকা দেয়া বন্ধ করে দেন। কিন্তু পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে, তিনি মাত্র ১২ জন শিশুর ওপর গবেষণা করেছিলেন, আর তাদের মেডিকেল হিস্ট্রি বিকৃত করে সাজিয়েছিলেন নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে। এর পরে একের পর এক বড় বড় গবেষণা প্রমাণ করে দেয় টিকা আর অটিজমের কোনো সম্পর্কই নেই। শেষে ল্যানসেট লেখাটা প্রত্যাহার করে নেয়, তার সহ-লেখকদের বেশিরভাগ নিজেদের নাম সরিয়ে নেন, আর তার চিকিৎসার লাইসেন্সই বাতিল হয়ে যায়।
ফার্মাসিউটিক্যাল বিষয় নিয়ে কন্সপিরেসির বিষয়টা আরেকটু ভেঙে পরের পরিচ্ছেদে বলছি।
(৫)
ফার্মাসিউটিকাল কোম্পানিগুলি শুধু তাদের নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী গবেষণা করছে?
ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি একটা ব্যবসা। লাভের হিসাব তাদের মাথায় থাকেই। ওষুধ কোম্পানির টাকায় হওয়া গবেষণায় সেই কোম্পানির ওষুধের পক্ষে ফলাফল আসার প্রবণতা দেখা গেছে। এটা নিয়ে বহু একাডেমিক পেপার আছে। যে গবেষণায় ফলাফল কোম্পানির পক্ষে যায় না, সেটা প্রকাশই হয় না অনেক সময়। একে বলে "পাবলিকেশন বায়াস"। অপিওয়েড সংকটের মতো ঘটনাও ঘটেছে আগে। সেখানে কোম্পানি জেনে-বুঝে ওষুধের ক্ষতিকর দিক চেপে গিয়ে বাজারজাত করেছে। প্রাকৃতিক বা সস্তা চিকিৎসার প্রতি অনাগ্রহেরও একটা বাণিজ্যিক কারণ থাকতে পারে, একটা ভেষজ যা পেটেন্ট করা যায় না, তাতে বিনিয়োগ করে বড় গবেষণা করারও তেমন প্রণোদনা কোম্পানিগুলোর থাকে না। এগুলো বাস্তব সমস্যা, অস্বীকার করার উপায় নেই।
কিন্তু "ফার্মা সবকিছু দাবিয়ে রাখছে", এই দাবীতে বিশ্বাসকারীদের বিরুদ্ধে আমি প্রবলভাবেই কথা বলতে চাই। কারণ, এই মানুষগুলিই তথাকথিত বিকল্প চিকিৎসার দিকে যায়। এরাই জাহাঙ্গীর কবীরের মুরীদ হয়। পৃথিবীর হাজার হাজার বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ভিন্ন দেশের ভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, সবার পরিশ্রমকে অস্বীকার করে তারা টোটকার ওপর ভরসা করে আর এর স্বাস্থ্যগত প্রতিক্রিয়া হয় ভয়াবহ। কোনো একটা সত্যিকারের কার্যকর প্রাকৃতিক চিকিৎসা যদি থেকে থাকে, সেটা একজন স্বাধীন গবেষকের হাত দিয়েও প্রকাশ পেতে পারে। ফার্মার অনুমতির অপেক্ষায় থাকার দরকার নেই।
আমরা কেমিক্যালের ক্ষতি থেকে দূরে গিয়ে প্রকৃতি থেকে ঔষধ নিতে চাই। কিন্তু পানি নিজেই একটা কেমিক্যাল, ভিটামিন সি একটা কেমিক্যাল, একটা আপেলের মধ্যেও শত শত রাসায়নিক যৌগ আছে। কেমিক্যাল না প্রাকৃতিক এর বদলে প্রশ্নটা হওয়া উচিত, কার্যকর কি না, ডোজ ঠিক আছে কিনা। "প্রাকৃতিক" শব্দটাও নিরাপত্তার গ্যারান্টি না, সাপের বিষও প্রাকৃতিক, আর্সেনিকও প্রাকৃতিক। উল্টোদিকে,, অ্যাসপিরিন সিন্থেটিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হলেও কোটি কোটি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে।
কোনটা কাজ করে, কোনটা করে না, সেটা বোঝার একমাত্র উপায় এখনও ওই একই জিনিস, প্রমাণ আর যাচাই, ফার্মার বিরুদ্ধে সন্দেহ থাকলেও তার বিকল্প যাচাইহীন বিশ্বাস হতে পারে না।
(৬)
আপনি কি দেখেছেন যে ওটা কাজ করে?
এটা নিয়ে আসলে বেশি কিছু বলতে চাই না। প্রথম পরিচ্ছেদে অনেকখানিই বলেছি। আমরা তো প্রতিটা বৈজ্ঞানিক তথ্য নিজে পরীক্ষা করে দেখতে পারব না। যেমন, আমরা জানি হাড়ে ক্যালসিয়াম আছে। এটা বইয়ে পড়েছি, শুনেছি, এটা একটা বহুল প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক তথ্য, নিজে গবেষণাগারে গিয়ে যাচাই করিনি। তারপরও এটা আমরা বিশ্বাস করি।
আমাদের মূল উৎস থেকে পাওয়া, বহুবার যাচাই করা, ঐকমত্যপ্রাপ্ত বৈজ্ঞানিক তথ্যকে স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বাস করতে হবে, কারণ প্রতিটা জিনিস আলাদা করে যাচাই করা সম্ভব না। তবে কিছু জিনিস ভুল প্রমাণিত হতে পারে জেনেই, নতুন প্রমাণের সাথে নিজেদের ধারণা আপডেট করার প্রস্তুতি রেখেই আমাদের এগুলি বিবেচনা করতে হবে।
(৭)
ক্রিয়েটিভ লাইসেন্সের মোড়কে অপবিজ্ঞানের প্রসার
একটা উপন্যাসে অতিপ্রাকৃতিক বা অযৌক্তিক কিছু থাকতেই পারে, তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। ভূত-প্রেত, জাদু, ফ্যান্টাসি, ম্যাজিক রিয়ালিজম, এসবের নিজস্ব জগৎ আছে, পাঠকও জানে সে বাস্তবতার বাইরে গিয়ে একটা কল্পিত জগতে ঢুকছে। এখানে সমস্যা নেই।
কিন্তু, যখন একজন লেখক একটা যুক্তিবাদী চরিত্র নির্মাণ করেন আর সেই চরিত্রের মুখ দিয়েই অবৈজ্ঞানিক দাবীকে বাস্তব সত্য বলে চালিয়ে দেন, সমস্যা সেখানেই। হুমায়ূন আহমেদের মিসির আলি চরিত্রটার কথাই ধরি। মিসির আলি একজন যুক্তিবাদী এবং অনুসন্ধানী চরিত্রের মানুষ। অথচ এই চরিত্রকে দিয়েই বলানো হয়েছে যে অনেক মানুষের নাকি সত্যিকারের অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা থাকে, চোখ দিয়ে চামচ বাঁকিয়ে ফেলতে পারে তারা বা ইএসপি ক্ষমতা ব্যবহার করে। জেমস র্যান্ডি যাকে ভুয়া প্রমাণ করেছিলেন, সেই ইউরি গেলারকে হুমায়ূন আহমেদ মিসির আলির মাধ্যমে অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। আর যেহেতু পাঠক মিসির আলিকে একজন অত্যন্ত যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে জানে, তাই তার বয়ানে অতিপ্রাকৃতিকের বাস্তব উদাহরণ তাদের মনে গেঁথে যায় এবং তারাও এসবে বিশ্বাস করতে শুরু করে। দেখেন, মিসির আলির দেবী উপন্যাসে রাণুর ওপর দেবী ভর করা নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা হলো মিসির আলিকে দিয়ে ইউরি গেলারের চামচ বাঁকানোর ধান্দাবাজীকে যখন সত্য বলে অবিহিত করা হয়।
আপাতত দৈনন্দিন জীবনের অপযুক্তি আর অপবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই বিষয়গুলিই লিপিবদ্ধ করা হলো। এর আগে হোমিওপ্যাথি আর ইলুমিনাতিকে ডিবাংক করে দুটি বড় লেখা লিখেছিলাম।
লিংক- ইলুমিনাতি হোমিওপ্যাথি
১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:১৩
হাসান মাহবুব বলেছেন: সেটাই আপা। ভালো থাকবেন।
২|
১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৪২
রাজীব নুর বলেছেন: ভালো বিষয় নিয়ে লিখেছেন।
১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:১৪
হাসান মাহবুব বলেছেন: ধন্যবাদ।
৩|
২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৪৫
ঠাকুরমাহমুদ বলেছেন:
যুক্তি ও সত্যর পক্ষে মানুষ কম থাকে। অপযুক্তি আর মিথ্যার সাথেই মানুষের দল থাকে। জীবনের একটি বড় অংশ পার করেছি থানা আর আদালতে। মানুষ মিথ্যার পক্ষে সাক্ষী দিতে আসে। সত্যর পক্ষে প্রায় কেউ থাকে না।
// আমি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি লেখা লিখবো। সম্ভব হলে আপনি আপনার মনের কথা লিখে একটি মন্তব্য করবেন //
২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৮
হাসান মাহবুব বলেছেন: ধন্যবাদ ভাই।
অবশ্যই পড়ে কমেন্ট করব।
৪|
২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৮
রাজীব নুর বলেছেন: পোষ্টে আবার এলাম। কে কি মন্তব্য করেছেন, সেটা জানতে।
২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:২৪
হাসান মাহবুব বলেছেন: তারপর? কী জানলেন? কী বুঝলেন? বিস্তারিত বলেন।
৫|
২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৪২
অধীতি বলেছেন: সময় উপযোগী লেখা। বিভ্রান্তির যুগে সঠিক ধারণা থাকাটাই অনেক সময় বাঁচিয়ে দেয়।
২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৫৭
হাসান মাহবুব বলেছেন: ধন্যবাদ অধীতি। শুভকামনা।
৬|
২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫০
মিরোরডডল বলেছেন:
লেখাটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভালো লেগেছে।
২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৪৩
হাসান মাহবুব বলেছেন: ধন্যবাদ। দিনটি ভালো কাটুক।
৭|
১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৭:২০
রোবোট বলেছেন: এমন পোস্টে লাইক এত কম কেনো? ব্যাপারটা লাইক করতে পারলাম না। তোমার মত কজন মানুষ আছে বলে লাইফসাপোর্টে হলেও ব্লগ বেঁচে আছে।
১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:২৩
হাসান মাহবুব বলেছেন: ৫টা লাইক কি কম না কি রোবোটাঙ্কেল? আপনাদের মতো পুরোনো মানুষদের দেখলে ভালো লাগে।
৮|
১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৩:২৫
নাহল তরকারি বলেছেন: বিজ্ঞানের সৌন্দর্য হলো, এটি অন্ধবিশ্বাসের ওপর নয়, প্রমাণ ও যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বিজ্ঞান কখনো দাবি করে না যে তার সব উত্তর জানা হয়ে গেছে; বরং নতুন তথ্য ও পরীক্ষার মাধ্যমে পুরোনো ধারণাকে সংশোধন করে আরও নির্ভুল সত্যের দিকে এগিয়ে যায়।
১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৪৫
হাসান মাহবুব বলেছেন: হ্যাঁ। ধন্যবাদ।
৯|
১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪১
মিরোরডডল বলেছেন:
ব্লগের সেই ডিজগাস্টিং পোষ্টে হাসানের মন্তব্যে সহমত জানিয়ে আমি একটা মন্তব্য করেছিলাম কিন্তু সেই ষ্টুপিড ব্লগার সেইটা ডিলিট করে দিয়েছে, তার মগজ নিয়ে কথা বলেছি বলে।
সত্যি অবাক লাগে মানুষের চিন্তা ভাবনার এতোটা অধঃপতন দেখে।
১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৪৭
হাসান মাহবুব বলেছেন: যে পোস্ট মডুদের মুছে দেয়ার কথা, সে পোস্টে ন্যাক্কারজনক পোস্টদাতা মডুগিরি ফলাচ্ছে। ব্লগের কী দুর্দিন!
দেখি কী করা যায়।
গান শোনো- Click This Link
১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:৪৬
হাসান মাহবুব বলেছেন: অপলকের পোস্টটা মোছা হয়েছে।
১০|
২৩ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:১৪
মিরোরডডল বলেছেন:
লেখক বলেছেন: অপলকের পোস্টটা মোছা হয়েছে।
not really.
ডার্টি পোষ্ট এখনও আছে কিন্তু সেখান থেকে আমার মন্তব্য ডিলিট করে দিয়েছে।
But you tried, thanks for that.
গানটা শুনেছি, নাইস ওয়ান। থ্যাংকস অর শেয়ারিং।
আমারও একটা প্রিয় গান দিলাম।
২৩ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:২৫
হাসান মাহবুব বলেছেন: এটা আমারও প্রিয় একটা গান।
কমেন্ট যখন করেছিলাম, তখন কিন্তু পোস্টটা ছিল না। মডু নিজে মুছে আবার ফিরিয়ে দিয়েছে, না কি অপলক নিজেই ড্রাফট করেছিল, কে জানে! আমি তো খুশিই হয়ে গেছিলাম!
১১|
২৩ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৪
মিরোরডডল বলেছেন:
its okay, I absolutely understood.
এ ছেলের মাথায় গণ্ডগোল, আগে এরকম ছিলো না
ভালো থাকবে হাসান।
২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:২৮
হাসান মাহবুব বলেছেন: সনেট কবির এ দূরবস্থা দুঃখজনক।
Can we stay in touch? You can mail me [email protected]
©somewhere in net ltd.
১|
১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:২৫
মেহবুবা বলেছেন: কত শিক্ষিত জ্ঞানী গুনী মানুষকে দেখি অনায়াসে বিভ্রান্ত হতে।
আসলে সাধারণ জ্ঞান, -- common sense is a rare sense !