| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
বুলি বলে শুনতে পাই, রূপ কেমন তা দেখি নাই, ভীষম ঘোর দেখি।। পোষা পাখি চিনলাম না, এ লজ্জা তো যাবে না, উপায় কী করি, আমি উপায় কী করি।।
দেব-দেবতাগণ করে আরাধন
জন্ম নিতে মানবে!
মন যা কর ত্বরায় কর এই ভবে!
বাউলদের দেখলেই আমার ভিতরটা দুমড়ে যায়।
একটা সত্যিকার সার্ভে চালানো হলে দেখা যাবে, ২% লোকও বাউলের ব্যাপারটা ঠিক জানে না। তারা কী, তাই জানা নাই।
কাছ থেকে বাউল দেখেছি, বাউলা দেখেছি দূর থেকে, বাউলাদের সাথে নিশীথযাপন করেছি নির্জনতায়- সাধকদের মাজারে, মদবিহীন উন্মত্ততায় ছোট্ট হৃদয়টা উথাল পাথাল করে উঠেছে তাদের অন্তরসঙ্গীত শ্রবণে... এমন মানব জনম আর কি হবে?
বাউল কী? বাউলকে একটা ধর্মরূপে প্রমাণ করতে চান, কথাটা ঠিক বেখাপ্পা নয়। কেউ ইসলামেই বে-শরা হিসাবে প্রমাণ করতে চান, তাও কিন্তু সত্যি। কেউ বলেন, ব্যাটারা হিন্দুও নয়, এ কথাও মোক্ষম।
বাউলের ভিতরে প্রবহমাণ অন্তর্চেতনাকে একটু ছুয়ে দেখার সুযোগ পোড়া কপালে হয়েছে তো, তাই যখন দেখি বাউলের দাড়ি চুল কেটে দেয়া হয় মুসলমানের হাত দিয়ে, মরলে জানাজা হবে না, জ্যান্ত থাকতে মসজিদে ঢুকতে পারবে না, মন্দিরেও না... কী যে কষ্ট হয়, বলে বোঝানো যায় না।
বাউলের মূলধারা লালন সাঁইজির আগে থেকেই বহমান। তবু এই মহামহিমকে নিয়েই আলাপ শুরু করা যাক।
কথাতো সত্যি, তিনি নামে মুসলমান ছিলেন। ছিলেনই তো। তার নামে বন্দোবস্ত হওয়া জমির দলিল যদি আমরা ঘাঁটতে যাই, দেখতে পাব-
নাম: লালন সাঁই
পিতা: সিরাই সাঁই
ধর্ম: মোসলমান
পশা: ভিক্ষাবৃত্তি ইত্যাদি
আহা, সাঁইজিগো আমার, তুমি কেন আসলে, সেটা বুঝল না মানুষ। সুনীলবাবু তো তোমার জীবন নিয়ে তাঁর জীবনদর্শন অনুসারে উপন্যাস লিখেই খালাস। আর সেই উপন্যাসের আলোকে মনের মানুষ নামে ম্যুভি বানিয়ে খালাস ম্যুভিবিদরা। আমরা দর্শক, ইন্টারনেট আর হিন্দি সিনেমা দেখে কুল পাই না, তাই তোমাকে বুঝতে গিয়ে মনের মানুষ দেখে আমরাও খালাস।
একটা বার কারো মনে পড়ে না, মানুষ আপন সাঁইয়ের নামের ক্ষেত্রে বলে, আমার পিতা। কিন্তু সাঁইকে কউ পিতার আসনে বসাতে পারল না, এক লালন সাঁই ছাড়া। তার অন্তরেও পিতারূপ সিরাজ সাঁই, দেহেও পিতৃরূপে সিরাজ, এমনকি দলীলেও সিরাজ।
ধন্য লালন সাঁইজির কথা,
অনন্তরূপ সৃষ্টি করলেন সাঁই,
শুনি মানবের উত্তম কেহ নাই।
এই সাঁইটা আবার কী জিনিস? লালন পন্ডিতে দেশ-বিদেশ ছেয়ে গেছে। তাদের উপস্থিতিতে কিছু বলতে যাওয়াও দূষণীয়।
না, ভদ্রনোকে যে লালন শাহ্ লালন শাহ্ করে, সেটা শুধুই ভদ্র শব্দ। শাহ্ আর সাঁই পুরো আকাশ পাতাল তফাত। শাহ্ শব্দটা ইরানি। শাহ্ এসেছে রাজা বা শাসনকর্তা হিসাবে। বাদশাহ্ মানে শাহ্ দের পরে যিনি শাহ্। এমনি সব শব্দ, পাদশাহ্, শাহানশাহ্ মানে শাহদের পর শাহ্। জাহান শাহ্ মানে সারা জাহানের যিনি বাদশাহ্। আবার শাহ্ শব্দটা ব্যবহৃত হয় দয়াময় নবী দ.’র পবিত্র বংশধারায় কখনো সখনো। কখনো ব্যাপকভাবে, একেবারে বংশগতভাবে। সেটাও ফারসি-ইরানি প্রভাব।
লালন তো জানাসূত্রে নবীবংশও নন, নন কোন শাসক, তার নামের সাথে আমরা যে শাহ্ ব্যবহার করি, সেটাকে সম্মানার্থে ব্যবহারে কোন দূষণ নেই, কিন্তু সাঁই শব্দের প্রতিরূপে ব্যবহার দূষণ তো বটেই।
সাঁই এসেছে আরবি শব্দ থেকে। শাইখ। শাইখ মানে গুরু। দীক্ষাগুরুকেই মূলত সাইখ বলা হয়, শিক্ষাগুরুকে নয়। শিক্ষাগুরু তো একপ্রকার, পিতৃশ্রেষ্ঠ, কিন্তু বহু হতে পারেন। দীক্ষাগুরু আদপে মাত্র একজন। এক জীবন, এক গুরু। তার কাছেই বিক্রি হয়ে যাওয়া- এই হল সাঁইবাদ, শাইখতন্ত্র। হ্যা, ফারসি একটা রূপ আছে বটে, তাকে বলে পীর।
তো লালন সাঁই সাঁই হয়েছেন সিরাজ সাঁইয়ের পথ ধরে। আর সিরাজ সাঁই কীভাবে সাঁই হলেন? উপরে উঠতে গিয়ে ধাক্কা খেতে হয়, তাদের ধারাটা গিয়ে ঠেকেছে মহামতি নিজামুদ্দিন আউলিয়াতে। (নিজামুদ্দিন আউলিয়া আর ডাকাত থেকে নিজামুদ্দিনের আউলিয়া হয়ে যাওয়া- দুজন দুই ব্যক্তি, ইতিহাসের বিকৃতিতে নিজামুদ্দিন আউলিয়ার ক্ষেত্রে আমরা সেটা ব্যবহার করি।)
নিজামুদ্দিন আউলিয়ার চতুর্থ পূর্ব সাঁই হলেন গরীব নাওয়াজ মুঈনুদ্দীন চিশতী। তিনি আবার সংশ্লিষ্ট ছিলেন বাগদাদের কালাতিক্রমী মহাপুরুষ গাউসে জিলানীর সাথে, কিন্তু তাদের পরম্পরার ধারা ছিল ভিন্ন। চিশতী ধারা গিয়ে মিলিত হয় সাহাবী (কউ কউ অজ্ঞতাবশত বলেন, তাবেয়ী) হাসান বসরী যাঁর উপর আল্লাহ্ রাজি ও খুশি- তাঁর কাছে। পরম্পরা গিয়ে শেষ হয় আলী কাররামাল্লাহ্ এর কাছে, যাকে ভালবেসে লালন ঘরানারা বলেন, আলী কালামুল্লা- মানে আল্লার বাণী।
লালন সাঁইজির পরম্পরার অধোপুরুষেও কিন্তু এই ধারা বর্তমান।
এখন মজার প্রশ্ন হল, তারা যদি মুসলিম ঘরানার হয়েই থাকবেন, মুসলিমরা তাদের কেন মানে না, আর তারাও কেন দাবী করেন না, আর জীবনাচরণেও কেন তা ফুটে ওঠেনি?
এখানেই বাউলমনের জ্বালা। এখানেই সে অস্পৃশ্যপূর্ব পর্দাটা লুকিয়ে থাকে। যে মনটাকে উন্মুক্ত করে সেখানে ছোঁয়া দিতে পারবে, সে মরার আগে ধরে যাবে কোন অধরাকে।
তাঁরা উপলব্ধির এমন এক স্তরে অবস্থান করেন, যেখানে আমি-তুমি-তোমরার প্রচলিত ত্রিমাত্রিক জগত দুমড়ে মুচড়ে যায়।
তাঁরা নিজেদেরকে মুসলিম বা হিন্দু দাবী করেন না, কারণ মুসলিম বা হিন্দু দাবী করার মধ্যে যে গৌরববোধ আছে, সেই আমিত্বকে জলাঞ্জলী না দিলে তো অকিঞ্চনের অকিঞ্চিত দানের যৎকিঞ্চিত এই সামান্য দু হাতের তালুতে ধারণ করা কোনদিনই সম্ভব হবে না।
তাঁদের উপলব্ধিটা এমন এক স্তরে গিয়ে পৌছেছে, যেখানে আমি মুসলমান, বা হিন্দু, বা ওই বংশের বা ওই জাতির হওয়াতে কোন আলাদা গৌরব নাই। মানব তাদের আরাধ্য, কিন্তু এমনকি মানব হওয়াতেও কোন গৌরব নাই। মানব-মলের ভিতরে বিচরণরত একটা ব্যাক্টেরিয়া আর তার নিজের মধ্যে তারা কোন ফারাক তারা আসলেই পান না।
এই যে অনুভূতি, সাঁইজি, সেটা তো তোমার স্পর্শবিনে কখনো দূর থেকে বোঝার যো নেই, তুমি ক্ষমা দাও ওদের।
হ্যা, বাউলার ভউ টোটালিটারিয়ান ভউ। তাদের ভউ হোলিস্টিক। সারবিক এবং সামগ্রিক। একটা দৃষ্টিভঙ্গি, যা এমনিতে অর্জিত হয় না, এই পরিপূর্ণতার জন্য চাই এক গুরু, আর চাই নিবেদন। একাগ্রকায়মনোবাক্যে অনুভূতির একবিন্দুতে স্থাপন। তারপর না মাত্র দৃষ্টিভঙ্গি অর্জিত হবে। পড়ে আছে যোজন যোজন পথ। এরপর আসবে এই দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে এগিয়ে যাবার পালা। সে আরো বড় কোন যাত্রা।
দৃষ্টির দিগন্তবিস্তৃতিতে সবকিছু লয়প্রাপ্ত হতে শুরু করে।
তখনি অনুভূতিতে আসে, যে আল্লাহ মা’বুদের জন্য আমার নামাজ পড়া, সে নামাজে একাগ্রতা কতটা আছে? নেই। সে নামাজে তার সাথে মিরাজ করার দৃষ্টান্ত? অকল্পপূর্ব।
আর যখন আমার মিরাজ চলছে মালিক তোমার সাথে তখন তোমার আমার মাঝে পর্দারূপে নামাজ এনে ভালবাসাটাকে আচারে বিচারে ঢেকে কী হবে প্রভু?
প্রভু, আমি যদি তোমাতেই সমর্পিত হয়ে থাকি, তাহলে হিন্দু-মুসলিম, জাত-পাত, ব্যাখ্যা- টিপ্পনীর বেড়ার বাইরে তোমারি কালামের কথা কেন প্রকাশ্যে ধরি না? আপন রূপে আমি সিজিলাম মানব?
জাত গেল, জাত গেল বলে, একী আজব কারখানা!
হ্যা, লালন সাইজি আর সব মহামহিম সূফী সাধকদের মতই এক সাধক। তাকে আপনি সুফী বলতে পারেন, কারণ তিনি সউফ- সরল সাদা পোশাক ধারণ করেছিলেন। সূফী বলতে পারেন, কারণ তিনিও মালিকের ভালবাসায় ভাবমত্ত হয়ে দিনাতিপাত করেছেন জঙ্গলের কাঠ কেটে। মুনী বলতে পারেন, তাতে ইসলাম ধর্মের কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। মুনী শব্দটা এসেছে মৌনী থেকে মৌনী মানে যে মৌন থাকে। আর মৌন থাকাটা ইসলাম ধর্মের সাধনার মধ্যেও অবশ্যকরণীয়। এমনকি প্রচলিত যে ফরজে কিফায়া, অর্থাৎ সমাজের উপর ফরজ, সমাজে কারো না কারো এ কাজ করলে সবার উপর দায় চলে যায়, তেমনি এক ফারদ্বুল ক্বিফাআহ্ হল এক এলাকার মসজিদে কমপক্ষে একজনকে ইতিকাফ করতে হবে রমজানের শেষ দশদিন। এই ইতিকাফ হল এক ধরনের মৌন সাধনা। সাঁইজিকে আপনারা যোগী বলতে পারেন, কারণ তিনি ধ্যানযোগে প্রভুর প্রতি ভাবযুক্ত হবার সাধনা করতেন। আমাদের মুসলিমদের নামাজও কিন্তু যোগসাধনা। নামাজ মানে মিরাজ, মিরাজ মানে মিলন বা যোগ, তাই আমরা যারা নামাজী, তারা সবাই যোগী। সাইজিকে মুসলিমও বলতে পারেন, কারণ তিনি মহাপ্রভুতে শুধু সমরপিত ছিলেন না, তিনি বিশ্বাস করতেন মহাপ্রভুর শ্রেষ্ঠ প্রেরিতপুরুষ রাসূল দ.’র উপর। আর যে ঈমানের সাতটা বিষয়ে বিশ্বাস রাখে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়, তাকে ক্বাফির-মুরত্বাদ্ব বললে বস্তুত আপনিই জাহান্নামী হবেন। তাকে হিন্দু বললে ক্ষতি কী? সম্রাট আলেকজান্ডার যখন সিন্ধু (বর্তমান পাকিস্তান) অতিক্রম করেন, তখন ওই এলাকাকে হিন্দ বলেছিলেন, স উচ্চারণে সমস্যা ছিল গ্রীকদের। ভাইরে, আমাদের অতি প্রিয় পাকিস্তানি ভাইরা সবাই যে অধিবাসী হিসাবে হিন্দু, আর হিন্দের সীমা শেষ হয়েছে মগধ রাজ্যে এসে, প্রাচীণ মগধ রাজ্যের শেষ প্রান্ত এই বাংলার পুরোটা।
আর যাই করুন না কেন, লালনের উপর অত্যাচার (ডিফেম), তার ঘরানা বাউলের উপর অত্যাচার করবেন না। ওরা মত্ত, কিন্তু কথা সত্যি, মদমত্ত নয়, মত্ততা যার কাছ থেকে এসেছে, তার শক্তিমত্তায় মত্ত।
©somewhere in net ltd.