| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
কুরআনের সৈনিক
`আপনি তাদের শাসক নন' ইসলামের অতুলনিয় সৌন্দর্যে র মাঝে একটি সৌন্দর্য হল, ধর্মীয় বিষয়ে কেবল উপদেশ দেয়ারই কথা বলা হয়েছে, দারোগাগিরি করার কথা বলেন নি। যেমন আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রিয় নবী খাতামান নাবীঈন (সা.)-কে মানুষের জন্য শাসক রূপে প্রেরণ করেন নি। আর শাসন করা কখনও ইসলামের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল না। ইসলামের মূল উদ্দেশ্য মানুষের আধ্যাত্মিকতার সাথে সম্পর্কযুক্ত। ইসলাম ধর্মীয় ব্যাপারে কোন জবরদস্তি করে না, বরং বারণ করে। স্বয়ং মহানবী (সা.)-কে আল্লাহ তায়ালা সম্বোধন করে বলেছেন, তুমি কেবল নসীহত করতে পার, তুমি কেবল একজন উপদেশদাতা। এর সাথে আল্লাহ তালা শাসন করার বিষয়ে শিক্ষা দিতে গিয়ে মোহাম্মদ (সা.)-কে সম্বোধন করে বলেন ‘আপনি তাদের জন্য শাসক নন।’ উপদেশ দেয়াই হল আপনার কাজ আর যারা অমান্য করবে কথা শুনবে না তাদের জন্য জাগতিক কোন বিধানের কথা বলেন নি বরং বলেছেন, ‘তাদের প্রত্যাবর্তন আমারই নিকট। অতঃপর তাদের নিসাব নিকাশ নেয়া (অর্থাৎ শাস্তি বিধান করা) আমার দায়িত্ব।’ চমৎকার শিক্ষা। পৃথিবীর কোন ধর্মে এমন শিক্ষা খুঁজে পাওয়া ভার। অতএব ধর্মের নামে নৈরাজ্য ও অশান্তি সৃষ্টি করে ইসলামের মৌলিক এমন অনন্য শিক্ষাকে কালিমাযুক্ত করা মোটেও কোন ইসলাম প্রেমীর সাজে না।
ইসলাম ধর্মের মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্ব হল, এটা প্রত্যেক মানুষকে ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করে ৷ এই স্বাধীনতা কেবল ধর্ম-বিশ্বাস লালন-পালন করার স্বাধীনতা নয় বরং ধর্ম না করার বা ধর্ম বর্জন করার স্বাধীনতাও এই ধর্মীয় স্বাধীনতার অন্তর্ভূক্ত ৷ পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, কুলিল হাক্কু মির রাবি্বকুম ফামান শা' ফালইউমিন ওয়ামান শা' ফাল ইয়াকফুর অর্থাত্ 'তুমি বল, তোমার প্রতিপালক-প্রভুর পক্ষ থেকে পূর্ণ সত্য এসে গেছে, অতএব যার ইচ্ছা সে ঈমান আনুক আর যার ইচ্ছা সে অস্বীকার করুক' (সূরা কাহাফঃ ২৯)৷ সত্য ও সুন্দর আপন সত্তায় এত আকর্ষণীয় হয়ে থাকে যার কারণে মানুষ নিজে নিজেই এর দিকে আকৃষ্ট হয় ৷ বলপ্রয়োগ বা রাষ্ট্রশক্তি নিয়োগ করে
সত্যকে সত্য আর সুন্দরকে সুন্দর ঘোষণা করানো অজ্ঞতার পরিচায়ক ৷ ফার্সিতে বলা হয়, আফতাব আমাদ্ দালিলে আফতাব ৷ অর্থাত্ সূর্যোদয়ই সূর্যের অস্তিত্বের প্রমাণ ৷ এই নিয়ে গায়ের জোর খাটানোর বা বিতন্ডার অবকাশ নেই ৷ সূর্যোদয় সত্বেও কেউ যদি সূর্যের অস্তিত্ব অস্বীকার করে তাকে বোকা বলা যেতে পারে কিন্তু তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কিছুই নেই ৷ ঠিক তেমনি কে আল্লাহকে মানল বা মানল না, কে ধর্ম করল বা করল না এটা নিয়ে এ জগতে বিচার বসানোর কোন শিক্ষা ইসলাম ধর্মে নেই ৷ বরং এর বিচার পরকালে আল্লাহ নিজে করবেন বলে তাঁর শেষ শরীয়ত গ্রন্থ আল কোরআনে বার বার জানিয়েছেন ৷ এ স্বাধীনতা কাজে লাগিয়ে সমাজে আস্তিকও থাকবে, নাস্তিকও থাকবে ৷ মুসলমানও থাকবে হিন্দুও থাকবে এবং অন্যান্য মতাবলম্বীরাও থাকবে ৷ এক্ষেত্রে রাষ্ট্র পরিচালনা করার ইসলামী শিক্ষা কি আর ধর্ম নিরপেক্ষতা প্রসঙ্গে ইসলাম কি বলে সংক্ষেপে আমার সীমাবদ্ধ জ্ঞানে উপস্থাপন করছি ৷
ধর্ম নিরপেক্ষতা রাষ্ট্র পরিচালনার একটি নীতি৷ এর অর্থ ধর্মহীনতা বা ধর্ম বিমুখতা নয়৷ এর অর্থ হচ্ছে, রাষ্ট্র পরিচালনার ৰেত্রে রাষ্ট্র নায়করা নাগরিকদের ধর্ম বা বিশ্বাসের বিষয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকবেন ৷ কে কোন্ ধর্মে বিশ্বাসী বা কে অবিশ্বাসী অথবা নাস্তিক এ বিষয়ে রাষ্ট্র-যন্ত্র কোন ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না ৷ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমান অধিকার, সবাই রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সমান-এই হচ্ছে ধর্ম নিরপেক্ষতা৷
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তালা ঘোষণা করেছেন, ইন্নাল্লাহা ইয়মুরুকুম আন তুয়াদ্দুল আমানাতি ইলা আহলিহা ৷ ওয়াইযা হাকামতুম বায়নান নাসি আন তাহকুমু বিল আদল ৷ ইন্নাল্লাহা নেঈম্মা ইয়াইযুকুম বিহি৷ ইন্নাল্লাহা কানা সামিয়াম বাসিরা ৷ অর্থাত্ নিশ্চয় আল্লাহ তালা তোমাদেরকে আমানতসমূহ (অর্থাত্ দায়িত্বাবলীকে)-এর উপযুক্ত ও যোগ্য প্রাপকের হাতে তুলে দেয়ার আদেশ দিচ্ছেন ৷ আর যখন তোমরা মানুষের মাঝে শাসন কাজ পরিচালনা কর তখন তোমরা পূর্ণ ন্যায়-পরায়ণতা (Absolute Justice)-এর সাথে শাসন পরিচালনা করবে৷ আল্লাহ যা উপদেশ দিচ্ছেন তা কত উত্তম ৷ নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা (সূরা নিসাঃ আয়াত, ৫৮)
আলোচ্য আয়াতে একদিকে সর্বাধিক উপযুক্ত প্রাপকের হাতে দায়িত্ব প্রদানের জন্য বলা হয়েছে৷ অপরদিকে নির্বাচিত হবার পর শাসন কাজ পরিচালনার মূল নীতি শেখানো হয়েছে৷ এখানে শাসক ব্যক্তিকে ধর্ম পরিত্যাগ করতে বলা হয়নি৷ বরং তাঁকে বলা হয়েছে প্রকৃতপক্ষে যদি ধার্মিক হয়ে থাকো তবে ন্যায় বিচার করবে৷ আর বলা বাহুল্য, পূর্ণ নিরপেক্ষতা ছাড়া পক্ষপাতহীন ন্যায় বিচার সম্ভব নয় ৷
ইসলাম ধর্মের এই অমোঘ শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জীবনে ৷ মক্কার নির্যাতিত অবস্থা থেকে মুক্তি চেয়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা লাভের প্রত্যাশায় তিনি মদিনায় হিজরত করেন৷ মদিনায় পৌছানোর পর মদিনার ইহুদী ও অন্যান্য ধর্ম গোষ্ঠী ও গোত্রের সাথে তিনি একটি 'সন্ধি' করেন ৷ এই সন্ধি 'মদিনা সনদ' নামে বিখ্যাত৷ 'মদিনা সনদের ' প্রতিটি ছত্রে সকল ধর্মের ও বর্ণের মানুষের সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে৷ মদিনা রাষ্ট্রের সকল নাগরিককে এক জাতি-ভুক্ত বলে ঘোষণা করা হয়েছে৷ এখানে কয়েকটি ধারার উল্লেখ করাই যথেষ্ট হবে বলে মনে করি ৷ মদিনা সনদের যে ধারা বিন্যাস প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হামিদুল্লাহ তার লিখিত The First Written Constitution of the World ব্যবহার করেছিলেন এখানেও তাই অবলম্বন করছি৷ চলবে...
©somewhere in net ltd.