নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

কেন মিছে ভাবো আমায় নিয়ে? আমি আছি আমার মতো।

ইসিয়াক

জয় বাংলা!!

ইসিয়াক › বিস্তারিত পোস্টঃ

গল্পঃ নূরজাহান

৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:১৪




সব শুনে গ্রামের বড় হুজুর ফতোয়া দিল—"পেটের বাচ্চাসহ সখিনাকে গায়েব করে দেওয়াই সওয়াবের কাজ হবে। ওকে আজ এই অমাবস্যার রাতে নির্জন চরে ফেলে আসা হোক। ওই মাইয়া অলক্ষ্মী। ওর পেটের সন্তানও কুলক্ষণা। নইলে ওরে ওর স্বামী তাড়াইয়া দিব ক্যান? নিশ্চয়ই কোনো দোষ আছিল।"

সমস্বরে সবাই বলে উঠল, "ঠিক, ঠিক, ঠিক।"

সখিনার বিয়ে হয়েছিল মাধবদী গ্রামে। ১০ বছরের এক ছেলেসহ সে এখন স্বামী-পরিত্যক্তা রমণী। এদিকে পেটে আবার আরেকটি সন্তান। সখিনার বাপের নাম হাসেম আলী। জন খেটে দিনমজুরির কাজ করে জীবন কাটাত সে। মাটি কাটা, গাছ কাটা, ধান কাটা ও নারকেল গাছ থেকে ফল পাড়া ছিল তার প্রধান কাজ। একবার এক গৃহস্থের বাড়ির নারকেল গাছ থেকে পড়ে গিয়ে সারাজীবনের মতো কোমর থেকে তলপেট অব্দি অচল হয়ে ঘরে পড়ে আছে সে। বাধ্য হয়ে সখিনার মা ফাতেমা বিবি অন্যের বাড়ি ধান ভেনে আর কাঁথা সেলাই করে দিন এনে দিন খেয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। অভাবের এমন রূপ যে চারদিকে শুধু হাহাকার।

অভাবের সংসারে হঠাৎই গর্ভবতী সখিনার পেটে অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ আর প্রচণ্ড ব্যথায় প্রাণ যাওয়ার দশা হলো। তখন গ্রামের কবিরাজ ডেকে আনলে সে জানাল, সখিনা ‘জিনের আছড়ে’ পড়েছে; এ বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হলে পুরো পাড়ায় গজব নামবে। এর মধ্যে কারা যেন রটিয়ে দিল সখিনার সন্তানটি অবৈধ কুকর্মের ফসল, যার জন্য স্বামী তাকে ত্যাগ করেছে এবং সেই পাপের ফলই এখন সে ভোগ করছে।

নানামুখী রটনা আর বড় হুজুরের ফতোয়ায় গ্রামের সবাই যখন সখিনাকে নদীর চরে ফেলে আসায় একমত হলো, ফাতেমা বিবি সেদিনই রাতের অন্ধকারে দূরের এক দরগা শরীফের খাদেম মোতাহার সাহেবের পায়ে গিয়ে পড়ল। ঠিক তার পরপরই সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার তীব্র প্রসববেদনা উঠল সখিনার।

নিঃসন্তান মোতাহার সাহেব অত্যন্ত গোপনে সদ্যোজাত কন্যাসন্তানটিকে নিজের জিম্মায় নিয়ে নিলেন। বিনিময়ে ফাতেমা বিবি শপথ করল—মেয়ে কখনো জানবে না তার আসল মা-বাবা কে। আর গ্রামে রটানো হলো সখিনার মৃত বাচ্চা হয়েছে, তাকে নদীর চরে পুতে ফেলা হয়েছে। এর ফলে সখিনা পাপমুক্ত হয়েছে বলেও প্রচার করা হলো। সেই শুক্রবার সখিনার নামে গ্রামের মসজিদে শিন্নি চড়ানো হলো।

সেদিন রাতে সখিনার ১০ বছরের ছেলে আসলাম চুপিচুপি মা ও নানীর পিছু নিয়েছিল। সে শুধু এটুকু দেখেছিল, তার এক ছোট বোন এই দুনিয়ায় এসেছে। কিন্তু সেদিন তার তীব্র জ্বর ছিল। জ্বরের ঘোরে ফিরতি পথে সে খোলা চরেই নিস্তেজ হয়ে পড়ে রইল। সদ্য ভূমিষ্ঠ বোনকে কোথায় রেখে আসা হয়েছে, তা সে জানতে পারল না; কোনো দৃশ্যকল্পই তার কাছে পরিষ্কার ছিল না। ওদিকে সেদিনের পর থেকে তার মা সখিনা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল, স্বাভাবিক জ্ঞানে সে আর কোনোদিনই ফিরল না।

বছরের পর বছর কেটে গেল। আসলাম বড় হলো। নানার পক্ষাঘাত, নানীর সায়াটিকা আর পাগল মায়ের ওষুধ-পথ্যের খরচ চালাতে চালাতে আসলামের যৌবন কাটল অন্যের জমিতে জন খেটে ও মাটি কেটে। কিন্তু মনে তার একটাই সুপ্ত বাসনা—সে টাকা জমাবে, বোনকে খুঁজে বের করবে, আর পরম আদরে নিজের ঘরে ফিরিয়ে এনে ধুমধাম করে বিয়ে দেবে।

দরগার খাদেম মোতাহার সাহেব মেয়েটির নাম রেখেছিলেন ‘নূরজাহান’। অসম্ভব রূপ ও গুণের অধিকারী সে। খাদেম ও তাঁর স্ত্রীর স্নেহে নূরজাহান বড় হতে লাগল কুরআন ও হাদিসের আলোয়।

নানীজান অবশ্য মরার আগে আসলামকে নূরজাহানের কথা এবং সে কোথায় আছে তা জানিয়ে গিয়েছিলেন। তারপর থেকে প্রতি বছর ঈদের আগে দরগায় এক অচেনা লোক এসে একটি শাড়ি, কিছুটা আতর আর কিছু টাকা খাদেম মোতাহার হোসেনের হাতে দিয়ে যেত নূরজাহানের জন্য। খাদেম মোতাহার সেগুলো নূরজাহানের হাতে পৌঁছে দিয়ে বলতেন, "তোর এক অদৃশ্য ভাই আছে রে নূর, সে তোরে খুব ভালোবাসে। কিন্তু কী এক প্রতিজ্ঞায় তোর সামনে সে আসতে চায় না।" নূরজাহান দরগার চত্বরে বসে আল্লাহর কাছে হাত তুলে কান্নাকাটি করত—সে যেন অন্তত একবারের জন্য হলেও তার সেই ভাইয়ের চেহারাটা দেখতে পায়।

নূরজাহানের বয়স যখন আঠারো, দরগার পীর সাহেব নিজের উদ্যোগেই এক সম্ভ্রান্ত মাদ্রাসার শিক্ষকের সাথে তার বিয়ের বন্দোবস্ত করলেন। বড় ধুমধাম করে দরগা প্রাঙ্গণেই বিয়ের আয়োজন হলো। নূরজাহান কাঁদে আর কেবল দরজার দিকে তাকায়—যদি আজ তার সেই অচেনা ভাই এসে দাঁড়ায়! কিন্তু কেউ আসে না। বিয়ের পর দুই-তিন বছর ঈদে শাড়ি দিয়ে যেত লোকটা, তারপর হঠাৎ উপহার আসা বন্ধ হয়ে যায়। খাদেম মোতাহারকে জিজ্ঞেস করেও কোনো সদুত্তর পায় না নূরজাহান।

...

বিয়ের কয়েক বছর পর, নূরজাহানের স্বামী তখন মস্ত বড় এক জামিয়া মাদ্রাসার মুহতামিম। তাদের বিশাল বাড়ি, নিজস্ব জমিজমা। একদিন সেই বাড়ির একপাশে ছোট একটা টিনের ঘরে আশ্রয় দেওয়া হলো এক নিঃস্ব, অসুস্থ খাদেমকে। লোকটির ডান চোখটা নষ্ট, বাম পা-টা টেনে টেনে হাঁটে। বহুবছর আগে এক নতুন ভবনের কাজ করতে গিয়ে বাঁশের ভাড়া থেকে পড়ে তার এই দশা হয়েছিল।

বাড়ির গৃহিণী নূরজাহানের ওপর দাসীদের মাধ্যমে এই লোকটার দেখভাল করার দায়িত্ব পড়ল। স্বামীঅন্তপ্রাণ নূরজাহান তার দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করত, খোঁজখবর নিত। ভোরবেলায় লোকটার কুরআন তিলাওয়াত শুনে সে মুগ্ধ হতো। প্রতি শুক্রবার নূরজাহান নিজ হাতে রান্না করে লোকটার জন্য খাবার পাঠাত। পর্দার আড়াল থেকে লোকটাকে দেখলে কেন যেন তার বুক ঠেলে কান্না আসত। মনে হতো, তার হারিয়ে যাওয়া ভাইটার অবয়ব যেন লোকটার সাথে মিলে যায়। নূরজাহান লোকটার যত্ন নিত, টুপি সেলাই করে পাঠাত।

রমজানের শেষদিকে লোকটা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ল। চাঁদরাতে সুযোগ বুঝে পর্দার আড়াল থেকে লোকটাকে নূরজাহান বলল, "আমার না একটা ভাই ছিল। কোনোদিন চোখ মেলে দেখিনি। আপনাকে দেখলে কেন যেন মনে হয়, আল্লাহ আমার ভাইকে আপনার রূপেই পাঠিয়েছেন। আমার খুব জানতে ইচ্ছে হয়—আপনিই কি আমার সেই হারিয়ে যাওয়া ভাই?"

লোকটা চুপ করে থাকে। কপালে জমে থাকা ঘাম হাত দিয়ে মোছে। তার চোখে ছানি পড়েছে, ভালো দেখতে পায় না; কিন্তু কান তার খুব সজাগ।

পরের দিন ঈদুল ফিতর। সকালে ঈদের নামাজ শেষে নূরজাহান হাসিমুখে থালায় করে লোকটার জন্য সেমাই আর জর্দা পাঠায় দাসীদের দিয়ে। নিজে পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে।

খাওয়া শেষে লোকটা দাসীর মাধ্যমে নূরজাহানের দিকে একটা ছোট্ট পুরোনো কাঠের বাক্স বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "আমার শেষ সময় উপস্থিত বইন। এই বাক্সে আমার জীবনের সবচাইতে দামি জিনিসটা আছে। আমার আর সময় নেই, তুমি এটা খুলে দেখো।"

নূরজাহান কৌতূহল সামলাতে না পেরে তখনই পর্দার ওপাশে বাক্সটি খুলল। ভেতরে অতি যত্নে রাখা কতগুলো চিঠি আর একটা পুরোনো ছবি—মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ১০ বছরের এক শিশু।

নূরজাহানের বুকটা ধক করে উঠল! চোখ জলে ভেসে গেল। সে পর্দা একটু সরিয়ে কান্নাভেজা কণ্ঠে চিৎকার দিয়ে উঠল, "আপনি... আপনিই কি আমার ভাই? ভাইজান! আপনি এতদিন আমার পাশে থেকে নিজেকে লুকালেন কেন? কেন বললেন না যে আপনিই আমার সেই ভাই?"

লোকটা চোখ দুটো বন্ধ করে শান্ত গলায় বলল, "না রে বোন, তুই ভুল বুঝছিস..." সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "আমি তোর ভাই আসলাম নই।"

নূরজাহান চমকে উঠে থমকে দাঁড়াল, "মানে? তাহলে এসব জিনিস আপনার কাছে কেন?"

লোকটা বলল, "তোর ভাই আসলাম আজ থেকে কয়েক বছর আগে ইটভাটায় কাজে গিয়ে চলন্ত ট্রাক থেকে পড়ে মারা যায়। মৃত্যুশয্যায় হাসপাতালে শুয়ে সে এই চিঠির আর ছবির পোঁটলাটা আমার হাতে তুলে দিয়েছিল। আমি তোর খোঁজখবর নিয়ে তোর ছায়া হয়ে থাকার জন্যই এখানে কাজের লোক হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিলাম, যাতে আমানত নষ্ট না হয়। সে আমার বন্ধু ছিল, খুব ভালো মানুষ ছিল। সে আমাকে হাজারটা কসম দিয়ে বলেছিল—'আলী ভাই, আমি তো বোনটাকে কোনোদিন ভালো করে দেখতে পারলাম না। তুমি শুধু আমার এই পরিচয়টা নিয়ে ওর আশেপাশে থেকো, কিন্তু কখনো বোলো না যে তার ভাই মারা গেছে। সে যেন ভাবেন তার ভাই দুনিয়ায় বেঁচে আছে এবং তাকে ভালোবাসে।' সেজন্য তোকে কোনোদিন বলতে পারিনি যে তোর রক্তের ভাই কয়েক বছর আগেই মাটির নিচে ঘুমিয়ে আছে। তোকে ওই মিথ্যে সান্ত্বনাটুকুর ভেতর বাঁচিয়ে রাখতেই আমি এতগুলো বছর তোর ভাই আসলামের ছায়া হয়ে থেকেছি রে বোন... কিন্তু আমারও তো দিন শেষ হয়ে এলো।"

নূরজাহান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বাইরে তখন ঈদের খুশিতে মসজিদের মাইকে ভেসে আসছে তাকবীরের ধ্বনি—আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার...। আর পর্দার আড়ালে এক বোন তার মৃত ভাইয়ের স্মৃতি আর চিঠির বাক্সটা বুকে জড়িয়ে অঝোরে কেঁদে চলেছে।

© রফিকুল ইসলাম ইসিয়াক
রচনাকালঃ ৩০ আগস্ট ২০২৬




মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.