| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
রুপায়না দেশে ফিরছে। অনেক আগের পরিচয় আমাদের, সেই ক্যাম্পাস লাইফ থেকে। একসাথে ঘোরা, শপিং করা, মুভি দেখা, সারারাত জেগে আবোল তাবোল কথার তুবড়ি ছোটানো, স্বপ্ন দেখা আরও অনেক কিছু। আমাদের কথা কখনো শেষ হত না, সারারাত পার হয়ে গেলেও মনে হত কি যেন বাকি রয়ে গেছে বলা। শেষ হয়নি কথা। মাঝে মাঝে এর মাঝে বাঁধা দিত ফোন কোম্পানি। তখন ফেসবুকে কথা চালাচালি ছিল মরুভূমিতে একফোঁটা পানি পাবার মত। সময় গুলো ভাল কাটছিল। অসাধারন কিছু মুহূর্ত আর অসাধারন কিছু স্মৃতি আছে এখনো। মাঝে মাঝে সেই দিনগুলোতে হারিয়ে যাই।
ক্যাম্পাস জীবনের সেই আউলা আধপাগলা আমি আর রুপা যে কত কিছু করেছি তা ভাবলে এখনো হাসি পায়। অনেক ছেলেমানুশি আর রাত জাগার মাঝে কিভাবে যে সেই জীবন নিমেষেই পার হয়ে গেছে বুঝতে পারিনি। তার সাথে আমার সম্পর্ক তা ছিল অদ্ভুত। কেমন যেন একটা আত্মিক বন্ধন ছিল। কিছু বলার আগেই আমরা বুঝে নিতাম, অনেক সময় একসাথেই ফোন দিতাম একজন আরেকজনকে। মাঝে মাঝে তো তার কোন কথার আগেই আমি বলে দিতাম সে কি বলতে চাচ্ছে। অদ্ভুত একটা ভাললাগা থাকতো সারাক্ষণ। তাকে ছেড়ে থাকতে হবে ভাবিনি কখনো। জীবন বদলায়, বদলায় মানুষ। কিন্তু সেই পুরনো স্মৃতি নতুন থেকে যায় মনের মাঝে, কোন পরিবর্তন হয় না। মনের নানা রঙের বাক্সগুলিতে সেগুলো জমা থাকে সযত্নে।
আমি বর্তমানে একটা প্রাইভেট কম্পানিতে জব করি। স্যালারি ভাল। বাসা থেকে আলাদা থাকি একা একটা ফ্ল্যাটে। ৩ টা রুমের একটায় আমি থাকি। আরেকটা মেহমানদের জন্যে। স্টাডিটা সাজিয়ে নিয়েছি নিজের মত করেই। সেখানে কারো ঢোকা বারণ। একলা থাকার ঝামেলা অনেক কম, একটা বুয়া আছে, রেঁধে দিয়ে যায়, ঘর গুছিয়ে রাখে, স্টাডি আমি নিজেই গুছাই। মা বিয়ে বিয়ে করে ক্লান্ত এখন, বয়স বত্রিশের কোঠায় পা দেই দেই করছে। নিজের মত থাকি, ঘুরি ফিরি খাই, শপিং করি একা একা। জীবনটা খারাপ যাচ্ছে না। মোটা মাইনের বেতনের অনেকটাই ব্যাংকে পড়ে আছে। থাকুক না, খরচ করার মানুষ নেই।
আজ সকালে হঠাৎ রুপার ফোন পেয়ে চমকে গেছিলাম। গলাটা আগেরমতই আছে, কথা বলার ধরন পাল্টেছে শুধু। একটু বিদেশি টান, একটু বাংলায় হোঁচট, আমি শুনছিলাম শুধু, হু হাঁ করে ফোন রেখে দিয়েছি। আসলে আমি কিছু গুছিয়ে বলার সময় পাই নি। সবকিছু বারবার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। ফোন রাখার পর বেশ কিছুক্ষণ আমি চুপচাপ বসেছিলাম। সেই স্মৃতির বাক্স থেকে একটার পর একটা স্মৃতি ঢেউ এর মত আছড়ে পড়ছিল মগজে। নাহ, আগের মতই আছে সবই, শুধু সময়টা বদলে গেছে। বুড়িয়ে গেছি আমি, ফুরিয়ে যাই নি তাই বাঁচোয়া। একচিলতে হাসি নিয়ে কেবিন ছেড়ে বেরোলাম। আজকে ছুটি দরকার, বেশি দরকার। রুপা চলে যাচ্ছে আবার সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে। আমাকে জানায়নি সে যে সে এতদিন এই শহরেই ছিল। যাবার আগে এভাবে কোন প্রিপারেশন ছাড়াই হুট করে দেখা করার কোন মানে হয়???
৬ বছর পর দেখা হচ্ছে তার সাথে, কি করব কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। বাসায় যেতে হবে তারপর কোন এক রেস্টুরেন্টে। সেখানে দেখা হবে কিছু সময়ের জন্যে। তারপর জানি না। বাসায় গাড়িটা পার্ক করেই ছুটে গেলাম উপরে। গোসল করে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। ওয়ারড্রবে কাপড়ের অভাব নেই। অনেক আগে কিনে রাখা একটা নীল শার্ট বের করলাম, রুপার সাথে দেখা করার জন্যেই এটা কেনা। কখনো পড়া হয় নি। দ্রুত রেডি হয়ে নিলাম। সময় খুব অল্প, হয়ত তার কোন কাজ আছে। আধ ঘণ্টার মত সময় দিবে সে আমাকে। কি বলব কি করব কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। মাথায় জট লাগা এমন অসহায় অবস্থায় খুব কমই পরেছি আমি। রাস্তায় গাড়ি বের করে মতিঝিলের দিকে ছুটিয়ে দিলাম গাড়ি। একটা রুফটপ রেস্টুরেন্ট এর নাম বলেছে সে আমকে। রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে অনেকগুলো চকলেট কিনলাম আমি। রুপা খুব পছন্দ করত, এখনো হয়ত করে। একটা ফুলের বুকে কিনলাম, নীল অর্কিড এর, রুপায়নার পছন্দের ফুল এটা। তাড়াতাড়ি চলে এলাম রেস্টুরেন্টে।
উপরে উঠে অপেক্ষা করছি। একগাদা চিন্তায় মাথা জট পাকিয়ে গেছে, কোটি কোটি প্রশ্ন মাথায়। কেমন আছে রুপা, বদলে গেছে নাকি আগের মতই আছে, এখনো কি আগের মত সেই ছটফটে আছে??? এখনো কি তার মাথায় দুষ্টুমি কিলবিল করে ??? কেন এতদিন পর আসলো সে?? কেন যোগাযোগ রাখেনি??? কেন ?? অনেক কেন আর আশঙ্কার মাঝে অপেক্ষা করতে করতে ৫টা বেজে গেল। ৫ টায় আসার কথা তার। কিছুক্ষণ পর পর ঘড়ি দেখছিলাম, প্রতিটা সেকেন্ডে প্রতীক্ষা, চাপা উত্তেজনা, ভয় আর প্রশ্নের ভিড়ে নিজেকে জর্জরিত করতে থাকলাম।
৫:১৫............ নাহ আর পারা যায় না। ফোন দিলাম রুপাকে। ২ বার রিং হবার পর ধরল সে
- রুপা ??
- হ্যাঁ বল, আমি আসছি, তুমি অপেক্ষা কর আরও কিছুক্ষণ। জানই তো ঢাকার রাস্তার জ্যাম। আর ১০ মিনিট লাগবে আমার।
- আচ্ছা, রাখছি।
- হুম, ১০ মিনিট, ১০ মিনিট লাগবে আমার জাস্ট
কফি হাতে খোলা ছাদের নিচে এসে দাড়ালাম। এখান থেকে ঢাকা শহরের অর্ধেক অংশ দেখা যায় বহুদূর পর্যন্ত। নিচে ব্যাস্ত মানুষের ঘরে ফেরা আর শেষ বিকেলের চলমান যান্ত্রিকতার মাঝে শেষ মুহূর্তের কিছু কাজ শেষ করতে ছুটতে থাকা মানুষের ভীর। সূর্যের লাল আবিরের মুঠি মুঠি রঙ ছড়িয়ে তার যাবার ঘণ্টা ঘোষণা ঘোষণা করছে। এসব দেখতে দেখতে তন্ময় হয়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ বুঝতে পারলাম প্যান্টের নিচের দিকে টেনে কেউ আমার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে। ঘুরে দাঁড়ালাম, ৪/৫ বছরের একটা ছোট মেয়ে, চুলে সুন্দর করে বেণী করা, একটা লাল টিশার্ট আর নীল জিন্স পড়া, পায়ে লাল কেডস। তার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে হাঁটু গেড়ে বসলাম, গাল ধরে হালকা টেনে আদর করে দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম
- কিছু বলবে??
আধো আধো বাংলায় যা বলল তাতে বুঝতে পারলাম তার গাড়ি চালাতে সমস্যা হচ্ছে আমার জন্যে, আমি যেন একটু সরে দাড়াই। মুচকি হেসে আমি সরে দাড়িয়ে দেখতে লাগলাম মেয়েটাকে। ভালই লাগছিল, নিজের কথা চেপে না রেখে মন খুলে কথা বলে, রুপার মত। রুপার কথা মনে আসতেই ফোন বের করে ফোনে ট্রাই করতে লাগলাম। হঠাৎ পাশ থেকে কেউ বলে উঠলো
- আমাকে ফোন দিচ্ছ???
তাকিয়ে দেখলাম তাকে, রুপাকে, ৬ বছর পর। একটা হালকা নীল শাড়িতে খোলা চুলে দাড়িয়ে আছে সে। প্রায় আগের মতই আছে সে, শুধু এটা বোঝা যায় সে এখন আর সেই চঞ্চলা তরুণী নেই, একজন পুরোদস্তুর যুবতী। চেহারায় একটা আশ্চর্য কমনীয়তা আর একটা ধীর স্থির শান্ত ভাব এসেছে। চমকে ওঠার সময় পাইনি, হয়ত চমকাতে ভুলে গেছি এখন।
- কেমন আছ ???
- ভাল, তুমি ???
- যেমন দেখছ, বদলে গেছ, কিছুটা
- তুমিও বদলেছ, অনেক
- তাই নাকি ??? জানতাম না, নিজেকে দেখার সময় পাইনি
- ও, কেন ?? খুব ব্যাস্ত??
- হুম কিছুটা, নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছি, অফিস এর কাজ, বাসার কাজ আবার অফিস, দম ফেলার সুযোগ নেই
- বাহ, সেই কাজের মানুষ তুমি
- তোমার খবর বল, আগে বলনি কেন আসছ দেশে ??
- এমনি ইচ্ছা করে নি, তোমার কত কাজ, তোমার খোঁজ আছে আমার কাছে, থাকে
- কয়দিন থাকবে ??
- আগামী পরশু রাতের ফ্লাইট
- কতদিনের ছুটি ছিল??
- ছুটি না, এমনিতেই আসা হল, মা কে দেখিনি অনেকদিন
- ও , বাসার সবাই ভাল আছে ??
- হুম, তোমার ??
- ভাল
- বউ ভাল আছে ??? যত্ন করে না বুঝি ??
- হাসালে, খোঁজ রাখ সব??? বিয়েটাই করা হয়নি এখনো এটাও জানো না ???
- হুম , খুজে দেখ, পেয়ে যাবে কাউকে
- হুম তুমি ??
- আমি কি ??
- বিয়ে করেছ ??
ঘড়ির দিকে দেখল রুপায়না। তারপর বলল বড্ড দেরি হয়ে যাচ্ছে, উঠি। আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই উঠে দাঁড়ালো। আমিও দাঁড়ালাম, দেখলাম রুপা কি যেন খুজছে। তারপর সে ডাক দিল "" পৃথুলা""
সেই ছোট মেয়েটা দৌড়ে এসে রুপার হাত ধরল। এবার চমকানোর পালা আমার। এটা তোমার মেয়ে ???
- হুম
- কি নাম তোমার বাবু???
- মেহেরনুশ রাহাত রুপন্তি
- রুপন্তি!!! ভাল নাম।
আর কোন কথা হল না। চকলেটের বাক্স রুপন্তির হাতে দিলাম, মায়ের হাত ধরে হাটতে হাটতে সে লিফটে উঠলো। নিচে এসে দেখলাম গাড়ি রেডি করা আছে। গাড়ি থেকে একজন নেমে এলো, রুপন্তি তার দিকে ছুটে গেল। এটা তার বাবা হয়ত, রুপা কে আবার জিজ্ঞেস করলাম '' বিয়ে করনি?? "
- না, সময় হয়নি, রুপন্তিকে বড় করতে করতেই তো ৬টা বছর শেষ হল
- ওর বাবার সাথে কোন মিল নেই রুপুর, কোথায় যেন দেখেছি মনে হচ্ছে ওকে
- আছে, যথেষ্ট মিল আছে, মিলিয়ে দেখ
- হুম দেখছি, তোমার কান, তোমার চুল, তোমার ...........................
- তোমার চোখ, তোমার নাক, তোমার গড়ন, তোমার কথা বলার ভঙ্গি সব আছে ওর মধ্যে
- মানে কি ??? কি বলতে চাও??
- মানে কিছু না রাহাত, কিছু না
- আমি কিছু বুঝতে পারছিনা রুপায়না
- মাইশা রাহাত রুপন্তি, আমার মেয়ে। শুধু তার মাঝের নামটা তার বাবার নামে রাখা
- রুপা, মাইশা ...... আমার মেয়ে......
- না, ও আমার মেয়ে, তোমার কোন অধিকার নেই, কোন কাপুরুষ আমার মেয়ের বাবা হতে পারে না
- আমি... আমি......... ওর কাছে যাব আমি
- না, তুমি এখানেই দাড়িয়ে থাক, নড়বেনা একচুল
রুপা এগিয়ে যায় গাড়ির দিকে, গাড়িতে বসে রুপন্তির দিকে তাকিয়ে বলে "" মা, আঙ্কেলকে টাটা দিয়ে দাও"" সেই মেয়েটা যার নাক আমার মত, যার চোখ আমার মত, যার মাঝে আমার সত্ত্বার একটা অংশ মিশে আছে, সে জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে আমকে বিদায় জানাছে। চারিদিকের কোলাহল ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে। শেষ বিকেলে ঘরেফেরাদের তুমুল ভীরে আমি একটা খালি পুতুলের মত দাড়িয়ে আছি। আমার চোখের দৃষ্টি ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে তবুও আমি প্রানপন চোখ মুছে দেখার চেষ্টা করছি সেই চোখদুটোকে, সেই হাত। একটু একটু করে দূরে কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে আমার সেই সত্ত্বা, সেই চোখ। আমার চোখটা বারবার ঝাপসা হয়ে আসছে, দূরে চলে যাওয়া হাত দুটোও ...................................................
©somewhere in net ltd.