নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

\"আমি সেই অবহেলা, আমি সেই নতমুখ, নিরবে ফিরে যাওয়া অভিমান-ভেজা চোখ, আমাকে গ্রহণ কর\"- রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

রাকিব আর পি এম সি

একজন মহাকাশপ্রেমী

রাকিব আর পি এম সি › বিস্তারিত পোস্টঃ

বাল হাদাদ (Baal Hadad): প্রাচীন নিকটপ্রাচ্যের ঝড়দেবতা, রাজশক্তি ও ধর্মীয় ইতিহাসের এক বিস্তৃত বিশ্লেষণ (পর্ব–২)

২১ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:০১

অধ্যায় ৫ : হারিয়ে যাওয়া নগরীর প্রত্যাবর্তন — কীভাবে উগারিত আবার পৃথিবীর সামনে ফিরে এল

চিত্র ৩: প্রাচীন উগারিত নগরীর একটি শিল্পসম্মত পুনর্নির্মাণ (আনুমানিক খ্রি.পূ. ১৪০০–১২০০)

১৯২৮ সালের বসন্তে সিরিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের একটি ছোট গ্রামে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যার তাৎপর্য তখন সেখানে উপস্থিত কেউই বুঝতে পারেনি। লাতাকিয়া শহর থেকে কয়েক মাইল উত্তরে মিনেত এল-বেইদা নামে পরিচিত উপকূলীয় এলাকায় জমি চাষ করার সময় একজন স্থানীয় কৃষকের লাঙল মাটির নিচে থাকা একটি পাথরের কাঠামোয় আঘাত করে। প্রথমে এটিকে সাধারণ কোনো পুরোনো স্থাপনা বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু মাটি সরানোর পর বোঝা গেল, এটি একটি প্রাচীন সমাধির অংশ। সমাধিটির ভেতর থেকে যেসব মৃৎপাত্র ও প্রত্নবস্তু বেরিয়ে এল, সেগুলো এমন এক অতীতের দিকে ইঙ্গিত করছিল, যা বহু শতাব্দী ধরে ইতিহাসের স্মৃতি থেকে প্রায় সম্পূর্ণ মুছে গিয়েছিল।

এই আকস্মিক আবিষ্কারের সংবাদ পৌঁছায় তৎকালীন ফরাসি ম্যান্ডেট প্রশাসনের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কাছে। পরের বছর, ১৯২৯ সালে, ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিক ক্লদ ফ্রেদেরিক-আরমান শেফার এলাকাটিতে নিয়মিত খননকাজ শুরু করেন। প্রথমে অনুসন্ধানের কেন্দ্র ছিল সমুদ্রতীরবর্তী মিনেত এল-বেইদা। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রত্নতাত্ত্বিকদের দৃষ্টি সেখান থেকে কিছুটা ভেতরে অবস্থিত রাস শামরা নামের একটি উঁচু মাটির ঢিবির দিকে যায়। আরবি ভাষায় “রাস শামরা” অর্থ মোটামুটি “মৌরি-আবৃত উচ্চভূমি”। বাইরে থেকে এটি ছিল উপকূলীয় অঞ্চলের আরও অনেক প্রাচীন ঢিবির মতোই; কিন্তু এর নিচে চাপা পড়ে ছিল ব্রোঞ্জ যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগরীর ধ্বংসাবশেষ।

প্রত্নতত্ত্বে এ ধরনের ঢিবিকে সাধারণত টেল বলা হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একই স্থানে মানুষের বসতি নির্মাণ, ধ্বংস এবং পুনর্নির্মাণের ফলে একটির ওপর আরেকটি স্থাপত্যস্তর জমে এমন ঢিবি তৈরি হয়। রাস শামরার মাটির নিচেও ছিল মানুষের দীর্ঘ বসতির বহু স্তর। কিন্তু ১৯২৯ সালের খননে যে নগরী ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে শুরু করল, তার সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় ছিল খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শেষভাগে—বিশেষ করে আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চদশ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যে।

খননকারীরা প্রথমে প্রাচীর, কক্ষ, সমাধি ও নানা প্রত্নবস্তুর সন্ধান পেলেন। কিছুদিনের মধ্যেই স্পষ্ট হলো, এটি কোনো সাধারণ গ্রাম বা ছোট উপকূলীয় বসতি ছিল না। এখানে ছিল প্রশস্ত রাজপ্রাসাদ, প্রশাসনিক ভবন, অভিজাতদের বাড়ি, উপাসনালয়, কর্মশালা, গুদাম এবং সুপরিকল্পিত নগরজীবনের চিহ্ন। প্রত্নবস্তুগুলোর মধ্যে সিরিয়া ও লেভান্তের স্থানীয় সামগ্রীর পাশাপাশি মিশরীয়, সাইপ্রাসীয়, মাইসেনীয় ও মেসোপটেমীয় প্রভাবও দেখা গেল। এগুলো প্রমাণ করছিল যে নগরটির যোগাযোগ শুধু তার আশপাশের অঞ্চলের সঙ্গে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

তবু নগরটির প্রকৃত পরিচয় তখনো জানা যায়নি। রাস শামরার মাটির নিচে যে সভ্যতা শুয়ে ছিল, তার নাম প্রাচীন মিশরীয়, হিত্তীয় এবং মেসোপটেমীয় নথিতে বহু আগেই পাওয়া গিয়েছিল—উগারিত। কিন্তু সেই নামের সঙ্গে রাস শামরার সম্পর্ক তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। প্রত্নতাত্ত্বিকদের সামনে ছিল একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরী, কিন্তু তার অধিবাসীরা নিজেদের কী নামে পরিচয় দিত, তাদের রাজাদের নাম কী ছিল, তাদের ভাষা কী ছিল কিংবা তারা কোন দেবতাদের উপাসনা করত—এসব প্রশ্নের উত্তর তখনো মাটির নিচেই লুকিয়ে ছিল।
সেই উত্তর আসতে বেশি সময় লাগেনি।

১৯২৯ সালের ১৪ মে বিকেলে রাস শামরার খননক্ষেত্রে কর্মরত মোহাম্মদ মুরসাল নামে এক শ্রমিক মাটির ভেতর থেকে ছোট ইটের মতো একটি বস্তু তুলে আনেন। এর গায়ে ছিল সারিবদ্ধ অদ্ভুত চিহ্ন। প্রথমে বস্তুটি খুব অসাধারণ কিছু মনে না হলেও শিগগির বোঝা গেল, এটি একটি মাটির ফলক এবং এর ওপর লেখা রয়েছে কিউনিফর্ম বা কীলকাকার লিপি। সাধারণ বর্ণনায় এই আবিষ্কারের সমস্ত কৃতিত্ব প্রায়ই শেফারকে দেওয়া হয়; কিন্তু ফলকগুলোর প্রথম প্রত্যক্ষ আবিষ্কারক ছিলেন খননকর্মী মোহাম্মদ মুরসাল। আধুনিক গবেষকেরা এই বিষয়টি বিশেষভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, কারণ প্রাচীন নিদর্শন আবিষ্কারের ইতিহাসে স্থানীয় শ্রমিকদের অবদান প্রায়ই পরিচালনাকারী ইউরোপীয় প্রত্নতাত্ত্বিকদের নামের আড়ালে হারিয়ে গেছে।

মাটির ফলক প্রাচীন নিকটপ্রাচ্যে নতুন কিছু ছিল না। মেসোপটেমিয়ার অসংখ্য নগরী থেকে এর আগেই হাজার হাজার কিউনিফর্ম ফলক উদ্ধার হয়েছিল। সেগুলোর অধিকাংশ লেখা হতো সুমেরীয় বা আক্কাদীয় ভাষায় এবং তাদের লিপিতে কয়েক শ চিহ্ন ব্যবহৃত হতো। একটি চিহ্ন কখনো একটি শব্দ, কখনো একটি ধারণা, আবার কখনো একটি শব্দাংশ প্রকাশ করত। ফলে কিউনিফর্ম দেখতে একই ধরনের হলেও প্রতিটি ফলকের ভাষা ও লেখনপদ্ধতি এক ছিল না।

রাস শামরার নতুন ফলকগুলো পরীক্ষা করতে গিয়ে গবেষকেরা অদ্ভুত একটি বিষয় লক্ষ করলেন। এগুলোর চিহ্ন দেখতে কিউনিফর্ম হলেও পরিচিত আক্কাদীয় লিপির তুলনায় চিহ্নের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম। ধীরে ধীরে দেখা গেল, এই লেখনপদ্ধতিতে মূলত মাত্র ত্রিশটি চিহ্ন ব্যবহৃত হয়েছে। এত অল্পসংখ্যক চিহ্ন দিয়ে মেসোপটেমীয় শব্দচিহ্ন ও শব্দাংশভিত্তিক জটিল লিপি লেখা সম্ভব ছিল না। ফলে গবেষকেরা অনুমান করলেন, তাঁদের সামনে যে লেখনপদ্ধতি রয়েছে, তা আসলে কিউনিফর্ম চিহ্নে লেখা এক ধরনের বর্ণমালা।

এই আবিষ্কার ছিল বিস্ময়কর। এখানে কাদামাটির ওপর কীলকাকার দাগ তৈরি করা হয়েছে মেসোপটেমীয় কৌশলে, কিন্তু সেই দাগগুলো শব্দ বা শব্দাংশের পরিবর্তে প্রধানত পৃথক ধ্বনি নির্দেশ করছে। অর্থাৎ উগারিতের লিপিকাররা একটি পুরোনো লেখনপ্রযুক্তিকে ব্যবহার করে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের বর্ণমালাভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। এই ত্রিশ-চিহ্নের লিপিকে আজ আমরা উগারিতীয় বর্ণমালা নামে জানি। পল ধোর্ম, হান্স বাউয়ার এবং শার্ল ভিরোলো প্রায় একই সময়ে পৃথকভাবে এর পাঠোদ্ধারে কাজ করেন। ভাষাটি হিব্রু ও ফিনিশীয়ের নিকটাত্মীয় উত্তর-পশ্চিম সেমিটিক ভাষা বলে চিহ্নিত হওয়ায় তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের সাহায্যে মাত্র এক বছরের মধ্যেই এর মৌলিক পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়।

ফলকগুলোর পাঠোদ্ধার শুরু হওয়ার পর রাস শামরার নীরব ধ্বংসাবশেষ যেন হঠাৎ কথা বলতে শুরু করল। রাজাদের নাম, কূটনৈতিক বার্তা, বাণিজ্যিক হিসাব, জমির দলিল, আইনি চুক্তি, চিকিৎসা ও জাদুবিষয়ক পাঠ, শিক্ষার্থীদের অনুশীলন—একটির পর একটি নথি অতীতের নগরজীবনকে সামনে আনতে লাগল। উগারিতের রাজারা মিশর, হিত্তীয় সাম্রাজ্য, আসিরিয়া, সাইপ্রাস এবং লেভান্তের অন্যান্য নগরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। ব্যবসায়ীরা তামা, কাঠ, তেল, মদ, বস্ত্র এবং বিলাসবহুল দ্রব্যের লেনদেন করতেন। রাজদরবারে আক্কাদীয় ভাষা আন্তর্জাতিক কূটনীতির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো, আবার স্থানীয় ধর্মীয় ও সাহিত্যিক রচনার জন্য উগারিতীয় ভাষা ব্যবহৃত হতো।

এই দ্বৈত ভাষাব্যবস্থা উগারিতের অবস্থানকে স্পষ্ট করে। নগরটি একদিকে স্থানীয় কনানীয়-সেমিটিক সংস্কৃতির অংশ, অন্যদিকে বৃহত্তর ব্রোঞ্জ যুগের আন্তর্জাতিক জগতের সক্রিয় সদস্য ছিল। সেখানে উগারিতীয় ও আক্কাদীয় ছাড়াও হুরীয়, সুমেরীয়, হিত্তীয় এবং সাইপ্রো-মিনোয়ান লিপি ও ভাষার নিদর্শন পাওয়া গেছে। অর্থাৎ এটি ছিল বহু ভাষা ও বহু সংস্কৃতির সংযোগস্থল—এমন একটি উপকূলীয় রাজ্য, যেখানে বণিক, কূটনীতিক, লিপিকার এবং দূতদের মাধ্যমে পূর্ব ভূমধ্যসাগরের নানা সভ্যতা পরস্পরের সংস্পর্শে আসত। উগারিতের বিভিন্ন বাড়ি ও প্রশাসনিক স্থাপনা থেকে আবিষ্কৃত হাজার হাজার ফলক এই নগরীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের এক অসাধারণ লিখিত ভান্ডার তৈরি করেছে।

কিন্তু ইতিহাসবিদ ও ধর্মতত্ত্ববিদদের কাছে সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল প্রশাসনিক দলিল নয়। ফলকগুলোর মধ্যে এমন কিছু দীর্ঘ কাব্যিক ও ধর্মীয় পাঠ পাওয়া গেল, যেখানে এক বিস্তৃত দেবসমাজের কথা বলা হয়েছে। সেখানে ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ দেবতা এল, দেবমাতা আথিরাত, ভয়ংকর যোদ্ধা দেবী আনাত, সমুদ্রের শক্তির প্রতীক ইয়াম, মৃত্যু ও অনুর্বরতার দেবতা মোট এবং তাঁদের মাঝখানে বজ্র, ঝড় ও বৃষ্টির অধিপতি বাল।

এই পাঠগুলোর আগে প্রাচীন কনানীয় ধর্ম সম্পর্কে গবেষকদের জ্ঞান ছিল খণ্ডিত। বাইবেলের বিভিন্ন অংশে বাল, আশেরাহ ও কনানীয় উপাসনার উল্লেখ থাকলেও সেগুলো প্রধানত ইসরায়েলীয় ধর্মীয় বিরোধিতার দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা। একজন প্রতিদ্বন্দ্বী ধর্মের সমালোচনা থেকে সেই ধর্মের নিজস্ব বিশ্বাস, কাব্য, আচার ও দেবতাতত্ত্ব সম্পূর্ণভাবে পুনর্গঠন করা সম্ভব নয়। গ্রিক ও রোমান যুগের লেখকদের কিছু বিবরণও ছিল, কিন্তু সেগুলো উগারিতের যুগের বহু শতাব্দী পরের এবং প্রায়ই পরিবর্তিত ধর্মীয় ঐতিহ্যকে প্রতিফলিত করত।

রাস শামরার ফলক সেই সীমাবদ্ধতাকে বদলে দিল। প্রথমবারের মতো গবেষকেরা কনানীয় সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের ভেতর থেকে রচিত দীর্ঘ ধর্মীয় কাব্য পড়তে পারলেন। এখানে বালকে তাঁর শত্রুদের ভাষায় নয়, তাঁর নিজস্ব উপাসকদের ভাষায় দেখা গেল। তিনি কেবল নিষিদ্ধ কোনো বিদেশি দেবতা নন; তিনি বৃষ্টির বাহক, মেঘের আরোহী, উর্বরতার রক্ষক এবং দেবতাদের মধ্যে রাজকীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী এক শক্তিশালী চরিত্র।

এই কাব্যিক ফলকগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে আধুনিক গবেষকেরা সম্মিলিতভাবে বাল সাইকেল নামে অভিহিত করেন। “সাইকেল” শব্দটি প্রাচীন ফলকের নিজস্ব শিরোনাম নয়; এটি আধুনিক গবেষকদের দেওয়া নাম। কারণ বর্তমানে যেসব ফলক পাওয়া গেছে, সেগুলো একটি বৃহত্তর ধারাবাহিক কাহিনির পরস্পরসংযুক্ত অংশ। কোথাও বাল সমুদ্রদেবতা ইয়ামের বিরুদ্ধে লড়ছেন, কোথাও তিনি নিজের প্রাসাদ নির্মাণের অনুমতি চাইছেন, আবার কোথাও মৃত্যুর দেবতা মোটের মুখোমুখি হচ্ছেন। কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছে ক্ষমতা, প্রকৃতি, মৃত্যু, বৃষ্টি, উর্বরতা এবং মহাজাগতিক শৃঙ্খলার পারস্পরিক সম্পর্ক।

বাল সাইকেলের প্রধান ফলকগুলোর সঙ্গে ইলিমিলকু নামে এক লিপিকারের নাম যুক্ত রয়েছে। তিনি নিজেকে উগারিতের রাজা নিকমাদ্দুর আমলের একজন লিপিকার ও ধর্মীয় কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তবে তিনি কাহিনিগুলোর মূল রচয়িতা ছিলেন কি না, নাকি আরও পুরোনো মৌখিক বা লিখিত ঐতিহ্য নকল ও সংকলন করেছিলেন—এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। প্রাচীন নিকটপ্রাচ্যের বহু সাহিত্যকর্মের মতো এসব রচনারও সম্ভবত দীর্ঘ মৌখিক ও পাঠগত ইতিহাস ছিল। বর্তমানে আমাদের হাতে থাকা ফলকগুলো সেই ইতিহাসের একটি বিশেষ পর্যায়ের সাক্ষ্য মাত্র।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা প্রয়োজন। উগারিত থেকে পাওয়া ধর্মীয় কাব্যকে পুরো কনানীয় জগতের অভিন্ন ধর্মগ্রন্থ মনে করা ঠিক হবে না। উগারিত ছিল উত্তর লেভান্তের একটি নির্দিষ্ট নগররাষ্ট্র, যার নিজস্ব রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য ছিল। দক্ষিণ কনান, ফিনিশিয়া বা পরবর্তী ইসরায়েলে একই নামের দেবতাদের উপাসনা করা হলেও তাঁদের চরিত্র, সম্পর্ক ও আচার সব জায়গায় হুবহু এক ছিল না। তবু ভাষা, দেবতার নাম এবং ধর্মীয় প্রতীকের ঘনিষ্ঠতার কারণে উগারিতীয় পাঠগুলো বৃহত্তর কনানীয় ধর্ম বোঝার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক উৎসগুলোর একটি।

উগারিতের আবিষ্কার বাইবেল গবেষণায়ও গভীর প্রভাব ফেলে। উগারিতীয় ও বাইবেলীয় হিব্রু ভাষার মধ্যে বহু শব্দ, কাব্যিক বাক্যগঠন এবং রূপকের সাদৃশ্য পাওয়া যায়। মেঘের ওপর আরোহন, সমুদ্রের শক্তিকে দমন, পর্বতে দেবীয় আবাস এবং ঝড়ের মাধ্যমে রাজকীয় ক্ষমতার প্রকাশ—এসব মোটিফ উভয় সাহিত্যিক পরিমণ্ডলেই বিভিন্ন রূপে উপস্থিত। কিন্তু সাদৃশ্য মানেই সরাসরি অনুলিপি নয়। উভয় ঐতিহ্যই বৃহত্তর পশ্চিম সেমিটিক ভাষা ও সংস্কৃতির অংশ ছিল; ফলে তারা অনেক পুরোনো যৌথ কাব্যিক ভাষা ও ধর্মীয় প্রতীক উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিল। উগারিতীয় ফলকের গুরুত্ব এখানেই—এগুলো বাইবেলের উৎসকে সহজ কোনো একরৈখিক ধারায় ব্যাখ্যা করে না, বরং সেই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক জগৎকে দৃশ্যমান করে, যার মধ্যে প্রাচীন ইসরায়েলীয় ধর্মও বিকশিত হয়েছিল।

রাস শামরার খনন থেকে শুধু লেখা নয়, ধর্মীয় স্থাপত্যও প্রকাশিত হয়। নগরীর উঁচু অংশে দুটি প্রধান মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ চিহ্নিত করা হয়, যেগুলো সাধারণভাবে বাল ও দাগানের মন্দির হিসেবে পরিচিত। মন্দিরসংলগ্ন এলাকায় ধর্মীয় সামগ্রী, উৎসর্গীকৃত বস্তু এবং লিপিকারের ব্যবহৃত পাঠ পাওয়া গেছে। বিখ্যাত বজ্রধারী বালের পাথরের স্তম্ভচিত্রও উগারিত থেকে আবিষ্কৃত হয়। সেখানে দেবতাকে এক হাতে অস্ত্র উঁচিয়ে এবং অন্য হাতে বজ্র বা উদ্ভিদের প্রতীকযুক্ত দণ্ড ধারণ করতে দেখা যায়। তাঁর পায়ের নিচের ঢেউখেলানো রেখা পর্বত বা সমুদ্রের ইঙ্গিত বহন করতে পারে। এই চিত্রে বাল একই সঙ্গে ঝড়ের আক্রমণাত্মক শক্তি এবং বৃষ্টির জীবনদায়ী ক্ষমতার প্রতীক। লুভর জাদুঘরের ব্যাখ্যাতেও তাঁর অস্ত্রকে বজ্র ও বৃষ্টির শক্তির সঙ্গে এবং দণ্ডে উদ্গত পাতাকে উদ্ভিদজগতের উর্বরতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

খনন যত এগোতে লাগল, উগারিতের ইতিহাসের শেষ অধ্যায়ও তত স্পষ্ট হতে শুরু করল। খ্রিষ্টপূর্ব ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষদিকে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় বিশ্ব গভীর সংকটে পড়ে। বহু রাজ্য, বন্দর ও নগর ধ্বংস হয়; বাণিজ্যপথ ভেঙে পড়ে; খাদ্যাভাব, রাজনৈতিক সংঘর্ষ এবং জনবসতির স্থানান্তর ঘটে। এই বৃহত্তর পরিবর্তনকে আধুনিক গবেষণায় সাধারণত শেষ ব্রোঞ্জ যুগের পতন বা Late Bronze Age collapse বলা হয়।

উগারিতের শেষ দিকের কিছু চিঠিতে সেই বিপদের প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়। খাদ্যসংকট, শত্রু জাহাজ এবং সামরিক সহায়তার প্রয়োজনের কথা সেখানে উঠে এসেছে। রাজা আম্মুরাপির সময়ে পরিস্থিতি ক্রমে গুরুতর হয়ে ওঠে। আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ থেকে ১১৮৫ সালের মধ্যে নগরীটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং পূর্বের রাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে আর কখনো পুনর্গঠিত হয়নি। আগুনে পোড়া বহু মাটির ফলক অনিচ্ছাকৃতভাবে শক্ত হয়ে সংরক্ষিত হয়ে যায়। যে বিপর্যয় উগারিতের জীবন্ত সভ্যতার অবসান ঘটিয়েছিল, সেই আগুনই তার লিখিত স্মৃতির একটি অংশকে তিন হাজার বছরেরও বেশি সময় টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে।

তারপর শতাব্দী পেরিয়ে যায়। নগরীর দেয়াল ভেঙে পড়ে, কক্ষগুলো মাটি ও ধ্বংসাবশেষে পূর্ণ হয়, নামটি স্থানীয় স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়। ভূমধ্যসাগরের বাতাস সেই একই উপকূলে বইতে থাকে, কিন্তু কেউ আর জানত না যে রাস শামরার ঢিবির নিচে একসময় রাজা, পুরোহিত, ব্যবসায়ী ও লিপিকারের ব্যস্ত নগরী ছিল। উগারিত ইতিহাসে পরিচিত ছিল, অথচ মানচিত্রে তার অবস্থান হারিয়ে গিয়েছিল।

১৯২৮ সালের সেই আকস্মিক আঘাত এবং ১৯২৯ সালের খনন এই দীর্ঘ নীরবতার অবসান ঘটায়। রাস শামরা আবার উগারিত হয়ে ওঠে। মাটির ফলকগুলো শুধু একটি হারিয়ে যাওয়া নগরীর নাম ফিরিয়ে দেয়নি; এগুলো প্রাচীন লেভান্তের ধর্ম, ভাষা, সাহিত্য, রাজনীতি ও দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে আমাদের ধারণাই পাল্টে দিয়েছে। সেই আবিষ্কার থেকে একটি নতুন গবেষণাক্ষেত্রের জন্ম হয়েছে—উগারিতবিদ্যা বা Ugaritic Studies। আজও নতুন ফলক, নতুন পাঠ এবং পুরোনো আবিষ্কারের পুনর্বিশ্লেষণ উগারিত সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানকে প্রসারিত করছে।

তবে উগারিতের পুনরাবিষ্কার আমাদের সামনে আরেকটি জটিল প্রশ্নও তুলে ধরে। যেসব ফলকে বালের যুদ্ধ, মৃত্যু ও বিজয়ের কাহিনি লেখা ছিল, সেই কাহিনির অন্য চরিত্রেরা কারা? বাল কি দেবতাদের সর্বোচ্চ শাসক ছিলেন, নাকি তিনি আরও প্রাচীন কোনো কর্তৃত্বের অধীন ছিলেন? এল, আথিরাত, আনাত, ইয়াম ও মোটের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কী ছিল? এবং উগারিতের মানুষ দেবতাদের জগৎকে কীভাবে নিজেদের রাজদরবার, পরিবার ও প্রকৃতির প্রতিচ্ছবি হিসেবে কল্পনা করেছিল?

বালকে তাঁর পূর্ণ ঐতিহাসিক রূপে বুঝতে হলে এখন আমাদের সেই দেবসমাজের ভেতরে প্রবেশ করতে হবে। কারণ কোনো দেবতা একা তাঁর পরিচয় নির্মাণ করেন না; তাঁর শক্তি, ভূমিকা ও সীমা নির্ধারিত হয় অন্য দেবতাদের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্য দিয়েই।

পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা পরিচিত হব উগারিতের সেই বিস্তৃত দেবপরিবারের সঙ্গে—যেখানে সর্বোচ্চ আসনে বসে আছেন প্রাচীন ও পিতৃতুল্য দেবতা এল, তাঁর পাশে আছেন দেবমাতা আথিরাত, আর তাঁদের প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার ভেতরেই ঝড়দেবতা বাল ধীরে ধীরে নিজের রাজকীয় কর্তৃত্ব দাবি করছেন।

অধ্যায় ৬ : দেবতাদের পরিবার — উগারিতের দেবসমাজে বাল হাদাদের অবস্থান

উগারিতের পুনরাবিষ্কারের পর যখন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা একের পর এক কিউনিফর্ম ফলকের পাঠোদ্ধার করতে শুরু করেন, তখন তাঁদের সামনে কেবল একটি প্রাচীন নগরীর ইতিহাসই উন্মোচিত হয়নি; ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়েছিল সম্পূর্ণ এক দেবজগত। সেই জগতের দেবতারা বিচ্ছিন্ন কোনো অতিপ্রাকৃত সত্তা ছিলেন না। তাঁরা একটি পরিবার, একটি রাজনৈতিক সমাজ এবং একই সঙ্গে একটি মহাজাগতিক ব্যবস্থার অংশ। তাঁদের সম্পর্ক, দ্বন্দ্ব, উত্তরাধিকার ও ক্ষমতার কাঠামো অনেকটাই মানুষের সমাজের প্রতিফলন।

এই কারণেই উগারিতীয় ধর্মকে বুঝতে হলে প্রথমেই একটি বিষয় মনে রাখতে হবে—বাল হাদাদ এই দেবসমাজের সর্বোচ্চ দেবতা হিসেবে আবির্ভূত হননি। পরবর্তী কাহিনিতে তাঁর শক্তি ও মর্যাদা যতই বৃদ্ধি পাক না কেন, দেবতাদের জগতে তাঁর অবস্থান প্রথম থেকেই নির্ধারিত ছিল অন্য দেবতাদের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে। সেই সম্পর্কগুলো না বুঝলে বাল সাইকেলের ঘটনাগুলোও সম্পূর্ণরূপে বোঝা সম্ভব নয়।
উগারিতীয় ধর্মের সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন এল (El)। পশ্চিম সেমিটিক ভাষাগুলিতে El শব্দটির সাধারণ অর্থই হলো "দেবতা"। কিন্তু উগারিতীয় ধর্মীয় সাহিত্যে এটি কেবল একটি সাধারণ শব্দ নয়; এটি একটি নির্দিষ্ট দেবতার নাম। তিনি দেবতাদের পিতা, বহু দেবতার জন্মদাতা এবং দেবসমাজের প্রবীণ অভিভাবক।

উগারিতীয় কাব্যে এলকে প্রায়ই শান্ত, ধীরস্থির ও প্রজ্ঞাবান এক বৃদ্ধ শাসক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি সাধারণত যুদ্ধের নায়ক নন, বজ্র হাতে যুদ্ধক্ষেত্রে ছুটে বেড়ান না, কিংবা প্রতিনিয়ত শত্রু দমন করেন না। বরং তিনি বিচার করেন, সিদ্ধান্ত দেন এবং দেবতাদের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেন। তাঁর আবাসকে কখনো "দুই নদীর উৎসে" বা "সমুদ্রের উৎসের কাছে" অবস্থিত এক দূরবর্তী পবিত্র পর্বত বা অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এই চিত্রায়ণ তাঁকে প্রকৃতির দৈনন্দিন সংঘর্ষের ঊর্ধ্বে অবস্থানকারী এক প্রাচীন পিতৃপুরুষ হিসেবে তুলে ধরে।

এই বৈশিষ্ট্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বালের সঙ্গে এলের সম্পর্ক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নয়, বরং উত্তরাধিকার ও বৈধতার। বালকে পরবর্তীকালে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হলেও সেই কর্তৃত্বকে এলের অনুমোদনের মধ্য দিয়েই বৈধতা অর্জন করতে হয়।

এলের পাশে আছেন আথিরাত (Athirat), যাঁকে বাইবেলে অধিক পরিচিত নাম আশেরাহ (Asherah) হিসেবে পাওয়া যায়। উগারিতীয় কাব্যে তিনি দেবতাদের জননী, এলের সহধর্মিণী এবং দেবসমাজের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। বহু পাঠে তাঁকে "সমুদ্রের আথিরাত" (Athirat of the Sea) নামে উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও এর প্রকৃত অর্থ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ এটিকে তাঁর আবাসস্থলের ইঙ্গিত মনে করেন, আবার কেউ এটিকে প্রাচীন ধর্মীয় উপাধি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

আথিরাতের ভূমিকা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তিনি সরাসরি যুদ্ধ করেন না, কিন্তু দেবতাদের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা, মধ্যস্থতা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো দেবতা যদি এলের কাছে নিজের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাহলে আথিরাতের সমর্থন লাভ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এতে বোঝা যায়, উগারিতীয় দেবসমাজে নারীর ভূমিকাও কেবল গৃহস্থালির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; দেবীয় রাজনীতিতেও তাঁর প্রভাব ছিল গভীর।

এরপরই আমাদের সামনে আবির্ভূত হন এই ধারাবাহিকের কেন্দ্রীয় চরিত্র—বাল হাদাদ।

তিনি ঝড়, বজ্র, মেঘ, বৃষ্টি এবং উর্বরতার দেবতা। কিন্তু তাঁর পরিচয় কেবল প্রকৃতির শক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি এমন এক দেবতা, যিনি ক্রমাগত নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছেন। তিনি যুদ্ধ করেন, বিজয় অর্জন করেন, প্রাসাদ নির্মাণ করেন এবং দেবসমাজে নিজের রাজনৈতিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন। এই দিক থেকে বাল উগারিতীয় ধর্মের সবচেয়ে গতিশীল চরিত্র।

তাঁর একটি বহুল ব্যবহৃত উপাধি হলো "মেঘের আরোহী" (Rider on the Clouds)। এই উপাধি শুধু কাব্যিক অলংকার নয়; এটি ঝড়ের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ এবং আকাশপথে তাঁর দেবীয় কর্তৃত্বের প্রতীক। বজ্রপাত তাঁর অস্ত্র, মেঘ তাঁর রথ, আর বৃষ্টি তাঁর আশীর্বাদ। কৃষিনির্ভর উগারিতীয় সমাজে এই শক্তিই জীবন ও মৃত্যুর পার্থক্য নির্ধারণ করত।

তবে বাল একা নন। তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের একজন হলেন আনাত (Anat)। তিনি উগারিতীয় ধর্মের অন্যতম জটিল ও আকর্ষণীয় দেবী। একদিকে তাঁকে তরুণী দেবী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, অন্যদিকে তিনি ভয়ংকর যোদ্ধা। যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর নির্মমতার বর্ণনা প্রাচীন নিকটপ্রাচ্যের সাহিত্যে সবচেয়ে শক্তিশালী চিত্রগুলোর একটি। শত্রুদের বিরুদ্ধে তাঁর ক্রোধ, রক্তাক্ত যুদ্ধ এবং বালের প্রতি তাঁর আনুগত্য তাঁকে দেবসমাজে একটি অনন্য স্থান দিয়েছে।

আনাতকে কখনো বালের বোন, কখনো তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচরী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁদের সম্পর্কের প্রকৃতি নিয়ে আধুনিক গবেষকদের মধ্যে একমত অবস্থান নেই। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—বালের সংকটের সময় আনাতই তাঁর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সহযোগী।
দেবসমাজে আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হলেন কোথার-ওয়া-খাসিস (Kothar-wa-Khasis)। তিনি কারিগর, স্থপতি ও প্রযুক্তির দেবতা। দেবতাদের অস্ত্র, প্রাসাদ এবং নানা অলৌকিক বস্তু নির্মাণের দায়িত্ব তাঁর। গ্রিক পুরাণে যেমন হেফাইস্টাস দেবতাদের কারিগর, উগারিতীয় ধর্মে কোথারের ভূমিকা অনেকটা তেমনই।

বালের বজ্রাস্ত্র নির্মাণ, তাঁর রাজপ্রাসাদের নকশা এবং দেবীয় প্রযুক্তির প্রয়োগ—সব ক্ষেত্রেই কোথারের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তিনি কেবল একজন কারিগর নন; তিনি দেবীয় সভ্যতার নির্মাতা।

উগারিতীয় দেবসমাজে শাপাশ (Shapash)-এর ভূমিকাও অসাধারণ। তিনি সূর্যদেবী। লক্ষণীয় বিষয় হলো, যেখানে বহু প্রাচীন সভ্যতায় সূর্য পুরুষদেবতা, সেখানে উগারিতে সূর্য একজন দেবী। তিনি দেবতা, মানুষ এবং পাতাল—এই তিন জগতের মধ্যকার সংযোগ রক্ষা করেন। তাঁর নিরপেক্ষ অবস্থান তাঁকে বহু কাহিনিতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা দিয়েছে।

কিন্তু কোনো সমাজে যেমন কেবল বন্ধু বা সহযোগী থাকে না, তেমনি উগারিতীয় দেবসমাজেও এমন শক্তি ছিল, যারা বালের ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।

প্রথমজন ইয়াম (Yam)।
পশ্চিম সেমিটিক ভাষায় Yam শব্দের অর্থই "সমুদ্র"। কিন্তু উগারিতীয় ধর্মে ইয়াম শুধু জলরাশির দেবতা নন; তিনি বিশৃঙ্খল, অনিয়ন্ত্রিত এবং ভয়ংকর প্রাকৃতিক শক্তির প্রতীক। দেবসমাজে তাঁরও ক্ষমতার দাবি রয়েছে। ফলে বালের সঙ্গে তাঁর সংঘর্ষ কেবল দুই দেবতার ব্যক্তিগত বিরোধ নয়; এটি প্রকৃতির দুই ভিন্ন শক্তির মধ্যে আধিপত্যের সংগ্রাম।

অন্যদিকে রয়েছেন মোট (Mot)।
মোট হলেন মৃত্যু, খরা এবং অনুর্বরতার দেবতা। তাঁর রাজ্য পাতাল, তাঁর উপস্থিতি মানেই জীবনের অবসান। কৃষিনির্ভর সমাজে দীর্ঘ খরা যেমন মৃত্যুর সমার্থক, তেমনি মোটও প্রকৃতির সেই ভয়ংকর রূপের প্রতীক, যা জীবনচক্রকে থামিয়ে দিতে পারে।
বালের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা শেষ পর্যন্ত ইয়ামের সঙ্গে নয়, মোটের সঙ্গেই হবে।

এই দেবতাদের প্রত্যেকেই প্রকৃতির একটি শক্তিকে প্রতিনিধিত্ব করেন। কিন্তু তাঁদের কাহিনি কেবল প্রকৃতির রূপক নয়। উগারিতীয় সমাজ তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, রাজতন্ত্র, পারিবারিক সম্পর্ক এবং কূটনৈতিক বাস্তবতাকেও দেবতাদের জগতে প্রতিফলিত করেছিল। ফলে দেবতাদের সভা অনেকটাই রাজদরবারের মতো, দেবতাদের বিরোধ অনেকটাই রাজনীতির মতো, আর দেবতাদের জোট ও সমঝোতা অনেকটাই মানবসমাজের প্রতিচ্ছবি।

এই কারণেই আধুনিক গবেষকেরা উগারিতীয় ধর্মকে শুধুমাত্র পুরাণ হিসেবে দেখেন না; তাঁরা এটিকে একটি সমাজের আত্মপরিচয়, রাজনৈতিক চিন্তা এবং প্রকৃতি-অনুধাবনের সাহিত্যিক প্রকাশ হিসেবেও বিবেচনা করেন।

বাল হাদাদের অবস্থান এখন আমাদের কাছে অনেকটাই স্পষ্ট। তিনি দেবতাদের জগতের সর্বোচ্চ প্রবীণ নন, কিন্তু সবচেয়ে সক্রিয় শক্তি। তিনি সৃষ্টিকর্তা নন, কিন্তু রক্ষক। তিনি বিচারক নন, কিন্তু সংগ্রামী। আর সেই সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তিনি নিজের রাজকীয় মর্যাদা অর্জন করবেন।

কিন্তু সেই পথ মোটেও সহজ ছিল না।
দেবসমাজে ইতিমধ্যেই আরেক শক্তিশালী দাবিদার নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে—তিনি সমুদ্রের দেবতা ইয়াম। দেবতাদের সভায় তাঁর দাবির ফলে এমন এক সংঘাতের সূচনা হয়, যা শুধু দেবতাদের ভাগ্যই নয়, সমগ্র বিশ্বের শৃঙ্খলাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
সেই সংঘর্ষের কাহিনিই উগারিতীয় সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা—বাল সাইকেল।

পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা প্রবেশ করব সেই মহাকাব্যের প্রথম পর্বে, যেখানে ঝড়ের দেবতা বাল প্রথমবারের মতো সমুদ্রের দেবতা ইয়ামের বিরুদ্ধে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য অস্ত্র ধারণ করেন।

চিত্র ৪: উগারিতের প্রধান দেবতাদের পারস্পরিক সম্পর্কের একটি সরলীকৃত চিত্র।

পর্ব ২ এর প্রধান একাডেমিক উৎস:

1. Watson and Wyatt — Handbook of Ugaritic Studies
2. Yon — The City of Ugarit at Tell Ras Shamra
3. Sauvage and Lorre — À la découverte du royaume d’Ougarit
4. Smith — The Ugaritic Baal Cycle, Volume I
5. Smith and Pitard — The Ugaritic Baal Cycle, Volume II
6. Pardee — Ritual and Cult at Ugarit
7. Wyatt — Religious Texts from Ugarit
8. del Olmo Lete — Canaanite Religion According to the Liturgical Texts of Ugarit
9. van der Toorn, Becking and van der Horst — Dictionary of Deities and Demons in the Bible
10. Huehnergard — An Introduction to Ugaritic

মন্তব্য ৪ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (৪) মন্তব্য লিখুন

১| ২১ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০

রাজীব নুর বলেছেন: উগারিত দেবসমাজ আজ আর নেই।
এখন আমরা অনেক কাঠকখড় পুড়িয়ে আধুনিক সমাজে এসেছি।

২| ২১ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৭

নাহল তরকারি বলেছেন: আপনার এই ধারাবাহিকটি আমার কাছে শুধু একটি পুরাণভিত্তিক লেখা নয়, বরং ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, ভাষাবিজ্ঞান ও ধর্মতত্ত্বের সমন্বিত গবেষণার মতো মনে হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে প্রাচীন সভ্যতা সম্পর্কে জানতে আমার খুবই ভালো লাগে। বিশেষ করে কোনো হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার ভাষা, বর্ণমালা, রাজনীতি, বাণিজ্য, সাহিত্য ও ধর্ম সম্পর্কে নতুন তথ্য জানতে আমি সবসময় আগ্রহী। তাই উগারিতের পুনরাবিষ্কার, কিউনিফর্ম ফলকের পাঠোদ্ধার এবং উগারিতীয় বর্ণমালার বিকাশের অংশগুলো আমার কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় লেগেছে।

তবে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ জাগিয়েছে উগারিতের দেবসমাজের বিশ্লেষণ। এল, আথিরাত, বাল, আনাত, ইয়াম ও মোট—এই দেবতাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে যেভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করেছেন, তা বিষয়টিকে শুধু ধর্মীয় কাহিনি হিসেবে নয়, বরং একটি সভ্যতার মানসিকতা ও বিশ্বদৃষ্টির প্রতিফলন হিসেবে বুঝতে সাহায্য করে। ইতিহাসভিত্তিক এমন তথ্যসমৃদ্ধ ও সূত্রনির্ভর লেখা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।

৩| ২১ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫০

নাহল তরকারি বলেছেন: দেব দেবীদের যারা পূজা করে তাদের মধ্যে কিছু কমন দেব দেবী আছে।
যেমন:
০১। দেবতাদের প্রধান ও তার স্ত্রী।
০২। প্রেম, বিয়ে সাদীর দেবী।
০৩। মৃত্যুর দেবতা।
০৪। সূর্য্য দেবতা।
০৫। চদ্র দেবতা।

৪| ২১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:১১

ইমরোজ৭৫ বলেছেন: সুন্দর।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.