নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমি টিকে থাকবো তদ্দিন, যদ্দিন আমি স্বাধীন।

স্বাধীন আকন্দ

https://

স্বাধীন আকন্দ › বিস্তারিত পোস্টঃ

প্রতিশোধ (সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার গল্প)

২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৩২


বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে।
কুকুর-বিড়াল বৃষ্টি। জানলা দিয়ে বাইরে অনেক দূর দেখা যায়। কিন্তু এখন কাছের নারিকেল গাছটাও দেখা যাচ্ছে না। এমন ঝুম বৃষ্টিতে সুমনের মন ভাল হয়ে যায়। বৃষ্টির ছটা গায়ে এসে লাগলে অদ্ভুত শিহরণ কাজ করে৷ খুব প্রিয় মানুষকে পাশে পেতে ইচ্ছে করে।

বর্ষার সাথে তার একটা আশৈশব সম্পর্ক আছে। সুমনের জন্ম হয়েছে এরকম ঝুম বৃষ্টির দিনে। তাই হয়তো বৃষ্টি তার এতো প্রিয়।
কিন্তু এখন সুমনের মন ভাল নেই। যত বৃষ্টির বেগ বাড়ছে, তত মেজাজ খারাপ হচ্ছে। যে মানুষটাকে সে মনে মনে প্রেমিকা হিসেবে কল্পনা করেছিল, সে কল দিয়েছিল। মালিহা৷ ঠিক প্রেমিকা নয়, তবে বন্ধুর থেকেও বেশি কিছু৷ তারা নিজেরাও জানে না, তাদের মধ্যে সম্পর্কটা আসলে কোন পর্যায়ের।
একদিন মালিহা ওকে বলল, “এই সুমন। তুই আমাকে প্রেমপত্র লিখবি। দীর্ঘ প্রেমপত্র। তারপর সেটা হলুদ খামে আমার কলাবাগানের বাসার ঠিকানায় পোস্ট করবি। ঠিক নব্বইয়ের দশকের মতো। পারবি না?”
সুমন চিঠি লেখে নি। মালিহাই লিখে পাঠিয়েছে। ডাকপিওন এসে ওদের বাসার ঠিকানায় চিঠি দিয়ে গেল। হলুদ খামে। বিশাল কলেবরে প্রেমপত্র। সুমন এমন আবেগতাড়িত হয়ে গিয়েছিল।
একবার ডিপার্টমেন্টের পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। মালিহা একটা কবিতার বই এনে ওর সামনে ধরলো। পূর্ণেন্দু পত্রীর লেখা “কথোপকথন”।
“ আমরা এখান থেকে একটা কবিতা আবৃত্তি করবো এই অনুষ্ঠানে। ঠিক আছে?” মালিহা আবদার করলো। ওর কথামত নব্বইয়ের দশকের পোশাকে দুজনে মঞ্চে উপবিষ্ট হয়ে কবিতা আবৃত্তি করলো। এই মালিহাকে সে কি কেবল বন্ধু হিসেবে দেখে? নাকি প্রেমিকা?

আবার কল আসছে। মালিহার ফোন থেকে। সে ফোন সাইলেন্ট রেখেছে৷ খুব ইচ্ছা হচ্ছে, এই প্রবল বৃষ্টির মধ্যেই বেরিয়ে পড়ে৷ কিন্তু সুমন জানে, সামান্য বৃষ্টিতে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। বৃষ্টির বেগ কমা পর্যন্ত অপেক্ষা করা প্রয়োজন। এরপর কলাবাগানে মালিহাদের বাসার সামনে সে যাবে।

মন খারাপের শুরুটা যেভাবে হলো। সুমন বসে ছিল তার রিডিং রুমের টেবিলের সামনে। এমন সময় কল আসলো ফোনে। ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে অতি অপ্রিয় কণ্ঠটি ভেসে এলো৷ "বন্ধু সুমন। হোয়াটসঅ্যাপ চেক করো। গুড নিউজ আছে। ভিডিওসহ।"
ওর ডিপার্টমেন্টের বন্ধু রবিন। ইতর-শ্রেণির ছেলে৷ ক্লাস চলাকালীন লাস্ট বেঞ্চে বসে প*ন দেখে। কখনোই ওর সাথে মেশে না। ফোন তো দূরের কথা৷ এমনকি ওর নাম্বারও সেইভ করা নেই।
"কিসের গুড নিউজ?" সে আস্তে করে জানতে চাইলো।
"মামা! তুমি নিজে চেক করো।" বলে সে বিভৎস হাসিটা দিলো।
সুমন কল কেটে দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকলো। তখন আকাশ মেঘলা। বাইরে হঠাৎ বাতাস থমকে গেছে। ঝড় হবার আগের অবস্থা। অল্প সময়ে মেঘ ঘনীভূত হয়েছে। সন্ধ্যার মতো আবছা অন্ধকার৷ এরকম মেঘে সাধারণত বৃষ্টি হয় কম, ঝড় হয়৷ এটা ঝড়ের পূর্বাভাস।
হোয়াটসঅ্যাপ খুলে সুমন ৪০ সেকেন্ডের ভিডিওটা দেখলো। এক মুহুর্ত থেমে গেল। হাত পা শীতল হওয়া শুরু করলো। আবহাওয়া গরম, কিন্তু সুমনের ঠান্ডা লাগছিল। ভয়ংকর খারাপ লাগা কাজ করছিল।
রবিনের কল এসেছে আবার৷ "মামা দেখছো ভিডিও। একদম টাটকা। আমার ফোনের ভিডিও মামা। তুমি মন খারাপ করো না৷ মালিহা তোমারই আছে এখনো।" বলে নোংরাভাবে হেসে উঠলো।
সুমন দ্রুত কেটে দিল কল।
ভিডিওটি দেখে তার স্বাভাবিক থাকার কথা না৷ প্যানিক এটাক হয়ে যেতে পারে৷ মালিহা আছে ভিডিওতে। আর একটি কুৎসিত হৃদয়ের ছেলে৷ ওদের ডিপার্টমেন্টেরই। সৈকত ভাই৷ দুই ব্যাচ সিনিয়র৷ পলিটিক্যাল। সরকারি দলের ছাত্রনেতা। হেন খারাপ কাজ নাই সে করে না। সেই ছেলের সাথে মালিহা! বাথরুমের চিপায় জড়িয়ে একজন আর একজনকে কিস করছে!
ঠিক তখনই ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো।
ঝড় হলো না।
এমনকি সামান্য বাতাসও। বাইরে কেবল বৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে। অবিশ্রান্ত। যেন আজ ঢাকা শহর ডুবে যাবে। আজ কেউ বেরুতে পারবে না। ঢাকা শহর ডুবে যাওয়া মানে কোমর সমান পানি। রাস্তা যেখানে সেখানে ভাঙা। অনেক ম্যানহোলের ঢাকনা থাকে না৷ পানির নিচে সেসব ম্যানহোলে পড়ে গেলে নির্ঘাত মৃত্যু।
এমন বর্ষায় বের হওয়া মানে অনিশ্চিত গন্তব্য। সুমনের মনে হচ্ছে আজ বৃষ্টি না থামুক৷ গোটা ঢাকা শহর ডুবে যাক। গুলিস্তানের ময়লার ভাগাড় থেকে নোংরা ছড়িয়ে পড়ুক সারা ঢাকা শহর।
সুমন বেরিয়ে পড়লো।
কোন ধরনের প্রস্তুতি ছাড়া৷ না কোন ছাতা নিলো। না কোন রেইনকোট। এই মুহুর্তে তাকে কলাবাগানে যেতে হবে৷ মালিহাদের বাসার সামনে।

এমন বর্ষনে গাড়ি চলে কম। রিকশা পাওয়াই যায় না। যদিও পাওয়া যায়, বৃষ্টিতে যাবে না। থামলে যাবে। রিকশাওলাও এমন ভাব নিয়ে থাকবে যেন আজ তার ছুটি। তার একটু বৃষ্টি যাপন করতে মন চাচ্ছে। বৃষ্টিবিলাসী রিকশাওয়ালা।
ধানমন্ডি রোডে এসেই সুমন একটি রিকশা পেয়ে গেল। যেতে রাজিও হলো। মাঝবয়সী রিকশাওলা। বৃষ্টিতে ভিজেই রিকশা চালাচ্ছে।
সুমন বলল, "শহীদুল্লাহ হলে যাও মামা।"
রিকশাওলা মাথা নেড়ে বলল, "আইচ্চা।"
রিকশা চলছে। সুমনের মাথায় কত কিছু ঘুরপাক করার কথা। কত বিচিত্র প্রশ্ন আসার কথা। কিন্তু সেসব আসছে না। মালিহার সাথে সৈকত ভাইয়ের মধ্যে কী ধরনের সম্পর্ক, কতদিনের? সুমনকে জানায় নি কেন? এসব কিছুই সে ভাবছে না। সে ভাবছে, শহীদুল্লাহ হলে যাবে। হলের ইউসুফ ভাইয়ের দোকানের সামনে বসে চা খাবে। বৃষ্টিতে ভিজেই খাবে। হলে ঝড় বৃষ্টির মধ্যেও দোকান খোলা থাকে।
মালিহাদের বাসায় সে যাবে না।

রিকশা যখন হলে পৌঁছলো, সুমন প্রায় ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। রিকশাওলাকে ভাড়া বাড়িয়ে দিল।
হাঁটতে হাঁটতে হলের পুকুরপাড়ে ইউসুফের দোকানের সামনে এলো। হালকা বৃষ্টি হচ্ছে। সুর্য যে ডুব গেছে একটু আগে তা জানান দিচ্ছে হলের লাইটগুলো। আকাশে মেঘ কেটে যাচ্ছে। অন্ধকার কমে আসার কথা, কিন্তু এখন তো সন্ধ্যা।
ইউসুফ ভাই দোকানের ভিতর বসা। সুমন সোজাসুজি ইউসুফের কাছে এগিয়ে গেল। এক প্যাকেট সিগারেট চাইলো। ইউসুফ ভাই ওকে চেনে। সিগারেট চাওয়ায় বেশ অবাক হল। সুমন সিগারেট খায় না।
"ভাইয়ের মন ভাল?"
সুমন হাসলো।
সিগারেট পকেটে ঢুকাতে ঢুকাতে ইউসুফ ভাইয়ের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে উলটো জিজ্ঞেস করল, "সৈকত ভাই কত নম্বর রুমে থাকে?"

শহীদুল্লাহ হলের পুকুরটা বিশাল৷ চারপাশে সারিবদ্ধ নারিকেল গাছ। পশ্চিমপাশে শহীদুল্লাহ হলের মূল ভবন, পূর্বপাশে ফজলুল হক মুসলিম হল। দুই হলের মাঝখানে অবস্থান করা সত্ত্বেও, এটি শহীদুল্লাহ হলের পুকুর নামেই পরিচিত। সুমন পুকুরের একটি নারিকেল গাছের নিচে এসে দাঁড়ালো৷ একটি সিগারেট ধরিয়ে ফুঁকতে লাগলো। বেনসন লাইট। একটু কাশি আসলো। তবু সে থামলো না। ধোঁয়াটা ভিতরে ঢুকলে আরামবোধ হয়৷ ভেজা শরীর কিছুটা শুকিয়ে এসেছে। এখন ঠান্ডা লাগছে। মনে হয় জ্বর আসবে। জ্বরের আগে এমন লাগে। সিগারেট টেনে কিছুটা উষ্ণতা অনুভব করছে সে।
সিগারেটের প্রতি কখনোই আগ্রহ তৈরি হয় নি। এখনো না। এর কারণ ওর বাবা। চিরকাল বাবাকে অনুসরণ করে এসেছে। বাবা যা করেছে, সে তার বিপরীতটা করেছে। সুমনের বাবা আনিসুজ্জামান একজন চেইন স্মোকার। বাড়িতে কি অফিসে। সিগারেট তার মুখে থাকেই। বাবার চেহারা কল্পনা করলে মুখে সিগারেট আছে, ধোঁয়া উড়ছে, এমন ছবি ভেসে ওঠে। ছোটবেলা থেকেই সুমন বাবাকে এমনটা দেখেছে। বাবার প্রতি প্রবল কৌতুহল থেকে সে আবিষ্কার করেছে, সে তার বাবাকে প্রচন্ড ঘৃণা করে।
আজ সে বাবার মতো সিগারেট ফুঁকছে। তখনই ফোনটা এলো।
"বাবা সুমন!" ওর ফুফু। ওদের বাসায় দীর্ঘদিন যাবৎ থাকে। আপন ফুফু। ডিভোর্সী৷ বাসার একমাত্র নারী সদস্য৷ সুমনের দেখাশোনা করে। ওর বাবা আর ও ছাড়া এই জগতে তার আপন কেউ নেই। এরকম নারী সাধারণত কাছের যাকে পায় তাকেই আকড়ে ধরে। আরো আপন করে নেয়। সে হিসেবে সুমনকে নিজের সন্তানের মতো ভালবাসার কথা। কিন্তু, সুমনকে সন্তান তো দূরের কথা, কাছের মানুষই মনে করে না। ভালবাসার ছিটেফোঁটা যদি থাকতো হৃদয়ে!
"ফুফু বলো।" সুমন উত্তর দিল।
"তুমি কই বাবা? হুট করে বৃষ্টির মধ্যে বের হইলা ক্যান?"
সুমন জানে, ফুফুর তার ব্যাপারে কোন আগ্রহ নেই। জাস্ট ফোন দিতে হয় তাই৷ সুমনের প্রতি তেমন ভালবাসাও নেই। থাকলে, বাসা থেকে বের হবার সময়ই থামাতো। উনি তখন সিরিয়াল দেখায় ব্যস্ত ছিলেন।
"আছি আশেপাশে৷ আসতে লেট হবে ফুফু।" সুমন নিষ্প্রাণ কন্ঠে উত্তর দিলো। তারপর কেটে দিলো।

মাগরিবের আজান শেষ হয়ে গেছে।
সুমন সিগারেটের শেষ অংশ পুকুরের দিকে ছুড়ে মারলো। নামাজ পড়তে হলের ছেলেরা মসজিদের দিকে যাচ্ছে। সুমন নামাজ পড়ে না। ধর্মের ব্যাপারে তেমন আগ্রহ নেই৷ অশ্রদ্ধাও নেই।
সে আসলে অপেক্ষা করছে।
সৈকত ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা।
সে জানে সন্ধ্যায় তিনি রুমে থাকবেন না। রাত দশটার পরে তাকে পাওয়া যাবে। একটা ভয়ংকর প্ল্যান তার মাথায় আছে। খুবই ভয়ংকর। বাসা থেকে বের হবার সময় ধারালো একটা চাকু নিয়েছে। রান্নাঘরে ছিল। এখন সেটা তার পেটের কাছে, শার্টের নিচে। তাড়াহুড়ো করা যাবে না। তাড়াহুড়ো করলে কোন পরিকল্পনাই কাজ করে না। পরি উড়ে যায়, শুধু কল্পনা থেকে যায়। কে বলেছিল এই কথা? সুমন আউট বইটইও পড়ে না তেমন। তারমানে কারও কাছে শুনেছে।
মাথা ঠান্ডা রেখে তাকে এখন অপেক্ষা করতে হবে। অপেক্ষা সুন্দর, যদি তা সুন্দর কিছুর জন্য হয়। সুমনের অপেক্ষা ভয়ংকর সুন্দর।

"আরে সুমন যে?"
সুমন ঘুরে তাকালো। বিস্ময় নিয়ে দেখলো, সৈকত ভাই দাঁড়িয়ে সামনে। সাথে আর একটি ছেলে। সৈকত ভাইয়ের বাড়ি বরিশাল। তার কথার টোনে এটা স্পষ্ট বোঝা যায়। ইদানিং হলগুলোতে ঐ এলাকাগুলোর ছেলেদের আধিপত্য বেশি। এটা সুমন জানে। ভাল করেই জানে। সৈকত ভাইও হলের কোন একটা পোস্টে আছে। তাকে জুনিয়র, সিনিয়র ছাত্র প্রায় সবাই চেনে।
বেশ লম্বা, ঝাঁকড়া চুল কাজী নজরুলের মতো। গালে মুখে কালো কালো দাগ, হয়তো বসন্ত বা কোন কিছুর হবে। এগুলো ওর চেহারাকে আরো কুৎসিত করে তুলেছে। এমন একটা ছেলের সাথে মালিহা কিভাবে?

সুমন সালাম দিল। সৈকত একটু এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো, "তুই ভিজা গেছোস ক্যান? কাঁপছিস যে?"
সুমন কিছু বলল না। ভদ্রতাসূচক সেও এগিয়ে এলে সৈকত ওর ঘাড়ে হাত রাখলো।
"কীরে জ্বর আসছে নাকি? চল রুমে চল।"
সুমন মাথা নেড়ে বলল, "না ঠিক আছি। আপনি কোথাও যাচ্ছেন?"
"না। আসলাম। মিটিং ছিল মধুর ক্যান্টিনে। তোরা আন্দোলন করতেছোস কোটার বিরুদ্ধে। সেইগুলা নিয়া। চল চা খাবি।"
"ভাই, আপনি যান। রাতে রুমে থাকবেন?"
"হ। আছি তো। তবে যা শুরু হইছে। মেয়েরা পর্যন্ত রাস্তায় নামছে। এগুলোরে থামানো দরকার। মালিহার কী খবর?"
সুমন চমকালো না। সে জানে, এটা জিজ্ঞেস করার জন্য জিজ্ঞেস করা। সৈকত আজ মালিহার সাথেই ছিল।
"জানি না।" বলে সে অন্যমনস্ক হল।
"এই ব্যাটা, আয়। আমার সাথে।" বলে সৈকত ভাই তাকে ডাকলো। সুমন এড়াতে পারলো না। সৈকতের পিছন পিছন হাঁটতে লাগলো। সৈকতের রুমের দিকে। যে রুমে গেলে হয়তো সে সুযোগ পাবে। তার ভয়ংকর পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হবে।

সৈকত ভাইকে সে এই পুকুরপাড়েই প্রথম দেখে। মালিহার সাথে কিছু নোটস ফটোকপি করতে এসেছিল। চা খেতে ইউসুফের দোকানের কাছে আসতে একটা জটলা দেখে সেদিন। কিছু হলের ছাত্র গোল করে ঘিরে আছে কিছু একটা। সে আর মালিহা এগিয়ে এসে দেখে, ইউসুফ ভাই মাটিতে শুয়ে আছে। লম্বা মতোন একটা ছেলে তাকে পা দিয়ে সমানে লাথি মারছে। এটাই সৈকত ভাই। ইউসুফের অপরাধ, সে তাকে সিগারেট না দিয়ে আর একজনকে চা দিয়েছিল। তাকে আগে কেন সিগারেট দিল না। এতো সাহস।
নিরীহ ইউসুফকে জড়সড় হয়ে মাটিতে শুয়ে কাঁদতে দেখেছে সেদিন। আর জন্তুর মতো লাথি দিয়ে যাচ্ছে সৈকত ভাই। এরপরে যতবার সৈকত ভাইকে দেখেছে, কোনবারই এই স্মৃতি মাথা থেকে নামাতে পারে নি।
মালিহা জিজ্ঞেস করলো, "তুই কি ভয় পাচ্ছিস নাকি?"
সুমনের হাতে নোটগুলো ছিল। সে আসলেই কাঁপছিল। তবে ভয়ে না। ঘৃণায়। সে সৈকতের এই আচরণে তার বাবার ছায়া দেখতে পেয়েছিল। ছোটবেলায়, সুমনকে তার বাবা প্রায়ই এভাবে মারতো। একটু ভুল করলেই মেঝেতে ফেলে দিত। কুৎসিতভাবে গালিগালাজ করতো। আর হাতে থাকতো সিগারেট। সোফায় বসে ফুফু টিভি দেখতো। এগিয়ে আসতো না কখনো।
"তুই অনেক ভীতু রে।" মালিহা বলেছিল। "তবে ছেলেটার পৌরষত্ব আছে বলতে হবে।" বলে হেসেছিল।

এই মালিহাই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল সৈকত ভাইয়ের সাথে। সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে তখন। বাসার পরিবেশ সুমনের ভাল ঠেকছিল না। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল হলে উঠে যাবে। মালিহাকে শেয়ার করতেই সে বলল, "আমার পরিচিত একজন পলিটিক্যাল ভাই আছে। চল পরিচয় করিয়ে দিই। আমাদের ডিপার্টমেন্টেরই।"
হলে উঠতে হলে পরিচিত পলিটিক্যাল বড় ভাই লাগে। সুমন সেটা জানতো। মালিহার সাথে এসে দেখা করতে এসে জানলো, সেদিনের সৈকত ভাই ওর পরিচিত। এক মুহুর্তে সেদিনের ইউসুফকে মারার দৃশ্যটি সামনে ভেসে উঠেছিল। আর প্রচন্ড ঘৃণা৷ প্রায় আধা ঘন্টা কথা বলে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল হলে সে উঠবে না।
"তুই কিভাবে উনাকে চিনিস?" সুমন জানতে চেয়েছিল।
মালিহা তড়িৎগতিতে উত্তর দিয়েছিল, "আরে, ভাইয়া তো আমাদের এলাকার। ভার্সিটিতে আমাদের এলাকার সমিতিতে উনি আসেন।"

এই সেই মালিহা। যাকে সে কল্পনা করে অন্যরূপে। হয়তো ভালোবাসার মানুষ হিসেবে। তবে সে নিশ্চিত না। সুমনের জীবনে একমাত্র এতো ঘনিষ্ঠ নারী মালিহা। রূপবতী। যেকোনো ছেলে আকৃষ্ট হবে। অন্য মেয়েদের মতো হিজাব পরে না। আধুনিক পোশাক পরে। দেখতে ভারতীয় নায়িকাদের মতো লাগে। সুমনের সাথে ঘনিষ্ঠতা ফার্স্ট ইয়ার থেকে। সুমন তখন ফিজিক্যালি এট্রাক্টেড ফিল করে নি। ধীরে ধীরে হয়েছে। একবেঞ্চে ক্লাস রুমে বসা থেকে রিডিং রুমে পড়তে যাওয়া। মালিহা আর সে।

সৈকত ভাইয়ের রুমে পৌঁছানোর আগে আগে বাবার কল এলো।
সে রিসিভ করলো।
"তুমি নাকি বাইরে? বাসায় ফিরবে কখন?" প্রায় চিৎকার করে জানতে চাইলো সুমনের বাবা। এই টোন তার কাছে অস্বাভাবিক না। ওর বাবা এভাবেই ওর সাথে কথা বলে।
"আমার ফিরতে দেরি হবে।" বলে সে ফোন কেটে দিল।
সুমন অনেকদিন জানত না তার বাবার এই আচরণের কারণ। বাবার কাছে কোনদিন শোনে নি। শুনেছে ফুফুর কাছে। তিনি অতি জঘন্যভাবে বর্ননা করেছে।
“তোমার মা তো তোমারে রেখেই ভাগছে। তখন তোমার বয়স এক বছর। কেমন করে পারলো সে? এতো খারাপ মহিলা জীবনে দেখি নাই। বিয়ার আগে থিকাই সম্পর্ক ছিল। আমার ভাইডার লগে বিয়ে দিছে জোর কইরা। বিয়ের পরও যোগা্যোগ ছিল। একদিন সেই নাঙ, আমেরিকা থেকে আইসা তোমার মায়রে নিয়া গেল। ছি ছি ছি! এতোটুকুন বাচ্চা রাইখা ক্যামনে পারলো?”
এই ঘটনার সত্যতা সে পেয়েছে। এই জন্য বুঝ হবার পর ফুফু ছাড়া অন্য নারীকে সে এ বাডিতে দেখে নি। মায়ের আদর কী, সে জানে না। সম্ভবত এ কারণেই ওর বাবা ওর প্রতি এমন ব্যবহার করে।

সুমন ঢুকলো সৈকতের রুমে। সৈকতের সাথের ছেলেটি চলে গেছে। এখন রুমে ও আর সৈকত৷
সুমন পাশের বিছানায় বসে পড়লো। ও ভিতর থেকে হঠাৎ খুব সাহস অনুভব করছে। নৃশংস কিছু করার আগে বোধহয় সব মানুষের মধ্যে এটা আসে। সে সিগারেটের প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরালো। এখন সে কাশছে না। একদিনে সে অভ্যস্ত হয়ে গেল?
"কিরে ব্যাটা, সিগারেট খাস তুই?" সৈকত জামা পাল্টাতে পাল্টাতে জিজ্ঞেস করলো।
সুমন উত্তর দিচ্ছে না। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। সে ভাবছে না৷ কেননা, সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে৷ সিদ্ধান্ত পৌঁছালে মাথাটা বেশ খালি লাগে। হালকা লাগে।
"তুই কি কোটা আন্দোলনের লোক নাকি আবার?" সৈকত জানতে চাইলো।
"জানি না।" কোটা নিয়ে সুমনের মাথাব্যথা নেই। সে নিজে ডিপার্টমেন্টে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। টিচার না হলেও দেশের বাইরে ইজিলি চলে যেতে পারবে। দেশেও ভাল চাকরি পেতে তার বেগ পেতে হবে না। তাই সরকারি চাকুরিতে কোটা থাকলেই কি না থাকলেই কি। ওর কিছু যায় আসে না। ওর মাথায় কেবল মালিহা। আর ঐ ভিডিও৷ যেটা আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। তার পরিণতি সে দেখতে চায়।
সৈকত বিছানায় হেলান দিয়ে বলতে লাগলো, "বুঝলি। সাধারন ছাত্র ছাত্রী হলো শেয়ালের দল। এক শেয়াল হুক্কা হুয়া দেয়৷ বাকি সবাই কেয়া হুয়া করে চিল্লায়। আমরা এতো বুঝাইলাম, আমাদের নেত্রী কোটার বিপক্ষে, আন্দোলনকারীরা মানবেই না। এইটারে সরকারবিরোধী বানানোর চেষ্টা চলতেছে। ভিতরের খবর তো আমরা জানি। "
সুমনের হাত থেকে একটি সিগারেট নিয়ে সৈকত ধরালো। সুমন কি সৈকতের কথা শুনছে?
"আইজ রাতে একটা ফয়সালা হবে রে সুমন। ছাত্রদের এই আন্দোলন নিয়া নির্দেশনা আসছে। চূড়ান্ত ফয়সালা।" বলে সে হাসতে লাগলো।
সুমন জানে না তা না। সেও খোঁজ রাখে। দেশের ভার্সিটিগুলোতে কয়েকদিন থেকে জোরালো আন্দোলন হচ্ছে। সরকারি চাকুরিতে কোটা আবার ফিরিয়ে আনা হবে। আদালত থেকে রিট করা হয়েছে। হলগুলো সরগরম। প্রায় সব ছাত্ররা একজোট হয়েছে এর বিরুদ্ধে। সৈকত ভাইরাও সাধারন ছাত্রদের উপর চড়াও হচ্ছে। দুপক্ষের ভালো একটা গ্যাঞ্জাম লাগবে। সৈকতের কথা থেকে বোঝা যাচ্ছে। আজ রাতেই কিছু একটা ঘটবে।
সে চিন্তা করেছে এটা। সেইজন্যেই আজ তার মোক্ষম সময়। কিছু একটা করে ফেললে, দোষ যাবে সাধারন ছাত্রদের উপর। সুমন সেটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। তার এখন খুব নির্ভার লাগছে।
"মালিহারে তুই চেনোস কয়দিন?" হঠাৎ মালিহা প্রসঙ্গে গেল সৈকত।
"ফার্স্ট ইয়ার থেকে।" সুমন বলল।
"ও তো একটা কনফিউসড মা*ল।" বলে সে থুথু ফেললো। "তুই তো বা*ডাও চেনোস না। তোরে ফার্স্ট ইয়ার থেকেই ইউজ করসে সে ব্যাটা। তুই কি ভাবছোস? সিচুয়েশনশিপ? হাহাহা। তোর নোটস পড়ে সে ডিপার্টমেন্টে সেকেন্ড। ভার্সিটির টিচার হতে চায়। তাই এখন আমার পিছে আসছে!" বলে সে আবার হেসে উঠলো।
"তোরে সে নার্ড, মেয়েলি পোলা বলে।" বলে সে আবার হেসে উঠলো। "শালার মাইয়া মানুষ আর মানুষ হইলো না৷ সব শালা স্বার্থপর।"
সুমন সৈকতের শেষের কথাগুলো শুনছিল। ভিতরে জ্বলে পুড়ে যাচ্ছিল। সিগারেটের মতো। মালিহাকে নিয়ে বলা কথাগুলো খুব মিথ্যা না। ডিপার্টমেন্টের অন্য বন্ধুরাও এরকম বলেছে। ওর নোটগুলোর জন্যই মালিহা ওর সাথে চলে। এখন সৈকতের কথার সাথে মিল পাচ্ছে। কিন্তু, সৈকত তো এখানে নির্দোষ না। সে সেজন্য তার কঠিন সিদ্ধান্ত থেকে এক চুল নড়বে না। সে অপেক্ষা করবে। যখন হলগুলো জেগে উঠবে মিছিলে। সরকারি দলের ছাত্ররা সাধারন ছাত্রদের উপর চড়াও হবে। তখনই কাজটা করে ফেলবে। এখন সুমনকে ধৈর্য ধরতে হবে।

সৈকতের সিগারেট ধরাটা অবিকল ওর বাবার মতো। তেমনটাই রূঢ়।
"বুঝলি ব্যাটা। পলিটিক্স করলে মোরালিটির ধার ধারতে হয় না। পলিটিক্স অইলো মৌচাক। মধু খাইতে হয় কেবল। এইটা প্রেমের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। প্রেমেও কোন মোরালিটি ফোরালিটির আনতে হয় না। সবই মধু। মধু হই হই আরে বিষ হাওয়াইলা..." বলে গান ধরলো সৈকত। লোকটি কি পাগল? হঠাৎ সুমনের এমন মনে হচ্ছে কেন? কোনভাবে পজিটিভ কিছু ভাবা যাবে না সৈকতকে নিয়ে। পাগলের প্রলাপ চলতে থাকুক।
"আইজ আমার পলিটিক্যাল লাইফের শেষ দিন সুমন। মধুর ক্যান্টিনে যে নির্দেশনা পাইছি, তারপরে আর পলিটিক্স কন্টিনিউ করা পসিবল না। আমরা কার বিরুদ্ধে লড়তেছি? সাধারন ছাত্ররা কী চায়? সরকারি চাকুরিতে সমান সুযোগ, এইতো? তাইলে সরকারের কী সমস্যা? মেধাবীরা আইবো দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদে। এইটা ভাল না? এইটা খারাপ? ন্যায় তাইলে কারে কয়? কিরে, কথা কস না ক্যান?"
সুমন একটু থতমত খেয়ে যায়। কিছু বলে না। সৈকত এখন আসলে পলিটিক্যালি কোন অবস্থানে আছে? সে বুঝতে পারছে না।
"আমার নিজের বড়ভাই সুইসাইড করছিল পাঁচ বছর আগে। কেবল একটা চাকরির জন্যে। যথেষ্ট মেধাবী ছিল। ভাইভা থেকে বাদ পড়ছে। এইটা সে নিতে পারে নাই। পরিবারের হাল ধরার জন্য নিজের জীবনটা দিয়া দিল। তখন আমি সিদ্ধান নিলাম পলিটিক্স করতে অইবো। কিন্তু তাতে লাভ কী? কোন লাভ নাই। দিনশেষে, আমারও তো একটা চাকরি চাই। তাইলে, ওদের আন্দোলন তো আমার জন্যেও! হুদাই ওদের কেন রাজাকারের বাচ্চা বলবো? আমিও তো কোটার বিলোপ চাই! আইজ রাইতে, পেটুয়া বাহিনী যদি একটা সাধারন ছাত্রের গায়ে হাত উডায়, আজ তার হাত আমি ভাংমু।"
বলে সৈকত পাশ ফেরে। ওপাশ হয়ে ঘুমের মতো শুয়ে থাকে।

সুমন অনেকক্ষন পর্যবেক্ষন করে। সৈকত নড়ছে না। ঘুমিয়ে পড়েছে। কতক্ষন হয়ে গেল? এক ঘন্টা? রাত কয়টা বাজে? এটাই কি সেই সময় না? পেটের কাছে জামার নিচে হাত রাখে। ধারালো চাকুটার উপর হাত বোলায়। সুমনের মনটা হঠাৎ প্রফুল্ল হয়ে ওঠে।

সুমন যখন হল থেকে বের হলো, আকাশে তখন অনেক তারা। চাঁদ নেই। ঢাকার আকাশে এতো তারা দেখা যায় না। তবে শহীদুল্লাহ হলের মাঠ থেকে পরিষ্কার আকাশ দেখা যায়। চারপাশটা ধুঁয়ে গেছে বৃষ্টিতে। এতো ভাল লাগছে। এমন মুহুর্তে কাউকে পাশে দরকার হয় না।
হাঁটতে তার ভাল লাগছে।
সে আজ বাসায় ফিরবে না।
সে দুর্বল কেউ না। মেয়েলিপনা তার দুর্বলতা না। আজ থেকে সে আন্দোলনে যোগ দিবে।
যে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিবে সৈকত ভাই।



মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.