নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

বাউন্ডুলে কবি

বাউন্ডুলে কবি › বিস্তারিত পোস্টঃ

বৃষ্টিকন্যা

২৫ শে জানুয়ারি, ২০১৩ দুপুর ১২:৪৫

প্লাবন তার রুমে শুয়ে আছে। বিছানাটা এলোমেলো, জানালার পর্দাটা টেনে দেওয়া, তাই রুমটা আবছা অন্ধকারে ঢাকা। তার মা দরজায় দাঁড়িয়ে বলছেন, “কি রে, ভার্সিটিতে যাবি না?” প্লাবন বালিশ থেকে মাথা না তুলেই বলল, “যাব, একটু পরে।” মা চলে গেলেন, অফিস আছে উনার। প্লাবনের বাবা তার অফিসে যাওয়ার আগে তাকে তার অফিসে নামিয়ে দিয়ে যাবেন। প্লাবনের আজ ঘুম ভাঙ্গার পর থেকেই কেমন যেন লাগছে, কিন্তু সে ঠিক ধরতে পারছে না কেমন লাগছে তার, আর কেনইবা এমন লাগছে। ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে সে উঠে পড়ল। নাস্তা খেয়ে বেরিয়ে গেলো।



বাসের জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর একটা বাস এলো, প্লাবন লাফিয়ে উঠে পড়লো বাসে। বাসে উঠার পর পরই শুরু হল মুশলধারে বৃষ্টি। প্লাবন কোনমতে জানালার পাশের একটা সিটে বসলো। বৃষ্টির সময় জানালার পাশের সিটে সাধারণত কেউ বসতে চায় না। কিন্তু প্লাবনের ব্যাপার আলাদা। চলন্ত বাসে জানালার পাশের সিটে বসে বৃষ্টির পানির হালকা ঝাপ্টায় ভিজতে তার খুবই ভাল লাগে। বাসে বসে সে বাইরের দিকে তাকালো, এত বৃষ্টি হচ্ছে যে বাহিরটা ঝাপসা হয়ে আছে। কোনকিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না, তাও সে তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে। তীব্র যানজট, গাড়ি সব থেমে আছে। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেলো রাস্তার ঐ পাশটায়। সে দেখলো, একটা মেয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে। দুই হাত দুই দিকে ছড়িয়ে সে ভিজছে, কোনদিকে কোন খেয়াল নেই। অবশ্য খেয়াল করার কোন দরকারও ছিল না, কারণ ঐ পাশের রাস্তা প্রায় ফাঁকাই ছিল। প্লাবনের কি যেন মনে হল; সে নেমে পড়ল বাস থেকে। রাস্তার ঐ পাশে গেলো, একটু দূর থেকে মুগ্ধ চোখে দেখতে লাগলো বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা মেয়েটিকে। প্লাবনের চারপাশ যেন কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেলো। সে শুধু দেখতে লাগলো অসম্ভব সুন্দর একটি মেয়েকে, যে সবকিছু উজার করে যেন বৃষ্টিতে ভিজছে। দেখতে দেখতে কখন যে সে মেয়েটির কাছে চলে গেলো, বলতে পারবে না। সংবিৎ ফিরে পেলো যখন মেয়েটি তাকে জিজ্ঞেস করল, “আপনিও কি আমার মতো বৃষ্টিপাগল নাকি?” প্লাবনের তখন ভেতরটা কাঁপছে। কেন কাঁপছে তা সে নিজেও জানে না। এমন তো নয় যে সে এর আগে কোন মেয়ের সাথে কথা বলে নি। এখন তার শেষ সেমিস্টার চলছে ভার্সিটিতে, কত মেয়ে বন্ধুই তো তার আছে। কই, তাদের সাথে কথা বলার সময় তো কখনও এমন হয় নি। তাহলে আজকে কেন এমন হচ্ছে? মেয়েটি আবারও জিজ্ঞেস করল তাকে, “এই যে, শুনছেন?” তখন প্লাবন বলল, “না, আমি আসলে বৃষ্টিপাগল না। কিন্তু আপনাকে দেখে বৃষ্টিতে ভেজার লোভ সামলাতে পারলাম না। আমি আসলে ঐ বাসে ছিলাম, ভার্সিটিতে যাচ্ছিলাম। আপনাকে ভিজতে দেখে নেমে এলাম ভিজতে।” মেয়েটা হেসে দিল, চমৎকার সে হাসি। প্লাবনের মনে হল যেন বৃষ্টির শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে নূপুর পড়ে কেউ নাচছে। প্লাবন বলল, “আমি প্লাবন, ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়াশুনা করছি, ফাইনাল ইয়ার। আপনি?” “মিথিলা, বিবিএ, সেকেন্ড ইয়ার। কিছুদিন পর ফাইনাল দিব।” কিছুক্ষণ পর বৃষ্টিটা একটু কমলো। প্লাবন আর মিথিলা হাটতে লাগলো পাশাপাশি। “এখন কোথায় যাবেন?” জিজ্ঞেস করল প্লাবন। “বাসায় যাব” বলল মিথিলা। “এখনও তো বৃষ্টি পড়ছে, চলুন হেঁটে যাই।” মিথিলা রাজি হল। হাঁটতে হাঁটতে মিথিলাকে তার বাসার কাছে পৌঁছে দিয়ে প্লাবন চলে এল বাসায়।



কিছুদিন বেশ ভালই কাটল তাদের। এর মধ্যেই ঘনিষ্ঠতা বাড়ল দুজনের। এক সময় প্লাবন মিথিলাকে জানাল তার মনের কথা। মিথিলার এক মুহূর্তে মনে হল যে তার চেয়ে সুখি আর কেউ নেই। কিন্তু পর মুহূর্তে তার মন ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো। অনেক কষ্টে সে নিজেকে সামলে নিল। তারপর বলল, “আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে প্লাবন।” বলে সে কাঁদতে লাগলো। প্লাবনও অনেক কষ্ট পেলো। কিন্তু সে কিছুই বলতে পারলো না। কারণ, সে মাত্র পাশ করেছে। চাকরি কবে পাবে, তার ঠিক নেই। কিভাবে সে মিথিলাকে বিয়ে করে নিবে? বাস্তবতার চরম সীমায় দাঁড়িয়ে তারা দুজন। শেষবারের মতো দুজন দুজনকে দেখল। মিথিলার চোখে পানি, কোনভাবেই সে সেটা আটকাতে পারছে না। প্লাবন মিথিলার চোখের পানিটা মুছে দিল। দুজন তাকালো দুজনের চোখের দিকে, কত না বলা কথা সেখানে! কত কিছু যে বলতে ইচ্ছে করছে! কিন্তু কারও মুখ থেকে কোন কথা বের হল না। প্রিয়জনের সাথে বিদায়ের মুহূর্তটা বুঝি এমনই হয়। বিদায় নেওয়ার আগে প্লাবন বলল, “ভালো থেকো বৃষ্টিকন্যা।” তারপর…….



৫ বছর পরের কথা। ব্যাস্ত নগর জীবনের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে আর সবার মতোই ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে প্লাবন। কিন্তু শত ব্যাস্ততার মাঝেও দিন শেষে সে কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে থাকে। এমন অন্যমনস্কভাবে একদিন সে অফিসে যাচ্ছিল। বাসে মানুষের ভীড়ে পা রাখাই দায়। কোনমতে সে বাসে উঠলো। বাসে ওঠার পর চমকে গেলো সে। জানালার পাশের একটা সিটে বসে আছে মিথিলা। প্লাবনের হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেলো যেন মিথিলাকে দেখে। কিন্তু এ কি অবস্থা মিথিলার! চরম বাস্তবতা আর বিষন্ননতা চাদরে সেই সুন্দর আর চঞ্চল মেয়েটা যেন আড়াল হয়ে গেছে। মিথিলা জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল, তাই সে প্লাবনকে খেয়াল করে নি। বাস থেকে দুজন এক সাথেই নামলো। পিছন থেকে প্লাবন ডাকল মিথিলাকে, যদিও সে জানে পিছন থেকে ডাকাটা মিথিলার পছন্দ না। মিথিলা পিছনে ফিরে তাকাল। প্লাবনকে দেখে যেন সে তার পায়ের নিচে মাটি খুঁজে পেলো। কাঁদবে না হাসবে সে ঠিক বুঝতে পারছে না। রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদাটা ঠিক হবে না ভেবে সে নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেমন আছো তুমি?” প্লাবন বলল, “তোমার এই অবস্থা কেন?” মিথিলা বুঝতে পারল যে সে তার বর্তমান অবস্থা প্লাবনের কাছে লুকাতে পারে নি। কিন্তু প্লাবনকে সে এখন তার বর্তমান অবস্থার সম্পর্কে কিছুই বলতে পারবে না। তাই সে প্লাবনকে তার ফোননম্বর দিয়ে বলল, “আজকে বিকেলে দেখা করতে পারবে, প্লীজ?” প্লাবন বলল, “ঠিক আছে।” অফিসে পুরোটা সময় প্লাবন ছটফট করে কাটালো, মিথিলাও অফিসে ভালভাবে কাজ করতে পারল না। অফিস শেষে তারা দেখা করল। মিথিলা বলল তার কথা। তার হাজব্যান্ডের আরও একটা বউ ছিল, কিন্তু মিথিলার পরিবারের কেউ তা জানত না। যখন তারা জানল ততদিনে মিথিলা তার সংসার জীবনের সাড়ে ৩ বছর পার করে দিয়েছে। তার হাজব্যান্ড তাকে বেশ অত্যাচার করত। তাদের কোন সন্তান ছিল না, তাই সাড়ে ৩ বছর পর মিথিলা ডিভোর্স নিয়ে নেয়। এখন সে তার বাবার বাসায় থাকে, আর একটা ব্যাঙ্কে চাকরি করে। কোনভাবেই সে ভুলতে পারে না তার স্বামীর অত্যাচারের কথা। আর প্লাবন? মিথিলার বিয়ের পরে সে খুব ভেঙ্গে গিয়েছিল। একটা চাকরি হয়ে যাওয়ায় সে ব্যাস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু কখনও সে মিথিলাকে ভুলতে পারে নি, এক মুহূর্তের জন্যও পারে নি। এই জন্যই শত ব্যাস্ততার পরও সে অন্যমনস্ক থাকে। মিথিলা বলল, “এখনও এত ভালবাস আমাকে?” প্লাবন কিছু না বলে শুধু মাথা নাড়লো। এরপর প্রায় প্রতিদিন তারা দেখা করতে লাগলো। প্রথমবারের মতো সেই আবেগ হয়তো এতটা ছিল না, তারপরও দুজন দুজকে কাছে পেয়ে যেন স্বস্তি পেত। প্লাবন মিথিলাকে অনেক সময় দিতে লাগলো। মিথিলাও আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হতে লাগলো, কিন্তু তার সেই প্রাণখোলা হাসিটা ফিরে এলো না। প্লাবন অনেক চেষ্টা করল তার ঐ হাসিটা ফেরাতে, কিন্তু পারলো না। প্লাবন প্রায় আশা ছেড়েই দিয়েছিল। এমন সময় একদিন বৃষ্টি হল, মুষলধারে বৃষ্টি। সেদিন ছিল ছুটির দিন। প্লাবন মিথিলাকে ফোন দিয়ে বলল, “আমরা আজকে দেখা করব, প্রথম যেইখানে আমি তোমাকে প্রথমবারের মতো দেখেছিলাম, ঐখানে।” মিথিলা আসলো। তখনও বৃষ্টি হচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন আকাশ ভেঙ্গে সব পানি বৃষ্টি হয়ে আজকে সব কিছুকে ভিজিয়ে দেবে। প্লাবন মিথিলাকে বলল, “আজকে তুমি নিজেকে উজাড় করে বৃষ্টিতে ভিজবে, আর আমি মুগ্ধ চোখে তোমাকে দেখব; সেই প্রথম দিনের মতো।” মিথিলা তখন ভিজলো নিজেকে উজাড় করে, আর প্লাবন তাকে দেখতে লাগলো সেই প্রথম দিনের মতো। এক সময় প্লাবন মিথিলার হাত ধরলো, তারপর দুজনে একসাথে ভিজতে লাগলো। বৃষ্টি একটু কমে এলে তারা হাঁটতে শুরু করলো। মিথিলা বলল, “তুমি আজ তোমার বৃষ্টিকন্যাকে ফিরিয়ে এনেছ।” প্লাবন বলল, “আমি জানি।” মিথিলা বলল, “প্লীজ, তোমাকে ছেড়ে আর যেতে দিও না আমাকে।” প্লাবন তখন তাকে তার বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, “কখনও যেতে দিব না”। মিথিলার চোখে তখন তার পৃথিবীকে ফিরে পাবার আনন্দঅশ্রু, প্লাবন তা মুছে দিল না। সে আজকে তার বৃষ্টিকন্যাকে তার বুকের মাঝে পেয়েছে। আজ তার চোখেও বাঁধভাঙ্গা আনন্দঅশ্রু, কিন্তু মথিলা তা লক্ষ্য করে নি।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.