| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
আমার ঘরটা এখন আর আগের মতো লাগে না। দরজার লক নষ্ট, বন্ধ করলেও পুরোপুরি বন্ধ হয় না, আধখোলা হয়ে থাকে। বুকশেলফে ধুলো জমে আছে, ড্রেসিং টেবিলের পর্দাটা এলোমেলোভাবে ঝুলে থাকে, ফ্যানটাও অনেকদিন ধরে নষ্ট দেয়ালের রঙ খসে পড়ে গেছে অনেক টুকু।
সবকিছু মিলিয়ে ঘরটার ভেতরে এক ধরনের অগোছালো অসামঞ্জস্য কিছু জমে আছে।
এই ঘরেই আব্বার জীবনের শেষ তিন দিন ছিলেন। হাসপাতাল থেকে যখন তাকে বাসায় নিয়ে এলাম, তখন নিজের ঘরটাই আমি তার জন্য ঠিক করেছিলাম। নিজের সংসার রয়েছে আমার, এই ঘর খালি পড়ে আছে অনেকদিন, সবাই বলেছিল অন্য কোথাও ব্যবস্থা করতে, মাও মানা করেছিলেন, কিন্তু আমি শুনিনি। আমার মনে হয়েছিল, এই ঘরটাই সবচেয়ে নিরিবিলি, সবচেয়ে নিরাপদ, একজন গুরুতর অসুস্থ মানুষের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।
তারপর এখানে অক্সিজেন সাপোর্ট বসানো হলো, বিশেষ হসপিটাল বেড আনা হলো, নানা রকম চিকিৎসার জিনিসপত্রে আমার পরিচিত ঘরটা ধীরে ধীরে ছোট্ট এক হাসপাতাল কক্ষে বদলে গেল।
সবকিছু খুব দ্রুত ঘটেছিল। আর মাত্র তিন দিনের মধ্যেই এই ঘরেই আব্বা তার শেষ নিঃশ্বাস ফেললেন।
সেই সময়ের একটা দৃশ্য বারবার মনে পড়ে। আত্মীয় স্বজনের ভীড়, আব্বার হসপিটালের দিন গুলোতে সবথেকে বেশি যে ইচ্ছেটা করেছিলেন সেটা ছিল বাড়ি আসা, আমি তার হাত ধরে বলেছিলাম বার বার কাঁপতে কাঁপতে খুব খুশি হয়ে, আব্বা আপনাকে বাড়ি এনেছি আর ভয় নেই আপনি সুস্থ হয়ে যাবেন।
তিক্ত একটা ব্যাপার হলো এরপর আর আব্বার সাথে দেখা হয় নাই আমার, একটা কান্না চলছে ভেতরে আজ অনেকদিন পর নিজের ঘরে শুয়ে।মানুষের শেষ সময়ে অনেক কথা আর বলা হয় না, শুধু চোখের ভেতর, কণ্ঠের কম্পনে, নিঃশ্বাসের ভাঙনে সব হারিয়ে যায়।
আগে আমার রুমে খুব কমই আসতো আব্বা অথবা মা। সারাদিন অফিস আর ভার্সিটি শেষে ক্লান্ত হয়ে ফিরতাম, আব্বা আর মা বুঝতেন আমার বিশ্রাম দরকার, তাই এই ঘরটা ছিল আমার নিজের মতো একান্ত বিশ্রামের জায়গা। এখন এই ঘরে ঢুকলেই প্রথমে চোখ চলে যায় সেই জায়গাটায়, যেখানে হাসপাতালের বেডটা রাখা ছিল। অজান্তেই পা কেঁপে ওঠে।
এখন আর সহজে এই ঘরে ঘুমাতে পারি না। একা থাকলে অকারণ ভয় কাজ করে। ঠিক কিসের ভয়, তা স্পষ্ট করে বলতে পারি না, শুধু মনে হয় ঘরের ভেতরে জমে থাকা ভারী কষ্ট বুকের ওপর চাপ ফেলে।
আমি কাকে দোষ দেব, আমার এই রুমকে, না সময়কে। রুম তো এমন যেমন আছে কিন্তু সময়! আগের কিছুই যে নেই, সময় আমার আগের জীবনের সমস্ত কিছু ওলটপালট করে এক অদ্ভুত অন্য আরেকটি জীবন দিয়েছে যে জীবনে এই ঘরটার আর কোন প্রয়োজন নেই। তবে হ্যাঁ আব্বাকে প্রয়োজন ছিল, খুব প্রয়োজন ছিল, অনেক ব্যাপারেই প্রয়োজন ছিল। এই জীবনে কিছুই তো করা হয়ে ওঠেনি তার জন্য।
©somewhere in net ltd.