| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
কোর্টের সামনের চত্বরে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। দুপুরের রোদটা তখন কিছুটা নরম হয়েছে। মানুষের ভিড়, আইনজীবীদের কালো কোট, চায়ের দোকানের ধোঁয়া আর ফাইল হাতে ছুটে চলা লোকজন মিলে জায়গাটা যেন এক অদ্ভুত ব্যস্ততায় ভরা। হঠাৎ চোখে পড়ল একজন মানুষকে।
হাতে থাকা লাঠিটা ঘুরিয়ে এমন কায়দায় একটা ভাঁজ করা চেয়ারে পরিণত করল যে দূর থেকে দেখে মনে হলো যেন কোনো যাদুকর খেলা দেখাচ্ছে। স্টীলের লাঠির সাথেই ছোট্ট রাউন্ড একটা সীট এটাচ করা ওটায়, চেয়ারটায় বসতে গিয়েই আবার হুমড়ি খেয়ে পড়ে যেতে যেতে নিজেকে সামলে নিল সে।
আমি তাকিয়ে রইলাম, চেনা চেনা লাগছে।
কয়েক সেকেন্ড পরই চিনতে পারলাম, লোকটার নাম মাহবুব।
আমার চাকরি হারানোর পেছনে যাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা ছিল, সে তাদেরই একজন।
পাঁচ বছর পর দেখা।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তাকে দেখে আমার রাগ হলো না। বরং একধরনের কৌতূহল আর অদ্ভুত মমতা জেগে উঠল মাহবুবও আমাকে দেখে থমকে গেল।
তার চোখের কোণে বয়সের রেখা। চুলে পাক ধরেছে আগের সেই কঠোরতা আর নেই।
-আরে রফিক সাহেব?
আমি মৃদু হেসে বললাম,
- হ্যাঁ, আমি
সে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি আরও কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম তার দিকে। মনে পড়তে লাগল পুরনো দিনের কথা। দুপুরে কাজের চাপে পাঁচ মিনিট দেরি করে ক্যান্টিনে গেলে সে এমনভাবে বলত যেন আমি ভিক্ষা চাইতে এসেছি।
- খাবার শেষ। এত দেরি করে আসেন কেন?
আমি জানতাম খাবার তখনও আছে। তবুও সে আমাকে ফিরিয়ে দিত
কখনও এডমিনে ওষুধ চাইতে গেলে বলত,
- আপনাদের জন্য কি আলাদা হাসপাতাল খুলে বসে আছি?"
সে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সামনে এমনভাবে কথা বলতো, যেন আমি প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে অযোগ্য কর্মচারী। একবার তো শুধু একটি ফাইল দেরিতে জমা দেওয়ার কারণে পুরো অফিসের সামনে অনর্গল নোংরা ভাষায় কথা শুনিয়েছিল, কি বাজে একটা সিচুয়েশন পার করছিলাম শুধু আমার আল্লাহই জানতো।
সেদিন বাড়ি ফিরে মায়ের সামনে হাসার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু আয়নায় নিজের মুখ দেখে নিজেই বুঝেছিলাম কতটা অপমানের সহ্য করার পরাজিত বাতিল চেহারা ওটা।
মাহবুব তার অদ্ভুত চেয়ারে বসে বলল,
- কেমন আছেন?
- ভালো। আপনি?
লোকটা হাসল। সেই হাসিতে আগের দাপট ছিল না বলল,
- ভালো আছি, সত্যি বলতে কী চলছে
আমি লক্ষ্য করলাম, তার ডান পায়ে সমস্যা হয়েছে হাঁটার সময় কষ্ট হচ্ছে, কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর সে নিজেই বলল,
- আপনার কাছে একটা কথা বলার ছিল হয়তো তাই আজকে আপনার সাথে দেখা হয়েছে।
আমি চুপ করে রইলাম।
- তখন অনেক অন্যায় করেছি।
কথাটা শুনে অবাক হলাম না একটু অস্বস্তি লাগল।
কারণ আমি কখনও কল্পনা করিনি, এই মানুষটি কোনোদিন নিজের ভুল স্বীকার করবে।
সে নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
- বড় ডেজিগনেশন ছিল, ক্ষমতা ছিল মনে হতো সবাইকে ধমক দিয়ে রাখতে হবে। মানুষকে মানুষ মনে করতাম না সে সময়,
আমি কিছু বললাম না।
কোর্টের সামনের বটগাছের পাতাগুলো বাতাসে কাঁপছিল।
মাহবুব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
- জানেন, চাকরিটা আমারও নেই এখন।
আমি তাকালাম।
সে মৃদু হেসে বলল,
- যেভাবে আপনাদের বিদায় হতে দেখেছিলাম, একদিন আমাকেও ঠিক সেভাবেই কিংবা তার থেকেও জঘন্য ভাবে আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে।
তার কণ্ঠে অভিযোগ নাকি ক্লান্তি ছিল বোঝা গেল না।
আমি হঠাৎ অনুভব করলাম, পাঁচ বছর ধরে বয়ে বেড়ানো তার উপর রাগটা কোথাও আর নেই।
আমাদের দুজনের মাঝখানে শুধু সময় বসে আছে; সময়।
যে সময় মানুষকে বদলে দেয়; ক্ষমতাকে মুছে দেয়, অহংকারকে শেষ করে দেয়, আর অপমান কে ধোঁয়াটে স্মৃতিতে পরিণত করে দেয়।
আমি বললাম,
- চা খাবেন?
মাহবুব সাহেব মাথা তুলে তাকালো; চোখে বিস্ময়; হয়তো ভাবেনি আমি এমন প্রস্তাব দেব।
তারপর ধীরে ধীরে হাসল।
- খাব।
আমরা রাস্তার পাশের ছোট্ট দোকানের দিকে হাঁটতে লাগলাম,
দুজন মানুষ; একজন একসময় অপমান করেছিল। আরেকজন একসময় অপমান সহ্য করেছিল।
পাঁচ বছর পর শুধু সময়ের কাছে সমান হয়ে যাওয়া দুইজন মানুষ।
সমাপ্ত
©somewhere in net ltd.