নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমি এক নগণ্যজন। কিন্তু তোমার খুব আপন...

সাদাকালো মিসবাহ

সাদাকালো মিসবাহ › বিস্তারিত পোস্টঃ

একদল কিশোরের বীরত্বের গল্প

০৫ ই মার্চ, ২০১৩ রাত ৯:৩৬

১৯৭১ সালের কথা বাঙালি মাত্রই জানেন। তারপরও একাত্তরের অনেক স্মৃতি, ঘটনা এখনো থেকে গেছে সাধারণের অজানা। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশপ্রেমিক জনতা পাকহানাদারদের নানাভাবে প্রতিরোধের চেষ্টা করেছেন। যুদ্ধাস্ত্র ছাড়াও অনেকে যুদ্ধ করেছেন উত্তাল একাত্তরের। এগিয়ে এসেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতায়। তাদের ছোট ছোট সহযোগিতার সম্মিলিত শক্তিতে বিশ্ব মানচিত্রে অঙ্কিত হয়েছে লাল সবুজের বাংলাদেশ। সিলেটের কাজীটুলা, শাহী ঈদগাহ, ইলেকট্রিক সাপ্লাই, গোয়াইটুলা, হাজারীবাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড এলাকায় কয়েক জন দেশপ্রেমিক কিশোর-তরুণ ঘটিয়েছেন অনেক ঘটনা। সিলেট ভিউ পাঠকদের উদ্দেশ্যে এসব ঘটনা তুলে ধরছে। রাস্তায় গাছ ফেলে প্রতিবন্ধকতা : ২৫ মার্চের কালো রাত্রি। সিলেট শহরের প্রবেশ করছিল পাকহানাদারদের অস্ত্রসজ্জিত গাড়ি। সিলেটের বিভিন্ন স্থান থেকে আসছে গোলাগুলির আওয়াজ। সিলেট শহরের তৎকালিন ৪ নম্বর কাজীটুলা ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ নেতা প্রবাসী আবদুল ওয়াদুদ, ইউনিয়ন আঞ্চলিক কমিটির নেতা নুর উদ্দিন আহমদ, আবদুস সালাম মোস্তফা, ফারুক আহমদ, আবদুস সালাম শাহান, আবদুর রব, আবদুল মালিক জাকা, শফিক মিয়া, আফতাব উদ্দিন, লজিং মাস্টার ফজলুল করিম, সফিক উদ্দিনসহ আরো কয়েকজন কিশোর-যুবক স্থানীয় উত্তর কাজীটুলা জামে মসজিদের পশ্চিমে রাবণের বাড়িতে একটি জঙ্গলাকীর্ণ স্থানে বৈঠক করেন। মুরব্বীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে করা এ বৈঠকে রাস্তায় গাছ ও বড় বড় পাথর ফেলে পাকবাহিনীর গাড়ি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির সিদ্ধান্ত হয়। শুরু হয় প্রতিবন্ধকতার কাজ। কিছুক্ষণের মধ্যেই কাজীটুলা বাজারের প্রধান সড়ক, কাহির মিয়ার গলির উত্তর মুখ, ও ইলেকট্রিক সাপ্লাই রোডে বর্তমান স্কলার্সহোমের সামনে গাছ ও পাথর ফেলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে দূরন্ত কিশোরের দল। ইলেকট্রিক সাপ্লাই রোডে গাছ ফেলার কিছুক্ষণের মধ্যেই পাক সেনাবাহিনীর গাড়ির আসার শব্দ পেয়ে পাশ্ববর্তী আশু মিয়ার বাড়িতে একটি জঙ্গলের আড়ালে লুকিয়ে পড়েন তারা। সেনাবাহিনীর গাড়িটি এসে আটকা পড়ে। একটি জিপ ও ট্রাক থেকে সেনা সদ্যরা নেমে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে জঞ্জাল সাফ করে রাস্তা পরিস্কার করে। বাকি প্রতিবন্ধকতাগুলোর মোকাবেলা পাকসেনারা একইভাবে করেছিল। কালভার্ট ভাঙার চেষ্টা : শাহী ঈদগাহ প্রধান সড়কে ছড়ার উপর একটি কালভার্টটি ভেঙে পাকসেনাদের গাড়ির গতিরোদের পরিকল্পনা নেন কিশোরের দল। নুর উদ্দিন আহমদ, আবদুস সালাম শাহান, আবদুর রব, আবদুস সালাম মোস্তফা, আবদুন নুর, সোনা মিয়াসহ আরো কয়েকজন মিলে কালভার্টটি ভাঙার কাজ শুরু করেন। কালভার্টের তিনভাগের একভাগ ভাঙার পর চলে আসে পাকবাহিনীর সাজোয়া যান। বিপদ আঁচ করতে পেরে সটকে পড়েন কিশোররা। লাশ দাফন : উত্তাল একাত্তরের ৪ বা ৫ এপ্রিল। রাতের কোনো এক সময় পাকিস্তানিরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আলতাফ হোসেনকে অফিসের কোয়ার্টারে উঠার রাস্তায় নৃশংসভাবে গুলি করে হত্যা করে। পরদিন সকালে তার লাশ পাওয়া যায়। লাশটি ততক্ষনে ফুলে গিয়েছিলো। পরে উত্তর কাজীটুলা এলাকার কিশোর লালন মিয়া ও নুরউদ্দিন আহমদসহ কয়েকজন মিলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের টিলায় তাকে দাফন করেন। জায়গাটি পাকসেনাদের যাতায়াতের সময় দেখা যায় বলে দাফন কাজটি তাদের করতে হয়েছে খুব গোপনে। রিকসা চালকের ভূমিকায় : ৭ এপ্রিল থেকে সিলেট শহরের অবস্থা বেশি খারাপ হতে থাকে। তাই লোকজন শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে ছুটতে থাকেন। কাজীটুলা, কলবাখানি (তৎকালিন খোয়াড়ের মুখ) এলাকার অনেক বাসিন্দা চারটি রিকশায় করে টুলটিকরের মিরাপাড়ার দিকে রওয়ানা হন। রিকসা চালনার দায়িত্ব নেন আলাউদ্দিন আহমদ, নুর উদ্দিন আহমদ ও আরো নাম না জানা দুই কিশোর। শাহী ঈদগাহের পশ্চিম দিকে আল্লাহু পয়েন্টের নিচে নামার সময় বন বিভাগের টিলা থেকে রিকসা লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে পাক সেনারা। কিন্তু আল্লাহর রহমতে গুলিগুলো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা : পরিবারের লোকজনদের মিরাপাড়ায় রেখে বাবা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতা ডাক্তার আবদুর রহমানের সাথে ভোলাগঞ্জ সীমান্তে চলে যান নুর উদ্দিন আহমদ। ওখানে এক পরিচিতের বাড়িতে আশ্রয় নেন তারা। মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ছিলো কাছেই। তাই নুর উদ্দিন আহমদ বেশির ভাগ সময় কাটাতেন ওই ক্যাম্পে। বাবা তাকে ইনজেকশন দেওয়ার বিদ্যা শিখিয়ে দিয়েছিলেন অনেক আগে থেকেই। ক্যাম্পের দায়িত্বশীল কর্ণেল সি আর দত্ত আর মীর শওকত আলীর ইচ্ছায় অসুস্থ মুক্তিসেনাদের সেবা ও ইনজেকশন দিতেন মেট্রিক পরীক্ষার্থী নুর উদ্দিন। ভয়ঙ্কর লিফলেট বিতরণ : সিলেট শহরের কলবাখানির পিয়ারা মিয়ার বাড়িতে লজিং পড়াতেন এক স্কুল শিক্ষক। নাম ফজলুল করিম। তার বাড়ি ছিলো জকিগঞ্জে। তিনি ও আবদুল ওয়াদুদ, নুর উদ্দিন আহমদ, আবদুস সালাম মোস্তফা, আবদুস সালাম শাহান, আবদুর রব সবাই একসাথে মিলে সারারাত জেগে তৈরি করতেন পাকিস্তানি বিরোধী লিফলেট। এসব লিফলেট লেখা হতো বাশের কঞ্চিতে কালি লাগিয়ে। উর্দু কথা লিখা হতো ইংরেজি বর্ণমালায়। সাথে বাংলা ভাষাও থাকতো। এসব চিঠির ভাষা ছিলো এরকম ‘সাড়ে সাত কোটি বাঙালির বাংলাদেশ। এই সিলেট ৩৬০ আউলিয়ার পূণ্যভূমি। তোমরা মুসলমান হয়েও মুসলমানদের উপর, নিরীহ মানুষের উপর অত্যাচার চালাচ্ছো। মুসলমান হয়েও মুসলমানদের রক্ত নিচ্ছো। জীবন নিয়ে খেলছো। তোমাদের এই অত্যাচারের প্রতিরোধে বাংলার মানুষ একজোট। অস্ত্র ছেড়ে দাও, আত্মসমর্পণ করো। তোমাদের বিচার আমরা করবোই। খুব তাড়াতাড়ি তোমাদের ক্যাম্প গুড়িয়ে দেওয়া হবে।’ এসব লিফলেট জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শহরের বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানিদের ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। এ দায়িত্ব পালন করতেন দু’বন্ধু আবদুস সালাম মোস্তফা ও নুর উদ্দিন আহমদ। একবার ফজরের নামাজের আগে রাতের শেষদিকে দু’জন যান পানি উন্নয়ন বোর্ডের ক্যাম্পে লিফলেট ফেলে আসতে। তারা চাষনী পীর (রহ.) মাজারের পিছন দিয়ে পানি উন্ন্য়ন বোর্ডের উচু টিলা বেয়ে বেয়ে উঠেন। উঠে একটি টয়লেটের দেয়ালে ২০টি লিফলেট রাখেন। নামতে গিয়ে নুর উদ্দিনের ডান কানে কাটাতার আটকে গিয়েছিলো, রক্ত ঝরছিলো। এসময় পাহারারত এক পাকিস্তানি সৈন্য নড়াচড়া শব্দ বুঝে ফেলে। শুরু করে খোজাখুজি। দুইবন্ধু প্রাণ নিয়ে কোনো মতে দৌঁড়ে পালিয়ে আসেন। তারা চলে আসেন কলবাখানি গলির মুখে। ঠিক তখনই পাকসেনারা তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ে। অল্পের জন্য তারা রক্ষা পান।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.