নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

ফেসবুকে আমি - রিয়াদুল রিয়াদ (শেষ রাতের আঁধার)

রিয়াদ( শেষ রাতের আঁধার )

কিছু মানুষ অন্য মানুষকে মুগ্ধ করার অসীম ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। আর কিছু মানুষের ভিতর এই ক্ষমতা কখনই আসে না। আমি দ্বিতীয় দলের মানুষ। কাউকে মুগ্ধ করার মত কিছু কখনই করতে পারি না। কেউ অনেক সুন্দর গান গায়, আমি শুধু শুনে যাই। কেউ অনেক সুন্দর নাচে, আমি শুধু হাত তালি দিয়ে যাই। কেউ অনেক সুন্দর লেখে, আমি শুধু ভেবে যাই, কী করে এত ভালো লেখে কেউ? আমিও লিখি। তবে তা কাউকে মুগ্ধ করার মত কিছু না। আমার লেখায় আমার ভালোবাসা ছাড়া কিছুই নেই। পড়াশুনা শেষ, বুটেক্স থেকে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বের হয়ে চাকরি, বিয়ে, পেশা পরিবর্তন সব হয়েছে। লেখালেখির ধারাবাহিকতায় চারখানা উপন্যাস অমর একুশে বইমেলায় বেরিয়েছে। টুকরো ছায়া টুকরো মায়া (২০১৫) – সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার । একা আলো বাঁকা বিষাদ (২০১৬) – সামাজিক উপন্যাস । মধ্য বৃত্ত (২০১৮) – ডিটেকটিভ সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার । অভিসন্ধি (২০২০) – ক্রাইম থ্রিলার । দেশটাকে ভালোবাসি অনেক। অনেক মায়া কাজ করে। মাঝে মাঝে ভাবি, সব বদলে দিতে পারতাম। স্বপ্নের মত না, বাস্তবের মত একটা দেশ গড়তে পারতাম …………………………

রিয়াদ( শেষ রাতের আঁধার ) › বিস্তারিত পোস্টঃ

বিপ্রতীপ

২১ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১০:২৯

একটা মানুষ, চাওয়া পাওয়ার হিসেব ছাড়া ঠিক কতটা দিন, কতটা মাস, কতটা বছর অপর একটা মানুষের সঙ্গ হয়ে থাকতে পারে? আমার জন্মের ঠিক আটদিন পরে, তরুর জন্ম। এখন আমার বয়স বত্রিশ, জন্মমাস এপ্রিল। বাংলা সালও চলছে চৌদ্দশ’ বত্রিশ। বয়স ভুলে গেলে, বাংলা সালের কথা মনে করি, দিব্যি খেয়াল হয়ে যায়। তরুর বয়সও তাই। সেই ছেলেবেলা থেকে এখন পর্যন্ত ও আমার সাথে। তরু আমার বন্ধু। একই স্কুল, একই কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ও এক। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর পরে ভর্তি হয়ে, আমার জুনিয়র হয়ে গিয়েছিল তরু। তরুকে আমরা ছেলেবেলা থেকে ক্ষেপাতাম, মেয়েলি নামের জন্য, মেয়েলি স্বভাবের জন্য। ও ভীষণ আবেগি ছেলে- অল্পতেই কান্না পায়, অল্পতেই মুখ ফুলিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে রয়। মানুষের গড় আয়ু ষাট-সত্তর হলে, জীবনের অর্ধেক সময় পার করেও, আমার মনে হয় তরুর মধ্যে কোনো ভারিক্কি ভাব আসেনি। আমার বিয়ের বয়স ছয়, একটা ছেলে আছে যার বয়স দেড় বছর। বাবা হয়েছি, সে ভাব আনার জন্য দাড়ি ছেটে ফেললেও, নাকের নিচে পুরো গোঁফ আমি রেখে দেই। অথচ তরু, মেয়েদের মতন টলটলে মসৃণ মুখমণ্ডলখানা নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, বয়স কমিয়ে বিশ পঁচিশে আটকে দেয়। বিয়ে করেনি, একা সংসার, মা গ্রামে ছোটো ছেলে নিয়ে থাকেন, বাবা গত হয়েছেন। তরুর একার সংসার আমার ঠিক সামনের ফ্ল্যাটে। সময় পেলেই আমার বাসায় এসে বসে থাকে, ওর একা সংসার শূন্য করে, আমার সংসারের অংশ হয়ে যায়।

তরুকে নিয়ে আমি যে কম কথা শুনেছি মানুষের কাছে, তাও কিন্তু নয়। আমার সাথে সারাটাক্ষণ লেপ্টে থাকার জন্য, বন্ধু মহলে আমাদের বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড হিসাবে পরিচিতি হয়ে গিয়েছিল। তরুর মেয়েলি স্বভাব, পরিপাটি হয়ে চলাচল, সে পরিচিতিকে আরও জোরধার করেছিল। কী লজ্জার বিষয়! ওকে আমি বহুবার বলেছি, “তুই আমার থেকে দূরে থাক ভাই, এমন চললে, কোনো মেয়ে আমাকে বিয়ে করবে না।“
তরু ডান হাত দিয়ে নিজের বাম তর্জনী মোচড়াতে মোচড়াতে বলে, “তোর কাছে, বিয়েটাই সব। বন্ধুত্বের কোনো দাম নেই, তাই না? যাহ, বললাম না তোর সাথে কথা। তাই আমার কী হবে?”
এই পর্যন্তই। কিছুক্ষণ পরে আবার তরু ফিরে আসে,”আমাকে তো একটু সরি বলে ফেরাতে পারতি। আমার কি তুই ছাড়া কোনো বন্ধু আছে? আর তুই ই আমার সাথে এমন করলি!”
বলেই নাক টেনে টেনে কান্না জুড়ে দেয়। সে কান্না থামানো, আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটা। শেষমেশ কান্না থামলে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে, “সুমন, তুই কথা দে, এরপর থেকে আমাকে কষ্ট দিবি না, ভুল করলে সরি বলবি?”
আমি নানা কথা বলে প্রতিবারই এড়িয়ে যেতাম। কখনও তরুকে সরি বলিনি। ও কষ্ট পাবে এমন কিছু, মনে হয় না কখনও এড়িয়ে চলেছি। বরং সবাই যখন তরুকে নিয়ে ঠাট্টা করত, আমিও তাতে সায় দিয়ে যেতাম। তরু সবার কথা হজম করে নিত, কিন্তু মাঝে মাঝে তাতে বদহজম হয়ে, একা একা এক কোণে বসে কান্নার পথ বেছে নিত। আমাকে ডেকে বলত, “আমি বড্ড মেয়েলি, তাই নারে? কিন্তু আমি কী ইচ্ছা করে এমন হয়েছি? সবাই আমাকে নিয়ে মজা করে, তুই ও করিস। তুই না আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ, তুই এমন কেনো করিস?”

আমি সে কান্নাও থামিয়ে, সরি বলার মিথ্যে আশ্বাসে তরুকে আশ্বস্ত করেছিলাম। কিন্তু তরুকে আমি কখনও সরি বলিনি। আমি কোনো ভুল করেছি, আমার সেটা কখনও মনে হতো না। হয়ত মনে হওয়া উচিত ছিল।

তরুর সবচেয়ে বিচ্ছিরী রকম স্বভাব হচ্ছে, মিথ্যে বলা। তরু অতি সহজে, অনেক বড় সব মিথ্যে বলে ফেলতে পারত। ওর এক ফোঁটা গলা কাঁপত না, চোখের অস্থির নড়াচড়া হতো না। মিথ্যে বলার সময় ভীষণ লাজুক ছেলেটাই কেমন আত্মবিশ্বাসী হয়ে যেত।
একবার ক্লাস ফাইভে থাকতে, আমাদের এক বন্ধু গালিবের বাসায় গিয়ে, ওদের টেলিভিশনটা ফেলে নষ্ট করে ফেলল। গালিবরা বাসায় কুকুর পালত। টেলিভিশন ভাঙার শব্দে, বাসার কুকুর প্রচণ্ড শব্দে ঘেউ ঘেউ শুরু করল, গালিবের মা ছুটে আসলেন। সে সময়ে মোটামুটি অবস্থাসম্পন্ন মানুষ ছাড়া অন্য কারো বাসায় টেলিভিশন ছিল না, এত দামী জিনিস। তরু কুকুর হতে যথাযথ দূরত্ব বজায় রেখে জানালো, “আন্টি, আপনাদের কুকুরটা লাফ দিয়ে না, টিভির উপর পরে, টিভিটা ভেঙে ফেলছে।“

গালিবের মা তা বিশ্বাস করেছিলেন কিনা আমরা জানি না। জানি না কুকুরের কোনো বিচার হয়েছিল কিনা আমরা চলে আসার পর, কিংবা কুকুরটা কি সত্যিটা বলে দিয়েছিল? তার সম্ভাবনা নেই, কারণ কুকুর তো আর কথা বলতে পারে না। তবে যদি কুকুরের কোনো শাস্তি হয়ে থেকে থাকে, তার জন্য তরুই দায়ী।

এ ব্যাপারে আমরা গালিবকে কখনও কিছু জিজ্ঞেস করিনি। গালিবও আমাদের বাসায় দাওয়াত দেয়ার মতন বন্ধুর তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছিল।

স্কুলেও মাঝে মধ্যে তরু আসত না। ঘুম থেকে উঠতে পারত না। অজুহাত হিসাবে তৎকালীন বেঁচে থাকা ওর দাদা, দাদী, নানা, নানীকে মেরে ফেলত তরু। কাঁদো কাঁদো গলায় তাদের মৃত্যু সংবাদ জানাত ও স্যারদের কাছে। একবার ওর মাকে দেখে, আমাদের বিজ্ঞান শিক্ষক জামিল স্যার, বেশ করুণ গলায় তরুর নানা মারা যাওয়ায় শোক প্রকাশ করেছিলেন। তরুর মা এ কথায় আকাশ ভেঙে পড়া অনুভূতি নিয়ে তাকিয়েছিলেন স্যারের দিকে।
এরপর থেকে এই জীবিত মানুষকে মৃত করার অসত্য পাল্টে, নিজের শরীরে বিভিন্ন জায়গায় ফার্মেসি থেকে কেনা এক টাকার ব্যান্ডেজ টেপ বেঁধে আহত হবার অভিনয় করত। তরুর মিথ্যের ঝুলি কখনও খালি হতো না, খালি হয়নি, খালি হয়ত কখনও হবে না। আমি ওর এতো কাছের মানুষ হয়েও ওর মিথ্যে সবসময় ধরতে পারি না। তরুও কখনও মিথ্যে বলে কাউকে সরি বলে না।

অবশ্য তরু যতই মিথ্যে বলুক, ওর মনের মাঝে আমার মনে হয় সবসময় একটা শিশু বাস করে। যে শিশুর বয়স বাড়ে না, কৈশোর, যৌবনের দেখা পায় না। তরুর কাছে কেউ কখনও ধার চেয়ে ফেরত যায়নি, সাহায্য চেয়ে নিরাশ হয়নি। ভার্সিটির কত জনকে কত টাকা ও দিয়েছে, সবার নামও ওর জানা নেই, টাকা ফেরতের বিন্দুমাত্র আশাও করে না। এসব নিয়ে আমার সাথে ওর মাঝে মধ্যেই কথা কাটাকাটি কত, সবাইকে এত বিশ্বাস করতে নিষেধ করায়, আমার প্রতি বিরাগ ধারণার সৃষ্টি হয়।

এই মাসখানেক ধরে ওর বাসায় একটা ছেলেকে এনে তুলেছে। পুটু নাম। এই ছেলে নাকি একই সাথে আমাদের কলেজে পড়ত। অথচ আমি পুটু নামে আমাদের কোনো ক্লাসমেটের নাম মনে করতে পারলাম না। তরু বলছে, ওর ঠিক পুটুর কথা মনে আছে। কলেজে আমাদের দুই সেকশন মিলিয়ে প্রায় তিনশ-এর উপরে ছেলেমেয়ে পড়ত। বিশাল হল রুমে ক্লাস হতো। কলেজের ঐ বছর দেড়েক সময়ের মধ্যে সবার নাম আমি মুখস্থ করতে পারিনি। তরু পেরেছিল কিনা কে জানে? তবু একটা ছেলে, যে আমাদের ক্লাসমেট হিসাবে নিজেকে পরিচয় দিচ্ছে, তার ব্যাপারে এক ফোঁটা স্মৃতিও আমার মনে থাকবে না, সর্বোপরি তরু ওকে চিনতে পেরেছে, যে তরু আমার সাথে আঠার মতন লেগে থাকত, সেই তরুর স্মৃতিতে একজন আছে, আমার স্মৃতি বিস্মৃত, এটা মানতে আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। চেহারা এই পনেরো-ষোলো বছরে অনেক বদলে যেতেই পারে, তবু চেহারার আঙ্গিকে তো আর আমূল পরিবর্তন একটা মানুষের কখনই আসে না। আমি কিছুই মনে করতে পারি না।

পুটু অনেক বিপদে আছে। এক ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করত, এখন চাকরি নেই, বাবা-মা নেই, স্ত্রী একটা ছিল, তাও ওকে ছেড়ে চলে গেছে। থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। তাই থাকার ব্যবস্থা হয়েছে তরুর ওখানে, খাবার ব্যবস্থা বেশির ভাগ সময় তরুসমেত আমার বাসায়। পুটু মাঝে মধ্যেই আমাদের কলেজের আলাপ করে, বিভিন্ন শিক্ষকদের নিয়ে মজার সব কথা বলে। সবাই সে কথায় হেসে কুটিকুটি হয়ে যায়, আমার তাতে সন্দেহ হয়। মনে হয় এসব ও তরুর কাছ থেকে জেনে আমাদের বলছে, তরু বিশ্বাস করাতে চাচ্ছে, পুটু আমাদের ক্লাসমেট। আমার ধারণা থেকে আমাকে কেউ টলাতে পারে না, আমার বিশ্বাস এটাও তরুর আরেকটা মিথ্যে। এই মিথ্যের আড়ালে কী আছে, আমি তা বুঝবার চেষ্টা করি।

ওর মিথ্যা মাঝে মাঝে বেশ বিচ্ছিরি রকম পরিস্থিতিরও সৃষ্টি করে। একটা ঘটনা আমার মনে আছে। ২০১১ সাল, বাংলা চৌদ্দশ’ আঠারো। আমাদের বয়সও তখন তাই আঠারো। পহেলা বৈশাখের ঠিক নয়দিন আগে আমাদের ইন্টারমেডিয়েট পরীক্ষা শুরু হয়েছিল। পরীক্ষার মাঝেই, চৌদ্দশ’ আঠারো উদযাপনে বৈশাখী মেলায় চলে গেলাম। আঠারো বছর বয়স নিয়ে অনেক জল্পনা কল্পনা মনে ছিল। নিজেকে বড্ড স্বাধীন, বড় মনে হচ্ছিল। তরুর পরিচিত এক বড় ভাই আমাদের নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন, বাজার গলির মোড়ে। মেলা থেকে বের হওয়া সাজগোজ করা প্রতিটা মেয়েকে দেখে সে বড় ভাই শিস দিচ্ছিলেন, এটা ওটা বলে যাচ্ছিলেন। আমাদেরকেও তাড়া দিচ্ছিলেন, “বড় হইছিস ব্যাটা, মজা কর। ভয় নাই, আমার এলাকা এইটা।“
আমি শিস বাজাতে পারি না। চুপচাপ দাঁড়িয়েছিলাম। তরু মাঝে মাঝে মেয়েলি কণ্ঠে মেয়েদের বলছিল, “এই বান্ধবী, কই যাও? কথা শুনে যাও।” বলেই হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছিল।

এর মাঝেই অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটে গেল। একটা ঘটনা না, কয়েকটা ঘটনা একই সাথে ঘটে হতভম্ব একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করল। কোথা থেকে পাগল রকম এক লোক, গায়ে জড়ানো রঙবেরঙের তালি পট্টি মারা জামা কাপড়, আমাদের এসে চোঙার মতন কী একটা দিয়ে পেটাতে শুরু করল। অকথ্য গালিগালাজ করে, পড়তে যেতে বলল। চোঙার একটা আঘাত গিয়ে নাজুক তরুর চোখের নিচে গিয়ে লাগল। এর মধ্যে আরেক হই হট্টগোল, একটা বাচ্চাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তখন ছেলে ধরা রকম গুজব খুব চলছিল। কয়েকজন মিলে তাদের হারানো এক বাচ্চাকে খুঁজেছিল। তরুর চোখের নিচ বেয়ে গলগল করে রক্ত পড়তে শুরু করেছিল, আমি তরুকে ধরে একটু দূরে সরাবার চেষ্টা করছিলাম। এর মাঝে হট্টগোলের লোকজন আমাদের জিজ্ঞেস করেছিল, “চার পাঁচ বছরের একটা বাচ্চা ছেলে, এদিক দিয়ে গেছে? দেখছ তোমরা? লাল জামা পরা।“
তরু চট করে, এতগুলো ঘটনার মাঝেও তাদের ঐ রঙবেরঙ-এর পোশাক পরা লোকটাকে দেখিয়ে বেশ শান্ত গলায় বলেছিল, “চার পাঁচ বছরের বাচ্চা না? লাল জামা পরা? ঐ যে ওনার সাথে দেখেছি।“
সবাই ছুটে গিয়েছিল সেই পাগল রকম লোকটার দিকে। টেনে হিচড়ে মারধর করে জানতে চেয়েছিল, বাচ্চা কোথায়?
আমি তরুকে নিয়ে চলেছিলাম, হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। তরুর চোখে নিচে মারাত্মক জখম হলো, পহেলা বৈশাখের পরে দুটো পরীক্ষা পদার্থ বিজ্ঞান প্রথম পত্র ও দ্বিতীয় পত্র একটাও দিতে পারল না। তরু আমার এক বছরের জুনিয়র হয়ে গেল।

সামনে পহেলা বৈশাখ। আমার পরিচিত মাছওয়ালা বাসায় চারটা ইলিশ মাছ পাঠিয়েছে। চৌদ্দশ’ তেত্রিশ, মানে আমিও তেত্রিশ বছরে পা দিচ্ছি। সেদিনের জন্য জম্পেশ এক পরিকল্পনা নিয়ে তরু আমাদের সাথে আলাপে বসল। একদিনের জন্য আমরা সবাই দোকানদার হব। আমার স্ত্রী ইলিশ পান্তা করবে, আমরা তা কিনে খাব। এছাড়া বাকি যে তিনজন আমরা একেকজন একেক সাজে সাজব, একে অন্যের কাছে খাবার দাবার বিক্রি করব। কী অদ্ভুত ভাবনা! আমার স্ত্রী এই পরিকল্পনায় বেজায় আনন্দ পেল। তাই আমি না করতে পারলাম না।

পরিশিষ্ট
আজ পহেলা বৈশাখ, সুমনের বাড়িতে বেশ মজার এক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানের বুদ্ধি এসেছে আমার মাথা থেকে। সে অনুষ্ঠানে সুমনের স্ত্রীর কাছ থেকে ইলিশ পান্তা কিনব। সুমন ঠিক করেছে ও পেয়ারা মাখা বিক্রি করবে। সুমনের ছেলেটার বয়স, দেড় বছর। আচ্ছা সুমন যদি এই অবস্থায় না থেকে, সত্যি পেয়ারা বিক্রেতা হতো, তবে কি সুমনের ছেলেটা লজ্জা পেত? যখন স্কুলে যেত, বন্ধুদের আড্ডায় আলাপ উঠত, তখন বাবার পরিচয় দিতে গিয়ে কি ইতস্তত করত? জানি না। তবে আমার স্কুল-কলেজ জীবনটা না কেমন যেন কেটেছে। সবাই আমার নাম নিয়ে ক্ষেপাতো, কেমন উদ্ভট একটা নাম। বাবা পছন্দ করে রেখেছিল, এ নিয়ে আমার বাবার প্রতি ভীষণ অভিমান ছিল। আর কোনো নাম পেলো না খুঁজে। আমাকে পাছে কেউ নাম জিজ্ঞেস করে, তাই ধরতে গেলে স্কুল কলেজে পালিয়েই বেড়াতাম। বন্ধু ছিল না তেমন, কারও সাথে কথা বলতাম না খুব একটা। আমার চেনাজানা সহপাঠির সংখ্যা, যারা আমাকে চিনে, আমি তাদের চিনি- তা হাতে গুণে বলে দেয়া যাবে।

আমার যদি ক্ষমতা থাকত, আমি সবার আগে নিয়ম করতাম, কোনো শিক্ষক কোনো শিক্ষার্থীর বাবার পেশা জিজ্ঞেস করতে পারবেন না। শিক্ষকের কাছে প্রতিটা ছাত্র ছাত্রী সমান। মন্ত্রীর ছেলেও যেমন, মুদি দোকানির মেয়েও তেমন, ঠিক তেমনি চানাচুরওয়ালার চুপচাপ ছেলেটাও তেমন হবে। তার বাবার পেশা বার বার জিজ্ঞেস করে তাকে বিব্রত করা যাবে না। আমি বিব্রত হতাম, স্কুল কলেজে যখন শিক্ষকরা জিজ্ঞেস করত, “তোমার বাবা কী করে?”
আমার, “চানাচুর বিক্রি করে,” এ উত্তর দিতে লজ্জা লাগত। বার কয়েক দেয়ার পর দেখেছি, সবাই কেমন করে যেন তাকাত। শিক্ষকরা মমতার চোখে দেখলেও, সে মমতায় করুণা মিশে থাকত। যেন তারা বলতে চাচ্ছেন, “চানাচুরওয়ালা কত কষ্ট করে তার ছেলেকে পড়ালেখা করাচ্ছে।“

বাবার পেশাও আমাকে হীনমন্যতায় ডুবিয়ে দিত অহরহ। আমি আর ভাসতে পারতাম না, ডুবেই যেতাম, তলিয়েই যেতাম। মাঝে মধ্যে বাবার মিথ্যে পেশা আমি বন্ধুদের বলেছি। অনেক বড় করে বলেছি তা না, এই যেমন গারমেন্টেসের সুপার ভাইজার কিংবা বাজারে চালের আড়তদার- এতটুকুই বাড়িয়ে বলা। একটা সময় পর, আমি আর মিথ্যেটাকে সামলাতে পারছিলাম না। আমার বারবার মনে হতো, আমি কবে বড় হব? ঠিক ততটা বড়, যতটা বড় হলে কেউ বাবার পেশা জানতে চায় না।

আমি খুব তাড়াতাড়িই বড় হয়ে গেলাম। আমার বাবা মরে গেলো অকালেই। এরপর যখন কেউ জিজ্ঞেস করত, “বাবা কী করে?” আমি উত্তর করতাম, “বাবা নেই, মারা গেছেন।“
‘চানাচুরওয়ালা’ শুনে যে করুণা আমার প্রতি মানুষের হতো, তার শতগুণ করুণা সে উত্তর শুনে মানুষ করত। অথচ কী আশ্চর্য! আমার তাতে খারাপ লাগা কাজ করত না। আমি কি তাহলে মনে মনে আমার বাবার মৃত্যুটাই কামনা করতাম?

নিজেকে মাঝে মাঝে এ ভাবনার জন্য অপরাধী মনে হয়। আবার সে অপরাধের দায় আমি পরক্ষণেই অন্যের ঘাড়েও চাপিয়ে দেই।

পহেলা বৈশাখের আজকের দিনে, আমি তাই চানাচুর বিক্রি করব। আমি গায়ে পরেছি বাবার সেই চানাচুর বিক্রি করার রঙ বেরঙের পট্টি দেয়া, তালি দেয়া পোশাক। যে পোশাক পরে ২০১১ সালে, আমার ইন্টারমেডিয়েট পরীক্ষার মাঝে, আমার বাবা মানুষের হাতে গণপিটুনি খেয়ে মরে গেছেন।

আমি দূর থেকে শুধু দেখেছি, আমি কিছুই করতে পারিনি। এত দ্রুত ঘটনাগুলো ঘটেছিল, আমি সামলে উঠতে পারিনি।

গলির মোড়ে দাঁড়ানো, তিন জন ছেলের মধ্যে দুজন আমার ক্লাসমেট ছিল। সুমন আর তরু। অন্যজনকে আমি চিনতাম না। আমার বাবা ওদের দেখিয়ে রাগের স্বরে অনেক কিছু আমাকে বলেছিল। আমি নিচু স্বরে জানিয়েছিলাম, ওদের মধ্যে দুজন আমার ক্লাসমেট, এবার আমার সাথেই পরীক্ষা দিচ্ছে।
বাবা আদ্যোপান্ত কিছু না ভেবে, “এই চানাচুর……” বলে চিৎকার করার চোঙা নিয়ে ওদের দিকে তেড়ে গিয়েছিল, ধীর পায়ে পিছনে এগিয়ে যাচ্ছিলাম আমি। কিন্তু আমি যাওয়ার আগেই সব শেষ।

সুমন আর তরুর সে বড় ভাইয়ের দিকে আমি অনেকদিন খেয়াল রেখেছিলাম। আমার বাবার মতই এক গণপিটুনিতে মারা গিয়েছে। বখাটে ছেলে, রাস্তা ঘাটে মেয়েদের সাথে নোংরামি করত, মরে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।

সুমন আর তরুর সঙ্গেই আমি ছিলাম অদৃশ্য ছায়ার মতন। ওদের দিকে খেয়াল রাখার মাঝে আবিষ্কার করলাম, তরুর কাছাকাছি আসাটা বেশ সহজ। এত মাস, এত বছর, এত দিনের অপেক্ষার পর, আমি ওদের কাছাকাছি এসেছি। আমার কলেজ জীবনে অন্তর্মুখী স্বভাবের কারণে, সুমন আমাকে চিনতেই পারেনি। কিন্তু তরুকে বোঝাতে সফল হয়েছি, “আমি পুটু আর আমি ওদের কলেজের ক্লাসমেট।“

আমি চানাচুর বিক্রি করছি, বাবার সে পোশাক পরে। সুমন আর তরু কি পোশাকটা চিনতে পারছে? ওদের মনে কি অনুশোচনা সৃষ্টি হচ্ছে? আমার পকেটে একটা কৌটায় কিছু অ্যাকোনাইট আছে, মারাত্মক বিষ, অল্প মিশিয়ে দিলেই দুজনে শেষ। মৃত্যুর বিনিময়ে মৃত্যু কি আসলে কোনো সমাধান? আমি চাই ওরা শুধু ভুল করেছে, এ ব্যাপারটা বুঝতে পারুক।

আমার চানাচুর বিক্রি করতে গিয়ে বারবার কান্না পাচ্ছে। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে, বাবার কথা, সেদিনটার কথা বারবার মনে পড়ছে। বুকের উপর জমাট বাধা পাথরের বোঝা আরও ভারী হচ্ছে। আজকের এই দিনেই তো বাবা চলে গেল।
চোখ মুছে, চানাচুর মাখাতে শুরু করলাম। একটু পর পর অ্যাকোনাইটের প্যাকেটে হাত বুলাতে লাগলাম। দুজনই তাকিয়ে আছে আমার চোখের দিকে। নাহ, একটা সুযোগ দুজনকে দিলাম, যদি তরু বা সুমন যেকোনো একজন এসে , “সরি” বলে, আমি সব ভুলে যাব।
ওরা কি সরি বলবে?

২১-০৪-২০৬
রিয়াদুল রিয়াদ

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.