নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

স্রোতের অজানা টানে সমুদ্র বালিয়াড়ি বেয়ে বোহেমিয়ান- গৃহকোন, জীবন যাপন ফেলে চলে যায়। তুমি দুহাত বাড়িয়ে আলিঙ্গনে বাঁধতে চাও জোছনা গলে হারিয়ে যায় সুখ । আছড়ে পরা ঘূর্ণিজল মনে বাজায় অচেনা সবুজ দিগন্ত ..

রোকসানা লেইস

প্রকৃতি আমার হৃদয়

রোকসানা লেইস › বিস্তারিত পোস্টঃ

চাঁদের আলোয় পাহাড়ি রাস্তায়

১৫ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ২:০৪


বাইরে পা রাখতেই মুচমুচে চানাচুরের মতন শব্দ উঠল। কড়কড় করে ভেঙ্গে যাচ্ছে পায়ের নিচে বরফের আস্তরণ। এই ভেঙ্গে পরা অবস্থা মন্দ না। হাঁটার সময় মনে হয় ছন্দে ছন্দে নুপুর বাজছে। কিন্তু এই উপরের মুচমুচে চানাচুড়ের ভিতরে রয়েছে মরণ ফাঁদ। মাঝে মাঝেই পিছলে যাচ্ছে পা । একটু অসাবধানে পা আরেকটু জোড়ে সরে গেলেই পপাৎ ধরনীতল।
ধুপধাপ অনেকেই পরে এ সময় । হাত, পা, মাথা, পাজর, নাক, কোমর, আঙ্গুল কত কিছু যে ভেঙ্গে যায়। ইমারজেন্সি ডাক্তারদের জীবন হয়ে যায় তেলে বেগুনে ভাজাভাজা। আর এই সব ভাঙ্গার ধকল বয়ে বেড়ায় মানুষ অনেক দিন পর্যন্ত। কেউ পুরোপুরি ভালো হয় তো কেউ কখনই ভালো হয় না। থেকে থেকে জেগে উঠে হাড়ের ভিতর ব্যাথা।
রাস্তার উপর পরে গেলে খুব সুবিধা মিউনিসিপালিটিকে অভিযুক্ত করে কেইস ঠুকে দেয়া যায়। ঠিকঠাক স্যু করতে পারলে ভাগ্য দেবি সুপ্রসন্ন হয়ে অর্থ প্রদান করে। ঐ যেমন আমরা খারাপ হলেও বলি, যা হয়েছে ভালোর জন্যই হয়েছে। কিন্তু নিজের আঙিনায় পরলে সমস্যা, কেরো উপর দোষ চাপানো যায় না। আর মিউনিসিপালিটিও অনেক সময় পরিস্কার না করা আঙিনার জন্য ফাইন দিয়ে যায়। তাই যত বরফ পরুক শীতে গা কাঁপুক নেমে পরতে হয়ে বরফ ছাফ করতে। অনেকে আবার আক্রান্ত হয়ে পরেন হার্ট এ্যাটাকে, ঠান্ডার কারনে। কারো বা আঙ্গুল জমে অষাড় হয়ে যায় ফ্রস্টবাইটে আক্রান্ত হয় হাইপোথার্মিয়ায়।
এই সব কষ্ট ছাড়াও বরফ মানেই আনন্দ তুষার পাত হলেই অনেকে খেলতে নামেন বরফে নিয়ে। বরফের বল ছোঁড়াছুড়ি তো খুব সাধারন খেলা। এছাড়া বাচ্চারা খুব মজা পায় টোবাগ্যান করতে। একটা সমান কিছুর উপর বসে উপর থেকে গড়িয়ে নিচে নামা। তবে বড়রা অনেকেই নির্জন পাহাড়ি এলাকায় চলে যান এসময় স্কি করতে। পেরিয়ে যান মাইলের পর মাইল লাঠির মতোন লম্বা জুতো পায়ে লাগিয়ে দুই হাতে দুটো লাঠির ঠেলা দিয়ে। অনেকে নামেন জল শুকিয়ে বরফ হয়ে যাওয়া হৃদে স্কি করতে। যে জায়গায় যেমন সুযোগ মিলে। এছাড়া নানা রকম যন্ত্রপাতির ব্যবহার করে ঘুরে বেড়াতেও অনেকে ভালোবাসেন। কতরকমের খেলা আনন্দ শুধু বরফকে ঘিরে।

তবে খুব অবাক হতাম দেখে, বছর শুরুর দিন জানুয়ারির কনকনে ঠাণ্ডায় এক দল মানুষ হ্রদের জলে ডুব দিতে যায় খালি গায়ে। এদের শীত সহ্য করার শক্তি কত বেশি ! বাপরে। এটা খুব জনপ্রিয় একটি খেলা।
এখন স্যোসাল মিডিয়ার কারণে ছোট ভিডিও দেখি অনেকে ঘরের চালে উঠে বা ঘরের ভিতর থেকে আঙ্গিনায় জমা বরফের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পরে। বাচ্চ থেকে তাদের কুকুর, বিড়ালও মাতে এই খেলায়। যখন প্রথম এ দেশে এসেছিলাম, তখন শীত কালে দেখতাম বছর তিন থেকে পাঁচ বছরের বাচ্চাকে দড়ি দিয়ে লাইন করে বেঁধে সামনে পিছনে টিচার গাইড করে স্কুলের গন্ডির পাশে অনেকটা পথ হাঁটিয়ে নিয়ে আসে। বরফ পরে, বৃষ্টি হয় বা খুব রোদ উঠে, বাচ্চাদের এই হাঁটা প্রতিদিন চলে। অন্য সময় যা হোক শীতকালে শিশুদের এমন হাঁটানো দেখে আমার গায়ে জ্বর আসত। রাগও হতো খুব। এটা কেমন ব্যবহার। কিন্তু এটা বাচ্চাদের শক্ত সামর্থ করে প্রকৃতির সাথে মানিয়ে নিতে ইমিউনিটি সিস্টেম বাড়ায় অনেক দিন গড়িয়ে যাওয়ার পর জানলাম। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে এক বছরও হয়নি এমন বাচ্চাদের স্ট্রলারের উপর শুইয়ে বরফ পরা রাস্তায় রেখে মায়েরা চা কফির আড্ডা দিয়ে দেয় কিছু সময়ের জন্য।
অনেক বছর শীতের দেশে কাটিয়ে আমারও খুব পছন্দ শীত। কী সুন্দর শুভ্রতায় ছাওয়া পরিবেশ। পূর্ণিমার সময়গুলো এমন অপরূপ হয়ে উঠে চারপাশ, আমি না ঘুমিয়ে উপভোগ করে নেই প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য। শীত শেষ হলে আর দেখা যাবে না বিস্তীর্ণ জনপদে আলোর বিচ্ছুরণ। এক সময় হাঁটতাম অনেক পথ, ঝরে পরা বরফের মাঝে হয় তো কয়েক কিলোমিটার হবে। সারা গায়ে জমে যেত বরফের এক আস্তরণ। নিঃশ্বাস নিতে খুব ভালোলাগে হিম শীতল বাতাসে। মনে হয় প্রকৃতির মাঝে কোন দুষিত কিছু থাকে না শীতকালে। সবটাই খুব পরিচ্ছন্ন।
আজকাল আমিও বরফের মাঝে খালি পায়ে মাঝে মাঝে খানিক সময় পা ডুবিয়ে রাখি। ঘরের সারাক্ষণ চলা হিটিং থেকে আলাদা প্রকৃতির এক সতেজ টাটকা অনুভুতি পাই ।
বলতে চেয়েছিলাম অন্য একটা ঘুরে বেড়ানোর গল্প। অথচ লিখতে বসে অনেক কিছু মাথায় চলে আসল। আমাকে নিয়ে গেলো কত দিকে।
কড়কড় করে ভেঙ্গে পরা বরফের আস্তরণ, মুচমুচে চানাচুড়ের মতন ভেঙ্গে সাবধানে পা ফেলে আমি গাড়িতে গিয়ে বসলাম। ছুটির একটা দিন ঘরে বসে আছি কেন যেন ভালো লাগছিল না। বাকি দিনটাও অর্ধেক পার হয়েছে। বাইরে প্রচুর রোদ। রোদ দেখে মনে হয় গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুর। অথচ উত্তাপ উল্টো দিকে কুড়ির ঘরে, অর্থাৎ মায়নাস বিশ। বেশ ঠান্ডা তবু বেরিয়ে পরলাম, ছোট একটি শহর গন্তব্য করে। অনেক বার গিয়েছি। তাও যেতে ভালোলাগে।

সিনিক সিটি নামে পরিচিত, ওয়েন সাউন্ড নামের এই শহরটিতে।
জর্জিয়ান উপসাগরের দক্ষিণ তীরে নায়াগ্রা এসকার্পমেন্টের চুনাপাথরের পাহাড়ের নীচে একটি উপত্যকায়, ব্রুস উপদ্বীপের পাদদেশে অবস্থিত। ব্যতিক্রমী ভূগোলের জন্য বিখ্যাত। ছোট দারুণ মনোমুগ্ধকর এই শহরটি।
ঐতিহাসিক শহর ওয়েন সাউন্ডে রয়েছে, বিস্তৃত বন্দর এবং উপসাগর। ঘূর্ণায়মান নদী, ঝর্ণা, পাহাড়। পাহাড়ি এলাকায় আঁকাবাঁকা, উঁচু নিচু রাস্তা।
প্রধান প্রাকৃতিক আকর্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে ইংগিলিস ফলস, হ্যারিসন পার্ক, কেলসো বিচ পার্ক এবং বেশ কয়েকটি সংরক্ষতি এলাকা। ব্রুস ট্রেইল, শহরটিকে দারুণ ভাবে ঘিরে তৈরি করা হয়েছে। এই পথে হাঁটতে জলপ্রপাত পেরিয়ে যেতে হয়। বিরল ফার্নসহ নানারকম উদ্ভিদ ও প্রাণী সংরক্ষিত এলাকায় নির্ভয়ে বসবাস করে।
দুটি নদী দক্ষিণ-পশ্চিমে গ্রে কাউন্টি এলাকা ঘিরে বেয়ে যাচ্ছে। সিডেনহ্যাম নদী: ইংগিলিস জলপ্রপাতের জল নায়াগ্রা এসকার্পমেন্টের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শহরের কেন্দ্রস্থলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ।
পোত্তাওয়াতোমি নদী: পৌরসভার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ওয়েন সাউন্ড বন্দরে প্রবাহিত হয়।
শুধু ভৌগলিক বৈচিত্র নয় কানাডার সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত ছিল একসময়। শহরটিতে অসংখ্য উৎসব এবং অনুষ্ঠান বছর জুড়ে চলতে থাকে। সামারফোক মিউজিক অ্যান্ড ক্রাফটস ফেস্টিভ্যাল, স্যালমন স্পেকটাকুলার ফিশিং ডার্বি, কনকোর্স ডি'এলিগ্যান্স এবং নর্দার্ন লাইটস ফেস্টিভ্যাল।
ওয়েন সাউন্ড আদিবাসী সংস্কৃতি উদযাপনের অনুষ্ঠান এবং আরও অনেক অনুষ্ঠান বছর জুড়েই চলতে থাকে। আদিবাসীদের অংশগ্রহণ আয়োজনে হয়, দীর্ঘস্থায়ী মুক্তি উৎসব। শহর ছেড়ে গ্রামে গেলে পরিচিত হওয়া যায় অন্যরকম জীবনের সাথে। জানা যায় মানুষের জীবনযাপনের বৈচিত্র।

টম থমসন আর্ট গ্যালারিটি প্রতিষ্টিত হয় কানাডার বিখ্যাত, গ্রুপ অভ সেভেনের একজন আর্টিস টম থমসনের নামে। যিনি এই এলাকা থেকেই নিজের কাজ নিয়ে আলোচিত হয়েছিলেন। পরে যোগ দিয়ে ছিলেন কানাডার প্রকৃতি নিয়ে কাজ করা গ্রুপ অভ সেভেনে।
ওয়েন সাউন্ডের টম থমসন আর্ট গ্যালারিতে টম থমসন, গ্রুপ অফ সেভেনের একজন প্রধান প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। যার শিকড় জড়িয়ে আছে এই অঞ্চলে। এই অঞ্চল থেকেই আঁকার কাজ শুরু করেছিলেন অনেক বছর বসবাস করেছেন। এবং প্রকৃতির রূপ ধারন করেছেন, তার কাজে।
জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহ রয়েছে আর্ট গ্যালারিতে। তেল স্কেচ এবং স্মারক, যা এই এলাকার সাথে শিল্পীর গভীর সংযোগের উপর আলোকপাত করে।
ওয়েন সাউন্ডে অবস্থিত কেনেডিয়ান প্যাসিফিক রেলওয়ে স্টেশনটি অনেক পুরানো স্মৃতি বহন করে। বর্তমান স্টেশনটি ১৯৪৬-৪৭ সালে নির্মিত হয়েছিল। ১৮৭৩ তে প্রথম রেল চলাচল শুরু হয়েছিল। স্টেশনটি ১৯৭০ সনে যাত্রীবাহি ট্রেনের চলাচল বন্ধ হয়ে গেলেও। মালবহনের জন্য উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু ১৯৮৬ সনে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৯৫ সনে কমিউনিটি ওয়াটারফ্রন্ট হেরিটেজ সেন্টার হিসাবে স্টেশনটিকে পুরানো দিনের রেলওয়ে স্টেশনের স্মৃতির স্বরূপ মিউজিয়াম করা হয়।
এই দেশে অনেক পুরানো ঐতিহ্য, ইতিহাস এতো সুন্দর ভাবে সংরক্ষণ করা হয় দেখে খুব ভালোলাগে। যতই ছোট কিছু হোক শহর সেখানে ইতিহাস উজ্জ্বল ভাবে অবস্থান করে, অনেক গুরুত্ত সহকারে সংরক্ষণ করা হয়।
পাহাড়ি রাস্তা ধরে বিকালের পথ চলাটা সুন্দর ছিল। আমি পৌঁছে শহরে খানিক ঘোরাফেরা করতেই সন্ধ্যা হয়ে গেলো। ঝর্ণার পাশে যখন পৌঁছালাম তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। তখন একটু মন খারাপ হলো সকাল থেকে বের হলাম না বলে।
ঝর্ণাধারা প্রবল বেগে ঝরে পরছে না। সব জল জমাট বাঁধা বরফ হয়ে আছে। তবে মধুর একটা শব্দ ভাসছে। কলকল করে ছুটে চলেছে স্রোতস্বনী নদীর জল। লেকের জল জমাট বেঁধে গেল নদী বয়ে চলেছে আপন বেগে। শব্দটা খুব ভালো লাগছিল। ট্রেইল ধরে বেশ খানিক হাঁটলাম। দেখা হয়ে গেলো আমার মতন ঘুরতে আসা কিছু মানুষের সাথে।
আবার ফিরে গেলাম শহরের ভিতর। অবাক হয়ে দেখলাম এখানে অনেক রাত অবধি বেশ কিছু খাবার দোকান খোলা থাকে। অনেক শহরে সন্ধ্যা হলে সাথে সাথেই দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। খাবারের মানও বেশ ভালো ছিল। অবশেষে চাঁদের আলোয় পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে, ছোটখাটো ভ্রমণ শেষ করে আনন্দ চিত্তে বাড়ি ফিরে এলাম।

মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ১৫ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ২:৩১

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: আমি তো আপনাকে খুজঁতে জার্মানী গিয়েছি
আর কতদূর গেলে দেখা পাবো ?

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.