নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

"মানুষ যুদ্ধ করে চলে, যদিও কখনই তাকে একবারও তলোয়ার চালাতে হয় না"

আমি নতুন কিছু পড়তে ভালবাসি

মো: আবু তাহের

আমি নতুন কিছু পড়তে ভালবাসি

মো: আবু তাহের › বিস্তারিত পোস্টঃ

দারিদ্র্য বিমোচনে যাকাতের ভূমিকা - সমগ্র

২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১১ দুপুর ১২:৫২

"বেশ কিছুদিন থেকে এই লেখাটি ধারাবাহিকভাবে পোস্ট দিয়ে আসছি। কারো খারাপ লেগেছে আর কারো বা ভালো। যার যাই লাগুক না কেন সবার জন্যই পুরো লেখাটা আবার পোস্ট করছি। আশা করি মন্তব্য ও পরামর্শ পাব।"



ভূমিকাঃ



"আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করলাম"। (সূরা মায়েদা-৩)



Islam is the complete code of life. যেহেতু ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, সেহেতু এখানে মানুষের জীবনের প্রতিটি বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বর্ণনা করা হয়ে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া সবচেয়ে বড় কথা হল আমাদের স্রষ্টা আলাহ রাব্বুল আলামীন নিজেই এটাকে (এই দ্বীনকে) পূর্ণাঙ্গ দ্বীন বলেছেন। সেহেতু মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তাকে কি করতে হবে, কিভাবে চলতে হবে তার সব কিছুই এখানে বর্ণিত আছে। এই দ্বীনি ব্যবস্থায় যেমন আছে নামাজ, রোযা, যাকাত, হজ্জ সম্পর্কে আলোচনা, তেমনি আবার কিভাবে রাষ্ট্র চালাতে হবে সে বিষয়েও আছে পরিপূর্ণ আলোচনা ও দিক নির্দেশনা। এখনকার আলোচনা অবশ্য এতসব বিষয়ে নয়, এখনকার আলোচ্য বিষয় হচ্ছে "যাকাত"।



যাকাতঃ



যাকাত আরবী শব্দ। এর বাংলা অর্থ হচ্ছে পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা, বর্ধিত হওয়া, বৃদ্ধি করা, মার্জিত করা, সংযত করা, পূর্ণতা, নির্দোষ, সততা ইত্যাদি।

নিজের ধন-সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ গরীব-মিসকীন ও অভাবী লোকদের মধ্যে বন্টন করাকে যাকাত বলা হয়।

যাকাত কেবল ইসলামী অর্থ ব্যবস্থার একটি মৌলিক স্তম্ভ নয়, যাকাত ইসলামী জীবন ব্যবস্থারই অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ। যাকাত ইসলামের অন্যতম প্রধান বধ্যতামূলক ইবাদত। ঈমানের পর নামাজ আর নামাজের পরই যাকাতের স্থান। এ সম্পর্কে একটি হাদীস ইলেখ করা যেতে পারে।

"হযরত আব্দুলাহ ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুলাহ (সাঃ) এরশাদ করেছেনঃ ইসলাম পাঁচটি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। সেগুলো হল: এই স্যা দেয়া যে, আলাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই এবং মুহাম্মদ (সাঃ) আলাহর রাসূল। সালাত কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, রমযানের রোযা রাখা এবং হজ্জ করা।" (বুখারী ও মুসলিম)



হাদীসে জিব্রাইলেও এমন ধরনের বর্ননা এসেছে।

ইসলামী শরীয়তে যাকাত প্রদান না করা যেমন চরম অপরাধ, ঠিক তেমনি যাকাত অর্থশীলদের সম্পদে অভাবীদের অধিকার হবার কারনে যাকাত পরিশোধ না করলে সমাজের একটি বিরাট অংশ তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় এবং আর্থ সামাজিক অবস্থা ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে।

যাকাত সামগ্রীকভাবে সমাজের রন্ধ্র রন্ধ্র থেকে অন্যায় আবিলতা দূর করে সমাজকে ষুষ্ঠু, সুন্দর, বিকশিত ও সু-সংহত করে তোলে।

বর্তমান বিশ্বের, বিশেষ করে আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে যাকাত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হওয়া অত্যন্ত জরুরী।





যাকাত ফরজঃ



কুরআন ও হাদীসের অকাট্য দলীল অনুযায়ী এটা প্রমানিত হয় যে, যাকাতকে আল্লাহ ফরজ করে দিয়েছেন। ইসলামী শরীয়ার সমস্ত উৎস অনুযায়ী যাকাত ফরজ আইন। যেমন কুরআনের সূরা বাকারার ৪৩, ৮৩, ১১০, আন-নিসার ৭৭, আল-হজ্জ এর ৭৮, আন-নূর এর ৫৬, আহযাব এর ৩৩, মুজাদালার ১৩, মুযাম্মিলের ২০ নং আয়াতে আলাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেছেন "নামাজ কায়েম কর এবং যাকাত প্রদান কর"।

যাকাত শুধু আমাদের উপরিই ফরজ করা হয়নি বরং পূর্ববর্তী নবীর উম্মতগনের উপরও যাকাতকে ফরজ করা হয়েছিল। যেমন কুরআনপাকে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এবং তাঁর বংশের নবীদের কথা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে "আমরা তাদেরকে মানুষের নেতা বানিয়েছি, তারা আমাদের বিধান অনুযায়ী পরিচালিত করে, পথ প্রদর্শন করে। আমরা অহীর সাহায্যে তাদেরকে ভালো কাজ করার, নামাজ কায়েম করার এবং যাকাত আদায় করার আদেশ করেছি, তারা খাঁটিভাবে আমার ইবাদত করতো-হুকুম পালন করতো।" সূরা আম্বিয়া-৭৩

এছাড়াও সূরা মায়েদার ১২এবং ৫৫নম্বর আয়াতে বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়েছে।

যাকাত ফরজ সম্পর্কে রাসূলুলাহর (সাঃ) হাদীস উল্লেখ করা যেতে পারে। "হযরত আব্দুলাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন ঃ রাসূল (সাঃ) মুয়াজকে (রাঃ) ইয়েমেনের শাসনকর্তা নিযুক্ত করে পাঠাবারকালে নিম্নোক্ত নির্দেশ প্রদান করেন- হে মুয়াজ ! তুমি আহলে কিতাবের লোকদের কাছে যাচ্ছো। তাদের প্রথমে আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই এবং মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর রাসূল এই ঘোষনা দেয়ার আহ্বান জানাবে। এই আহ্বান মেনে নিলে তাদের বলবে- আল্লাহ তাদের উপর দিন-রাতে পাঁচবার সালাত আদায় করা ফরজ করেছেন। তারা যদি এ কথা মেনে নেয় তাহলে তাদের জানাবে-আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর যাকাত ফরজ করে দিয়েছেন, যা তোমাদের ধনীদের কাছ থেকে আদায় করে তোমাদের গরীবদের মাঝে বন্টন করে দেয়া হবে।" (বুখারী-মুসলিম)

অন্যত্র তিনি (সাঃ) বলেছেন "তোমাদের সম্পদের যাকাত পরিশোধ করো"। (তিরমিযি)

উপরে কুরআন ও নিচের হাদীস দু'টি যাকাত অকাট্যভাবে ফরজ হবার কথা প্রমান করে।





যাকাত অস্বিকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষনাঃ [/su



আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদেরকে কাফির ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে লড়াই করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং পরে বলেছেন "তারা যদি কুফর ও শিরক থেকে তাওবা করে খাঁটিভাবে ঈমান আনে এবং নামাজ কায়েম করে ও যাকাত আদায় করে তবে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাইয়ে পরিণত হবে।" সূরা তাওবা-১১

অর্থাৎ শুধু কুফর ও শিরক থেকে তাওবা করা এবং ঈমান আনার কথা প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়, সে যে কুফর ও শিরক থেকে তাওবা করেছে এবং প্রকৃতপক্ষে ঈমান এনেছে, তার প্রমানের জন্য যথারীতি নামাজ আদায় করা ও যাকাত দেয়া অপরিহার্য। অতএব তারা যদি তাদের এরূপ বাস্তব কাজ দ্বারা এ কথার প্রমান পেশ করে, তাহলে নিশ্চই তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই, অন্যথায় তাদেরকে ভাই মনে করাতো দূরের কথা, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও বন্ধ করা যাবে না।

এতো গেলো কুরআনের কথা। এবার রাসূলের (সাঃ) সাহাবাদের দিকে তাকাই। রাসূলের (সাঃ) ইন্তেকালের পর কিছু লোক কালেমা এবং নামাজ, রোযা মেনে নিয়ে কেবল যাকাত দিতে অস্বিকার করে। তাদের বিরুদ্ধে প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রাঃ) যুদ্ধ ঘোষনা করেন। তিনি ঘোষনা করে দেন "যে ব্যক্তি নামাজ থেকে যাকাতকে বিচ্ছিন্ন করবে, আমি অবশ্যই তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো।" এর কারণ হলো এই যে "ঈমানদার লোকদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, তারা সালাত কায়েম করে, যাকাত পরিশোধ করে এবং তারা আল্লাহর সম্মুখে মাথা নতকারী হয়ে থাকে।" সূরা মায়েদা-৫৫

যেহেতু ঈমানের অন্যতম শর্তই হচ্ছে যাকাত প্রদান, সেহেতু যারা যাকাত দিতে অস্বীকার করে তাদের ঈমান থাকতে পারে না, তারা অবশ্যই কাফের।

এ সম্পর্কে একটি হাদীস উল্লেখ করা যেতে পারে- "হযরত আব্দুলাহ ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে। রাসূল (সাঃ) বলেছেন- লোকদের বিরূদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে আমি আদিষ্ট হয়েছি, যতক্ষণ না তারা সাক্ষ দেবে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই, মুহম্মাদ (সাঃ) আল্লাহর রাসূল ও সালাত কায়েম করবে ও যাকাত প্রদান করবে।" বুখারী ও মুসলিম

এ হাদীস থেকেও যাকাত অস্বিকার করার পরিণতি সু-স্পষ্ট হয়ে গেছে।





যাকাত না দেয়ার পরকালীন শাস্তিঃ



যাকাত না দেয়ার পরকালীন শাস্তি যে কত ভয়ঙ্কর হতে পারে সে বিষয়ে কুরআনের একটি আয়াত এবং একটি হাদীস উল্লেখ করাই যথেষ্ট মনে করছি।

আলাহ তায়ালা বলেন ঃ "যারা সোনা-রুপা (অর্থ-সম্পদ) পুঞ্জিভূত করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে খরচ করে না, তাদের যন্ত্রনাদায়ক শাস্তির সু-সংবাদ দাও! এমন একদিন আসবে যেদিন সেসব সোনা রূপা জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে, তারপর তা দিয়ে তাদের মুখ-মন্ডল, পার্শ্বদেশ ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেয়া হবে এবং বলা হবে, এই হলো তোমাদের সেসব অর্থ-সম্পদ যা নিজেদের জন্য জমা করে রেখেছিলে। অতএব এখন জমা করে রাখা সম্পদের স্বাদ গ্রহণ করো।" সূরা তাওবা-৩৪-৩৫



হাদীসটি হলো-"হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলে করীম (সাঃ) বলেছেন- আল্লাহ যাকে অর্থ-সম্পদ দিয়েছেন, সে যদি সেই অর্থ-সম্পদের যাকাত প্রদান না করে, তবে তা কিয়ামতের দিন একটি বিষধর অজগরের রূপ ধারণ করবে। যার দু'চোখের উপর দু'টি কালো চিহ্ন থাকবে। সে বলবে-আমিই তোমার অর্থ-সম্পদ, আমিই তোমার সঞ্চয়। এতটুকু বলার পর নবী করীম (সাঃ) নিম্নোক্ত আয়াতটি পাঠ করলেন-যারা আলাহর দেয়া অর্থ- সম্পদে কার্পন্য করে, তারা যেন মনে না করে যে, এটা তাদের জন্য মঙ্গল, বরং এটা তাদের জন্য অত্যন্ত খারাপ। তারা যে অর্থ-সম্পদ নিয়ে কার্পন্য করছে তাই কিয়ামতের দিন তাদের গলার বেড়ি হবে, (সূরা-আল ইমরান-১৮০)।" বুখারী





যাকাত সম্পদ বৃদ্ধি করেঃ



যাকাত দিলে মানুষের সম্পদ কমে না, বরং বাড়ে। যারা গভীর নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর নির্দেশ মতো তাঁর পথে ব্যয় করেন, পরম করুনাময় আল্লাহ এর বিনিময়ে কেবল পরকালে নয়, দুনিয়াতেও ব্যাপক বরকত, স্বচ্ছলতা ও উন্নতি দান করেন।

যেমন আলাহ বলেন-"আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে তোমরা যে যাকাত দাও, মূলত যাকাত দানকারী সম্পদ বৃদ্ধি করে।" সূরা রুম-৩৯



অন্যত্র বলা হয়েছে-"যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের খরচের দৃষ্টান্ত হচ্ছে একটি শষ্য বীজের মতো, যে বীজ থেকে সাতটি শীষ বের হয় এবং প্রত্যেকটি শীষে হয় একশটি দানা। আলাহ যার আমলকে চান এভাবেই বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহতো সীমাহীন ব্যাপকতার অধিকারী, জ্ঞানী।" সূরা বাকারা-২৬১



এভাবে আল্লাহ যাকাত প্রদানকারীদেরকে অনেক অনেক শুভ সংবাদ দিয়েছেন।





যাকাত আদায় ইসলামী সরকারের দায়িত্বঃ



যাকাত আদায় করা ইসলামী রাষ্ট্রের সরকারের অপরিহার্য দায়িত্ব। এ সম্পর্কে আল্লাহ কুরআনে বলেন-"তারা হচ্ছে সেই সব লোক, যাদেরকে আমি রাষ্ট্র ক্ষমতা দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত ব্যাবস্থা চালু করবে, মানুষকে সৎকাজের আদেশ করবে এবং অন্যায়-অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে।" সূরা হজ্জ-৪১



আলাহ আরও বলেন- "হে নবী, তাদের সম্পদ থেকে যাকাত আদায় করে তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করো।" সূরা তাওবা-১০৩



এ আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রাসূলে করীমকে (সাঃ) মুসলমানদেরকে স্বতন্ত্র ও ব্যক্তিগতভাবে যাকাত দান করতে বলা হয়নি।

এ থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় মুসলমানদের রাষ্ট্রপ্রধান বা ঈমাম সকলের নিকট থেকে যাকাত আদায় করবে এবং সমষ্টিগতভাবে তা খরচ করবে।

একটি হাদীসেও নবী করীম (সাঃ) একথাই বলেছেন।



তিনি বলেন-"তোমাদের বিত্তবানদের থেকে যাকাত আদায় করে তোমাদের দরিদ্রদের মধ্যে তা বন্টন করার জন্য আমি আদিষ্ট হয়েছি।"



হুজুর (সাঃ) এবং খোলাফায়ে রাশেদীনদের আমলে ইসলামী সরকার কর্তৃক যাকাত আদায় করে তা কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে বন্টন করা হতো।

বর্তমানে যেহেতু ইসলামী রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠিত নেই এমতাবস্থায় আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায় যে সকল সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে সে সকল ইসলামী সংগঠন অথবা অন্তত ব্যক্তিগতভাবে যাকাত আদায় করে কুরআন নির্ধারিত খাতসমূহে তা বন্টনের ব্যবস্থা করাই যাকাত আদায়ের সর্ব্বোত্তম পন্থা হতে পারে।





যারা যাকাত দিবেঃ



সালাত ফরজ হবার জন্যে যেমন কিছু শর্ত আছে, তেমনি যাকাত ফরজ হবার জন্যেও কিছু শর্ত আছে। শরীয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতে এমন প্রত্যেক ব্যক্তিরই উপর যাকাত ফরজ, যাদের মধ্যে নিম্নোক্ত শর্তাবলী পাওয়া যায়-১.মুসলিম ২. স্বাধীন ৩. আকেল হওয়া ৪. বালেগ হওয়া ৫. নিসাব পরিমান সম্পদ থাকা ৬. পূর্ণাঙ্গ মালিকানা থাকা ৭. এক বছর অতিবাহিত হওয়া।





যারা যাকাত পাবেঃ



আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যাকাত কাদের প্রাপ্ত অর্থাৎ কাদের মধ্যে যাকাতের অর্থ বন্টন করে দিতে হবে সে সম্পর্কে সু-স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন-"এসব সদাকাতো (যাকাত) কেবল নিস্ব, অভাবগ্রস্থ ও তৎসংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জন্য, যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা হয় তাদের জন্য, ঋণ ভারাক্রান্তদের, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরদের জন্য। এটা আল্লাহর বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।" সূরা তাওবা-৬০



উপরের আয়াত হতে আটটি উদ্দেশ্যে যাকাতের অর্থ ব্যবহারের জন্যে সু-স্পষ্টভাবে নির্দেশ পাওয়া যায়।

সেগুলি হচ্ছে-

১. দরিদ্র্য জনসাধারণ

২. অভাবী ব্যক্তি

৩. যে সকল ব্যক্তি/কর্মচারী যাকাত আদায়ে নিযুক্ত রয়েছেন

৪. নও মুসলিম

৫. ক্রীতদাস বা গোলাম মুক্তি

৬. ঋণগ্রস্থ ব্যক্তি

৭. আল্লাহর পথে মুজাহীদ এবং

৮. মুসাফির।



এই আটখাতের মধ্যে ছয়টাই দারিদ্র্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অন্য দুটি খাতও (৩,৭) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা যাকাত আদায় ও ব্যবস্থাপনা একটি কঠিন ও শ্রমসাপেক্ষ কাজ। এ কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের এটাই সার্বক্ষনিক দায়িত্ব। সুতরাং তাদের বেতন এই উৎস থেকেই দেওয়া বাঞ্ছনিয়।

তাছাড়া যে সব ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রামে লিপ্ত তারাও অন্যকোনভাবে জীবিকা অর্জনের সুযোগ হতে বঞ্চিত। সুতরাং উপরে বর্ণিত আটটি খাতেই যদি যাকাতের অর্থ ব্যয় হয় তাহলে দরিদ্র্যতা দূর হবে।





বাংলাদেশে দারিদ্র্যের চিত্রঃ



বাংলাদেশের জনগোষ্ঠির প্রায় ৫০% লোক দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০০৪ অনুযায়ী দেখা যায় জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্যের পরিমান দাঁড়িয়েছে ৪৯.৮ শতাংশ। শহর অঞ্চলে এর পরিমান ৩৬.৬ শতাংশ হলেও পল্লী এলাকায় এর পরিমান ৫১.১ শতাংশ।

এই ভয়াবহ দারিদ্র্য বিমোচনের জন্যে সরকারের গৃহীত সাধারণ কর্মসূচী যেমন কোনক্রমেই স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে না, তেমনি একাজ বিদেশী সাহায্যপুষ্ট এনজিওদের উপরও ফেলে রাখা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন যাকাতভিত্তিক অর্থনীতি।





বাংলাদেশে যাকাতের চিত্রঃ



আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় বাংলাদেশের মত একটি দরিদ্র্য দেশে তেমন কিই বা যাকাত আদায় হতে পারে। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার তার সম্পূর্ণ বিপরিত।

বেসরকারী এক হিসাবমতে দেখা গেছে বাংলাদেশে ১০,০০০এর ও বেশি কোটিপতি বাস করেন, এ দেশে আছে অনেক অনেক ব্যাংক ও বীমা কোম্পানী, অন্যান্য কোম্পানী, তাছাড়া গ্রাম ও শহরে আরও অনেক ব্যক্তি আছেন যারা সাহেবে নিসাব।

বাংলাদেশে সবধরনের উৎস মিলিয়ে প্রতি বছর "বার হাজার" কোটি টাকারও বেশী যাকাত আদায় হওয়া খুবই সম্ভব। যা দিয়ে দারিদ্র্য দূর করা খুব সহজেই সম্ভব।





দারিদ্র্য বিমোচনে যাকাতের ভূমিকাঃ



যাকাতের অন্যতম অর্থনৈতিক ও সামাজিক উদ্দেশ্য হচ্ছে ইসলামী সমাজ হতে দরিদ্রতা দূর করা। দারিদ্র্যতা মানবতার পয়লা নম্বরের দুশমন। ক্ষেত্র বিশেষে তা কুফরী পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে। যে কোন সমাজ ও দেশের এটা সবচেয়ে জটিল ও তীব্র সমস্যা। সমাজে হতাশা ও বঞ্চনার অনুভূতি সৃষ্টি হয় দারিদ্র্যতার ফলে। পরিনামে দেখা দেয় সামাজিক সংঘাত। বহু সময়ে রাজনৈতিক অভ্যুত্থান পর্যন্ত ঘটে। অধিকাংশ অপরাধই সচরাচর ঘটে দরিদ্রতার জন্য। এ সমস্যাগুলির প্রতিবিধান করার জন্যে যাকাত ইসলামের অন্যতম মুখ্য হাতিয়ার। যে আট শ্র্রেণীর লোকের কথা পূর্বেই উলেখ করা হয়েছে, যাকাত লাভের ফলে তাদের দিনগুলি আনন্দ ও নিরাপত্তার হতে পারে। যাকাত যথাযথভাবে আদায় ও পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা হলে আজকের দিনেও এর মাধ্যমে দরিদ্রতা দূর করা সম্ভব।

কিন্তু দূর্ভাগ্যের বিষয়, এক সময়ে যে যাকাত পদ্ধতি চালু ও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারনে জাযিরাতুল আরবে যাকাত গ্রাহকের সন্ধান পাওয়া ছিল দূর্লভ, আজও সেই যাকাত ব্যবস্থা চালু থাকা সত্ত্বেও মুসলিম বিশ্বে দুঃস্থ, অভাবী ও নিস্ব লোকের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর মূল কারণ হলো- মুসলিম দেশগুলিতে আজ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বাধ্যতামূলকভাবে যাকাত আদায় ও বিলি-বন্টনের ব্যবস্তা নেই। উপরন্তু বহু বিত্তশালী মুসলিমই যাকাত আদায় করেন না। যারা যাকাতের অর্থ প্রদান করেন তাদেরও বেশির ভাগই বিচ্ছিন্ন ও অপরিকল্পিতভাবে যাকাতের অর্থ বিলি-বন্টন করেন। তাতে না সমাজের তেমন উপকার হয়, না অভাবী ও দরিদ্র জনগনের সমস্যার স্থায়ী সুরাহা হয়। একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই আমরা বুঝতে পারবো যে, আসলে আমরা যে সমাজে বাস করি, তার কল্যাণ ও উন্নতির সাথেই আমাদের কল্যাণ ও উন্নতি জড়িত। আমি যদি আমার অর্থ সম্পদ থেকে আমার ভাইদের সাহায্য করি, তবে তা আবর্তিত হয়ে বহু কল্যাণ সাথে নিয়ে আমার কাছেই ফিরে আসবে। কিন্তু আমি যদি সংকীর্ণ দৃষ্টির বশবর্তী হয়ে তা নিজের কাছেই জমা করে রাখি কিংবা কেবল নিজের ব্যক্তি স্বার্থেই ব্যয় করি, তবে শেষ পর্যন্ত তা ক্ষয়প্রাপ্ত হতে বাধ্য।



যেমন ধরুন, কেউ যদি একজন এতিম শিশুকে প্রতিপালন করেন এবং তাকে লেখাপড়া শিখিয়ে সমাজের একজন উপার্জনক্ষম সদস্যে পরিনত করে দেন, তবে আসলে তিনি সমাজের সম্পদই বৃদ্ধি করলেন। আর সমাজের সম্পদ যখন বৃদ্ধি পাবে, তখন সমাজের একজন সদস্য হিসেবে তিনিও তার অংশ লাভ করবেন। তবে এই অংশ যে তিনি সেই বিশেষ এতিমটির যোগ্যতার ফলে লাভ করেছেন, যাকে তিনি সাহায্য করেছিলেন, তা হয়তো ঐ ব্যক্তি হিসাব করে মিলাতে পারবেন না। কিন্তু তিনি যদি সংকীর্ণ দৃষ্টির বশবর্তী হয়ে বলেন যে, আমি তাকে সাহায্য করবো কেন? তার বাপের উচিত ছিলো তার জন্য কিছু রেখে যাওয়া। তবেতো সে ভবোঘুরের মতো টো টো করে ঘুরে বেড়াবে। বেকার অকর্মণ্য হয়ে পড়বে। নিজের শ্রম খাটিয়ে সমাজের সম্পদ বৃদ্ধি করার যোগ্যতাই তার মধ্যে সৃষ্টি হবে না। বরং সে ব্যক্তি যদি অপরাধ প্রবণ হয়ে কারো ঘরে সিঁদ কাটে অথবা যে সাহায্য করলো না তার ঘরেই সিঁদ কাটে তাহলে তাতেও বিষ্ময়ের কিছু থাকবে না। এর অর্থ এই দাড়াবে যে, তিনি সমাজের একজন অকর্মণ্য, ভবঘুরে এবং অপরাধ প্রবণ বানিয়ে কেবল তারই ক্ষতি করেন নি, নিজেরও ক্ষতি করলেন।



বেশিরভাগ লোকই মনে করেন দরিদ্র জনগনের অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে চাই সরকারী সাহায্য, নয়তো বিদেশী অনুদান। কিন্ত একটু তলিয়ে দেখলে দেখা যেতো, এ দেশে যে বিপুল পরিমান অর্থ যাকাতের মাধ্যমে বিতরণ করা হয় তার সুষ্ঠু, সংগঠিত ও পরিকল্পিত ব্যবহার হলে এসব দরিদ্র লোকদের অবস্থার পরিবর্তন করা খুবই সম্ভব।



উদাহরণ স্বরুপ বলা যায়, বহু ধনী ব্যক্তি বিশ-পঁচিশ হাজার টাকার উপর যাকাত দিয়ে থাকেন। কিন্তু তারা সাধারনত-এই অর্থের বড় অংশ নগদ পাঁচ/দশ টাকার নোটে পবিত্র রমযান মাসের শেষ দশ দিনে বাড়ির গেটে উপস্থিত গরীব নারী-পুরুষের মধ্যে বিলিয়ে দেন, বাকীটা শাড়ি-লুঙ্গী আকারে বিতরণ করে থাকেন। কখনও কখনও এরা এলাকার মাদ্রাসার লিল্লাহ বোডিং বা ইয়াতিমখানাতেও এই অর্থের কিছুটা দান করে থাকেন। এরা মুসাফির ঋণগ্রস্থ অসুস্থ লোকদের কথা আদৌ বিবেচনায় আনেন না। বিবেচনায় আনেন না আল্লাহর পথে মুজাহীদদের জন্যে খরচের কথাও। অথচ এরাই যদি পরিকল্পিতভাবে এলাকার দুস্থ, বিধবা, সহায়-সম্বলহীন পরিবারের মধ্যে থেকে বাছাই করে প্রতি বছর অন্ততঃ তিন/চারটি পরিবারকে নিজের পায়ে দাড়াবার জন্যে রিক্সা, ভ্যান, সেলাই মেশিন, ছাগল ইত্যাদি কিনে দিতেন তাহলে দেখা যেতো তার একার প্রচেষ্টাতেই পাঁচ বছরে তার এলাকায় অন্ততঃ বিশটি পরিবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছে। ভিক্ষুক ও অভাবী পরিবারের সংখ্যাও কমে আসছে।



উপরে উল্লেখিত বাংলাদেশে যাকাতের খাত হতে প্রাপ্তব্য এই বিপুল অর্থ দিয়ে যেসব ত্রাণ ও পূণর্বাসনমূলক এবং প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান মূলক কর্মসূচী গ্রহণ করা সম্ভব সে বিষয়ে নিচে আলোকপাত করা হলো।





জনকল্যাণমূলক কর্মসূচী



যাকাতের টাকা থেকে যে সব জনকল্যাণমূলক কাজ করা যায় তা নিম্নে আলোচনা করা হলো-





১.বৃদ্ধদের জন্য মাসহারাঃ



এ দেশে সরকারী, আধা-সরকারী ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হতে যারা অবসর নেয় শুধুমাত্র তারাই পেনশন পেয়ে থাকেন । কিন্তু লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবীর বার্ধক্যে কোন আর্থিক সংস্থান নেই। এদের জন্য কিছু করা খুবই জরুরী। অনেক সময় এরা নিজেদের পরিবারের কাছেও হয় অবহেলিত। এদের এই অসহায় অবস্থা দূর করার জন্যে প্রাথমিকভাবে দেশের সকল ইউনিয়ন এবং পৌর কর্পোরেশনের অধিনস্থ ওয়ার্ডের (ইউনিয়ন ৪,৪৫১ ও ওয়ার্ড ৫৮৪টি) প্রতিটি হতে প্রতি বছর যদি অন্ততঃ পঞ্চাশ জনকে মাসিক ১,০০০টাকা হিসেবে আর্থিক সহায়তা দেয়া যায় তাহলে উপকৃত হবে ২,৭১,৭৫০জন। তাদের ন্যুনতম প্রয়োজনের খানিকটা হলেও পুরণ হবে। এজন্য প্রয়োজন হবে ৩০২কোটি ১০লক্ষ টাকা।





২. মৌলিক পারিবারিক সাহায্যঃ



এ দেশের গ্রামাঞ্চলে তো বটেই, শহরতলীতেও বহু পরিবারের মশার আক্রমণ হতে রক্ষা পাওয়ার জন্যে যেমন মশারী নাই, তেমনি শীতের প্রকোপ হতে বাঁচার জন্যে লেপ বা কম্বোল নেই। এর জন্য প্রতি বছর অনেক বৃদ্ধ ও শিশু মৃত্যুবরণ করে। এর প্রতিবিধানের জন্যে যদি প্রতি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড হতে প্রতি বছর কমপক্ষে পঞ্চাশটি পরিবারকে বেছে নিয়ে তাদের একটা করে বড় মশারী ও একটা বড় লেপ দেওয়া যায় তাহলে তারা দীর্ঘদিনের জন্যে মশার আক্রমণ ও শীতের প্রকোপ হতে রক্ষা পাবে। যদি মশারীর মূল্য ২২০টাকা ও লেপের মূল্য ৪৩০টাকা হয় তাহলে এজন্যে প্রয়োজন হবে প্রায় ১৬কোটি ৩৭লক্ষ টাকা।





৩. কন্যা দায়গ্রস্থদের সাহায্যঃ



আমাদের দেশে বিদ্যমান সামাজিক সমস্যা সমূহের অন্যতম প্রকোট সমস্যা মেয়েদের বিয়ে। যৌতুকের কথা বাদদিলেও মেয়েকে একটু মোটা-মুটি সাজিয়ে শ্বশুরবাড়িতে পাঠাবার সাধ থাকলেও সাধ্য নেই হাজার হাজার পরিবারের। এছাড়া বিয়ের দিনের আপ্যায়ন ও অপরিহার্য কিছু খরচও রয়েছে যা যোগাবার সাধ্য অনেকেরই নাই। এসব কারনে বিয়ের সম্বন্ধ এলেও বিয়ে দেয়া হয়ে উঠেনা। পিতা বেঁচে না থাকলে বিধবা মায়ের পক্ষে এই দায়িত্ব পালন করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। যদি দেশের সকল ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে প্রতি বছর দশজন করে মেয়ের বিয়ের জন্যে ৩,০০০টাকা করে দেওয়া হয় তাহলে বছরে ব্যয় হবে প্রায় ১৫কোটি ১১লক্ষ টাকা।





৪. ঋণগ্রস্থ কৃষকদের জমি অবমুক্তকরণঃ



বাংলাদেশের পলী এলাকায় এমন গ্রামের সংখ্যাই বেশি যেখানে বর্তমান ভূমিহীন কৃষকদের অনেকেই কয়েক বছর পূর্বেও ছিল মোটামোটি স্বচ্ছল এবং কৃষি জমির মালিক। কিন্তু পারিবারিক কোন বড় ধরনের ব্যয় নির্বাহের জন্যে ব্যাংক বা গ্রামীন মহাজনের নিকট হতে ঋণ নেয়ার ফলে তার শেষ সম্বল চাষের জমিটুকু বেহাত হয়ে গেছে। মেয়ের বিয়ে, বৌয়ের চিকিৎসা বা প্রাকৃতিক দূর্বিপাকের ফলে শস্যহানীর ক্ষতিপুরনের জন্যে শেষ সম্বল দুই বা তিন বিঘা চাষের জমি তারা বন্ধক রাখে। এসব ঋণ গ্রহীতাদের অধিকাংশই এ ঋণ আর শুধতে পারে না। ফলে তাদের জমি চলে যায় মহাজনদের হাতে। এর প্রতিবিধানের জন্যে যাকাতের অর্থ হতেই এদের সাহায্য করা যায়। যদি প্রতি ইউনিয়নে বছরে পাঁচ জনকে গড়ে ৫,০০০টাকা করে সাহায্য করা যায় তাহলে এতে বার্ষিক ব্যয় হবে ৪৪কোটি ৫১লক্ষ টাকা।





৫. দরিদ্র শিশুদের পুষ্টি সাহায্যঃ



বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে তো বটেই, শহরেও বস্তি এলাকাতে অগনিত শিশু নিদারুন পুষ্টিহীনতার শিকার। ফলে এরা যৌবনেই নানা দূরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। অনেকে সারা জীবনের মতো রাতকানা, স্কার্ভি, গলগন্ড, পাইলস নানা রোগের শিকার হয়ে পড়ে। এর প্রতিবিধানের জন্যে যাদের বয়স দুই থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে তাদের ভিটামিন "এ" ক্যাপসুল, ভিটামিন "সি" ট্যাবলেট, আয়োডিনযুক্ত লবণের প্যাকেট ইত্যাদি সরবরাহ করতে হবে। এজন্যে প্রাথমিক পর্যায়ে যদি প্রতি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে দুই হতে পাঁচ বছর বয়সের ১০০জন শিশুকে বাছাই করা হয় তাহলে বছরে খরচ হবে ৩৬কোটি ২৫লক্ষ টাকা।





৬. প্রসবকালীণ সহযোগিতাঃ



প্রসুতি মাতা ও ৬সপ্তাহ বয়সের মধ্যের শিশুদের মৃত্যু উন্নয়নশীল দেশে/বিশ্বে উঁচুহারে মৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। আমাদের গ্রমাঞ্চলে এখনও গর্ভবতী ও প্রসুতি মায়েদের যথাযথ পরিচর্যা, সেবা-যত্ন ও পুষ্টিকর খাবার যোগানোর ব্যাপারে একদিকে যেমন বিপুল অমনোযোগিতা ও অশিক্ষা বিদ্যমান অন্যদিকে সামর্থের অভাবও রয়েছে। এর ফলে গর্ভবতী মায়েদের শেষের ছয় সপ্তাহে যখন পুষ্টিকর খাবারের বেশি প্রয়োজন তখন তারা তা যেমন পায়না, প্রসবের পরেও সেই অবস্থার কোন উন্নতি ঘটেনা। যদি ঘটনাক্রমে উপর্যুপরি দ্বিতীয় বা তৃতীয় কন্যা সন্তানের জন্ম হয় তাহলে প্রসূতির অনাদর ও অবহেলার সীমা থাকে না। উপরন্তু প্রসবকালে যে পরিচ্ছন্ন ও জীবানুমুক্ত কাপড়-চোপড়, জীবানুনাশক সামগ্রী ও ঔষধপত্র প্রয়োজন দরিদ্র পরিবারে তার খুব অভাব। এর পতিবিধান করতে পারলে গর্ভবতী ও প্রসুতি মায়ের কল্যাণ হবে, তাদের অকাল মৃত্যুর হার কমে যাবে। একই সাথে নবজাতকের মৃত্যুর হারও কমে আসবে। এজন্যে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডপ্রতি যদি ২০টি দরিদ্র পরিবারের গর্ভবতী মাকে বেছে নেয়া হয় এবং ১,০০০টাকা করে সহযোগিতা দেয়া যায় তাহলে বছরে প্রয়োজন হবে ১০কোটি ৭লক্ষ টাকা।





৭. বিধবা/বিকলাঙ্গের কল্যাণঃ



বাংলাদেশে বিধবা এবং নানাভাবে বিকলাঙ্গ হয়ে যাওয়া পরিবার প্রধানদের পরিবারের দূর্দশার সীমা-পরিসীমা নাই। ভিক্ষুকদের মতই এদের জীবন-যাপন অথবা ভিক্ষাবৃত্তিই এদের একমাত্র সম্বল। এদের এই অসহায় অবস্থা দূর করার জন্য প্রাথমিকভাবে দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরকর্পোরেশনের অধিনস্থ ওয়ার্ডের প্রতিটি হতে কমপক্ষে ২০জন করে বিধবা-বিকলাঙ্গ পরিবার বেছে নেয়া হয়, আর এদের প্রত্যেককে বছরে যদি ১,০০০টাকা করে সাহায্য করা যায় তাহলে বার্ষিক ১৭০কোটি ৮৪লক্ষ টাকার প্রয়োজন হবে।





৮. মুসাফিরদের সাহায্যঃ



নিঃস্ব মুসাফিরের জন্যেও আমাদের সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। কারন এ হলো খোদায়ী বিধান। দেশের শহরগুলির মসজিদতো বটেই, থানা পর্যায়ের মসজিদেও প্রায়ই নামাজ শেষে দেখা যায় দু'একজন মুসাফির দাঁড়িয়ে যায় যার সব সম্বল শেষ। চিকিৎসা করতে এসে বাড়ি ফেরার মত টাকা নেই, কাজের খোঁজে এসে কাজ না পেয়ে ফিরতে হচ্ছে খালি পকেটে অথবা দূর্বৃত্তের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব খোয়া গেছে। এদের বাড়িতে ফেরার ব্যবস্থা করা আমাদের শরয়ী দায়িত্ব। বাংলাদেশের প্রধান প্রধান মসজিদগুলোর মধ্যে যদি ৭৮০টি মসজিদকে বাছাই করে নিয়ে মাসে যদি প্রত্যেক মসজিদের মুসাফিরদের জন্যে গড়ে ২,০০০টাকা হারে ব্যয় করা যায় তাহলে প্রয়োজন হবে ১কোটি ৮৭লক্ষ টাকা।





৯. ইয়াতীমদের প্রতিপালনঃ



বাংলাদেশের মতো একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে অনেক ইয়াতীম বর্তমান। তাছাড়া শতাব্দীর ভয়াবহ বন্যায় কতযে শিশু-কিশোর ইয়াতীম ও নিস্ব হয়েছে তার সঠিক চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়। এদের অন্য-বস্ত্র-বাসস্থান ও শিক্ষার জন্যে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা খুবই উপযুক্ত পদক্ষেপ হতে পারে। এজন্যে নতুন ইয়াতীমখানা তৈরী ও ইয়াতীমদের ভরণ পোষন, সঠিক তত্ত্বাবধান এবং সাধারণ শিক্ষা সহ বৃত্তিমূলক প্রশিনের ব্যবস্থা করতে হবে। যদি ১০০জন ইয়াতীমের একটি প্রতিষ্ঠানের জন্যে বার্ষিক ন্যুনতম সার্বিক ব্যয় ১২লক্ষ টাকা ধরা হয় তবে এরকম ৫০টি ইয়াতীমখানার জন্যে বছরে ব্যয় হবে ৬কোটি টাকা।





১০. স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারঃ



দেশের পল্লী এলাকাতো বটেই, শহরতলীতেও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের অভাব প্রকট। হাজার হাজার পরিবারের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও স্বাস্থসম্মত সৌচাগার বানাবার আর্থিক সামর্থ নাই। সেজন্যেই যেখানে সেখানে প্রসাব-পায়খানার কদর্য ও স্বাস্থ্যবিধি বহির্ভূত অভ্যাস আরও বেশি প্রসার লাভ করে চলছে। ফলে সহজেই পানি দূষিত হচ্ছে, সংক্রামক ব্যাধি বিস্তার লাভ করছে, নোংরা পরিবেশের সৃষ্টি হচ্ছে। উপরন্তু গ্রামাঞ্চলে মহিলাদের পক্ষে ইজ্জত-আবরু বজায় রেখে প্রাকৃতিক এই প্রয়োজন পুরন করা খুবই দূরহ। এর প্রতিবিধানের উদ্দেশ্যে দরিদ্র পরিবার সমূহের জন্যে স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের ব্যবস্থা করা খুবই জরুরী। এজন্য প্রয়োজন একটা প্যানসহ স্লাব ও সিমেন্টের দুই বা তিনটা রিং। এজন্য সর্বোচ্চ খরচ পড়বে ৩৫০টাকা। যদি প্রতি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে বছরে ৫০টি করে পরিবারকে এই সুবিধা দেওয়া যায় তাহলে প্রয়োজন হবে ৮কোটি ৮১লক্ষ টাকা।





১১. ইউনিয়ন মেডিকেল সেন্টারঃ



এদেশের পল্লী এলাকায় চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সেবার সুবিধা যে কত অপ্রতুল ও অবহেলিত তা ভুক্তভোগীই মাত্র জানে। এদেশের গ্রামীন জনগন সু-চিকিৎসার অভাবে হাতুড়ে ডাক্তারদের হাতে জীবন সঁপে দিয়ে ধুঁকে ধুঁকে অকাল মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। দেশের এই বৃহৎ জনগোষ্ঠির অধিকাংশই দরিদ্র। এদেরকে সুস্থ্যভাবে বাঁচার সুযোগ দিতে আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা পল্লী এলাকায় পৌছে দিতে হবে। এজন্যে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ন্যুনতম সুযোগ-সবিধা সম্পন্ন মেডিকেল সেন্টার গড়ে তোলা প্রয়োজন। ইউনিয়ন প্রতি গড় মাসিক ব্যয় যদি ২০হাজার টাকা ধরা যায় তাহলে মাসিক ব্যয় দাঁড়াবে ১০৬কোটি ৮২লক্ষ টাকা।





১২. নওমুসলিম পূনর্বাসনঃ



দেশে প্রতি বছরই বিভিন্ন জেলায় কিছু কিছু ব্যক্তি বা পরিবার ইসলাম গ্রহণ করছে। ইসলাম গ্রহণের সাথে সাথেই এরা পারিবারিক সহযোগিতা ও সম্পদ হতে বঞ্চিত হয়। এদের ছেলে মেয়েরাও লেখা-পড়ার সুযোগ পায়না। এদের সম্মানজনক পূনর্বাসনের জন্যে সহযোগিতার উদ্যোগ নেয়া আমাদের দ্বীনি দায়িত্ব। যদি সারা দেশে প্রতি বছর অন্ততঃ পঞ্চাশটি নওমুসলিম পরিবারকে এ উদ্দেশ্যে ন্যুনতম মাসিক ৫,০০০টাকা হারে এক বছর ভাতা প্রদান ও কর্ম সংস্থানের জন্যে এককালীন ১০,০০০টাকা সাহায্য করা যায় তাহলে বছরে ব্যয় হবে ৩৫লক্ষ টাকা।





১৩. মরনোত্তর ঋণ পরিশোধঃ



সহীহ হাদীসে উলেখ আছে "ঋণ রেখে মারা গেলে আল্লাহ শহীদকেও ক্ষমা করবেন না।" ঋণ বান্দার হক, এই ঋণ পরিশোধ না করার গোনাহ আল্লাহ ক্ষমা করবেন না, যতণ পর্যন্ত ঋণদাতা তা ক্ষমা করে না দেয়। সুতরাং ঋণ গ্রহীতা ঋণ পরিশোধ না করে মারা গেলে এবং তার ছেলে-মেয়ে বা উত্তরাধিকারীরা সেই ঋণ পরিশোধে অক্ষম হলে আখিরাতে ঐ ব্যক্তির অন্ততঃ আজাবের আশঙ্কা রয়েছে। তাই ঋণগ্রস্থ দরিদ্র কৃষকের জমি অবমুক্ত করার জন্যে যে ধরনের সহযোগিতার প্রস্তাব ইতোপূর্বে করা হয়েছে অনুরূপ সাহায্য এ ক্ষেত্রেও দেওয়া যেতে পারে। বরং এর ক্ষেত্র অধিক বিস্তৃত। কৃষিকাজ ছাড়াও নানা কারনে লোকে ঋণ নেয় এবং অনেকে তা সাধ্যমত চেষ্টা সত্ত্বেও শুধতে পারে না। এদের মরনোত্তর ঋণ পরিশোধে এগিয়ে এলে অসহায় ছেলে-মেয়ে ও বিধবা পীড়ন ও অসম্মান হতে রেহাই পাবে। উপরন্তু ঋণ যদি জমি বন্ধক রাখার কারনে হয়ে থাকে তাহলে ঋণ পরিশোধের ফলে জমি ফিরে পাবে ওয়ারিশরা। এতেও বিরাট কল্যাণ নিহিত রয়েছে।





১৪. শরনার্থী সহায়তা ও উদ্বাস্তু পূনর্বাসনঃ



বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা সন্ত্রাসের শিকার। স্বদেশ ছেড়ে পার্শ্ববর্তী দেশে আশ্রয় নিচ্ছে অসহায় হাজার হাজার নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ। জীবন বাঁচাবার জন্যে নিরুপায় হয়ে অনেকেই শুধু পড়নের কাপড়টুকু সম্বল করে অজানা গন্তব্যের দিকে পাড়ি জমিয়েছিল, তাদের বর্তমান বিভীষিকাময় ভবিষ্যৎ অজানা ও অনিশ্চিত। লাখো লাখো বনি আদমের সাহায্যে মুসলিম মিল্লাতকেই এগিয়ে আসতে হবে। সেই সাথে যাকাতের অর্থও দিতে হবে আজকের এসব অভাবী ভাই-বোনদের প্রয়োজন পুরনের জন্যে, তাদের পূনর্বাসনের জন্যে। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের পাশাপাশি শীতের ঠান্ডা ও গ্রীষ্মের দাবদাহ হতে রক্ষার জন্য চাই উপযুক্ত আশ্রয়স্থল। এর প্রয়োজন পুরনে যাকাতের অর্থ ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। চাই শুধু প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও যথাযথ পরিকল্পনা।





মানবসম্পদ উন্নয়নমূলক কর্মসূচী





যাকাতের অর্থ দিয়ে বিভিন্নভাবে মানবসম্পদ উন্নয়নমূলক কাজ করা যায়, তার কিছু নিম্নে আলোচিত হল-





১. দ্বীনি শিক্ষা অর্জনে সহযোগিতাঃ



ইসলামী শিক্ষা অর্জন ব্যতিরেকে প্রকৃত মু'মিন হওয়া অসম্ভব। কিন্ত এ দেশে ক্রমেই সেই সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসছে। দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে মাদ্রাসাগুলো কোন রকমে টিকে আছে। স্কুলগুলোর মতো মাদ্রাসাগুলোতে না বই ফ্রী দেওয়া হয় আর না পোশাক (কিছুদিন পূর্ব থেকে অবশ্য নবম শ্রেণী পর্যন্ত বই ফ্রি দেওয়া হচ্ছে)। স্বাভাবিকভাবেই অর্থাভাবে অবিভাবকেরা তাদের সন্তানদেরকে মাদরাসা ছেড়ে স্কুলে ভর্তি করান। মাদ্রাসাগুলোতো ছাত্র-ছাত্রী রাখতে হলে ত

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.