নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমার ভাবনা গুলোই!

দ্য মৃ্ন্ময়

আলো তুমি কোথায়?? তুমি আসো,নিভিয়ে দাও সকল অন্ধকার! খুলে দাও সকল দ্বার,আলোকিত কর আমায়।

দ্য মৃ্ন্ময় › বিস্তারিত পোস্টঃ

পঁচিশের কালো রাত

০১ লা এপ্রিল, ২০১৭ রাত ১১:৪৭


পঁচিশের কালো রাত
এক
রাত প্রায় দু’টো। চারদিকে স্তব্দতা। নিরবতা। দিনের কর্ম-ক্লান্তি শেষে সবাই শান্তির ঘুমে নিদ্রিত। বাড়ির বাইরে একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করছে। কাউকে দেখেছে মনে হয়! কাউকে দেখলেই কুকুরটা ক্রমাগত ঘেউঘেউ করতে থাকে,যতক্ষ্ণ না যায়।
ঘরের সব লাইট অফ। এপাশ-ওপাশ করে, হঠাৎ আয়েশা জেগে উঠলো। চোঁখ-মুখে বিরক্তির ভাব। শান্তির ঘুম নষ্ট হয়ে গেল। কার যেন চিৎকার চেঁচামেচি!
-এই শুনছো, এই!
-রফিক বিরক্তির সুর টেনে, তোমার আবার এতো রাতে হয়েছেটা কি,শুনি?
-আরে শুনছো না, ওই ঘর থেকে চিৎকারের শব্দ আসছে!
-কই? হুম। তাইতো। কে চেচাচ্ছে? বিস্ময়ে তাকালো রফিক।
-কে আবার? , মা।
-আচ্ছা, বুঝলাম না। উনার আবার এত রাতে কি হয়েছে?
-মা মনে হয় আবার সে স্বপ্নটা দেখেছে!
-কোন স্বপ্নটা বলোতো?

দুই
রাহেলা বেগম। বয়স ৬০ বছর। দুই সন্তানের জননী। তাদের দুই সন্তান-ই মেয়ে। আয়েশা আর ফাতেমা। বড় মেয়ে ফাতেমা আর আয়েশা ছোট। বড় মেয়ের কাহিনী ভিন্ন! ছোট মেয়ের বিয়ে হয়েছে। তার এক সন্তান- রুনু। তার স্বামীর নাম রফিক। সরকারী চাকুরে। ছোট মেয়ের পরিবারেই রাহেলা বেগম থাকেন। রুনু কে নিয়ে সারাদিন তার কেটে যায়। মেয়ে এবং মেয়ের জামাই সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত।
রাহেলা বেগমকে নিয়ে বেশি কিছু বলার নাই। তিনি মাঝে মাঝে একটা স্বপ্ন দেখেন। ভয়ার্ত চিৎকারে তিনি জেগে উঠেন। আর সারা রাত ঘুমাতে পারেন না। এটা স্বপ্ন-ভঙ্গের স্বপ্ন। যাক সে কথা পরে হবে!

তিন
রফিক অফিস থেকে বাসায় ফিরেছে। আয়েশা রুনু কে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছে। রুনু কিছুতেই ঘুমাবে না। এই এক জ্বালা, রুনু কে দিনে ঘুম পাড়ানো না গেলে, রাতে না খেয়েই মেয়েটা ছড়ার বই হাতে ঘুমিয়ে পড়বে। না খেয়ে রুনু ঘুমোলে, আবার আয়েশাকে রফিকের কথা শুনতে হবে।
অনেক না –অনুনয় শুনার পর মেয়েটা এবার ঘুমোতে গেল। রাহেলা বেগম পাশের রুমে নামাজ পড়ছেন। সূরা তিলাওয়াতের শব্দ শুনা যাচ্ছে মৃদু সুরে।

-কখন ফিরলে তুমি? আয়েশা জিজ্ঞেস করল।
-এইতো কিছুক্ষ্ণ হল।
-ফ্রেশ হয়ে এসো, আমি চা নিয়ে আসছি।

-আয়েশা চা নিয়ে ফিরল। দুই কাপ চা। রফিক চায়ের পেয়ালায় ঠোট লাগিয়ে জিজ্ঞেস করল-
-আচ্ছা, আয়েশা তুমি তো আমাকে রাতের ঘটনাটা খুলে বলনি?
-কোনটা ঘটনা? বিস্ময়ের স্বরে আয়েশা।
-আরে, ঐ যে রুনুর নানু চিৎকারে জেগে উঠেছিল।
-ও! মনে পড়েছে।

চার
আজ থেকে ৩০ বছর আগে। আমরা থাকতাম বাবার ভাড়া করা ধানমন্ডির-৬ এর বাসায়। আপু তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত- আয়েশা গড়্গড় করে বলে যেতে লাগল।
রফিক চায়ের পেয়ালার মুখ লাগিয়ে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে আয়েশায় মুখের দিকে। শুনছে—
রোকেয়া হলে থাকত আপু। আমাদের বাসায় আমি, আব্বু আর আম্মু। ১৯৭১ সালের পঁচিশে মার্চ। বৃহস্পতিবার। আব্বু-আম্মু প্ল্যান করেছিল শুক্রবার সবাই বেড়াতে যাবো। আব্বু আম্মুর জন্য একটা নতুন শাড়ী কিনে এনেছিল। হলুদ রঙের। হলুদ রঙ ছিল আম্মুর খুব পছন্দ।
রাত নামতেই আমাদের ছোট ঘরটিতে খুশির বান নেমে এসেছিল। কথা ছিল আপু সকালেই হল থেকে বাসায় ফিরবে। আপু আসলেই আমরা রওনা হব। আমার আনন্দে খুশিতে চোঁখের পাতায় ঘুম ছিল না।
আব্বু রেডিও তে খবর শুনছিলেন। দেশের অবস্থা আর আগের মত নেই। শেখ সাহেব নাকি ভাষণ দিয়েছেন। শেখ সাহেব কে তখনো আমার মাথায় ডুকতো না! ঘরে ঘরে দুর্গ ঘরে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। ইয়াহিয়া-ভুট্টোর ষড়যন্ত্র চরম মাত্রায় পৌঁছেছে। এবার একটা ফয়সালা হওয়ার পালা। ঢাকাবাসীকে কড়া সতর্ক অবস্থায় থাকতে বলেছেন। এতোটুকুই বুঝতাম।
আমি বাবার পাশে বসে রেডিও শুনছি। মা এশার নামাজ শেষ উঠে আসলেন। রাত তখন ১০ টা।
-ভাত-সাঝিয়ে রেখেছি, তুমি খেয়ে নিও- বাবাকে , মা বলল।
-আমি ঘুমোতে যাচ্ছি।
বাবা দেরিতে ঘুমোতেই অভ্যস্ত ছিলেন। মা আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে শুবার ঘরে চলে গেলেন। বাবা রেডিও শুনছেন তখনো।

পাঁচ
গল্পের মাঝখানে আয়েশা থেমে গেল। রফিকের বিস্ময়ের ঘোর কিছুটা কাটল। তাকিয়ে দেখল আয়েশার চোঁখ পানিতে টলমল করছে। তবু আয়েশা বলে যেতে লাগল---
মাঝ রাতে হঠাৎ চারদিকে ভয়ার্ত চিৎকারের শব্দে আমি জেগে উঠলাম। আব্বুকে দেখলাম জানালার পর্দা সরিয়ে কি যেন শুনছেন। কান ফেটে যাওয়ার মত তীব্র শব্দ। ঠাস-ঠাস-ঠাস করে কানে আঘাত করতে লাগলো। বিজলির মতো হঠাৎ হঠাৎ আলো দেখা যাচ্ছিল। ঠিক যেন একটা যুদ্ধ। আমি ভয়ে কাতরাতে শুরু করলাম। কান্না করছিলাম, আপুর কথা মনে পড়ছিল। মা একটা ব্যাগে বাবার দেয়া নতুন শাড়ীটা আর আমার কিছু জামা-কাপড় গুছাতে লাগলেন। আব্বু মা’কে বলছিলেন, তাড়াতাড়ি কর। আমি কিছুই বুঝতেছিলাম না ঠিক, কি হতে যাচ্ছে।
তবে আমি এটা জানতাম, আব্বু দেশ স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন। এসব নিয়ে মিটিং-মিছিল করে কয়েকবার পুলিশের খাতায় নামও লিখেয়েছেন। আব্বু আমাদেরকে নিয়ে বাসার ছাদে পানির ট্যাংকিতে লুকিয়ে রাখলেন। মা বারবার আব্বুকে বারণ করছিল, বাসায় ফিরে না যেতে। আমাদের সাথে থাকতে। আব্বু বললেন, তোমাদের কিচ্ছু হবে না, আমি বাসার দিকটা দেখছি।
-তোমরা কিন্তু এদিকে এসো না। আমি এসে তোমাদের নিয়ে যাবো- আব্বু যাবার বেলায় বলে গেলেন।
আমার মনে হচ্ছিল যেন, মাথার উপর দিয়ে বাজ পড়ছে। এই বুঝি আমাদের উপর পড়বে, আমরা ছিটকে পরে মারা যাব। এক অসহ্য যন্ত্রনা। আমাদের বাসার সামনে একটা কালো জীপ গাড়ী এসে থামার শব্দ শুনলাম। ভয়ে ভিতরটা মুচরে উঠল। মা, বারবার দুরুদ শরীফ পাঠ করছিলেন।
আমরা কিছুই দেখছিলাম না। শুনছিলাম শুধু। এদিকে ওদিকে ঠাস –ঠাস শব্দ। বুটের আওয়াজ। টক-টক-টক করে সারা ঘর জুড়ে এমন আওয়াজ। কিছুক্ষ্ণ পরে নিস্তব্দ হয়ে গেল। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম কি না জানি না। এতটুকুই মনে আছে।
রাত কেটে গেছে। আমি আমাকে আবিষ্কার করলাম, মায়ের কোলে। আমার গালে, কয়েকটা পানির ফুটা। দেখলাম মায়ের চোঁখ দিয়ে, গাল বেয়ে উষ্ণ জল পড়ছে। মা, খাটের পায়াই হেলান দিয়ে বসে আছেন। সারা ঘর লন্ড-ভন্ড! কোন কিছুই তার ঠিক জায়গায় নেই।
বাবার চশমাটা মেঝেতে পরে আছে। দেয়ালে টাঙ্গানো শেখ মুজিবের ছবিটা দ্বি-খন্ডিত। বইয়ের তাকের রাখা বইগুলো এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে এদিকে-ওদিকে।
সবই আছে, তবে এলোমেলো। শুধু আব্বু নেই। কোথায়?
মাকে প্রশ্ন করেছি বারবার, মা নিশ্চুপ। পৃথীবির সকল উত্তর ব্যর্থ!



ছয়

তারপর কি হল? ফাতেমার কি হল?- রফিক আগ্রহের সুরে জিজ্ঞেস করল।
আয়েশা আচঁল দিয়ে চোঁখের জল মুছে আবারো বলতে লাগল—
সকাল দশটায়, আপুর হল থেকে আব্বুর নামে একটা চিঠি আসল। চিঠি খুলতেই যা লেখা পেলাম, এমনটা যে হবে কখনোই ভাবিনি। মা’ চিৎকারে-কান্নায় মাটিতে গড়াগড়ি দিতে লাগলেন—
মনে হয়েছিল, এসব শুনার আগে মরণ হল না কেন?
ফাতেমা আপুকে পাকিস্তানিরা হল থেকে ধরে নিয়ে গেছে। সাথে আরো অনেক মেয়ে। সারা রাত অকথ্য নির্যাতন, বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে হত্যা করেছে। শুধু রোকেয়া হল নয়, জানতে পেরেছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো অনেক হলের ছেলে-মেয়েদের ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়েছিল সেই রাতে। হল কর্তৃপক্ষ খবর পাঠিয়েছেন, লাশ খুঁজে নিয়ে আসার জন্য!
অনেক কষ্টে আপুর লাশটা খুজে পেয়েছিলাম। মার চোঁখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছিল আপুর লাশের অবস্থা দেখে। দেখলাম আপুর মাথার চুল ছিড়ে ফেলা হয়েছে, পেট ফুলে অনেক উপরে উঠে গেছে, যোনিপথ রক্তাক্ত। একটা চাদর দিয়ে লাশ টাকে ঢেকে নিয়ে আসলাম বাসায়।
এসব বলতে গিয়ে, ঝরণার মত পানি বেয়ে আসছিলো আয়েশার চোঁখ থেকে। কথা থেমে যাচ্ছিল বারবার। তবুও কান্নার সুরে আয়েশা বলতে লাগল—
আব্বুকে আর খুজে পাইনি। মিলিটারিরা কোথায় ধরে নিয়ে গেছে জানিনা।অনেক খুঁজাখুঁজি করেছি। কোন সন্ধান পাইনি। সেই থেকে তিরিশটা বছর ধরে মা অপেক্ষা করেছেন। হলুদ শাড়িটার ভাজ আজও খুলেন নি আব্বু আসবে বলে!
আর এই স্বপ্নটাই মা দেখেন। মা দেখেন বাবা ফিরে এসেছেন, ফাতেমা আপু হল থেকে বাসায় ফিরেছেন। মা, হলুদ শাড়ী পড়ে বাবার সামনে দাড়িয়েছেন। বাবা, মা’র শাড়ি পরা নিয়ে আমাদের দু’বোনের সাথে কৌতুক করছেন। হাসিতে-আনন্দে আমরা ভেসে যাচ্ছি। মা, আমাদের দিকে রাগ চোঁখে তাকিয়ে আছেন, বাবার পক্ষ নিয়েছি বলে।
কিন্তু এসব যে আজও স্বপ্ন-ই। একটা হাহাকার-ই রয়ে গেছে, এ্টা ভেবেই মা,ভয়ার্ত চিৎকারে জেগে উঠেন, সেদিনের রাতের সব-হারানোর কথা মনে করে। ঘৃণায় আর রাগে তার চোঁখে জলের ঝরণা ধারা বয়ে যায়। সারারাত তিনি আর ঘুমোতে পারেন না। তিরিশটা বছর ধরে মা এমন স্বপ্ন দেখেন---





সাত
-আয়েশা, এই আয়েশা! রুনু কান্না করছে শুনছিস? রাহেলা বেগম জায়-নামাজে বসে চেচিয়ে বলছেন।
রাহেলা বেগমের ডাকে আয়েশার ঘোর কাটল। আয়েশা চোঁখ-মুখ মুছে তাকালো রফিকের দিকে। এই কথা গুলো বলার সময় একবারো সে রফিকের দিকে তাকাতে পারেনি। আয়েশার হাতের চা, চা-ই রয়ে গেল। ভরা কাপ। এক চুমুকও সে দিতে পারে নাই। চা জুড়িয়ে গেছে।
তুমি চা খাও। রুনু উঠে গেছে ঘুম থেকে। আমি গেলাম- আয়েশা বলল।
রফিক নিস্তব্দ চোখে আয়েশার যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইল। কি যেন বলতে চাইছিল। থেমে গেছে সব কথা!
চায়ের কাপটা আর শেষ হল না। হাতের কাপটা ট্রে-তে রেখে, সে ব্যালকনিতে গিয়ে দাড়াল।
কিছু ভাবতে পারছে না রফিক! তাকিয়ে আছে-
নিচে আয়েশা রুনুর কান্না থামানোর চেষ্টা করছে।

মন্তব্য ২ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (২) মন্তব্য লিখুন

১| ০২ রা এপ্রিল, ২০১৭ রাত ১:৪৭

অতঃপর হৃদয় বলেছেন: অনেক সুন্দর ছিল লেখাটি

০২ রা এপ্রিল, ২০১৭ সকাল ৮:১৭

দ্য মৃ্ন্ময় বলেছেন: ধন্যবাদ ভাই।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.