| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
মুজতাহিদ জাহিদ
বাস্তবতা আমাকে ভাবায়.।.।অন্যায় আর ক্ষমতার দাপটে পিষ্ট মানবতা.।।আমি সেই শোষনের কথা বলি.।স্বাধীনতার কথা লিখি.।।।আমার লেখাতে ফুটে উঠুক মানবতার তৃপ্ত জয়োল্লাস!!
'অহনা' নামে কেহ থাকিতে পারে তাহা না জানিবার মূল কারণ হিসেবে যাহা লিপিবদ্ধ করা যাইতে পারে তাহা হইতেছে, আমি এই নামের কেহকে পূর্বে চিনিতাম না । তবে বন্ধুদের নিকট যখন তাহার কথা বলিলাম তখন নানা রকমের মন্তব্য হজম করিতে হইল রীতিমত ।কেহ বলিল,"আরে এই নাম শুনিস নি?আমার ছোট বোন..." কেহ বলিল,"আরে আমার বাসার পাশে..."কেহ বলিল,"মোতালেব স্যারের মেয়ের সাথে যে পড়ে তাহার নামও..."- এরূপে দশজন বন্ধুর মধ্য হইতে কমপক্ষে পনেরজন 'অহনা'র সন্ধান পাওয়া গেল ।তবে যাই হোক। পাঠকের ইতোমধ্যে বোঝবার বাকি নাই যে, যাহার কথা বলিতেছি তাহার নাম 'অহনা' ।
অহনার সহিত আমার কিভাবে পরিচয় হইয়াছিল তাহা বলিতে গেলে গল্প অত্যধিক পরিমাণে বড় হইয়া উঠিবে ।আজকাল বড় গল্প কেহ পড়িতে চাই না ।'কুদ্দুস আলীর হাসির ভাণ্ডার' অথবা 'চুলের যত্নে হরিতকি' রূপ চটিবই এই জাতি যতটা আগ্রহ নিয়া পড়িয়া থাকে তেমন আগ্রহ নিয়া যদি সুনীলের 'পূর্ব-পশ্চিম'খানা পড়িত তবে আর বলিবার কিছু থাকিত না।তবে পাঠকের প্রয়োজনে বলিতেছি,অহনারা আমাদের বাসার পাশেই থাকিত ।বয়সে আমার চেয়ে খানিকটা ছোট হইলেও কোনো একভাবে তাহার সহিত আমার বন্ধুত্ব হইল এবং সেই বন্ধুত্ব বাংলা সিনেমার মতই প্রেমের রূপ ধারন করিল ।তখন আমি মাত্র কলেজে পড়ি ।পাড়ার লোকে যদি এ ব্যাপারে কিছু টের পাইয়া যায় তবে আমার বত্রিশ পাটি দন্তের সহিত যে বত্রিশ গোষ্ঠী উদ্ধার হইয়া যাইবে তাহাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নাই ।তাই কখনও কলেজ হইতে ফিরিবার পথে কাগজ দিয়া প্লেন বানাইয়া ছুঁড়িয়া মারিয়া,কখনওবা বাড়ির বেড়ার আশপাশ দিয়া উঁকিঝুকি মারিয়া,আবার কখনও তাহার স্কুলের পেছনের গেটে দাঁড়িয়া থাকিয়া আমি তথা আমরা যোগাযোগ রক্ষা করিতাম ।নববর্ষ কিংবা উৎসবের দিন আমরা যখন চুরি করিয়া বের হইতাম তখন এই দুনিয়ার নানা আজগুবি কীর্তি-কারবার আমাদের রীতিমত অবাক করিত বারবার ।মফস্বলে থাকিতাম তাতে কি , নদীর পাড়ে,পার্কে কিংবা নিবিড় নির্জন কোনো জায়গা পাইলেই আমাদের তথাকথিত প্রেমিক-প্রেমিকারা তাহাদের অতিব মূল্যমান ভালবাসা-ভালবাসা খেলা খেলিত ।সত্যি কথা বলতে কি এই ভালবাসা-ভালবাসা খেলাটাই আমি আর অহনা সর্বাধিক পরিমাণে উপভোগ করিতাম ।বড় বড় ভাই-হবু ভাবীরা একে অপরের হাতে হাত রাখিয়া আকাশের পানে তাকিয়া থাকিত ।তাহারা আকাশের পানে তাকাইয়া যে কী খুঁজিত তাহা আমি আর অহনা বিস্তর চিন্তা-ভাবনা করিয়াও খুঁজিয়া পাইতাম না ।তবে আবার কাহাকে দেখিতাম একখানা আরসি কোলার বোতল লইয়া তাহার ভেতরে দুইখানা পাইপ ঢুকাইয়া টানিতে থাকিত ।কিছুক্ষণ পর সেই পাইপযুগল একজন আরেকজনের সহিত পরিবর্তন করিয়া আবারও টানিত ।ব্যাপারখানা আমার খুব মনে ধরিল । অহনার নিকট প্রস্তাব তুলিতেই সে তাহার নিকোশ পাঁপড়ি মোড়ানো মায়াবী চোখদুটো হইতে দিয়াশলাইয়ের কাঠির মতই হঠাৎ করিয়া অগ্নি ঝরাইল ।পরমুহুর্তেই রাগে ফুঁসফুঁস করিতে করিতে সেই স্থান ত্যাগ করিল ।তাহার অভ্যাস,একজনের মুখের জিনিস কখনই খাইবে না ।তো আর কি করার । অতঃপর মুখখানাকে পেঁচার মত করিয়া বিড়বিড় করিতে করিতে আমিও তাহার সহিত চলিতাম ।যাইবার পথে তাহাকে বারবার দেখিতাম ।কে বলিবে এই কোমলসত্তায় কখনও ছেলেমানুষীর অবসান হইবে কিনা...তাহার দৈহিক বয়স বাড়িতেছে ঠিকই কিন্তু সেরূপে মনের বয়স আর বাড়েনা।
আমার আবার একটু-আকটু লেখালেখির অভ্যাস ছিল ।আর অহনা এই ব্যাপারখানা প্রচণ্ড পরিমাণে পছন্দ করিত ।একদিন বলিলাম,"অহনা,তোমাকে নিয়া একখানা কবিতা লিখিয়াছি । শুনিবে?" বলল,"শোনাও" । আমি ছড়া কাটিবার মতই বলা শুরু করিলাম,"তুমি আমার অহনা
হৃদয়ের গহনা
দূরে সরে যেও না
ভেঙ্গে প্রেমের মোহনা"
তখন তাহার দিকে তাকাইয়া দেখি,সে আমার দিকে বিদ্যুতের খুঁটির মত নিথর হইয়া তাকাইয়া আছে ।কিছুক্ষণ পর নিরবতা ভাঙ্গিয়া সে নিজেই বলিয়া উঠিল,"এটা কিছু হইল???হিঃহিঃহিঃ..."তারপর সেই উচ্চঃস্বরে হাসি.........যেন এই মাত্র রাজা পঞ্চম জর্জকে হারাইয়া ব্রিটিশ সাম্রাজ্য দখল করিয়া আসিল ।আমি তাহার দিকে কেবল অপলক তাকাইয়া আছি ।মানুষ যখন অতিশয় আনন্দ পায় তখন হাসি দিয়া আর যখন অতিশয় দুঃখ পায় তখন অস্রু দিয়া তাহা উদগীরণ করে ।কখনই তাহার নিজ শরীর সেই অনুভূতি হজম করিতে পারে না ।এই অহনা মেয়েটাকে আমি অনেক কাছ হইতে দেখিয়াছি ।তাহার জীবনে শুধু আনন্দেরই উদগীরণই দেখিয়াছি,দুঃখ দেখি নাই ।তাহার দুঃখের কথা পরে হইবে ।তো ঐ সময় তাহার হাসি থামাইয়া দিয়া বলিলাম,"আমি ঐ ছড়া বলেছি বলেই তুমি এতটা হাসিতে পাড়িয়াছ ।যদি বলিতাম,অহনা শোনো,
ঐ নীলগিরি পারাবার জয় করলে দুঃখ কি থাকে কোনো?
অহনা শোনো,
রাতের জোনাকী আলো দেখিয়েছে ভয় কি রয়েছে এখনও?
অহনা শোনো,......
-"থাক,আর শুনতে হবে না ।আমি জানি তুমি ভালো লেখ ......" তারপর একখানা আবেগপূর্ণ মায়াবী মুচকি হাসি দিল ।সেই কাজল মাখানো চোখের অবিরত মধুবর্ষন,গোলাপী ঠোঁটের প্রান্ত ঘিরিয়া এক বাঁকা চাঁদ যেন আমার হৃদয়ের সব শিরা ধমনী একাকার করিয়া রক্তের বদলে এক ভিন্নধর্মী অনুভূতি সংবহন করিতেছে,আর খোলা আকাশের নিচে ঐ খোলা চুল আজ নিজের সহিত যেন আমাকেও দোলাইতেছে অনবরত ।এই অপরুপ হাসির মূল্য আমি কি করিয়া দিব?
এতদিন ধরিয়া যে অহনা আমার হৃদয়ে বসত করিতেছে তাহার কিন্তু আরেকখানা পরিচয় আছে ।আর তাহা হইতেছে সে অতীব দরিদ্র ঘরের মেয়ে ।বাবা-মা তাহাকে বহু কষ্ট করিয়া লেখাপড়া শিখাইতেছিল সত্য কিন্তু সেই খরচ বহন করিবার পর যে তাহাদের আর কিছু অবশিষ্ট থাকিত না তাহাও আমি বৈ আর কেহ জানিত না ।একদা আমার এক জন্মদিনে সে আমাকে কোনো উপহার দিতে পারে নাই বলিয়া তাহার কান্না বাধ ভাঙ্গিয়াছে ।তাহাকে কোনোরূপেই থামানো যাইতেছিল না ।কান্না থামানোর এই যুদ্ধে আমি যখন হার মানিয়া বসে বসে দীর্ঘশ্বাস ছাড়িতেছিলাম তখন সে নিজেই আমাকে প্রস্তাব করিয়া বসিল,"আমি তোমাকে একখানা গান শোনাই?"আবেগের আচ্ছাদন তাহার চোখে-মুখে তখন প্রতিভাত হইয়াছে ।এমন সুযোগ কেহ ছাড়িতে চাই?অবশেষে আমি তাহার গান শুনিলাম এবং সেই গান শুনিয়া আমি নিজেই নিজের গালে তিনখানা চড় মারিলাম ।প্রথম চড়খানা এই অধম আমার নিজের জন্য,দ্বিতীয় চড়খানা এই অহনার গানের জন্য এবং তৃ্তীয় চড়খানা অহনা এত সুন্দর গান গায় তাহা আমি কি করিয়া এতদিন বুঝিলাম না, সেই সময়ের জন্য!নিজের কাছেই নিজেকে খুব ছোট মনে হইতেছিল ।আর কোনো সন্দেহ নাই যে এই গানটাই ছিল আজ আমার জন্মদিনের সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার ।
অতঃপর এভাবেই দিন যাইতেছে,রাত হইতেছে,আকাশে চাঁদ উঠিতেছে,জোৎস্না ছড়াইতেছে এবং সেই জোৎস্না দেখিতে দেখিতে আমি আর অহনা বড় হইয়া গেছি ।আমাদের পারিবারিক কোনো সমস্যা যেহেতু হইবেনা সেহেতু আমরা এখন বিবাহ করিব ।কিন্তু বললেই তো আর বিবাহ করা সম্ভব নয়;বিবাহের জন্য টাকা-পয়সা লাগিবে,আয়োজন লাগিবে,কাজী লাগিবে এবং আমার উপস্থিতি লাগিবে ।কেননা তখন আমি লন্ডনে, এফসিপিএস ডিগ্রি অর্জনের জন্য নিয়মিত মাথা ব্যাথা বানাইতেছি ।একবছর পর দেশে ফিরিয়া যাইব এবং আমরা বিবাহ করিব ।বিবাহের কথা চিন্তা করিতেই মনটা কেমন গেছো ব্যাঙ-এর মত লাফ দিয়া উঠিতেছে ।তো যাই হোক ।লজ্জার কথা এরূপে বলিতে হয় না ।অবশেষে এক বছর পেরোল এবং আমি বাড়ি ফিরিয়া আসিলাম ।তারপর......
তারপর............যাহা ভাবিতেছেন তাই......আমাদের আর বিবাহ হইল না।কারণ এক মরণ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হইয়া অহনা মারা গিয়াছে ।তখন দেশে এই ডায়রিয়ার মহামারী চলিতেছে ।আর অহনার বাবাও এত সামর্থবান ছিলেন না যে তাহার মেয়ের উন্নত চিকিৎসা করাইবেন,যেখানে দুবেলা দুমুঠো ভাতই জোটে না মুখে ।ক্রোধের আগুনে জ্বলিতে জ্বলিতে যখন তাহার নিকট অহনার কথা জিজ্ঞেস করিয়াছিলাম তখন তাহার এই দুর্বল রোগে জর্জরিত দেহ কিছু কান্নার ঝর্ণা ছাড়া আর কিছুই প্রকাশ করিতে পারিল না ।কী আর বলিব কষ্টের কথা ।অহনার কবরের পাশে দাঁড়াইয়া কেবল ভারী এক দীর্ঘশ্বাসই আমার সব অনুভূতিটুকু প্রকাশ করিতে ব্যাকুল ।
********************************
আজ আমি মেডিসিনের ডাক্তার বটে ।প্রতিদিন আমার চেম্বারে শত শত ডায়রিয়ার রোগীর ছড়াছড়ি ।সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কত রোগীকেই না চিকিৎসা দিয়া থাকি,বিনামূল্যে ।মাঝে মাঝে অপেক্ষাগারে ঢুকিয়া সেইসব রোগীদের দেখিয়া আসি ।এত ভীড়.........কিন্তু সেই ভীড়ের মাঝে আমার অহনা নাই ।আমার ভালবাসা নাই......।।
(গত ২৫-০৩-০৪ দৈনিক প্রথম আলোর একখানা খবর পড়িয়া চমকিয়া উঠিলাম ।অহনা নামের এক মেয়ে ডায়রিয়াজনিত কারণে মারা যায় ।আমাদের লেখকরা তাহাদের লেখায় যদি কখনও নায়িকাকে মারিয়া ফেলিতে চান তবে ব্রেইন টিউমার অথবা ব্লাড ক্যান্সারের সাহায্য নিয়া থাকেন ।অথচ আমাদের এই দেশে এই কারণে অকালে ঝরে যাওয়া কিশোরীর সংখ্যা মাত্র ৬%,যেখানে ডায়রিয়া,টাইফয়েড কিংবা জণ্ডিসের মত পানিবাহিত রোগের দ্বারা ঝরে যাওয়া কিশোরীর সংখ্যা ২৪% ।কিন্তু তাহাদের নিয়া তথা অহনাদের নিয়া কেউ লেখে না ।আমি বাস্তবতার কবি......তাই তাহাদের নিয়া লেখি......লিখিতে হয়।এই মুহুর্তে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হইয়া যাহারা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতেছেন তাহাদের জন্যে উৎসর্গীকৃ্ত.......)
©somewhere in net ltd.