নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

যুক্তির প্রান্তরে শুনি জীবনের জয়গান

মুজতাহিদ জাহিদ

বাস্তবতা আমাকে ভাবায়.।.।অন্যায় আর ক্ষমতার দাপটে পিষ্ট মানবতা.।।আমি সেই শোষনের কথা বলি.।স্বাধীনতার কথা লিখি.।।।আমার লেখাতে ফুটে উঠুক মানবতার তৃপ্ত জয়োল্লাস!!

মুজতাহিদ জাহিদ › বিস্তারিত পোস্টঃ

সময়ের প্রয়োজনে.

১১ ই জুন, ২০১৩ দুপুর ১:৪৫

মাঝে মাঝে অদ্ভূত এই জীবনের কঠিন কিছু প্রশ্নের উত্তরে বিস্মিত হতে হয় রীতিমত ।স্থান,কাল,পাত্রভেদে সেই প্রশ্নগুলো হয়ত কালের স্রোতে হারানো অযুত সময়ের মূ্ল্যবান কিছু মুহূর্তের মতই গুরুত্বের গাম্ভীর্য বহন করে ।কিন্তু......ভাগ্য!!সেই প্রশ্নের উত্তর কখনই পায় না মানুষ ।আজ আমার প্রশ্নটা কি তার কাছে এমনই ঠেকল?কিছুক্ষণ উদাস হয়ে সে কোন পৃথিবীর কবিতায় হারিয়ে গিয়েছিল জানিনা ।তবে নীরবতা কাটিয়ে একসময় বলল,"না" ।আমি তার দিকে হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছি শুধু ,অবাক হওয়া শিশু যেমন তাকিয়ে থাকে কোনো অজানা বস্তুর দিকে কৌতুহলী চোখ নিয়ে,যা তার কাছে অদ্ভূত মনে হয়;ঠিক তেমনই ।নীরবতা কাটিয়ে আমি আবারও ছুঁড়ে দিলাম প্রশ্ন,"বিয়ে করনি কেন? ।"



-"ওটা তোমার মেয়ে বুঝি?খুব সুন্দর ।দেখতে ঠিক তোমার মতই!"তারপর...সদ্য ফোটা পদ্মের মত একটা মুচকি হাসি দিল সত্যি,কিন্তু সেই হাসির সাথে যে মিশে আছে কত না পাওয়ার যন্ত্রনায় আকুল অবুঝ মনের ছোট ছোট ক্ষোভদানাগুলোর চিবুক চিড়ে বেড়িয়ে আসা সহস্র অশ্রুজল, হৃদয়ভাঙ্গার ব্যাথায় দগ্ধ এই অধম তনুর প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে এখন বাঁধভাঙ্গা ধিক্কার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে......আর এই হাসি যে সেই অসহ্য বিষম অনুভূতিরই নিঁখুত আত্নপ্রকাশ তা বুঝতে আমার দেরি হল না আজ এতটুকুও ।







লেখালেখির অভ্যাসটা আমার আগে থেকেই ছিল ।কিন্তু এই লেখা যে আমার জীবনের খাতায় এমন এক গরল সমীকরণ উপস্থাপন করে দিয়ে যাবে,যে সমীকরণের সমাধান করতে গিয়ে আমাকে হিমশিম খেতে হবে প্রতিনিয়ত তা কি আর ভেবেছিলাম কখনও! ফেসবুকে একবার আমার একটা লেখা ছাপা হয় ,ব্যাপক সাড়াও ফেলে ।তবে সেই লেখা পড়ে কোনো মেয়ে আমাকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠাবে...এটা ভাবনার বাইরে ছিল ।তো যাই হোক ।মেয়েটা ছিল উপজাতি ।তাই আমার আগ্রহটা যে একটু বেশি ছিল তা বলার অবকাশ রাখে না ।







মেয়েটির নাম ছিল মোমো ।মারমা 'মোমো' শব্দের অর্থ 'বৃষ্টি' ।প্রথম যখন ওর কণ্ঠে এই অর্থটি শুনি,খুব ভাল লাগছিল তখন ।কারণ বৃষ্টি আমার অনেক পছন্দের ।আর এর একটি নাম অন্য ভাষায় জেনে নেওয়া তো কম কথা না ।আরও কত সব শব্দার্থ যে শিখলাম তার ইয়ত্তা নেই ।তো এভাবেই গল্প করতে করতে আমরা ভালো বন্ধুও হয়ে গেলাম।আর আমার লেখালেখিতে তার পৃষ্ঠপোষকতা ,বস্তুতঃউপজাতিদের প্রতি আমার চিরকালের দুর্বলতা বন্ধুত্বের সেই সীমানাটিকে প্রসারিত করার কাজে প্রভাবক হিসেবে কাজ করছিল বলা যেতে পারে ।এভাবেই দিনগুলি পার হতে থাকে ।এদিকে আমার একটি বইও বেরিয়ে গেল ।লেখাপড়ার এই বদ্ধ জীবনের শত ব্যস্ততার মাঝে একটা বই লিখে ফেলা সাধারণ কথা না ।মোমো এইচ.এস.সি পরীক্ষার পর আর পড়াশুনা করে নি ।এলাকায় একটা ছোট স্কুলে শিক্ষকতা করে,বান্দরবানে ।ভারী আজ়ীব মেয়েটা!!বাবা মা'র একমাত্র সন্তান,তাই কিছু বলতেও পারে না ।তবে আমার কাছে মেয়েটাকে ভীষণ ভাল লাগে ।সব সময় কম করে, আস্তে আস্তে কথা বলত ।কণ্ঠস্বরটাও ছিল খুব মিষ্টি ।মাঝে মাঝে ফোনে কথা বলতে গিয়ে অবাক হতাম ।এত সুন্দর করে কেউ কথাও বলতে পারে!!







একবার মোমোদের এলাকায় সাংরাই উৎসব ছিল । মারমারা প্রতিবছর এই উৎসবটির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে । মূলত, এটি হচ্ছে পানি মারার উৎসব ।এই সময় যে যার গায়ে যত পারে পানি মারতে পারবে,তখন নেই কোনো শত্রু,নেই কোনো দুশমন ;নেই ছোট, নেই বড় ।ভেদাভেদ ভুলে বছরের এই দিনে সবাই মুছে ফেলে বছরের মাখা কালিমা,ঘুচে সব জরা জেগে উঠে এক নব প্রাণের উন্মাদনায়,ব্যাপারগুলো মোমোর কাছ থেকেই জানা ।তবে সবচেয়ে অবাক হলাম যখন সেই অনুষ্ঠানে আমাকে দাওয়াত করে সে ।তো আগেই বলেছি উপজাতিদের প্রতি আমার আগ্রহটা একটু আগে থেকেই ছিল ।আর তাই বাবাকে বলে ম্যানেজ করে গাড়িটা নিয়ে তিনদিনের জন্য বের হয়ে গেলাম বান্দরবানের উদ্দেশ্যে ।আমাকে রিসিভ করার জন্য সে শহরেই এসে বসে আছে ।যখন পরিচয় পেয়ে জানলাম সে'ই মোমো,কিছুক্ষণের জন্য যে কোথায় হারিয়েছিলাম নিজেও জানিনা ।তার ছবি ছিল না ফেইসবুকে,কখনও দেখার ইচ্ছেও পোষণ করিনি ।তাই বলে যে বিধাতা আমার জন্য এমন এক মুহুর্তের সম্মুখীন করবে তাও তো চিন্তা করিনি কখনও ।আমি পুরো সময় শুধু তার দুটো চোখের দিকেই তাকিয়ে আছি ।বিধাতা ওদের চোখগুলো তেমন বড় করে তৈরি করে নি;আর তাই হয়ত অতিরিক্ত মায়া দিয়ে তা পরিপূর্ণ করে দিয়েছে ।সেই আলতো নিষ্পাপ চোখের মাঝে যে লুকিয়ে আছে বাধভাঙ্গা জলরাশির মাঝ থেকে ছুটে আসা একরাশ জলচ্ছটার শীতল কাঁপন,দিগন্তের খাঁচাছাড়া অদম্য ছুটে আসা বুনো বাতাসের নিদারুন শিহরণ,আর শান্তির পারাবতের কোমল পালকের মতই যেন সেই আনমনে অনুভূতি আমাকে অবুঝ শিশুর মতই অদ্ভূত কোনো নগরের সন্ধান দিল, এ বেলায় আরও একবার ।







মোমোদের বাড়িতেই ছিলাম আমি ।অতিথিদের আপ্যায়নের কোনো শেষ রাখে না মারমারা ।আমার জায়গা হয়ে গেল বাঁশের চাঁচে ঘেরা অত্যন্ত সুন্দর একটি ঘরে ।পরেরদিন শুরু হল সাংরাই ।একজন হুঁইসেল দিল, অমনি সবাই বালতি,মগ যা পারে তাই নিয়ে ভেজাতে লাগল একে অন্যকে ।এ যেন এক অপরূপ দৃশ্য,নিজের কাছে খুব গর্বিত লাগছিল ভেবে যে, এই সুন্দর আয়োজনের আজ আমিও এক দর্শক !কিছু বুঝে উঠার আগেই এক ঝটকায় আমার সারা শরীর ভিজিয়ে দিল মোমো ।আমি তখন তো কেঁদেই বাঁচিনা ।রাগে,দুঃখে আমিও একটা বালতি নিলাম ।পালানোর চেষ্টা করেও রেহাই পায়নি মেয়েটা ।



বিকেলে আমরা ঘুরতে বের হলাম দূরের পাহাড়ের দিকে ।মোমোর গায়ে থামি,গাড় নীল রঙের এই থামিতে আঁকা আল্পনা শুধু মোমোর শরীরের ঐ মধুময় দেহলতাকে আমার হৃদয়ের সাথে একাকার করেই ক্ষান্ত হয়নি,বরং সেই আল্পনা কল্পনার চাদরে বান্দরবানের এই অপরূপ প্রকৃ্তির সাথেও মিশে একাকার হয়ে গেছে ।পাহাড়ের ঢালু থেকে নেমে গেছে বিশাল উপত্যকা ।তারই কোনও এক স্থানে একটা বেঞ্চে বসে আমরা দুজন ।আমি কেবল অপলক তাকিয়ে আছি তার দিকে ।মায়া হরিণীর মত সেই কালো দুটো চোখ,কপালের লাল টিপ,আর ওপাশ থেকে আসা বুনো বাতাসে এলোমেলো হয়ে যাওয়া সেই লম্বা চুল-এসবই যেন তার শুভ্র চেহারাটির মায়া আজ শতগুনে বাড়িয়ে দিচ্ছে বারবার ।তাই কখন সন্ধ্যা হল বুঝলাম না ।পাহাড়ের পাশ কেটে চাঁদটা তখন ইচ্ছে করেই হয়ত আরো আবেগ আর ভালবাসা নিয়ে উঠে বসল ।অনেকক্ষণ গল্প করে ঘরে ফিরলাম আমরা ।



পরের দিন বিদায় নিতে খুব কষ্ট হচ্ছিল,বিশেষ করে মোমো যখন আমার হাতদুটো ধরে ছিল ।জানতাম,ও আমাকে অনেক আগে থেকেই পছন্দ করত,আমিও যে করতাম না তাও বা কি করে বলি ।তবে বাস্তবতা......বারবার সেই ভাললাগা,ভালবাসাকে ধিক্কার দিয়ে গেছে ।তাই......জ়ীবন হয়ত এমনই...হাতদুটো ছাড়িয়ে বললাম,"মোমো,এটা সম্ভব নয় ।"







অনেক দূর এসে পড়েছি ।তবু গাড়ি থামিয়ে কি যেন কি ভেবে পাহাড়ের পাশে ঘাসের উপর বসে পড়লাম।সারা দেহ কেমন এক অদ্ভূতরকমের কাঁপুনি হচ্ছিল ।হঠাৎ লক্ষ্য করলাম পেছনে কেউ আছে ।পেছনে ফিরতেই অবাক!"মোমো,তুমি?এত দূর কি করে এলে?"..."আমি জানতাম,তুমি থামবে ।"কি থেকে কি বলব তখন কিছু খুঁজে পাচ্ছিলাম না।তার নিষ্পাপ দুটো চোখ আবারও আমাকে শিহরিত করছে ।কিন্তু মুখ ফুটে বলতেও পারছিনা,"মোমো,আমিও তোমাকে ভালোবাসি ...!!" কিছু বলতে যাব, এমন সময় বিবেক যেন হুংকার ছেড়ে বলে উঠল,"জাহিদ,আবেগের কাছে হেরে যাস না যেন!"......ওপাশ থেকে বাস্তবতা বলে উঠল,"খামোশ!!মেনে নিবে না তোর বাবা-মা ।তাদের পানে একবারও চেয়েছিস?বিসর্জন দিবি ধর্ম?বিসর্জন দিবি জাতি?বিসর্জন দিবি গর্ভধারিণীর ভালবাসাকে এই ভালবাসার কাছে?..এটা ভালবাসা না...সময়ের প্রয়োজন....।"জাতিবিভেদ আর ধর্মের দোহাই দিয়ে বারবার পিছিয়ে পড়ছি আমি ।আর কিছু ভাবতে পারছিলাম না তখন ।অপরাধীর মত মোমো তাকিয়ে আছে আমার দিকে ।জীবনের কঠিন এই প্রশ্নগুলো আমাকে রীতিমত গ্রাস করছে এই নীল আকাশের নিচে,ঘাম ঝরাচ্ছে অবিরত ।কিছুক্ষণ পর কোনো উত্তর না পেয়ে মাথা নিচু করল মোমো ।তারপর...তারপর ওকে আবার বাড়ি পৌঁছে দিয়ে চলে এলাম ঢাকায় ।







*********************************







আজ অনেকদিন মোমোর কোনো খোঁজ জানতাম না ।যোগাযোগের সব কিছু বন্ধ করে কোথায় যে হারিয়েছিল মেয়েটা !আমি এদিকে বিয়ে করলাম ।একটা মেয়েও হল,নামঃবর্ষা।আর সেই বর্ষাকে ফেলে রেখে চলেও গেল তার মা সড়ক দূর্ঘটনায়,না ফেরার দেশে ।আজ এত বছর পর মেয়ে বর্ষাকে নিয়ে ঘুরতে এলাম রাঙ্গামাটি ,মোমোর স্কুলে ।আমার মেয়েটিকে দেখে সে কোলে নিল,আদর করল ।আমি কেবল অবাক হয়ে দেখছি ।বিয়ে করে নি মোমো ।আমার জন্য!!!উন্মত্ত এক অপরাধবোধ জর্জরিত করে দিচ্ছে আমাকে ।আমার মেয়েটা স্কুলে ছোটাছোটি শুরু করছে ওর কোল থেকে নেমে ।আমার তাকিয়ে থাকা দেখে কিছুটা বিব্রত হচ্ছিল মোমো ।তার শরীরের সেই কোমলতা যেন আজও হয়ে অমলিন,কালো পাঁপড়ি থেকে ছুটে আসা সেই শুভ্র কপালে মোমো আজও পড়েছে লাল টিপ ।নিষ্পাপ সেই চোখদুটো আজ়ও মায়ার বাঁধনে আটকে ,তার সৌন্দর্য যেন কখনোই শেষ হওয়ার নয় ।আমি অপরাধীর মতই কিছু বলতে যাচ্ছিলাম,"মোমো,বর্ষার মা নেই......তুমি যদি..."।আমাকে থামিয়ে দিল সে ।"জাহিদ............এটা সম্ভব না ।"তারপর চলে গেল ক্লাসরুমে ।জানি,আজ থেকে দশ বছর আগে এমন কিছু আমিও বলেছিলাম তাকে ।এটা সেই প্রতিশোধ না তো? সাদা খড়ি দিয়ে কি যেন বোর্ডে লিখে পড়াচ্ছিল মুমু।আমি কেবল সেই মুহুর্তটিকে নীরবে দেখে গেলাম ।আজ নিজের কাছেই এই অদ্ভূত জীবন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে বারবার,নির্মম এক অপরাধবোধ তিল তিল গ্রাস করছে আমাকে ।পাহাড়ের পাশে ঐ বেঞ্চটাতে বসলাম আমি আর বর্ষা ,যেখানে আমার পাশে একসময় মুমু বসেছিল ,সন্ধ্যা অবধি ,যতক্ষণ না চাঁদ উঠে......দূর থেকে ঐ মাঠটা দেখা যাচ্ছে ।হয়ত এখনও সেখানে সাংরাই হয়,বছরের শেষে ভিজে একাকার হয় মারমা সম্প্রদায় ।হয়ত তারপর থেকে মুমু আর কাউকে ভেজায় নি,তাকেও কি কেউ ভিজিয়ে ছিল? হঠাৎ বর্ষা এক আবদার করে বসল ।"বাবা,আমি ঐ স্কুলটাতে ভর্তি হব ।ঐ আপুটা অনেক ভাল ।"কিছু বলার আগেই উপর থেকে গাড়ির ড্রাইভার আনিস চেঁচিয়ে উঠল,"স্যার!!বেলাতো পইড়া গেল,যাইবেন না?"......বর্ষাকে বুকে টেনে নিলাম ।কপালে একটি চুমু দিয়ে বললাম,"চল,মা!!"

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.