| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
মুজতাহিদ জাহিদ
বাস্তবতা আমাকে ভাবায়.।.।অন্যায় আর ক্ষমতার দাপটে পিষ্ট মানবতা.।।আমি সেই শোষনের কথা বলি.।স্বাধীনতার কথা লিখি.।।।আমার লেখাতে ফুটে উঠুক মানবতার তৃপ্ত জয়োল্লাস!!
সময়ের পার্থক্য বুঝে উঠার আগেই সাঁই করে চলে যাচ্ছে গাড়িগুলো ।মাঝে মাঝে খুব দুঃখ হয়,ঢাকা শহরে এত জ্যাম লাগে,এই রাস্তাটাতে জ্যাম লাগতে পারে না?একটু পর পরই চলছে যান,আর তাদের কর্কশ আওয়াজে আমার নিদ্রা ম্লান ।আমার প্রতিবেশী তো থাকে অনেকেই ।কাকে রেখে কার কথা বলব!ঠিক ডানপাশে থাকে একটি ছোটো ছেলে;শুনলাম তার এলাকায় নাকি আগুন লাগে একদিন , পুড়ে যায় বাড়িঘর,শতাধিক মানুষ ।তারপর...তারপরই নাকি সে এখানে চলে আসে ।ওদিকটাই আরো অনেকে থাকে,সবার সাথেই আমার মোটামুটি ভাল সম্পর্কই বলা চলে ।তাদের মধ্যে একজন ডাক্তার,একজন বিজ্ঞানীও আছেন ।তো এদের নিয়েই আমরা...আমাদের আজিমপুর গোরোস্থান ।
আমার কথা তোমাদের জানতে হবে এমন কোনো কথা নেই ।তোমরা বরং আমার চাদেঁর গল্প শুনো ।চাঁদ বলতে......হয়ত সে মায়ের কোমল হাতে দেয়া সন্তানের কপালের নিখুঁত তিলক নয় ...সে পূর্ণিমার রাতে হাতছানি দেয়া ধূসর জোৎস্নাও নয়... কিংবা কবি সুকান্তের ক্ষুধার পৃথিবীতে ঝলসানো রুটিও নয়...।তবু সে আমার চাঁদ...মুন ।তাকে নিয়েই আমার গল্প ।না না!তোমরা যা ভাবছো তা না,রাস্তাঘাটে হাঁটতে গিয়ে ধাক্কা লেগে কিংবা বইপত্র পড়ে তুলতে গিয়ে আমার মুনের সাথে পরিচয় হয়নি ।ছোটবেলা থেকেই আমরা একসাথে থাকতাম ।সকালের রোদ যখন মিষ্টি হাসি দিয়ে সবার ঘুম ভাঙাতো তখন হয়ত পূবের পুকুরে বড়শি পেতে বসে আছি একটা মাছের অপেক্ষাই...আমরা দুজন । অন্ধকারের ছোট মেয়ে সন্ধ্যায় যখন তার কালো জামা জড়িয়ে দিত আমাদের গায়ে তখন হয়ত পুতুল বিয়ের নাম করে আমি মুনের সাথে একটা ঝগড়া বাধিয়ে বসে আছি ।তার পুতুল বিয়ে দেবে...আর তাই রোজ় রোজ় আমাকে দাওয়াত করবে ।আমার এগুলো মোটেও ভাল লাগত না ।তবু সে আমাকে জোর করে বসিয়ে রাখবে ।রাগ করে আমি মাঝে মাঝে অত্যন্ত সুন্দর করে সাজানো সেই পুতুলগুলোর মাঝ থেকে একটি নিয়ে গর্ত খুঁড়ে চাপা দিয়ে দিতাম ।ও তখন পুতুলটা খুঁজে না পেয়ে বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করত,"অপু!আমার পুতুলটা কোথায় রে?" আমি বলতাম,"সেটা তো মরে গেছে ।তাই কবর দিয়ে এসেছি ।"আমার কথা শুনে সে চোখগুলো নারকেলের মত বড় বড় করে আমাকে মারতে আসতো ..."দাঁড়া!তোকেই কবর দিচ্ছি!"..তারপর সে কবর খুঁড়া শুরু করত....সেই মুহুর্তগুলো মনে পড়লে এখন হাসা ছাড়া অন্য কিছু তো ভাবতেই পারি না ।ভাববোই বা কি করে?অন্য কিছু নিয়ে ভাবতে গেলেও সেই মায়াবী স্মৃতিগুলি হৃদয়ের অপলক দৃশ্যপটে ছেলেভুলানো তারাবাজি খেলে ।
মুনের একটা বদঅভ্যাস ছিল ।বদঅভ্যাস বললে হয়ত ভুল হবে তবে আমার এটা মারাত্নক বিরক্তি লাগতো ।মুন সারাদিন নানা রকম অদ্ভূত অদ্ভূত সব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে করতে আমাকে বেহাল করে দিতো ।একবার হয়ত বলবে,"অপু!বলতো,আকাশে তারা কয়টা?"......আমি রেগে বলতাম,"তোর মাথায় চুল যতটা!"......"কেমন করে পারলি??হিঃহিঃহিঃ..."তারপর জোরে একটা বিজ্ঞের হাসি দিয়ে আমার কান ঝালাপালা করে দিতো!মনে হয় এই মাত্র আমার সাথে হোগার্টসে খেলতে গিয়ে স্নিচটা হাতে পেয়েছে ।তখন এই হাসির মর্মার্থ বুঝিনি সত্যি,তাই তার দিকে টেলি সামাদের মত হা করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আমার আর কোনো কাজ় ছিল না ।
বইয়ে পড়েছিলাম শৈশবের পর কৈশোর আসে,তারপর যৌবন ।আর এভাবেই নাকি কেটে যায় সময়ের কাটা ।কিন্তু মুনের সাথে আমার জীবনঘড়ি কিভাবে সময়কে হার মানিয়েছে তা বলতে পারব না ।নদীতীরে দৌড়ে দৌড়ে রঙ্গিন ঘুড়ি উড়াতে উড়াতে,নৌকা নিয়ে খালে-বিলে ঘুরে-বেরিয়ে কালের শালুক তুলতে তুলতে;আর মনের অজ়ান্তে ছোটখাটো কোনো বিষয় নিয়ে মিছেমিছি ঝগড়া বাজিয়ে দুজনের চেহারাদুটো রূপকথার ভূতের মত করে রাখতে রাখতে আমরা নাকি বড়ও হয়ে গেলাম !আর তাই কত মানা না মানার প্রশ্নে মনঃক্ষুন্ন হয়ে বসে থাকতাম প্রতিনিয়ত ।তবে এতে আর কি লাভ?বড় হয়েছি তাই আর কোনো ছেলেমানুষী করতে বারণ ।তবু আমরা ঘুড়ে বেড়াতাম ইচ্ছেমতো ।সদ্য উড়তে শেখা শালিক যেমন ছুটোছুটি করে বেড়ায় স্বাধীন হয়ে,ঠিক তেমনই ।এভাবেই হয়ত দিনগুলি কাটতে পারতো ।কিন্তু...আমার জীবন তো আর বাংলা সিনেমার কোনো এক পরিচালকের দ্বারা পরিচালিত নয় । তাই হয়ত জীবনের রঙ্গমঞ্চে সরল এই সমীকরণটা এক্স-এর নতুন কোনও মানের জন্য একটু গরল হয়েই ধরা দিল ।আর এই গরল সমীকরণের সমাধাণ করতে গিয়ে আমার যে কত চড়াই-উৎরাই পার হতে হয়েছে তা বলতে গেলে আমি আর আমি থাকবোনা ।তো যাই হোক ।একসময় আমার পরিবার চলে আসে ঢাকায় ।বেড়ে যাই দূরত্ব ।আফসোস!তখন মুনের হাতে ছিল না গ্রামীণফোন।না হলে হয়ত দুরত্ব যতই হোক,কাছে থাকতে পারতাম ।
জীবনের এই পর্যায়ে একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম ।কারণ কিছুদিনের মধ্যেই চান্স পেয়ে গেলাম বহুল আকাংখিত ক্যাডেট কলেজে ।ছোটবেলা থেকেই যার স্বপ্নে বিভোর ছিলাম রীতিমত ।তবে চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকার মত ছেলে আমি কখনোই ছিলাম না ।তার উপর আবার বড় ভাইয়াদের কথামত চলতে হবে,তাদের কাজে আলিফ লায়লার সাহায্যকারী জ়্বিনরূপে থাকতে হবে,সকালবেলা যাকে ঘুম থেকেই উঠানো যেত না একটা বয়সে,সে আজ ব্যান্ডের তালে পা মিলিয়ে যাবে অবিরত......ভোরের সূর্য যখন আড়মোড়া দিচ্ছে ঠিক তখন ।অদ্ভূত জীবনের অদ্ভূত সব বাস্তবতা মানুষকে এভাবেই মেনে নিতে হয়,কোনো কারণ ছাড়াই ।
ছুটিতে যখন বাড়ি যেতাম একবার হলেও গ্রাম থেকে ঘুড়ে আসতাম ।তবে মুনের সাথে দুরত্ব কেন যেন বেড়েই চলছিল । হয়ত সময়ের ব্যাবধানে মানুষ এমনই হয়।আমার সামনে আসতো না,দূর থেকে আমাকে দেখলে আড়াল হয়ে যেত।স্কুল শেষে যখন ছুটি হত,সে সবার আগে বাড়ি চলে আসতো ।যদি কখনও ডাকতাম,অপরাধীর মত কাছে এসে দাঁড়াত ।তখন আমিও কিছু বলতে পারতাম না ।আর এভাবেই গল্পের মত বাস্তবতাটাও এক অদ্ভূত নিয়মে শেষ হয়ে যাচ্ছিল কোন উপসংহার ছাড়াই ।
অপেক্ষা না করে একদিন ব্যাপারটা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করলাম...তার ঘনিষ্ঠ এক বান্ধবীকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল তার বাবা মারা গেছে......তারপর থেকে সে মানসিকভাবে খুব বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে ।খবরটা অনেক সহজভাবে লিখে ফেললাম ।কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তখন কথাগুলো আমি কি আদৌ এত সহজে মেনে নিতে পেরেছি?সেই প্রশ্নের উত্তরে আমি রীতিমত হেসেই ফেলছি ।মূলত মেয়েটার অসহায়ত্ব আর তার প্রতি তিল তিল করে জমে উঠা কিছু দুর্বলতার দোহাই দিয়েই হয়ত বিষাদের তিক্তরস আমার মনে ছিটকে পড়েছিল ।
তো একসময় কলেজ থেকে বের হলাম ।স্মৃতিকাতরতার কষ্টটা বেশ আটকেই ছিল মনে ।তোমাদের এই সভ্যতার কত না যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হল তখন ।অবশেষে পেলাম আর্মিতে চান্স ।বাম-ডান বাম-ডান আর শত্রুর প্রতি নির্ভীক বেয়নেটই যেন আমার জ়ীবন!জ়ীবনের প্রকৃ্ত অর্থ ।আর এই অর্থের প্রকৃ্তি-প্রত্যয় বিশ্লেষণ করতে করতে কিভাবে যে চার বছর পার হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না ।এই দীর্ঘ সময়ে আমার গল্পের নায়িকার কথা কিন্তু আমি ভুলে যায়নি মোটেও!বরং প্রত্যেকটি মূহুর্ত আমি তাকে নিয়ে ভেবেছি ।ভেবেছি আমার ছোটবেলার সাথীর কথা...ভেবেছি আমার বন্ধুর কথা...ভেবেছি...হ্যাঁ!হয়ত তখনি আমি বুঝতে পারি মুন আমার অনেক কাছের কেউ ।খুব অদ্ভূত একটা অনুভূতি হচ্ছিল তখন ।যে আমি রাস্তাঘাটে কোনো প্রেমিক-প্রেমিকার জ়ুটি দেখলে হই হেসে কুটিকুটি,যে আমি সবসময় বন্ধুদের প্রেমিকাদের নিয়ে তাদের খুঁচিয়ে এসেছি এতদিন,যে আমি প্রেম-ভালবাসা নিয়ে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে যাই,এমনকি বাবা-মার একমাত্র সন্তান হওয়া সত্তেও বিয়ের কথা মুখেও আনতে দেইনি তাদের......সেই আমি নাকি......!!নাহ!আর ভাবতে পারছি না!ছুটির জন্য অপেক্ষা না করে ব্যাগ গুছিয়ে বের হয়ে গেলাম ।
**************************
রাস্তার পাশের সেই বকুল গাছটা এখনও গ্রামে সুগন্ধ ছড়িয়ে যায় ।নদীর পাড়ের সেই শিউলী গাছটাও এখন আছে ।ঐতো গর্তটা!মুন রাগ করে আমাকে কবর দেয়ার জন্য খুঁড়েছিল ।জানিনা এত বছর পর সেই স্মৃতিগুলো কেন আমাকে আনমনে করে দিচ্ছে বারবার।মফস্বল হলেও রুপাতলী শহর বলার চেয়ে গ্রামটাই একটু ভাল শুনায় ।স্বচ্ছ প্রকৃ্তির কোমল চাদর এই গ্রামের মানুষকে আজও ঢেকে রেখেছে সত্যি ।আর সেই চাদরের বুক চিরে আমি কখন পৌঁছে গেলাম আমার ভালবাসার কাছে বুঝতেই পারলাম না ।দরজায় টোকা দিতেই দরজা খুললেন একজন বৃদ্ধ ।পুরোপুরি বৃদ্ধ না হলেও বয়স ষাটের কোঠায়,কোনও সন্দেহ নেই ।ভদ্রলোককে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাব ঠিক তখনি দরজার পাশে এসে দাঁড়াল আমার গল্পের নায়িকা ।আজ এত বছর পরও ও আমাকে চিনতে পেরেছে ।ভাবতেই অবাক লাগল ।সবসময়ই খুব কম কথা বলত মুন ।আজও তাই।হৃদয়কাড়া মুচকি হাসিটা আজ ছিলনা তার ।তাই মলিন চোখগুলোকে আড়াল করার ব্যর্থ এক চেষ্টায় হেরে গিয়ে আলতো করে বলল,"কেমন আছো?"আমি কেমন ছিলাম তখন জানি না ।তবে কিছুদিনের বেড়ানো শেষ করে মুন যখন চলে যাচ্ছিল তার শ্বশুরবাড়ি,তার বরের সাথে,কোনও এক নৌকায় করে আর সেই নৌকার আরেক যাত্রী যখন আমি তখন খুব খারাপ লাগছিল না ।মুন এখন চশমা পড়ে।চশমা পড়লে মেয়েদের সাধারণত এত সুন্দর দেখায় না ।কিন্তু ঠিক ঐ মুহুর্তটাতে আমি দুনিয়ার এসব ভ্রান্ত ধারণাগুলোর জন্য নিজেই লজ্জিত হলাম । মুনের ছোট মেয়েটা;বয়স হয়ত ১/২ বছর হবে,সে বারবার মায়ের চোখের চশমাটা খুলে দিতে চাচ্ছিল ।মা দিচ্ছিল না ।আর এই নিয়ে রূপালি নদীর বুক চিড়ে যাওয়া এই ছোট তরীতে বসা মা-মেয়ের মধ্যে যে নিবিড় খেলা চলছিল,তার দর্শক হয়ত সেই মুহুর্তে আমিও ছিলাম ।মেয়েকে শান্ত করার জন্য বারবার চেষ্টা করছে মুন ।আর নদীর অপর প্রান্তের খাপছাড়া অগোছালো বাতাসটা তার ঘন কালো চুলগুলোকে উড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছিল সে বেলায় আরও একবার ।
মুনকে বিদায় দিয়ে খুব আনমনে হয়ে পড়ি আমি ।ঢাকার বাসে না উঠে কি মনে করে যেন হেঁটে হেঁটেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই......দুপাশের শ্যমল বৃক্ষরাজি সেই আনমনে অনুভূতিটিকে আরো বেশি নিখুঁত করে দেয়...রাস্তার পাশ দিয়েইতো হাঁটছিলাম ।কিন্তু বাংলাদেশের ড্রাইভার বলে কথা ।একদম চাকাটা এনে আমার মাথার উপর দিয়েই ওর নিতে হবে ।বাংলা সিনেমার হিরো হলে না হয় সে বেলায় বেঁচে যেতাম ।কিন্তু আমি তো দিগন্তজ়োড়া শস্যভাণ্ডারে একটি ছোট সরষেদানা মাত্র ।আমি তো আর তারেক মাসুদ কিংবা মিশুক মুনীর নয়;এই অধমের খবর তোমরা কি করেই বা পাবে?তবে যদি কখনো আজ়িমপুর গোরোস্থানে আসো তবে আমাকে দেখতে পাবে ।দেখবে ঐ কাঁচাবাঁশের বদ্ধ ঘরে শুয়ে একা...আমি এখনও চাঁদ দেখি...রাতের আঁধারে জ়োৎস্নার ভেলায় চড়ে নীল পরীরা যখন মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলে আমি তখন মুগ্ধ হয়ে তাদের দেখি......আর......সেই অনুভূতির অসহায় প্রকাশে আমি এখনও গল্প লেখি......হ্যাঁ!আমার ...ভালবাসার গল্প!......আমার... চাঁদের গল্প!!
©somewhere in net ltd.