নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

যুক্তির প্রান্তরে শুনি জীবনের জয়গান

মুজতাহিদ জাহিদ

বাস্তবতা আমাকে ভাবায়.।.।অন্যায় আর ক্ষমতার দাপটে পিষ্ট মানবতা.।।আমি সেই শোষনের কথা বলি.।স্বাধীনতার কথা লিখি.।।।আমার লেখাতে ফুটে উঠুক মানবতার তৃপ্ত জয়োল্লাস!!

মুজতাহিদ জাহিদ › বিস্তারিত পোস্টঃ

তোমাদের ভীড়ে...

১৯ শে আগস্ট, ২০১৩ দুপুর ২:২৬



মেয়েটির নাম ছিল সুলতানা এবং মেয়েটির বাবা-মা তার নাম রাখতে ভুল করেননি ।ভুল করেননি বললাম এই কারণে যে আজকাল ফেসবুকে মেয়েদের নামের বাহার দেখলে মনে হয় তাদের বাবা-মা তাদের নাম রেখে বড্ড ভুল করে ফেলেছেন । যার নাম "কুমকুম বেগম",সে হয়ত সেই নাম বদল করে রাখে "প্রিন্সেস কুমকুম" বা "কুমকুম দ্যা কুইন" ।মানে "সুলতানা কুমকুম" বা "রাজকন্যা কুমকুম" ।অনেকে আবার সুলতানা না হয়ে পরীও হতে চায় ।যেমন,"সালেহা খাতুন" বদলে "এঞ্জেল সালেহা "।বলাবাহুল্য অনেক বকলমকে আবার এই "এঞ্জেল" লিখতে গিয়ে "এঙ্গেল"ও লিখে ফেলতে দেখা যায় ।সেই দুঃখের কথা না হয় না'ই বললাম ।তবে রাণী কিংবা পরী হওয়ার প্রতি মেয়েদের এই আকাংক্ষা চিরদিনের ।তা নামেই হোক,আর কাজেই হোক ।



বলছিলাম সুলতানার কথা ।বাবা ইসলামের ইতিহাসের অধ্যাপক হলেও ইংরেজিতে দক্ষতার জোরে আমাদের ইংরেজি ক্লাসগুলো তিনিই নিতেন ।ছোট কিন্ডার গার্ডেন স্কুল ।মফস্বল শহর ।তবু ছাত্র-ছাত্রীর অভাব নেই ।আমরা ছিলাম চতুর্থ শ্রেণীতে ।আমি ফার্স্টবয় আর সুলতানা সেকেণ্ড গার্ল ।অনেকেই ভাববেন,লেখক একটু ভাব নিল কিনা ।আসলে কি,আমাদের গল্পের শুরু এখানেই ।

ক্লাসে মেয়েরা বসত একপাশে এবং ছেলেরা অন্য পাশে ।কোনো ছেলে পড়া না পারার কারণে কানে ধরলে মেয়েরা হাসবে এবং কোনো মেয়ে পড়া না পেরে কানে ধরলে ছেলেরা হাসবে ।এটাই আমাদের অঘোষিত নিয়ম । দুনিয়া স্থির দাঁড়াতে পারে,সূ্য্যিমামা ভুল করে পশ্চিম দিকে উঠে যেতে পারে,কিন্তু এই দুই দলের মধ্যকার যে প্রাকৃতিক বিরোধ তা যেন কখনই সমাধান হবার নয় ।আর তাইতো দুদলই সবসময় প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের সংকল্পে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ।অপরদিকে এদের মধ্যে কোনো এক দলের দলনেতা ছিলাম আমি ।এবং অত্যন্ত স্বাভাবিক নিয়মেই আমার বিরোধী দলীয় নেত্রী...সুলতানা ।সবসময় আমি ওর পেছন লেগে থাকতাম ।কি করে ওর বারোটা বাজানো যায় !কেন এমন করি এবং কেনইবা এই শত্রুতা,এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই ।শুধু জানি,আমরা শত্রু । পরীক্ষার খাতা দেখার সময় বাবা ভাবতেন ছেলেকে পাশে নিয়ে দেখলে হয়ত সে ভুলগুলো শুধরাতে পারবে ।কিন্তু তিনি কি কখনও চিন্তা করেছিলেন এই অধম সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার কি করে করছে ! হঠাৎ যখন সুলতানার খাতাটা চলে আসতো আমার যেন আনন্দের সীমা নেই ।তন্ন তন্ন করে খুঁজতে থাকি ভুলবাবাজিদের ।এই বুঝি পাওয়া গেল ! আর প্যারাগ্রাফে আর্টিকেল কিংবা প্রিপোজিশনের ভুল ধরতে পারার মধ্যে যে কেমন একটা ভাল লাগা অনুভূতি পেতাম তখন,তা কি কখনও বর্ণে বা ভাষায় প্রকাশ করা যায়? বারবার যখন শিক্ষককে ভুল ধরিয়ে দেয়া হয়,তখনতো খাতায় অনিচ্ছাকৃতভাবেও নম্বর কম উঠবে ।এদিকে আমার খাতা যখন আসতো,বাপজানকে সমসাময়িক নানা ব্যাপারে অবগত করার মাধ্যমেই পার করে দিতাম ।এবং অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই খাতা দেয়ার পর সুলতানা দেখত এই এক বিষয়েই আমি তাকে আকাশ-পাতাল ব্যাবধানে ফেলে দিয়েছি ।লজ্জায় আর অপমানে মাথা নিচু হয়ে আসত তার ।কিছুক্ষণ পর চোখগুলো বড় বড় করে আমার দিকে কৌতুহলী ভঙ্গিমায় তাকাতো ।আর আমি তাকে রাগাবার জন্য মিটমিটি হাসতাম । তার কিছুই যেন আমার সহ্য করার মত নয় ।আবার তার দিকে তাকালেও সে মুখখানাকে বাঁকা করে ঠোঁটের কোণায় এমন একটা অদ্ভূত ভেংচি কাটতো, যে রাগে আর দুঃখে আমার রক্ত থেকে ধোয়া বেরোত ।



একদিন হল কি,আমাদের এসেম্বলি চলছে ।সামনে জাতীয় সঙ্গীতের জন্য ডাক পড়ল আমার ।আমি তো একটু শার্টটা ঠিক করতে করতে সামনে এগিয়ে গেলাম ,স্মার্ট হিসেবে নিজেকে উপস্থাপনের জন্য যা যা করা উচিত বলে মনে হচ্ছিল তা'ই করতে লাগলাম ।চতুর্থ শ্রেণীর ফার্স্ট বয়,ভাবই আলাদা ।কিছুক্ষণ পর দেখা গেল,আমার পাশে সুলতানা ।পড়লাম মহা বিপদে ।একটু জায়গা থেকে সরে আসলাম,না হলে আমার কি আর দাম থাকে ! সে হয়ত ব্যাপারটা খেয়াল করল ।আমার দিকে একবার তাকিয়ে পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রীতে একটা ভেংচি কাটলো ।আমি পাল্টা কিছু করতে যাবো এমন সময়ই শুরু হল জাতীয় সঙ্গীত,সবার সাথে আমিও শুরু করি ।স্বদেশের জন্য আমাদের মত নন্দলালদের বেশি ভালবাসা আর কার আছে দেখে নিব !আমার গাওয়া শুরু হতেই আশেপাশের কয়েকজন আমার দিকে তাকাল ।এবং সুলতানাও ।সে একটা মুচকি হাসি দিয়ে গাইতে থাকল ।ভাবলাম,হয়ত ভালো গাচ্ছি তাই ।নিজের মধ্যেই কেমন একটা গর্ববোধ কাজ করছে ।আরও জোরে প্রবল আগ্রহে আমি গাওয়া শুরু করলাম,"ওমা ফাগুনে তোর আমার বনে,ঘ্রাণে,পাগল করে........."রবীঠাকুরের মত আমিও দিলাম হ্যাঁচকা টান......"এই অপু!!!আস্তে,গাও!!ফাটা বাঁশ একটা!!" বলে সুলতানা মুখ চেপে হাসা শুরু করল ।তাতে কিন্তু আমি বিন্দুমাত্র ভ্রক্ষেপ করিনি,স্বদেশের তরে আমার এই ভালবাসা প্রকাশে আমি বরাবরই অবিচল ।



এভাবেই কাটছিলো দিনগুলো ।ইংরেজির কারণে বরাবরই সুলতানা আমার থেকে পিছিয়ে ।তাই হয়ত শেষ পর্যন্ত আমার সাথে পেরে উঠার যুদ্ধে সে হাল ছেড়েই দিল । একসময় সেখান থেকে চলে আসি ঢাকায়,এই ব্যস্ত নগরে ।এখানে তো আর ছেলেমেয়েদের কোনো বিভেদ নেই ।কোনো মেয়ে কোনো ছেলের দুর্বলতা দেখে মুচকি হাসে না,সফলতা দেখে ভেংচি কাটে না ।আর এই কারণেই হয়ত সেই সময়গুলো মিস করছিলাম ।উপভোগ করার সময় থাকে কম,আর মিস করার সময় অনেক ।তাইতো এই বৃহৎ সময়ের রশি ধরে কেটে গেছে প্রায় নয়টি বছর ।



আজও বাবা খাতা দেখেন ।এইচ এস সি,অনার্স,মাস্টার্স সব খাতাই দেখেন ।ইসলামের ইতিহাসের এই খাতাগুলোতে পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মূল কারণ যারা শের শাহের বিশ্বাসঘাতকতাকে নীল কালি দিয়ে হাইলাইট করে দেয়,আমি তাদেরও বেশি বেশি নম্বর দেয়ার জন্য বাবাকে সুপারিশ করি ।কিন্তু কখনও কি এই খাতাগুলোর ভীড়ে পাব সেই সুলতানার খাতাটি? তাদের মধ্যে কি এমন কেউ থাকবে যে চোখগুলি বড় বড় করে তাকাতে জানে?তাদের মধ্যে কি এমন কেউ থাকবে যে ঠোঁটের কোণে ভেংচি কাটতে জানে?তাদের মধ্যে কি এমন কেউ থাকবেনা যে অন্যের অপারগতা দেখে মুখ চেপে হাসতে জানে ?হ্যাঁ,থাকবে ।আর তাই তাদের মাঝেই আমি সেই সুলতানাকে খুঁজে পেতে আকুল ।জানি না,এই প্রচেষ্টা কতটুকু অব্যর্থ ।তবে এটাইতো মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি ।যার কোনো অর্থ থাকবেনা তাকেই নিজস্ব অভিধানে জায়গা করে দিয়ে নিছক অর্থ খোঁজার চেষ্টা......!!



মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.