| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
'আরে এত ব্যস্ত হচ্ছো কেন? বলছি... বলছি...আমি...আমি নিশিতা । নিশিতা আমার নাম । তুমি?’
‘তপু ।’
‘ব্যস হয়ে গেল!’
‘কী?’ অবাক হয়ে জানতে চাইলাম আমি ।
‘কেন? বন্ধুত্ব ।’
এত সহজেও বন্ধুত্ব হয়! ছোটবেলায় ‘ভাব’ বলে দু’জনে বুড়ো আঙ্গুল ছোঁয়ালেই বন্ধুত্ব হয়ে যেত । এখানে সেটুকুও লাগল না, শুধু দু’জন দু’জনের নাম জেনেই বন্ধুত্ব হয়ে গেল ।
এরপরের গল্পটা খুব সাধারণ । রাতারাতি বদলে গেল আমার জীবন । যেই আমি বই ছাড়া আর কিছুই বুঝতাম না, সেই আমার বইয়ে মন বসে না । এ এক অদ্ভুত অবস্থা! সারাদিন সব কাজ করছি, অথচ যেন কোনো কাজেই মন বসছে না । একটা ঘোরের মাঝে রয়েছি যেন আমি, নেশাগ্রস্তের মতো অবস্থা আমার । সারাদিন শুধু মনে হতে থাকে কখন রাত এগারোটা বাজবে! কখন রাত এগারোটা বাজবে । সারাটা দিন এই রাত এগারোটা বাজার অপেক্ষায় থাকি । সারাটা দিন মোবাইল বন্ধ থাকে মেয়েটার । যতবারই ফোন দিই না কেন, একই কথা শোনা যায়, ‘দুঃখিত । এই মুহূর্তে সংযোগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না ।’ শুধু রাত এগারটায় নাম্বারটা খুলে যায় । গভীর রাতে বন্ধ হয়, তারপর আবার সেই রাত এগারোটার প্রতীক্ষা ।
মাঝে মাঝে বুকের বাঁ-দিকটায় খুব সূক্ষ্ম চিনচিনে একটা ব্যথা অনুভব করি । মনে হয়, খুব সূক্ষ্ম একটা কিছু দিয়ে কেউ একজন খোঁচা দিচ্ছে । গোলাপকাঁটার মতো সূক্ষ্ম কোনো কিছুর খোঁচা । উঁহু, হলো না, এর চেয়েও সূক্ষ্ম খোঁচা । সোনামুখী সূচের খোঁচা । এই গোলাপকাঁটার খোঁচা, সোনামুখী সূচের খোঁচা—এই খোঁচাগুলোই কি প্রেম? এই অনুভূতিটাকেই ভালোবাসা বলে?
তাহলে আমিও প্রেমে পড়েছি, আমিও ভালোবেসেছি । নিশিতার প্রেমে পড়েছি আমি । নিশিতাকে ভালবেসেছি আমি । আগাগোড়াই নিশিতার মাঝে ডুবে আছি আমি ।
কোথা থেকে যেন শুরু করেছিলাম? ও! মনে পড়েছে, ঐশীর কথা বলছিলাম । আসলে আজকাল জীবনটাই এত অগোছালো হয়ে গেছে যে গুছিয়ে কোনো কথাই বলতে পারি না, সব গুলিয়ে ফেলি ।
আনোয়ারের স্যারের রোজকার অভ্যাস দেরি করে পড়াতে আসা, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের কমপক্ষে পঁচিশ মিনিট থেকে আধাঘণ্টা দেরি করে আসবেন । উনার এই অভ্যাসে অন্যদের খুব একটা অসুবিধা না হলেও আমার খুবই সমস্যা হতো । অন্যদের কথা বলার বিষয় কিংবা কথা বলার মানুষ কোনটারই অভাব নেই । আমি কী করব এই সময়টাতে? প্রথম প্রথম পড়ার বইয়ে মুখ গুঁজে সময়টা কাটানোর চেষ্টা করতাম আমি, কিন্তু চতুর্দিকে এত শব্দের মাঝে পড়াশোনা করা যায়, তুমিই বলো? কয়েকদিন যাওয়ার পর আমি নিজেও সময় কাটানোর একটা উপায় খুঁজে বের করে ফেললাম । খুব মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করে দেখলাম, নিজে কোনো আলাপে অংশ না নিয়েও অন্যদের আলাপ শুনতে খুব একটা খারাপ লাগে না । খারাপ লাগে না কী বলছি, বরং বলি ভালোই লাগে । কত বিচিত্র বিষয় নিয়ে যে আলাপ হয়! আমার অজানা নতুন নতুন কত শব্দ! শুনতে বেশ লাগে ।
ব্যস, এরপর থেকে সময় কাটাতে আমার আর কোনো অসুবিধাই হতো না । মাঝামাঝি একটা বেঞ্চে বসে সামনে বাংলা উপন্যাস কিংবা নাটক এমন কোনো একটা বই চোখের সামনে খুলে এমন ভাব করতাম যেন খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছি, অথচ পড়া দূরে থাক, বইয়ের দিকে ভালো করেই তাকাতাম না আমি । ক্যান খাড়া করে শুনতাম অন্যদের আলাপ । কয়েকদিন আলাপ শুনেই বুঝে গেলাম, আনোয়ার স্যার আসার পূর্বের সময়টাতে ছেলে-মেয়েদের মাঝে সম্মিলিতভাবে যে আলোচনা হয় তার মূল মধ্যমণি ঐশী ।
মেয়েটা বিতর্ক করত, কলেজের ডিবেটিং ক্লাবের জেনারেল সেক্রেটারি, বিতর্কে তুখোড় । আমাদের কলেজের যেই ছেলেগুলো বিতর্ক করত তারা কি আর এই সুযোগ হারাতে চাইবে? এই সময়টাতেই ছোটখাট বিতর্ক হয়ে যেত । আমি অবাক হয়ে শুনতাম । কী দারুণ বাচনভঙ্গি! কত সুন্দর করেই না যুক্তি খন্ডন করে ঐশী নামের এই অহংকারী মেয়েটা! সেই সময় থেকে মেয়েটাকে আমার একটু একটু হলেও ভালো লাগা শুরু করল । মনে মনে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হলাম আমি, একটু বাচাল আর অনেকখানি অহংকারী হলেও মেয়েটা আসলেই অসাধারণ বিতর্ক করে ।
সবদিন বিতর্ক জমত না, কোনো কোনোদিন আলোচনা হতো হালের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে; সেদিন মুগ্ধ করত মেয়েটা আমাকে, সব বিষয়ে কী গভীর জ্ঞান তার!
এই যে মেয়েটা এত মুগ্ধ করত আমাকে; ওর হাত-পা নাড়া, চোখের ভাষা থেকে নিয়ে কথা বলার স্টাইল সবকিছু বিভোর হয়ে দেখতাম আমি, আর মনে মনে ভাবতাম মানুষ এতটা অসাধারণ হয় কী করে! এই মেয়েটাকে আমি কিছুটা হলেও নিশিতার সাথে তুলনা করতাম । কেন করতাম নিজেও জানি না । মেয়েটা সত্যিই চমৎকার, মানুষকে মুগ্ধ করার অসংখ্য গুণ তার মাঝে আছে, তবু একটা জায়গায় কিন্তু সে হেরে যেত । হেরে যেত নিশিতার কাছে, আমার নিশিতার কাছে ।
জানি না কেন, এই একটা মেয়ের সাথেই ।
ঐশী নিশিতার মতো সুন্দর করে হাসতে পারে? নাহ!
নিশিতার মতো সুন্দর করে কথা বলতে পারে? না । কিছুটা হয়তো পারে, সবটা নয়, নিশিতা দশে সাড়ে নয় হলে এই মেয়ে পৌনে আট ।
নিশিতার মতো ভালো মেয়ে ও? প্রশ্নই আসে না! হিংসুটে আর অহংকারী ।
না, এই মেয়ে নিশিতার পায়ের নখের যোগ্যও না, নিশিতার ধারে-কাছেও যেতে পারবে না ঐশী । তবুও কেন আমি বারবার নিশিতার সাথে ঐশীর তুলনা করি? কেন মুগ্ধ হয়ে ওর কথা শুনি? নিজেকেই নিজে উত্তর দেই, কোনো একভাবে তো সময়টা কাটাতে হবে? তাই শুনি, তাই দেখি, হয়তো কিছুটা মুগ্ধ হই । এর চেয়ে বেশি কিছু না ।
আমার নিশিতা আছে, নিশিতা আছে, নিশিতা আছে । আর কী চাই?
একদিন নিশিতা ফোনে আমাকে বলল, ‘তুমি তো অনেক বইটই পড়ো, তাই না?’
‘হ্যাঁ । তা পড়ি, কেন বলো তো?’
‘কবিতা পড়ো?’
‘পড়ি তো,’ উৎসাহী হয়ে বললাম আমি । ‘তুমি কবিতা শুনবে? জীবনানন্দ দাশ? নির্মলেন্দু গুণ? জয় গোস্বামী? নাকি পূর্ণেন্দু পত্রী’র কবিতা?’
‘আরে নাহ! অন্যদের কবিতা শুনে কী হবে?’
‘তাহলে?’ অবাক হয়ে জানতে চাইলাম আমি ।
‘তুমি বরং আমার জন্য একটা কবিতা লেখ । শুধু আমার জন্য । কি পারবে না?’
আমি বিমোহিত! নিশিতা আমাকে কবিতা লিখতে বলছে? শুধু ওর জন্য? পৃথিবীতে এর চেয়ে মধুর প্রস্তাবও কি আসে কারও কাছে?
(চলবে)

©somewhere in net ltd.