নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

এডভোকেট আশফাক

এডভোকেট আশফাক › বিস্তারিত পোস্টঃ

কারবালার হৃদয় বিদারক ইতিহাস____২য় অংশ

১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ রাত ১২:৪৫

হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম আনহু উনার শাহাদাত



ইয়াযীদী বাহিনীর মারাত্মক পরিণতির কথা উপলব্ধি করে আমর বিন সা’আদ নির্দেশ দিল, সবাই মিলে চারিদিক থেকে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামকে লক্ষ্য করে তীর নিক্ষেপ করো। নির্দেশমত ইয়াযীদী বাহিনী উনাকে চারিদিক থেকে ঘিরে বৃষ্টির মত তীর নিক্ষেপ করতে লাগলো। ফলে চারিদিক থেকে তীর এসে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামকে আঘাত হানতে লাগলো। কোনটা ঘোড়ার গায়েও লাগছিল, কোনটা উনার নিজের গায়ে পড়ছিল। এভাবে যখন তীরের আঘাতে উনার পবিত্র শরীর ঝাঁঝরা হয়ে ফিনকি দিয়ে সারা শরীর মুবারক থেকে রক্ত বের হতে লাগলো। তখন উনি বার বার মুখে হাত দিয়ে বললেন, বদবখতের দল! তোমরাতো তোমাদের নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার লেহাজও করলে না। তোমরা নিজের নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বংশধরকে কতল করছো! এভাবে যখন তিনি আর একবার মুখের উপর হাত দিলেন, তাঁর চোখের সামনে আর এক দৃশ্য ভেসে উঠল। তিনি দেখতে পেলেন, স্বয়ং হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাত মুবারকে একটি বোতল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। হযরত আলী র্ক্রাামাল্লাহু ওয়াজ্্হাহু রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ও হযরত ফাতিমাতুয্্ যাহরা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহাও পার্শ্বে আছেন আর বলছেন, ‘হুসাইন! আমাদের দিকে তাকাও, আমরা তোমাকে নিতে এসেছি।’



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কাপড় রক্তে ভিজে যাচ্ছিল আর হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই রক্ত বোতলে ভরে নিচ্ছিলেন এবং বলছিলেন, ‘হে আল্লাহ পাক! হুসাইনকে পরম ধৈর্য ধারণের ক্ষমতা দান করুন।’ নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রিয় দৌহিত্র নিজের রক্তে রঞ্জিত হয়ে গেলেন। শরীর থেকে রক্ত বের হয়ে গিয়ে একেবারে রক্তশূন্য হয়ে পড়লেন এবং আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে ঘোড়া থেকে পড়ে গেলেন। যে মুহূর্তে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম ঘোড়া থেকে পড়ে গেলেন, আল্লাহ পাক উনার আরশ দুলতে লাগলো, হযরত ফাতিমাতুয্্ যাহরা আলাইহস সালাম উনার আত্মা মুবারক যেন ছটফট করতে লাগলো, হযরত আলী র্ক্রাামাল্লাহু ওয়াজ্্হাহু রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার রূহ মুবারক থেকে যেন ‘আহ’ শব্দ উচ্চারিত হলো। সেই হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম যমীনে পড়ে গেলেন, যাকে প্রিয় নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের কাঁধ মুবারকে নিতেন। ঘোড়া থেকে পড়ে যাওয়ার পর কমবখ্্ত সীমার, হাওলা বিন ইয়াযীদ, সেনান বিন আনাস প্রমুখ বড় বড় জালিম এগিয়ে আসলো এবং হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার শরীর মুবারকের উপর চেপে বসলো। সীমার বুকের উপর বসলো। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম বুকের উপর সীমারকে দেখে বললেন, আমার নানাজান ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঠিকই বলেছেন, ‘এক হিংস্র কুকুর আমার আহলে বাইতের রক্তের উপর মুখ দিচ্ছে’, আমার নানাজান ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কথা মুবারক নির্ঘাত সত্য, তুমিই আমাকে শহীদকারী। আজ জুমুয়ার দিন। এ সময় লোকেরা আল্লাহ পাক উনার দরবারে সিজদারত। আমার মস্তকটা তখনই আমার শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করো, যখন আমিও সিজদারত থাকি।’



আল্লাহু আকবর! দেখুন, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম জীবন সায়াহ্নের সেই মুহূর্তেও পানি পান করার ইচ্ছা প্রকাশ করেননি, নিজের ছেলেমেয়েকে দেখার জন্য আরজু করেননি, সেই সময়ও আকাঙ্খা বা আরজু এটাই ছিল যে, আমার মাথা নত হলে যেন আল্লাহ পাক উনার সমীপেই নত হয়।



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম সিজদায় মাথা রাখলেন এবং سبحان ربى الاعلى ‘সুবহানা রব্বিইয়াল আ’লা’ তাসবীহ পাঠ করে বললেন, মাওলা! যদি হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কুরবানী আপনার দরবারে গৃহীত হয়, তা’হলে এর ছওয়াব নানাজান ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উম্মতের উপর বখশিশ করে দিন। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার মস্তক মুবারক যখন শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হলো, তখন উনার ঘোড়া স্বীয় কপালকে উনার রক্তে রঞ্জিত করল এবং দৌড়ে চলে যেতে লাগল, তখন সীমার লোকদেরকে বলল, ঘোড়াটিকে ধরো, কিন্তু যতজন লোক ঘোড়াটি ধরতে এগিয়ে গেল, সে সবাইকে আক্রমণ করল এবং দাঁত আর পা দিয়ে জখম করে ওদেরকে শেষ করে দিল। সতের জন লোককে এভাবে খতম করল। শেষ পর্যন্ত সীমার বলল, ছেড়ে দাও, দেখি কি করে? ঘোড়া ছুটে গিয়ে তাঁবুর কাছে গেল এবং কান্না ও চিৎকার করতে লাগলো।

_____

হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার শহীদী দেহ মুবারকের পার্শ্বে হযরত যয়নাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা



হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম যখন ঘোড়ার কান্না ও চিৎকার শুনলেন, তখন তিনি হযরত সখিনা আলাইহিস সালাম আলাইহাকে ডেকে বললেন, বেটি! একটু দাঁড়াও, আমি বের হয়ে দেখে আসি, সম্ভবতঃ তোমার আব্বা এসেছেন। মজলুম বোন বের হয়ে দেখলেন, ঘোড়ার জীন খালি এবং ঘোড়ার কপাল রক্তে রঞ্জিত। তা দেখে হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম বুঝতে পারলেন, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম শাহাদাত বরণ করেছেন এবং তিনি চিৎকার দিয়ে বলে উঠলেন- واه حسينا ‘ওয়াহ্্ হুসাইনা’ واه غريبا ‘ওয়াহ্্ গরীবা।’ তাঁর এ আওয়াজ শুনার সাথে সাথে তাঁবুর অভ্যন্তরে ক্রন্দনের রোল পড়ে গেলো। হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম ডাক দিয়ে বললেন, শহরবানু! সখিনাকে থামিয়ে রেখ, আমি ভাইয়ের খবর নিতে যাচ্ছি।



হযরত ফাতিমাতুয্্ যাহরা আলাইহস সালাম উনার কন্যা হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম; যার মাথার ওড়নাও কোন অপরিচিত ব্যক্তি কখনো দেখেনি, যিনি ঘরের চৌহদ্দি থেকে কখনো বের হননি, আজ পরদেশে অসহায় অবস্থায় মুখের উপর পর্দা ফেলে ভাইয়ের শহীদী দেহ মুবারক দেখার জন্য কারবালার ময়দানের দিকে ছুটে চললেন। যেতে যেতে তিনি বলতে লাগলেন, ‘ওহে যালিমেরা! পথ ছেড়ে দাও, আমার ভাইকে দেখতে দাও।’ ওরা বলল, আপনি উনাকে কি দেখবেন? উনার মাথা মুবারক শরীর মুবারক থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে।



হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম গিয়ে ভাইয়ের রূহবিহীন, মস্তকবিহীন দেহ মুবারক দেখে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন, আর বলতে লাগলেন, ভাইজান! আপনিতো আমাদেরকে যালিমদের হাওলা করে চলে গেলেন।



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার শহীদী দেহ মুবারক কারবালার যমীনে পড়ে রইল। যেসব লোকেরা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার শহীদী দেহ মুবারক দাফন করেছিলেন, তারা বলেছেন যে, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার শরীর মুবারকে চৌঁত্রিশটি বর্শার ছিদ্র , চল্লিশটা তলোয়ারের আঘাত এবং একশত একুশটি তীরের জখম ছিল।



হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম নিজের ভাইয়ের শহীদী দেহ মুবারকের পাশে বিভোর হয়ে পড়ে রইলেন; এদিকে হযরত সখিনা আলাইহিস সালাম আলাইহা, হযরত শহরবানু আলাইহাস সালাম থেকে নিজেকে মুক্ত করে কারবালার ময়দানের দিকে অঝোর নয়নে ক্রন্দনরত অবস্থায় ছুটে আসলেন এবং চিৎকার করে বলতে লাগলেন, ফুফু! আপনি কোথায়? আমার আব্বু কোথায়? আওয়াজ শুনে ফুফু ডাক দিলেন, বেটি! এদিকে এসো, তোমার মজলুম ফুফু তোমার আব্বুর পাশে বসে আছেন। হযরত সখিনা আলাইহিস সালাম আলাইহা যখন নিজের আব্বাজানকে দেখলেন, চিনতে পারলেন না। কারণ উনার সমস্ত শরীর মুবারক রক্তে রঞ্জিত ছিল এবং মস্তক মুবারক শরীর থেকে বিছিন্ন ছিল। মা’ছুমা সখিনা রহমতুল্লাহি আলাইহা আব্বাজানের দেহ মুবারকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বেহুঁশ হয়ে গেলেন। হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম হযরত সখিনা আলাইহাস সালাম উনার হাত টেনে ধরে বললেন, মা সখিনা! ওঠ, আমি তোমাকে তাঁবুতে দিয়ে আসি। আমার ভাই, আমাকে বলেছিলেন, তোমাকে সান্ত¡না দেয়ার জন্য। উনি জোর করে হযরত সখিনা আলাইহিস সালাম আলাইহাকে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার বুক মুবারক থেকে ছাড়িয়ে তাঁবুতে নিয়ে গেলেন।



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম ও উনার অন্যান্য সঙ্গী সাথীদের শহীদী দেহ মুবারক কারবালার ময়দানে পড়ে রইলো। ইয়াযীদী বাহিনীরা, যারা ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে মনে করেছিল তারা বিজয়ী হয়েছে, বাস্তবে তাদের এমন পরাজয়ই হয়েছে যা আর কারো হয়নি। কারণ তারা চিরতরের জন্য আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শাফায়াত ও জান্নাত থেকে বঞ্চিত। যাক, তারা এক রাত সেখানে অবস্থান করলো। যখন তারা শুয়ে পড়ল, হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম মুখে পর্দা ফেলে তাঁবু থেকে পুনরায় বের হলেন। দেখলেন, হযরত ফাতিমাতুয্্ যাহরা আলাইহস সালাম উনার বাগানের জান্নাতী ফুল কারবালার প্রান্তরে পড়ে রয়েছেন। নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নয়নের মণি চকমক করছেন। হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম এক পলক সকল প্রিয়জনকে দেখলেন। ছবর ও ধৈর্যে অটল থাকা সত্ত্বেও অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। কাঁদতে কাঁদতে এক এক জনকে দেখে দেখে শেষে ভাইয়ের দেহ মুবারকের পাশে আসলেন এবং বসে পড়ে বললেন, ‘ওহে আমার ভাইজান! আমি অসহায়, অপারগ, ভিন-দেশের মুসাফির। মদীনা মুনাওওয়ারা অনেক দূর। আমি কিভাবে ওখানে আপনার খবর পৌঁছাবো? আমি কিভাবে আপনার দাফন করবো?’



হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম মদীনা মুনাওওয়ারার দিকে মুখ করে ক্রন্দনরত অবস্থায় হাত তুলে বলতে লাগলেন, ‘ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনার দৌহিত্র হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার মস্তকবিহীন দেহ মুবারক কাফন ও দাফন বিহীন রক্তে রঞ্জিত অবস্থায় পড়ে রয়েছেন।’ আর এদিকে রুগ্ন হযরত যাইনুল আবিদীন আলাইহিস সালাম হাত তুলে বলছেন-



للعالـمين- ادركنى زين العابدين يارحمة



‘ইয়া রহমতাল্লিল আলামীন! আদরিকী যাইনাল আবিদীন’ অর্থাৎ ‘হে রহমাতুল্লিল আলামীন ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমার উপর রহম করুন।’ এভাবে রাত্রি অতিবাহিত করলেন।



উলামায়ে কিরামগণ লিখেছেন যে, ‘হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার শাহাদাতের সময় সূর্যগ্রহণ হয়েছিল, আসমান ঘোর অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল, ফলে দিনে তারকারাজি দৃষ্টিগোচর হয়েছিল। কিছুক্ষণ পর আকাশ কালো থেকে লাল বর্ণে পরিণত হয়েছিল এবং আসমান থেকে রক্ত বর্ষিত হয়েছিল। সাতদিন পর্যন্ত এ রক্ত বর্ষণ অব্যাহত ছিল। সমস্ত ঘর বাড়ির দেয়াল রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল এবং যেসব কাপড়ের উপর রক্ত পতিত হয়েছিল, সেসব কাপড় ছিড়ে টুকরো টুকরো হওয়ার পরও সেই রক্তের লালিমা যায়নি। যমীনও কান্নাকাটি করেছিল। বায়তুল মুকাদ্দাসে যে পাথরটা উঠানো হতো, সেই পাথরের নিচ থেকে তাজা রক্ত বের হতো। পানি ভর্তি কলস রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল। ইয়াযীদী বাহিনীরা যখন উট যবেহ করেছিল তখন সে উটের ভিতর থেকে রক্তের পরিবর্তে আগুনের লেলিহান শিখা বের হয়েছিল। জিনদের মধ্যেও শোক-বেদনা ছড়িয়ে পড়েছিল। এক অদ্ভুত ও বিস্ময়কর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল।



অনেক বেদনাবিধূর, রোমহর্ষক ঘটনার কথা স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে। কিন্তু হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার শাহাদাত অপরিসীম হৃদয় বিদারক। এর কল্পনা করাও যায় না। এর স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠলে মন-প্রাণ শিউরে ওঠে।

_____

ইমাম পরিবারকে কূফায় আনয়ন



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার শাহাদাতের পর ইয়াযীদী বাহিনী একরাত কারবালার প্রান্তরে অবস্থান করেছিল। পরের দিন সকালে তারা তাদের মৃতদেরকে দাফন করেছিল। কিন্তু শহীদদের দেহ মুবারকগুলো দাফন ও কাফন বিহীন অবস্থায় যেমনি ছিল, তেমনি অবস্থায় ফেলে রেখে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার পরিবারের অবশিষ্ট মহিলা ও শিশুদেরকে বন্দি করে উটের উপর আরোহণ করিয়ে কূফার দিকে রওয়ানা দিল। চলতে চলতে তারা রাত্রি বেলা কূফার কাছে গিয়ে পৌঁছল। ঐখান থেকে মাত্র দুই মঞ্জিল দূরত্বে ছিল কূফার রাজধানী।



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার মস্তক মুবারক নিয়ে ‘হাওয়া বিন ইয়াযীদ’ যখন রাত্রে কূফার রাজধানীতে এসে পৌঁছেছিল, তখন গভর্নর ভবনের শাহী দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এর জিম্মাদারী যেহেতু ওর হাতে, সেহেতু অন্য কাউকে হস্তান্তর না করে মস্তক মুবারক তার নিজের ঘরে নিয়ে গেল। ঘরে নিয়ে গিয়ে একটি মাটির বাসনের নিচে মস্তক মুবারক রেখে দিল। ওর স্ত্রী জিজ্ঞাসা করল, তুমি কি এনেছ? সে উত্তরে হযরত ইমাম হুসাইন ইবনে আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার মস্তক মুবারকের কথা বললো। এটা শুনে তার স্ত্রী শিউরে উঠলো এবং বলল, ‘কী জঘন্য ব্যাপার! তোমার ঘর ধ্বংস হয়ে যাবে। হযরত ইমাম হুসাইন ইবনে আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার মস্তক মুবারক! নবী মুস্তফা ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দৌহিত্রের মস্তক মুবারক তুমি মাটির থালার নিচে রাখতে পেরেছ! আফসুস! মানুষ ঘরে সোনা-চান্দি আনে, আর তুমি এনেছ নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দৌহিত্রের ছিন্ন মস্তক মুবারক? আর এভাবে বেয়াদবী এবং অবজ্ঞাভরে রেখে দিয়েছ! আমি তোমার মত বদবখত্ লোকের সাথে থাকতে চাই না’- এ বলে তিনি মস্তক মুবারকের কাছে এসে সসম্মানে তা মাটি থেকে উঠিয়ে উচ্চ স্থানে রাখলেন এবং পাশে বসে ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় চিন্তা করতে লাগলেন, কী জানি আমাদের ঘরে আল্লাহ তায়ালা’র কোন্ গযব নাযিল হয়। এমন সময় তিনি কী দেখতে পেলেন, তা তার ভাষায় শুনুন- আমি দেখলাম, আসমান থেকে ছোট ছোট সাদা পাখির আগমন হলো এবং সেগুলো উনার মস্তক মুবারকের এদিক সেদিক উড়ছিল এবং ঘুরাঘুরি করছিল। একবার চলে যেত, আবার আসত। সারা রাত এ অবস্থায় ছিল। আর মাঝে মধ্যে মস্তক মুবারক থেকে এমন উজ্জ্বল আলো বিচ্ছুরিত হতে দেখলাম, যা আসমান পর্যন্ত আলোকিত করে ফেলত।

_____

ইবনে যিয়াদের নিষ্ঠুর আচরণ



রাত অতিবাহিত হওয়ার পর সকাল হলো। ইবনে যিয়াদ সভাগৃহে আগমন করল এবং তাকে কারবালার তথাকথিত বিজয় সম্পর্কে অবহিত করল। হাওলা বিন ইয়াযীদ হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার মস্তক মুবারক নিয়ে একটা পাত্রের উপর রেখে তা’ ইবনে জিয়াদের সামনে রাখল। তখন ইবনে যিয়াদের হাতে একটি ছড়ি ছিল। সে ছড়ির মাথা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার ঠোঁট মুবারকের উপর লাগাল এবং দাঁত মুবারকের সাথে ঘষতে লাগল। সেই সময় তার সভাগৃহে নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার একজন বৃদ্ধ ছাহাবী হযরত যায়িদ বিন হাসান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উপস্থিত ছিলেন। তিনি এ বেয়াদবী দেখে কেঁদে ফেললেন এবং বলে উঠলেন, ‘হে ইবনে যিয়াদ! যে ঠোঁট এবং দাঁত মুবারকের উপর তুমি আঘাত হানছো, খোদার কছম করে বলছি- আমি স্বয়ং দেখেছি, সে দাঁত ও ঠোঁট মুবারকের উপর নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চুমু দিতেন। আর আজ তুমি সে ঠোঁট এবং দাঁত মুবারকের সাথে বেয়াদবী করছ?’ ভর মজলিসে এ কথাগুলো বলার কারণে ইবনে যিয়াদ খুবই রাগান্বিত হল এবং বলল, এ বৃদ্ধকে এখান থেকে বের করে দাও। বৃদ্ধ না হলে আমি এ মুহূর্তে গর্দান দ্বিখ-িত করে ফেলতাম। হযরত যায়িদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, ‘তোমার জন্য আফসুস! তুমি আমাকে বৃদ্ধ হিসেবে সহানুভূতি দেখালে, কিন্তু রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শরাফতের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করলে না! আমি বৃদ্ধ বলে তুমি আমাকে রেহাই দিলে, কিন্তু হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কলিজার টুকরা ও দৌহিত্র হওয়া সত্ত্বেও কোন সমীহ করলে না!’ উনার কথার প্রতি কোনরূপ কর্ণপাত না করে ইবনে জিয়াদের অনুচরেরা উনাকে বেত্রাঘাত করে দরবার থেকে বের করে দিল। (নাঊযুবিল্লাহ)



ইবনে যিয়াদ দরবারে দাঁড়িয়ে কয়েকটি দাম্ভিকতাপূর্ণ কথা বলল। যেমন- ‘সব প্রশংসা সেই আল্লাহ’র জন্যে, যিনি দুশমনকে নাজেহাল করেছেন, নাঊযুবিল্লাহ! যিনি দুশমনকে পরাজিত করেছেন, নাঊযুবিল্লাহ! এবং ইবনে যিয়াদকে বিজয় দান করেছেন, নাঊযুবিল্লাহ! এ ধরনের কথা সে বলছিল। সেই সময় খায়বর বিজয়ী বীরের কন্যা হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম সেখানে কয়েদী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলে উঠলেন- ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ পাক উনার জন্যে, যিনি হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম উনার বংশধর হওয়ার কারণে আমাদের সম্মানিত করেছেন। আর যিনি আমাদের সম্পর্কে আয়াতে কারীমা নাযিল করেছেন এবং আমাদের পূত-পবিত্রতার কথা ঘোষণা করেছেন।’ ইবনে যিয়াদ বলে উঠল, তুমি কি এখনও সেই কথা বলছো! তুমি কি দেখনি তোমার ভাইয়ের কি পরিণতি হয়েছে? হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম কেঁদে দিলেন এবং কেঁদে কেঁদে বললেন, ‘হে ইবনে যিয়াদ! সেই সময় বেশি দূরে নয়, যখন হাশরের ময়দানে একদিকে নবীয়ে দো’জাহান হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থাকবেন আর একদিকে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম থাকবেন; তখন তুমি দেখবে যালিমদের কী পরিণতি হয়। আমাদের আরজি আল্লাহ তায়ালা’র দরবারে পেশ করেছি’ এ কথাগুলো বলে তিনি নিশ্চুপ হয়ে গেলেন।



ইত্যবসরে হযরত ইমাম যাইনুল আবিদীন আলাইহিস সালাম-এর প্রতি ইব্নে জিয়াদের চোখ পড়ল। সে জিজ্ঞাসা করলো, এ কে? ইয়াযীদ বাহিনীরা বলল, এ হলো হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার ছেলে। ইব্নে যিয়াদ বলল, তোমরা একে কেন রেখে দিয়েছ? একে কেন কতল করোনি? ওরা বলল, এ অসুস্থ ছিল এবং আমাদের সাথে মোকাবেলা করতে আসেনি। এজন্য আমরা একে কতল করিনি। ইবনে যিয়াদ বলল, একেও কতল করে দাও। আমি চাই না যে, এদের একজনও বেঁচে থাকুক। পাপিষ্ঠ ইবনে যিয়াদ এ কথাগুলো বলার সাথে সাথে জল্লাদ তলোয়ার নিয়ে এগিয়ে আসলো। হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম হযরত যাইনুল আবিদীন আলাইহিস সালাম আলাইহিকে জড়িয়ে নিলেন এবং বললেন, ওহে যালিমেরা! আমাদের সাথে কোন পুরুষ মাহরাম (আপনজন) নেই। এ একমাত্র আমাদের মাহরাম। যদি তোমরা একেও কতল করো, আমাদের সাথে কোন মাহরাম থাকবে না। তাই তোমরা এটা জেনে রেখো, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা আমাকে কতল না করবে, এর আগে তোমরা এর কাছেও পৌঁছতে পারবে না। যদি একে কতল করতে চাও তাহলে প্রথমে আমাকে কতল করো। ওহে যালিমেরা! একে বাঁচতে দাও। যদি তোমরা একেও কতল করে ফেল, তাহলে আওলাদে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ‘সিলসিলা’ কিভাবে জারি থাকবে? এ কথাগুলো বলার পর আল্লাহ তায়ালা ইব্নে জিয়াদের অন্তরে এমন এক ভীতি সৃষ্টি করে দিলেন, শেষ পর্যন্ত সে তার এ ঘৃণিত সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রইলো।



এরপর ইবনে যিয়াদ কূফা শহরে সাধারণ সমাবেশের আয়োজন করলো এবং সমবেত লোকদের ধমকী ও হুমকী দিয়ে বলল, দেখ! যারা ইয়াযীদের বিরোধিতা করেছে, তাদের কী পরিণতি হয়েছে। তোমরাও যদি ইয়াযীদের বিরুদ্ধে কোন কথা বলো, তাহলে তোমাদেরও একই পরিণতি হবে। সে নির্দেশ দিল, শহীদদের মস্তকসমূহ বর্শার অগ্রভাগে নিয়ে এবং আহলে বাইত-এর সদস্যদেরকে উটের পিঠে উঠিয়ে কূফার অলিতে-গলিতে যেন ঘুরানো হয়, যাতে লোকেরা দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং আগামীতে ইয়াযীদের বিরুদ্ধে কোন বিদ্রোহ করার সাহস না পায়। নির্দেশ মুতাবিক মহান শহীদগণের পবিত্র মস্তকসমূহ বর্শার অগ্রভাগে উঠিয়ে কূফার অলিতে-গলিতে ঘুরানো হলো এবং সাথে আহলে বাইত-এর সেই পর্দানশীন সম্মানিতা মহিলাগণও ছিলেন, যাদের দোপাট্টা পর্যন্ত লোকেরা আগে কখনও দেখার সুযোগ পায়নি। দুঃখের বিষয়! আজ তাদেরকে বেপর্দাভাবে কুফার অলিতে-গলিতে ঘুরানো হচ্ছে!



যখন তাঁদেরকে ঘুরানো হচ্ছিল তখন ঐসমস্ত কূফাবাসী, যারা চিঠি লিখে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামকে দাওয়াত দিয়েছিল, যারা হযরত ইমাম মুসলিম আলাইহিস সালাম আলাইহি-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেছিল এবং যারা বড় বড় শপথ করে বলেছিল, ‘জান-মাল উৎসর্গ করে দিব তবুও আপনার সঙ্গ ত্যাগ করবো না।’ যারা আহলে বাইত-এর মুহব্বতের বড় দাবিদার ছিল, যারা নিজেদেরকে আহলে বাইত-এর প্রেমিক বলতো, সেই কূফাবাসীরা, পবিত্র মস্তকসমূহ বর্শার অগ্রভাগে নিয়ে এবং আহলে বাইত-এর সদস্যগণকে একান্ত অমানবিকভাবে কূফার অলিতে-গলিতে যখন ঘুরাতে দেখলো, তখন তারা নিজেদের ঘরের ছাদের উপর দাঁড়িয়ে, কেউ ঘরের জানালার পার্শ্বে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদছিল।



যখন হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম তাদের এ কান্না ও চিৎকার করতে দেখলেন, তখন তিনি উটকে থামাতে বললেন এবং ওদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, ওহে কুফাবাসী! আজ তোমরা কেন কান্না-রোনাজারি করছো? হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কাছে চিঠি প্রেরণকারী ছিল কারা? উনাকে কূফায় আসার জন্য দাওয়াত দানকারী ছিল কারা? হযরত ইমাম মুসলিমকে যখন প্রতিনিধি করে পাঠানো হয়েছিল, তখন তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেছিল কারা? এবং মুখে বড় বড় কথা বলে শপথ করে জান-মাল কুরবানী করার নিশ্চয়তা দানকারী ছিল কারা? নাফরমানরা! তোমরাইতো চিঠি লিখেছিলে, তোমরাইতো নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দৌহিত্রকে দাওয়াত করে এনেছিলে। এরপর তোমরাইতো বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলে এবং উনাদেরকে যালিমদের হাতে সোপর্দ করেছিলে, ফলে নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দৌহিত্রকে একান্ত অমানবিকভাবে শহীদ হতে হলো। আর এখন তোমরা অশ্রুপাত করছ! বিশ্বাসঘাতকের দল! তোমরা কি মনে করেছো, তোমাদের এ অশ্রুপাতের ফলে তোমাদের কপাল থেকে আহলে বাইত-এর রক্তের দাগ মুছে যাবে? না! কক্ষনো তা হবে না। কিয়ামত পর্যন্ত তোমরা কাঁদতে থাকলেও তোমাদের ললাট থেকে এ রক্তের দাগ মুছবে না। আমি আল্লাহ পাক উনার নিকট ফরিয়াদ করছি, তোমরা কিয়ামত পর্যন্ত এভাবে কাঁদতে ও চিৎকার করতে থাক। হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম কথাগুলো বলে সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন।

______

শহীদ পরিবার ও খন্ডিত মস্তক মুবারক দামেস্কে প্রেরণ



এভাবে তিনদিন পর্যন্ত মস্তকসমূহ ও শহীদ পরিবারের সদস্যগণকে ঘুরানোর পর ইবনে যিয়াদ নির্দেশ দিল, এবার এ মস্তকসমূহ ও শহীদ পরিবারের সদস্যদেরকে দামেস্কে ইয়াযীদের কাছে নিয়ে যাও। ইবনে যিয়াদ আরো বলল যে, পথের মধ্যে কোন গ্রাম, বাজার, কোন লোক বসতি সামনে পড়লে যেন তাকবীর ইত্যাদি বলে শোরগোল করে যাওয়া হয়, যাতে লোকেরা ভয় পায় এবং ইয়াযীদের বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ করার সাহস না পায়।



অতঃপর ইয়াযীদী বাহিনী মস্তক সমূহ বর্শায় বিদ্ধ করে এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদেরকে উটের উপর উঠিয়ে কূফা থেকে দামেস্কের পথে রওয়ানা দিল। চলতে চলতে রাত্রিবেলা এক গীর্জার সন্নিকটে উপনীত হলো। যে সময় এ কাফেলা গীর্জার কাছে পৌঁছল, সে সময় গীর্জা থেকে এর প্রধান পাদ্রী বের হয়ে ওদের সামনে এসে জিজ্ঞাসা করল, তোমরা কে? কোথা থেকে আসতেছ? এ মস্তকগুলো কাদের? এ মহিলাগণ কারা? তোমরা যাচ্ছ কোথায়? ঘটনা কি? তারা সম্পূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করল। পাদ্রী সম্পূর্ণ ঘটনা শুনার পর বলল, তোমরা চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছ, রাতটা এখানেই কাটাও এবং এক রাতের জন্য হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার মস্তক মুবারকটি আমার কাছে আমানত রাখ এবং এসব পুত-পবিত্র মহিলাগণ যারা আছেন উনাদের খিদমত করারও আমাকে সুযোগ দাও। ওরা বলল, তা কিছুতেই হতে পারে না। সরকারের গুরু দায়িত্ব আমাদের কাঁধে অর্পণ করা হয়েছে। এ মস্তক আমরা কারো কাছে দিতে পারি না। মস্তক ও এদেরকে ইয়াযীদের কাছে পৌঁছাতে হবে। পাদ্রী বলল, ঠিক আছে পৌঁছাবে, কিন্তু এ রাত্রেতো আর পৌঁছাতে পারবে না। ওরা বলল, আমরা এখানে রাত অতিবাহিত করতে রাজী আছি। কিন্তু মস্তক দিতে রাজী নই। পাদ্রী বলল, আমার থেকে টাকা নিয়ে হলেও এক রাত্রের জন্যে মস্তকটি আমার হিফাজতে দাও এবং আমি ওয়াদা করছি, তোমাদের মস্তক ফিরিয়ে দিব। ওরা বলল, আমাদেরকে কত টাকা দিবেন? পাদ্রী বলল, আমার কাছে আমার সারা জীবনের উপার্জন আশি হাজার দিরহাম জমা রয়েছে। আমি সব তোমাদেরকে দিয়ে দিব। তোমরা শুধু এক রাত্রের জন্যে মস্তকটি দাও। ওরা চিন্তা করল, ইয়াযীদ থেকে তো বখশিশ পাবই, আর এদিকে নগদ আশি হাজার দিরহাম হাতছাড়া করবো কেন? শেষ পর্যন্ত তারা রাজী হয়ে গেল এবং এক রাত্রের জন্যে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার মস্তক মুবারকটি উক্ত পাদ্রীকে দিয়ে দিল।



পাদ্রী গীর্জার এক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কামরা আহলে বাইত-এর সম্মানিত সদস্যগণকে বিশ্রামের জন্য দিয়ে দিল এবং উনাদের খিদমত করার জন্য কয়েকজন খাদিম নিয়োজিত করে তাদেরকে বলে দিল যেন উনাদের কোন কষ্ট না হয়। আহলে বাইত-এর সদস্যগণ পাদ্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন, পাদ্রী সাহেব! আমাদের আগমনের খবর আপনি কিভাবে জানতে পারলেন? পাদ্রী বলল, আমি ভিতরে বসা ছিলাম, তখন আপনাদের কাফেলা বেশ কিছু দূরে ছিল, আমি হঠাৎ শুনলাম, আমার গীর্জার বড় দেয়ালটা কাঁদছে। আমি আমার জীবনে এ রকম কান্না আরও কয়েকবার শুনেছি। কান্না শুনার পর আমি বুঝতে পারলাম, কোন একটা অঘটন ঘটেছে। তখন আমি বের হলাম, কি ঘটনা ঘটল তা দেখার জন্য। তখন আমি আপনাদের কাফেলা দেখতে পেলাম। এবং সমস্ত ঘটনা শুনে বুঝতে পারলাম, আপনাদের প্রতি অমানুষিক জুলুম করা হয়েছে। নবী মুস্তফা ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দৌহিত্রকে নিদারুণ অত্যাচারের সাথে শহীদ করা হয়েছে এ জন্যই বড় দেয়ালটা কাঁদছিল।



অতঃপর পাদ্রী উনাদেরকে ধৈর্যধারণের কথা বললেন এবং বললেন, আল্লাহ তায়ালা’র নেক বান্দাগণের প্রতি এরকম মুছিবত আগেও এসেছে, বর্তমানেও আসছে এবং ভবিষ্যতেও আসবে। আপনাদেরকে ধৈর্য ও সহনশীলতার পরাকাষ্ঠা দেখাতে হবে। আল্লাহ তায়ালা আপনাদের নাম কিয়ামত পর্যন্ত চির জাগরুক রাখবেন।



এরপর পাদ্রী ইয়াযীদ বাহিনীকে আশি হাজার দিরহাম দিয়ে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার মস্তক মুবারক নিয়ে নিলেন। মস্তক মুবারক নিয়ে তিনি তার উপাসনালয়ে চলে গেলেন। চেহারা মুবারকে যেসব রক্তের দাগ ছিল, তিনি সব পরিষ্কার করলেন এবং নিজের কাছে যা সুগন্ধি ছিল সব হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার চুল ও দাড়ী মুবারকে ঢেলে দিলেন এবং একটি রেশমী কাপড়ে জড়িয়ে উঁচু জায়গায় রাখলেন আর সারা রাত তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন ও কান্না-কাটি করলেন। তিনি হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার মস্তক মুবারকের যথাসাধ্য যত্ন নিলেন এবং যথাযথ সম্মান করলেন।



মহান আল্লাহ পাক উনার রহমতের শান দেখুন, সকাল বেলা পাদ্রীর মুখ থেকে কালিমা তাইয়্যিবাহ্ জারি হয়ে গেল। মস্তক মুবারকের তা’যীম করার ফলে আল্লাহ তায়ালা উনাকে ঈমানী দৌলত দ্বারা পরিতুষ্ট করলেন এবং তিনি মুসলমান হয়ে গেলেন। তিনি দুনিয়াবী দৌলত ত্যাগ করলেন, আল্লাহ তায়ালা উনাকে ঈমানী দৌলত দান করলেন। তিনি অস্থায়ী দৌলত (আশি হাজার দিরহাম) ব্যয় করলেন, আল্লাহ তায়ালা এর বিনিময়ে উনাকে স্থায়ী দৌলত (ঈমান) দান করলেন।



সকালে ইয়াযীদী বাহিনী পবিত্র মস্তকসমূহ ও শহীদ পরিবারের সদস্যগণকে নিয়ে পুনরায় রওয়ানা দিল। কিছু দূর যাওয়ার পর ইয়াযীদী বাহিনী পরস্পর শলা-পরামর্শ করে পাদ্রী প্রদত্ত আশি হাজার দিরহাম তাদের মধ্যে বণ্টন করে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিল। কারণ, ইয়াযীদ জানতে পারলে সব দিরহাম নিয়ে নিতে পারে। সিদ্ধান্ত মুতাবিক বণ্টন করার জন্য যেইমাত্র দিরহামের পুটলি খুলল, তখন দেখতে পেল সব মাটির পাত্রের ভাঙ্গা টুকরা এবং প্রতিটি টুকরার দুই পিঠে পবিত্র কুরআন শরীফ-এর আয়াত শরীফ লিখা। এক পিঠে লিখা ছিল-



وسيعلم الذين ظلموا اى منقلب ينقلبون



অর্থ: ‘যুুলুমকারীরা অতিসত্ত্বর জানতে পারবে, তারা কোন দিক হয়ে বসে আছে।’ (সূরা শুয়ারা-২২৭)



অপর পিঠে লিখা ছিল- ولاتحسبن الله غافلا عما يعمل الظالمون



অর্থ: ‘আল্লাহ তায়ালাকে যালিমের কাজকর্মের প্রতি উদাসীন মনে করো না। যালিমরা যা কিছু করছে, আল্লাহ তায়ালা সব জানেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালাকে বেখবর মনে করো না।’ (সূরা ইবরাহীম-৪২)



দেখুন, আশি হাজার দিরহাম ওরা নিয়েছিল, কিন্তু তা মাটির পাত্রের ভাঙ্গা টুকরা হয়ে গেল। তারাতো দ্বীনের পরিবর্তে দুনিয়াকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল, সেটাতো বিফল হলো। কিন্তু যারা দুনিয়াকে অবজ্ঞা করে দ্বীনকে আঁকড়িয়ে ধরে, দুনিয়াবাসী তাঁদের পিছনে ঝুঁকে পড়ে, সম্পদ তাঁদের পদতলে গড়াগড়ি খায়।

_____

ইয়াযীদের দরবারে শহীদ পরিবার ও ইয়াযীদের ভন্ডামী



ইয়াযীদী বাহিনী আশি হাজার দিরহামের অনুশোচনা করতে করতে দামেস্কে পৌঁছল এবং ইয়াযীদের দরবারে গিয়ে সমস্ত ঘটনার বিবরণ দিল। ইয়াযীদ সমস্ত ঘটনা শুনে বলল, ইবনে যিয়াদ খুবই বাড়াবাড়ি করেছে। আমি ওকে এতটুকু করতে বলিনি। এমনকি অনেক কিতাবে লিখা হয়েছে যে, ইবনে যিয়াদের প্রতি ইয়াযীদ লা’নত দিয়েছিল। অর্থাৎ সে বলেছিল, আল্লাহ তায়ালা ইবনে যিয়াদের উপর লা’নত করুন। ইবনে যিয়াদ খুবই অত্যাচার করেছে, আমার উদ্দেশ্য তা ছিল না। আমার উদ্দেশ্য ছিল, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামকে যেন নজর বন্দী করে রাখা হয়, যাতে লোকেরা আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করে। কিন্তু এ ধরনের কথার দ্বারা ইয়াযীদ রেহাই পেতে পারে না। যা কিছু হয়েছে ইয়াযীদের ইঙ্গিতেই হয়েছে। সে ইবনে যিয়াদকে সর্বময় ক্ষমতা প্রদান করেছিল যেন সে যা প্রয়োজন হয়, তা করে। যাতে তার বিরুদ্ধে গড়ে উঠা বিদ্রোহ দমন হয়ে যায়। ইয়াযীদ ভনিতাপূর্ণ দরদমাখা কথা-বার্তা এজন্যে বলেছিল, যাতে লোকজন তার বিরুদ্ধে চলে না যায় এবং লোকেরা যেন মনে করে, সে এ ধরনের আচরণ করার পক্ষপাতি ছিল না। এসব কথার কারণে অনেক লোক ইয়াযীদকে ভাল বলে আখ্যায়িত করে তাদের রচিত কিতাবে লিখেছে যে, ‘ইয়াযীদ এ শাহাদাতে রাজী ছিল না। সুতরাং, ইয়াযীদ নয় বরং ইবনে যিয়াদই এ ঘটনার জন্য দায়ী।’



মূলতঃ এ ঘটনার জন্য ইয়াযীদই দায়ী ছিল। যার কারণে আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত-এর নির্ভরযোগ্য কিতাব ‘কিতাবুল আক্বায়িদ’-এ লিখা হয়েছে, ইয়াযীদের উপর, ইবনে যিয়াদের উপর, আহলে বাইত-এর সদস্যগণের শহীদকারীদের উপর লা’নত বর্ষিত হোক। যদি ইয়াযীদ নির্দোষ ও নিষ্পাপ হতো তাহলে হযরত ইমাম নাসাফী আলাইহিস সালাম তাঁর ‘কিতাবুল আক্বায়িদ’-এ এ ধরনের কথা কখনও লিখতেন না। আর ইয়াযীদের পরবর্তী পদক্ষেপে তার আসল রূপ আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এতকিছু বলার পরও সে শহীদগণের মস্তক মুবারক গুলোকে রাতে রাষ্ট্রীয় ভবনের শাহী দরজায় টাঙ্গানোর জন্য এবং দিনে দামেস্কের অলিতে-গলিতে ঘুরানোর নির্দেশ দিয়েছিল। নির্দেশ মত মস্তক মুবারকসমূহ দামেস্কের অলি-গলিতে ঘুরানো হয়েছিল।



নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিশিষ্ট ছাহাবী হযরত মিনহাল বিন্ আমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেছেন, খোদার কসম! আমি স্বচক্ষে দেখেছি যে, যখন হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার মস্তক মুবারক বর্শার অগ্রভাগে উঠিয়ে দামেস্কের গলিতে এবং বাজারসমূহে ঘুরানো হচ্ছিল, তখন মিছিলের আগে আগে এক ব্যক্তি কুরআন শরীফ-এর সূরা কাহাফ তিলাওয়াত করছিল। যখন সে এ আয়াতে কারীমা-



ام حسبت ان اصحاب الكهف والرقيم كانوا من ايتنا عجبا



অর্থাৎ ‘নিশ্চয়ই আছহাবে কাহাফ ও রক্বীম আমার নিদর্শনসমূহের মধ্যে এক আশ্চর্যজনক নিদর্শন ছিল’ (সূরা কাহাফ-৯) পাঠ করছিল তখন হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার বিচ্ছিন্ন মস্তক মুবারক থেকে আওয়াজ বের হলো- اعجب من اصحاب الكهف قتلى وحملى অর্থাৎ ‘আছহাবে কাহাফ-এর ঘটনা থেকে আমার শাহাদাত এবং আমার মস্তক নিয়ে ঘুরাফেরা আরও অধিক আশ্চর্যজনক।’ আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ ফরমান- ولاتقولوا لمن يقتل فى سبيل الله اموات ‘যারা আমার রাস্তায় শহীদ হয়েছে, তাদেরকে মৃত বলো না।’ (সূরা বাক্বারা-১৫৪) হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার মস্তক মুবরাক তা প্রমাণ করে দিল।

_____

শহীদ পরিবারের মদীনা শরীফ প্রত্যাবর্তন



এরপর ইয়াযীদ হযরত নু’মান বিন বশীর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে তলব করল, যিনি একজন বিশিষ্ট ছাহাবী ছিলেন। উনাকে ডেকে বলল, আপনার সাথে আরো ত্রিশজন লোক নিয়ে শহীদ পরিবারের সদস্যদেরকে বাহনযোগে মদীনা মুনাওওয়ারায় পৌঁছিয়ে দিয়ে আসুন। হযরত নু’মান বিন বশীর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এ প্রস্তাবকে সানন্দে গ্রহণ করলেন এবং নিজের জন্য সৌভাগ্যের বিষয় মনে করলেন। অতঃপর ত্রিশজন সহকর্মীসহ হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার পরিবারের সদস্যদেরকে নিয়ে মদীনা মুনাওওয়ারার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম হযরত নু’মান বিন বশীর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে বললেন, আমাদেরকে কারবালার পথ দিয়ে নিয়ে যান। আমরা দেখে যেতে চাই, আমাদের শহীদদের দেহ মুবারক সেইভাবে পড়ে আছে, না কেউ দাফন করেছে। যদি দাফনবিহীন অবস্থায় পড়ে থাকে, প্রথমে আমরা তাঁদেরকে দাফন করবো, এরপর ওখান থেকে রওয়ানা হবো। আর যদি কেউ দাফন করে থাকে, তাহলে তা দেখে অন্ততঃ কিছুটা সান্ত¡না পাব। হযরত নু’মান বিন বশীর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম-এর কথার প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন করলেন এবং কারবালার পথ ধরলেন। কারবালায় গিয়ে হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম সেই প্রান্তর যখন দেখলেন, যেই প্রান্তরে উনাদের আপনজনদেরকে নির্মমভাবে শহীদ করা হয়েছিল, হঠাৎ উনি অপ্রত্যাশিতভাবে চিৎকার করে উঠলেন এবং অঝোরে কাঁদতে শুরু করলেন এবং কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, এখানে হযরত আলী আছগরের দেহ মুবারক পড়েছিল, ওখানে হযরত আলী আকবরের দেহ মুবারক পড়ে ছিল, এখানে আমার ভাই হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার দেহ মুবারক পড়েছিল। তিনি এভাবে যখন হাতের আঙ্গুল দ্বারা দেখিয়ে দেখিয়ে দেহ মুবারকগুলোর অবস্থানের কথা বলছিলেন, তখন সবারই মুখ থেকে ক্রন্দনের করুণ আওয়াজ বের হচ্ছিল।



কারবালার নিকটবর্তী একটি গ্রাম ছিল, যার নাম ছিল আমরিয়া। ইয়াযীদ বাহিনী চলে যাওয়ার পর ঐ আমরিয়া গ্রামের অধিবাসীরা এসে শহীদদের দেহ মুবারকসমূহ দাফন করেছিল। মদীনা শরীফ থেকেও একটি দল হযরত জাবির বিন আব্দুল্লাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার নেতৃত্বে কারবালায় এসে পৌঁছেছিল। শহীদ পরিবারের কাফেলা যখন কারবালার প্রান্তরে পৌঁছল, সেই সময় মদীনা শরীফ থেকে আগত দল ও আমরিয়া গ্রামের অধিবাসীরাও উপস্থিত ছিল। তারা যখন এ মজলুম কাফেলাকে দেখলো তখন আর এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হল। ঘটনাক্রমে সেদিন ছিল ২০শে সফর অর্থাৎ শহীদদের ‘চেহলামের’ দিন। কাফেলার সবাই সেই রাত সেখানেই অতিবাহিত করেন। সারা রাত তাঁরা কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করেন, দুয়া-দুরূদ শরীফ পাঠ করেন এবং খাবারের জন্য খিচুড়ী পাকান। আজকাল মুসলমানগণ যেরূপ কারো ইন্তিকালের পর ফাতিহা পাঠ বা ঈছালে ছওয়াব উপলক্ষে খিচুড়ী বা অন্য তাবারুকের ব্যবস্থা করে থাকেন। এটা মূলতঃ উনাদেরই স্মৃতিচারণ।



শহীদ পরিবার কারবালার প্রান্তরে একদিন এক রাত অবস্থানের পর মদীনা মুনাওওয়ারার পথে রওয়ানা হলেন। কাফেলা যখন মদীনা মুনাওওয়ারার সন্নিকটে পৌঁছল এবং চোখের সামনে মদীনা শরীফ-এর দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল, তখন সবারই চোখ আবার অশ্রু সজল হয়ে উঠলো এবং একান্ত ধৈর্য ও ছবরের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে অগ্রসর হলেন। এদিকে তাঁদের আগমনের খবর বিদ্যুৎ গতিতে সমগ্র মদীনা মুনাওওয়ারায় ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময় হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার বড় মেয়ে হযরত ফাতিমা আলাইহিস সালাম আলাইহা মদীনা শরীফ-এ ছিলেন, যাঁর সাথে হযরত ইমাম হাসান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার বড় ছেলের বিবাহ হয়েছিল। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার ভাই হযরত মুহম্মদ বিন হানাফিয়া আলাইহিস সালাম আলাইহিও মদীনা শরীফ-এ ছিলেন, হযরত মুসলিম বিন আকিল আলাইহিস সালাম আলাইহি-এর মেয়ে ও বোনেরাও তখন মদীনা শরীফ-এ ছিলেন। নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আহলিয়া উম্মুল মু’মিনীন হযরত উম্মে সালামা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহাও মদীনা শরীফ-এ ছিলেন। উনারা সকলেই এবং মদীনা শরীফ-এর প্রতিটি ঘরের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা প্রত্যেকেই মজলুম কাফেলাকে এক নজর দেখার জন্য ঘর থেকে বের হয়ে আসলেন।



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার বড় মেয়ে হযরত ফাতিমা আলাইহিস সালাম আলাইহা যখন মজলুম কাফেলাকে এগুতে দেখলেন, তখন একান্ত ছবর ও ধৈর্যশীলা হওয়া সত্ত্বেও অজান্তে হু হু করে কেঁদে উঠলেন এবং ফুফু হযরত যয়নাব আলাইহাস সালামকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলেন, ফুফু! আমার আব্বাজানকে কোথায় রেখে এসেছেন? আমার ভাই আলী আছগর ও আলী আকবরকে কোথায় রেখে এসেছেন? আমার চাচাতো ভাই ক্বাসিমকে কোথায় রেখে এসেছেন? আমার আব্বাস চাচাজান কোথায়? আমাদের ভরপুর ঘর কোথায় লুণ্ঠিত হলো? হযরত ফাতিমাতুয্্ যাহরা আলাইহস সালাম উনার সুশোভিত বাগানকে কারা ছিন্নভিন্ন করলো? এভাবে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করতে লাগলেন তখন এমন এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল যে, একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে অনেকে বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিলেন। লোকেরা অনেক সান্তনা দিয়ে, ছবর ও ধৈর্যের কথা বলে কাফেলাকে মদীনা শরীফ-এ নিয়ে আসলেন।

_____

হযরত ইমাম যাইনুল আবিদীন আলাইহিস সালাম উনার রওজা শরীফ-এ উপস্থিতি



মজলুম কাফেলার সকলেই যখন কান্নায় ভেঙে পড়লেন তখন কাফেলার একমাত্র জীবিত পুরুষ সদস্য হযরত ইমাম যাইনুল আবিদীন আলাইহিস সালাম শোকে পাথর হয়ে এক কিনারে দাঁড়িয়েছিলেন। সবাই যখন উনাকে ঘরে যাওয়ার জন্য জোর করলেন, তিনি বললেন, আমার আব্বাজান ওছীয়ত করেছেন, মদীনা শরীফ পৌঁছে যেন সবার আগে তাঁর নানাজান ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার রওজা শরীফ-এ হাজিরা দিই। তাই আমি রওজা পাকে যাওয়ার আগে কোথাও যাব না। অতঃপর তিনি রওজা শরীফ-এ গিয়ে পৌঁছলেন। হযরত যাইনুল আবিদীন আলাইহিস সালাম যিনি এতক্ষণ পর্যন্ত ছবর ও ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে নিশ্চুপ ছিলেন, তিনি রওজা পাক-এর সামনে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। শুধু এতটুকু বলতে পারছিলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনার দৌহিত্র হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার সালাম গ্রহণ করুন। এরপর তাঁর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল এবং অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে তাঁর চোখের দেখা কারবালার সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করতে লাগলেন। আর তাঁর কান্নার সাথে সাথে মদীনা শরীফ-এর সমস্ত দেয়াল থেকে কান্নার রোল বের হচ্ছিল এবং রওজা মুবারকও থরথর করে কাঁপছিল এবং সেখান থেকে আওয়াজ বের হলো, যাইনুল আবিদীন! তুমি আমাকে কী শুনাচ্ছ? আমি তো সব কিছু স্বচক্ষে দেখেছি।



মদীনাবাসী হযরত ইমাম যাইনুল আবিদীন আলাইহিস সালাম উনাকে ধৈর্য ধারণের কথা বললেন, আল্লাহ তায়ালা’র যা হুকুম ছিল, তা হয়েছে। নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিতা আহলিয়া উম্মুল মু’মিনীন হযরত উম্মে সালামা আলাইহাস সালাম তিনি বর্ণনা করেন, মদীনা শরীফ-এ একবার সেই দিন ক্বিয়ামত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যেই দিন নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তায়ালা’র সান্নিধ্যে গমন করেছিলেন। আর একদিন ক্বিয়ামত প্রতিষ্ঠিত হলো, যেদিন হযরত ইমাম যাইনুল আবিদীন আলাইহিস সালাম কারবালা থেকে ফিরে এসেছেন। উম্মুল মু’মিনীন হযরত উম্মে সালামা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা আরো বর্ণনা করেন, নূরে মুজাস্সাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিছাল শরীফ-এর দিন অদৃশ্য থেকে যেভাবে ক্রন্দনের আওয়াজ শুনা গিয়েছিল, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার শাহাদাতের সময় একইভাবে অদৃশ্য থেকে কান্নার আওয়াজ শুনা গিয়েছিল।



রওজা শরীফ-এ হাজিরা দিয়ে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করার পর হযরত ইমাম যাইনুল আবিদীন আলাইহিস সালাম ঘরে গেলেন এবং একান্ত ছবর ও ধৈর্য সহকারে মদীনা শরীফ-এ অবস্থান করতে লাগলেন। হযরত ইমাম যাইনুল আবিদীন আলাইহিস সালাম-এর এমন অবস্থা হয়েছিল যে, যখন তিনি পানি দেখতেন সীমাহীন কান্নাকাটি করতেন এবং বলতেন, এই সেই পানি, যা আলী আছগরের ভাগ্যে জোটেনি, হযরত আলী আকবরের ভাগ্যে জোটেনি, আহলে বাইত-এর সদস্যদের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। উনার সামনে যখন খাবার আনা হতো তিনি দু’ এক লোকমা মুখে দিয়ে অবশিষ্টগুলো সামনে থেকে নিয়ে যেতে বলতেন। সবসময় একাকী থাকতে পছন্দ করতেন। সাধারণ লোকদের সাথে মেলামেশা করতেন না এবং যতদিন পর্যন্ত জীবিত ছিলেন, কোনদিন হাসেননি। উনার ছেলে হযরত ইমাম মুহম্মদ বাকির আলাইহিস সালাম একদিন উনাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আব্বাজান! কী ব্যাপার? আমি আপনাকে কোনদিন হাসতে দেখিনি। তিনি বললেন, বৎস! আমার চোখের সামনে কারবালার যে দৃশ্য ফুটে রয়েছে, তা দেখলে তোমার মুখ থেকেও চিরদিনের জন্য হাসি বন্ধ হয়ে যেত! তুমিও সারা জীবনে কোনদিন হাসতে না। বৎস! আমি পুতঃপবিত্র শরীর মুবারককে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে দেখেছি, প্রিয় নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নকশা মুবারককে দাফন-কাফনবিহীন অবস্থায় কারবালার প্রান্তরে পড়ে থাকতে দেখেছি। আমি নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রিয় দৌহিত্রকে আঘাতে জর্জরিত হয়ে কারবালার তপ্ত বালি-রাশির উপর দাফন-কাফনবিহীন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি।



হযরত উলামায়ে কিরামগণ লিখেছেন, এই পৃথিবীতে পাঁচজন ব্যক্তি খুব বেশি কান্নাকাটি করেছেন। তাঁরা হলেন- এক. হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম, জান্নাত থেকে যমীনে তাশরীফ আনার পর খুবই কান্নাকাটি করেছেন। দুই. হযরত ইয়াহ্ইয়া আলাইহিস্ সালাম, আল্লাহ তায়ালা’র ভয়ে খুবই কেঁদেছিলেন। তিনি এত বেশি কান্নাকাটি করেছিলেন যে, দু’ গাল মুবারক বেয়ে চোখের পানি পড়তে পড়তে চেহারা মুবারকে দাগ পড়ে গিয়েছিল। তিন. হযরত ইয়া’কূব আলাইহিস সালাম, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর বিচ্ছেদের কারণে খুবই কেঁদেছিলেন এবং অজস্র ধারায় চোখের পানি ফেলেছিলেন। চার. সাইয়্যিদাতু নিসায়ি আহ্লিল জান্নাহ হযরত ফাতিমাতুয্ যাহরা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা, নূরে মুজাস্সাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিছাল শরীফ-এর পর খুবই কেঁদেছিলেন। পাঁচ. হযরত ইমাম যাইনুল আবিদীন আলাইহিস সালাম কারবালার ঘটনার পর অনেক কেঁদেছিলেন।

_____

আহলে বাইত-এর প্রত্যাবর্তনের পূর্বেই মদীনাবাসীগণ কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা জেনে গিয়েছিলেন



আহলে বাইত-এর প্রত্যাবর্তনের পূর্বেই মদীনাবাসীগণ কারবালা ময়দানের মর্মান্তিক ঘটনা জেনে গিয়েছিলেন। স্বয়ং আল্লাহ পাক উনার হাবীব, নূরে মুজাস্্সাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই তাদেরকে স্বপ্নযোগে এই খবর জানিয়েছিলেন। ইমাম বায়হাকী আলাইহিস সালাম ‘দালায়িলুন নুবুওওয়াত’ গ্রন্থে সনদ সহকারে একটি রিওয়ায়িত উদ্ধৃত করেছেন। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম কূফা গমনের পর এক রাত্রে হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু স্বপ্নে দেখলেন, যেন দুপুর বেলা নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপস্থিত হয়েছেন। তাঁর চেহারা মুবারক মলিন, কেশ মুবারক উস্ক-খুস্ক। একটি শিশি হাতে নিয়ে তিনি এসেছেন। শিশিটিতে রক্ত ভরা ছিল। হযরত আব্দুল্লাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনার হাত মুবারকে ঐ শিশিটিতে কি রয়েছে? নূরে মুজাস্্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করলেন, ‘এটাতে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার রক্ত মুবারক রয়েছে। আমি এটা আল্লাহ পাক উনার দরবারে পেশ করে বিচার চাইবো।’ হযরত আব্দুল্লাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তৎক্ষণাৎ লোকদের জানিয়েছিলেন যে, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম শাহাদাত বরণ করেছেন।



ইমাম তিরমিযী আলাইহিস সালাম বর্ণনা করেন- উম্মুল মু’মিনীন হযরত উম্মে সালামা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বলেন, একদা আমি খাবে (স্বপ্নে) দেখলাম যে, নূরে মুজাস্্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপস্থিত হয়েছেন। তাঁর চুল-দাঁড়ি মুবারকে মাটি লেগে রয়েছে। জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রসূলাল্লাহ, ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনার এই অবস্থা কেন? তিনি বললেন, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামকে শহীদ করার সময় আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম।



এসব স্বপ্ন ও তার পরবর্তী বিভিন্ন লোকের নিকট হতে পাওয়া খবরাখবর হতে মদীনাবাসীরা জেনেছিলেন যে, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম শহীদ হয়েছেন। আর তাই তখন থেকে মদীনা শরীফ-এর মধ্যে শোকের ছায়া বিরাজ করছিল। অলিতে গলিতে, পথে-ঘাটে সবখানেই হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার আলোচনা। শত্রু-মিত্র সকলেই এজন্য শোকাহত হয়ে পড়েছিলেন। অতঃপর যখন আহলে বাইত-এর লোকজন মদীনা শরীফ-এ তাশরীফ নিয়ে এসে হৃদয়গ্রাহী ভাষায় এই মর্মান্তিক ঘটনার ইতিবৃত্ত বর্ণনা করলেন তখন সমগ্র মদীনা শরীফ-এ শোকের ছায়া নেমে এলো।



কূফা গমনের সময় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জা’ফর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার দুই পুত্র হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার সঙ্গী হয়েছিলেন। কারবালার মাটিতে তাঁদেরও রক্ত মুবারক ঝরেছে। তাঁরাও হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার জন্য যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছেন। আহলে বাইত-এর মদীনা শরীফ ফিরে আসার পর যখন এই ভ্রাতাদ্বয়ের শাহাদাতের খবর প্রকাশিত হলো তখন একদল লোক হযরত আব্দুল্লাহু ইবনে জা’ফর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে সান্ত¡না দেয়ার জন্য তাঁর বাড়িতে গমন করলো। তাদের মধ্যে একজন কথার ফাঁকে হঠাৎ বলে ফেলল, "হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কারণেই আজ আপনার উপর এই বিপদ।" নাঊযুবিল্লাহ। কথাটা শুনামাত্রই হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জা’ফর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু পায়ের সেন্ডেল খুললেন এবং সেটা ঐ ব্যক্তির দিকে ছুঁড়ে মেরে বললেন, কমবখত্! তুমি এমন কথাও বলতে পারলে! অথচ আমি নিজেই যদি সেখানে থাকতাম তবে আমার জীবনও হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার জন্য কুরবান করে দিতাম। আল্লাহ তায়ালার কসম! আজ আমার বড় সান্ত¡না এই যে, আমি নিজে জীবন দিতে না পারলেও আমার পুত্র দু’টি হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার জন্য জীবন দিয়েছে। সুবহানাল্লাহ।



ইবনে আছীর প্রমুখ ঐতিহাসিকগণ বর্ণনা করেছেন যে, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার শাহাদাতের পর প্রায় তিন মাস প্রকৃতিতে এক আজব অবস্থা বিরাজ করছিল। সূর্য যখন উদয় হতো এবং তার রশ্মি দূরদূরান্তে লোকের ঘরের দেওয়ালে ও দরজার কপাটে ছড়িয়ে পড়তো তখন মনে হতো যেন কেউ তাজা রক্ত দিয়ে ঐগুলো রঙ্গীন করে দিয়েছে।

____

কারবালার ঘটনা থেকে উপলব্ধি ও শিক্ষা



সম্মানিত পাঠকবৃন্দ! হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম ও তাঁর সঙ্গীদের শাহাদাতের ঘটনাবলী বিস্তারিতভাবে জানলেন। এর মধ্যে আপনারা একদিকে দেখেছেন সত্যের ঝা-া উঁচ্চে তুলে ধরার জন্য মুষ্টিমেয় কয়েকজন লোকের অপূর্ব আত্মত্যাগ, অন্যদিকে দেখেছেন যালিমশাহীর প্রচ- প্রতিরোধ। যালিমের যুলুমের সামনে সত্য মার খেয়েছে দেখে যদি মনে করে থাকেন যে, জগতে যুলুমই সবসময় জয়লাভ করে তাহলে ভুল করবেন। আসল চক্ষু খুলে দেখলে দেখতে পাবেন, কারবালার মরুভূমিতে সেদিন যালিমশাহীরই ভরাডুবি হয়েছে এবং ন্যায় দীপ্ততেজে নতুন ভঙ্গিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। যালিমরা মারতে গিয়ে নিজেরাই মরেছে এবং মযলুম কাফেলা শহীদ হয়ে অমর হয়ে আছেন।



ইবনে যিয়াদ এবং ইয়াযীদের অত্যাচারী বাহিনী চেয়েছিল, সত্যের ঝা-াবাহী হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম ও তাঁর মুষ্টিমেয় সঙ্গীদের একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দিতে। তারা পানি বন্ধ করে তাঁদেরকে কষ্ট দিয়েছে, তীর নিক্ষেপ করে তাঁদের শরীর মুবারক ঝাঁঝরা করেছে, তরবারী চালিয়ে তাঁদের শির মুবারক দ্বিখ-িত করেছে- তবুও হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম আজও জীবিত, তাঁর সঙ্গীগণ অমর।



প্রতিটি ঘরে ঘরে আজও তাঁদের আলোচনা। প্রতিটি মানুষ তাঁদের অপূর্ব আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে শ্রদ্ধা ও সম্মান করে থাকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে। সুদীর্ঘ দেড় হাজার বৎসর পরেও আজ হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার হক্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আত্মত্যাগের নজিরবিহীন দৃষ্টান্তের কথা শুনতে পাই। সমুদ্রে-স্থলে-অন্তরীক্ষে সর্বত্রই হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার নাম মুবারক উচ্চারিত হয়।



পক্ষান্তরে যালিমশাহী ইয়াযীদ কারাবালা ময়দানে জুলুম করে কি করল? দুনিয়ার মানুষের কাছে সে আজ ধিকৃত, লাঞ্ছিত, ঘৃণিত। মানুষ তাকে অভিশাপ দেয়, লা’নত সহকারে তার নাম উচ্চারণ করে। এতে বুঝা যায় যে, সত্য ও মিথ্যার দ্বন্দ্বে সাময়িকভাবে সত্যের কণ্ঠস্বর যদিও রুদ্ধ হয়ে যায় কিংবা সত্যানুসারীরা মিথ্যাবাদীদের সামনে সত্য প্রকাশে বাধাগ্রস্ত হন তবুও তাতে ভগ্নোৎসাহ হবার কারণ নেই। সত্য নিজ মহিমায় দীপ্তিমান। তার প্রচ- তেজ দমিয়ে রাখার সাধ্য কারো নেই। একদিন না একদিন তা আপন তেজে জ্বলে উঠবেই। আর সে এমন প্রচ- মহিমায় তার সামনে মিথ্যা ধূলিসাৎ হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।



সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার শাহাদাতের মর্মান্তিক ঘটনাটা যেভাবে ও যে পরিস্থিতিতে সংঘটিত হয়েছে, তাতে মুসলিম উম্মাহ্র জন্য যথেষ্ট শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। এ বিষাদময় ঘটনা থেকে যেসব শিক্ষা চিহ্নিত করা যায় তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, ‘শাসন ক্ষমতায় যে ধরনের লোক অধিষ্ঠিত থাকে, জনগণ সে ধরনের নিরাপত্তা, ইনসাফ ও ন্যায়বিচার লাভ করে এবং সে ধরনের যুলুমেরও শিকার হয়ে থাকে।’



শাসন ক্ষমতায় যদি খোদাভীরু, সৎ, ঈমানদার ও চরিত্রবান লোকেরা অধিষ্ঠিত থাকে, তবে জনগণের ইনসাফ পাওয়া ও যুলুম, অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়া যেমন নিশ্চিত হয়, তেমনি জনগণের নৈতিক ও চারিত্রিক উৎকর্ষও দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। পক্ষান্তরে শাসক মহল যদি দুশ্চরিত্র, দুর্নীতিবাজ ও অত্যাচারী হয়, তা হলে সমাজে যত সৎ লোকই থাক, ইনসাফ ও সততা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। এ কারণেই ইয়াযীদের আমলে মুসলিম সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় অঞ্চল মক্কা শরীফ, মদীনা শরীফ ও ইরাক যুলুম, অত্যাচার, দুর্নীতি ও অনৈতিক কার্যকলাপের লীলাভূমিতে পরিণত হয়।



হিজরী প্রথম শতকের এই সময়টাতে বিপুল সংখ্যক ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম জীবিত ছিলেন। যারা মুসলিম উম্মাহর মধ্যে সর্বোচ্চ মানের সততা ও তাক্বওয়ার অধিকারী ছিলেন। কিন্তু অসৎ লোকদের ক্ষমতায় আরোহণের সুযোগ পাওয়ার কারণে ইসলামের মূলনীতিগুলো বাস্তবায়িত হতে পারেনি। অথচ খিলাফতে রাশিদার আমলে ইসলামের নীতিমালা সমাজের সকল স্তরে বাস্তবায়িত হয়েছে। খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত উছমান যুন্ নূরাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার শাসনামলে সামান্য কিছু ফিৎনা শুরু হলেও কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী শাসন ব্যবস্থা থাকায় ঐ ফিৎনা ব্যাপক ও স্থায়ী রূপ লাভ করতে পারেনি। সুতরাং এ ঘটনার অন্যতম শিক্ষা হলো যে, সর্বপর্যায়ে খোদাভীরু, সৎ ও ন্যায়পরায়ণ লোকদের শাসন কায়িমের জন্য কোশেশ করা। পরামর্শ অর্থাৎ মজলিসে শূরা বহাল রাখা এবং কোন ক্রমেই অসৎ, ফাসিক-ফুজ্জার লোকদের হাতে ক্ষমতার চাবি-কাঠি অর্পণ না করা।



বিশেষতঃ খিলাফতের আওতাধীন সকল স্তরের ব্যবস্থাপনাকে অমুসলিমদের প্রভাব ও হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত রাখা জরুরী। কেননা যারা অমুসলিম তথা ইহুদী-খ্রিস্টান-মুশরিক ইত্যাদি প্রত্যেকেই মুসলমানদের শত্রু। তা কালামুল্লাহ শরীফ-এও ঘোষণা করা হয়েছে।



ইতিহাস সাক্ষী যে, ইয়াযীদের খ্রিস্টান কোন কোন মতে ইহুদী উপদেষ্টার পরামর্শ অনুযায়ী ইবনে যিয়াদকে কূফার গভর্নর নিযুক্ত করা হয়। যদি ইয়াযীদের খ্রিস্টান বা ইহুদী উপদেষ্টার পরামর্শ গ্রহণ না করা হতো তাহলে ইবনে যিয়াদ গভর্নর নিযুক্ত হতো না এবং মুনাফিকরা মুনাফিকী কার্যক্রম সংঘটিত করতে পারতো না।



সাইয়্যিদু শাবাবি আহ্লিল জান্নাহ হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার শাহাদাতের পিছনে যে কারণগুলো সংক্ষেপে উল্লেখ করা যায় তা হলো-



১. ইয়াযীদ-এর নেতৃত্বে ইসলামী খিলাফতের যে নৈতিক ও আদর্শিক ক্ষতি ও বিকৃতি ঘটতে যাচ্ছিল, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম সেই বিকৃতির বিরুদ্ধে ছিলেন। ইয়াযীদের অসৎ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আপোসহীন ছিলেন।



২. সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম প্রতিবাদে আপোসহীন হলেও যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে কারবালা প্রান্তরে হাজিরও হননি। তা সত্ত্বেও ইয়াযীদের বাহিনী উনাকে নিষ্ঠুরভাবে শহীদ করে। তিনি মদীনা শরীফ যাওয়ার অথবা ইয়াযীদের সাথে সাক্ষাত করার অথবা অন্য কোন দেশে চলে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করা সত্ত্বেও ইয়াযীদী বাহিনী তাঁর কোন কথায় কর্ণপাত করেনি।



৩. ফোরাত নদীর পানি অবরোধসহ নারী ও শিশুদের প্রতি চরম অমানবিক আচরণ করে কষ্ট ও দুর্বল করে দেয়ার কারণে যে নিষ্ঠুর ও পৈশাচিক পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছিল, নুবুওওয়াতের এত কাছাকাছি সময়ে এমন বর্বরতা স্বয়ং মুসলিম নামধারীদের দ্বারা ঘটতে পারে, তা কারো কল্পনায়ও আসেনি। বিশেষতঃ নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রিয় দৌহিত্রের প্রতি এ আচরণ পরবর্তী মুসলিম প্রজন্মকে নিদারুণভাবে ব্যথিত করেছে।



৪. বহু সংখ্যক নিষ্ঠাবান ছাহাবী ও তাবিয়ীগণ বেঁচে থাকা সত্ত্বেও সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার এই অভিযানে একেবারেই নিঃসঙ্গ হয়ে যাওয়াটা মুসলিম জনমানসে আরো বেশি মর্মবেদনা ও গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে।



কারবালার মর্মান্তিক শাহাদাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনেকে ইয়াযীদকে দোষারোপ করার সাথে সাথে তার পিতা যিনি জলীলুল ক্বদর ছাহাবী হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকেও দোষারোপ করে থাকে। নাঊযুবিল্লাহ!



এখানে একটা বিষয় মনে রাখা জরুরী যে, আল্লাহ পাক উনার রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আদরের দৌহিত্র হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামসহ আহলে বাইত-এর অন্যান্য সদস্য ও সঙ্গীগণের মর্মান্তিক শাহাদাতে মুসলিম উম্মাহ্র অন্তর ব্যথাতুর হবে তা চরম সত্য কথা এবং এটি ঈমান মজবুতির আলামতও বটে। কিন্তু এজন্য আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিশিষ্ট ছাহাবী হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে দোষারোপ করা কস্মিনকালেও শরীয়ত সম্মত হতে পারে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন- ولاتزر وازرة وزر اخرى ‘একজনের পাপের বোঝা অপরজন বহন করবে না।’ (সূরা বণী ইসরাইল-১৫)



এ আয়াত শরীফ-এর ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, "সন্তানের অপরাধের জন্য পিতাকে এবং পিতার অপরাধের জন্য সন্তানকে দায়ী করা বৈধ নয়।" কাবিলের অপরাধের জন্য হযরত আদম আলাইহিস্ সালামকে, কেনানের অপরাধের জন্য হযরত নূহ আলাইহিস্ সালামকে দায়ী করা যেমন বৈধ নয়, তেমনি ইয়াযীদের অপরাধের জন্য হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে দায়ী করাও বৈধ নয়। বরং তা সম্পূর্ণ নাজায়িয, হারাম ও কুফরীর অন্তর্ভুক্ত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন- ليغيظبهم اللكفار ‘কাফিরেরাই ছাহাবায়ে কিরামগণের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে থাকে।’ (সূরা ফাতহ্-২৯)



হাদীছ শরীফ-এ বর্ণিত রয়েছে-

< p class="a">عن مالك بن انس رحمة الله عليه قال من غاظ اصحاب محمد صلى الله عليه وسلم فهو كافر



অর্থ: ‘হযরত মালিক ইবনে আনাস আলাইহিস সালাম বর্ণনা করেন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছাহাবায়ে কিরামগণের প্রতি যে ব্যক্তি বিদ্বেষ পোষণ করে, সে কাফির।’ (নাসীমুর রিয়াদ্ব)



হাদীছ শরীফ-এ আরো বর্ণিত রয়েছে-



عن ابي سعيد الخدرى رضي الله تعالي عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم ¬¬¬ لاتسبوا اصحابى فلو ان احدكم انفق مثل احد ذهبا ما بلغ مد احدهم ولا نصيفه



অর্থ: হযরত আবু সায়ীদ খুদুরী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমরা আমার ছাহাবায়ে কিরামগণকে গাল-মন্দ বা দোষারোপ করো না। যদি তোমাদের কেউ উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ আল্লাহ পাক উনার রাস্তায় দান করো, তবুও ছাহাবায়ে কিরামগণের এক মুদ বা অর্ধ মুদ গম দান করার ফযীলতের সমপরিমাণ ফযীলত অর্জন করতে পারবে না।’ (বুখারী শরীফ)

.



হাদীছ শরীফ-এ আরো বর্ণিত রয়েছে-



عن عويمر بن ساعدة رضي الله تعالى عنه انه صلى الله عليه و سلم قال ان الله اختارنى واختار لى اصحابا فجعل لى منهم وزراء وانصارا واصهارا فمن سبهم فعليه لعنة الله والـملئكة والناس اجمعين ولايقبل الله منهم صرفا وعدلا



অর্থ: হযরত উয়াইমির ইবনে সায়িদাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত রয়েছে, নূরে মুজাস্সাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক আমাকে মনোনীত করেছেন এবং আমার ছাহাবায়ে কিরামগণকে মনোনীত করেছেন এবং তাঁদের মধ্য থেকে আমার কার্য সম্পাদনকারী, খিদমতকারী ও বৈবাহিক সূত্রের আত্মীয়বর্গ নির্ধারণ করেছেন। অতএব, যে ব্যক্তি তাঁদেরকে গালি দিবে বা দোষারোপ করবে, তার প্রতি আল্লাহ পাক উনার, ফেরেশ্তা ও মানুষ সকলেরই লা’নত। এবং তার কোন ফরয ও নফল ইবাদত আল্লাহ পাক কবুল করবেন না।’ (তবারানী, হাকিম)



যারা সাইয়্যিদুনা হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে দোষারোপ করে তারা মূলতঃ তাঁর সুমহান মর্যাদা সম্পর্কে নেহায়েতই জাহিল বা অজ্ঞ।



হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু নূরে মুজাস্্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছাহাবীগণের মধ্যে একজন বিশেষ শ্রেণীর ছাহাবী, যাঁকে উলুল আযম্ বা জলীলুল ক্বদর ছাহাবী বলা হয়। তিনি ছিলেন আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন, কাতিবীনে ওহীর সদস্য, হাদীছ শরীফ-এর রাবী, ফক্বীহ্ ইত্যাদি মর্যাদার অধিকারী। তাঁর ইল্মের পূর্ণতা, হিদায়েতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা, তাঁর দ্বারা লোকদের হিদায়েত লাভ, কিতাব শিক্ষাদান এবং জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার ব্যাপারে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তায়ালার নিকট দুআ করেছেন।



যেমন হাদীছ শরীফ-এ বর্ণিত রয়েছে-



عن ام حرام رضى الله تعالى عنها انها سمعت النبى صلى الله عليه وسلم يقول اول جيش من امتى يغزون البحر قد اوجبوا



অর্থ: হযরত উম্মু হারাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা হতে বর্ণিত। তিনি হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে বলতে শুনেছেন, তিনি বলেছন, আমার উম্মতের প্রথম যে দল সমুদ্রের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে তাদের জন্য জান্নাত ওয়াজিব।’ (বুখারী শরীফ)



হযরত ইমাম তাবারী আলাইহিস সালাম বলেন, "হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ২৮ হিজরীতে সর্বপ্রথম সমুদ্র যুদ্ধের মাধ্যমে কাবরাসের উপর আক্রমণ করেন এবং কাবরাস তিনিই বিজয় করেন।"



হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার মর্যাদা-মর্তবার মধ্যে অন্যতম মর্যাদা হলো- তিনি ছিলেন একজন আদিল বা ইনসাফগার খলীফা। তাঁর ন্যায় বিচার ও ইনসাফ সম্পর্কে কিতাবে উল্লেখ করা হয় যে, জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ছাহাবী হযরত সা’দ ইবনে আবী ওয়াক্কাছ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন-



ما رايت احدا بعد عثمان اقضى بحق من صاحب هذا الباب



‘আমার দৃষ্টিতে হযরত উছমান যুন্ নূরাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, এরপর হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার চেয়ে অধিক ন্যায় বিচারক কেউ নেই।’



এক ব্যক্তি বিশিষ্ট ফক্বীহ্্ হযরত মুয়াফা ইবনে ইমরান আলাইহিস সালাম আলাইহিকে জিজ্ঞেস করলো, ন্যায় বিচারের দিক দিয়ে হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ও হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয আলাইহিস সালাম আলাইহি-এর মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ? একথা শুনে তিনি রাগান্বিত হয়ে বললেন, "হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের সাথে কোন প্রকার ক্বিয়াস করা যাবে না। হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তো হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছাহাবী, কাতিবে ওহী ও আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ‘আমীন’ (আমানতদার)।" আমীরুল মু’মিনীন ফিল হাদীছ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক আলাইহিস সালাম আলাইহিকে জিজ্ঞাসা করা হলো যে, "হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু শ্রেষ্ঠ, না হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয আলাইহিস সালাম শ্রেষ্ঠ? জবাবে তিনি বলেন, আল্লাহ পাক উনার কসম! হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যখন নূরে মুজাস্্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে ঘোড়ায় চড়ে জিহাদে যেতেন, তখন ঘোড়ার নাকে যে ধূলোবালিগুলো প্রবেশ করতো, সে ধূলোবালিগুলোও হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয আলাইহিস সালাম হতে বহুগুণে শ্রেষ্ঠ।"



সুতরাং, এত সব মর্যাদা ও মর্তবার পরও যারা হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, উনাকে নাক্বিছ বলে গালি দেয়, তাদের জন্যে হযরত ইমাম শিহাবুদ্দীন খাফ্ফাযী আলাইহিস সালাম আলাইহি-এর কথাই অধিক প্রযোজ্য। তিনি বলেন-



من يكون يطعن فى معاوية فذلك كلب من كلاب الحاوية



‘যে ব্যক্তি হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে উনাকে গালি দেয়, নাক্বিছ বলে, সমালোচনা করে, সে হাবিয়া দোযখের কুকুরসমূহের মধ্য হতে একটি কুকুর।’ (নাসীমুর রিয়াদ্ব)



উপরোক্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হলো যে, হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু শুধু ছাহাবীই ছিলেন না বরং উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, জলীলুল ক্বদর ছাহাবী ও খলীফা ছিলেন। সুতরাং হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু আনহুসহ সকল ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম সম্পর্কে সাবধানে কথা বলতে হবে। মূলতঃ তাঁদের সকলের প্রতিই সুধারণা পোষণ করতে হবে, মুহব্বত করতে হবে এবং তাঁদেরকে অনুসরণ-অনুকরণও করতে হবে। কেননা তাঁরা হলেন দ্বীনের ইমাম এবং নূরে মুজাস্্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আদর্শের বাস্তব প্রতিফলন।



অনেকে ইয়াযীদকে খলীফা নিযুক্ত করার কারণে বিশিষ্ট ছাহাবী হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে দোষারোপ করে বলে যে, তিনি খিলাফতের পরিবর্তে রাজতন্ত্র ও রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। নাঊযুবিল্লাহ।



মূলতঃ যারা হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে রাজতন্ত্র ও রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতারূপে চিহ্নিত করতে চায় প্রকৃতপক্ষে তারা চরম শ্রেণীর জাহিল। কারণ রাজবংশ বা রাজতন্ত্র ইসলামের অনেক পূর্বকাল থেকেই চলে আসছে। যা আমরা হাদীছ শরীফ-এ দেখতে পাই যে, নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোম, পারস্য, আবিসিনিয়া, চীন, মালাবার, গুজরাট ইত্যাদির সম্রাট বা রাজাদের নিকট ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিয়ে দূত মারফত পত্র পাঠিয়েছেন।



উল্লেখ্য, ‘রাজতন্ত্র’ অর্থ হলো- ‘রাজ’ অর্থ ‘রাজা’, আর ‘তন্ত্র’ অর্থ ‘নিয়ম-নীতি’। যিনি রাজা হন সাধারণতঃ তিনি তার নিজস্ব মনগড়া নিয়ম-নীতিই তার কর্তৃত্বাধীন এলাকায় প্রণয়ন বা বাস্তবায়ন করে থাকেন, তাকেই রাজতন্ত্র বলে। আর ‘রাজবংশ’ বলতে ‘রাজার বংশকে‘ বুঝানো হয়।



অথচ হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি নিজেও রাজা ছিলেন না এবং অন্য কাউকেও রাজা মনোনীত করেননি। বরং তিনি স্বয়ং নিজের, উনার পরিবার, উনার সমাজ এবং তাঁর কর্তৃত্বাধীন সমগ্র এলাকার উপর কুরআন-সুন্নাহ’র বিধানই জারি বা বাস্তবায়ন করেছিলেন, যাকে ‘খিলাফত আলা মিন্হাজিন্ নুবুওওয়াহ্’ বলা হয়।



মূলতঃ তাঁর খিলাফত পূর্ববর্তী খলীফাগণেরই অনুরূপ ছিল এবং তাঁর খলীফা হওয়ার বিষয়টি ছিলো স্বয়ং আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ভবিষ্যদ্বাণীর ফসল।



হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু নিজেই বর্ণনা করেন, আমি একদা আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার খিদমতে ছিলাম। তিনি আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "হে মুআবিয়া! কখনো যদি তোমার হাতে জনগণের কর্তৃত্বভার আসে তখন তাদের প্রতি ইনছাফ করো।" হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, "আমি তখনই নিশ্চিত হলাম যে, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উক্ত কথা বাস্তবায়িত হবেই।"



আর সত্যিই তিনি প্রথমে দু’খলীফা হযরত উমর ফারূক্ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং হযরত উছমান যুন্ নূরাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার খিলাফতকালে আমীরে শু’বা বা প্রাদেশিক গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত হন। অতঃপর চতুর্থ খলীফা হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজহাহু রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার শাহাদাতের পর প্রায় ছয় মাস তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত ইমাম হাসান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু খিলাফত পরিচালনা করেন। অতঃপর তিনি ষষ্ঠ খলীফা হিসেবে হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে এই শর্তে খিলাফত দেন বা মনোনীত করেন যে, "আপনার পর আমি অথবা আমার ভাই হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম অর্থাৎ দু’জনের একজন হায়াতে থাকলে আমাদেরকে খিলাফত ফিরিয়ে দিতে হবে।"



অতঃপর ইমাম হাসান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার শাহাদাতের সময় তিনি তাঁর ছোট ভাই হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামকে নছীহত করেন যে, "দেখুন, খিলাফতের জন্যেই আমাদের পিতা শহীদ হয়েছেন, আমিও শহীদ হচ্ছি, সুতরাং আপনি আর খিলাফতের যিম্মাদারী নিবেন না। আপনি দ্বীনি তা’লীম-এর কাজে নিয়োজিত থাকুন, হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু অন্য যাকে ভাল মনে করেন তাকে খিলাফতের দায়িত্ব অর্পণ করে যাবেন।"



হযরত ইমাম হাসান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু প্রদত্ত শর্ত মুতাবিক হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু খলীফা মনোনীত হয়ে সঠিকভাবে খিলাফত পরিচালনা করেন এবং পরবর্তিতে খিলাফত পরিচালনার যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে তাঁর ছেলেকে খলীফা মনোনীত করেন।



অতএব, এটা অবশ্যই সত্য যে, হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তাঁর ছেলে ইয়াযীদকে যখন খলীফা নিযুক্ত করেন তখন ইয়াযীদ ভাল ছিল। কিন্তু মুনাফিকদের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে পরবর্তিতে ইয়াযীদ গুমরাহ হয়ে যায়।



অতএব, কেউ যদি ছেলের বদ আমলের কারণে পিতাকে দোষারোপ করে অর্থাৎ ইয়াযীদের জন্য বিশিষ্ট ছাহাবী হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে দোষারোপ করে তবে তা সম্পূর্ণরূপে কুফরী হবে।



এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন-



ولاتزر وازرة وزر اخرى



‘একজনের গুনাহ্র বোঝা অন্যজন বহন করবে না।’ (সূরা বণী ইসরাঈল-১৫)



এখন পিতার পর ছেলে খলীফা হলে যদি রাজতন্ত্র ও রাজবংশ প্রতিষ্ঠাকারী হয় তাহলে তো দেখা যায় আল্লাহ পাকই রাজতন্ত্র ও রাজবংশের প্রতিষ্ঠাকারী হয়ে যান। নাঊযুবিল্লাহ।



কারণ আল্লাহ পাক উনার নবী ও রসূল হযরত দাউদ আলাইহিস্ সালাম যিনি ছিলেন খলীফাতুল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ পাক উনার খলীফা এবং তাঁর বিদায়ের পর তাঁর ছেলে হযরত সুলাইমান আলাইহিস্ সালামকে আল্লাহ পাক সারা পৃথিবীর খলীফা নিযুক্ত করেন।



এছাড়া হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার পর উনার ছেলে হযরত ইমাম হাসান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুও তো খলীফা নিযুক্ত হয়েছিলেন। তাই বলে কি হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে রাজতন্ত্র ও রাজবংশ জারি হয়েছে? নাঊযুবিল্লাহ।



মূলতঃ আল্লাহ পাক, হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালাম, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম, হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম আলাইহিস সালাম আলাইহিম কেউই রাজতন্ত্র ও রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা নন। যদি কেউ উল্লিখিত কাউকে রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বলে তবে সেটা হবে তাঁর প্রতি প্রকাশ্য তোহমত এবং কুফরীর শামীল।



অতএব, সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত হলো যে, হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু রাজতন্ত্র কিংবা রাজবংশ কোনটিরই প্রতিষ্ঠাতা নন বা ছিলেন না।



হযরত ইমাম যাহাবী আলাইহিস সালাম বলেছেন, কারবালার শাহাদাতের ঘটনা অতঃপর মদীনা শরীফ আক্রমণের পর ইয়াযীদের বিরুদ্ধে প্রচ- গণবিদ্রোহ সংঘটিত হয়। তার আয়ুও ছিল খুব কম। মাত্র তিন বছর কর্তৃত্ব করার পর সে ৪০ বছর বয়সে মারা যায়। বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার শহীদকারীদের কেউই আল্লাহ পাক উনার গযব থেকে রক্ষা পায়নি। লা’নতে পরে কেউ নিহত হয়েছে এবং কেউ এমন কষ্টদায়ক অবস্থার শিকার হয়েছে যে, মৃত্যুও তার চেয়ে অনেক ভাল ছিলো।



হযরত ইমাম ইবনুল জাওযী আলাইহিস সালাম বলেছেন: "হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার শহীদকারীদের সকলেই কোন না কোন প্রকারে দুনিয়াতেই শাস্তি পেয়েছে। কেউ নিহত হয়েছে, কেউ অন্ধ হয়ে গেছে। আর ক্ষমতাসীনরা অল্প সময়েই ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে।"



বিশিষ্ট তাফসীরবিদ হযরত ইবনে কাছীর আলাইহিস সালাম বলেন: "হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার শাহাদাতের পর যে সকল দুর্যোগ সংঘটিত হওয়ার বর্ণনা ইতিহাসে পাওয়া যায়, তার বেশির ভাগই সত্য। উনার শহীদকারীদের প্রত্যেকেই কোন না কোনভাবে আযাব ভোগ করেছে। অনেকে কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়েছে। অধিকাংশই উন্মাদ হয়ে মরেছে।"



আব্দুল মালেক ইবনে মারওয়ানের শাসনামলে যখন মুখতার সাকাফী কূফার শাসক হলেন, তখন তিনি হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার শাহাদাতে অংশগ্রহণকারীদেরকে এবং উনার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়া বাহিনীতে যোগদানকারীদেরকে বেছে বেছে হত্যা করেন। এমনকি একদিনেই তিনি এ ধরনের দুইশ’ চল্লিশ ব্যক্তিকে হত্যা করেন। আমর বিন হাজ্জাজ হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার শহীদকারী ছিলো। সে কূফা থেকে পালিয়েও বাঁচতে পারেনি। মুখতার সাকাফীর লোকদের হাতে নিহত হয়েছে। মুখতার সাকাফীর লোকেরা পাপিষ্ঠ সিমারকে হত্যা করে তার লাশ কুকুরকে খাইয়ে দিয়েছেন।



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার শহীদকারীদেরকে মুখতারের কাছে আনা হতো এবং তিনি তাদেরকে অত্যন্ত কষ্টদায়ক পদ্ধতিতে হত্যা করার নির্দেশ দিতেন। কাউকে জ্যান্ত আগুনে পুড়িয়ে মারতেন। কাউকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে রেখে দিতেন এবং ছটফট করে করে মরে যেতো। খাওলী বিন ইয়াযীদ হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার মাথা মুবারক কাটার চেষ্টা করেছিল। মুখতার তাকে হত্যা করে তার লাশ জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। ইবনে যিয়াদও মুখতারের সেনাপতি আল আশতারের হাতে নিহত হয় এবং তার মস্তকও মুখতারের কাছে পাঠানো হয়। ইবনে যিয়াদের বাহিনীর অধিনায়ক আমর বিন সা’দকে এবং তার ছেলেকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার শহীদকারীদের যারা পালিয়ে প্রাণে বেঁচে গেছে, মুখতার সাকাফী তাদের বাড়িঘর ধ্বংস করে ও জ্বালিয়ে দেন। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কণ্ঠনালীতে তীর নিক্ষেপকারী হাসিন বিন নুমাইরও তার হাতে নিহত হয়। ইবনে যিয়াদ ও আমর বিন সা’দ-এর মাথা কেটে মুখতার সাকাফী হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার ছেলে হযরত ইমাম যাইনুল আবিদীন আলাইহিস সালাম-এর কাছে প্রেরণ করলে হযরত ইমাম যাইনুল আবিদীন আলাইহিস সালাম সিজদায় চলে যান এবং বলেন, ‘আল্লাহ পাক উনার শোকর, যিনি আমার শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিয়েছেন।" মোট কথা, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও ষড়যন্ত্রে অংশ গ্রহণকারী প্রত্যেককেই আল্লাহ পাক ধ্বংস করে দেন।



কালামুল্লাহ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে-



ومن يقتل مؤمنا متعمدا فجزاءه جهنم



অর্থ: ‘যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোন মু’মিনকে কতল করে সে জাহান্নামী।’ (সূরা নিসা-৯৩)



হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে-



عن عبد الله بن مسعود رضي الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم سباب المسلم فسوق وقتاله كفر



অর্থ: ‘হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, মুসলমানকে গালি দেয়া ফাসিকী আর কতল করা কুফরী।’ (বুখারী ও মুসলিম শরীফ)



কাজেই, সাধারণ মু’মিন মুসলমানকে কতল করা যদি কুফরী ও জাহান্নামী হওয়ার কারণ হয় তাহলে আল্লাহ পাক উনার হাবীব, নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার লখতে জিগার, সাইয়্যিদু শাবাবি আহ্লিল জান্নাহ হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামসহ আহলে বাইত-এর অন্যান্য সম্মানিত সদস্য ও সঙ্গীগণকে যারা শহীদ করেছে তাদের ফায়সালা কি হবে? তা বলার অপেক্ষা রাখে না, তারা সকলেই কাট্টা কাফির ও চির জাহান্নামী।



আহলে বাইতগণের প্রতি মুহব্বত ঈমানের অঙ্গ আর বিদ্বেষ পোষণ কুফরীর অন্তর্ভুক্ত। স্বয়ং আল্লাহ পাক তাঁর কালাম পাক-এ ইরশাদ করেন-



قل لااسئلكم عليه اجرا الا المودة فى القربى



অর্থ: ‘হে হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি উম্মতদেরকে বলুন, আমি তোমাদের নিকট নুবুওওয়াতের দায়িত্ব পালনের জন্য কোন প্রতিদান চাই না। তবে আমার নিকটজন তথা আহলে বাইত, তাঁদের প্রতি তোমরা সদাচরণ করবে।’ (সূরা শূরা-২৩)



হাদীছ শরীফ-এ আহলে বাইত ও আওলাদে রসূলগণ-এর অপরিসীম ফযীলত-মর্যাদা-মর্তবার কথা বর্ণিত রয়েছে।



সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম আহলে বাইত-এর বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। উনার সম্পর্কে কিতাবে বর্ণিত রয়েছে- রঈসুল মুহাদ্দিছীন হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার সাথে চলাচল করতেন, উঠাবসা করতেন। কোন এক প্রসঙ্গে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনাকে বলেছিলেন, ‘গোলামের ছেলে গোলাম’। এটা শুনে তিনি কিছুটা অপ্রস্তুত হলেন এবং বিষয়টা ফায়সালার জন্য উনার পিতা যিনি খলীফাতুল মুসলিমীন, আমীরুল মু’মিনীন উনাকে জানালেন যে, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম আমাকে বলেছেন, ‘গোলামের ছেলে গোলাম’। খলীফাতুল মুসলিমীন, আমীরুল মু’মিনীন হযরত উমর বিন খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, বেশ ভালো কথা। তুমি যখন ফায়ছালা চাচ্ছো, তাহলে মুখের কথায় তো হবে না। এটা লিখিত আনতে হবে, কাগজে-কলমে থাকতে হবে।



হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার নিকট গিয়ে বললেন, হে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম! আপনি যে আমাকে বলেছেন, ‘গোলামের ছেলে গোলাম’ এটা লিখিত দিতে হবে। আমি খলীফার কাছে ব্যাপারটা পেশ করেছি। তিনি বললেন ঠিক আছে, অসুবিধা নেই। আমি লিখিত দিব। সত্যিই তিনি একটা কাগজে লিখে দিলেন, ‘গোলামের ছেলে গোলাম’। সেটা নিয়ে পেশ করা হলো খলীফাতুল মুসলিমীন, আমীরুল মু’মিনীন, হযরত উমর বিন খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার কাছে। তিনি বললেন, ঠিক আছে, আমি এর ফায়ছালা করবো। বিষয়টি নিয়ে হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ সকলেই চিন্তিত হলেন। তাঁরা চিন্তিত হলেন যে, হযরত উমর বিন খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু জালালী তবিয়তের, তিনি ইনছাফগার হিসেবে মশহুর, আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিশিষ্ট ছাহাবী, নবীদের পরে দ্বিতীয় ব্যক্তিত্ব।



একদিকে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম, আরেকদিকে হযরত উমর বিন খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু। সকলেই চিন্তিত হলেন, বিষয়টি কীভাবে ফায়ছালা করা হবে? হযরত উমর বিন খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ইনছাফ করে থাকেন, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিচার করে থাকেন। তিনি কী বিচার করবেন? নির্দিষ্ট স্থান, সময়, দিন, তারিখ সব ঘোষণা করা হলো। হযরত ছাহাবায়ে কিরাম, হযরত তাবিয়ীনে কিরাম যাঁরা ছিলেন সকলেই সেখানে জমা হয়ে গেলেন যে, কী ফায়ছালা করা হয় সেটা জানার জন্য।



এদিকে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম তিনি উপস্থিত হলেন। তিনি যখন উপস্থিত হলেন, হযরত উমর ফারূক্ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে তা’যীম-তাকরীম করে একটা সম্মানিত স্থানে বসালেন। আর হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যখন আসলেন, উনাকেও বসতে বললেন। লোকজন সকলেই উপস্থিত। বিচারের নিদিষ্ট সময় যখন উপস্থিত হলো, খলীফাতুল মুসলিমীন তাঁর পকেট থেকে কাগজটা বের করে বললেন যে, একটা কাগজ আমার কাছে পেঁৗঁছানো হয়েছে, এ কাগজের মধ্যে লিখিত রয়েছে ‘গোলামের ছেলে গোলাম’। কাগজটা দিয়েছেন আমার ছেলে হযরত আব্দুল্লাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু। তাঁর বক্তব্য হচ্ছে- হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনাকে বলেছেন- ‘গোলামের ছেলে গোলাম’।



এ বিষয়ে ফায়ছালার জন্য এ কাগজটা আমার নিকট পেশ করা হয়েছে। তখন হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামকে জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কি আপনি লিখেছেন? তিনি বললেন যে, হ্যাঁ। এটা আমার লিখিত, আমি বলেছি এবং লিখেছি। যখন জিজ্ঞাসা করা হলো, জবাব নেয়া হলো। বিষয়টা সবাইকে জানানো হলো যে, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম তিনি বলেছেন এবং লিখেছেন। এটা লোকজন শুনলেন। তখন হযরত উমর বিন খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন যে, এটা এখন ফায়ছালা করা হবে। সকলেই শুনে তো স্তব্ধ হয়ে গেলেন। মনে হয়েছে যেন বাতাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে, সকলেই একদৃষ্টিতে খলীফাতুল মুসলিমীন, আমীরুল মু’মিনীন হযরত উমর বিন খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার দিকে চেয়ে রয়েছেন। এটা তিনি কীভাবে ফায়ছালা করেন, এটার কী ফায়ছালা রয়েছে?



হযরত উমর বিন খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ঘোষণা করলেন, এই যে কাগজটা যার মধ্যে লিখিত রয়েছে, ‘গোলামের ছেলে গোলাম’। অর্থাৎ আহলে বাইত-এর যিনি অন্যতম ব্যক্তিত্ব হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম তিনি আমার ছেলেকে বলেছেন, ‘গোলামের ছেলে গোলাম’। এর অর্থ হচ্ছে খলীফাতুল মুসলিমীন, আমীরুল মু’মিনীন তিনি হচ্ছেন গোলাম আর তাঁর ছেলে হচ্ছে ‘গোলামের ছেলে গোলাম’। এর ফায়ছালা হচ্ছে- আপনারা সকলেই সাক্ষী থাকুন, আমি আমার যিন্দিগীর অনেক সময় অতিবাহিত করেছি, পূর্ববর্তী কুফরী যিন্দিগী বাদ দিয়েছি, আমার অতীতের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি যা ছিল সেটা আমি ত্যাগ করেছি, শরীয়তের নির্দেশবহির্ভূত স্ত্রী ছিল তাদেরকেও ত্যাগ করেছি আল্লাহ পাক ও তাঁর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সন্তুষ্টির জন্য। আমার চাওয়া এবং পাওয়ার বিষয় এটাই ছিল যে, আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি এবং আল্লাহ পাক উনার হাবীব-এর সন্তুষ্টি। আল্লাহ পাক যতটুকু দিয়েছেন ততটুকু পাওয়া হয়েছে। তবে আমার একটা লিখিত দলীল প্রয়োজন ছিল, যে লিখিত দলীলের আমি প্রত্যাশা করেছিলাম। আজকে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম এটা লিখিত দিয়েছেন। এখন থেকে আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম আমি উনাদের গোলাম।



কাজেই, আমি ইন্তিকাল করলে এই কাগজখানা আমার কাফনের ভিতরে, আমার সিনার উপর রেখে দিবেন। এটা আমার ওছীয়ত। আমি ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ পাক এবং আল্লাহ পাক উনার হাবীব-এর কাছে আরজু করবো যে, ইয়া রসূলাল্লাহ, ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনার যিনি লখতে জিগার হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনি আমাকে লিখিত দিয়েছেন যে, ‘আমি গোলাম’। কাজেই, আমার আমল যা-ই রয়েছে কমপক্ষে এই দলীলের খাতিরে আমাকে গোলাম হিসেবে কবুল করা হোক। সুবহানাল্লাহ!



উনি যখন এটা ফায়ছালা করলেন, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম এবং তাবিয়ীনে কিরাম আলাইহিস সালাম আলাইহিম যাঁরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন সকলেই লা-জাওয়াব হয়ে গেলেন।



মূলতঃ এ ঘটনাটির মাধ্যমে যে বিষয়টি সুস্পষ্টরূপে ফুটে উঠেছে তা হলো- আল্লাহ পাক ও উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সন্তুষ্টি লাভ করতে হলে প্রত্যেক উম্মতের জন্য দায়িত্ব হলো আহলে বাইত এবং আওলাদে রসূলগণ-এর প্রতি সুধারণা পোষণ করা, উনাদেরকে মুহব্বত করা ও সম্মান-ইজ্জত করা।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.