নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

এডভোকেট আশফাক

এডভোকেট আশফাক › বিস্তারিত পোস্টঃ

কারবালার হৃদয় বিদারক ইতিহাস____১ম অংশ

১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ রাত ১০:৪৭

ইয়াযীদের মসনদ দখল



আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার বিছাল শরীফ-এর পর ইয়াযীদ সিংহাসনে আরোহন করলো এবং আরোহন করার সাথে সাথেই তার মনের মধ্যে সীমাহীন অহঙ্কার ও গর্ববোধের সৃষ্টি হলো। যার ফলে এমন কাজ-কর্ম শুরু করলো, যা মহান দ্বীনী শরীয়তের সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রায় মানুষ-ই ক্ষমতার মোহে বিভোর হয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করে। যেমন; ফিরআউন প্রথমে গরীব ছিল, কিন্তু ভাগ্যক্রমে বাদ্শা হয়ে সিংহাসনে আরোহন করার সাথে সাথে এমন অহঙ্কারী হয়ে বসলো যে, শেষ পর্যন্ত নিজেকে খোদা বলে ঘোষণা করলো। (নাঊযুবিল্লাহ) সে বলতে লাগলো, ‘আমি তোমাদের সবচেয়ে বড় খোদা’। আমার পূজা, আরাধনা কর। সে-ই রক্ষা পাবে যে আমার পূজা করবে। আর যে আমার পূজা করতে অস্বীকার করবে, তাকে আমি খতম করবো। একমাত্র এ কারণেই সে অনেক লোকের গর্দান দ্বিখন্ডিত করেছিল। তাঁদের অপরাধ ছিলো, তাঁরা তার পূজা করতেন না এবং তাকে মা’বূদ মানতে অস্বীকার করেছিলেন। তদ্রুপ ইয়াযীদও যখন সিংহাসনে বসলো, সে ক্ষমতায় আরোহন করার পর পরই হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম, হযরত আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু প্রমুখ থেকে বাইয়াত তলব করলো। একেতো উনারা ছিলেন ছাহাবী, বিশেষ সম্মানিত ব্যক্তি এবং উনারা বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের বংশধর ছিলেন। তাই তাঁরা কিভাবে ফাসিক-ফাজির ইয়াযীদের হাতে বাইয়াত করতে পারেন? সুতরাং তাঁরা অস্বীকার করলেন এবং এটা তাঁদের মর্যাদাগত সদাচরণই ছিল। অস্বীকার করার পর হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মদীনা শরীফ থেকে মক্কা শরীফে চলে গেলেন।



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম মদীনা শরীফ-এর গভর্নর ওয়ালীদের আহবানে তার দরবারে তাশরীফ নিয়ে গেলেন। তার সঙ্গে আলোচনা করলেন। মদীনা শরীফ-এর গভর্নর বললো, ইয়াযীদ আপনার বাইয়াত তলব করেছেন। তিনি বললেন, ‘আমি ইয়াযীদের হাতে বাইয়াত করতে পারি না। ইয়াযীদ হলো ফাসিক-ফাজির, এ ধরণের অনুপযুক্ত লোকের হাতে আমি বাইয়াত করতে পারি না। আমি কোন অবস্থাতেই তার হাতে বাইয়াত করতে রাজী নই।’ তিনি সুস্পষ্টভাবে অস্বীকার করলেন। এটা তাঁর মর্যাদাগত সদাচরণই ছিল।



উল্লেখ্য, তিনি যদি বাইয়াত করতেন, তাহলে নিজের প্রাণ বাঁচতো, পরিবার-পরিজন বাঁচতো, হয়তো এমনও হতো যে, অগাধ সম্পত্তির মালিকও তিনি হয়ে যেতেন। কিন্তু ইসলামের আইন-কানুন ছত্রভঙ্গ হয়ে যেত এবং কিয়ামত পর্যন্ত ফাসিক-ফাজিরের আনুগত্য বৈধ হয়ে যেত এবং তাদের কাছে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার আনুগত্য প্রধান দলীল হিসেবে পরিগণিত হতো। লোকেরা বলতো, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম যখন ফাসিক-ফাজিরের আনুগত্য স্বীকার করেছেন, তাহলে নিশ্চয়ই তা জায়িয।



কিন্তু ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু অস্বীকারের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সামনে প্রমাণ করে দিলেন, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম শত কষ্ট-যাতনা ভোগ করতে পারেন, অনেক বিপদ-আপদের মুকাবিলা করতে পারেন, এমন কী আপন পরিজনের সমস্ত লোকদের নির্দয়ভাবে শহীদ হওয়াটা অবলোকন করতে পারেন; নিজেও জালিমদের হাতে নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করতে পারেন, কিন্তু ইসলামের নিযাম বা বিধান ছত্রভঙ্গ হওয়া কিছুতেই সহ্য করতে পারেন না। নিজের নানাজান হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দ্বীন ধ্বংস হওয়াটা কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম নিজের কাজ ও কর্মপন্থা দ্বারা তা প্রমাণ করেছেন এবং দুনিয়াবাসীকে এটা দেখিয়ে দিয়েছেন, আল্লাহ তায়ালার মনোনীত ও খাছ বান্দাগণের এটাই শান যে, বাতিলের সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে যান এবং তীর তলোয়ারের সামনে বুক পেতে দেন, কিন্তু কখনও বাতিলের সামনে মাথা নত করেন না। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম নিজের আমল দ্বারা তাঁর উচ্চ মর্যাদার পরিচয় দান করেছেন এবং জনগণের সামনে নিজের পদমর্যাদা তুলে ধরেছেন।

_________

হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার মক্কা শরীফ-এর উদ্দেশ্যে মদীনা শরীফ ত্যাগ



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম এভাবে মদীনা শরীফ-এর গভর্নর ওলীদের বেয়াদবীপূর্ণ প্রস্তাব অস্বীকার করে যখন তার দরবার থেকে নিজের আপনজনদের কাছে ফিরে আসলেন এবং সবাইকে একত্রিত করে বললেন, আমার প্রিয়জনেরা! যদি আমি পবিত্র মদীনা শহরে অবস্থান করি, এরা আমাকে ইয়াযীদের বাইয়াত করার জন্য বাধ্য করবে, কিন্তু আমি কখনও বাইয়াত গ্রহণ করতে পারবো না। তারা বাধ্য করলে নিশ্চয়ই যুদ্ধ হবে, ফাসাদ হবে; কিন্তু আমি চাইনা আমার কারণে মদীনা শরীফ-এ লড়াই বা ফাসাদ হোক। আমার মতে, এটাই সমীচীন হবে যে, এখান থেকে হিজরত করে মক্কা শরীফ-এ চলে যাওয়া। নিজের আপনজনেরা বললেন, ‘আপনি আমাদের অভিভাবক; আমাদেরকে যা হুকুম করবেন তাই মেনে নেব।’ অতঃপর তিনি মদীনা শরীফ থেকে হিজরত করার সিদ্ধান্ত নিলেন।



আহ! অবস্থা কেমন সঙ্গীন হয়ে গিয়েছিল যে, ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে সেই মদীনা শরীফ ত্যাগ করতে হচ্ছিল, যে মদীনা শরীফ-এ হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনার নানাজান ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার রওযা শরীফ অবস্থিত। তাঁর নানাজান ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার রওযা শরীফ যিয়ারত করার উদ্দেশ্যে হাজার হাজার টাকা পয়সা ব্যয় করে, আপনজনদের বিরহ-বেদনা সহ্য করে, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দূর-দূরান্ত থেকে লোকেরা আসে এই পবিত্র মদীনা মুনাওওয়ারায়। কিন্তু আফসুস, আজ সেই মদীনা শরীফকে তিনি ত্যাগ করছেন, যেই মদীনা শরীফ ছিল উনারই। নবীজী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নয়নের মণি, আদরের দুলাল ছিলেন তিনি। ক্রন্দনরত অবস্থায় তিনি নানাজান ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার রওযা পাক-এ উপস্থিত হয়ে বিদায়ী সালাম পেশ করলেন এবং অশ্রুসজল নয়নে নানাজান ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অনুমতি নিয়ে আত্মীয়-পরিজন সহকারে ৬০ হিজরী ৪ঠা শা’বান তারিখে মদীনা শরীফ থেকে হিজরত করে মক্কা শরীফ-এ চলে গেলেন।

___________

মক্কা শরীফ-এ গমনের কারণ



আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ ফরমান-



ومن دخله كان امنا



অর্থ: ‘যে হেরেম শরীফ-এ প্রবেশ করলো, সে নিরাপদ আশ্রয়ে এসে গেল।’ (সূরা আলে ইমরান-৯৭) কেননা হেরেম শরীফ-এর অভ্যন্তরে ঝগড়া-বিবাদ, খুন-খারাবী নাজায়িয ও হারাম। এমনকি হেরেম শরীফ-এর সীমানায় উঁকুন মারা পর্যন্ত নিষেধ। তবে সাপ, বিচ্ছু ইত্যাদি মারতে পারে। কিন্তু যে সব পশু-পাখি মানুষের কোন ক্ষতি করে না সেগুলো মারা জায়িয নেই। আর মু’মিনদের ইজ্জত-সম্মান তাঁদের শান-মান এটাতো অনেক ঊর্ধ্বের বিষয়। তাই হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম চিন্তা করলেন যে, হেরেম শরীফ-এর অভ্যন্তরে যেহেতু ঝগড়া-বিবাদ, খুন-খারাবী নিষেধ সেহেতু কেউ আমার সাথে এখানে ঝগড়া-বিবাদ করতে আসবে না। তাই হেরেম শরীফ-এর সীমানায় অবস্থান করে আল্লাহ তা’য়ালার ইবাদত বন্দেগীতে বাকী জীবন কাটিয়ে দেব। এ মনোভাব নিয়ে তিনি মদীনা শরীফ থেকে মক্কা শরীফ-এ চলে আসলেন।

______

হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কাছে কূফাবাসীর চিঠি



মক্কা শরীফ আগমনের সাথে সাথে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কাছে কূফা থেকে লাগাতার চিঠিপত্র এবং সংবাদ-বাহক আসতে শুরু করলো। অল্প সময়ের মধ্যে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কাছে দেড়শত চিঠি এসে পৌঁছল। উলামায়ে কিরাম-এর কেউ কেউ তাঁদের কিতাবে বারশত চিঠির কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু নির্ভরযোগ্য কিতাবে দেড়শত চিঠির কথা উল্লিখিত হয়েছে। দেড়শত চিঠিই বিশেষ নির্ভরযোগ্য। কারণ সেই যুগে ডাক আদান-প্রদান অত সহজ ছিল না। লোকেরা চিঠি-পত্র, পত্র-বাহকের মাধ্যমে প্রেরণ করতো এবং পত্র-বাহক পায়ে হেঁটে বা ঘোড়ায় চড়ে গন্তব্যস্থানে চিঠি পৌঁছিয়ে দিত। এমতাবস্থায় দেড়শত চিঠি পৌঁছাটা অতটা সহজ ব্যাপার ছিল না।



যা হোক, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কাছে দেড়শত চিঠি পৌঁছেছিল। প্রত্যেক চিঠির বিষয়বস্তু খুবই আকর্ষণীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিষয়বস্তুগুলো হচ্ছে এরকম, "হে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম! আমরা আপনার সম্মানিত পিতা হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনারই অনুসারী এবং আহলে বাইত-এর ভক্ত। আমরাতো হযরত মুআবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে সমর্থন করিনি। তাঁর অনুপযুক্ত ছেলে ইয়াযীদকে মানার প্রশ্নই উঠতে পারে না। আমরা আপনার পিতা হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজহাহু রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ও আপনার ভাই হযরত ইমাম হাসান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার সমর্থনকারী। আমরা ইয়াযীদের অনুসারী নই। ইয়াযীদ এখন তখতারোহন করেছে, কিন্তু আমরা ইয়াযীদকে খলীফা বা ইমাম মানতে পারি না। আপনাকেই বরহক ইমাম, বরহক খলীফা মনে করি। আপনি মেহেরবানী করে কূফায় তাশরীফ আনুন। আমরা আপনার হাতে বাইয়াত করবো এবং আপনাকে খলীফা হিসেবে গ্রহণ করবো। আপনার জন্য আমাদের মাল-জান কুরবান করতে প্রস্তুত এবং আপনার হাতে বাইয়াত করে আপনার অনুসরণে জিন্দেগী অতিবাহিত করতে ইচ্ছুক। তাই আপনি আমাদের কাছে তাশরীফ আনুন। আমাদের প্রতি মেহেরবানী করুন এবং আমাদেরকে আপনার ছোহবতে রেখে আপনার ফয়েজ-বরকত দ্বারা আমাদেরকে উপকৃত করুন"।



সমস্ত কাবিলা খানদানের পক্ষ থেকে তাঁর কাছে এই ধরণের চিঠি এসেছিল। অনেকেই এই ধরণের চিঠিও লিখেছিল, "হে মহান ইমাম, আপনি যদি আমাদের কাছে না আসেন, আমাদেরকে বাধ্য হয়ে ইয়াযীদের হাতে বাইয়াত করতে হবে; কারণ সরকারের মোকাবেলা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কাল কিয়ামতের মাঠে আল্লাহ্ তা’য়ালা যখন জিজ্ঞেস করবেন- কেন আমরা নালায়েক ইয়াযীদের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করলাম, তখন আমরা পরিস্কার বলব, হে মওলা! আমরা আপনার পেয়ারা রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সল্লাম-এর দৌহিত্রের কাছে চিঠি লিখেছিলাম, সংবাদ পাঠিয়েছিলাম, মাল-জান কুরবানী করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি তাশরীফ আনেননি এবং আমাদের দাওয়াত গ্রহণ করেননি। তিনি যখন অগ্রাহ্য করলেন, আমরা বাধ্য হয়ে ইয়াযীদের হাতে বাইয়াত করেছি। তাই হে ইমাম! আপনি স্মরণ রাখবেন, আমাদের এ বাইয়াতের জন্য আপনিই দায়ী হবেন।"

______

হযরত ইমাম মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর কূফা গমন



কূফাবাসীদের পক্ষ থেকে এ ধরনের চিঠি লিখার পরিপ্রেক্ষিতে শরীয়তের বিধান অনুযায়ী হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম চিন্তা করলেন যে, সেখানে তিনি যাবেন কি না। তিনি অনেকের সাথে এ বিষয়ে পরামর্শ করলেন এবং শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, প্রথমে একজন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিকে পাঠাবেন, যিনি সেখানে গিয়ে স্বচক্ষে অবস্থা যাচাই করে দেখবেন যে, ওরা বাস্তবিকই উনাকে চায় কি না? উনার প্রতি সত্যিই আন্তরিক মুহব্বত ও বিশ্বাস আছে কি না? সঠিক সংবাদ পাওয়ার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিবেন, তিনি যাবেন কি যাবেন না।



অতঃপর তিনি তাঁর চাচাতো ভাই হযরত মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহিকে এ কাজের জন্য মনোনীত করলেন এবং ফরমালেন, প্রিয় মুসলিম! কূফা থেকে যেভাবে চিঠি আসছে তা যাচাই করে দেখার জন্য তোমাকে আমার প্রতিনিধি করে সেখানে পাঠানোর মনস্থ করেছি। তুমি সেখানে গিয়ে স্বচক্ষে অবস্থা উপলব্ধি এবং যাচাই করে যদি অবস্থা বাস্তবিকই সন্তোষজনক মনে কর, তাহলে আমার কাছে চিঠি লিখবে। চিঠি পাওয়ার পর আমি রওয়ানা হবো, অন্যথায় তুমি সেখান থেকে চলে আসবে। তাঁর চাচাতো ভাই হযরত মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহি যাবার জন্য তৈরি হয়ে গেলেন। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম কূফাবাসীদের কাছে একটি চিঠি লিখলেন- ‘ওহে কূফাবাসী! পরপর তোমাদের অনেক চিঠি আমার কাছে পৌঁছেছে। তাই আমি আমার চাচাতো ভাই হযরত মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহিকে আমার প্রতিনিধি করে তোমাদের কাছে পাঠালাম। তোমরা সবাই তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করো এবং তাঁর খিদমত করো। তিনি তোমাদের মনোভাব যাচাই করে আমার কাছে চিঠি লিখবেন, যদি তোমাদের মনোভাব সন্তোষজনক হয়, তাঁর চিঠি আসার পর পরই আমিও তোমাদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে যাব।’ এভাবে চিঠি লিখে সীল মোহর লাগিয়ে হযরত মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহিকে দিলেন এবং উনাকে বিদায় দিলেন। হযরত মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর দুই ছেলে হযরত মুহম্মদ রহমতুল্লাহি আলাইহি ও হযরত ইব্রাহীম রহমতুল্লাহি আলাইহিও তৈরি হয়ে গেলেন। তাঁরা বলতে লাগলেন, আব্বাজান! আমাদেরকে ফেলে যাবেন না, আমাদেরকেও সাথে নিয়ে যান। হযরত মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ছেলেদের অন্তরে আঘাত দিতে চাইলেন না। তাই তাঁর ছেলেদ্বয়কেও সাথে নিয়ে নিলেন। অতঃপর তিনি মক্কা শরীফ থেকে মদীনা শরীফ গেলেন এবং আত্মীয় স্বজনের সাথে দেখা করার পর কূফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন।

_____

হযরত ইমাম মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর প্রতি প্রাণঢালা সংবর্ধনা



কূফায় পৌঁছে মুখতার বিন উবায়দুল্লাহ সাক্ফী, যে আমন্ত্রণকারীদের মধ্যে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিল ও আহলে বাইত-এর অনুরক্ত ছিল, তার ঘরেই হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি তাশরীফ রাখলেন। যখন কূফাবাসীরা খবর পেল যে, হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম এর প্রতিনিধি হয়ে এসেছেন। তখন কূফাবাসীরা দলে দলে এসে তাঁর হাতে বাইয়াত হতে লাগলো। অল্প দিনের মধ্যে চল্লিশ হাজার লোক তাঁর হাতে বাইয়াত হয়ে গেল এবং এমন ভালবাসা ও মুহব্বত দেখালো যে, হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি অভিভূত হয়ে গেলেন। তাঁর পিছে পিছে লোক চলাফেরা করছে, দিন-রাত মেহমানদারী করছে, তাঁর হাতে-পায়ে চুম্বন করছে এবং একান্ত আনুগত্যের পরিচয় দিচ্ছে। এতে হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি ভীষণভাবে আকৃষ্ট হলেন এবং মনে মনে বললেন, এরাতো সত্যিই হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার বড়ই আশিক এবং উনার জন্য একেবারে ফানা। তিনি ভাবলেন, আমাকে পেয়ে তাদের যে অবস্থা হয়েছে, জানিনা, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম আসলে তারা কী যে অবস্থা করবে। হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি এভাবে পরিতৃপ্ত হয়ে সমস্ত অবস্থার বর্ণনা দিয়ে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কাছে চিঠি লিখলেন- "চল্লিশ হাজার লোক আমার কাছে বাইয়াত হয়েছে, সব সময় আমার সাথে সাথে রয়েছে, আমার যথেষ্ট খিদমত করছে এবং তাদের অন্তরে আপনার প্রতি অসীম মুহব্বত রয়েছে। তাই আপনি আমার চিঠি পাওয়া মাত্রই চলে আসুন। এখানকার অবস্থা খুবই সন্তোষজনক।" এভাবে হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার নিকট চিঠি লিখলেন। এদিকে পত্র-বাহক পত্র নিয়ে রওয়ানা হয়ে গেল। আর ঐদিকে দেখুন, তক্দীরে যা লিখা ছিল, তা কিভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

_____

কূফাবাসীর বেঈমানী



ইয়াযীদের অনুসারীদের মধ্যেও অনেকে কূফায় অবস্থান করতো। তারা যখন দেখলো, হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি -এর হাতে চল্লিশ হাজার লোক বাইয়াত গ্রহণ করেছে, তখন তারা ইয়াযীদকে এ ব্যাপারটা জানিয়ে উস্কানীমূলক চিঠি দিল। তারা ইয়াযীদকে লিখলো যে, ওহে ইয়াযীদ! তুমিতো নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছো, আর এদিকে তোমার বিরুদ্ধে কূফায় বিদ্রোহ দানা বেঁধে উঠছে, যা তোমার পক্ষে প্রতিরোধ করা খুবই কষ্টসাধ্য হবে। তোমারতো খবরই নেই, তোমার বিরুদ্ধে চল্লিশ হাজার লোক বাইয়াত হয়েছে এবং আরও লোক বাইয়াত হচ্ছে। যদি এভাবে চলতে থাকে, তাহলে এখান থেকে এমন এক ভয়ানক ঝড়-তুফানের সৃষ্টি হবে, যা তোমাকে খড়-কুটার ন্যায় উড়িয়ে নিয়ে যাবে। তাই তুমি যেভাবেই হোক এটাকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করো।’ যখন ইয়াযীদ চিঠির মাধ্যমে এ খবর পেল, সে খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলো। সে অবহিত আছে যে, রাজ-ক্ষমতা বড় জিনিস। কেউ নিজ ক্ষমতা সহজে ত্যাগ করতে চায় না। আপ্রাণ চেষ্টা করে সেই ক্ষমতা, সেই সিংহাসন আঁকড়ে রাখতে চায়। তাই ইয়াযীদের কাছেও যখন তার রাজত্ব হুমকির সম্মুখীন মনে হলো, তখন কূফার গভর্নর ‘নোমান বিন বশীর’ যিনি হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি -এর বিরুদ্ধে কোন প্রতিকার নেননি, তাকে পদচ্যূত করলো এবং তার স্থলে ইবনে যিয়াদ যার আসল নাম ছিল ‘উবাইদুল্লাহ’ যে বড় যালিম ও কঠোর ব্যক্তি ছিল এবং যে বছরার গভর্নর ছিল, তাকে কূফার গভর্নর নিয়োগ করলো এবং তার কাছে চিঠি লিখলো- ‘তুমি বছরার গভর্নরও থাকবে, সাথে সাথে তোমাকে কূফারও গভর্নর নিয়োগ করা হলো। তুমি শীঘ্রই কূফা এসে আমার বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহের সৃষ্টি হয়েছে, তা যেভাবে হোক দমিয়ে ফেলো, এ ব্যাপারে যা করতে হয়, তা করার জন্য তোমাকে পূর্ণ ইখতিয়ার দেয়া হলো। যেভাবেই হোক, যে ধরনের পদক্ষেপই নিতে হোক না কেন, এ বিদ্রোহকে নির্মূল করে দাও।’ ইবনে যিয়াদ ইয়াযীদের পক্ষ থেকে পূর্ণ ক্ষমতা নিয়ে কূফায় আসলো। সে কূফায় এসে সর্বপ্রথম যে কাজটা করলো, তা হচ্ছে যতগুলো বড় বড় সর্দার ছিল এবং যারা হযরত মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সাথে ছিল ও বাইয়াত গ্রহণ করেছিল, তাদের সবাইকে বন্দী করে ফেললো এবং বন্দী করার পর কূফার গভর্নর হাউজে নজরবন্দী করে রাখলো। তাদের এই বন্দীর কথা বিদ্যুৎ বেগে সমগ্র কূফায় ছড়িয়ে পড়লো এবং এতে সমস্ত লোক হতভম্ব ও মর্মাহত হলো। সবাই চিন্তিত হলো, এখন কি করা যায়? সমস্ত বড় বড় সর্দারকে বন্দী করছে এবং অনেককে বন্দী করে ফেলেছে। এমনকি হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহিকেও বন্দী করার কৌশল নিয়ে চিন্তা ভাবনা করছে।



যখন হযরত মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি দেখলেন যে, বড় বড় সর্দারদেরকে বন্দী করা হয়েছে এবং আরও নতুন-নতুন বন্দী করার জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে, তখন তিনি তাঁর সমস্ত অনুসারী ও বাইয়াত গ্রহণকারীদের আহবান করলেন। তাঁর ডাকে সাথে সাথে সবাই এসে সমবেত হয়ে গেল। ঐ চল্লিশ হাজার ব্যক্তি যারা তাঁর হাতে বাইয়াত করেছিল, তারা সবাই সমবেত হলো। তিনি তাদের হুকুম দিলেন, গভর্নর ভবন ঘেরাও করো। হযরত মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি সেই চল্লিশ হাজার অনুসারীদেরকে নিয়ে গভর্নর ভবন ঘেরাও করলেন। তখন অবস্থা এমন উত্তপ্ত ছিল, তিনি একটু ইশারা করলে ঐ চল্লিশ হাজার লোক এক মূহূর্তের মধ্যে গভর্নর ভবন ধুলিস্যাৎ করে ফেলত এবং ইবনে যিয়াদ এর কোন প্রতিরোধ করতে পারতো না। কারণ, ঐ চল্লিশ হাজার লোকের মোকাবেলা করার ক্ষমতা তখন তার ছিল না। এমনকি তখন তার কাছে এত সৈন্যও ছিল না। হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি যখন চল্লিশ হাজার লোক নিয়ে গভর্নর ভবন ঘেরাও করলেন, তা দেখে ইবনে যিয়াদ খুবই ভয় পেল। তবে সে চালাকী ও ধোঁকাবাজির আশ্রয় নিল। যেসব বড় বড় সর্দারদেরকে গভর্নর ভবনে নজরবন্দী করে রাখা হয়েছিল, তাদের সবাইকে একত্রিত করে বললো, দেখুন আপনারা যদি আপনাদের পরিবার-পরিজনের মঙ্গল চান তাহলে আমার পক্ষ অবলম্বন করুন। আমাকে সহযোগিতা করুন। নচেৎ আমি আপনাদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দিব এবং আপনাদের পরিবারের ও আপনাদের সন্তান-সন্ততিদের যে কঠিন পরিণতি হবে, তা দুনিয়াবাসী দেখবে। অতঃপর বড় বড় সর্দারেরা বললো, আপনি কি চান? কি ব্যাপারে আমাদের সহযোগিতা চান? ইবনে যিয়াদ বলল- যারা এ মুহূর্তে গভর্নর ভবন ঘেরাও করে রেখেছে, তারা হয়তো আপনাদের ছেলে হবে বা ভাই হবে বা অন্য আত্মীয় স্বজন হবে। আমি এখন আপনাদেরকে গভর্নর ভবনের ছাদের উপর উঠাচ্ছি, আপনারা নিজ নিজ আপনজনদেরকে ডেকে বুঝান, যেন তারা ঘেরাও প্রত্যাহার করে নেয় এবং হযরত মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সঙ্গ ত্যাগ করে। যদি আপনারা এই রকম না করেন, তাহলে সবার আগে আপনাদের হত্যা করার নির্দেশ দিব এবং অতি সহসা আমার যে সৈন্য বাহিনী আসছে তারা কূফা আক্রমণ করবে, আপনাদের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হবে এবং আপনাদের শিশুদেরকে বর্শার অগ্রভাগে উঠানো হবে অর্থাৎ আপনাদের কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে। তাই আমি আপনাদেরকে বলছি- আমার পক্ষ অবলম্বন করুন, যদি নিজের এবং পরিবার পরিজনের মঙ্গল চান।



এভাবে যখন সে হুমকি দিল তখন বড় বড় সর্দারেরা ঘাবড়িয়ে গেল এবং সবাই বলতে লাগল, ইবনে যিয়াদ! আপনি যা করতে বলেন আমরা তাই করবো। ইবনে যিয়াদ বললো, চলুন, ছাদে উঠুন এবং আমি যেভাবে বলি সেভাবে করুন। সর্দারেরা সাথে সাথে ছাদের উপর উঠলো এবং নিজ নিজ আপনজনদেরকে ডাকতে লাগলো। ডেকে চুপি চুপি বুঝাতে লাগলো, দেখ, ক্ষমতা এখন ইয়াযীদের হাতে, সৈন্য বাহিনী ইয়াযীদের হাতে, অস্ত্র-শস্ত্র, ধন-সম্পদ ইয়াযীদের হাতে। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম অবশ্যই রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বংশধর। কিন্তু তাঁর কাছে না আছে রাজত্ব, না আছে সম্পদ, না সৈন্য-সামন্ত, না অস্ত্র-শস্ত্র। তাই তিনি সৈন্য-সামন্ত, অস্ত্র-শস্ত্র ও ধন সম্পদ ব্যতিরেকে কিভাবে ইয়াযীদের মোকাবিলা করবেন? মাঝখানে আমরা বিপদগ্রস্ত হবো। এটা রাজনৈতিক ব্যাপার। তাই তোমরা এখন এ ঘেরাও উঠিয়ে নাও এবং হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সঙ্গ ছেড়ে দাও। স্মরণ রেখ, তোমরা যদি এরকম না করো, তাহলে না তোমরা আমাদের মুখ দেখবে আর না আমরা তোমাদের মুখ দেখবো। আমাদেরকে এখনি কতল করে ফেলবে আর তোমাদের পরিণামও খুব ভয়াবহ হবে।



যখন বড় বড় সর্দারেরা নিজ নিজ আপন জনদেরকে বুঝাতে ও পরামর্শ দিতে লাগলো, তখন লোকেরা অবরোধ ছেড়ে দিয়ে নীরবে চলে যেতে লাগলো। দশ-বিশজন করে এদিক-ওদিক থেকে লোক চলে যেতে লাগলো। হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি চল্লিশ হাজার লোক নিয়ে গভর্নর ভবন ঘেরাও করেছিলেন কিন্তু আসরের পর মাগরিবের আগে মাত্র পাঁচশ জন লোক ছাড়া বাকী সব চলে গেল। এতে হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি খুবই মর্মাহত হলেন। তিনি ভাবলেন, চল্লিশ হাজার লোক থেকে সাড়ে ঊনচল্লিশ হাজার চলে গেছে, কেবল পাঁচশ জন রয়ে গেল, তাদের উপরও বা কতটুকু আস্থা রাখা যায়? হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি যখন এ অবস্থা দেখলেন, তখন যে পাঁচশ জন ছিল, তিনি তাদেরকে বললেন, চলুন আমরা জামে মসজিদে গিয়ে মাগরিবের নামায আদায় করি। নামাযের পর পরামর্শ করব- কি করা যায়? সবাই বললেন, ঠিক আছে। হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি পাঁচশ লোককে নিয়ে মসজিদে গেলেন। তখন নামাযের সময় হয়ে গেছে। আযান হয়েছে। হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন। পাঁচশ জন পিছনে ইক্তিদা করলো। হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিন রাকায়াত ফরয নামায পড়ার পর যখন সালাম ফিরালেন, তখন দেখলেন, ঐ পাঁচশ জনের মধ্যে একজনও নেই।



আশ্চর্য! সকালে চল্লিশ হাজার লোক সাথে ছিল, এখন মাগরিবের পরে একজনও নেই! এরা তারাই, যারা নিজেদেরকে আহ্লে বাইত-এর একান্ত ভক্ত বলে দাবি করতো, যাদের পূর্ব পুরুষেরা আহ্লে বাইত-এর অনুসারী দাবীদার ছিল। এরাই চিঠি লিখেছিল, এরাই হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামকে কূফায় আসার জন্য আহবান জানিয়েছিল, এরাই জান-মাল কুরবানীর জন্য নিশ্চয়তা দিয়েছিল! এরাই হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেছিল এবং বড় বড় শপথ করে ওয়াদা করেছিল যে, তারা জান দেবে তবুও তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করবে না। কিন্তু তাদের প্রাণও দিতে হলো না, তীর দ্বারা আহতও হতে হলো না, না তরবারি দ্বারা আঘাত প্রাপ্ত হলো, কেবল ইবনে জিয়াদের ধমকেই হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সঙ্গ ছেড়ে দিল এবং বিশ্বাসঘাতকতা করলো!



হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি নামায শেষে আল্লাহ পাককে স্মরণ করছিলেন এবং মনে মনে ভাবছিলেন, এখন কী করা যায়? সব লোকতো আমাকে ছেড়ে চলে গেল। আর এদিকে আমিতো হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামকে চিঠি লিখে দিয়েছি যে, এখানকার অবস্থা খুবই সন্তোষজনক। এখানকার লোকদের মনে তাঁর প্রতি আন্তরিক ও অসীম মুহব্বত রয়েছে। চিঠি পাওয়ার পর হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম এক মুহূর্তও বিলম্ব করবেন না। তিনি খুব তাড়াতাড়ি এসে যাবেন। তখন কী যে প্রতিক্রিয়া হবে, যখন এসে দেখবেন এসব লোকেরা আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এসব চিন্তা-ভাবনা নিয়ে তিনি মসজিদ থেকে বের হয়ে নিজ মুরীদের কাছে গেলেন। কিন্তু যেই মুরীদের কাছেই গেলেন, দেখলেন যে, ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। ডাকাডাকি করার পরও ঘরের দরজা খুলছে না। অথচ এরাই ঐসব লোক, যারা বড় বড় ওয়াদা করেছিল এবং আহ্লে বাইত-এর ভক্ত বলে দাবি করেছিল, এখন তারা ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে রাখলো!



হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি রাত্রে কুফার রাস্তায় এমনভাবে অসহায় অবস্থায় ঘুরে বেড়াতে লাগলেন যেমন একজন সহায়-সম্বলহীন মুছাফির ঘুরাফিরা করে। তিনি বড় পেরেশানীর সাথে অলি-গলিতে হাঁটতে লাগলেন। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় গিয়ে এক বৃদ্ধা মহিলাকে দেখলেন, যিনি ঘরের দরজা খুলে বসেছিলেন। তিনি তার কাছে গিয়ে পানি চাইলেন। বৃদ্ধা পানি দিলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কে? কোথা থেকে এসেছেন, কার সঙ্গে দেখা করবেন এবং কোথায় যাবেন? যখন বৃদ্ধা মহিলাটি তাঁর অবস্থা জিজ্ঞাসা করলেন, তখন তিনি অকপটে বললেন, ওহে বোন! আমি মুসলিম বিন আক্বীল, হযরত ইমাম হুসাইন বিন আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার প্রতিনিধি হয়ে কূফায় এসেছিলাম। মহিলাটি আশ্চর্য হয়ে বললেন, আপনি মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহি! আপনি এভাবে অসহায়ভাবে ঘুরাফিরা করছেন! কূফার সবাই জানে যে, আপনার হাতে হাজার হাজার লোক বাইয়াত হয়েছে এবং সবাই আপনার জন্য জান-মাল কুরবান করতে প্রস্তুত। কিন্তু এখন আমি কী দেখছি! আপনি যে এভাবে অসহায়, একাকী ঘুরাফিরা করছেন? হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, ‘হ্যাঁ বোন’! বাস্তবিকই তা ছিল। কিন্তু তারা আমার সাথে বেঈমানী করেছে। তাই আপনি আমাকে এই অবস্থায় দেখছেন। কূফার কোন ঘরের দরজা আজ আমার জন্য খোলা নেই, এমন কোন জায়গা নেই যেখানে আমি রাত্রি যাপন করতে পারি এবং আশ্রয় নিতে পারি। বৃদ্ধা মহিলা বললেন, আমার গরীবালয় আপনার জন্য খোলা আছে। আমার জন্য এর থেকে বড় সৌভাগ্য আর কি হতে পারে যে, রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার একজন আওলাদ আমার ঘরে মেহমান হয়েছেন। সেই বৃদ্ধাটি উনাকে ঘরে জায়গা দিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি তার ঘরে আশ্রয় নিলেন। সেখানে তিনি রাত যাপন করলেন।



খোদা তায়ালার কুদরত! ঐ বৃদ্ধার এক ছেলে ছিল বড় নাফরমান। এটা খোদা তায়ালারই শান যে, নেককার থেকে বদকার এবং বদকার থেকে নেককার পয়দা হয়। আল্লাহ তায়ালা ম’ুমিনদের ঘরে কাফির সৃষ্টি করে দেন এবং কাফিরদের ঘরে মু’মিন। ফিরআউনের স্ত্রী শ্রেষ্ঠ ঈমানদার। আর হযরত লূত আলাইহিস সালাম-এর স্ত্রী হয়ে যায় কাফির। কাফিরের ঘরে লালিত-পালিত হয়ে যান নবী-রসূল। আর হযরত নূহ আলাইহিস সালাম-এর ঘরে জন্ম ও লালিত-পালিত কেনান হয়ে যায় কাফির। বৃদ্ধা মহিলার ক্ষেত্রেও তাই। তিনি নেককার। কিন্তু তার ঘরেই জন্ম নিয়েছে এক বড় নাফরমান।



শেষ রাতে বৃদ্ধার সেই নাফরমান ছেলে ঘরে আসলো, এসে মাকে পেরেশান দেখে জিজ্ঞাসা করলো, মা তুমি চিন্তিত কেন? মা বললেন, বৎস! মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহি, যিনি আমাদের প্রিয় নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার খানদানের একজন। তিনি কূফায় এসেছিলেন হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার প্রতিনিধি হয়ে। কূফাবাসী তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেছিল। তারা তাঁর পিছে-পিছে থাকতো এবং জান-মাল কুরবানী করার নিশ্চয়তা দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান গভর্নরের ধমকীতে সবাই তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করেছে এবং বেঈমানী করে সবাই তাঁর জন্য ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি অসহায় অবস্থায় অলি-গলিতে ঘুরছিলেন। যাক, খোদা তায়ালা আমাকে সৌভাগ্যবান করেছেন, আজ তিনি আমার ঘরে মেহমান এবং আমার ঘরে অবস্থান করছেন। তিনি আমার গরীবালয়ে ক্বদম রেখেছেন। এর জন্য আমি আজ গর্ববোধ করছি যে, আমি তাঁর মেহমানদারীর সুযোগ লাভ করলাম। এ জন্যই একদিকে আজ আমি খুবই আনন্দিত, আর অন্যদিকে আমি খুবই দুঃখিত যে, কূফাবাসীরা একজন সম্মানিত মেহমানের সাথে এ ধরনের বেঈমানী করতে পারলো।



বৃদ্ধা মহিলাটি যখন এসব ঘটনা বলছিলেন, তাঁর সেই নাফরমান ছেলে মনে মনে খুবই খুশি হলো এবং মনে মনে বলতে লাগলো- শিকার হাতের মুঠোয়, এটাতো বড় সৌভাগ্যের বিষয়। নাঊযুবিল্লাহ! আমার মা’ তো একজন সাধা-সিধে মহিলা। তিনি কি জানেন ইবনে জিয়াদের ঘোষণার কথা? ইবনে যিয়াদ তো ঘোষণা করেছে, যে ব্যক্তি হযরত মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহিকে গ্রেফতার করতে পারবে, তাকে এক হাজার দিরহাম পুরস্কার দেয়া হবে। যা হোক, তিনি যখন সৌভাগ্যবশতঃ আমার ঘরে এসে গেছেন, আমি খুবই সকালে গিয়ে খবর দিয়ে উনাকে আমার ঘর থেকে গ্রেফতার করাবো এবং হাজার দিরহাম পুরস্কার লাভ করবো। ছেলে এই অসৎ উদ্দেশ্য ও ইচ্ছা তার মা’র কাছে গোপন রাখলো।



এদিকে সে অস্থির হয়ে পড়লো, কখন সকাল হবে, কখন খবর পৌঁছাবে এবং পুরস্কার লাভ করবে। ফজর হওয়া মাত্রই সে তার অন্যান্য বন্ধুদের নিয়ে ইবনে যিয়াদকে খবর দিলো যে, হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি ওর ঘরেই অবস্থান করছেন, সে হলো সংবাদদাতা এবং সেই পুরস্কারের দাবিদার। ইবনে যিয়াদ বললো, তোমার পুরস্কার তুমি নিশ্চয়ই পাবে, প্রথমে উনাকে গ্রেফতার করার ব্যবস্থা করো। সে বললো, ঠিক আছে, আমার সাথে সিপাই পাঠিয়ে দিন। তার কথা মতো তার সাথে সত্তরজন সিপাই গেল এবং সেই মহিলাটির ঘর চারদিক থেকে ঘেরাও করে ফেললো।



হযরত মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি এই অবস্থা দেখে তলোয়ার নিয়ে বের হলে সিপাইরা জঘন্যভাবে বেয়াদবী করলো এবং এমন ভাষা উচ্চারণ করলো, যা মোটেই বরদাশত্্যোগ্য নয়। ওরা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কঠোর সমালোচনা করলো এবং ইয়াযীদের প্রশংসা করলো। আর তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অভিযোগ আনলো। হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি এর যথার্থ উত্তর দিলেন। কিন্তু ইত্যবসরে ওরা তীর নিক্ষেপ করলো।



হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, যদি আলোচনা করতে চাও তাহলে বুদ্ধিমত্তার সাথে আলোচনা করো। আর যদি তীর নিক্ষেপ করো আমিও এর যথোচিত জবাব দিব। ওরা বললো, ঠিক আছে, শক্তি থাকলে জবাব দিন। তাদের কথা শুনে হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি তাদের সামনা-সামনি এসে গেলেন এবং তলোয়ার চালাতে শুরু করলেন। তিনি একাই সত্তরজনের সাথে মোকাবিলা করতে লাগলেন আর এদিকে ওরা তাঁর বীরত্বপূর্ণ আক্রমণে হতভম্ভ হয়ে গেল এবং তারা মনে মনে বললো, আমরা ধরাকে সরা জ্ঞান করে ভুল করলাম। হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সুনিপূণ তলোয়ার চালনার সামনে ওরা টিকতে না পেরে পিছপা হলো। তবুও তিনি কয়েক জনকে হত্যা করতে সক্ষম হলেন এবং অনেককে আহত করলেন। এই অবস্থায় তিনি নিজেও আহত হলেন। একটা তীরের আঘাতে উনার সামনের দাঁত ভেঙ্গে গেল। রক্ত বের হচ্ছিল।



তখন তিনি বৃদ্ধা মহিলাটির কাছ থেকে পানি চাইলেন। মহিলাটি উনাকে পান করার জন্য এক পেয়ালা পানি দিলেন। যখন তিনি পানি পান করতে মুখে নিলেন, তখন সেই পানি মুখের রক্তে লালে লাল হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত তিনি পানি পান করলেন না। পেয়ালাটা মাটিতে রেখে তিনি মনে মনে বললেন, "হয়তঃ দুনিয়ার পানি আমার ভাগ্যে আর নেই। আমি জান্নাতুল ফিরদাউস-এ গিয়ে তৃষ্ণা নিবারণ করবো।"

_____

হযরত ইমাম মুসলিম বিন আক্বীল রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর শাহাদাত



হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি পুনরায় লড়তে শুরু করলেন। এ খবর যখন ইবনে জিয়াদের কাছে পৌঁছলো তখন সে মুহম্মদ বিন আশআছকে পাঠালো এবং তাকে বললো, তুমি গিয়ে কুটনৈতিক ও রাজনৈতিক পন্থায় উনাকে বন্দী করে আমার কাছে নিয়ে এসো। সে হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর কাছে এসে বললো, ‘ওরা আসলে বোকামী করেছে। ওদেরকে ইবনে যিয়াদ মোকাবিলা বা লড়াই করার জন্যে পাঠায়নি। ওদেরকে পাঠানো হয়েছিল আপনাকে ডেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আপনি আমার সাথে গভর্নর ভবনে চলুন। আপনি গভর্নরের সাথে কথা বলুন, তিনি আপনার সাথে মত বিনিময় করতে চান। কারণ তিনি চাচ্ছেন, ইত্যবসরে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামও কূফায় এসে পৌঁছবেন। তাই যেন কোন ফিতনা-ফাসাদের সৃষ্টি না হয়। গভর্নরের কাছে চলুন, কথাবার্তার মাধ্যমে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হোন। মত বিনিময়ের মাধ্যমে হয়ত সন্ধিও হয়ে যেতে পারে।



হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, আমিও তো তাই চাচ্ছি। তা’ না হলে আমি যখন চল্লিশ হাজার সমর্থক নিয়ে গভর্নর ভবন ঘেরাও করেছিলাম তখন আমার একটু ইশারাই গভর্নর ভবন তছনছ এবং ইবনে যিয়াদকে গ্রেফতার করার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু আমি এটা নিজে পছন্দ করি না যে, মারামারি বা খুন-খারাবী হোক। মুহম্মদ বিন আশআছ বললো, আমার সাথে চলুন, সিপাইদেরকে ধমকের সুরে বললো, তলোয়ার খোলা রাখছো কেন? বেকুবের দল কোথাকার, তলোয়ার খাপের মধ্যে ভরে রাখো। এভাবে ওদেরকে ধমক দিল আর উনাকে সাথে নিয়ে চললো। হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি তার সাথে গেলেন এবং গভর্নর ভবনে প্রবেশ করার সময় এই দুআটি পড়লেন-



ربنا افتح بيننا وبين قومنا بالحق وانت خير الفاتحين



‘রব্বানাফ্তাহ্ বাইনানা ওয়া বাইনা ক্বওমিনা বিল্হাক্কি ওয়া আংতা খইরুল ফাতিহীন।’ (সূরা আ’রাফ-৮৯) এই দুআটি পড়তে পড়তে যখনই তিনি গভর্নর ভবনের শাহী দরজায় প্রবেশ করলেন, এদিকে ইবনে যিয়াদ উম্মুক্ত তলোয়ারধারী কিছু সিপাহীকে দরজার দু’পাশে নিয়োজিত করে রেখেছিল এবং তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করা মাত্রই দু’দিক থেকে আক্রমণ করে যেন উনাকে শহীদ করা হয়। নির্দেশ মত যখনই তিনি গভর্নর ভবনের দরজায় পা রাখলেন, তখনই তাঁর উপর দু’দিক থেকে তলোয়ার দ্বারা আক্রমণ করা হলো এবং সেখানেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন)



উলামায়ে কিরাম-এর কেউ কেউ তাঁদের কিতাবে লিখেছেন যে, তিনি যথারীতি ইবনে জিয়াদের কাছে পৌঁছেছেন এবং আলোচনা করেছেন। ইবনে যিয়াদ হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহিকে বললো, দেখুন, আপনি বড় অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছেন। তথাপি একটি শর্তে আমি আপনাকে রেহাই দিতে পারি। শর্তটি হচ্ছে, আপনি ইয়াযীদের বাইয়াত গ্রহণ করুন এবং প্রতিশ্রুতি দিন যে, যখন হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম আসবেন, উনাকেও ইয়াযীদের বাইয়াত করিয়ে দিবেন। এতে সম্মত হলে আপনাকে আমি মুক্তি দিতে পারি। অন্যথায় আপনার ও হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কোন নিস্তার নেই। নাঊযুবিল্লাহ।



হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি উত্তরে বললেন, ‘প্রস্তাব মন্দ নয়, তবে আমি কিংবা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম ইয়াযীদের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করতে পারি না। এটা কখনো কল্পনাও করা যায় না যে, আমরা ইয়াযীদের কাছে বাইয়াত হবো। তাই তোমার যা ইচ্ছা তা করতে পার।’ ইবনে যিয়াদ পুনরায় বলল, যদি আপনি বাইয়াত গ্রহণ না করেন ও ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকেও বাইয়াত করানোর ব্যবস্থা না করেন, তাহলে আমি আপনাকে শহীদ করার নির্দেশ দিব। হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি দৃঢ়কন্ঠে বললেন, ‘তোমার যা ইচ্ছে তা করতে পার।‘



ইবনে যিয়াদ জল্লাদকে নির্দেশ দিল, হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহিকে গভর্নর ভবনের ছাদের উপর নিয়ে গিয়ে শহীদ করো এবং মাথা কেটে আমার কাছে নিয়ে আসো আর দেহকে রশি বেঁধে বাজারে হেঁচড়াও, যাতে হাড় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় এবং লোকেরা যেন এই দৃশ্য অবলোকন করে। জল্লাদকে হুকুম করার পর, ওরা যখন উনাকে ধরতে আসল, তখন হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি দেখলেন যে, গভর্নর ভবনের চারিদিকে লোকে লোকারণ্য। তারা সব এসেছে তামাশা দেখার জন্য। কিন্তু আফসুস! এদের মধ্যে অনেকে এসেছে যারা হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেছিল, যারা চিঠি লিখে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামকে কূফায় আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল।



হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি ওদেরকে দেখে বললেন, ‘হে কূফাবাসী! তোমরা বেঈমানী করেছ; তা সত্ত্বেও এখন আমি তোমাদেরকে তিনটি কাজের দায়িত্ব দিচ্ছি। যদি পার, এই তিনটি কাজ তোমরা অবশ্যই করবে। প্রথম কাজ হচ্ছে, আমার কাছে যে হাতিয়ারগুলো আছে, এগুলো বিক্রি করে অমূক অমূককে দিও। কারণ, আমি ওদের কাছে ঋণী। দ্বিতীয় কাজ হচ্ছে, যখন আমার মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ইবনে জিয়াদের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হবে এবং আমার লাশ বাইরে নিক্ষেপ করবে, তোমরা আমার লাশটি উঠিয়ে কোন এক যথোপযুক্ত স্থানে দাফন করো। তৃতীয় কাজ হচ্ছে, যদি তোমাদের মধ্যে এক তিল পরিমাণও ঈমান থাকে এবং আহলে বাইত-এর প্রতি এক কণা পরিমাণও মুহব্বত থাকে, তাহলে যে কোন উপায়ে তোমরা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কাছে সংবাদ পৌঁছে দিও, যেন তিনি কূফায় তাশরীফ না আনেন। এসব কথা শুনে ইবনে যিয়াদ খুবই রাগান্বিত হলো এবং চারিদিকে ঘুরে সবাইকে হুমকি দিতে লাগলো, খবরদার! যারা হযরত মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর এই সব কথামত কাজ করবে, আমি তাদেরকে কতল করাবো এবং তাদের ছেলে-মেয়েদেরকে বর্শার অগ্রভাগে উঠাবো, যাতে কেউ হযরত মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর কথা অনুসরণ করতে না পারে। এবং সে হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহিকে লক্ষ্য করে বললো, আমি আপনার হাতিয়ারগুলো আমাদের মুজাহিদ বাহিনীর মধ্যে বণ্টন করবো এবং আপনার লাশকে দাফন করতে দিব না। বরং কূফার অলিতে-গলিতে ঘুরাবো এবং জনগণকে দেখাবো। যারা আপনার পক্ষ অবলম্বন করবে, নিশ্চয়ই তাদের সাথে এই রকম আচরণ করা হবে। আর হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামকে খবর দেয়া থেকে বাধা দেয়ার কারণ হলো, উনাকে এখানে আনা চাই এবং উনাকেও ইয়াযীদদ্রোহীতার স্বাদ উপভোগ করাতে চাই। নাঊযুবিল্লাহ।



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার ভবিষ্যত পরিণতির কথা চিন্তা করে তখন ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন এবং কূফাবাসীর বিশ্বাস-ঘাতকতার কথা উনাকে আরও বেঁদনাক্লিষ্ট করল। এমন সময় জল্লাদরা উনাকে ধরে ছাদের এক কিনারে নিয়ে গেল। তিনি তাদের কাছে দুই রাকায়াত নফল নামায পড়ার অবকাশ চেয়েছিলেন। কিন্তু তারা সেই সুযোগটাও দিল না। তিনি অশ্রু-সজল নয়নে মক্কা শরীফ-মদীনা শরীফ-এর দিকে তাকালেন এবং তাকিয়ে বললেন, ওগো আমার মাওলা হুসাইন! আমার এই অবস্থার খবর আপনাকে কে পৌঁছাবে? আমার সাথে কী যে নির্মম আচরণ করা হচ্ছে। হায়! আমি যদি আপনাকে চিঠি না লিখতাম এবং কূফার অবস্থা সন্তোষজনক না জানাতাম তাহলে আপনি এখানে কখনো আসতেন না। কূফাবাসীরা আজ আমার সাথে যেভাবে বিশ্বাস ঘাতকতা করলো, জানিনা, আপনার সাথে কি ধরণের আচরণ করবে? উনি এসব চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। আর এদিকে জল্লাদরা উনাকে ধরে ছাদে শুইয়ে শরীর মুবারক থেকে মস্তক মুবারক বিচ্ছিন্ন করে ফেললো।

_____

হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কূফা গমন



আল্লাহ তায়ালার কি যে মহিমা! যেদিন হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি কূফায় শহীদ হলেন, সেদিনই অর্থাৎ ৬০ হিজরী ৩রা যিলহজ্জ তারিখে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম প্রিয়জন ও আপনজনদের নিয়ে মক্কা শরীফ থেকে কূফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলেন। কারণ, উনার কাছে চিঠি পৌঁছেছিল যে, কূফার অবস্থা খুবই সন্তোষজনক, তিনি যেন বিনা দ্বিধায় অনতিবিলম্বে কূফায় তাশরীফ নেন। তিনি তাঁর আহলিয়া, বোন, ছেলে-মেয়ে এমনকি দুগ্ধপোষ্য শিশুদেরকেও সঙ্গে নিলেন এবং মক্কা শরীফ থেকে বের হলেন। উলামায়ে কিরাম লিখেছেন যে, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কাফেলায় মুখতালিফ বর্ণনা, কোন কোন বর্ণনায় ৭২ জন আর কোন কোন বর্ণনায় ৮২ জন ছিলেন। যার মধ্যে মহিলা, দুগ্ধপোষ্য শিশুও ছিলেন এবং উনার সঙ্গে কয়েকজন যুবক খাদিম-খুদ্দামও ছিলেন।



এখানে একটি কথা বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য যে, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম যুদ্ধ করার কিংবা মোকাবিলা করার উদ্দেশ্যে কখনও বের হননি। কেননা, তিনি যদি যুদ্ধ বা মোকাবিলা করার উদ্দেশ্যে বের হতেন তাহলে, তিনি কখনও মেয়েলোক ও দুগ্ধপোষ্য শিশুদের নিয়ে বের হতেন না। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার নিজের আহলিয়া ও দুগ্ধপোষ্য শিশুদের নিয়ে বের হওয়াটা এটাই প্রমাণ করে যে, তিনি যুদ্ধ কিংবা মোকাবিলার উদ্দেশ্যে বের হননি। তাঁর কাছে তো চিঠি এসেছে যে, সেখানকার অবস্থা খুবই সন্তোষজনক, চল্লিশ হাজার লোক বাইয়াত গ্রহণ করেছে, কূফাবাসীরা বেশ মেহমানদারী করছে। তাই তিনি তাঁর আপন-জনদেরকে নিয়ে বের হয়েছেন এবং যুদ্ধ করার কোন অস্ত্র-শস্ত্র রাখেননি। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম যখন মক্কা শরীফ থেকে কূফার উদ্দেশ্যে বের হলেন, পথে তিনি হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর শাহাদাত বরণের খবর পেলেন।



হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর শাহাদাতের খবর শুনে তিনি এবং তাঁর সফরসঙ্গীগণ একেবারে হতবাক হয়ে গেলেন। অর্থাৎ কোথা থেকে কি হয়ে গেল। মাত্র কয়েকদিন আগে হযরত ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর চিঠি আসলো, কূফার অবস্থা খুবই সন্তোষজনক। অথচ এখন শুনতে পাচ্ছি উনাকে শহীদ করা হয়েছে। এটা কি ধরণের ঘটনা! যা হোক, উনারা পিছপা হলেন না। সম্মুখপানে অগ্রসর হলেন। উনাদের সিদ্ধান্ত হলো, ওখানে গিয়ে দেখি অবস্থা কি এবং কিভাবে এত তাড়াতাড়ি এ ধরণের ঘটনা ঘটলো, তা অবহিত হওয়া। এ মনোভাব নিয়ে উনারা সামনে অগ্রসর হলেন।

_____

কারবালার প্রান্তরে হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু আলাইহিস সালাম



কূফা থেকে দুই মঞ্জিল দূরত্বে কারবালার প্রান্তরে ৬১ হিজরী ২রা মুর্হরম তারিখে পৌঁছলেন। যখন তাঁরা পৌঁছলেন, তখন হুর বিন ইয়াযীদ রিয়াহী এক হাজার সৈন্য নিয়ে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার সাথে মোলাকাত করলো এবং বললো- হে সম্মানিত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু! আমি আপনাকে গ্রেফতার করার জন্য এসেছি। তখন ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু জিজ্ঞাসা করলেন, কেন? সে বললো, ‘তা আমি জানি না, তবে কূফার গভর্নর ইবনে যিয়াদের নির্দেশ- আপনাকে যেখানে পাওয়া যাবে, গ্রেফতার করে তার কাছে যেন পৌঁছে দেয়া হয়। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম ফরমালেন, আমার কি অপরাধ? সে বললো, আপনি ইয়াযীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন, ইয়াযীদের বিরুদ্ধে এখানে জন অসন্তোষ সৃষ্টি করেছেন এবং জনগণকে বাইয়াত করিয়েছেন। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম বললেন, ‘আমি কোন জন অসন্তোষ সৃষ্টি করিনি এবং ক্ষমতা দখলেরও কোন ইচ্ছা আমার নেই। কূফাবাসীই আমার কাছে চিঠি লিখেছে, যার কারণে আমি এখানে আসতে বাধ্য হয়েছি। তবে যদি কূফাবাসী বেঈমানী করে এবং অবস্থার যদি পরিবর্তন হয়, তাহলে আমি ফিরে যেতে রাজি আছি। যখন হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম হুরের সঙ্গে আলোচনা করলেন এবং হুরকে সমস্ত বিষয় অবহিত করলেন, তখন সে খুবই দুঃখিত হলো। হুর বললো, এই মুহূর্তে যদি আমি আপনাকে চলে যেতে দেই, আমার সঙ্গী-সাথীদের মধ্যে কেউ হয়তো ইবনে যিয়াদের কাছে গিয়ে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারে এবং ইবনে যিয়াদ আমার উপর যুলুম করতে পারে। সে বলবে, ‘তুমি জেনে-শুনে দুশমনকে ছেড়ে দিয়েছ, আপোষে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছ।’ ফলে আমার উপর মুছীবতের পাহাড় নাযিল হবে। তাই আপনি একটা কাজ করতে পারেন- এভাবে আমার সঙ্গে সারাদিন কথাবার্তা চালিয়ে যেতে থাকেন, যখন রাত হবে, আমার সৈন্যরা শুয়ে পড়বে এবং অন্ধকার হয়ে যাবে, তখন আপনি আপনার আপনজনদের নিয়ে এখান থেকে চলে যাবেন। সকালে আপনাকে খোঁজ করব না, আপনার পিছু নেব না। সোজা ইবনে যিয়াদের কাছে গিয়ে বলব, উনি রাতের অন্ধকারে আমাদের অজান্তে চলে গেছেন এবং কোন দিকে গেছেন এরও কোন খোঁজ পাইনি। এরপর যা হওয়ার আছে, তাই হবে। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম বললেন, ঠিক আছে।



যখন রাত হলো, চারিদিকে অন্ধকার ঘণীভূত হলো এবং সৈন্যরা প্রায় ঘুমিয়ে পড়লো, তখন হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম নিজের সঙ্গী সাথীদেরকে রওয়ানা হওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন। সবাই বের হয়ে গেলেন। সারারাত এ কাফেলা পথ চলতে থাকল, কিন্তু খোদা তায়ালার রহস্য দেখুন, সারারাত হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কাফেলা চললো, কিন্তু ভোরে তারা তাদেরকে ঐ জায়গায়ই দেখতে পেলেন, যেখান থেকে রওয়ানা শুরু করেছিলেন। এই অবস্থা দেখে সবাই আশ্চর্য হয়ে গেল, এটা কিভাবে হলো। আমরা সারারাত পথ চললাম, কিন্তু সকালে আবার একই জায়গায়। এ কেমন কথা! হুর তাঁদেরকে দেখে জিজ্ঞাসা করলো, আপনারা কি যাননি? ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, আমরা সত্যিই চলে গিয়েছিলাম, কিন্তু যাওয়ার পরওতো যেতে পারলাম না, দিশেহারা হয়ে আবার একই জায়গায় ফিরে আসলাম। হুর বললো, ঠিক আছে, চিন্তার কিছু নেই। আজ আমরা পুনরায় দিনভর আলোচনা করতে থাকব এবং আমার সৈন্যদেরকে বলব, আমাদের মধ্যে এখনও কোন ফায়সালা হয়নি, আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। আজ রাতেই আপনি চলে যাবেন। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম দ্বিতীয় রাত্রিতেও সঙ্গীদেরকে নিয়ে বের হলেন। সারারাত উনি ও উনার সফরসঙ্গীগণ পথ চললেন। ভোর যখন হলো, তখন পুনরায় উনারা উনাদেরকে সেই একই জায়গায় পেলেন, যেখান থেকে উনারা বের হয়েছিলেন। উপর্যুপরি তিন রাত এ রকম হলো। সারারাত উনারা পথ চলতেন, কিন্তু ভোর হতেই উনাদেরকে ঐ জায়গায় পেতেন, যেখান থেকে উনারা বের হতেন।



চতুর্থ দিন জনৈক পথিক উনাদের পার্শ্ব দিয়ে যাচ্ছিল, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম ওকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে ব্যক্তি যেই জায়গায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি, এই জায়গাটার নাম কি? লোকটি বললো, হযরত! এই জায়গাটার নাম ‘কারবালা’। কারবালা শব্দটি বলার সাথে সাথেই হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম বিস্মিত হলেন এবং বললেন, ‘আমার নানাজান ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঠিকই বলেছেন, ‘হুসাইন আলাইহিস সালাম কারবালার ময়দানে শহীদ হবেন।’ এটাতো আমার শাহাদাতের স্থান। আমি এখান থেকে কিভাবে চলে যেতে পারি? পরপর তিন রাত্রি প্রস্থান করার পর পুনরায় একই জায়গায় প্রত্যাবর্তন এ কথাই প্রমাণ করে যে, এটা আমার শাহাদাতের স্থান। এখান থেকে আমি কিছুতেই বের হতে পারব না।



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম তাঁর প্রিয়জনদের বললেন, ‘সওয়ারী থেকে অবতরণ করে তাবু খাটিয়ে নিন। নির্দেশ মত উনার সঙ্গী সাথীরা সওয়ারী থেকে অবতরণ করে তাবু খাটাতে শুরু করলেন। কিন্তু যেখানেই তাবুর খুঁটি পুঁততে গেলেন, সেখান থেকেই টাটকা রক্ত বের হতে লাগলো। এই দৃশ্য দেখে সবাই হতভম্ব হয়ে গেলেন। হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম যখন দেখলেন যে, মাটিতে যেখানেই খুঁটি পুঁততে যান, সেখান থেকে রক্ত বের হচ্ছে, তখন তিনি হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামকে বললেন, প্রিয় ভাইজান! চলুন, আমরা এখান থেকে সরে যাই। এই রক্তাক্ত ভূমি দেখে আমার খুব ভয় করছে, আমার খুবই খারাপ লাগছে। এই রক্তাক্ত ভূমিতে অবস্থান করবেন না। চলুন, আমরা এখান থেকে অন্যত্র চলে যাই। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম বললেন, ওগো আমার প্রাণ-প্রিয় বোন! এখান থেকে আমি বের হতে পারব না। এটা আমার ‘শাহাদাত গাহ’ অর্থাৎ শাহাদাতের স্থান। এখানেই আমাকে শাহাদাত বরণ করতে হবে। এখানেই আমাদের রক্তের নদী প্রবাহিত হবে। এটা সেই ভূমি, যেটা আহলে মুস্তাফা ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার রক্তে রঞ্জিত হবে। এটাই সেই জায়গা, যেখানে ফাতিমাতুয যাহরা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-এর বাগানের বেহেশ্্তী ফুল টুকরো টুকরো হয়ে পতিত হবে এবং তাঁদের রক্তে এই ভূমি লালে লাল হয়ে যাবে। তাই সবাই অবতরণ করো, ছবর, ধৈর্য এবং সাহসের সাথে তাবুতে অবস্থান করো। আমরা এখান থেকে কখনও যেতে পারব না। এখানেই আমাদেরকে ধৈর্য ও সাহসিকতার পরিচয় দিতে হবে। এবং এখানেই শাহাদাত বরণ করতে হবে।’ অতঃপর তাবু খাটিয়ে উনারা কারবালায় অবস্থান নিলেন।



তাঁরা অবস্থান নেয়ার পর থেকে ইবনে যিয়াদ ও ইয়াযীদের পক্ষ থেকে সৈন্যবাহিনী একদলের পর একদল আসতে লাগল। যেই দলই আসে, সবাই ইয়াযীদের পক্ষ থেকে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কাছে এ নির্দেশটাই নিয়ে আসল- ‘হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামকে গিয়ে বলো, তিনি যেন ইয়াযীদের কাছে বাইয়াত গ্রহণ করেন। যদি তিনি বাইয়াত গ্রহণ করতে রাজী হন, তখন উনাকে কিছু বলোনা, উনাকে ধরে আমার কাছে নিয়ে এসো। আর যদি বাইয়াত গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন, তখন তাঁর সাথে যুদ্ধ করো এবং তাঁর মস্তক কর্তন করে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও।’ এভাবে সৈন্য বাহিনীর যেই দলটিই আসতে লাগল, তারা একই হুকুম নিয়ে আসল। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম বললেন, ‘এটাতো হতেই পারে না যে, আমি ইয়াযীদের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করব!



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাকে আহ্বান করা হয়েছে আমার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করার জন্য। আর এখন আমাকে বাধ্য করা হচ্ছে ইয়াযীদের হাতে বাইয়াত হওয়ার জন্য! এই জন্যইতো আমি মদীনা শরীফ ছেড়ে মক্কা শরীফ-এ চলে গিয়েছিলাম। তাহলে কি আমি এখন মক্কা শরীফ থেকে এখানে এসেছি ইয়াযীদের হাতে বাইয়াত হওয়ার জন্য? এটা কিছুতেই হতে পারে না। আমি ইয়াযীদের হাতে কখনো বাইয়াত গ্রহণ করব না।’ ওরা বলল, আপনি যদি ইয়াযীদের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করতে রাজী না হন, তাহলে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হোন। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম বললেন, ‘আমিতো যুদ্ধের জন্যও আসিনি। যুদ্ধের কোন ইচ্ছাও পোষণ করি না।’ ওরা বলল, এরকমতো কিছুতেই হতে পারে না। হয়তো বাইয়াত গ্রহণ করতে হবে নতুবা যুদ্ধ করতে হবে।



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম যখন দেখলেন, এদের উদ্দেশ্য খুবই খারাপ তখন তিনি তাদের সামনে তিনটি শর্ত পেশ করলেন। তিনি বললেন, ‘শোন! কূফাবাসী আমার কাছে চিঠি লিখেছে এবং চিঠিতে এমন কথা লিখা ছিল, যার জন্য শরীয়ত মতে আমি এখানে আসতে বাধ্য হয়েছি। এখন যখন তারা বেঈমান হয়ে গেছে, আমি তোমাদের সামনে তিনটা শর্ত পেশ করছি; তোমাদের যেটা ইচ্ছা সেটা গ্রহণ করো এবং সে অনুসারে কার্য সম্পাদন করো- ১। হয়তো আমাকে মক্কা শরীফ-এ চলে যেতে দাও। সেখানে হেরেম শরীফ-এ অবস্থান করে ইবাদত-বন্দেগীতে নিয়োজিত থেকে বাকী জীবনটা অতিবাহিত করব ২। যদি মক্কা শরীফ-এ যেতে না দাও, তাহলে অন্য কোন দেশে যাওয়ার সুযোগ দাও, যেখানে কাফির বা মুশরিকরা বসবাস করে। ওখানে আমি দ্বীনী তা’লীম-তালক্বীনের কাজে নিয়োজিত থাকবো এবং ওদেরকে মুসলমান বানানোর প্রচেষ্টা চালাতে থাকবো ৩। যদি অন্য কোন দেশেও যেতে না দাও তাহলে এমন করতে পার যে, আমাকে ইয়াযীদের কাছে নিয়ে চলো। আমি তার সাথে বসে আলোচনা করব। হয়তঃ কোন সন্ধিও হয়ে যেতে পারে, এই নাজুক অবস্থার উন্নতিও হতে পারে এবং রক্তপাতের সম্ভাবনাও দূরীভূত হতে পারে।



ইয়াযীদ বাহিনী এ তিনটি শর্ত কূফার গভর্নর ইবনে যিয়াদের কাছে পাঠিয়ে দিল। সে এ শর্তগুলোর কথা শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল এবং আমর বিন ইবনে সা’আদ’ যে সেনাপতি ছিল তাকে লিখল যে, আমি



তোমাকে সালিশকার বা বিচারক বানিয়ে পাঠাইনি যে, তুমি আমার এবং হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার মধ্যে সন্ধি করার ব্যবস্থা করবে; আমি তোমাকে পাঠিয়েছি হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামকে বাইয়াত গ্রহণ করতে বলার জন্য অথবা উনার সাথে যুদ্ধ করে তাঁর মস্তক আমার কাছে পাঠিয়ে দেয়ার জন্য। অথচ তুমি সন্ধির চিন্তা-ভাবনা করছো এবং এর জন্য বিভিন্ন তদবীর করছো। আমি আবার তোমাকে শেষবারের মতো নির্দেশ দিচ্ছি, ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যদি বাইয়াত গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন, তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করো এবং মস্তক কেটে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও। যখন হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামকে এই নির্দেশের কথা শুনানো হলো, তখন তিনি বললেন, ‘আমার পক্ষ থেকে যা প্রমাণ করার ছিল, তা প্রমাণিত হয়েছে এবং যা বলার ছিল তা বলা হয়েছে। এখন তোমাদের যা মর্জি তা করো। আমি ইয়াযীদের হাতে কিছুতেই বাইয়াত গ্রহণ করব না।’ ওরা বলল, তাহলে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হোন। তিনি বললেন, ‘তোমাদের পক্ষ থেকে যা করার তোমরা কর। আমার পক্ষ থেকে যা করার আমি করব।"

_____

ইমাম পরিবারকে অবরোধ ও ফোরাত নদীর পানি পান করতে বাধা



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম যখন ইয়াযীদ বাহিনীকে সরাসরি জানিয়ে দিলেন যে, তোমাদের পক্ষ থেকে যে ব্যবস্থাই তোমরা নেও না কেন আমি কিছুতেই ইয়াযীদের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করবো না। তখন ইয়াযীদ বাহিনীর মনোভাব এত জঘন্য রূপ ধারণ করল যে, তারা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম ও উনার প্রিয়জনদের জন্য ফোরাত নদীর পানি বন্ধ করে দিল। সেদিন ছিল ৭ই মুর্হরম ৬১ হিজরী। ইয়াযীদ বাহিনী প্রায় চার হাজার সৈন্য ফোরাত নদীর তীরে নিয়োজিত করলো। এদের মধ্যে দুই হাজার ছিল ‘স্থল বাহিনী’ আর দুই হাজার ছিল ‘অশ্বারোহী’। তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল উনাদেরকে যেন এক ফোঁটা পানিও নিতে দেয়া না হয়। সে নির্দেশ অনুযায়ী উনাদের জন্য তারা পানি বন্ধ করে দিল। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার বিরাশিজন সঙ্গী সাথীর মধ্যে দুগ্ধপোষ্য শিশু ছিলেন এবং পর্দানশীন মহিলারাও ছিলেন। তিনি শুনে আরও আশ্চর্য হয়ে গেলেন যে, উনাদের মোকাবিলা করার জন্য বাইশ হাজার সৈন্য এসেছে। কী আশ্চর্য! বিরাশিজনের মোকাবিলায় বাইশ হাজার সৈন্য! আবার এই বিরাশিজনের মধ্যে শিশু ও মহিলারা রয়েছেন। অথচ উনাদের মোকাবিলায় যে বাইশ হাজার সৈন্য তারা সবাই যুবক এবং তারা সকল প্রকারের অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে এসেছে। এরপরও তারা পানি বন্ধ করে দিল। কারণ, তাদের ধারণা হল যে, উনারা যদি পানি পান করে যুদ্ধ করেন, তাহলে সম্ভবতঃ আমরা বাইশ হাজার হয়েও কামিয়াব হতে পারবো না। তাই পানি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এটা জুলুমের উপর জুলুম ছিল।



আফসুস! ঐসব যালিমদের জন্য, যারা এমন এক মহান ব্যক্তি এবং উনার পরিবার-প্রিয়জনদের জন্যে পানি বন্ধ করে দিল, যিনি হচ্ছেন সাকিয়ে কাওছার, শাফিয়ে মাহ্শার হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আদরের দৌহিত্র হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম।



ঐ কুখ্যাত ইয়াযীদ বাহিনীর প্রধান নির্দেশ দিয়েছিল যে, "মানুষ, জীব-জন্তু, বিধর্মী, গরু-ছাগল, পশু-পাখি সবাই এই ফোরাত নদীর পানি পান করবে, তোমরা বাধা দিও না। কিন্তু হযরত ফাতিমাতুয্ যাহরা আলাইহাস সালাম-এর এই ছেলে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামকে পানি পান করতে দিও না।" যেই ফোরাত নদীর পানি সবারই পান করার অনুমতি ছিল, জীব-জন্তু, পশু-পাখি কারো জন্য বাধা ছিল না। কিন্তু সেই ‘ফোরাত নদীর’ পানি পান করা থেকে বাধা দিল সাকিয়ে কাওছার, শাফিয়ে মাহ্শার হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামকে।

____

হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম আনহু উনার আহবান



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম যখন দেখলেন যে, পানিও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, তখন তিনি ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে ইয়াযীদের সৈন্য বাহিনীর নিকট গেলেন এবং তাদের সামনে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখলেন। তিনি তাদেরকে একান্ত যুক্তির মাধ্যমে বুঝালেন, ‘জুলুম-অত্যাচার থেকে বিরত থাকো, রক্ত দ্বারা তোমাদের হাতকে রঞ্জিত করো না। জেনে শুনে কোন মু’মিনকে কতল বা শহীদ করা মানে জাহান্নামকে নিজের ঠিকানায় পরিণত করা। আমি হলাম তোমাদের রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দৌহিত্র। যে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারই তোমরা কলেমা পড়ো। আর বর্তমানে আমি ছাড়া তোমাদের রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অন্য কোন দৌহিত্র নেই। আর আমার সম্পর্কে তোমরা ভালভাবে জানো, আমি ঐ হুসাইন, যার সম্পর্কে রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন- "হযরত ইমাম হাসান ও হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামমা বেহেশ্তের যুবকদের সাইয়্যিদ।" আমি সেই হুসাইন, যখন নিজ মায়ের কোলে ক্রন্দন করতাম, তখন আল্লাহ তায়ালা’র প্রিয় রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন, "ওগো মা ফাতিমা! ওকে কাঁদায়োনা। কারণ ও কাঁদলে আমার খুবই কষ্ট হয়।" দেখ, যখন আপন মায়ের কোলে আমার কান্নাটা নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্য কষ্টদায়ক ছিল, এখন তোমরা যদি আমাকে ভিন দেশে কষ্ট দাও এবং আমার রক্ত দ্বারা তোমাদের হাতকে রঞ্জিত করো, আমার ছেলে মেয়েদেরকে শোকাভিভূত করো, তাহলে চিন্তা করে দেখ, নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কী কষ্ট পাবেন! আর যে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে কষ্ট দিবে, এর পরিণাম সম্পর্কে তোমরা পবিত্র কুরআন শরীফ-এই পড়েছো-



ان الذين يؤذون الله ورسوله لعنهم الله فى الدنيا والاخرة واعد لهم عذابا مهينا



অর্থ: ‘নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ পাক ও তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে কষ্ট দেয়, তাদের প্রতি দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহ পাক উনার লা’নত এবং আল্লাহ পাক তাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছেন।’ (সূরা আহযাব-৫৭)



যখন তিনি নিজের এ বক্তব্য অকাট্য যুক্তির মাধ্যমে বুঝালেন যে, জুলুম-অত্যাচার থেকে বিরত থাকো এবং আমার রক্ত দ্বারা তোমাদের হাত রঞ্জিত করো না। আমি তোমাদের কোন ক্ষতি করিনি, তোমাদের সন্তানাদি হত্যা করিনি, তোমাদের প্রতি কোন অত্যাচার করিনি। আমিতো কূফাবাসীর আহবানে এসেছি। তারা যখন বিশ্বাসঘাতকতা করলো তখন আমাকে চলে যেতে দাও। কিন্তু তাদের মনে অসৎ মনোভাব প্রাধান্য বিস্তার করেছিল, তাদের কপালে জাহান্নাম অবধারিত ছিল। তাই হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার আহবান তাদের মনে কোন রেখাপাত করলো না। বরং তারা হৈ-চৈ শুরু করে দিল এবং বলতে লাগলো, আমরা আপনার বক্তৃতা শুনতে আসিনি। হয় ইয়াযীদের বাইয়াত গ্রহণ করুন অথবা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হোন। তিনি বললেন, আমি আমার পক্ষে যা প্রমাণ করার ছিল তা প্রমাণ করলাম। যেন কাল কিয়ামতের মাঠে তোমাদের এ কথাটুকু বলার সুযোগ না থাকে, হে আল্লাহ পাক! আমাদের জানা ছিল না, আমাদেরকে কেউ বুঝায়নি, তখন আর তোমরা আল্লাহ তায়ালা’র দরবারে এ ধরনের কোন আপত্তি পেশ করতে পারবে না। এখন সেটা প্রমাণিত হয়ে গেছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ ফরমান-



وما كنا معذبين حتى نبعث رسولا



অর্থ: ‘কোন রসূল অর্থাৎ হিদায়েতকারী না পাঠানো পর্যন্ত আমি কাউকে শাস্তি দান করবো না।’ (সূরা বণী ইসরাইল-১৫)



অতএব, যা প্রমাণ করার ছিল তা প্রমাণিত হয়ে গেছে। এখন তোমাদের যা ইচ্ছা তা করো।



মুহররমের নয় তারিখ ইয়াযীদ বাহিনীর মধ্যে আনন্দ-উল্লাস শুরু হয়ে গেল। এটা পূর্ণ যুদ্ধ ঘোষণার পূর্বাভাস ছিল। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম তাঁর এক সঙ্গীকে ওদের কাছে পাঠালেন এবং বললেন, ওদেরকে গিয়ে বলুন, আমাদেরকে যেন একরাত্রি সময় দেয়। ইয়াযীদ বাহিনী এই কথাটি গ্রহণ করলো এবং এক রাত্রির সুযোগ দিলো।

____

কারবালার ঐতিহাসিক ১০ই মুহররম



হিজরী ৬১ সন, মুর্হ্রম মাসের ৯ তারিখ দিবাগত রাত অর্থাৎ দশ তারিখ রাত্রি বেলা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার সফর সঙ্গীদের সবাইকে একত্রিত করলেন এবং বললেন, আমার প্রিয় সাথীরা! আমি তোমাদের সকলের প্রতি আন্তরিকভাবে সন্তুষ্ট। আমি তোমাদেরকে অনুমতি দিচ্ছি যে, আজ রাতে তোমরা যে যেদিকে পার চলে যাও। এইসব ইয়াযীদী বাহিনীর লোকেরা আমার রক্ত পিপাসু। এরা একমাত্র আমার রক্তেই পরিতৃপ্ত হবে। তোমরা চলে যাও, তোমাদের জান বেঁচে যাবে। কিন্তু উনার সাথীদের মধ্যে একজনও যেতে রাজী হলেন না। তাঁরা বললেন, এ নাজুক সময়ে আপনাকে শত্রুদের হাতে সোপর্দ করে আমরা কিভাবে চলে যেতে পারি! এ রকম পরিস্থিতিতে যদি আপনাকে ফেলে আমরা চলে যাই, কাল ক্বিয়ামতের মাঠে আমরা আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে কিভাবে মুখ দেখাব? না! কিছুতেই আমরা আপনাকে ফেলে চলে যেতে পারি না। আমরা আপনার সাথেই থাকবো এবং আমরা আমাদের জানকে পতঙ্গের মতো উৎসর্গ করবো।



যখন কেউই যেতে রাজি হলেন না, তখন হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম বললেন, তাহলে শুন! যদি তোমরা আমার সাথে থাকার জন্য দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হও, তাহলে তোমরা ধৈর্য এবং আত্ম-বিশ্বাসে শিশাঢালা প্রাচীরের মতো অটল হয়ে যাও। এমন দৃঢ় ও অটল হয়ে যাও, যেন জুলুম-অত্যাচারের বিভীষিকা তোমাদের পদস্খলন ঘটাতে না পারে। বাতিলের সাথে মোকাবিলা করার সময়টা হলো, আমাদের পরীক্ষার সময়। আল্লাহ তা’য়ালা উনার বান্দাদের থেকে পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। এখন আমাদের সামনে মুছীবতের পাহাড় অবস্থিত। সমস্ত দুঃখ-দূর্দশা আমাদেরকে ধৈর্য সহকারে অতিক্রম করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা’র রাস্তায় অটল থাকতে হবে এবং এভাবে অটল থেকে শাহাদাতের শরবত পান করতে হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উদাহরণ রেখে যেতে হবে। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার এ কথা উনার সাথীদের মধ্যে যথেষ্ট ধৈর্য ক্ষমতা সৃষ্টি করে দিলো। উনার সকল সাথী উনার জন্য জান কুরবান করতে প্রস্তুত হয়ে গেলেন এবং সকলেই শাহাদাত বরণের জন্য অনুপ্রাণিত হয়ে গেলেন এবং ধৈর্য ও ত্যাগ স্বীকারের জন্য দৃঢ় পাহাড় বনে গেলেন। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম বললেন, তোমরা কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম করো। সকাল বেলা আল্লাহ পাক উনার হুকুম যা হওয়ার তাই হবে।



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার সাথীরা সবাই নিজ নিজ তাঁবুতে চলে গেলেন এবং তিনি নিজের তাঁবুতে কুরআন শরীফ তিলাওয়াত শুরু করলেন। কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করতে করতে তন্দ্রাভাব আসায় তিনি কিছুক্ষণের জন্য শুয়ে পড়লেন। তখন স্বপ্নে দেখলেন, তাঁর নানাজান ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাশরীফ এনেছেন এবং উনাকে কোলে নিয়ে নিলেন এবং তাঁর বুকে হাত মুবারক রেখে বললেন- اللهم ات الحسين صبرا واجرا ‘আল্লাহুম্মা আতিল হুসাইনা ছব্্রাওঁ ওয়া আজ্রা’ অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ পাক! হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে ধৈর্য ও পূণ্য দান করুন’ এবং হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে আরও বললেন, ‘তোমার উপর যা হচ্ছে, তা থেকে আমি বেখবর নই। আমি সবকিছু দেখছি। তোমার বিরুদ্ধে যারা তলোয়ার, তীর ইত্যাদি নিয়ে এসেছে, তারা সকলেই আমার শাফায়াত থেকে বঞ্চিত।’ নূরে মুজাস্সাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা বলে ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার অন্তরকে ধৈর্য এবং স্থিরতার খনি বানিয়ে দিলেন। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম ঘুম থেকে উঠে উনার বন্ধু-বান্ধব এবং পরিবার পরিজনকে স্বপ্নের কথা শুনালেন। ফজরের নামাযের পর তিনি আল্লাহ পাক উনার কাছে প্রার্থনা করছিলেন- ‘ইয়া আল্লাহ! আপনার রাস্তায় আমাকে অটল রাখুন, আমাকে ধৈর্য এবং সহনশীলতা দান করুন। হে মাওলা! জুলুম-অত্যাচারের ঝড় তুফান আমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে, আপনি আমাকে অটল থাকার তাওফীক দান করুন, যেন জুলুম-অত্যাচার আমাকে পদচ্যুত করতে না পারে।’ এভাবে তিনি মুনাজাত করছিলেন আর উনার সাথীরা আমীন, আমীন বলছিলেন।



মোটকথা, একদিকে পিপাসাকাতর আল্লাহ তায়ালা’র নেক বান্দাগণ ধৈর্য এবং সহনশীলতার জন্য আল্লাহ পাক উনার কাছে প্রার্থনা করছেন, অন্যদিকে ইয়াযীদের সৈন্যদের মধ্যে যুদ্ধের মহড়া চলছে। দুর্যোগের কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে গেল, ইয়াযীদের সৈন্যরা লম্ফ-ঝম্ফ দিতে লাগল, তাদের মধ্যে কতেক জাহান্নামী কুলাঙ্গার ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার তাঁবুর আশে-পাশে চক্কর দিতে লাগল এবং গর্ব ও অহংকারভরে হুঙ্কার দিয়ে বলতে লাগল, এমন কোন বাহাদুর আছ? থাকলে আমাদের মোকাবিলায় আস। ইত্যবসরে যালিমদের মধ্যে কেউ হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার তাঁবুর দিকে তীর নিক্ষেপ করল এবং মোকাবিলার জন্য হুঙ্কার দিল।

____

হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার অনুসারীদের শাহাদাত



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার সাথীদের মধ্যে যারা শাহাদাত বরণ করার জন্য উদগ্রীব ছিলেন, তাঁরা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন এবং হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার অনুমতি প্রার্থনা করলেন। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম তাঁদেরকে অনুমতি দিলেন। অনুমতি পেয়ে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার সঙ্গীরা জিহাদের ময়দানে বীরত্ব প্রদর্শন করতে লাগলেন। তিন দিনের পিপাসাকাতর জানবাজ মর্দে মুজাহিদগণ ক্ষুধা এবং ধৈর্যের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করছিলেন। কিন্তু ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত হলে কি হবে, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার সাথীরা ছিলেন ঈমানী বলে বলীয়ান। তাঁর এক একজন সঙ্গী ইয়াযীদী বাহিনীর দশজনের থেকেও অধিক শক্তিশালী ছিলেন। প্রচ- জিহাদ শুরু হয়ে গেল এবং হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার সাথীরা অনেক ইয়াযীদী বাহিনীকে জাহান্নামে পাঠিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেরা এক এক করে শাহাদাত বরণ করেন। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম নিজের চোখের সামনে তাঁর পঞ্চাশজন সাথীর শাহাদাত বরণ দেখলেন। এত কিছু দেখার পরও তিনি সামান্য ধৈর্যচ্যুত হননি; বরং তিনি সঙ্গী-সাথীদের বুকে তীর নিক্ষেপ অবলোকন করছিলেন আর বলছিলেন- رضيت بقضائك ‘রদ্বীতু বিক্বদ্বায়িকা’ অর্থাৎ মাওলা! আমি আপনার ইচ্ছা এবং আপনার সিদ্ধান্তের উপর সন্তুষ্ট।



পঞ্চাশজন সাথী শহীদ হওয়ার পর হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার মুষ্ঠিমেয় আপনজন ছাড়া আর কেউই রইলো না।

____

হযরত হুর বিন ইয়াযীদ রিয়াহী আলাইহিস সালাম-এর শাহাদাত



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার আপন জনের মধ্যে ভাই ছিল, ভ্রাতুষ্পুত্র ছিল, ভাগিনা ছিল এবং ছেলে ছিল। তিনি কাউকে কিছু না বলে ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে ইয়াযীদের সৈন্যদের সামনে গেলেন এবং বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে আহলে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাহায্যকারী কেউ আছো কি? এ সঙ্কটময় মুহূর্তে আওলাদে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাহায্যকারী কেউ আছো কি? আহলে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাহায্য করে বেহেশ্্তে গমনের ইচ্ছুক কেউ আছো কি? উনার এ আহবানে ইয়াযীদী বাহিনীর হুর বিন ইয়াযীদ রিয়াহীর অন্তরে বিপ্লব শুরু হয়ে গেল। সে ঘোড়ার উপর অস্বস্তি বোধ করতে লাগলো। তার এই অবস্থা দেখে তার এক সঙ্গী জিজ্ঞাসা করলো- হুর! কি হল? তোমার এই অবস্থা কেন? তোমাকে বড়ই ব্যতিব্যস্ত দেখাচ্ছে? আমি তোমাকে অনেক বড় বড় যুদ্ধ ময়দানে দেখেছি। কিন্তু কোন সময় তোমাকে আমি এ রকম অস্বাভাবিক অবস্থায় দেখিনি। কিন্তু এখন তোমার এই অবস্থা কেন? হুর বলল, কি বলবো, আমি আমার একদিকে বেহেশ্্ত দেখছি আর এক দিকে দোযখ। মাঝখানে অস্বস্তিকর অবস্থায় রয়েছি এবং কি করব তা চিন্তা করছি। একদিক আমাকে দোযখের দিকে টানছে আর একদিক বেহেশ্তের দিকে আহবান করছে। এটা বলার পর পরই তিনি ঘোড়াকে চাবুক মেরে এক নিমিষে ইয়াযীদী বাহিনী থেকে এ বলে বের হয়ে আসলেন, ‘যেতে হলে বেহেশ্তেই যাব।’ ইয়াযীদী বাহিনী থেকে বের হয়ে হুর জোর গলায় বললেন, দেখ, জাহান্নাম থেকে আল্লাহওয়ালা বের হচ্ছে।



আসলে একজন বের হয়ে আসার দ্বারা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার বাহিনীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোন পরিবর্তন হল না। আর ইয়াযীদী বাহিনীরও হাজারের মধ্যে একজন চলে গেলে কিছু আসে যায় না। তবে আসল কথা হলো, হুর ছিল বেহেশ্তী কিন্তু অবস্থান করছিল দোযখীদের সাথে।



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার আধ্যাত্মিক দূরদৃষ্টি দ্বারা অবলোকন করলেন যে, জান্নাতী দোযখীদের মধ্যে অবস্থান করছে। তাই তিনি ডাক দিলেন, উনার মুবারক ডাকে সাড়া দিয়ে হুর ইয়াযীদী বাহিনী থেকে বের হয়ে সোজা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার সামনে আসলেন এবং বলতে লাগলেন, ওগো রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আওলাদ! আপনি যে ডাক দিয়েছেন, ‘এ নাজুক সময়ে আওলাদে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাহায্য করে বেহেশ্তে যাওয়ার মত কেউ আছে কিনা’ আমি সেই ডাকে সাড়া দিয়ে ইয়াযীদ বাহিনী থেকে বের হয়ে এসেছি। তাই আমি যদি আজ আপনার সাহায্যার্থে জান কুরবান করি, তাহলে সত্যিই কি আপনার নানাজান ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শাফায়াত নসীব হবে? উনি বললেন, ইনশাআল্লাহ হবে। হুর বললেন, আপনি আমার জন্য দুয়া করুন, আল্লাহ তায়ালা যেন আমার বিগত দিনের পাপ মাফ করে দেন এবং আমার গড়িমসিকে ক্ষমা করে দেন। আমি আপনার পক্ষে জান কুরবান করার জন্য যাচ্ছি। এ বলে হুর কোমর থেকে তলোয়ার বের করে ইয়াযীদী বাহিনীর সামনে গেলেন। হুরকে দেখে ইয়াযীদী বাহিনীর সেনাপতি আমর বিন সা’দ সৈন্যদেরকে বললো, দেখ, হুর ছিল আমাদের বাহিনীর সেনাপ্রধান। সে এখন আমাদের শত্রুদের হাতে হাত মিলিয়েছে। সে আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তোমরা তাকে এমন শিক্ষা দাও, যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যে শিক্ষণীয় হয়ে থাকে। এরপর ইয়াযীদী বাহিনী চারিদিক থেকে আক্রমণ শুরু করলো। হযরত হুর রহমতুল্লাহি আলাইহিও এমন জোরে আক্রমণ শুরু করে দিলেন যে, ইয়াযীদী বাহিনীর জন্য যেন খোদার গযব নাযিল হলো। শেষ পর্যন্ত তিনি ক্ষত-বিক্ষত হয়ে শাহাদাত বরণ করেন।

____

চাচাতো ভাই এবং সৎভাই-এর শাহাদাত



হযরত হুর রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর শাহাদাতের পর হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার সামনে হযরত আকিল রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর বংশধর হযরত মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ভাই হযরত আব্দুল্লাহ বিন আকিল রহমতুল্লাহি আলাইহি দাঁড়িয়েছিলেন এবং অনুমতি প্রার্থনা করছিলেন। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনাকেও বুক মুবারকে জড়িয়ে ধরলেন এবং কপালে চুম্বন করে অনুমতি দিলেন। তিনিও যুদ্ধের ময়দানে গিয়ে নিজের বীরত্ব প্রদর্শন করে ইয়াযীদী বাহিনীর অনেককে হত্যা করে পরিশেষে শাহাদাত বরণ করলেন।



এবার হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার ভাই হযরত আবু বকর রহমতুল্লাহি আলাইহি অনুমতি নিয়ে যুদ্ধের ময়দানের দিকে অগ্রসর হলেন। শেরে খোদা হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াহাহু রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার আওলাদ যুদ্ধক্ষেত্রে প্রমাণ করলেন, উনাদের বাহুতে শেরে খোদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার শক্তি রয়েছে।



জিহাদের ময়দানে উনারা যে বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন, তা কারবালার মাটিতে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। উনিও অনেক ইয়াযীদী সৈন্যকে খতম করে শেষ পর্যন্ত নিজে শাহাদাত বরণ করেন।

____

হযরত আব্দুল্লাহ বিন হাসান রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর শাহাদাত



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার সামনে তাঁর আপন ভাতিজা, হযরত ইমাম হাসান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার নয়নের মণি এবং হযরত ফাতিমাতুয্ যাহ্রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা ও হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজহাহু রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার দৌহিত্র উপস্থিত হলেন। তিনি জিহাদে গমনের জন্য অনুমতি প্রার্থনা করলেন। তিনি যখন অনুমতি প্রার্থনা করলেন তখন হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার ভাতিজার প্রতি অশ্রুসজল নয়নে তাকালেন এবং বললেন, ‘তোমরা আমার সাথে এসেছিলে, চাচার সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় উনার ভক্ত ও মুরীদানদের বাড়িতে যাবে এবং কিছুদিন আনন্দ-ইত্মিনানে দিন অতিবাহিত করবে। আর আমিও তোমাদেরকে তলোয়ার ও তীরের আঘাত খাওয়ার জন্য সঙ্গে আনিনি। শোন! ওরা আমার রক্তের পিপাসু, তোমাদের রক্তের জন্য লালায়িত নয়। সুতরাং, তোমাকে আমি অনুমতি দিতে পারিনা। তুমি আশ্রয় শিবিরে চলে যাও এবং তোমার মা-বোনদের সাথে মদীনা মুনাওওয়ারায় চলে যেও। কিন্তু ভাতিজা বার বার বলতে লাগলেন, চাচাজান! আমাকে আপনার হাতে বিদায় দিন এবং আপনার বর্তমানেই জিহাদের ময়দানে যাওয়ার অনুমতি দিন। আমিও জান্নাতুল ফিরদাউসে পৌঁছার জন্য অস্থির। চাচাজান! দীর্ঘ তিন দিনের পিপাসায় খুবই কষ্ট পেয়েছি। এখন মন চাচ্ছে যে, যত তাড়াতাড়ি পারি জান্নাতুল ফিরদাউসে পৌঁছে আপন পিতা ও দাদাজানের হাত মুবারকে কাওছারের পানি পান করে তৃষ্ণা নিবারণ করি। ভাতিজার জান-কুরবানীর জন্য এ রকম দৃঢ় সংকল্প বোধ দেখে উনাকে ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরলেন; এরপর অশ্রুসজল নয়নে অনুমতি দিলেন।



হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজ্হাহু রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার দৌহিত্র, হযরত ইমাম হাসান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার নয়নমণি হযরত আব্দুল্লাহ বিন হাসান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু কারবালার মাঠে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মত চমকাতে লাগলেন এবং ইয়াযীদী বাহিনীর সাথে মোকাবিলা করে অনেক ইয়াযীদী সৈন্যকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করে নিজে আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে শেষ পর্যন্ত শাহাদাত বরণ করেন।

____

হযরত ইমাম ক্বাসিম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর শাহাদাত



এবার হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার সামনে যিনি এসে উপস্থিত, উনি হলেন উনার প্রিয় ভাতিজা হযরত ক্বাসিম রহমতুল্লাহি আলাইহি। যাঁর সাথে উনার মেয়ে হযরত সখিনা আলাইহাস সালাম উনার বিবাহের আগাম ওয়াদা ছিল। হযরত ক্বাসিম রহমতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন ঊনিশ বছরের নওজোয়ান। যখন উনি উনার নওজোয়ান ভাতিজাকে সামনে দেখলেন, তখন তিনি কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, বাবা! আমি তোমাকে কিভাবে বিদায় দিতে পারি? তোমাকে কি আমি তীর-তলোয়ারের আঘাত খাওয়ার অনুমতি দিতে পারি? প্রিয় ভাতিজা! দেখ, আমার ভাইয়ের এটা একান্ত আশা ছিল যে, সখিনার বিবাহ যেন তোমার সাথে হয়। শোন ভাতিজা! তুমি মদীনা মুনাওওয়ারায় ফিরে গিয়ে আমার মেয়ে সখিনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আমার ভাইয়ের আশা পূর্ণ করো। কিন্তু হযরত ক্বাসিম রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, চাচাজান! আমার আব্বাজানের আরও একটি আশা ছিল, সেটা হলো, আমার আব্বাজান আমার গলায় একটা তাবিজ দিয়েছিলেন এবং ওসীয়ত করে গিয়েছেন যে, ‘বাবা! এ তাবিজটা তখনই খুলে দেখো, যখন কোন বড় মুছীবতের সম্মুখীন হও এবং সেই মুতাবিক আমল করো।’ তাই আমি এ মুহূর্তে তাবিজটা খুলে দেখলাম। কারণ এর থেকে বড় মুছীবত আর কী হতে পারে! তাবিজ খুলে যা লিখা দেখলাম তাহলো- ‘ওহে আমার প্রিয় বৎস ক্বাসিম! এমন এক সময় আসবে, যখন আমার ভাই কারবালার মাঠে শত্রু পরিবেষ্টিত হবে। শত্রুরা উনার জানের পিপাসু হবে, বৎস! তুমি যদি সত্যিকার আমার ছেলে হও, তখন নিজ জানের কোন পরওয়া করো না। বরং নিজের জান চাচা’র জন্য উৎসর্গ করে দিও। কারণ, সেই সময় আমার ভাই হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার জন্য যে জান কুরবানী দেবে, আল্লাহ তায়ালার দরবারে সে খুবই উচ্চ মর্যাদা লাভ করবে।’ তাই চাচাজান! আমাকেও আপনার হাতে বিদায় দিন। আমি আপনার পরে জীবিত থাকতে চাই না। আমাকে বিদায় দিন, আমি যাতে সহসা জান্নাতুল ফিরদাউসে পৌঁছে তৃষ্ণা নিবারণ করতে পারি এবং আব্বাজানকে গিয়ে বলতে পারি, আব্বাজান! আমি আপনার ওসীয়ত পূর্ণ করে এসেছি।’



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম শেষ পর্যন্ত উনাকেও বুকে জড়িয়ে ধরে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে বিদায় দিলেন। হযরত ইমাম ক্বাসিম রহমতুল্লাহি আলাইহি ইয়াযীদী বাহিনীর বড় বড় যোদ্ধাকে টুকরো-টুকরো করে ফেলতে লাগলেন। ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত হওয়া সত্ত্বেও তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে যে বীরত্ব দেখান, তা দেখে ইয়াযীদী বাহিনীর জাদরেল সৈন্যরাও হতভম্ব হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত তিনিও আঘাতের পর আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে ঘোড়া থেকে পড়ে যান এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে পৌঁছেন । এভাবেই হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার চারজন ভাতিজা শহীদ হন।

_____

ভাগিনাদ্বয়ের শাহাদাত



চার ভাতিজার শাহাদাতের পর হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার আপন বোন হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম উনার দুই অবুঝ সন্তান হযরত মুহম্মদ এবং হযরত আউন রহমতুল্লাহি আলাইহিমাকে নিয়ে উনার সামনে উপস্থিত হয়ে বললেন, ভাইজান! আপনার এ ভাগিনাদ্বয়ও আপনার জন্য জান কুরবান করতে প্রস্তুত। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম বললেন, বোন! এদেরকে তীরের আঘাত খাওয়ার জন্য সাথে আনা হয়নি। আমার সামনে তাঁদেরকে বর্শার অগ্রভাগে ঝুলানো হবে, তা আমার সহ্য হবে না। তুমি তাঁদেরকে নিয়ে যাও এবং আশ্রয় শিবিরে গিয়ে অবস্থান করো।’ বোন বললেন, ভাইজান! কখনো তা হতে পারে না, আমি চাই আমার সন্তানদ্বয় আপনার জন্য কুরবান হোক। আমি যেন জান্নাতুল ফিরদাউসে গিয়ে আমার আব্বাজানকে বলতে পারি, আমার দু’টি ছেলেকেও আপনার সন্তানের জন্য কুরবানী দিয়েছি। তাই আপনি এদেরকে বুকে জড়িয়ে ধরুন এবং বিদায় দিন।



বোনের বার বার আকুতি-মিনতির কারণে উনি তাঁদেরকেও যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠালেন। হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম উনার নয়নমণি ও জানের জান সন্তানদের প্রতি নিজের অগাধ মায়া-মমতাকে বিসর্জন দিয়ে সন্তানদ্বয়কে বিদায় দিলেন। এ কঁচি ছেলেদ্বয় বেশি দূর অগ্রসর হতে পারলেন না। ইয়াযীদী বাহিনীর যালিমেরা এসে তাঁদেরকে বর্শার অগ্রভাগে উঠিয়ে নিল।



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম এ দৃশ্য দেখে দৌঁড়ে গেলেন এবং ভাগিনাদ্বয়ের মুবারক লাশ কাঁধে নিয়ে আশ্রয় শিবিরের কাছে এনে রাখলেন এবং বোনকে সম্বোধন করে বললেন, ওহে বোন! তোমার আরজু পূরণ হলো। তোমার সন্তানদ্বয় জান্নাতুল ফিরদাউসে পৌঁছে তৃষ্ণা নিবারণ করছে। মা শহীদ ছেলেদ্বয়ের পাশে দাঁড়িয়ে নীরবে চোখের পানি ফেললেন এবং ছেলেদের মাথার চুলে আঙ্গুল বুলিয়ে বুলিয়ে বললেন, বাবারা! তোমাদের প্রতি তোমাদের মা খুবই সন্তুষ্ট। তোমরা তোমাদের মামার জন্য জান-কুরবান করেছ এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে পৌঁছে গেছ।

____

হযরত আব্বাস আলাইহিস সালাম-এর শাহাদাত



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম বোনের হাত ধরে জোর করে বোনকে নিয়ে তাঁবুতে প্রবেশ করলেন। সেখানে গিয়ে আর এক দৃশ্য দেখলেন, উনার ছয় মাসের দুগ্ধ পোষ্য সন্তান হযরত আলী আছগর আলাইহিস সালাম তৃষ্ণায় ছটফট করছেন এবং উনার জিহ্বা মুবারক বের হয়ে গেছে। ছেলের মা বললেন, বাচ্চার এই অবস্থা আমি আর সহ্য করতে পারছি না। মুখ দিয়ে তাঁর কোন আওয়াজ বের হচ্ছে না। যে কোন প্রকারে তাঁর জন্য একটু পানি সংগ্রহ করুন। হযরত আব্বাস আলাইহিস সালাম পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি এ কথা শুনে একেবারে ব্যাকুল হয়ে পড়লেন এবং বললেন, ভাইজান! আমাকে অনুমতি দিন, আমি এই মুহূর্তে গিয়ে ফোরাত নদী থেকে পানি নিয়ে এসে এ বাচ্চার তৃষ্ণা নিবারণ করি। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম বললেন, ভাই! একটু সবর করো, সে জান্নাতুল ফিরদাউসে গিয়ে তৃষ্ণা নিবারণ করবে। কিন্তু হযরত আব্বাস আলাইহিস সালাম বললেন, ভাই! বড় পরিতাপের বিষয়। আমাদের সামনে একটি মাছূম শিশু এভাবে তৃষ্ণা-কাতর হয়ে থাকবে, তা কখনো হতে পারে না। আমরা কী সেই শেরে খোদার আওলাদ নই, যিনি খায়বারের বৃহৎ দরজা হাতের উপর তুলে নিয়েছিলেন? আমি কোন বাধা মানতে রাজী নই, এ মুহূর্তে পানি নিয়ে এসে এ মাছূম বাচ্চার তৃষ্ণা মিটাবো।



অতঃপর মশক নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে তিনি ফোরাত নদীর দিকে ধাবিত হলেন এবং ফোরাত নদীর কাছে গিয়ে অতিদ্রুত ঘোড়া থেকে অবতরণ করে মশক ভরে পানি নিলেন এবং মুখ বন্ধ করে কাঁধের উপর উঠালেন এবং নিজ হাতে এক অঞ্জলি পানি মুখের কাছে নিলেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে তৃষ্ণার্ত ভাতিজার কথা মনে উদিত হলো। ভাতিজা যেন বললো, ‘চাচাজান! আপনার উচিত নয় যে, আমার আগে পানি পান করা। আপনি আলী আছগরের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য পানি নিতে এসেছেন, নিজের জন্য নয়। প্রথমে আপনার মাছূম ভাতিজার তৃষ্ণা নিবারণ করুন। এর পরেই আপনি পান করুন।’ শেষ পর্যন্ত হাতে নেয়া পানি তিনি ফেলে দিলেন এবং ঘোড়াকে নদীর কিনারা থেকে উঠালেন, তখন ইয়াযীদের যালিম বাহিনীরা উনাকে ঘিরে ফেলল। তিনি এ অবরোধ ভেদ করে অগ্রসর হলেন। ওরা পুনরায় অবরোধ করলো। তিনি সেটাও প্রতিহত করলেন। এভাবে অবরোধ প্রতিহত করে ইয়াযীদী বাহিনীর অনেককেই জাহান্নামে পাঠিয়ে তিনি অগ্রসর হচ্ছিলেন কিন্তু তিনি ছিলেন একা। আর ওরা ছিল চার হাজারেরও অধিক। ওরা পুনরায় চারিদিক থেকে ঘিরে বৃষ্টির মত তীর নিক্ষেপ করে তাঁর শরীর ঝাঁঝরা করে দেয়। এভাবে তীরের আঘাতে যখন তাঁর শরীর মুবারক থেকে অনেক রক্ত বের হয়ে গেল, কাপুরুষ ইয়াযীদ বাহিনীরা বুঝতে পারলো যে, তিনি অনেক কাবু হয়ে গেছেন। তাই নিকটবর্তী হয়ে পিছন দিক থেকে একজন তরবারী দিয়ে আঘাত করে তাঁর বাম হাত কেটে ফেলল। বাম হাত কেটে ফেলায় মশক পড়ে যাচ্ছিল। শেরে খোদার আওলাদ তখনও সাহস হারাননি। তিনি মশক ডান কাঁধে নিয়ে নিলেন। সেই যালিমরা ডান হাতটাও কেটে ফেলে। মশক তখন পড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু শেরে খোদার আওলাদ-এর হিম্মত দেখুন, তিনি দুই বাজু দিয়ে মশক আঁকড়িয়ে ধরলেন। এবার বাজুদ্বয়ও কেটে ফেলে কাফিররা। এখন কোন হাত নেই যে ঘোড়ার লাগাম ধরবেন, এমন কোন হাত নেই যে তলোয়ার চালনা করবেন, এমন কিছু নেই যে মশক আঁকড়িয়ে ধরবেন।



শেষ পর্যন্ত তিনি দাঁত দিয়ে মশকের মুখ কামড়িয়ে ধরলেন। যালিমরা তীর নিক্ষেপ করে মশক ফুটা করে দিল এবং পানি সব পড়ে গেল। এই অবস্থা দেখে তিনি দাঁতের কামড় থেকে মশক ছেড়ে দিয়ে বলতে লাগলেন, হে আলী আছগর! আলাইহিস সালাম এই অবস্থায় আমি কিভাবে তোমার তৃষ্ণা নিবারণ করি? আমিতো তোমার তৃষ্ণা নিবারণে কামিয়াব হতে পারলাম না। বাবা! এখন তোমার চাচার কেমন অবস্থা হয়েছে দেখ। তিনি ঘোড়ার উপর বসা অবস্থায় ছিলেন। ইয়াযীদী বাহিনীর সৈন্যরা তীরের আঘাতে উনাকে ঘোড়া থেকে মাটিতে ফেলে দিল এবং চারিদিক থেকে তলোয়ার দ্বারা আঘাত করতে লাগলো। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম দূর থেকে দেখলেন হযরত আব্বাস আলাইহিস সালাম ঘোড়া থেকে মাটিতে পড়ে গেছেন। তখন উনি গুমরিয়ে কেঁদে উঠলেন এবং বললেন, ‘আমার কোমর ভেঙ্গে গেল।’ উনি একেবারে বেকারার হয়ে পড়লেন। উনার সকল সঙ্গী শহীদ হয়ে গেলেন এবং উনার ডান হাত হযরত আব্বাস আলাইহিস সালাম আলাইহিও শহীদ হয়ে গেলেন। এমতাবস্থায় হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম একেবারে একা হয়ে গেলেন। উনি আত্মহারা হয়ে উনার শহীদ ভাইয়ের নিথর দেহের কাছে ছুটে গেলেন। হযরত আব্বাস আলাইহিস সালাম আলাইহি-এর দুই বাহু কাটা ছিল, শরীর ঠা-া হয়ে গিয়েছিল এবং সেই যালিমরা তাঁর মাথা কেটে নিয়ে গিয়েছিল। লাশের কাছে পৌঁছে তিনি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন এবং বলতে লাগলেন, ভাই! তুমিতো আমাকে ছেড়ে চলে গেলে, তোমার সাথে অনেক কথা বলার ছিল। কিন্তু কিছুই বলতে পারলাম না।’ অতঃপর ভাইয়ের রক্তে রঞ্জিত নিথর দেহ সেখানে রেখেই কাঁদতে কাঁদতে ফিরে এলেন।

_____

হযরত আলী আকবর আলাইহিস সালাম -এর শাহাদাত



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম হযরত আব্বাস আলাইহিস সালাম আলাইহি-এর শহীদী দেহ মুবারকের কাছ থেকে ফিরে এসে দেখলেন, উনার আঠারো বছরের ছেলে হযরত আলী আকবর আলাইহিস সালাম উনি জিহাদে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছেন এবং হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামকে বললেন, আব্বাজান! আমাকেও বিদায় দিন। আমি চাই না, আপনার পর জীবিত থাকতে। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম বললেন, বাবা শোন! তুমিতো আমার নানাজান মুস্তফা ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারই প্রতিচ্ছবি, হুবহু নক্্শা। তোমাকে যখন কেউ দেখে, দিলের তৃষ্ণা মিটে যায়। তোমাকে দেখলেই আমার নানাজান ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক আকৃতি মুবারক সামনে ভেসে ওঠে। তোমাকে যদি আজ বিদায় দিই, আমাদের ঘর থেকে আমার নানাজান ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতিচ্ছবি চলে যাবে। বাবা! তুমি যেয়ো না। ওরা আমারই রক্তের পিপাসু। আমার রক্তের দ্বারাই ওদের পিপাসা নিবারণ হবে। কিন্তু হযরত আলী আকবর আলাইহিস সালাম বললেন, আব্বাজান! আমিও ওখানে যেতে চাই যেখানে আমার ভাই ক্বাসিম গেছেন, যেখানে আমার চাচাজান গেছেন। আমি কাপুরুষের মত পিছনে পড়ে থাকতে চাই না। আমিও জান্নাতুল ফিরদাউসে গিয়ে তৃষ্ণা নিবারণের জন্য ব্যাকুল। আমাকেও আপনার হাতে বিদায় দিন। আমাকে যালিমদের হাতে সোপর্দ করে যাবেন না। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম বাধ্য হয়ে তাঁর আঠারো বছরের ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন এবং বিদায় দিলেন।



হযরত আলী আকবর আলাইহিস সালাম রওয়ানা হলেন। আল্লাহু আকবর! ইনি কে যাচ্ছেন? সরকারে দো-আলম, নূরে মুজাস্্সাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতিচ্ছবি হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার জানের জান যাচ্ছেন। হযরত ফাতিমাতুয্ যাহরা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-এর বাগানের ফুল যাচ্ছেন। ইনি হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বাগানের ফুলের কলি যাচ্ছেন। হযরত আলী আকবর আলাইহিস সালাম যেতে যেতে এটা পড়তে ছিলেন-



انا على بن الحسين بن على + نحن اهل البيت اولى بالنبى.



‘আনা আলিই-ইব্নুল হুসাইনিব্নু আলিইয়ি-নাহ্নু আহ্্লুল বাইতি আওলা বিন্নাবিইয়ি’ অর্থাৎ- ‘আমি আলী আকবর, হযরত হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার ছেলে, যে হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজ্হাহু রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার বংশধর। আমরাই হলাম আহলে বাইত, রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সবচেয়ে প্রিয় বংশধর।’ এ ‘শে’র’ পড়তে পড়তে ইমাম আলী আকবর আলাইহিস সালাম সামনে অগ্রসর হলেন এবং ইয়াযীদী বাহিনীর সামনে গিয়ে বললেন, আমার দিকে লক্ষ্য করো! আমি ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার সন্তান। আলী আকবর আমার নাম। হে নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ঘরকে উজাড়কারী! হযরত ফাতিমাতুয্ যাহ্রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-এর বাগানের ফুল ও কলিসমূহকে কারবালার উত্তপ্ত বালিতে ছিন্ন-ভিন্নকারীরা! আমার রক্ত দ্বারাও তোমাদের হাতকে রঞ্জিত করো, আমার প্রতিও তীর নিক্ষেপ করো।’ হযরত ইমাম আলী আকবর আলাইহিস সালাম বলছেন, যালিমদের সাহস নেই, এ নওজোয়ানের প্রতি তীর নিক্ষেপ করার বা তরবারী চালানোর। আমর বিন সাআদ নিজ সৈন্যদেরকে বলল, হে কাপুরুষের দল! তোমাদের কি হলো? সত্ত্বর একেও বর্শায় উঠিয়ে নাও।



আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, যে সকলের আগে এ নওজোয়ানকে কতল করতে পারবে, আমি তাকে ‘মোছিল’-এর রাজত্ব প্রদান করবো। এমন কোন ব্যক্তি আছে কি? যে মোছিলের শাসক হতে চায়? মোছিলের রাজত্ব পেতে চায়?



তারিক বিন শিশ্ নামক এক বদবখ্্ত পালোয়ান ছিল। ওর মনে আমরের কথায় প্রভাব সৃষ্টি করল এবং সে আগে বাড়ল, দেখি ভাগ্যে মোছিলের গভর্নরগিরি আছে কিনা। সে তীর হাতে নিয়ে হযরত ইমাম আলী আকবর আলাইহিস সালাম আলাইহিকে লক্ষ্য করে এগিয়ে গেল। হযরত আলী আকবর আলাইহিস সালাম দৃঢ় স্তম্ভের মত দাঁড়িয়ে রইলেন। যখনই সে কাছে আসলো, হযরত আলী আকবর রহতুল্লাহি আলাইহি ঘোড়াকে ফিরায়ে ওর পিছনে এসে গেলেন এবং এমন জোরে আঘাত হানলেন যে একপলকে ওর মাথাকে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলেন।



এই দৃশ্য দেখে ওর ছেলে উমর বিন তারিক রাগে প্রজ্জ্বলিত হয়ে তলোয়ার উচু করে এগিয়ে আসলো। যখন উভয়ের তলোয়ার একটার সাথে আর একটা আঘাতে ঝনঝনিয়ে উঠল, তখন যারা অবলোকন করেছে তারা দেখছিল, ওর লাশ মাটিতে পড়ে ছটফট করছে। দ্বিতীয় পুত্র তল্হা বিন তারেক সেও বাপ-ভাইয়ের খুনের বদলা নেয়ার জন্য অগ্নিশর্মা হয়ে হযরত আলী আকবর আলাইহিস সালাম উনার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। হযরত আলী আকবর আলাইহিস সালাম একেও জাহান্নামে পাঠিয়ে দিলেন। এ তিনজনকে হত্যা করার পর হযরত ইমাম আলী আকবর আলাইহিস সালাম ঘোড়া ফিরিয়ে তাঁর আব্বাজানের খিদমতে হাজির হলেন।



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম দেখলেন, তাঁর কলিজার টুকরা জিহাদের ময়দান থেকে আসছেন। তিনি এগিয়ে এলেন, এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, বাবা কি খবর! হযরত ইমাম আলী আকবর আলাইহিস সালাম ঘোড়া থেকে অবতরণ করে আব্বাজানের কাছে আরজি পেশ করলেন। আব্বাজান! তৃষ্ণা খুব কষ্ট দিচ্ছে। খুবই তৃষ্ণা অনুভব করছি। যদি এক গ্লাস পানি পাওয়া যায়, তাহলে এদের সবাইকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিতে পারবো ইনশাআল্লাহ। আব্বাজান! আমি ওদের তিন বদবখত্্ যোদ্ধাকে হত্যা করে এসেছি, কিন্তু আমার মুখ শুকিয়ে গেছে, আমার গলাও শুকিয়ে গেছে, আমার নিশ্বাসটাও সহজভাবে আসছে না। আমি খুবই কাহিল হয়ে গেছি।



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম বললেন, প্রিয় বৎস! ধৈর্য ধারণ কর। কিছুক্ষণের মধ্যেই তুমি জান্নাতুল ফিরদাউসে পৌঁছে যাবে এবং হাউজে কাওছারের পানি দ্বারা তোমার তৃষ্ণা মিটাবে। কিন্তু বাবা! তুমি যখন আমার কাছে এসেছ, এসো, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন এবং বললেন, মুখ খোল! হযরত আলী আকবর আলাইহিস সালাম মুখ খুললেন এবং হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার শুষ্ক জিহ্বা মুবারক ছেলের মুখের ভিতর প্রবেশ করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমার জিহ্বাটা চুষে নাও, হয়তো কিছুটা আরামবোধ করবে। হযরত আলী আকবর আলাইহিস সালাম উনার আব্বাজানের জিহ্বা চুষতে লাগলেন। জিহ্বা চুষে কিছুটা আরামবোধ করলেন।



এরপর হযরত ইমাম আলী আকবর আলাইহিস সালাম পুনরায় জিহাদের ময়দানের দিকে এগিয়ে গেলেন। হযরত ইমাম আলী আকবর আলাইহিস সালাম জিহাদের ময়দানে প্রমাণ করে দিয়েছেন, তিনি শেরে খোদার দৌহিত্র। তাঁর শিরা-উপশিরায় হযরত আলী র্ক্রাামাল্লাহু ওয়াজ্হাহু রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার রক্ত মুবারক রয়েছে এবং তাঁর চোখে হযরত আলী র্ক্রাামাল্লাহু ওয়াজ্্হাহু রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার শক্তি কাজ করছে। তিনি আশি জন ইয়াযীদী বাহিনীকে হত্যা করে নিজে আঘাতে জর্জরিত হয়ে ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে শাহাদাত বরণ করার আগ মুহূর্তে ডাক দিয়ে বললেন- يا ابتاه ادركنى ‘ইয়া আবাতাহ! আদ্রিক্নী’ অর্থাৎ ‘ওহে আব্বাজান! আমাকে ধরুন, আমাকে নিয়ে যান, আপনার আলী আকবর পড়ে যাচ্ছে।’ এ আহবান শুনে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম দৌঁড়ে যান। তিনি ছেলের কাছে পৌঁছার আগে যালিমরা হযরত আলী আকবর আলাইহিস সালাম উনার শরীর মুবারক থেকে মাথা মুবারক বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ছেলের শহীদী দেহের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি চোখের পানি ফেলছিলেন এবং অশ্রু সজল নয়নে ছেলের শহীদী দেহ কাঁধে উঠিয়ে তাঁবুর পার্শে¦ নিয়ে আসলেন। হযরত আলী আকবর আলাইহিস সালাম উনার এ শাহাদাতে প্রত্যেকেই দারুণভাবে আঘাত পেলেন। হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম তাঁবু থেকে বের হয়ে এসে হযরত ইমাম আলী আকবর আলাইহিস সালাম আলাইহি-এর শহীদী দেহ মুবারক দেখে চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘আহ! যালিমরা প্রিয় নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতিচ্ছবিকেও শেষ করে দিল।’

_____

হযরত আলী আছগর আলাইহিস সালাম আলাইহি-এর শাহাদাত



হযরত যয়নাব আলাইহাস সালাম ভাতিজা হযরত আলী আকবর আলাইহিস সালাম উনার লাশের পাশে দাঁড়িয়ে অঝোর নয়নে কাঁদছিলেন। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম বোনের হাত ধরে তাঁবুর অভ্যন্তরে নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘বোন! ছবর করো, আল্লাহ তায়ালা ছবরকারীদের সাথে আছেন। ছবর এবং ধৈর্যের আঁচল হাতছাড়া করো না। যা কিছু হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা’র পক্ষ থেকে হচ্ছে। আমাদের ছবর ও ধৈর্যের মাধ্যমে কামিয়াবী হাছিল করতে হবে। এটা আল্লাহ তায়ালা’র পক্ষ থেকে মহাপরীক্ষা।’



বোনকে নিয়ে যখন তাঁবুর অভ্যন্তরে গেলেন, তখন হযরত শহরবানু আলাইহাস সালাম হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার সামনে এসে বললেন, আপনার ছেলে আলী আছগর পানির তৃষ্ণায় কেমন যেন করছে, গিয়ে দেখুন। পানির তৃষ্ণায় তাঁর অবস্থা খুবই সঙ্গীন হয়ে গেছে। কোন রকম নড়াচড়া করতে পারছে না। কাঁদছেন কিন্তু চোখে পানি আসছে না। মুখ হা করে আছেন, কোন আওয়াজ বেরুচ্ছে না। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে গেছে। শুনুন, যালিমেরা হয়তো জানে না যে, আমাদের সাথে ছোট ছোট শিশুরাও রয়েছেন। আমার মনে হয়, এ ছোট শিশুকে কোলে করে আপনি ওদের সামনে নিয়ে গেলে নিশ্চয় ওদের দিলে রহম হতে পারে। কারণ এ রকম শিশু ওদের ঘরেও রয়েছে। তাই আপনি এ শিশুকে কোলে করে ওদের সামনে নিয়ে যান এবং বলুন, আমাকে পানি দিও না, তোমাদের হাতে কয়েক ফোঁটা পানি এ শিশুর মুখে দাও। তাহলে তারা নিশ্চয় দিবে। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম বললেন, ‘শহরবানু! তোমার যদি এটা আরজু এবং ইচ্ছা হয়ে থাকে, তাহলে তোমার এ ইচ্ছা পূর্ণ করতে আমি রাজি আছি। কিন্তু ঐ বদবখ্তদের প্রতি আমার আদৌ আস্থা নেই।’



যা হোক, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম ছয় মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশুকে কোলে নিয়ে ইয়াযীদ বাহিনীর সামনে গিয়ে বললেন, ‘দেখ! ইনি ছয় মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশু। ইনি আমার ছেলে আলী আছগর। ইনি তোমাদের সেই নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বংশধর, তোমরা যার কলিমা পাঠ করো। শোন! আমি তোমাদের কোন ক্ষতি করে থাকলে, আমার থেকে তোমরা এর বদলা নেবে। কিন্তু এ মাছূম শিশুতো তোমাদের কোন ক্ষতি করেননি। ইনি পানির তৃষ্ণায় ছটফট করছেন, কিন্তু সেটা দেখা যাচ্ছে না। শোন! আমার হাতে কোন পানির পেয়ালা দিও না, তোমাদের হাতে এ শিশুর মুখে কয়েক ফোঁটা পানি দাও। আর এ শিশু পানি পান করার পর তৃষ্ণা মিটে গেলে তলোয়ার হাতে নিয়ে তোমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন না। তাই উনার তৃষ্ণাটা নিবারণ করো। তাঁবুর পর্দানশীন মহিলাদের কাকুতি-মিনতিতে টিকতে না পেরে আমি একে নিয়ে এসেছি। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম এ করুণ বর্ণনা দিচ্ছিলেন, আর এদিকে আলী আছগর আলাইহিস সালাম আলাইহিকে লক্ষ্য করে ‘হরমিলা বিন্্ কাহিল’ নামক এক বদবখ্্ত যালিম তীর নিক্ষেপ করলো এবং সেই তীর এসে আলী আছগর আলাইহিস সালাম আলাইহি-এর গলায় বিধল। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম দেখলেন, শিশুটি একটু গা-নাড়া দিয়ে চিরদিনের জন্য নিশ্চুপ হয়ে গেলেন।



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠলেন, বলতে লাগলেন, ‘ওহে যালিমেরা! তোমরাতো তোমাদের নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতিও কোন সমীহ করলে না। তোমাদের মনতো কাফিরদের থেকেও কঠোর। শিশুদের প্রতি কাফিরেরাও সহানুভূতি দেখায়। তোমরাতো নিজেদেরকে মুসলমান বলে দাবি করো। এসব কথা বলে তিনি ছেলের গলা থেকে তীর বের করলেন এবং নিথর দেহ মুবারক মাটিতে রেখে বললেন, মাওলা! এ লোকেরা যা কিছু করছে, এর জন্য আমি আপনাকে সাক্ষ্য করছি। দেহ মুবারক কাঁধে করে তাঁবুর কাছে নিয়ে এসে হযরত আলী আকবর আলাইহিস সালাম উনার পাশে রেখে ডাক দিয়ে বললেন, ‘ওহে শহরবানু! ওহে যয়নাব! আলী আছগর আর ছটফট করবেন না এবং তৃষ্ণার কারণে হাত পা নড়াচড়া করবেন না। উনার তৃষ্ণার্ত অবস্থা থেকে তোমাদের অস্থিরতা আর বৃদ্ধি পাবে না। সে জান্নাতুল ফিরদাউসে গিয়ে উনার দাদীজান আলাইহাস সালাম উনার কোলে বসে হাউজে কাওছারের পানি পান করছেন।

_____

হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার জিহাদের ময়দানে গমন



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম তাঁবুর অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন। তখন তাঁর চৌদ্দ বছর বয়স্ক ছেলে হযরত ইমাম যাইনুল আবিদীন আলী আওসাত আলাইহিস সালাম, যিনি মারাত্মক রোগ ও জ্বরে ভুগছিলেন, হেলিয়ে দুলিয়ে কোন মতে আব্বাজানের সামনে এসে আরজ করলেন, আব্বাজান! আমাকেও বিদায় দিন, আমিও শাহাদাত বরণ করতে চাই। তিনি নিজের অসুস্থ ছেলেকে সান্ত¡না দিলেন এবং বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, যাইনুল আবিদীন! তোমাকেও যদি বিদায় দিই, তাহলে ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার ‘সিলসিলা’ কার থেকে জারি হবে? বাবা শোন! তোমার থেকেই আমার বংশের ‘সিলসিলা’ জারি হবে। আমি দুআ করছি, আল্লাহ পাক তোমাকে জীবিত রাখুন এবং তোমার থেকে আমার বংশধরের ‘সিলসিলা’ জারি রাখুন। তিনি উনাকে বাতিনী খিলাফত ও ইমামত প্রদান করলেন। উনাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে বাতিনী নিয়ামত প্রদান করলেন এবং কিছু ওছীয়ত করার পর ফরমালেন, প্রিয় বৎস! আমি চলে যাওয়ার পর মদীনা শরীফ-এ পৌঁছার যদি সৌভাগ্য হয়, তাহলে সবার আগে তোমার নানাজান ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার রওযা শরীফ-এ গিয়ে সর্বপ্রথম আমার সালাম বলবে এবং কারবালায় তোমার দেখা সমস্ত ঘটনা উনাকে শুনাবে।

_____

হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার বীর বিক্রম আক্রমণ



হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম ইয়াযীদী বাহিনীর সামনে গিয়ে বললেন, দেখ, আমি কে? আমি হলাম জান্নাতের যুবকদের সাইয়্যিদ। আমি ঐ হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, যাঁকে রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চুমু দিতেন এবং বলতেন, এটা আমার ফুল। আমি ঐ হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, যাঁর মা সাইয়্যিদাতু নিসায়ি আহলিল জান্নাহ হযরত ফাতিমাতুয্্ যাহরা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা। আমি ঐ হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, যাঁর পিতা হযরত আলী র্ক্রাামাল্লাহু ওয়াজ্্হাহু রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, যিনি খাইবর বিজয়ী। আমি ঐ হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, যখন আল্লাহ পাক উনার নবী হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিজদারত অবস্থায় থাকতেন, আমি উনার পিঠ মুবারকের উপর সওয়ার হয়ে যেতাম আর তখন উনি সিজদাকে দীর্ঘায়িত করতেন। ওহে নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ঘরকে উচ্ছেদকারীরা! ওহে হযরত ফাতিমাতুয্্ যাহরা আলাইহস সালাম উনার বাগানের ফুলকে ছিঁড়ে ছিন্ন-ভিন্ন করে কারবালার উত্তপ্ত বালিতে নিক্ষেপকারীরা! এসো, আমার রক্তের দ্বারাও তোমাদের হাতকে রঞ্জিত করো। আমার পিছনে আর কেউ নেই। একমাত্র আমিই রয়েছি। এগিয়ে এসো। তখন ওরা তলোয়ার খাপ থেকে বের করে তীর উত্তোলন করে এগিয়ে আসলো। কিন্তু হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম যখন খাপ থেকে তলোয়ার বের করে ওদের উপর আক্রমণ করলেন, তখন ওরা মেষের মত ছুটে পালাতে লাগলো। কিন্তু হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার তলোয়ার বিদ্যুৎ বেগে ওদের উপর চলতে শুরু করলো এবং ওদের শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে এমনভাবে পতিত হতে লাগলো যেমন শীতকালে বৃক্ষের পাতা ঝরে পড়ে। শেরে খোদার আওলাদ হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম লাশের স্তূপ করে ফেললেন। তিনি নিজে তীরের আঘাতে জর্জরিত এবং তিনদিনের তৃষ্ণায় কাতর হওয়া সত্ত্বেও তাঁর তলোয়ার ‘যুলফিকার’ তখনও সেই নৈপুণ্য দেখিয়ে যাচ্ছিল, যেভাবে বদরের যুদ্ধে দেখিয়েছিল। বদরের যুদ্ধে এ তলোয়ার যখন শেরে খোদা হযরত আলী র্ক্রাামাল্লাহু ওয়াজ্্হাহু রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হাতে ছিল এবং চালানো হচ্ছিল, তখন অদৃশ্য থেকে আওয়াজ আসছিল- ‘লা ফাতা ইল্লা আলী, লা সাইফা ইল্লা যুল্ফিকার’ অর্থাৎ ‘ হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার মত যেমন কোন জওয়ান নেই, তেমনি ‘যুলফিকার-এর মত কোন তলোয়ার নেই।’ বদর যুদ্ধের ন্যায় কারবালার ময়দানেও সেই তলোয়ার নৈপুণ্য দেখিয়ে যাচ্ছিল।



মোট কথা, হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম লাশের স্তুপ করে ফেললেন। ইয়াযীদী বাহিনীকে কেটে কেটে মাটি রঞ্জিত করে ফেললেন। একদিকে তিনি যেমন অনেক ইয়াযীদী সৈন্যকে কচুকাটা করে ছিলেন অন্যদিকে ওরাও উনাকে আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করে ফেললো।

_____

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.