নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সাহিত্য, সংস্কৃতি, কবিতা এবং সমসাময়িক সামাজিক বিষয়াদি নিয়ে গঠনমুলক লেখা লেখি ও মুক্ত আলোচনা

ডঃ এম এ আলী

সাধারণ পাঠক ও লেখক

ডঃ এম এ আলী › বিস্তারিত পোস্টঃ

বাংলাদেশের ২০২৬–২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট : প্রত্যাশা, বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ একটি বিশ্লেষণধর্মী পর্যালোচনা

১১ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৭:৪১


বাংলাদেশের ২০২৬–২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট শুধু একটি বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি নতুন সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন, উন্নয়ন কৌশল এবং আগামী কয়েক বছরের অর্থনৈতিক রূপরেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট হিসেবে এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এই বাজেট এমন এক সময়ে এসেছে যখন দেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। তাই এই বাজেটের সাফল্য কেবল কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপরই নির্ভর করবে।

বাজেটের প্রধান বৈশিষ্ট্য

২০২৬–২০২৭ অর্থবছরের বাজেটের মোট আকার ৯.৩৮ লক্ষ কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ বাজেট।সরকারের প্রধান লক্ষ্যসমূহ হলো:-
৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন, মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি,
বেসরকারি বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত করা, রপ্তানি সম্প্রসারণ। করব্যবস্থার সংস্কার, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ।

একই সঙ্গে সরকার "গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির পথে যাত্রা"কে বাজেটের মূল প্রতিপাদ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। কথা হলো বৃহৎ বাজেট কিন্তু অর্থ কোথা থেকে আসবে?

প্রায় ৯.৪ লক্ষ কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়নের জন্য বিপুল রাজস্ব প্রয়োজন।

সরকার প্রায় ৬.৯৫ লক্ষ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

এখানেই প্রথম বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশে বহু বছর ধরেই কর আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম হয়ে আসছে। কারণ করজালের সীমাবদ্ধতা , কর ফাঁকি , দুর্বল প্রশাসন , অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি এবং করদাতার সংখ্যা কম এই কম সংখার মাঝেও আবার রয়েছে ব্যপক আকারের ফাকিবাজি ।

যদি রাজস্ব সংগ্রহ প্রত্যাশামতো না হয়, তাহলে সরকারকে অধিক ঋণ নিতে হবে, যা ভবিষ্যতে সুদের বোঝা বাড়াবে।

আবার প্রশ্ন দেখা দেয় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত? সরকার ৬.৫% প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো শিল্পখাতে উৎপাদন এখনও পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ায়নি। ব্যাংক ঋণপ্রবাহ দুর্বল। বেসরকারি বিনিয়োগে আস্থা পুরোপুরি ফিরে আসেনি। আমদানি ব্যয় এখনও তুলনামূলক বেশি। বৈদেশিক বাজারেও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সুতরাং ৬.৫% প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হলেও এর জন্য দ্রুত বিনিয়োগ, নীতি সংস্কার ও প্রশাসনিক দক্ষতা অপরিহার্য।

ছবি সুত্র : দি ডেইলী স্টার

অপরদিকে দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে বড় পরীক্ষার সম্মুখীন । বর্তমান সময়ে সাধারণ মানুষের প্রধান উদ্বেগ হলো খাদ্যের উচ্চ দাম , বাসাভাড়া , চিকিৎসা ব্যয় ও শিক্ষা ব্যয় ।
সরকার মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু শুধুমাত্র বাজেটে লক্ষ্য ঘোষণা করলেই মূল্যস্ফীতি কমে না। এর জন্য প্রয়োজন বাজার ব্যবস্থাপনা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি , আমদানি সহজীকরণ , মজুতদারি নিয়ন্ত্রণ , কার্যকর প্রতিযোগিতা কমিশন, শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা , অন্যথায় বাজেটের লক্ষ্য কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

ব্যাংকিং খাত সংস্কার নিয়ে কিসসা কাহিনীর শেষ নেই । তবে এ বাজেটের অন্যতম ইতিবাচক দিক হলো ব্যাংকিং খাতকে গুরুত্ব দেওয়া। দুর্বল ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণ, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগে আস্থা বাড়ানোর ওপর সরকার জোর দিয়েছে বলে বলা হয়ে থাকে ।

একই সঙ্গে সরকার দেশীয় ব্যাংক থেকে ঋণের ওপর চাপ কিছুটা কমিয়ে বৈদেশিক ঋণের ভূমিকা বাড়াতে চায়।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখনো তীব্র মূলধন সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিকের শেষে এ খাতের মোট মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা।
এমতাবস্থায় সরকার বিদেশী ঋণের উপর জোড় দিবে বলে বাজেট আলোচনায় হতে জানা যায় । তবে আশংকা প্রকাশ করা হয় যে
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত বৈদেশিক ঋণের সম্ভাব্য মারাত্মক কুফল দেখা দিতে পারে যথা :-

১. বৈদেশিক ঋণের কিস্তি (মূলধন ও সুদ) পরিশোধে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন হবে। এতে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হতে পারে এবং নতুন কর আরোপ বা অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রয়োজন বাড়তে পারে।
২. ঋণ পরিশোধের জন্য ডলার ব্যয় করতে হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যেতে পারে।
রিজার্ভ কমে গেলে আমদানি, জ্বালানি ক্রয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
৩. ডলারের চাহিদা বাড়লে টাকার বিনিময় হার দুর্বল হতে পারে।
ফলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যেতে পারে এবং মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।
৪. ডলারের মূল্য বৃদ্ধি পেলে জ্বালানি, খাদ্য, কাঁচামাল ও ওষুধসহ আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে ।এর প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে পড়ে।
৫. পুরোনো ঋণ শোধ করতে নতুন ঋণ নিতে হলে ঋণের বোঝা ক্রমেই বাড়তে থাকতে পারে।
উৎপাদনশীল বিনিয়োগ থেকে পর্যাপ্ত আয় না হলে এই ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাবে।
৬. বড় অঙ্কের বৈদেশিক ঋণের সঙ্গে অনেক সময় নীতিগত শর্ত (Policy Conditionality) যুক্ত থাকে। এতে করনীতি, ভর্তুকি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংস্কার বা অন্যান্য অর্থনৈতিক নীতিতে বাহ্যিক প্রভাব বাড়তে পারে।
৭. বৈদেশিক ঋণে নেওয়া প্রকল্প সময়মতো শেষ না হলে সুদের ব্যয় বাড়ে এবং প্রকল্পের মোট ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।
৮. আজকের অতিরিক্ত ঋণের দায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে করের মাধ্যমে বহন করতে হতে পারে।
৯. ঋণের বোঝা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাগুলো দেশের ঋণমান কমিয়ে দিতে পারে। এতে ভবিষ্যতে ঋণ নেওয়া আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
১০. বৈদেশিক মুদ্রার সংকট ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিদেশি বিনিয়োগ কমতে পারে এবং ব্যবসায়িক আস্থা দুর্বল হতে পারে।
১১. ঋণ পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিতে বরাদ্দ কমে যেতে পারে।
১২. যদি বৈদেশিক ঋণ দ্রুত বাড়তে থাকে কিন্তু রপ্তানি, প্রবাসী আয় এবং রাজস্ব একই হারে না বাড়ে, তাহলে অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা দুর্বল হতে পারে।

তাই অতিরিক্ত বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের পরিবর্তে সরকারকে বৈদেশিক ঋণ কেবল উচ্চ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ফলদায়ক প্রকল্পে ব্যবহার করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ ও বৈদেশিক আয় বৃদ্ধি করতে হবে। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব শক্তিশালী করতে হবে।দুর্বল ব্যাংকিং খাত সংস্কার করে দেশীয় সঞ্চয় ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে হবে।

ঋণ গ্রহণের আগে ঋণের দীর্ঘমেয়াদি টেকসইতা (Debt Sustainability) নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে।
বৈদেশিক ঋণ নিজেই ক্ষতিকর নয়; এর প্রভাব নির্ভর করে ঋণের পরিমাণ, শর্ত, ব্যবহার এবং অর্থনীতির সক্ষমতার ওপর। বাংলাদেশের বর্তমান নাজুক অর্থনৈতিক অবস্থায় উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, দক্ষ ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং শক্তিশালী রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ভিত্তি ছাড়া অতিরিক্ত বৈদেশিক ঋণ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বিনিয়োগবান্ধব উদ্যোগ নিয়ে দুচারটি কথা না বললেই নয় । বাজেটে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগবান্ধব পদক্ষেপ দেখা যায়।
যেমন ব্যবসার লাইসেন্স দ্রুত প্রদান , ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, ডিজিটাল অনুমোদন ব্যবস্থা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ,পুঁজিবাজার উন্নয়ন ,ব্যাংকের পরিবর্তে বন্ড মার্কেট শক্তিশালী করা এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ব্যবসা সহজ হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হল কর ব্যবস্থার সংস্কার। এন বি আর এর সঙগে ইনটারিম সরকারের সম্পর্ক কী রকম নাজুক ছিল তা হয়ত অনেকেই এখনো ভুলে যান নি । যাহোক বর্তমান সরকার করব্যবস্থাকে আধুনিক করার ঘোষণা দিয়েছেন , শুনে ভাল লাগল ।বিশেষভাবে করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি , ডিজিটাল কর প্রশাসন ,TIN ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ,কর ফাঁকি রোধ । এসব দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক হতে পারে। তবে করদাতাদের হয়রানি বন্ধ না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।

সবাই জানি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো যুব বেকারত্ব। বাজেটে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কথা বলা হলেও কোন খাতে কত নতুন কর্মসংস্থান হবে? কোন খাতে কত বিনিয়োগ হবে? দক্ষতা উন্নয়নের জন্য কী পরিকল্পনা?
এসব বিষয়ে আরও সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকলে বাজেট আরও শক্তিশালী হতো।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি কৃষি। কৃষকদের জন্য সহজ ঋণ , সারের প্রাপ্যতা , সেচ সুবিধা .ন্যায্যমূল্য এসব নিশ্চিত করা না গেলে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

দারিদ্র্য হ্রাসে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু ভাতার পরিমাণ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন , দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ,ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ ও স্বচ্ছতা ।

এবার আসা যাক উন্নয়ন বাজেটের আলোচনায় । এডিপি বা উন্নয়ন ব্যয়ে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি করা হয়েছে।এটি ইতিবাচক, কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস বলে বাজেট বরাদ্দের চেয়ে বাস্তবায়নই বড় সমস্যা।প্রকল্প সময়মতো শেষ হয় না। ব্যয় বেড়ে যায়। মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তাই উন্নয়ন বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপর।

ছবি সুত্র : Reuter

এই বাজেটের শক্তিশালী দিকগুলো হলো বৃহৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা। ব্যাংকিং সংস্কারের অঙ্গীকার। বিনিয়োগবান্ধব উদ্যোগ। রাজস্ব সংস্কারের প্রচেষ্টা। কর্মসংস্থান ও উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ এবং অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল করার চেষ্টা।

তবে কিছু উদ্বেগও রয়েছে অত্যন্ত উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা। মূল্যস্ফীতি কমানোর বাস্তব কৌশল এখনও কঠিন। ব্যাংকিং খাতের গভীর সংকট। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের সুস্পষ্ট রোডম্যাপের অভাব। প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘদিনের দুর্বলতা এবং বেসরকারি বিনিয়োগে আস্থা পুরোপুরি ফিরে না আসা।

আমার মত ভনেকের দৃষ্টিতে এই বাজেট একটি উচ্চাভিলাষী কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ বাজেট। এতে উন্নয়নের বড় স্বপ্ন রয়েছে। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সুশাসন , দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন , দক্ষ কর ব্যবস্থাপনা , রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা , শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা , দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন । যদি এসব নিশ্চিত করা যায়, তবে এই বাজেট বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে পারে।
কিন্তু যদি আগের মতো রাজস্ব ঘাটতি, প্রকল্প বিলম্ব, দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা অব্যাহত থাকে, তাহলে এই বৃহৎ বাজেটও প্রত্যাশিত সুফল বয়ে আনতে পারবে না।

এখন কথা হল আশার বাজেট’ নাকি বাস্তবতার পরীক্ষায় আরেকটি উচ্চাভিলাষী অঙ্গীকার?
২০২৬–২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণের দলিল।

ছবি সুত্র : Prothom Alo English

দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের সংকটের প্রেক্ষাপটে সরকার এই বাজেটের মাধ্যমে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি উচ্চাভিলাষী রূপরেখা উপস্থাপন করেছে। প্রবৃদ্ধি অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রাজস্ব বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার মতো লক্ষ্যগুলো নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী এবং প্রশংসনীয়।

কিন্তু বাংলাদেশের বাজেট বাস্তবায়নের অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায় যে, উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণ যতটা সহজ, বাস্তবে তা অর্জন করা ততটাই কঠিন। উন্নয়ন প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্বল তদারকি, প্রশাসনিক জটিলতা, দুর্নীতি, ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, রাজস্ব আহরণে সীমাবদ্ধতা এবং নীতিগত অসামঞ্জস্য বহু বছর ধরেই বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান অন্তরায় হয়ে আছে। ফলে বাজেটের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে অর্থবছরের শেষে যখন দেখা যাবে ঘোষিত লক্ষ্য ও বাস্তব অর্জনের মধ্যে ব্যবধান কতটা কমানো গেছে।
বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকারের প্রতিটি টাকার ব্যয় সর্বোচ্চ দক্ষতার সঙ্গে নিশ্চিত করা এখন সময়ের অন্যতম বড় দাবি। রাজস্ব আহরণ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না বাড়লেও সরকারি ব্যয় ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অবস্থায় ব্যয় ব্যবস্থাপনায় আরও কঠোর শৃঙ্খলা, অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং অপচয় রোধ অপরিহার্য।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বিষয়ও বিবেচনার দাবি রাখে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচি—যেমন খাল পুনঃখনন, বৃক্ষরোপণ, অবকাঠামো উদ্বোধন বা অন্যান্য প্রতীকী কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বের সফর উপলক্ষে বহু মন্ত্রণালয়, সরকারি ও আধাসরকারি সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন এবং বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ব্যাপক প্রস্তুতিতে নিয়োজিত হতে দেখা যায়। এসব কর্মসূচির ইতিবাচক প্রচারমূল্য থাকলেও, একই সঙ্গে এগুলোর জন্য বিপুল কর্মঘণ্টা, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও সরকারি অর্থ ব্যয় হয়। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মিত দাপ্তরিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং উন্নয়ন প্রশাসনের ধারাবাহিকতায় প্রভাব পড়ে।

প্রশাসন বিজ্ঞানের মৌলিক নীতি হলো নীতিনির্ধারণ, পরিকল্পনা, তদারকি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা নেতৃত্বের প্রধান দায়িত্ব; আর মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের। একজন সেনাপতি যেমন প্রতিটি যুদ্ধক্ষেত্রে নিজ হাতে অস্ত্র ধারণ না করেও সমগ্র যুদ্ধ পরিচালনা করেন, তেমনি রাষ্ট্র পরিচালনায়ও প্রতিটি উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সরাসরি উপস্থিতির পরিবর্তে একটি দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও ফলাফলভিত্তিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা অধিক কার্যকর হতে পারে। এতে একদিকে যেমন প্রশাসনের মূল্যবান কর্মঘণ্টা সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।

বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন প্রকল্প ঘোষণা নয়; বরং বিদ্যমান প্রকল্পসমূহ নির্ধারিত সময়ে, নির্ধারিত ব্যয়ে এবং কাঙ্ক্ষিত মান বজায় রেখে সম্পন্ন করা। একই সঙ্গে দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা সংস্কার, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় সংকোচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা শক্তিশালী করাই হওয়া উচিত সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

সবশেষে বলা যায়, ২০২৬–২০২৭ অর্থবছরের বাজেট নিঃসন্দেহে সম্ভাবনা ও প্রত্যাশার একটি দলিল। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—শুধু উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা কখনো অর্থনৈতিক সফলতা নিশ্চিত করতে পারে না। সফলতা নির্ভর করে বাস্তবায়নের সততা, প্রশাসনিক দক্ষতা, আর্থিক শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সর্বোপরি জনগণের প্রতি জবাবদিহির ওপর। সরকার যদি এই মৌলিক বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি সম্পদ অর্থ, সময় ও জনবল সর্বাধিক উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে, তবে এই "আশার বাজেট" সত্যিই দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, টেকসই উন্নয়ন এবং জনকল্যাণের একটি কার্যকর ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। অন্যথায় এটি আরেকটি উচ্চাভিলাষী বাজেট হিসেবেই ইতিহাসের পাতায় স্থান পাবে, যার প্রতিশ্রুতি থাকবে অনেক, কিন্তু বাস্তব অর্জন হবে সীমিত।

মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ১১ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৮:৪০

মাথা পাগলা বলেছেন: ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার বাজেট বিশ্লেষণ পড়ে শেষ করলাম, কিন্তু কোন খাতে কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে সেটাই জানতে পারলাম না। মনে হচ্ছে বাজেটের চেয়ে শব্দের বরাদ্দটাই একটু বেশিই হয়ে গেছে। ইনফোরমেশনগুলো অ্যাড করে দেবার অনুরোধ রইলো।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.