| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ডঃ এম এ আলী
সাধারণ পাঠক ও লেখক

শহরটা রাতে কখনও পুরো ঘুমোয় না। কেউ প্রেমে জাগে, কেউ স্বপ্নে, কেউ অপরাধবোধে।আর কেউ কেউ জেগে থাকে অভাবে। তিনতলার ছোট্ট ভাড়া-বাড়িটির জানালার পাশে বসে শিরীন হারমোনিয়ামের রিডে আঙুল রাখল।
বাইরে তখন রাত গভীর হচ্ছে। দূরের উড়ালপুলে( Over bridge) গাড়ির আলো জোনাকির মতো ছুটে যাচ্ছে। কোনো জানালায় টেলিভিশনের নীল আলো, কোনো ছাদের কার্নিশে একলা বিড়াল, আর বাতাসে ভেসে আসছে রাতজাগা শহরের অস্পষ্ট গুঞ্জন।
শিরীন গান ধরল ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে ……..’ সুরটা মাঝপথে এসে থেমে গেল।দরজার নিচ দিয়ে একটি সাদা খাম ধীরে ধীরে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়েছে। শিরীন উঠে গিয়ে খামটি তুলল।খামের ওপর শুধু লেখা-
শিরীনের জন্য। প্রেরকের নাম নেই।ভেতরে মাত্র একটি লাইন;
তোমার বাবাকে জিজ্ঞেস করো তোমার কলেজের টাকা কোথা থেকে আসে।
শিরীনের বুকের ভেতরটা হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল।সে ধীরে ধীরে জানালার কাছে ফিরে এল।আকাশে চাঁদ ছিল না।
হানিফ মিয়া ছিলেন সাধারণ মানুষ।সাধারণ চাকরি, সাধারণ সংসার, সাধারণ স্বপ্ন।
একটি বেসরকারী নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে হিসাবরক্ষকের চাকরি করতেন। মাসের প্রথম সপ্তাহে সংসারে একটু স্বস্তির বাতাস ঢুকত, তৃতীয় সপ্তাহে সেই বাতাস যেন নিঃশব্দে বেরিয়ে যেত। স্ত্রী অসুস্থ।ছোট ছেলে স্কুলে পড়ে।আর শিরীন কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী।মেয়েটির গলায় গান ছিল।কিন্তু সেই গানের পেছনে ছিল অগণিত না-পাওয়া।নতুন জামা চাইত না।বইয়ের দাম বেশি হলে পুরোনো বই কিনত।কলেজের ফি দিতে দেরি হলে বলত বাবা, এখন না দিলেও চলবে।
হানিফ মিয়া বলতেন তুই শুধু পড়াশোনা কর মা। টাকার কথা ভাবিস না। শিরীন জানত, বাবা মিথ্যে বলছেন।আর বাবা জানতেন, মেয়েটাও তা জানে।কারণ গরিব সংসারে ভালোবাসার একটি অদ্ভুত ভাষা আছে;সেখানে মিথ্যেও কখনও কখনও ভালোবাসার আরেক নাম।
কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে হানিফ মিয়া বদলে যাচ্ছিলেন। রাতে দেরি করে ফিরতেন।ফোন এলে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেন।কখনও দরজা বন্ধ করে কারও সঙ্গে নিচু গলায় কথা বলতেন।শিরীন জিজ্ঞেস করলে বলতেন অফিসের ব্যাপার। শিরীন বিশ্বাস করতে চাইত।কিন্তু সেই সাদা খামটি তার বিশ্বাসের ভিতরে প্রথম ফাটল ধরিয়ে দিল।
পরদিন ভোরে শহরটাকে অন্যরকম লাগছিল।রাতের অন্ধকার ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে আসছে।পূর্ব আকাশে গোলাপি আভা।গাছের পাতায় শিশির।দূরে কোনো অচেনা পাখি বারবার ডাকছে।শিরীন ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল।তার মনে হল ভোরের আলো খুব নিষ্ঠুর।কারণ আলো এলে অন্ধকারের লুকিয়ে রাখা জিনিসগুলোও দেখা যায়।
পেছন থেকে একটি গলা ভেসে এল কিছু খুঁজছ? শিরীন ফিরে তাকাল। পাশের ফ্লাটের নতুন বাসিন্দা রায়হান।কলেজে ইতিহাস বিভাগের এক তরুণ উঠতি কবি ও সাংস্কৃতিক কর্মী। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের গান ও নাটকের প্রশিক্ষণ দিত নিষ্ঠার সাথে ।শান্ত, সংযত, একটু রহস্যময়।
শিরীনের গান প্রথম শুনেই একদিন বলেছিল ‘তোমার গলায় দুঃখ আছে।শিরীন হেসে জিজ্ঞেস করেছিল ‘দুঃখেরও কি গলা থাকে?’ রায়হান বলেছিল থাকে, শুধু সবাই শুনতে পায় না। আজ শিরীন বলল আমি সত্যি খুঁজছি।রায়হান মৃদু হাসল।"সত্যি কি খুঁজে পাওয়া যায়?" শিরীনের কন্ঠ তুমিই বলো, তুমি তো ইতিহাস খুঁজে বেড়াও। রায়হান বলে ইতিহাসে সত্যি থাকে না। "তাহলে কী থাকে?" রায়হান একটু ভেবে বলল মানুষের বলা গল্প থাকে। আর গল্পের ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে থাকে সত্যি।শিরীন তার দিকে তাকিয়ে রইল।ভোরের আলো তখন রায়হানের মুখে এসে পড়েছে।কেন জানি, তার মনে হল,এই মানুষটিও যেন কোনো এক অন্ধকারের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে।
সেদিন কলেজে আতা খান এসেছিলেন।শহরের নামী ব্যবসায়ী।কলেজ পরিচালনা কমিটির প্রভাবশালী সদস্য।দানশীল মানুষ হিসেবে খ্যাতি আছে তাঁর।গরিব ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি দেন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অর্থ দেন, সংবাদপত্রে তাঁর ছবি বেরোয়।
কিন্তু তাঁর হাসির আড়ালে কী আছে তা কেউ জানে না।শিরীনের গান শুনে তিনি বললেন ‘এই মেয়েটার প্রতিভা আছে’।তারপর হানিফ মিয়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন বললেন আপনার মেয়ের পড়াশোনার দায়িত্ব আমি নিতে পারি। হানিফ মিয়া সঙ্গে সঙ্গে বললেন দরকার নেই। আতা খানের চোখে মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত এক ঝিলিক দেখা গেল। অভিমান করবেন না হানিফ মিয়া। সাহায্য নিতে লজ্জা নেই। হানিফ মিয়া শান্ত গলায় বললেন সাহায্যের দাম যদি পরে দিতে হয়, সেটা সাহায্য থাকে না।
আতা খান হেসে উঠলেন। আপনি এখনও আগের মতোই আছেন। শিরীন চমকে উঠল।
আগের মতো?তাহলে বাবা ও আতা খান একে অপরকে আগে থেকেই চিনতেন?
পরদিন হানিফ মিয়ার অফিস থেকে খবর এল তিনি নাকি গুরুত্বপূর্ণ কিছু নথি সরিয়ে ফেলেছেন। চাকরি বিপন্ন।সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে তিনি মাথা নিচু করে বসে রইলেন। শিরীন বলল বাবা, কী হয়েছে? কিছু না। তুমি আমাকে মিথ্যে বলছ। হানিফ মিয়া চমকে তাকালেন।কী বললি? শিরীন টেবিলের ওপর সাদা খামটি রেখে বলল এটা কে পাঠিয়েছে? বাবার মুখের রক্ত মুহূর্তে শুকিয়ে গেল। কোন খাম? এই খাম। হানিফ মিয়া অনেকক্ষণ খামটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।তারপর ধীরে বললেন তুই এটা ভুলে যা। কেন বাবা ? কারণ কিছু সত্যি জানলে মানুষ আর আগের মতো থাকতে পারে না। শিরীনের চোখ ভিজে উঠল। আমি কি এতদিন মিথ্যার মধ্যে ছিলাম? হানিফ মিয়া কোনো উত্তর দিলেন না।
সেই রাতে হানিফ মিয়া ঘুমিয়ে পড়ার পর শিরীন তাঁর পুরোনো আলমারি খুলল।কাপড়ের নিচে একটি ছোট কাঠের বাক্স।তালা দেওয়া।চাবি বাবার বালিশের নিচে।শিরীনের হাত কাঁপছিল।চাবি দিয়ে বাক্সটি খুলতেই বেরিয়ে এল কয়েকটি পুরোনো কাগজ।একটি সাদা-কালো ছবি।আর একটি ডায়েরি।
ছবিতে হানিফ মিয়া, আতা খান এবং আরও একজন যুবক।তৃতীয় লোকটির সাথে রায়হানের আশ্চর্য মিল।শিরীনের বুক ধক করে উঠল।ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা যেদিন সত্যি প্রকাশ পাবে, সেদিন শিরীনকে বাঁচানোই হবে আমার শেষ কাজ।শিরীনের হাত থেকে ডায়েরি পড়ে গেল।
পরদিন রায়হানকে সব বলল শিরীন।রায়হান ছবিটি হাতে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।তারপর বলল উনি আমার বাবা।শিরীন স্তব্ধ। তোমার বাবা? হ্যাঁ। শিরীন জানতে চাইল তিনি কোথায়? রায়হান জানালার বাইরে তাকাল। বলল বারো বছর আগে মারা গেছেন।"কীভাবে?" দুর্ঘটনা বলা হয়েছিল। তার গলায় তীব্র বিষণ্ণতা।
রহস্যের জাল ধীরে ধীরে খুলতে লাগল।বারো বছর আগে আতা খানের নির্মাণ সংস্থায় হানিফ মিয়া ছিলেন হিসাবরক্ষক।রায়হানের বাবা ছিলেন প্রধান প্রকৌশলী।একটি বহুতল ভবন নির্মাণের সময় তাঁরা আবিষ্কার করেছিলেন নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে।রায়হানের বাবা প্রতিবাদ করেছিলেন।হানিফ মিয়া হিসাবের খাতায় সত্যিটা লিখেছিলেন।তারপর একটি নির্মাণ দুর্ঘটনা।রায়হানের বাবার মৃত্যু।মামলা হয়নি।প্রমাণ হারিয়ে গেল।আর হানিফ মিয়া চাকরি হারিয়ে চুপ করে গেলেন।তবে পুরোপুরি চুপ হননি, তিনি কিছু প্রমাণের কপি লুকিয়ে রেখেছিলেন।
সেই প্রমাণই ছিল আতা খানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।কিন্তু হানিফ মিয়া কেন বারো বছর ধরে সত্য প্রকাশ করেননি? উত্তরটি ছিল আরও নির্মম।তখন শিরীনের মা সদ্য অসুস্থ।শিরীন ছোট।সংসারে টাকা নেই।চাকরি চলে গেলে পরিবার না খেয়ে মরত।
তিনি চুপ করেছিলেন।একজন মানুষের জীবন বাঁচাতে আরেকজনের মৃত্যুর সত্য চাপা দিয়েছিলেন।অপরাধ করেছিলেন?নাকি অসহায় মানুষ হিসেবে বাঁচার চেষ্টা করেছিলেন?শিরীন জানত না।
একদিন আতা খান নিজেই শিরীনের সামনে এসে দাঁড়ালেন , বললেন তুমি সত্যিটা জেনে গেছ। হ্যাঁ জেনে গেছি । শুনে তিনি বললেন তাহলে এটাও জানো, তোমার বাবাকে চাইলে কালই জেলে পাঠাতে পারি। শিরীন চুপ। আতা খান নরম গলায় বললেন ,তোমার পড়াশোনা, তোমার মায়ের চিকিৎসা, তোমার ভাইয়ের ভবিষ্যৎ সব আমি দেখব।শিরীন জানতে চাইল তার বিনিময়ে?
আতা খানের হাসি মিলিয়ে গেল। তোমার বাবার কাছে যে নথিগুলো আছে, সেগুলো আমাকে এনে দেবে। "আর যদি না দিই?" আতা খান টেবিলে একটি ফাইল রাখলেন।
তাহলে তোমার বাবার বিরুদ্ধে মামলা হবে। শিরীন ফাইলটির দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল আপনি জানেন সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষ কে? আতা খান ভ্রু তুললেন জানতে চাইলেন সে কে? শিরীন বলল যে অভাবী মানুষকে কিনতে চায়।
সেই রাতেই শিরীন রায়হানের সঙ্গে দেখা করল। জানাল আমাদের প্রমাণ দরকার। রায়হান বলল প্রমাণ আছে। শিরীন বলল তবে কোথায় সেই প্রমান ? তোমার বাবা লুকিয়ে রেখেছেন জানাল রায়হান । শিরীন বলল তুমি জানো কোথায়? রায়হান বলল জানিনা তা কোথায় । ঠিক তখনই অন্ধকার গলি থেকে হানিফ মিয়া বেরিয়ে এলেন।আমার কাছে আছে।তিনি একটি পুরোনো পেনড্রাইভ এগিয়ে দিলেন। সব আছে এখানে। হিসাব, ছবি, নথি সব। রায়হান বিস্মিত হয়ে বলল এতদিন লুকিয়ে রেখেছিলেন কেন?
হানিফ মিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।কারণ আমি কাপুরুষ ছিলাম। শিরীন বাবার হাত ধরে বলল না বাবা তুমি শুধু ভীত ছিলে।হানিফ মিয়া মৃদু হাসলেন, বললেন ভয় আর কাপুরুষতার মধ্যে পার্থক্য খুব সামান্য, মা।
পরদিন নথিগুলো সংবাদমাধ্যমের হাতে পৌঁছে গেল। আতা খানের সাম্রাজ্যে ঝড় উঠল।তদন্ত শুরু হল।পুরোনো মামলা খুলল।রায়হানের বাবার মৃত্যুও নতুন করে তদন্তের আওতায় এল।কিন্তু সত্যের সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এল আরেকটি সত্য। নথির শেষ পাতায় একটি স্বাক্ষর ছিল। সেটি আতা খানের নয়।হানিফ মিয়ারও নয়। রায়হানের।শিরীন স্তব্ধ হয়ে তাকাল বলল তুমি?।রায়হান চোখ নামিয়ে বলল আমি তোমার কাছে পুরো সত্যিটা বলিনি। কী সত্যি? আমি তোমার কলেজে এসেছিলাম শুধু তোমার গান শুনতে নয়। শিরীন জানতে চায় তাহলে?
আমি প্রমাণ খুঁজতে এসেছিলাম।শিরীনের চোখে জল। তুমি আমাকে ব্যবহার করেছ? রায়হান চুপ।তারপর বলল প্রথমে হ্যাঁ, শিরীনের জিজ্ঞাসা কিন্তু পরে?"রায়হান তার চোখের দিকে তাকাল।পরে তোমাকে হারানোর ভয়টা সত্যি হয়ে গিয়েছিল। শিরীন কোনো উত্তর দিল না।শুধু হারমোনিয়ামের সামনে গিয়ে বসল।
আঙুল রাখল সাদা-কালো কিবোর্ডে।তারপর গাইল ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’ রায়হান দরজার কাছে দাঁড়িয়ে শুনতে লাগল।সেই সুরে এবার ছিল অভাব,বিশ্বাসঘাতকতা,বাবার অপরাধবোধ,আতা খানের লোভ,আর অসম্পূর্ণ ভালোবাসা।
কয়েক মাস পর আতা খান গ্রেপ্তার হলেন। হানিফ মিয়া আদালতে নিজের নীরবতার অপরাধ স্বীকার করলেন।কেউ তাঁকে নায়ক বলল না।তিনি নায়ক ছিলেন না।তিনি ছিলেন একজন দুর্বল মানুষ, যিনি একদিন ভয় পেয়েছিলেন।কিন্তু পরে নিজের ভুল স্বীকার করে সত্যের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
মামলা এগোতে লাগল।শহরের আলোড়ন ধীরে ধীরে থিতিয়ে এল।কিন্তু শিরীন ও রায়হানের জীবনে তখন অন্য এক অধ্যায় শুরু হয়েছে।
চলবে , পরবর্তী পর্ব পাঠের আমন্ত্রণ রইল
প্রচ্ছদ ছবি কাল্পনিক, কারো প্রকৃত ছবি নয় ।
২|
১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:১৩
কাজী ফাতেমা ছবি বলেছেন: গল্প ভালো লাগলো
©somewhere in net ltd.
১|
১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৫৫
জ্যাক স্মিথ বলেছেন: প্রিয়তে নিয়ে রাখলাম, সময় করে পড়তে হবে।