নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সাহিত্য, সংস্কৃতি, কবিতা এবং সমসাময়িক সামাজিক বিষয়াদি নিয়ে গঠনমুলক লেখা লেখি ও মুক্ত আলোচনা

ডঃ এম এ আলী

সাধারণ পাঠক ও লেখক

ডঃ এম এ আলী › বিস্তারিত পোস্টঃ

আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না

২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:৪৪


আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না
আমার ডক্টর উপাধিটি মুছে দিও
জ্ঞানী, কবি, দরবেশ, সাধক, সফল, ব্যর্থ
এসব কোনো শব্দই যেন
মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আমাকে আলাদা না করে।

কারণ আমি দেখেছি
অহংকার খুব সূক্ষ্ম পোশাক পরে আসে
কখনো রাজমুকুট হয়ে
কখনো জ্ঞানের আলো হয়ে
কখনো পবিত্রতার দাবিতে
কখনো আবার বিনয়ের মুখোশে।

নফস বড় কৌশলী
সে সিজদার মধ্যেও নিজের ছায়া খুঁজে নেয়
তসবিহের দানাতেও নিজের মর্যাদা গোনে
অশ্রুর মধ্যেও
নিজেকে সাধু বলে ভাবতে শেখে।

হে পথিক
যদি কোনোদিন আমার কবরের
পাশে এসে দাঁড়াও
আমার জন্য শোক করার আগে
নিজের অন্তরে হাত রেখো।
দেখো-
সেখানে কি এখনো একটি সিংহাসন আছে
যেখানে তুমি নিজেকেই বসিয়ে রেখেছ?
যদি থাকে
সেই সিংহাসন ভেঙে দিও।

কারণ আল্লাহর নৈকট্যের পথে
সবচেয়ে দীর্ঘ দূরত্ব
আকাশ থেকে আকাশ নয়
‘আমি’ থেকে ‘আমি নই’এর দূরত্ব।

আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না
যে পাথরে নাম খোদাই করবে
সেই পাথরও একদিন ক্ষয়ে যাবে
বৃষ্টি তার অক্ষর মুছে দেবে
শেওলা তার বুকে সবুজ নীরবতা লিখবে,
সময়ের আঙুল
ধীরে ধীরে মুছে দেবে
আমার অস্তিত্বের সমস্ত চিহ্ন।

তবু ভয় নেই
কারণ মুছে যাওয়াই যদি
তাঁর দিকে ফেরার পথ হয়
তবে আমাকে মুছে দাও।
আমার স্মৃতি মুছে দাও
আমার অহংকার মুছে দাও
আমার কৃতিত্বের গল্প মুছে দাও
আমার নিজের কাছে নিজের যে পরিচয়
সেটুকুও মুছে দাও।

শুধু তাঁর স্মরণটি রেখো
যে নাম উচ্চারণ করলে
অন্তরের অন্ধকারে
অদৃশ্য কোনো দরজা খুলে যায়
যে নামের কাছে এসে
সব প্রশ্ন ধীরে ধীরে নত হয়ে যায়
যে নামের আলোয়
‘আমি’ নামের দীর্ঘ ছায়াটি
একদিন ক্ষীণ হয়ে আসে
সেই নামই যথেষ্ট।

আমি একদিন বুঝেছিলাম
স্রষ্টাকে খুঁজতে গিয়ে
আমি দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম
অথচ তিনি ছিলেন
আমার অশ্রুরও অধিক নিকটে।

আমি মরুভূমিতে জল খুঁজেছি
পর্বতের চূড়ায় উত্তর খুঁজেছি
গ্রন্থের অক্ষরে অক্ষরে
অসীমের মানচিত্র এঁকেছি
তারপর একদিন
এক ক্ষুধার্ত মানুষের চোখে
নিজের রবের করুণা দেখলাম।

এক অপরাধীর অনুতাপে
তাঁর দরজা দেখলাম
এক মায়ের ক্ষমায়
তাঁর রহমতের স্পর্শ পেলাম
এক নিঃসঙ্গ মানুষের দীর্ঘশ্বাসে
শুনলাম সেই প্রাচীন আহ্বান
ফিরে এসো
ফিরে এসো সেই ঘরে
যেখান থেকে তোমার যাত্রা শুরু হয়েছিল।

তাই আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না।
বরং কবরের মাটিতে
একটি বীজ রেখে যেয়ো।
যদি বৃষ্টি আসে
সে বীজ অঙ্কুরিত হোক
যদি বসন্ত আসে
সে মাটির বুক চিরে উঠুক
যদি কোনো পাখি এসে
তার ডালে বসে গান গায়
তবে ভাববে
মৃত মানুষটির জন্য নয়
জীবিত মানুষের হৃদয়ের জন্যই
প্রকৃতি এখনো গান গায়।

আমার কবরের ওপর
ফুল ফুটলে তাকে আমার ফুল বলো না
সে তো তাঁরই সৃষ্টি।
বাতাস এলে বলো না
মৃতের আত্মা ফিরে এসেছে
বাতাস তো তাঁরই নিঃশ্বাসের
এক ক্ষুদ্র ইশারা।

চাঁদ উঠলে
আমার স্মৃতিতে তাকিয়ো না
চাঁদেরও তো নিজস্ব কোনো আলো নেই
সে কেবল গ্রহণ করে
এবং ফিরিয়ে দেয়।

মানুষও কি তাই নয়?
যে আলোকে নিজের বলে ভেবেছিলাম
সে আলোও তো আমার ছিল না।

আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না
আমার কবরকে তীর্থ বানিয়ো না
আমার নামকে মন্ত্র বানিয়ো না
আমার জীবনের ভুলগুলোকে
পবিত্রতার পোশাক পরিয়ো না।

আমি মানুষ ছিলাম
আমার ভেতরে আলো ছিল
অন্ধকারও ছিল
তাওহিদের আকাঙ্ক্ষা ছিল
নফসের টানও ছিল
সত্যের দিকে পা বাড়িয়েছি
আবার নিজের ছায়াতেও ফিরে গেছি।

আমাকে ফেরেশতা বানিয়ে
আমার সত্যকে হত্যা কোরো না
বরং আমার অসম্পূর্ণতাকে
একটি আয়না হিসেবে রেখো।
যেন তুমি দেখো
মানুষ পতনের মধ্যেও
ফিরে আসতে পারে
পাপের পরেও
তওবার দরজা বন্ধ হয় না
অন্ধকার যত দীর্ঘ হোক
রহমতের ভোর
তার চেয়েও প্রাচীন।

হে অচেনা পথিক
যেদিন আমার কবরের পাশ দিয়ে যাবে
হয়তো তুমি তাড়াহুড়োয় থাকবে
হয়তো হাতে থাকবে
দুনিয়ার কোনো অসমাপ্ত কাজ
চোখে থাকবে ভবিষ্যতের স্বপ্ন
হৃদয়ে থাকবে কারও প্রতি অভিমান
এক মুহূর্ত থেমো
মাটির দিকে তাকিও।

এই মাটিই একদিন
তোমার সমস্ত পরিকল্পনার ওপর
শেষ স্বাক্ষর দেবে।
তখন বুঝবে-
জীবন আসলে সংগ্রহের নাম নয়
সমর্পণের নাম।
যা ধরে রেখেছিলে
সব ছাড়তে হবে
যাকে নিজের বলেছিলে
সব ফিরিয়ে দিতে হবে
যে শরীরকে এত যত্নে সাজিয়েছিলে
সে শরীরও একদিন
মাটির কাছে আমানত হয়ে যাবে।

শুধু আমল নয়
শুধু সম্পদ নয়
শুধু স্মৃতি নয়
শেষে মানুষকে
নিজেকেই সমর্পণ করতে হয়।

আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না
যদি কিছু লিখতেই হয়
তবে পাথরে নয়
কোনো জীবিত মানুষের হৃদয়ে লিখো
দুনিয়া ক্ষণিক,অহংকার ক্ষণিক
দুঃখ ক্ষণিক, আনন্দও ক্ষণিক।

কিন্তু যে হৃদয়
তার রবের দিকে ফিরে যায়
তার যাত্রা
মৃত্যুতে শেষ হয় না
এই একটি বাক্যই যথেষ্ট
কারণ মৃত্যু
দরজা বন্ধ করে না
দরজা বদলে দেয়।

এখানে যে আলো চোখে দেখা যায়
সেখানে হয়তো অন্য আলো
এখানে যে নীরবতা
কান শুনতে পায়
সেখানে হয়তো
নীরবতারও অতীত কোনো সত্য।

কবর-
সমাপ্তির নাম নয়
এ এক অন্তর্বর্তী নীরবতা
যেখানে মানুষ
দুনিয়ার কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে
নিজের রবের সামনে
নিজের প্রকৃত ওজন অনুভব করে।

হে আমার আত্মা
তুমি এতকাল কী খুঁজলে?
মানুষের ভালোবাসা?
তারা তো পরিবর্তনশীল।
সম্মান?
তা তো বাতাসে লেখা নাম।
জ্ঞান?
জ্ঞানও যদি হৃদয়কে নত না করে
তবে সে কেবল
অহংকারের আরেকটি কক্ষ।

সম্পদ?
মৃত্যুর দরজায়
তার কোনো চাবি নেই।
তবে কী খুঁজলে?
একটি চিরস্থায়ী আশ্রয়
আর আশ্রয় কোথায়?
যার কাছে ফিরে গেলে
হারানোর ভয় থাকে না
যার রহমতের সামনে
অপরাধও ক্ষমার সম্ভাবনা হয়ে ওঠে।
যার স্মরণে
বুকের ভিতরকার বিচ্ছিন্ন নদীগুলো
এক সমুদ্রে মিলিত হয়-
সেই একের কাছেই।

তাই আমার সমাধিতে
কোনো ফলক রেখো না
আমার নামকে
সময়ের হাতে তুলে দাও।
সময় তাকে ভাঙুক
মুছে দিক
ভুলে যাক
আমি ভুলে যেতে চাই
আমার নিজের তৈরি মানুষটিকে।

যে মানুষটি বলত-
“আমি করেছি,আমি জানি
আমি পেয়েছি,আমি হয়েছি
তার মৃত্যু হোক
আমার মৃত্যুর আগেই।

যেদিন সত্যিকারের
আমি মরে যাবে
সেদিনই হয়তো
ভেতরে জন্ম নেবে
সেই নিঃশব্দ মানুষটি
যে আর নিজের কিছু দাবি করে না।
সে শুধু বলে-
আমি তোমার বান্দা
আমাকে তুমি যেমন চাও
তেমনই গ্রহণ করো।

আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না।
যদি কাঁদো
আমার জন্য কেঁদো না
নিজের জন্য কেঁদো
যেন তোমারও ফিরে যাওয়ার আগে
হৃদয়ের দরজা খুলে যায়।

যদি দোয়া করো,
আমার জন্য করো;
কিন্তু দোয়ার শেষে
নিজের নামটিও রেখো।
কারণ একই মাটি
সব অহংকারের শেষ ঠিকানা।

আজ যে কবরের পাশে
তুমি দাঁড়িয়ে আছ,
কাল সেই মাটিই
তোমার জন্য অপেক্ষা করবে।
তখন তোমারও কোনো ফলক চাইবে না মন
চাইবে শুধু
একটি ক্ষমাশীল দৃষ্টি,
একটি গ্রহণযোগ্যতার ইশারা,
একটি রহমতের দরজা
যা বন্ধ হবে না।

আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না
শেষে যদি কিছু রেখেই যেতে চাও
একটি সাদা কাপড়ের মতো
নির্মল নীরবতা রেখে যেয়ো
একটু মাটি।একটু দোয়া
একটি অশ্রু।আর তাঁর নাম।

বাকিটুকু বাতাস নিয়ে যাক।
আমার সমস্ত গল্প
সময়ের নদীতে ভেসে যাক
কারণ আমি কোনো গল্প নই
আমি তাঁরই কাছে ফিরে যাওয়া
এক অসমাপ্ত বাক্য।

আমি কোনো স্মারক নই
আমি মুছে যেতে থাকা
একটি ক্ষণিক চিহ্ন।
আমি কোনো ফলক নই
আমি তাঁর দরজায় পড়ে থাকা
একটি নামহীন আবেদন।

তাই
আমার সমাধিতে কোনো ফলক রেখো না
যেদিন মাটি আমাকে সম্পূর্ণ ঢেকে দেবে
সেদিন যেন আর কিছুই না থাকে
যা আমাকে দুনিয়ার সঙ্গে বেঁধে রাখে।
শুধু আকাশ থাকুক
শুধু মাটি থাকুক
শুধু নীরবতা থাকুক
আর সেই নীরবতার গভীরে
যদি কোনো শব্দ কখনো জন্ম নেয়
তবে সে শব্দ আমার নয়।
সে হবে
ইয়া রব আমি ফিরে এসেছি।

মন্তব্য ৩ টি রেটিং +৩/-০

মন্তব্য (৩) মন্তব্য লিখুন

১| ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:০৪

হুমায়রা হারুন বলেছেন: অপূর্ব
সকলের মনের কথা।

২| ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৪৭

হুমায়রা হারুন বলেছেন: ২০০৭ এ লেখা আমার একটি ভবনাঃ
Graveyard
Don’t make my graveyard
I don’t want to be buried
I don’t want to be remembered
From my life nothing I took or I carried.

Neither I want to be recognized
Nor even to be remembered by you
I will rest in peace with myself
With colorless passionate hue.

I won’t try to find myself
I won’t try to think where am I
My passion of search with itself
Revert me when I will die.

30th Jan, 2007 Montreal

৩| ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৪৯

আহমেদ জী এস বলেছেন: ডঃ এম এ আলী ,




তাহলে আপনার জন্যে একটি ফারসী কবিতার কয়েকটি চরণ---
বেগিরে সাব্জে নাপুশাদ কাসি মাজ়ারে মার়া,
কে গোর্‌ পোশে গ়ারিবান হামিন গিয়াহ বাস আস্ত।

বাংলা অর্থ --
সবুজ ঘাস ছাড়া কেউ যেন আমার কবর ঢেকে না দেয়,
কারণ এই ঘাসই নিঃসঙ্গ মানুষের কবর ঢাকার জন্য যথেষ্ট।


এই দু'টো পঙ্ক্তি মোঘল সম্রাজ্ঞী জাহান আরার সমাধির সঙ্গে যুক্ত বলে কয়েকটি ফারসি-সাহিত্যবিষয়ক সূত্রে উল্লেখ আছে।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.