নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সাহিত্য, সংস্কৃতি, কবিতা এবং সমসাময়িক সামাজিক বিষয়াদি নিয়ে গঠনমুলক লেখা লেখি ও মুক্ত আলোচনা

ডঃ এম এ আলী

সাধারণ পাঠক ও লেখক

ডঃ এম এ আলী › বিস্তারিত পোস্টঃ

১৯৭১ঃ নদী-নালায় ভেসে থাকা স্বদেশের কান্নাঃ শহীদদের প্রতি নিবেদিত একটি কাব্যগাথা জাতির রক্ত, অশ্রু ও স্বাধীনতার অমর ইতিহাস

১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:০৫


পঁচিশে মার্চ ১৯৭১
রাত্রি তখন গভীর, নগরীর বাতিগুলো
যেন অনাগত বিপদের সামনে অসহায়
ঢাকার আকাশে হঠাৎ গর্জে উঠল কামান
ট্যাংকের চাকার নিচে কেঁপে উঠল রাজপথ
গুলি ছুটে গেল মানুষের ঘুমন্ত জানালায়
আগুন ছড়িয়ে পড়ল ঘর থেকে ঘরে।

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞের শিকার শহীদদের মৃতদেহ।

ছবি সুত্র : Click This Link

অপারেশন সার্চলাইট একটি নাম
অথচ তার আড়ালে কত মানুষের শেষ নিশ্বাস
কত মায়ের বুকের ভেতর নিভে যাওয়া পৃথিবী
কত তরুণের চোখে অসমাপ্ত ভোরের স্বপ্ন
কত বইয়ের পাতায় পড়ে থাকা স্বাধীনতার বর্ণমালা
কত রক্তাক্ত দেয়ালে থেমে যাওয়া জীবনের কবিতা!

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ, ছাত্রাবাসের কক্ষ
নগরীর গলি, সাধারণ মানুষের বক্ষ
কোনো স্থানই রেহাই পায়নি সেই নিষ্ঠুর রাতে
মানুষের পরিচয় হয়ে উঠেছিল মৃত্যুর কারণ
ভাষা হয়ে উঠেছিল অপরাধ
নিজের মাটিকে ভালোবাসা হয়ে উঠেছিল
ক্ষমতার চোখে এক অমার্জনীয় বিদ্রোহ।

কে দিয়েছিল মানুষকে মানুষ হত্যার অধিকার?
কোন ধর্ম, কোন বিবেক, কোন সভ্যতার বিধান
নিরস্ত্র মানুষের বুকে আগুন জ্বালাতে বলে?
যে হাতে শিশুকে আদর করার কথা
সে হাতে কেন ওঠে অস্ত্র?

যে চোখে মানুষের অশ্রু দেখে মমতা জাগার কথা
সে চোখ কী করে পাথর হয়ে যায়?
অন্ধ ক্ষমতার কাছে কি মানুষের প্রাণ এত সস্তা
একটি মায়ের বুক কি এত সহজে শূন্য করা যায়?
ইতিহাস আজও প্রশ্ন করে
উত্তরহীন সেই প্রশ্নের সামনে
মানবসভ্যতার সমস্ত অহংকার মাথা নত করে।

তারপর শুরু হলো দীর্ঘ নয় মাস
মৃত্যু আর প্রতিরোধের পাশাপাশি চলা এক মহাকাল
বাংলার গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল আতঙ্ক
পোড়া ঘরের ধোঁয়া মিশে গেল সন্ধ্যার আকাশে।

পথ হারানো মানুষ ছুটল অজানা গন্তব্যে
কেও নৌকায় , কেও পায়ে হেটে রেললাইন ধরে
কোলের শিশুকে বুকে চেপে মা পেরোলেন
কাদা, কাঁটা, অন্ধকার আর সীমাহীন অনিশ্চয়তা।

কোনো পিতা ফিরে এলেন না আর সন্ধ্যার পরে
কোনো কন্যার বিয়ের শাড়ি রয়ে গেল বাক্সে
কোনো বৃদ্ধের লাঠি পড়ে রইল উঠোনের কোণে
কোনো বধূর সিঁদুর শুকিয়ে গেল অপেক্ষার আগুনে।

দরজায় দরজায় প্রশ্ন কোথায় গেল মানুষটি?
নদীর ওপারে? কোনো শিবিরে?
কোনো অচেনা কারাগারে?
নাকি নামহীন কোনো বধ্যভূমির মাটিতে
চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে পড়েছে সে?
কেউ জানত না।

শুধু অপেক্ষা জানত, প্রতিটি দীর্ঘ রাতের শেষে
একটি পরিচিত কণ্ঠস্বর ফিরে আসতে পারে
শুধু অপেক্ষা জানত, দরজার বাইরে
পায়ের শব্দ হলেই বুক কেঁপে ওঠে।

বাংলার নদী, তুমি তো ছিলে জীবনের সহচর
তোমার জলে ভেসেছে নৌকা, স্বপ্ন, সোনালি ধান
তোমার দুই তীরে গড়ে উঠেছে মানুষের সংসার
তুমি দেখেছ কৃষকের ঘামে ভেজা সকাল
জেলের জালে ধরা পড়া রুপালি মাছ
বর্ষার জলে শিশুর উচ্ছ্বসিত হাসি
প্রেমিকের নৌকায় ভাটিয়ালির দীর্ঘশ্বাস।

কিন্তু সেই একাত্তরে তোমার তীরেও
নেমে এসেছিল মৃত্যুর অবর্ণনীয় ছায়া
কোথাও পড়ে ছিল নিথর দেহ
কোথাও জলে মিশে ছিল অচেনা মানুষের শেষ পরিচয়
কোথাও কাশবনের আড়ালে জমেছিল নীরবতা
কোথাও শ্যাওলাধরা জলাশয় বহন করেছিল
মানুষের নিষ্ঠুরতার অমোচনীয় সাক্ষ্য।

হে নদী, তুমি কি ভুলতে পেরেছ সেই দিন?
তোমার ঢেউ কি কখনো প্রশ্ন করেনি তীরকে
এই মানুষগুলো কারা, কেন তারা ফিরল না ঘরে?
কোন অপরাধে তাদের জীবনের প্রদীপ
এভাবে নিভিয়ে দেওয়া হলো অন্ধকারের হাতে?

খাল-বিল, ডোবা, জলাভূমি, নির্জন প্রান্তর
ধানক্ষেতের পাশের পথ, পরিত্যক্ত ইটভাটা
রেললাইনের ধারে বিস্মৃত কোনো ভূমিখণ্ড
কত স্থান বহন করে রেখেছে অজানা ইতিহাস।

যেখানে একদিন শিশুরা খেলত
যেখানে গরু ফিরত রাখালের পেছনে
যেখানে সন্ধ্যায় উঠত ধূপের গন্ধ
সেই চেনা ভূগোল কোনো কোনো স্থানে
পরিণত হয়েছিল মৃত্যুর নীরব সাক্ষীতে।

পাঁচ হাজার বধ্যভূমির সন্ধান
সহস্রাধিক স্থান আজও চিহ্নিত
মাটি খুঁড়ে ওঠে খুলি, হাড়, চুল
নীরব সাক্ষ্য দেয় গণহত্যার
চৌষট্টি জেলার গণকবর ও বধ্যভূমির ছবি
আজও কাঁদায় বিবেক, শিহরিত করে প্রাণ।

এ শুধু অতীত নয় জাতির ক্ষতচিহ্ন
শহীদের রক্তে লেখা স্বাধীনতার অমর দলিল
সত্য থাকুক সংরক্ষিত, স্মৃতি থাকুক অম্লান
একাত্তরের শহীদদের প্রতি
বিনম্র শ্রদ্ধা চিরকাল, অবিরাম।
বধ্যভূমির মাটি জানে, কত নাম হারিয়ে গেছে
কত পরিচয় মুছে গেছে ধুলো আর রক্তের ভেতর
কত পরিবার আজও জানে না
কোন আকাশের নিচে তাদের প্রিয়জন ঘুমিয়ে আছেন।
ছবি : ঠাকুরগাঁওয়ের জাঠিভাঙ্গা বধ্যভূমি।

ঠাকুরগাঁও সদরের বালিয়া ইউনিয়নের কিসমত সুকানপুকুরী
সেই মৌজার জাটিভাঙা গ্রামটি এখন বিধবাপল্লী নাম ধারী
যেখানে ২৩ এপ্রিল প্রায় আড়াই হাজার মানুষকে
হত্যা করে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের দোসর বাহিনী।
তথ্য ও ছবি সুত্র : Click This Link
মৃত্যুরও তো প্রাপ্য শেষ বিদায়
এক মুঠো মাটি, এক বিন্দু অশ্রু
একটি নাম ধরে ডাকার অধিকার
কিন্তু কত শহীদ সেই সামান্য অধিকারটুকুও
পাননি এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর কাছে!

হে ইতিহাস, তোমার পাতায় কি লেখা আছে
সেই মায়ের কথা, যিনি ছেলের জন্য ভাত বেড়ে
রাতের পর রাত বসে থেকেছেন দরজার পাশে?
তোমার অক্ষরে কি ধরা আছে সেই পিতার মুখ
যিনি শত মানুষের ভিড়ে খুঁজেছেন
নিজের সন্তানের পরিচিত চোখ?

সেই বোনের কথা, যে রাখি বাঁধার দিনেও
ভাইয়ের ফেরার অপেক্ষায় উঠোনে দাঁড়িয়েছিল?
সেই শিশুটির কথা, যে বুঝতেই পারেনি
কেন তার ঘর নেই, কেন তার বাবা নেই
কেন মায়ের চোখে পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকার?

তাদের প্রত্যেকের ছিল একটি নাম
একটি ব্যক্তিগত আকাশ, একটি নিজস্ব সকাল
ছিল ভালোবাসার মানুষ, ছিল স্বপ্নের সংসার
ছিল বেঁচে থাকার অধিকার।

বাংলাদেশের গণহত্যা গবেষণাকেন্দ্রের গ্যালারিতে
আলোকচিত্রীদের তোলা মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ছবি রয়েছে।

গণহত্যার আলোকচিত্র গ্যালারি দেখুন এখানে https://cbgr1971.org/gallery/genocide-gallery/
Genocide Gallery – Center for Bangladesh Genocide Research (CBGR)
https://commons.wikimedia.org/wiki/Category:1971_Bangladesh_genocide

তারা কোনো পরিসংখ্যান নয়
কোনো শীতল প্রতিবেদনের কয়েকটি শব্দ নয়
তারা প্রত্যেকে একটি সম্পূর্ণ পৃথিবী
যে পৃথিবী হত্যার এক মুহূর্তে ভেঙে পড়েছিল।

একদিন কোনো আলোকচিত্রী দাঁড়িয়েছিলেন
সময়ের সেই ক্ষতবিক্ষত প্রান্তে
কাঁপা হাতে তুলে নিয়েছিলেন ক্যামেরা।
লেন্সের ভেতর দিয়ে তিনি দেখেছিলেন
ধ্বংসস্তূপ, শূন্য চোখ, স্তব্ধ জনপদ
স্বজনহারা মানুষের মুখে জমে থাকা পাথরসম শোক।
পঞ্চগরে গনহত্যার ছবি

তথ্য ও ছবিসুত্র : Click This Link
https://www.prothomalo.com/bangladesh/ মুক্তিযুদ্ধে-লালমনিরহাট-ও-গাইবান্ধায়-গণহত্যা
ক্যামেরা তখন কেবল ছবি তোলেনি
সে ধরে রেখেছে সভ্যতার সামনে রাখা আয়না
একটি স্থিরচিত্রে থেমে গেছে মুহূর্ত
কিন্তু তার নীরবতা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে
অসংখ্য অনুচ্চারিত আর্তনাদের প্রতিধ্বনি।

সেই ছবির দিকে তাকালে আজও মনে হয়
সময় বুঝি হঠাৎ থেমে গেছে
মানুষের সমস্ত যুক্তি, সমস্ত অহংকার
একটি নিথর মুখের সামনে অসহায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কে ছিলেন তিনি? কোথায় ছিল তাঁর ঘর?
কোন নামে তাঁকে ডাকত তাঁর মা?
কোন স্বপ্ন নিয়ে তিনি বেরিয়েছিলেন সেদিন?
ছবিটি উত্তর দেয় না;
শুধু আমাদের বিবেকের দরজায়
বারবার কড়া নাড়ে এক অমোঘ প্রশ্ন
তোমরা কি সত্যিই মানুষ হতে পেরেছ?

সেই ছবিগুলোকে তাই শুধু দেখা নয়
দেখার ভেতর দিয়ে অনুভব করতে হয়
শুধু সংরক্ষণ নয়, সত্যের সঙ্গে রাখতে হয়
কোন আলোকচিত্রী, কোন তারিখ, কোন স্থান
প্রতিটি পরিচয় ইতিহাসের কাছে অমূল্য,
প্রতিটি নির্ভুল তথ্য শহীদের প্রতি সম্মান।

ছবির পাশে লিখতে হবে সত্য
স্মৃতির পাশে রাখতে হবে প্রমাণ
আবেগের পাশে জাগিয়ে রাখতে হবে বিবেক
যাবেনা ধ্বংস করা মুক্তিযুদ্ধা যাদুঘর।

এর পাশে স্থান হতে পারেনা অন্য কিছুর
কারণ মিথ্যা একদিন সত্যের পোশাক পরে
ইতিহাসের দরজায় এসে দাঁড়াতে পারে
বিস্মৃতি একদিন অপরাধীর পক্ষে
সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে।

তাই দলিল বাঁচাও, সাক্ষ্য বাঁচাও
বাঁচিয়ে রাখো প্রত্যক্ষদর্শীর কণ্ঠস্বর
যত দিন মানুষ প্রশ্ন করতে জানবে
তত দিন অপশক্তির সঙ্গে লড়বে ইতিহাস।

জেনে রাখ একাত্তর শুধু কান্নার নাম নয়
শুধু পুড়ে যাওয়া ঘর কিংবা রক্তাক্ত পথ নয়
একাত্তর প্রতিরোধেরও নাম
একাত্তর মানুষের মাথা নত না করার শপথ।

যে তরুণ একদিন বই হাতে স্বপ্ন দেখত
সে তুলে নিয়েছিল অস্ত্র
যে কৃষক লাঙল ধরত ভোরের আলোয়
সে হয়ে উঠেছিল মুক্তিযোদ্ধার সহযোদ্ধা।

যে মা সন্তানকে যুদ্ধের পথে বিদায় দিয়েছেন
তিনি বুকের ভেতর লুকিয়েছেন অশ্রুর সমুদ্র
যে মানুষ নিজের ঘর হারিয়েছেন
তিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য
নিজের শেষ আশ্রয়টুকুও উজাড় করেছেন।

বাংলার মাঠে, নদীর বাঁকে, সীমান্তের পথে
জেগে উঠেছিল অদম্য মুক্তির আকাঙ্ক্ষা
ভয় ছিল, তবু মানুষ এগিয়েছে
মৃত্যু ছিল, তবু মানুষ লড়েছে
অন্ধকার ছিল, তবু মানুষ বিশ্বাস করেছে
একটি স্বাধীন ভোর একদিন আসবেই।

ডিসেম্বরের আকাশে যখন বিজয়ের সূর্য উঠল
বাংলার বাতাসে উড়ল স্বাধীনতার পতাকা
সবুজের বুকে লাল সূর্য যেন বলল
এ রং কোনো অলংকার নয়
এ রং অগণিত প্রাণের শেষ অর্ঘ্য
এ রং মায়ের অশ্রু, বোনের দীর্ঘশ্বাস
এ রং মুক্তিযোদ্ধার রক্তে লেখা শপথ।
ছবি : বাংলাদেশের পতাকা

বাংলাদেশ জন্ম নিল পৃথিবীর মানচিত্রে
কিন্তু কত ঘরে জন্ম নিল না আর কোনো সকাল
কত মা পেলেন না তাঁর সন্তানকে
কত সন্তান পেল না পিতার ফিরে আসা
কত স্ত্রী রয়ে গেলেন অনন্ত অপেক্ষায়
কত নাম হারিয়ে গেল ইতিহাসের অন্ধকারে।

বিজয়ের আনন্দের গভীরেও তাই
একটি নীরব শোক চিরকাল জেগে থাকে
স্বাধীনতার প্রতিটি উৎসবের পাশে
শহীদদের স্মৃতি দাঁড়িয়ে থাকে মাথা উঁচু করে।

আজ নদীর জল আবার বয়ে চলে
আবার মাঠে দোলে ধানের সবুজ শীষ
আবার শিশুরা দৌড়ায় গ্রামের পথে
আবার সন্ধ্যার আকাশে জ্বলে নক্ষত্র।

বসন্ত ফিরে আসে, পাখিরা গান গায়
বর্ষায় ভরে ওঠে বাংলার খাল-বিল
নতুন প্রজন্মের চোখে জেগে ওঠে
আগামী পৃথিবীর অসংখ্য স্বপ্ন।

মাটির ক্ষত একদিন সবুজে ঢেকে যায়
নদীর জল একদিন স্বচ্ছ হয়ে ওঠে
ভাঙা বাড়ির জায়গায় নতুন ঘর গড়ে ওঠে
কিন্তু ইতিহাসের ক্ষত?
তার গভীরতা মাটির নিচে
তার দীর্ঘশ্বাস বাতাসের ভেতর
তার প্রশ্ন মানুষের বিবেকের কাছে
সেই ক্ষত কোনো ঋতুতে যায় না মুছে
কারণ স্মৃতি শুধু অতীতের দিকে তাকানো নয়
স্মৃতি ভবিষ্যতের প্রতি মানুষের অঙ্গীকার।

কিন্তু হায়, আজও কিছু কণ্ঠ প্রশ্ন তোলে
কিছু মানুষ তিন লাখের হিসাব কষে বলে
ত্রিশ লাখ নয়, এত প্রাণ যায়নি নাকি!
কোন যুক্তিতে তারা মুছতে চায়
রক্তে লেখা ইতিহাসের অক্ষর?

কোন স্বার্থের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে
তারা খাটো করতে চায় শহীদের আত্মদান?
কোন সাহসে বিস্মৃতির হাতে তুলে দেয়
একটি জাতির শোক, একটি জাতির সম্মান?

হে ইতিহাসের কারবারিরা, শোনো
সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে প্রমাণ নিয়ে এসো
দলিল খোলো, সাক্ষ্য দাও, অনুসন্ধানের পথে চলো
কিন্তু অনুমানের ধুলো উড়িয়ে
শহীদের রক্তকে কোরো না অবজ্ঞা
নিজের সুবিধামতো ইতিহাসের মাপজোখ করে
কোরো না আত্মত্যাগের অবমাননা।

ত্রিশ লাখ এ শুধু একটি সংখ্যা নয়
এ একটি জাতির স্মৃতিতে বহমান গভীর ক্ষত
ত্রিশ লক্ষ নিয়ে বিবেধ কেন!! একটি শহীদের রক্তকনা
লক্ষ কোটি তাজা প্রাণের চেয়েও ওজনে ভারী
কথাটি মনে রেখো হে ইতিহাস অবমাননাকারী।

ত্রিশ লাখ শহীদ অসংখ্য মায়ের বুকের শূন্যতা
এ পিতৃহারা সন্তানের অনন্ত প্রতীক্ষা
এ স্বজনের মুখ খুঁজে ফেরা মানুষের কান্না
এ নামহীন কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা
একটি দেশের নীরব, দীর্ঘশ্বাসময় ইতিহাস।

তিন লাখ বললেই কি মুছে যাবে
নদীর তীরে পড়ে থাকা সেই নিথর দেহ?
কোনো হিসাবের খাতায় সংখ্যা কমালে
ফিরে আসবে কি হারিয়ে যাওয়া সন্তান?
কোনো বক্তব্যের জোরে কি মুছে যাবে
বধ্যভূমির মাটি, গণহত্যার সাক্ষ্য?

ছবিসুত্র - https://www.dhakatimes24.com/2017/03/26/25826 /রাজশাহীর-গণকবরগুলো-বেদখল

রাজশাহীর গগনবাড়িয়া গ্রামের গণকবর
বিস্তৃত যা সেখানের ব্যাপক এলাকাজুড়ে
সংবাদ ভাষ্যমতে রমজানের প্রথম সপ্তাহের
এক অন্ধকার রাতে সেখানে প্রায় ৫০০ অধিবাসীকে
ধরে এনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে
হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী।
তথ্যসূত্র: Click This Link
https://www.prothomalo.com/bangladesh/ মুক্তিযুদ্ধে-রাজশাহীর-গণহত্যা-ও-বধ্যভূমি
যে মা সন্তান হারিয়েছেন চিরদিনের তরে
তাঁর শূন্য কোলে কি ফিরবে হারানো জীবন?
যে বোন ভাইয়ের পথ চেয়ে আজও কাঁদেন
তাঁর চোখের জল কি থামবে সংখ্যার তর্কে?

না, ইতিহাস এত সহজে বিকিয়ে যায় না
শহীদের রক্ত কোনো দর-কষাকষির বস্তু নয়
যে প্রাণ একবার স্বাধীনতার জন্য নিভেছে
তার মর্যাদা কোনো হিসাবের খেলায়
খর্ব হতে পারে না, হওয়া উচিত নয়।

প্রতিটি মৃত্যুর স্বিকৃতি পাওয়ার অধিকার আছে
প্রতিটি শহীদের স্মৃতি সংরক্ষণের দাবি আছে
প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায় আছে
কিন্তু সেই অনুসন্ধান হোক সত্যের জন্য,
ইতিহাসকে ছোট করার ছলনার জন্য নয়।

পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে, অর্ধশতাব্দীরও অধিক কাল
যখন নতুন প্রজন্ম জানতে চায়
কী মূল্যে পেয়েছিল তারা স্বাধীনতার সকাল
তখন তাদের হাতে তুলে দাও দলিল
শোনাও প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতি
দেখাও বধ্যভূমি, সংরক্ষণ করো আলোকচিত্র
তাদের সামনে ইতিহাসকে করো উন্মুক্ত
প্রমাণের আলোয় সত্যকে করো আরও দীপ্ত।

কিন্তু তাদের মনে সংশয়ের বিষ ঢেলে
শহীদের আত্মদানকে কোরো না তুচ্ছ
নিজের স্বার্থের কাছে বিকিয়ে দিয়ো না
একটি জাতির অশ্রুসিক্ত উত্তরাধিকার।

যদি সত্যিই প্রশ্ন থাকে, প্রশ্ন করো
প্রমাণের কাছে, ইতিহাসের কাছে
যদি নতুন তথ্য পাও, তুলে ধরো
যাচাই করো, বিচার করো, প্রকাশ করো
কিন্তু সত্য অনুসন্ধানের নামে
মনগড়া সংখ্যা ছুড়ে দিয়ে
একটি জাতির বেদনাকে কোরো না অপমান।

মতভেদ থাকতে পারে, গবেষণা চলতে পারে
ইতিহাসের পরিসংখ্যান নতুন আলোয়
পরীক্ষিত হতে পারে বারবার
কিন্তু শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা
থাকুক সকল বিতর্কের ঊর্ধ্বে
মানবিক মর্যাদা থাকুক অক্ষুণ্ণ।

হে বাংলার মানুষ, মনে রেখো
স্বাধীনতার ইতিহাস কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়
কোনো দলের একার উত্তরাধিকার নয়
কোনো সুবিধাবাদী মহলের ইচ্ছাধীন নয়।

এ ইতিহাস জনতার, এ ইতিহাস শহীদের
এ ইতিহাস মায়ের অশ্রুতে লেখা
মুক্তিযোদ্ধার রক্তে লেখা
নির্যাতিত মানুষের দীর্ঘশ্বাসে লেখা
একটি স্বাধীন দেশের জন্মবেদনার দলিল।

যারা সত্যের সন্ধানে প্রশ্ন তোলে
তাদের জন্য খুলে থাকুক গবেষণার দ্বার
কিন্তু যারা স্বার্থের তাগিদে প্রমাণহীন দাবি ছড়ায়
তাদের সামনে উঠুক যুক্তির দৃঢ় প্রাচীর।

প্রতিবাদ হোক নির্ভীক, কণ্ঠ হোক উচ্চকিত
কলম হোক সত্যের পক্ষে অবিচল
আমরা ইতিহাসের কাছে মাথা নত করব
কিন্তু ইতিহাসের অবমাননার কাছে নয়।

ত্রিশ লাখ শহীদের স্মৃতি
বাংলাদেশের হৃদয়ে জেগে থাকা অঙ্গীকার
তাঁদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষার শপথ
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান থাকুক।

সংখ্যার বিতর্কে নয়, সত্যের অনুসন্ধানে
বিদ্বেষের অন্ধকারে নয়, প্রমাণের আলোয়
অবজ্ঞার ভাষায় নয়, শ্রদ্ধার উচ্চারণে
আমরা তুলে ধরব মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।

হে শহীদ, তোমাদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না
তোমাদের নাম বিস্মৃতির অতলে হারাতে দেব না
যত দিন বাংলার আকাশে উড়বে লাল-সবুজ পতাকা
যত দিন পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বহমান
তত দিন সত্যের পক্ষে জেগে থাকবে কণ্ঠ
ইতিহাসের মর্যাদা রক্ষায় জাগবে বিবেক।

ত্রিশ লাখ এ কেবল উচ্চারিত একটি সংখ্যা নয়
এ আমাদের জাতীয় স্মৃতির গভীরতম অঙ্গীকার
এর ঐতিহাসিক সত্য ও প্রেক্ষাপট
সংরক্ষিত হোক প্রমাণ, গবেষণা ও সাক্ষ্যে।

শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা হোক চিরন্তন
গণহত্যার সত্য হোক অম্লান
ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হোক দৃঢ়
আর মানবতার বিজয় হোক চিরকাল।

তাই হে নতুন প্রজন্ম, শোনো
তোমাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে
একটি স্বাধীন দেশের উত্তরাধিকার
তার সঙ্গে তুলে দেওয়া হয়েছে
একটি রক্তাক্ত ইতিহাসের দায়িত্ব।

শুধু পতাকা ওড়ালেই দেশকে ভালোবাসা হয় না
শুধু বিজয়ের গান গাইলেই শহীদের ঋণ শোধ হয় না
সত্যকে সত্য বলা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো
মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা
নির্যাতিতের পাশে নিজের বিবেককে দাঁড় করানো
এসবের মধ্যেই স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ।

যে ইতিহাসে মানুষ নিহত হয়েছে
সেই ইতিহাসকে কখনো ঘৃণার ব্যবসায় কোরো না পরিনত
তাকে রাখো ন্যায়বিচারের আলোকবর্তিকা করে
যাতে ভবিষ্যতের কোনো শিশু
কোনো জাতির পরিচয়ের কারণে
কোনোদিন মৃত্যুর মুখোমুখি না হয়।

শহীদদের স্মরণ মানে কেবল অতীতের শোক নয়
শহীদদের স্মরণ মানে জীবনের প্রতি অঙ্গীকার
গণহত্যার স্মৃতি মানে প্রতিশোধের আগুন নয়
মানবতার পক্ষে অবিচল দাঁড়ানোর সাহস।

পৃথিবীর যে প্রান্তেই নিরপরাধ মানুষের রক্ত ঝরে
যে জনপদেই শিশুর ঘুম ভেঙে যায় বিস্ফোরণে
যে মায়ের কোলেই সন্তান চিরতরে হারিয়ে যায়
একাত্তরের স্মৃতি সেখানে আমাদের শেখায়
নীরবতা কখনো নির্দোষ থাকে না
বিবেককে বাঁচাতে হলে সত্য উচ্চারণ করতে হয়।

তাইতো চারিধারে ইতিহাস নিয়ে কাটাচিরার দৃশ্য দেখে
নিরব বুজি আর গেলোনা থাকা, মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ সাক্ষি
এই বৃদ্ধের আঙ্গুল যেন উঠল আবার একটুখানি কাপি,
কারণ মানুষের জীবনই সর্বোচ্চ মূল্য
মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকাই মানুষের সভ্যতার ভিত্তি
মানবতার চেয়ে বড় কোনো বিজয় নেই আজ অবধি।

হে বাংলার মাটি, তোমার কাছে আমাদের সালাম
তোমার বুকে শুয়ে আছেন অগণিত নামহীন শহীদ
হে বাংলার নদী, তোমার ঢেউয়ে রয়ে যাক
তাঁদের স্মৃতির প্রতি আমাদের চিরকৃতজ্ঞতা।

হে বাতাস, বহন করে নিয়ে যাও
মুক্তির সেই অমর শপথ এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে
হে আকাশ, তোমার নীলিমায় লিখে রেখো
একটি জাতির আত্মত্যাগের অবিনশ্বর কাহিনি।

যাঁরা আর ফিরে আসেননি
তাঁদের অনুপস্থিতিতেই আমরা স্বাধীনতার অর্থ বুঝি
যাঁদের নাম আমরা জানি না
তাঁদের ঋণেই আমাদের পরিচয় সম্পূর্ণ হোক।

তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা কোনো দিনের নয়
কোনো অনুষ্ঠানের নয়, কোনো ক্ষণিক উচ্চারণের নয়
তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা আমাদের প্রতিদিনের দায়
আমাদের সত্যের প্রতি আনুগত্য
আমাদের স্বাধীনতার সবচেয়ে পবিত্র শপথ।

একাত্তর, তুমি কেবল একটি সাল নও
তুমি আমাদের আত্মার গভীরে খোদাই করা ইতিহাস
তুমি রক্তের ভেতর জেগে থাকা স্বাধীনতার নাম
তুমি অশ্রুর ভেতর দীপ্ত হয়ে থাকা সাহস
তুমি ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে উঠে দাঁড়ানো বাংলাদেশ।

তোমার ক্ষত আমাদের স্মরণ করাবে
মানুষের নিষ্ঠুরতার সীমাহীন অন্ধকার
তোমার বিজয় আমাদের শেখাবে
মানুষের প্রতিরোধের অনির্বাণ আলো।

যত দিন পদ্মা, মেঘনা, যমুনা বয়ে যাবে
যত দিন বাংলার মাঠে ধান দুলবে বাতাসে
যত দিন কোনো শিশু মায়ের মুখে শুনবে
স্বাধীনতার প্রথম গৌরবময় ইতিহাস
তত দিন শহীদদের আত্মত্যাগ
আমাদের হৃদয়ে জাগিয়ে রাখবে শপথ।

সত্যকে ভুলব না, ইতিহাসকে বিকৃত হতে দেব না
মানবতাকে পরাজিত হতে দেব না
কোনো গণহত্যাকে নীরব বিস্মৃতির অন্ধকারে
হারিয়ে যেতে দেব না কখনো।

নদীর জল একদিন স্বচ্ছ হয়
মাটির ক্ষত একদিন সবুজে ঢেকে যায়
কালের প্রবাহে বদলে যায় জনপদের চেহারা
তবু রক্তের স্মৃতি থেকে যায় মাটির গভীরে
তবু শহীদের নামহীন আহ্বান
প্রতিধ্বনিত হয় বাংলার আকাশে-বাতাসে।

সেই আহ্বান শুনে আমরা মাথা নত করি
শ্রদ্ধায়, বেদনায়, কৃতজ্ঞতায়
তারপর মাথা তুলে দাঁড়াই
কারণ এই দেশ কেবল উত্তরাধিকার নয়
এই দেশ একটি অঙ্গীকার
এই দেশ মানুষের মুক্তি ও মর্যাদার প্রতিশ্রুতি।

হে একাত্তরের শহীদ, তোমাদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলী
তোমাদের রক্তে অর্জিত স্বাধীনতা
চিরকাল থাকুক অমলিন, অম্লান
তোমাদের স্মৃতি হয়ে থাকুক আমাদের বিবেক
তোমাদের আত্মত্যাগ হয়ে থাকুক আমাদের পথের আলো।

বাংলার মাটিতে আর কখনো
গণহত্যার অন্ধকার ফিরে না আসুক
পৃথিবীর কোনো জনপদে আর কখনো
নিরীহ মানুষের রক্তে লেখা না হোক স্বাধীনতার ইতিহাস।

মানুষ বাঁচুক
মানবতা জয়ী হোক
সত্য অমর হোক
স্বাধীন বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.