| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
আমার_বর্ণমালা
আমি বুয়েট, বাংলাদেশ থেকে পাশ। বর্তমানে মাইক্রোসফটে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে আছি। আমি বেশ কিছুদিন ধরে টুক টাক লেখা লেখি করি। আমি রম্য লিখতে পছন্দ করি।
সময় ১৯৭১। বিশ্বের মানচিত্রে ছোট্ট একটি দেশ পাকিস্তান। সেখানে জেগে উঠেছে এক পাশবিক উন্মত্ততা। বাইরের পৃথিবীর অনেকেই এর নাম দিল গৃহযুদ্ধ। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান অধিবাসী বাঙ্গালীর কাছে তা অস্তিত্বের লড়াই। ২৫ শে মার্চ কালো রাতে পশ্চিমা মিলিটারি ঝাঁপিয়ে পড়লো নিরীহ বাঙ্গালীর ওপর। তাদের প্রথম টার্গেট ছাত্র আর বুদ্ধিজীবী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের সমস্ত ছাত্রদের এক লাইনে দাড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে মেরে ফেলা হয়। উদ্দেশ্য প্রতিবাদী বাঙ্গালীর মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেয়া। এই গল্পের নায়ক স্থানীয় সরকারী কলেজের শিক্ষক। এই ভদ্রলোক নানা কারণে মফস্বলের স্থানীয় বুদ্ধিজীবী তালিকায় প্রথম সারিতে। এলাকার সবাই তাঁকে এক নামে চেনে। কাজেই টপ টার্গেট। বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি রাজনৈতিক হাওয়া পাল্টা হাওয়ার দিকে সতর্ক নজর রাখছিলেন। সামনে মহা বিপদ অনুমান করে ২৪ শে মার্চ দুটো ছোট ছেলে, সন্তান সম্ভবা স্ত্রী, ছোট ছোট কয়েকটি ভাই, তিন বোন আর মা কে নিয়ে শহর ছেড়ে তিনি আশ্রয় নিলেন গ্রামে। পেছনে পরে রইল এতদিনের আশ্রয় আর সঞ্চয়। আর ঠিক পরের দিন হানাদার বাহিনী স্থানীয় রাজাকার সহায়তায় শহরটিতে চালায় পাশবিক নিধন যজ্ঞ। মাত্র একদিনের জন্যে বেঁচে গেল পরিবারটি।
এর পরের কয়েক মাস প্রতি মুহূর্তে মৃত্যু কে পাশ কাটিয়ে যাওয়া এক পরিবারের অনিশ্চয়তায় চলা। কখনো চেনা কখনো অচেনা মানুষের বাসায় আশ্রয় নিতে হয় অজানা আশংকায়। কখনো পরিচিত জনের অদ্ভুত আচরণ, আবার কখনো সম্পূর্ণ অপরিচিতের অপূর্ব আতিথেয়তা। হিসেব বিজ্ঞানের এই শিক্ষককে প্রতিদিন হিসেব কষতে হয় কি ভাবে পুরো পরিবারকে রক্ষা করবে। বয়স্কা মা। সুন্দরী স্ত্রী অনাগত সন্তানকে বয়ে নিয়ে চলেছেন, দুই পা ফুলে ঢোল হয়ে গেছে। ছোট বড় সকলের পকেটে সামান্য কিছু টাকা আর কয়েকটি ঠিকানা রেখে দেয়া হয়েছে। অবস্থা বিশেষে কেউ আলাদা হয়ে পড়লে কাজে লাগতে পারে। ছোট ছেলেটাকে কোলে করে সেই অনন্তকাল ধরে অনাদিকালের দিকে যাওয়া। ছেলেটি এমনিতে শান্ত, কিন্তু বয়সের তুলনায় একটু বেশীই নাদুস নুদুস। ফলে কেউ কোলে নিতে চায় না। কাজেই পুরোটা সময় অগত্যা বেচারা শিক্ষক ডানে বাঁয়ে করে টেনে চলেছেন। দু হাতে পিতৃত্বের সুপারি। অন্য এক কোটি উদ্বাস্তুর মতোই এরাও ধীরে ধীরে এগোতে থাকে ভারতীয় সীমান্তের দিকে।
অবশেষে বুঝি সব যন্ত্রণার শেষ হয়। ওই তো দেখা যায় বর্ডার। শিক্ষক পরিবারটি চলেছেন একটা ছোট খাটো দলের সাথে। এ রকম একটি দলের সাথে ভিড়ে যাওয়ার সুবিধে হোল, আশেপাশে সুবিধাবাদী মানুষ থাকলেও সহজে ঘাটাতে যাবে না। সামনে একটা ধুলোর রাস্তা দেখা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর পর পাকিস্তানী জিপ এখানে টহল দেয়। খবর ঠিক থাকলে প্রতি ২০ মিনিট পরে পরে এই টহল। একটা জিপ চলে গেলে ওর মিলিয়ে যাবার আগেই দিতে হবে দৌড়। যতটা পারা যায় নীরবে নিঃশব্দে বিড়ালের মতো। সময়ের একটু এদিক ওদিক হলেই পুরো দলকে দিতে হবে চরম মূল্য। দু দিন আগেই একটা পুরো দল ব্রাশ ফায়ারে এখানে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বাচ্চা গুলোকে খুব ভালো করে বোঝানো হোল। বয়স্কদের ঝুরিতে করে তুলে নেয়া হয় মাথায়। প্রস্তুত পুরো দল। শুধু ধিক্ ধিক্ শব্দ বুকে, পারলে সেটাকেও ওরা বন্ধ করে রাখে। আর ঠিক এ সময় ছোট ছেলের চিৎকার। সহসা এই শব্দে অজানা আশংকায় পুরো দল শিউরে ওঠে। অসহায় শিক্ষক আর তাঁর স্ত্রী সহস্র চেষ্টা করে সে শব্দ থামাতে। বিধি বাম। যে ছেলে এতটা পথ ছিল শান্ত সে যেন আজ পণ করেছে থামবে না। চারপাশের ভয়ার্ত বিরক্ত চোখ যেন গিলে খাবে ওদেরকে।
-ফেলে দিন মশাই। এর জন্য আমরা কি সকলে জীবন দেব? একে নিয়ে পাড় হতে গেলে আমরা সবাই ধরা পড়বো।
ছেলেকে আরো সজোরে বুকে চেপে ধরলেন শিক্ষক। তার পরে কোন দিকে না তাকিয়ে শুরু করেন তাঁর দৌড়। হিসাব বিজ্ঞানের শিক্ষক এখন কোন হিসেবের তোয়াক্কা করেন না। পিছে ফেলে রেখে চলেন যত হিসেব, যত সঞ্চয়, যত অর্জন। নিয়তি এই চরম পরীক্ষার পরে তাঁদেরকে সাদরে বরণ করে নেন ভারতীয় সীমান্তে। পাঁচকোটি মানুষের জনপদ পশ্চিম বাংলা কাছে টেনে নেয় তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান মানে আজকের বাংলাদেশ থেকে আগত এক কোটি উদ্বাস্তুকে। বাঙ্গালীর প্রতি বাঙ্গালীর এই সহানুভূতি -আঞ্চলিকতা আর ধর্মীয় বৈষম্যের অনেক ওপরে স্থান করে নেয়।
*****
সে সময়ের নাদুস নুদুস সেই ছেলেটি আমি যাকে বুকে জড়িয়ে আমার প্রিয় বন্ধু শিক্ষক বাবা তাঁর জীবনকে বাজি রেখেছিলেন।
©somewhere in net ltd.