নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

পথের শেষে পথের দেখা

পথের শেষে পথের দেখা › বিস্তারিত পোস্টঃ

কারবালার ঘটনায় ইমাম হুসাইনের বিরুদ্ধে সালাফী-আহলে হাদিছদের যত অপপ্রচার-

১২ ই জুলাই, ২০২৪ রাত ১০:২৩

কারবালার হৃদয় বিদারক ঘটনার পর হুসাইনের শক্রুরাই ক্ষমতায় স্থায়ী হলো। ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেলো। চেপে বসলো রাজতন্ত্র। আর ক্ষমতাশীনদের পদলেহনকারী দরবারীরা জনগণের ক্ষোভকে দমন করার জন্যে নানা কৌশলে মেতে উঠলো। রাজতন্ত্রকে সমর্থনকারী এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পাদনকারী দলটি সদা প্রস্তুত রইল। এই দলের নাম ছিল নাসিবী। এরা হুসাইনের বিরুদ্ধে নানাভাবে মুসলমানদের বিভ্রান্ত করে আসছিলো। শিয়াদের ঠিক বিপরীত অবস্থানে ছিল নাসিবীরা। শিয়ারা হযরত মুয়াবিয়া এবং ইয়াজিদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতো। নাসিবীরা করতো আলী এবং হুসাইনের বিরুদ্ধে। সেই সময় ক্ষমতাশীন রাজতন্ত্র ও তাদের সহযোগী নাসিবীদের যে কি প্রভাব ছিল একটি ঘটনাই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের কিতাবাদি হযরত আয়শা, আবু হুরায়রা, আবদুল্রাহ ইবনে উমর-এর রেওয়ায়েত দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে থাকলেও হযরত আলী, ফাতেমা, হাসান, হুসাইন-এদের রেওয়ায়েত এই কিতাবাদিতে স্থান পায়নি বললেই চলে। আলী, হাসান, হুসাইন এরা সবাই রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় নাসিবীরা এদের উপর ক্ষিপ্ত হয়েছিল। যদিও তাদের মাত্র অল্প কিছু রেওয়ায়েত নেয়া হয়েছে নিরপেক্ষতা খাতিরে।
কাববালায় হুসাইনকে হত্যার পর যে রাজতন্ত্র ইসলামী জাহানে চেপে বসেছিল সেটা থেকে মুসলমানেরা এখনো মুক্ত হতে পারেনি। নাসিবীরা যুগে যুগে ছিল এখনো আছে। তবে তাদের নাম ও কিছু আকিদা বিশ্বাস পরিবর্তিত হয়ে এখন হয়েছে ‘সালাফী’। এদের আরেকটি উপশাখা হলো, আহলে হাদিছ। এরা আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের ছায়াতলে থেকে রাজতন্ত্রের অনুকুলে সবকিছুকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষন করে। ইবনে তাইমিয়ার মত একজন আলেমও সালাফীদের পক্ষ নিয়েছিলেন। সালাফী-একটা মতবাদ, একটা দল। যদিও একসময় এটাকে একটা মানহাজ বা কর্মনীতি বলে ঘোষনা দেয়া হয়েছিল। শিয়াদের বিরুদ্ধাচারণ ও রাজতন্ত্রকে ইসলামী বলে প্রচারণা চালানোই সালাফীদের প্রধান লক্ষ্য। এরা ইয়াজীদকে ‘রাহিমাহুল্লাহ’ বলে সম্ভোধন করেন, ইয়াজিদের জন্যে সময়ে অসময়ে দোয়া করেন এবং ইয়াজীদের পক্ষে নানা যুক্তি তুলে ধরেন। ইয়াজিদ বিরোধী সকল কর্মকান্ডকে শীয়া-রাফিজীদের কাজ বলে গন্য করেন। এরা কারবালার যুদ্ধকে নিছক একটা ‘রাজনৈতিক বিরোধের জের’ মনে করেন। তবে শীয়ারা ১০ই মহররমে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে যে রাজনৈতিক মিছিল বের করে তাকে ‘ধর্মীয় কর্মকান্ড’ আখ্যা দিয়ে শিরক-বিদআতের জিগির তুলে তৃপ্তি লাভ করেন। সালাফী মতবাদকে রাজতন্ত্রের অনুকুলে লালিত পালিত একটা ‘সুবিধাবাদী ইসলামী’ মতবাদ আখ্যা দেন অনেকে। এরা সবসময়ই রাজ আনুকুল্য পেয়ে এসেছেন। রাজতন্ত্রের অনুকুলে না গেলে কোন ইসলামী ব্যাখ্যাই এরা মেনে নেন না। এই মতবাদে বিশ্বাসী অনেক আলেম ও মুফতি রয়েছেন, যারা সবকিছুকেই রাজতন্ত্রের অনুকুলে তাদের ইসলামী ব্যাখ্যা পেশ করেন। রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখার প্রধান শক্তি ‘বিভাজন’-কে এরা যারপরনাই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। মুসলিম আকিদায় বিশ্বাসীদের মাঝে শীয়া, সুন্নী ইত্যাদি বিভাজন করে রাখতে এরা অগ্রনী ভূমিকা পালন করে আসছেন। বিশেষ করে, আমাদের দেশে সৌদি থেকে পাশ করা ঘোমটা দেয়া মোল্লারাই এ বিষয়ে বেশী সোচ্চার।
ইমাম হুসাইন জান্নাতবাসীদের সর্দার হবেন-এমন হাদীস থাকার কারনে সালাফী-আহলে হাদিছরা তার বিরুদ্ধে শক্তহাতে লড়তে সাহস পান না। এরপরও তারা ইনিয়ে বিনিয়ে ইমাম হুসাইনের বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ পেশ করে থাকেন আমরা এখনো তার কিছুটা বর্ণনা করবো।

ইমাম হুসাইনের বিরুদ্ধে সালাফীদের নানা কুযুক্তি ও অপপ্রচার:
তাদের ১নং অপপ্রচার হলো-
হযরত মুয়াবিয়ার পর হুসাইন ক্ষমতার দাবিদার ছিলেন বিধায় তিনি কুফাবাসীর প্ররোচনায় যুদ্ধে যেতে উদ্ভুদ্ধ হয়েছিলেন। অনেক সাহাবী তাকে কুফায় যেতে নিষেধ করেছিলেন।
প্রকৃত সত্য:
হুসাইন মোটেই ক্ষমতার লোভে বের হননি। ইসলামী খেলাফত ব্যবস্থার দিক পরিবর্তন লক্ষ্য করেই তিনি জীবন দিতেও কুন্ঠিত ছিলেন না। [বিস্তারিত জানার জন্যে পড়ুন, মুহররমের শিক্ষা, সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী] আর বিশিষ্ট সাহাবীরা তাকে বের হতে নিষেধ করেছিলেন, কুফাবাসীদের বিশ্বাসঘাতকতা সম্পর্কে আঁচ করতে পেরেই। অন্য কারনে নয়। তিনি ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থার পরিবর্তে রাজতন্ত্র দেখেই ক্ষুদ্ধ হয়েছিলেন। এছাড়া তার হাতে কুফাবাসীরা বাইয়াত করবে বলে অঙ্গীকার করেছিলেন এবং ইয়াজীদী শাসন ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থার ব্যত্যয় বিধায় তিনি কুফাবাসীর বাইয়াত গ্রহনের মনস্থ করেই বেরিয়েছিলেন। ঐ সময়ে মুসলিম উম্মাহ ইয়াজীদকে মেনে নেননি। ইয়াজীদের পিছনে মুসলিম জাতী ঐক্যবদ্ধ ছিল না। সিরিয়াবাসীকে বাদ দিলে পুরা জাতিই ছিল ইয়াজীদের বিরুদ্ধে। কাজেই হুসাইন ইসলামের স্বার্থেই পরিবার পরিজন নিয়ে বেরিয়েছিলেন। তিনি যুদ্ধ করবেন এমন প্রস্তুতি নিয়ে বের হননি। তেমনটা হলে নিজ পরিবার-পরিজন ও নারী শিশুদের নিয়ে বের হতেন না। তবে জালিমরা তাকে যুদ্ধ করতে বাধ্য করেছে এবং তিনি মজলুম অবস্থায় শহীদ হয়েছেন।
তাদের ২নং অপপ্রচার হলো-
হযরত উসমান এবং আলীকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। তারা সবাই হুসাইনের চেয়ে বেশী মর্যাদাশীল ছিলেন। কিন্তু মুসলমানেরা কেবল হুসাইনের মৃত্যুকেই শোকবহ মনে করে।
প্রকৃত সত্য:
ইসলামের ইতিহাসে অনেক নবী রসুলসহ খলিফা হযরত উসমান, হযরত আলীসহ হুসাইনের চাইতেও বেশী মর্যাদাপূর্ণ আরো অনেক বড় বড় মহান ব্যক্তির হত্যাকান্ডের ঘটনা থাকলেও ৬১ হিজরীর কারবালার ঘটনা এতোটাই পৈচাশিক ও নির্মমতম ছিল যে এটা যুগে যুগে কঠিন হৃদয়কেও নাড়া দিয়েছে, এখনো দেয় এবং নিঃসন্দেহ তা কেয়ামত পর্যন্ত জালিমদের বিরুদ্ধে ধিক্কার জানাতে ও ইসলামী খেলাফতের পক্ষে মুমীনদের উদ্ভূদ্ধ করায় নিয়ামক ভূমিকা পালন করবে। ১৪০০ বছর পেরিয়ে গেলেও মানুষ এখনো শোকার্ত হয়। সাম্প্রতিককালের আমাদের দেশে ঘটে যাওয়া রাজন হত্যার কথাই ধরুন, প্রতিদিনই অনেক শিশুকে হত্যা করা হচ্ছে। কিন্তু রাজন হত্যায় যে নৃশংসতা হয়েছে, তা কঠিনহৃদয়কেও নাড়া দিয়েছে। হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে সরকারকে বাধ্য করেছে।
তাদের ৩নং অপপ্রচার হলো-
হিজরত ও জিহাদ ও বিপদে ধৈর্য্য ধারন তাদের (হাসান ও হুসাইন) ভাগ্যে জোটেনি, যা আহলে বাইতের অন্যান্যের নসীব হয়েছিল। [আশুরা ও কারবালা, আবু আহমাদ সাইফুদ্দীন বেলাল, পৃষ্ঠা-৪০]
প্রকৃত সত্য:
হুসাইনের জীবনী এবং ইতিহাস পাঠ করলে এটা সুষ্পষ্ট যে, হিজরত, জিহাদ এবং বিপদে ধৈর্য্য ধরন সবকিছুই তার ভাগ্যে জুটেছে। হিজরত এবং জিহাদ করেই তো তিনি জীবন দিলেন। ইতিপূর্বে কোন মুসলমান তো দুরের কথা, অমুসলিমরাও হুসাইনের বিরুদ্ধে এ ধরনের অপবাদ দেয়নি। নব্য সালাফী এইসর কুলাঙ্গার অত্যন্ত কৌশলে ইদানীংকালে এ হীন কাজটি করে চলেছেন।
তাদের ৪নং অপপ্রচার হলো-
হুসাইনকে যারা সমর্থন করেন, তার জন্যে শোক প্রকাশ করেন, তারা শিরক বিদআতে লিপ্ত।
প্রকৃত সত্য:
কারবালার ঘটনাকে ঘিরে শিয়া নামধারী কতিপয় গোষ্টির কিছু শিরকী কর্মকান্ড বিদ্যমান আছে-একথা সত্য। কিন্তু সে সবকে উপাদান ধরে পুরো ইতিহাস পাল্টিয়ে দেয়ার ধুরন্ধর অপচেষ্টা রাজতন্ত্রের দরবারী আলেমরা হরহামেশাই করে যাচ্ছেন। রাজতন্ত্রীরা যতই চেষ্টা করুন, কেয়ামত পর্যন্ত মুসলমানেরা কারবালার নৃশংসতাকে ঘৃনা করেই যাবে। ঘৃনা হুসাইনের হত্যাকারীর প্রতি, ঘৃনা রাজতন্ত্রের প্রতি। মুসলমানের বুক পূর্ন থাকবে আহলে বাইতের প্রতি এবং তাদের আদর্শের প্রতি। তবে শিয়াদের কর্মকান্ডের সাথে মুসলমানদের গুলিয়ে ফেললে চলবে না। শিয়ারা যতটা না ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করে, তার চেয়ে বেশী করে রাজনৈতিক কর্মকান্ড। কেউ হুসাইনকে সমর্থন করলেই শিয়া হয়ে যায় না, শিয়াদের শিরক বিদআতের দায় মুসলমানদের ঘাড়ে চাপানো সালাফীদের আরেকটি ধুরন্ধর অপচেষ্টা মাত্র।
তাদের ৫নং অপপ্রচার হলো-
হুসাইন-কে ইমাম বলার কোন কারণ নেই। অন্য সাহাবীদের তো ইমাম বলা হয় না। এটা শিয়াদের দেথাদেখি মুসলমানেরা গ্রহন করেছেন।
প্রকৃত সত্য:
পুরো মুসলিম বিশ্ব এক কথায় তাকে ইমাম বা নেতা মেনে নিয়েছেন। ইয়াজীদ জনতার উপর চেপে বসেছিল। ইয়াজীদ মুসলিম বিশ্বের নির্বাচিত নেতা ছিল না। সেই সময় থেকে শুরু করে কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানেরা ইয়াজীদকে ইমাম বা নেতা হিসাবে মেনে নেননি, নেবেনও না। হুসাইনকে ইমাম বলার অর্থ ইয়াজীদকে নেতা হিসাবে স্বীকার না করা। ইমাম বা নেতা হুসাইনই। সে কারনে তখন থেকেই যুগে যুগে হুসাইন-এর নাম নেয়ার আগে 'ইমাম' বলা হয়। ইমাম হাসানকেও বিষ প্রয়োগে অত্যন্ত কৌশলে হত্যা করা হয়েছিল। তিনিও মুসলিম জাতির ইমাম। শিয়ারা তাদের (হাসান-হুসাইনকে) নেতা বললে মুসলমানেরা বলতে পারবে না তা কোন ধরনের যুক্তি?
ইমাম বললেই অতি সম্মান হয়ে যায় এটা কেমন কথা? হাদীস সংগ্রাহকদের ইমাম বলতে কিন্তু এরা পিছুপা হন না। যত আপত্তি হাসান এবং হুসাইনের বেলায়। ইয়াজীদের বংশধরদের যতই গা জ্বলুক, কেয়ামত পর্যন্ত মুসলমানেরা হাসান এবং হুসাইনকে ‘ইমাম’ হিসাবেই ঘোষনা দেবেন। আর অন্যদিকে নৃশংসতার প্রতীক ইয়াজীদের নামে আজ পর্যন্ত কোন মুসলমান সন্তানের নাম রাখা হয়নি, কেয়ামত পর্যন্ত হবেও না। যদিও মুসলিমনামধারী শীর্ষদেশ গুলোতে এজিদী শাসন এখনো বলবৎ রয়েছে।
আবু বকর, উমর, উসমান, মুয়াবিয়া নামগুলি শুনলে শিয়াদের যেমন এলার্জি হয়, তেমনি হুসাইন, হাসান, আলী, ফাতেমা, ইমাম, কারবালা এসব শুনলে সালাফীদের মাঝে এলার্জি পরিলক্ষিত হয়।
তাদের ৬নং অপপ্রচার হলো-
ইসলামের ইতিহাসে আশুরার দিনে অনেক খুশীর ঘটনা আছে বিধায় এদিন খুশীর এবং শুকরিয়ার রোজা রাখতে হয়। শোকের রোজা নয়। তিনদিনের বেশী শোক ইসলামে স্বীকৃত নয়।
প্রকৃত সত্য:
আশুরার দিনে দুনিয়াতে অনেক নাজাতের ঘটনা ঘটেছে। এইসব ঘটনার কারনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ে রোজা রাখার রেওয়াজ আগে থেকেই ছিল। ঘটনাচক্রে কারবালার মর্মদন্তু ঘটনাটিও এদিনই ঘটেছে। তাই বলে কোন মুসলমান শুকরিয়ার রোজাকে খুশীর রোজায় রুপান্তরিত করেন না। এটা আল্লাহর তরফ থেকে মুসলমানদের জন্যে একটা পরীক্ষাও বটে। মুসলমানেরা হুসাইনের জন্যে শোক প্রকাশ করেন, রোজা রাখেন এবং হুসাইনের পথ অনুসরনে ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠার শপথ নেন। কিন্তু নাসিবী তথা আজকের দিনের সালাফীরা শিয়াদের বিপরীত কর্ম তথা খুশী পালন করতে মানুষকে উদ্ভুদ্ধ করেন। তারা নাকি জালিমের পরাজয়ে হকের বিজয়ে শোকরের রোজা রাখেন। তারা কিসের সাথে কি মেলালো পাঠকগণ একটিবার খেয়াল করুন। সালাফী আলেমরা আশূরা নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা শুকরিয়া সংক্রান্তে ওয়াজ করলেও, হুসাইনের নামটি পর্যন্ত মুখে আনেন না। মুসলমানদের খুশীর দিন হলো দুই ঈদ। এই দুই ঈদে রোজা রাখা হারাম। আশুরার শুকরানা খুশীর দিন নয়। খুশীর দিন হলে রোজা রাখা হারাম হতো। বরং এটা একটা এবাদতের দিন। আর এদিনে ইমাম হুসাইন শহীদ হলেও এজিদ জয়ী হয়নি। বরং ইমাম হুসাইনেরই নৈতিক বিজয় অর্জিত হয়েছিল।
তাদের ৭নং অপপ্রচার হলো-
আজকের সালাফীরা ইমাম হুসাইনের কথা উঠলেই বলেন যে আমরা তার মুক্তির জন্যে দোয়া করি। তারা ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে চান ইমাম হুসাইন কারবালায় গিয়ে ভুল (বিদ্রোহ) করেছিলেন। তাই তার মুক্তির জন্যে দোয়া করি।
প্রকৃত সত্য: ইমাম হুসাইন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী এবং বেহেস্তবাসীগণের সর্দার।কোন মুসলমানের তাতে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নেই। তার ‘মুক্তির’ জন্যে যারা দোয়া করেন, এদের কুমতলব বুঝতে কোন মুসলমানের কষ্ট হওয়ার কথা নয়।জান্নাতের যুবকদের সর্দারের মুক্তির জন্যে কারা দোয়া করে?
তাদের ৮নং অপপ্রচার হলো-
কারবালার যুদ্ধ নিছকই একটি “পলিটিকাল ওয়ার”
প্রকৃত সত্য: ইমাম হুসাইনের শাহাদাত এবং কারবালার শিক্ষাকে ম্লান করে দেবার জন্যে সালাফীরা নানাভাবে প্রচার প্রগান্ডা চালায় যে, কারবালার যুদ্ধ একটি নিছকই পলিটিকাল ওয়ার তথা ক্ষমতার লড়াই। প্রকৃত সত্য তো এটাই যে, মুয়াবিয়া কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত রাজতান্ত্রিক সিস্টেম ইসলাম সম্মত পদ্ধতি নয়। খেলাফতই ইসলামের নীতি। আর সে খেলাফত প্রতিষ্ঠাই ছিল ইমাম হুসাইনের উদ্দেশ্য। তিনি ক্ষমতার লড়াই করতে যাননি। হক প্রতিষ্ঠার জন্যে বেরিয়েছিলেন। কারবালা কোনভাবেই পলিটিক্যাল ওয়ার ছিল না।

ইয়াজীদের পক্ষে যত প্রচারনা-
ইয়াজিদের পক্ষে তাদের ১নং যুক্তি:
ইয়াজীদ কারবালার হত্যাকান্ডে জড়িত ছিলেন না।
প্রকৃত সত্য:
আল বিদায়া ওয়ান নিহায়ার ৮মখন্ডে তার একটা উক্তি দেখা যায়। তাহলো-মৃত্যুকালে তিনি প্রার্থনা করছেন এই বলে যে, ‘‘হে আল্লাহ তুমি আমায় পাকড়াও করো না এইজন্যে যে যা আমি চাইনি এবং প্রতিরোধও করিনি। তুমি আমার ও ওবায়দুল্রাহ বিন জিয়াদের মধ্যে ফয়ছালা করো।’’ তার এই প্রার্থনায় তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন তিনি ঐ ঘটনার প্রতিরোধ করেননি। অথচ ইচ্ছা করলেই প্রতিরোধ করতে পারতেন। এই হত্যাকান্ডে তিনি নিজের চাইতেও ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদকে বেশী দায়ী করেছেন।
কিন্তু সত্যতো এটাই যে, এই হত্যাকান্ড তার অমতে হয়নি। হত্যাকারীকে তিনি কোন সাজাও দেননি, অপসারনও করেননি। প্রতিরোধও করেননি। ঘটনা ঘটতে দিয়েছেন এবং পৃথিবীর নৃশংসতম হত্যাকান্ডটি ঘটিয়ে ও হত্যাকারীর পক্ষাবলম্বন করেছেন। কোন শাস্তি দেননি। রাস্ট্রপ্রধান হিসাবে এ হত্যাকান্ডের দায়তারই। এক্ষেত্রে তাকে নিরাপরাধ প্রমাণ করার মত কোন কিছুই ইতিহাস ঘেটে পাওয়া যায় না।

ইয়াজিদের পক্ষে তাদের ২নং যুক্তি:
ইয়াজীদ হুসাইনের হত্যাকান্ডে ব্যথিত হয়েছিলেন এবং হুসাইনের কর্তিত মস্তক দেখে কেঁদে ফেলেছিলেন।
প্রকৃত সত্য:
ইয়াজীদ হুসাইনের শাহাদাতের সংবাদ পেয়ে প্রথমে খুশীই হয়েছিলেন। তারপর তিনি লজ্জিত হন। [দেখুন আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮মখন্ড, পৃষ্ঠা-৪২৩] একজন মুসলমানের হত্যাকান্ডে খুশী হলে সে লোক কি আর মুসলমান থাকে? অথচ সালাফীরা এর বিপরীত ইতিহাস বর্ণনা করে মানুষকে বিভ্রান্ত করে চলেছেন কেবল রাজতন্ত্রের তল্পীবাহক হওয়ার কারনে। ইয়াজিদের মর্যাদার সাথে রাজতন্ত্রের মর্যাদা জড়িত। ইয়াজিদ কর্তিত মস্তক দেখে কেঁদে ফেলেছিলেন এটা কেবল সালাফীদের নিজস্ব ইতিহাসে আছে। বাস্তবে নয়।
শিয়ারা যেমন কারবালা, আলী, হাসান এবং হুসাইনকে নিয়ে মিথ্যার পাহাড় গড়েছে। ঠিক তেমনি ইয়াজিদ এবং রাজতন্ত্রের শানে সালাফীরা মিথ্যার পাহাড় গড়েছে।
ইয়াজিদের পক্ষে তাদের ৩নং যুক্তি:
ইয়াজীদের ক্ষমা প্রাপ্তি সংক্রান্তে সহি হাদীস আছে।
প্রকৃত সত্য:
এটা সালাফীদের একটা জঘন্য মিথ্যাচার। সূদীর্ঘ কাল ধরে তারা মানুষকে এটা দ্বারা বোকা বানিয়ে এসেছে। সত্যটা লক্ষ্য করুন।
সহি বুখারী শরীফের হাদীসে আছে, যে মুসলিম প্রথম কায়সারের যুদ্ধে অংশগ্রহন করবে তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত। [Book of Jihad, Vol-4, Book-52, No-175]
লক্ষ্য করুন, আমার উম্মতের মধ্যে যে সেনাদল প্রথম কায়সারের যুদ্ধে অংশগ্রহন করবে তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত। এই যুদ্ধ হয়েছিল হিজরী ৪২ সালে। কিন্তু ইয়াজিদ যুদ্ধ করেছে কুসতুনতুনিয়া বা কনষ্টান্টিনপোলের যুদ্ধ। তাও প্রথম বাহিনীতে নয়, তিনি যুদ্ধ করেছেন ৮ম বাহিনীতে। শাস্তিস্বরূপ তাকে এ যুদ্ধে যেতে হয়েছিল।
[Ref: 1. Tareek Kamil- Imam Atheer, Vol-3, Page-231, Events of 49 Hijri,
2. Tareekh Ibn Khaldoon, Vol-3, Page-15
3. Murujh al Dhahab-Imam Dhahabi, Vol-3, Page-33
4. Ibn Kathir’s Al-Bidaya Wa Al0Nihaya ]
ইবনে কাছিরের বর্ণনা দেখা যায় প্রথম যুদ্ধ ২৭ হিজরীতে হয়েছিল। তবে তাতেও ইয়াজিদ ছিলেন না। কোন হাদিস বা ঐতিহাসেক বর্ণনায়ও ১ম সেনাদলে ইয়াজিদ থাকার কোন উল্লেখ নেই। ইবনে কাছিরের বর্ণনাটি দেখুন-
‘‘হাদীসে প্রমাণ রয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন, রোম সাম্রাজ্যে প্রথম যে সেনাদলটি যুদ্ধ করবে, তাদের জন্য আল্লাহর তরফ থেকে ক্ষমা রয়েছে। আর এ সেনাদলটিকে রাসুল (সা) উম্মে হারাম (রা) এর ঘরে স্বপ্নে দেখেছিলেন। উম্মে হারাম (রা) বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, তিনি যেন আমাকে তাদের দলভূক্ত করেন। রাসুল (সা) বললেন, তুমি হবে প্রথম দলের যোদ্ধাদের অন্তর্ভূক্ত। উসমান ইবনে আফফানের (রা) এর আমলে ২৭ হিজরীতে সাইপ্রাস বিজয় হয়। আমীর মুয়াবিয়া (রা)-এর পরিচালিত সৈন্যদল যখন সাইপ্রাস যুদ্ধে রত ছিল তখন তাদের সাথে উম্মে হারাম (রা) যুদ্ধে যোগদান করেছিলেন। তারপর তিনি সাইপ্রাসে ইনতিকাল করেন। এরপর দ্বিতীয় সেনাবাহিনীর আমীর ছিলেন তার পুত্র ইয়াজীদ ইবনে মুয়াবিয়া। উম্মে হারাম (রা) ইয়াজীদের সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে পারেননি। এটা ছিল নবুওয়াতের অন্যতম প্রধান দলীল।’’
(আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা-৪১৯, প্রথমপ্রকাশ-২০০৭, ইসলামী ফাউন্ডেশন)
খেয়াল করুন, রোম সাম্রাজ্যে প্রথম যে সেনাদলটি যুদ্ধ করবে, কেবল তাদের জন্য আল্লাহর তরফ থেকে ক্ষমা রয়েছে। ১ম সেনা দলে ছিলেন মুয়াবিয়া। ইয়াজীদ প্রথম সেনাদলের নন। ১ম সেনাদলটি যুদ্ধ করেছেন ২৭ হিজরীতে। ইয়াজীদ ছিলেন দ্বিতীয় সেনাদলের। রাজতন্ত্রের দরবারী আলেম ও তাদের অনুসারী সালাফীরা ইয়াজীদের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে এ হাদীসটিকে বরাবরই ব্যবহার করে আসছেন। হাদীসের নামে জঘন্য মিথ্যাচার করে এরা ইয়াজিদকে নিদোর্ষ প্রমানের কেন এতো প্রানান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছেন তা খুব সহজেই অনুমেয়।
ইয়াজিদের পক্ষে তাদের ৪নং যুক্তি:
ইয়াজীদ সম্পর্কে যত খারাপ কথা বলা হয়, তার সবই মিথ্যা, কেবল শিকার করা ছাড়া।
প্রকৃত সত্য: ইয়াজীদ কেবল হুসাইনের হত্যাকারীই নন। তিনি মক্কা ও মদীনা আক্রমনকারী। মদীনায় সাহাবী হত্যা ও নারীদের গণধর্ষনের অনুমতি দিয়ে তিনি মুসলমান থেকে খারিজ হয়ে গেছেন মর্মে অনেক বিশিষ্ট আলেম অভিমত দিয়েছেন।
ইয়াজিদের পক্ষে তাদের ৫নং যুক্তি:
সালাফী কতেক আলেম বলে থাকেন হুসাইন অন্যায়ভাবে মুসলমানদের ঐক্য বিনষ্ট করার জন্য ইয়াজিদের শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। তাই তাঁকে হত্যা করা সঠিক ছিল। তারা বুখারী শরীফের এই হাদীছ দিয়ে দলীল দেয়ার চেষ্টা করে থাকেন যে,
"একজন শাসকের সাথে তোমরা ঐক্যবদ্ধ থাকা অবস্থায় যদি তোমাদের জামআতে বিভক্তি সৃষ্টির জন্য কেউ আগমন করলে তাকে হত্যা করো।" (বুখারী)
তারা বলেন, মুসলিমরা ইয়াজিদের শাসনের উপর ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। হুসাইন এসে সেই ঐক্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করেছেন। সুতরাং তাঁকে হত্যা করা যুক্তিসংগত হয়েছে।

প্রকৃত সত্য: ইয়াজীদের শাসনের পক্ষে মুসলিম জাতি ঐক্যবদ্ধ ছিলেন না এটা সিরাত গ্রন্থগুলো থেকেই সুষ্পষ্ট। হুসাইন যখন তাঁর চাচাতো ভাই মুসলিম বিন আকীলের চিঠি পেলেন তখন খেলাফতের দাবী ছেড়ে দিয়ে ইয়াজিদের সৈনিকদের কাছে কয়েকটি প্রস্তাব পেশ করেছিলেন।
তাকে মুসলিম রাজ্যের কোন সীমান্তের দিকে যেতে দেয়া হোক।
অথবা তাঁকে মদিনায় ফেরত যেতে দেয়া হোক। কিন্তু ইয়াজীদ বাহিনী এর কোনটিই মানতে রাজি হননি। তারা পাল্টা হুসাইনকে আত্মসমর্পনের প্রস্তাব দিয়ে তাকে বন্দি করতে চাইলেন। তাদের এই প্রস্তাব মেনে নেয়া হুসাইনের জন্যে ওয়াজিব ছিল না। তিনি এহেন জালিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাকেই বেছে নিলেন। কাজেই দরবারী আলেম ও তাদের অনুসারী সালাফীদের অসত্য বক্তব্যে বিভ্রান্ত হওয়ার কোন কারন নেই। বেহেস্তবাসী যুবকদের সর্দার এই মজলুম ব্যক্তিটির বিরুদ্ধে বুখারী শরীফের এই হাদীস বর্ণনা করে রাজতন্ত্রপন্থীরা মানুষকে বিভ্রান্ত করার অপপ্রয়াস চালিয়ে আসছেন অত্যন্ত সুকৌশলে। পাঠকগণ একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, ইয়াজীদের সাথে মুসলমানেরা ঐক্যবদ্ধ থাকাবস্থায় হুসাইন বিদ্রোহ করেছেন, এটা একেবারেই মিথ্যা কথা। ইরাকের, মদীনার এবং মক্কার মুসলমানেরা ইয়াজীদকে ঐ সময় মেনে নেননি। সাহাবীরা তার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ ছিলেন না। কাজেই বুখারী শরীফের এই হাদীস হুসাইনের ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্রও প্রযোজ্য নয়। তিনি স্ত্রী, পুত্র, নারী-শিশু পরিবার পরিজন নিয়ে যুদ্ধ করতেও বের হননি, এটা বলাই বাহুল্য। রাজতন্ত্রপন্থী নাসিবী তথা সালাফীরা সাধারণ লোকজনের মাঝে ধুঁয়াশা সৃষ্টির জন্যেই এটার আশ্রয় নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেন।
ইয়াজিদের পক্ষে তাদের ৬নং যুক্তি:
ইয়াযীদ-এর নামের সাথে ‘রাহমাতুল্লাহি/ রাহিমাহুল্লাহ বলা উচিত।
প্রকৃত সত্য:
রাজতন্ত্রের সমর্থক সালাফীরা এতোই বেপরোয়া যে, তারা হুসাইনের বিপরীত শক্তি ইয়াযীদ-এর নামের সাথে ‘রাহমাতুল্লাহি’ বলা শুরু করেছেন। অবশ্য অতীতে রাজতন্ত্রীদের এতোটা নির্দয় আচরন করতে দেখা যায়নি। আহলে বাইতের দুশমনেরা চিরকাল মুসলমানের দুশমনই থাকবেন। মক্কা-মদীনা আক্রমণকারী, প্রচুর সাহাবীর হত্যাকারী, মদীনায় লুন্ঠন ও ধর্ষনের নিদের্শদানকারী, কারবালার ঘটনার মুল রূপকার ইয়াযীদকে কি কারনে ‘রাহমাতুল্লাহি’ বলার দরকার পড়লো তা কি সহজেই অনুমেয় নয়? হুসাইনের শাহাদাতের সাথে ন্যূণতমও যে ব্যক্তির নাম জড়িত তাকে দোয়া করার গরজ কেন একটিবার ভেবে দেখুন। মীর মোশাররফ হোসেনের ভাষায় বলতে হয়, অর্থ, হায়রে পাতকী অর্থ! এখানে প্রসঙ্গ ক্রমে একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, মীর মোশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ সিন্ধু’ কোন ঐতিহাসিক গ্রন্থ নয়। এটি শ্রেফ একটি উপন্যাস মাত্র। আর এ থিম নিয়ে উপন্যাস যে কেবল মীর মোশাররফ হোসেন লিখেছেন তা-ও নয়। নানাদেশে নানা ভাষায় এ ধরনের হাজার হাজার উপন্যাস আছে। আগেই বলেছি, কারবালার ঘটনা কেয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের হৃদয় থেকে মুছে ফেলা যাবে না। আমাদের দেশে জনগনের ক্ষোভ লক্ষ্য করে সালাফি-আহলে হাদিছরা এখন বলা শুরু করেছে, ইয়াজিদকে দোয়াও করা যাবে না, খারাপও বলা যাবে না। যে ব্যক্তি সাহাবী হত্যা করে, মুসলমান হত্যা করে, সাহাবীর স্ত্রী এবং কন্যাদের ধর্ষনের আদেশ দেয়, সে কিভাবে মুসলমান হয়, আপনারই বিচার করুন। তাকে নাকি খারাপ বলা যাবে না। কি কৌশল ভেবে দেখুন। আবার এও বলে, তার বিষয়ে বলে নাকি আমাদের কোন ফায়দা নেই। কেমন দ্বিমূখীতা একবার ভেবে দেখুন। তাহলে অন্যান্যদের ভাল-খারাপ আলোচনা করে মাঠ গরম কেন করেন?

ইয়াজিদের পক্ষে তাদের ৭নং যুক্তি:
ইয়াজিদ তার পিতার পর ন্যায়সঙ্গত উত্তরাধিকারী ছিল।
প্রকৃত সত্য: হযরত মুয়াবিয়ার সাথে হাসানের সন্ধির প্রধান শর্ত ছিল-আমীর মুয়াবিয়ার কাছে এই শর্তে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে যে তিনি কুরআন, সুন্নাহ এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের অনুসরণে খেলাফত পরিচালনা করবেন। আর খেলাফত ব্যবস্থায় ব্যত্যয় তো ইসলামী ব্যবস্থা নয়। বরং মহানবী কথা অনুযায়ী জুলুম ও অনাচার। মুয়াবিয়া তার পুত্রকে খলিফা মনোনয়ন দিলেও তা ইসলামী রীতিনীতি অনুযায়ী ছিল না। কাজেই ইয়াজিদ তার পিতার ন্যায়সঙ্গত উত্তরাধিকারী ছিলেন না। ইসলামের সুমহান নীতির পরিবর্তে বরং জাহিলিয়াত যুগের ‘গোত্র-প্রধান’ প্রথায় ফিরে গিয়েছিলেন, যেখানে পিতার পর বংশানুক্রমে গোত্র প্রধান নিযুক্ত হতেন। ইমাম হাসানের অবর্তমানে আমীর মু’আবিয়া (রাঃ) এর মৃত্যুর পর চুক্তি অনুযায়ী মুসলিম খেলাফতের একমাত্র ন্যায়সঙ্গত উত্তরাধিকারী ছিলেন ইমাম হুসেইন (রা)। কোনভাবেই ইয়াজিদ নয়।

ইয়াজিদের পক্ষে তাদের ৮নং যুক্তি:
অনেক সাহাবীরা তার আনুগত্য প্রত্যাহার করেননি।
প্রকৃত সত্য: যারা প্রত্যাহার করেছিল তাদের স্ত্রী, কন্যাদের ধর্ষন করা হয়েছিল, হাজার হাজার সাহাবীকে হত্যা করা হয়েছিল। এবার আপনারাই বলুন, এলান দিয়ে কে এজিদের আনুগত্য প্রত্যাহার করবে?

সালাফীরা ‘ইয়াজীদ এবং হুসাইন’ উভয়ের পক্ষে থাকার রহস্যঃ
যারা ইয়াযীদের পক্ষাবলম্বন করে রাজতন্ত্রকে ইসলামে হালাল বলে গন্য করতে ব্যতিব্যস্ত, তারা কি আসলেই হুসাইনের প্রতি সহানুভূতিশীল? তাদের লেকচার বা নানা লেখায় তারা হুসাইনের ভক্ত সাজার ভান করেন। এমন একটা ভনিতা করেন যে, তাদের হৃদয় হুসাইনের জন্য পরিপূর্ণ। এটা আসলে শিয়াদের মতই মেকিতা। ইয়াযীদ আর হুসাইন তো কখনোই প্যারালাল নয়। হক আর বাতিল কি একই সরল রেখায় চলতে পারে? সালাফিদের আকিদা, ইয়াজিদও সহি ছিল, হুসাইনও সহি ছিল। মুয়াবিয়াও সহি, আলীও সহি। যারা নিপীড়ন করলো তারাও সহি, আর যারা নিপীড়িত হলো তারাও সহি। জগাখিচুরী কিম্বা কন্ট্রাডিক্শন আর কাকে বলে? ইয়াজিদ একজন তাবেয়ী হওয়ায় তাকে অনুসরন করা তাদের জন্যে ফরজ। কিন্তু এই তাবেয়ীই কিন্তু মক্কা এবং মদীনায় হাজার হাজার সাহাবী হত্যা করেছে। এই হত্যাও সহি? ইয়াজীদ প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষভাবে হুসাইনের হত্যার জন্যে দায়ী ছিলেন। তিনি হত্যাকারীদের কোন শাস্তি তো দেনইনি, তাদেরকে অপসারনও করেননি। হুসাইনের কর্তিত মস্তক দেখে প্রথমে খুশী হয়েছিলেন। এমন পাপিষ্ঠ লোকের পক্ষে যারা ওকালতি করেন, তারা আবার হুসাইনের জন্যেও মায়াকান্না করেন। একটিবার নিজের বিবেককে জিজ্ঞেস করুন, যারা ইয়াজীদকে ভালবাসেন, ইয়াজিদের জন্যে দোয়া করেন, তারা মুখে যতই বলুন, তাদের অন্তরে হুসাইনের পক্ষে বিন্দুমাত্র ভালবাসা কি থাকতে পারে? হুসাইনকে যেহেতু মহানবী জান্নাতের সর্দার আখ্যায়িত করেছেন, সে কারনে রাজতন্ত্রের তল্পীবাহক সালাফীরা হুসাইনের বিরোধিতায় শক্তহাতে কলম ধরতে পারছেন না বলেই প্রতীয়মান।

আশুরার দিনে ইহুদীদের রোজা রাখার মিথ্যা কাহিনী:
মহররম আর আশুরা নিয়ে সালাফিরা যেসব কল্প কাহিনী রচনা করেছে, তাহলো-
• এই দিনে হযরত মূসা আঃ ও তার সাথীরা ফেরাউনের কবল থেকে উদ্ধার পান।
• আদম-কে এদিনেই জান্নাতে স্থান দেয়া হয় এবং পরবর্তীতে এই দিনেই পৃথিবীতে পাঠিয়ে নবী করা হয়। • হযরত নূহ-এর সময়ে এই দিনে মহাপ্লাবন হয়।
• হযরত ইব্রাহীম আ. জন্ম নেন।
• মুসা আঃ এর শুত্রূ ফেরাউন ও তার সৈন্যদেরকে আল্লাহ তায়ালা এই দিনে নীল নদের পানিতে ডুবিয়ে মারেন।
• হযরত ইউনুছ আঃ মাছের পেট থেকে মুক্তি পান এই দিনে।
• হযরত আইয়ূব আঃ রোগ মুক্তি পান এই দিনে।
• ঈসা আঃ এই দিনে জন্ম নেন এবং পরবর্তিতে তাকে সশরীরে ঊর্ধ্বাকাশে এই দিনে উঠিয়ে নেয়া হয়। ১০ই মহররম আসলে যা ঘটেছে-(সিরাত ও ইতিহাসের আলোকে) নবী মুহাম্মদ সা: এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন এই দিন কারবালার ময়দানে ইয়াজিদ-এর সৈন্যদের হাতে শাহাদাত বরন করেন। ইহুদীদের রোজার প্রকৃত সত্য: ইয়াম কিপ্পুর হচ্ছে ইহুদি বর্ষপঞ্জিকার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন তারা রোজা রাখেন। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উপবাসের দিন তিশা বাব। আনুমানিক ২৫০০ বছর আগে এই দিনে ব্যবলনিয়া জেরুজালেমের প্রথম পবিত্র মন্দির ধ্বংস করে দেয় এবং প্রায় ২০০০ বছর আগে রোমানরা জেরুজালেমের দ্বিতীয় পবিত্র মন্দির ধ্বংস করে দেয়। সেই উপলক্ষ্যে তারা এই দিনটিকে পালন করে রোজা রাখে। এছাড়া ইহুদীদের আর কোন রোজা রাখার ইতিহাস নেই। ইহুদীরা ১০ই মহররম রোজা রাখে-এটা তৎকালীন রাজতন্ত্রের বানানো ইতিহাস। খুব সম্ভবতঃ কারবালার হৃদয় বিদারক ঘটনার স্মরনে সেকালে ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা ১০ই মহররম যে রোজা রাখতেন, সেটাকে ভিন্নখাতে ঘুরিয়ে দিতেই মিথ্যা ইতিহাস রচিত হয়েছে। এছাড়া শুকরিয়ার কোন রোজা নেই এটা সালাফিরা স্বীকারও করে। কিন্তু বাস্তবে করে উল্টোটা।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.