| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ওবায়দুল হক সাহেব রিটায়ার করেছেন আজ চার বছর। সবকিছু থেকেই রিটায়ার করেছেন। অফিস -আদালত, কাজ-কর্ম সব থেকে। কেবল রিটায়ার করেন নি বাথরুম আর খাওয়া থেকে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হয় দুই ই বেড়েছে আগের চেয়ে। এই নিয়েও প্র্য়াই কথা শুনতে হয়। কিছুক্ষণ পর পর তার ক্ষুধা লাগে। এত ক্ষুধা লাগবে কেন? বয়স্ক লোক একটু রয়ে সয়ে খাবে তা না। খালি খাই খাই। ছেলের বউ তাকে সামনাসামনি কখনো কিছু বলেনি। তবে আড়ালে আবডালে বলতে শুনেছে। তার ছেলের কাছে বলেছে তোমার বাবাটা বুড়ো হলেও আক্কেল বুড়ো হয়নি। বাচ্চা ছেলে পেলের মত সারাদিন শুধু খাই খাই। ছেলে অবশ্য এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করেনি। যাক ভালই। বাপের ব্যাথা ছেলেই বোঝে। কষ্ট করে মানুষ করেছেন না। ছেলের বউ এর কথায় কান দিয়ে লাভ নেই। ও বাচ্চা মেয়ে না বুঝে দু একটা কথা বলে তাতে কি। ছেলে তো আর তাকে খাওয়া নিয়ে কিছু বলে বলছে না। খারাপ লাগে তখন, যখন বুড়িটা বউ এর সাথে গলা মেলায়। এতকাল কামাই করে খাওয়ালাম। আর! আসলে মেয়ে মানুষের জাতটাই এমন। যে দেবে তার দিকেই পাল্লা ভারি! ওবায়দুল সাহেব কিছুই আর করতে পারে না এখন। আগে সব পারতো। সরকারি অফিসের হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা ছিলেন এতকাল। লক্ষ লক্ষ টাকা হিসাব রেখেছেন পাই পাই করে। একটি পয়সা কোনদিন এদিক সেদিক হয়নি তার। কত খুঁটিনাটি বিষয় লিখে রেখেছেন। কোনদিন একটি কথাও শুনতে হয়নি তাকে। জোয়ান জোয়ান কম্পিউটার ওলা ছোকড়া কেরানীদের তিনি থোরাই কেয়ার করতেন। মাথা -ই তার কম্পিউটার। কিন্ত শালা আজকাল খুব ভোগাচ্ছে। এখন আর কাজ করতে চাইছে না। এখন আর কোন কাজই করতে পারেন না তিনি। এই বয়সে অবশ্য তেমন কিছু করার দরকার ও পরে না। স্ত্রী ছেলে মেয়ে মিলেই সব করে ফেলে। সে যত না করে ততই তাদের ভাল। সব বিষয়েই নাকি ওবায়দুল গুলিয়ে ফেলে। তাই বড় কোন কাজ তার করা নিষেধ। করার মধ্যে কেবল দু-চারদিন বাজার করতে পাঠানো হয় তাকে। তাও আবার দামী জিনিষ কিনতে নয়। দামী গুলো ওরাই বউ শ্বাশুরী মিলে দুপুর রাত পর্যন্ত মার্কেটে মার্কেটে ঘুরে কিনে আনে। তাকে পাঠায় টুকিটাকি জিনিষ যেমন কলমি শাক, লাউ এর ডগা, বউ এর রুমাল সেলাই করার সুঁই, নাতির ডায়পার, কাঁচা তেঁতুল এই সব। সুঁই কেনাও কি কম ঝামেলার কাজ! একবার সুঁই কিনে বাসায় এসে আবিস্কার হল সুই এর পাছায় ছিদ্র ছোট! সুতা পড়ানো যায় না! ভুলটা ওবায়দুল সাহেবেরই। তিনি সুই কেনার আগে অন্তত পাছায় বড় ফুটা আছে কী না তা দেখে নিতে পারতেন!
আজ ওবায়দুল সাহেবের দায়িত্ব পড়েছে যাকাতের কাপড় কিনতে হবে। রোজার শেষ শেষ। যাকাত না দিলে চলে। লোকে কি বলবে। তাছাড়া পাড়ায় মান সম্মান বলেও তো একটা জিনিষ আছে। ওবায়দুল সাহেব রোজা মুখে যোহরের নামাজ পড়ে বের হয়েছেন যাকাতের কাপড় কিনতে। কিন্তু মার্কেটে ঢোকার উপায় আছে। মানুষ আর মানুষ। মনে হয় দুনিয়ার সব লোক কেনাকাটা করতে ঢাকায় এসেছে। যতগুলো না তার পুরুষ মানুষ। তিনগুন তার মহিলা। আগে হাটে বাজারে গেলে মহিলাদের খুব একটা দেখা যেত না। এখন হযেছে তার উল্টো। রোজা মুখে মার্কেটের ভেতর হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে তার। না চাইলেও যুবতি-তরুনী মেয়েদের ধাক্কা থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারছেন না। আসলে রোজ কিয়ামত এগিয়ে আসছে। তার নমুনাই শুরু হয়েছে চারদিকে। অনেকগুলো দোকান বেছে বেছে একটি দোকানে ঢুকলেন ওবায়দুল সাহেব। দোকানের বাইরে বড় করে সাইন বোর্ড টাঙানো এখানে যাকাতের কাপড় পাওয়া যায়। ওবায়দুল সাহেব ভেবে পায় না কাপড়ের গায়ে যাকাতের কাপড় বলে সিল মারার কি আছে। সব কাপড় কি যাকাত দেয়া যায় না?
দোকান ভর্তি মানুষ গিজগিজ করছে। দোকানদারদের মাথা মাশাল্লা। এত কাস্টমার কেমনে যে সামলায়!
-এই তোমার দোকানে ভাল শাড়ী লুঙ্গি হবে?
-জ্বি হবে। বসেন।
-দেখাও তো।
-আরে বসেন বসেন। বসলেই নিতে হবে না। আগে দেখে পছন্দ করেন।
-ওই লুঙ্গি গুলো দেখি।
-ঠিকই চিনছেন, একদম সুতি। পড়লে টেরই পাইবেন না পড়নে কিছু আছে। খুব চমৎকার কাপড়। ডাইরেক্ট পাবনার মাল। হাবিজাবি লু্িঙ্গ আমার দোকানে পাইবেন না।
- ভালই। আচ্ছা ওই গুলো একটু দেখি।
-এই গুলো?
-না, ওই গুলো..।
-ওগলা তো পড়তে পারবেন না!
-কেন, পড়তে পারবো না কেন?
-ওগলা তো যাকাতের কাপড়। এক ধোয়াতেই ত্যানা!
-আমিও যাকাতের জন্যই কিনবো।
-সেইটা আগে বল্লেই পারেন। ওই যাকাতের মাল গুলা দেখা।
-এগুলোর অবস্থাতো খুব করুণ। ধরাই যাচ্ছে না। এর চেয়ে ভাল কাপড় নেই?
-আরে ধুর মিয়া! যাকাতের কাপড় ভাল দিয়া কি করবেন? সবাইতো এইগুলাই নিয়া বিলাইতাছে। আপনে আইছেন কইত্থিকা..!
ওবায়দুল সাহেব অনেকক্ষণ নেড়ে চেড়ে দেখেন লুঙ্গি গুলো। দোকানী কতগুলো শাড়ীও তার সামনে ফেলে ধপাস করে।
বড় বাহারী সেসব শাড়ী! বাহারীই বটে! যা তা জিনিষ তো আর মানুষকে দেয়া যায় না! এই কাপড় গুলো পেয়েই মহা আনন্দে ঈদ কাটে কত শত লোকের। বিশিষ্ট সমাজসেবক দাতারা আগের দিন মাইকিং করে ঘোষনা দেয় উমুক জায়গায় যাকাতের কাপড় বিলানো হবে। নতুন কাপড়! ঘোষনা শুনে রীতিমত হুমড়ি খেয়ে পড়ে মানুষ। ভীড় সামলানোর জন্য দু-চার-দশ জন চ্যালা চামুন্ডাও দরকার হয়ে পড়ে প্রায়ই। ভোর বেলা থেকেই তালুকদার, চাকলাদার, খন্দকার, খান সাহেবদের বাড়ীর পাশের বড় মাঠে, রাস্তায় লাইন পড়ে যায়। শুরু হয় সীমাহীন ঠেলা-ঠেলি, ধাক্কা-ধাক্কী। আসলে এই গরিবের বাচ্চারা কিচ্ছু শিখলো না! সামান্য একটা কাপড়ের জন্য পরিমরি করে হট্টগোল বাধিয়ে দেয়। ছোটলোকের দল! নতুন একটি শাড়ী বা লুঙ্গি পেতে প্রাণের মায়াও যেন তুচ্ছ এদের কাছে। তালুকদার সাহেবের চ্যালা চামুন্ডারা অন্তত ভীড় সামলাতে লাঠি পেটা করে শান্ত করে আগত জনতার ঢেউ। দু একটি পিটনী খেলে তাতে কি। পাছা ডলতে ডলতে হাতে শাড়ী লুঙ্গি নিয়ে দৌড় লাগায় তারা!
লুঙ্গি-শাড়ী গুলো নেড়েচেড়ে দেখে উঠে দাঁড়ায় ওবায়দুল।
-যান গা যে? যাকাতের কাপড় নিলেন না?
-না রে ভাই। এবার যাকাত দিব কিনা তাই ভাবছি!
দোকানদারের খুশি হওয়ার কোন কারন আছে বলে মনে হল না। সে বিড়বিড় করতে করতে কাপড় গুছিয়ে রাখছে। ওবায়দুল সাহেব দোকান থেকে বের হয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটছে। মাথার মধ্যে তার নানা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। কখন যে হেঁটে বাড়ী চলে এসেছে টেরই পায়নি। বাড়ীতে দরজায় কড়া নাড়তেই দরজা খোলে তার স্ত্রী। মনে হল দরজা ধরেই যেন দাঁড়িয়ে ছিল। আজ লক্ষণ সুবিধার মনে হচ্ছে না। নিশ্চয় ওবায়দুল যাকাতের কাপড় কিনে কখন ফিরবে তার অপেক্ষাই করছিল। ওবায়দুল সাহেব ঘরে ঢুকে সোজা ভেতরের দিকে হাঁটা দিলেন। এমন ভাব করলেন যেন তিনি নিচে একটু ঘুরতে গিয়েছিলেন। কাপড় টাপড় তার আনার কথা কোন কালেই ছিল না। তার স্ত্রী তার হাতে কিছু আছে কিনা দেখার জন্য একটু সময় নিলেন। হাত খালি দেখে বাজখাঁই গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন-
-খালি হাতে আসলে যে? যাকাতের কাপড় কই?
-নেই।
-নেই মানে?
-কতগুলো দোকান ঘুরলাম পছন্দই হল না।
-তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না বঝলে। আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল। আমাকেই বেরোতে হবে! কই টাকা দাও।
-টাকা নেই।
-টাকা নেই মানে?যাকাতের কাপড় কেনার জন্য যে টাকা দিলাম সে টাকা ফেরত দাও! আমাকেই সব করতে হয়! তোমার তো আর কোন কাজের মুরোদ নেই।
-যাকাতের কাপড় কিনতে হবে না। আমি যাকাত দিয়ে এসেছি।
-তুমি দিয়ে এসেছো? কাকে? কোথায় দিয়ে আসলে? কেউ দেখলো না শুনলো না! বুড়ো হচ্ছো আর মাথার বুদ্ধি সব খুইয়ে যাচ্ছে নাকি? কোথায় হারিয়েছো টাকা বল?
-টাকা হারাইনি।
-হারাওনি তো গেল কোথায় এতগুলো টাকা?
-বল্লাম তো যাকাত দিয়েছি।
ওবায়দুলের স্ত্রী সারা বাড়ী মাথায় তুলে চিৎকার করতে লাগলো। ছেলে মেয়েদের ডেকেডুকে একজায়গায় না করা পর্যন্ত ছাড়বে না আজ। প্রায়ই করে। চুন থেকে পান খসলেই এত বড় বড় ছেলে মেয়ে ছেলের বউ এর সামনে অপমান করে তবে ক্ষ্যান্ত হয়। ওবায়দুল কিছু না বললেও মনে মনে খুব লজ্জা পায়। সত্যিই সে একটা অকামের ঢেঁকি! রিটায়ার করার পর থেকে ওকে দিয়ে আর কিচ্ছু হয়না! সামান্য একটা যাকাতের কাপড় সে কিনতে পারে না! একবার ধুলে ত্যানা হয়ে যায় একথা শুনে এমন কাপড় আর কেনার রুচি হয়নি তার। অন্য দোকানে গেলেই পারতো। অন্য দোকানে নিশ্চই আরো ভাল ভাল কমদামি, না ধুতেই ত্যানা হয়ে যাওয়ার মত যাকাতের কাপড় ছিল। সে তা না করে দোকান থেকে বের হয়ে বাড়ীর দিকে হাঁটতে শুরু করে। আসার পথে ফুটপাতের পাশে ঝুপড়িতে বসবাস করা কয়েকটি পরিবারকে ভাগ করে দিয়ে এসেছে টাকা গুলো। তবে এতে যাকাত আদায় হয়েছে কিনা জানে না ওবায়দুল সাহেব। আজ রাতে নিশ্চয় সেদ্ধ করা পানি খেয়েই রোজাটা রাখতে হবে। যে আলামত শুরু হয়েছে তাতে ভাত আজ আর তার মুখে ঢুকবে না। ওরা অবশ্য খেতে বলবে। ওবায়দুল সাহেব অভিমান করে খাবে না। বুড়ো হলে অভিমানটাও বোধ হয় একটু বেশিই হয়!
©somewhere in net ltd.