নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সৈয়দা আরিফা সুলতানা

সৈয়দা আরিফা সুলতানা › বিস্তারিত পোস্টঃ

বিশ্বজিৎ এবং দয়াশূন্য সমাজ

০৬ ই জানুয়ারি, ২০১৩ দুপুর ১২:২৬

বিশ্বজিৎ মরে যায়নি। বিশ্বজিৎ শুধুমাত্র বর্তমানের একটা আয়না হয়ে আমাদের সামনে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বজিৎ মরে গেছে, কাঁদলে তার মা কাঁদবে। আমাদের কি? ভূলেও একথা মনে আনবেন না। মৃত্যু পরবর্তী জীবনে প্রবেশ করে বিশ্বজিৎ আমাদের দিকে তাকিয়ে বিদ্রুপের হাসি হাসছে। ডজন ডজন টিভি চ্যানেল, পত্রিকা সাংবাদিক আর শত মানুষের সামনে মাত্র কজন রড, চাপাতি নিয়ে উন্মত্ত হিং¤্র পশুর মতো বিশ্বজিতের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। শরীরে রক্তাক্ত আঘাত নিয়েও বিশ্বজিৎ দাঁড়িয়ে আছে। আঘাতের কষ্টের চাইতেও তার মুখায়ববে ফুটে উঠেছিল নিদারুণ বিস্ময়। অপরাধি যখন ধরা পড়ে, তখন তার চোখ, মুখ, কথা বলা, গলার স্বর সবকিছুই প্রমাণ করে যে, সে অপরাধি। সে নিজেও বুঝতে পারে- তার আর নিস্তার নেই। কিন্তু, যতবার বিশ্বজিতের মুখের দিকে তাকিয়েছি, ততবারই মনে হয়েছে- সে যেনো এই ঘটনাটা কিছুতে বিশ্বাস করতে পারছে না। যেনো ভাবছে, এটা একটা ভূল বা দুঃস্বপ্ন। এদের ভূল ভাঙ্গবেই। বোকা বিশ্বজিৎ এটা ভাবেনি যে, এই হিং¤্র পশুদের কোনো ভূল ছিলো না। তারা তখন রক্তের গন্ধে দিশেহারা-পাগলপারা অবস্থায়। তা না হলে কিভাবে সর্বশক্তিতে একের পর এক ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে ? তাদের এই রক্তের নেশা কেটে যাওয়ার আগেই বিশ্বজিতের প্রাণবায়ু বেরিয়ে যায়। সত্যিই বড্ড বোকা ছিল বিশ্বজিৎ! ভেবেছিল তার দুঃস্বপ্নটা ভেঙ্গে গেলেই নিজেকে তার পরিচিত পরিবেশে দেখতে পাবে। গৎবাঁধা জীবনের পুনঃরাবৃত্তি ঘটবে যথা নিয়মে। কিন্তু, তা আর হলো কই ?

দৃশ্যটা কল্পনা করুন- রাজনৈতিক ফায়দা লোটার আশায় শ’খানেক মানুষের সামনে তরতাজা একটা যুবককে পিটিয়ে মেরে ফেলছে কয়েকজন। আর ঐ শ’খানেক লোক নিজেদের মোবাইলের ক্যামেরা, অফিসের ক্যামেরা আর আল্লাহ প্রদত্ত দুচোখ দিয়ে ভিডিও করে নিচ্ছে পুরো দৃশ্য। রিপোর্টাররা ঝড়ের গতিতে ঘটনা সংক্ষিপ্ত আকারে লিখছে। এই কাজগুলো করছে শুধুমাত্র নিজস্ব প্রতিষ্ঠান আর পত্রিকার বাজার কাটতি বাড়াতে। হায়রে, একটা নিরপোরাধ তাজা প্রাণের চাইতে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থটাই মূখ্য হয়ে গেলো তাদের কাছে ! উপস্থিত মিডিয়াকর্মীরা নিশ্চয়ই তাদের দ্বায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন। আচ্ছা, পেশাদারিত্বের প্রতি এই চরম আনুগত্য বলুন আর ভালোবাসাই বলুন, এর জন্য কি তাদের সবাইকে বিশেষ পুরস্কার প্রদানের ব্যবস্থা করা যায় না। আফটার অল এতো বড় একটা নিউজ কাভারেজ !

এবার চলুন ভিন্ন চিত্র চিন্তা করি-বিশ্বজিতের দেহে কটা আঘাত করেছিল খুনীরা, দশটা? বিশটা? পঞ্চাশটা? একশটা? হাজারটা? ধারালো অস্ত্র আর রডের উপর্যুপরি কতটা আঘাত করা হলে একটা মানুষ মারা যেতে পারে আমার জানা নেই্ জানতে পারতাম, যদি বিশ্বজিৎ অলৌকিকভাবে বেঁচে যেতো, অত্যন্ত ক্লান্ত আর দূর্বলভাবে টেনে নিশ্বাস নিতে নিতে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতো। আঘাত যতগুলোই হোক না কেন, ঘটনাস্থলে উপস্থিত সবাই যদি বিশ্বজিৎ -কে ঘিরে দাঁড়াতো আর প্রত্যেকে একটা করে আঘাত নিজেদের শরীরে নিয়ে বিশ্বজিৎ-কে বাঁচাতে চেষ্ঠা করতো, তাহলে?

তাহলে হয়তো অনেকেই আহত হতো। কিন্তু, কেউ নিহত হতো না। বিশ্বজিতের মায়ের বুক খালি হতো না। আমরাও মৃত্যুর পূর্বপর্যন্ত সম্মিলিতভাবে একটা প্রাণ বাঁচিয়েছি-এই ভেবে গর্ববোধ করতাম। আমরা তা করলাম না। আমরা তা করলাম না, আমরা তামাশা দেখলাম। লাইভ শো দেখলাম, কি মজা! আমরা প্রমাণ দিলাম আমাদের মধ্যে দয়া নেই, মায়া নেই।

আমরা একজন বিশ্বজিতের প্রতি কিংবা একজন মানুষের প্রতি দয়ার পরশে একসাথে এগিয়ে গেলে হয়তো খুনীরা পালিয়ে যেতো। হত্যাযজ্ঞ শেষে খুনীরা ক্যাম্পাসে গিয়ে রক্তাক্ত কাপড় আর অস্ত্র নিয়ে বন্য উল্লাস করেছে। আমাদের একতাবদ্ধ হওয়ার নূন্যতম মানসিকতার অভাব খুনীদের উল্লাসে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে কাজ করেছে। খুনীরাও জেনে গেলো-‘ওয়াও ! কি নির্বিগ্নে মানুষ খুন করলাম সবার সামনে। কেউ টু-শব্দ করেনি। হরতাল-অবরোধের দিন ঘর থেকে বের হওয়া, এখন সারা দেশবাসী বুঝবে মজা। আজকে একটা কাজের কাজই হয়েছে।’

মানসচক্ষে দেখতে পাচ্ছি, বিশ্বজিৎ আমাদের এই আহা....উহু করা দেখে, বিশ্বজিৎ হত্যা নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় তোলা আর আমাদের নিয়ত কলম পেষা দেখে হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ছে। আমাদের দিকে আঙ্গুল তুলে বলছে- ‘‘আমি বিশ্বজিৎ নই, আমি আজকের বাংলাদেশের মানুষের মধ্যকার একতার প্রতিচ্ছবি, রাজনৈতিক কূটচাল আর তোমাদের প্রত্যেকের ভবিতব্যের জলজ্যান্ত প্রতিচ্ছবি। ভাবছো, বিশ্বজিৎ মরেছে তো আমার কি? হা.....হা.....হা..... সবাই কান পেতে শোনো, আমার মায়ের আহাজারি শুনতে পাচ্ছ? ঐ শোনো আরেক মায়ের আহাজারি শুরু হয়েছে, ঐ শোনো আরেকজন। ঐ যে পূর্ব দিক থেকে মায়ের কান্নার শব্দ ভেসে আসছে, উত্তর দিক থেকে আসছে, পশ্চিম দিক থেকে, দক্ষিণ দিক থেকে। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মতো চারদিক ছাপিয়ে শুধু কান্না আর কান্না। কি শুনতে পাচ্ছ?”

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.