নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আরজু জু

আমি ফিনিক্স পাখি দেখিনি, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি ছাই থেকে উত্তরণ সম্ভব।

আরজু জু › বিস্তারিত পোস্টঃ

আমরা '৭১ দেখিনি, দেখেছি ২০১৩....

০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ সকাল ৭:৫১

আমি একাত্তর দেখিনি, দেখেছি তের। আমি মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম সাহস দেখিনি, দেখেছি তাদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ তাদের উত্তরসূরিদের মাঝে সেই সাহসের ঝলক। আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, দেখেছি মুক্তিযুদ্ধের অপমান মুছে ফেলার যুদ্ধ।



যখনও বড় হইনি তখন বাবাকে দেখতাম কারণে-অকারণে বাস্তবে বা টেলিভিশনে কাউকে রাজাকার বলে গালি দিতেন। তখন বুঝতাম না, ধীরে ধীরে বুঝতে শিখেছি- সাথে সাথে জন্ম নিয়েছে তাদের প্রতি অসহ্য ক্ষোভ, ঘৃণা। আমি একা বা গুটিকয়েক নয়, আরো কোটি কোটি মানুষের অনুভূতিও যে এক তা এই তেরতে এসে পুরো বিশ্ব তাকিয়ে দেখছে। এই অনুভুতি যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি ক্রোধের অনুভুতি, আমাদের ভালবাসার এই দেশ্টার কলঙ্ক দূর করার প্রত্যয়ের অনুভুতি।



৫ ই ফেব্রুয়ারি প্রহসনের রায়ের পর বিক্ষোভে ফেটে পড়ে পুরো দেশ। শাবিপ্রবি ক্যাম্পাসে ছাত্র-শিক্ষকরা মিলে সিদ্ধান্ত নিল তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিলের। বন্ধু শাহরিয়ারের নেতৃত্বে সাথে সাথে কোথা থেকে এসে গেল হাতে লেখা রক্ত গরম করা শ্লোগানের একগাদা পোষ্টার।

''ফাঁসির কাষ্ঠে রাজাকার, ভাষার মাসের উপহার'' ''ফাঁসি ছাড়া রায় প্রদান, মুক্তিযুদ্ধে অপমান''।

কিভাবে কিভাবে যেন তাৎক্ষণিকভাবে জড় হলো বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রী, সবার মুখে হতবিহব্বল ভাব, কেউ এই রায় মানতে পারছে না। জাফর স্যার বললেন, 'তোমরা হতাশ নও, তোমরা ক্রুদ্ধ, হতাশ হলে তোমরা ঘরে বসে হাহুতাশ করতে- কিন্তু তোমরা রাস্তায় নেমে এসেছ কিছু করবে বলে' বিক্ষোভ মিছিল চলল ক্যাম্পাসজুড়ে- শ্লোগানে মুখরিত,

''ফাঁসি চাই, ফাঁসি চাই, রাজাকারের ফাঁসি চাই''।



ধনঞ্জয় তৈরি করলো ফেসবুক ইভেন্ট। পুরো শাবিপ্রবি জানলো এই দুঃসময়ে তাদের প্রিয় ক্যাম্পাস আবার জেগে উঠবে সংগ্রামে। সবাই একটি ব্যাপারে সচেতন, কোনভাবেই যেন রাজনৈতিক কোন সংগঠনের কেউ আমাদের আন্দোলনের সাথে মিশতে না পারে। এই আন্দোলন শুধু আমাদের সাধারণ মানুষের, এর অপমান আমরা হতে দেব না। পরদিন সকালের মিছিলটা আরো অনেক বড়। পুরো ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে সবাই অবস্থান নিল সেক্টর কমান্ডার চত্বরে। অবস্থান কর্মসূচিতে চলল জাগরণের গান এবং শ্লোগান। তৈরি হল নতুন নতুন পোষ্টার, প্ল্যাকার্ড- ওরিয়ন এবং আর্কিটেকচারের ছাত্রদের আঁকা কার্টুন। অবস্থান কর্মসূচির পর র‍্যালি হবে, গন্তব্য চৌহাট্টা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বর। আমিনুল, শাহরিয়ারের তত্ত্বাবধানে জাফর স্যারের নেতৃত্বে দ্রোহের মন্ত্রে উজ্জীবিত প্রায় দুইহাজার ছাত্রছাত্রীর অংশগ্রহণে চলল মিছিল চৌহাট্টা অভিমুখে। ''এক দফা এক দাবি, রাজাকারের ফাঁসি চাই''।



আমার চার বছরের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে- ভুল বললাম, তেইশ বছরের জীবনে এমন দিন আর আসেনি। যেইদিনে শরীরে এতটুকু ভয় অনুভব করিনি। আমি জানি, অনুভব করেনি ওই দুই হাজার ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষক। ওই মিছিলের প্রতিটি সত্তা শিরায় শিরায় ক্রোধ অনুভব করেছে, দেশপ্রেমের তাড়না অনুভব করেছে। সবাই নতুন মুক্তিযুদ্ধের তাগিদে এসেছে, কাউকে ডেকে বা জোর করে অথবা লোভ দেখিয়ে আনতে হয়নি। যাদেরকে আমরা কোনদিন মনে করিনি আসবে, তারাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসেছে এবং আমাদের লজ্জা দিয়েছে অবিবেচনাপ্রসূত আন্দাজ করার। এই ছাত্রজনতা দুর্বার, কার সাধ্য আছে তাদেরকে রোখার! কেউ বাঁধা দিল না এই মিছিলকে- পাঁচ কিলোর অধিক পথ পাড়ি দিয়ে পৌছুলাম চৌহাট্টায়। পৌঁছে দেখি শহীদ মিনার চত্বর লোকে লোকারণ্য। শহীদ মিনারের সামনে পুরো সিলেট শহর যেন ভেঙ্গে পড়েছে! সিলেট সাংস্কৃতিক কর্মীদের নেতৃত্বে শুরু হয় অবস্থান কর্মসূচি। গান, শ্লোগান ও ব্যক্তিতার মধ্যদিয়ে শুরু হয় ক্ষোভ আর প্রতিবাদ প্রকাশ। জাগরণের গানে সুর ওঠে ''এ লড়াই বাঁচার লড়াই, এই লড়াই জিততে হবে''। চক দিয়ে শ্লোগান, শিল্পকর্ম ফুটে উঠতে থাকে পথের ক্যানভাসে। সকল মানুষ এখানে একাত্ম, রাজাকারদের ফাঁসি দিতেই হবে। সন্ধ্যা হতেই সংহতি জানিয়ে শয়ে শয়ে মোমবাতি জ্বলে ওঠে, পোড়ে কুশপুত্তলিকা, জ্বলে মশাল।



পরদিন সকালে অয়নের ‘রাজাকারের মুখে মুত্র ত্যাগ’ আহবানে সাড়া দিয়ে রাজাকারের প্রতিকৃতিতে সফলভাবে মুত্রত্যাগের পর ক্যাম্পাসে চলে রাজাকারদের ফাঁসির দাবীতে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। জাগরণের গান, কবিতা, নাটিকায়, শ্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস। বিকেলে যথারীতি চৌহাট্টা। আজ র‍্যালি হয়নি, কথা ছিল সবাই চৌহাট্টায় মিলিত হবে। মানুষ কমার কথা, আমরা একটা ট্রাক(ধন্যবাদান্তে আশিক) নিয়ে মিছিল করে চৌহাট্টা পৌঁছে হাসলাম- আজকে আমাদের ভার্সিটির ছাত্রছাত্রী আরো বেশি। চৌহাট্টা আজ যেন এক টুকরো শাহবাগ। আজ উৎসাহ আরও বেশি, শ্লোগান আরও জোরালো।



৮ ই ফেব্রুয়ারি, আজ ট্রাক র‍্যালির দিন, ট্রাকে করে ভার্সিটি থেকে চৌহাট্টা- মিছিল, শ্লোগান। যত দিন যাচ্ছে দাবী আরও জোরালো হচ্ছে, উদ্দীপনা আরও বাড়ছে, কণ্ঠ আরও সোচ্চার। আজ চৌহাট্টা পৌঁছে সত্যিকার অর্থেই চোখ কপালে উঠল, বুক ভরে উঠল। এই না হলে বাঙ্গালি, এই না হলে মুক্তিযোদ্ধার উত্তরসূরি! আজ তিল ধারনের জায়গা নেই। দলে দলে মানুষ যোগ দিয়েছে প্রতিবাদে। সবার চোখে আগুন, প্রতিহিংসার আগুন। ‘একাত্তরের কালে যারা পুড়াইছে তোর বাড়িঘর, ধর ধর ধর ধররে তোরা রাজাকাররে ধর’।



এই প্রজন্ম তরুণ প্রজন্ম। এই প্রজন্ম এর আগে কোন গণজাগরণের সাক্ষী হয়নি। হঠাৎ আসা এই নতুন গণজাগরণের সময়ে এই প্রজন্ম পিছু হঠে যায়নি, বরং সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। শাহবাগ মোড় প্রজন্ম চত্বর এই গণজাগরণের কেন্দ্রবিন্দু। আমি একটুও বাড়িয়ে বলছি না- কিন্তু এই কয়েকদিনে চৌহাট্টা মোড় শহীদ মিনার চত্বর আমার কাছে শাহবাগের চেয়ে বিন্দুমাত্র আলাদা মনে হয়নি। আমাদের কোন আক্ষেপ নেই আমরা শাহবাগ যেতে পারিনি, আমরা চৌহাট্টা গিয়েছি। যখন যাকে মনে হয়েছে- আজকে ও আসেনি কেন, ফোন দিয়ে শুনি হয় সে শাহবাগ নয়ত সে চৌহাট্টা। আন্দোলন পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিটি মুহূর্তে শ্লোগানে গায়ে শিহরণ জাগে, গণজাগরণের গানে গায়ে কাঁটা দেয়, মোমবাতির শিখা দেয় উদ্দীপনা, কুশপুত্তলিকা দাহ দেয় ঘৃণার উদগীরণ, মশালের আগুন ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ। এই যুদ্ধ সবে শুরু, রাজাকারদের ফাঁসি না দেওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলবে। স্বাধীনতার বিপক্ষের কোন শক্তি এতে বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না- এই ক্ষমতা কারো নেই। আমরা প্রতিদিন শাহবাগ যাব, চৌহাট্টা যাব, যেখানে আন্দোলন করা সম্ভব সেখানে আন্দোলন করব। আমরা এই রায় মানি না, ফাঁসি ছাড়া কোন রায় মানি না। শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও আমরা স্বাধীনতার মর্যাদা রাখব, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রাখব, শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না।

‘বাংলা মায়ের অপমান,

ফাঁসির মঞ্চে সমাধান’।

























মন্তব্য ২ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (২) মন্তব্য লিখুন

১| ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ বিকাল ৪:০৫

ঐদিকের কেউ!! বলেছেন: লেখা ভালো লাগসে , আরজু ভাই ! :)

০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ রাত ১১:১৪

আরজু জু বলেছেন: ধন্যবাদ, ধন্যবাদ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.