নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

Someone, who wanted to become so many things, ended being nothing, that raise the question, in innerself, was the goal becomnig \"Nothing\"!

মৌন পাঠক

মৌন পাঠক › বিস্তারিত পোস্টঃ

লাহোর প্রস্তাব, ৪৭, ৭১

০১ লা জুন, ২০২৬ সকাল ৭:৫০

১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের মূল পাঠে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলে একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্র বা independent states গঠিত হবে।

১৯৪৬ সালে লাহোর প্রস্তাব সংশোধন করে independent states শব্দটিকে পরিবর্তন করে একটিমাত্র রাষ্ট্র বা a sovereign independent State করা হয়।

১৯৪০ সালের প্রস্তাবটি গৃহীত হয়েছিল নিখিল ভারত মুসলিম লীগের জেনারেল সেশনে, যা ছিল দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম। অথচ ১৯৪৬ সালে এই মৌলিক সংশোধনীটি আনা হয় এর অধীনস্থ একটি লেজিসলেটরস কনভেনশনে, যার কোনো গঠনতান্ত্রিক বা আইনি বৈধতা ছিল না।

বাঙালি মুসলিম নেতারা, বিশেষ করে আবুল হাশেম যখন এই অসাংবিধানিক সংশোধনীকে চ্যালেঞ্জ করেন, তখন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ states শব্দটিকে স্রেফ টাইপোগ্রাফিক্যাল এরর বলে উড়িয়ে দেন। কাঠামোগত বিশ্লেষণে তার এই দাবি একেবারেই ধোপে টেকে না।

states শব্দটি ছাপার অক্ষরে লেখা ছিল, ছয় বছর ধরে এটি প্রচারিত হয়েছে এবং এটি নিয়ে ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্কও চলেছে। দীর্ঘ ছয় বছর পর আচমকা এটিকে মুদ্রণ প্রমাদ বলে দাবি করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

উপরন্তু, ১৯৪০ সালের মূল প্রস্তাবে স্পষ্টভাবে লেখা ছিল, constituent units should be autonomous and sovereign, যা গাণিতিক ও কাঠামোগতভাবে একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্রের সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ, কোনো এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রের সাথে নয়।

এই অবৈধ সংশোধনী এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হঠকারিতায় একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্রের বদলে ১৬০০ কিলোমিটার দূরত্ব এবং ভাষা ও সংস্কৃতির বিস্তর ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও ১৯৪৭ সালে একটি অবাস্তব এককেন্দ্রিক পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলো।

অথচ ১৯৪০ সালের মূল প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯৪৭ সালেই আমাদের এই বাংলা অঞ্চলে একটি আলাদা স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
১৯৪৬ সালের সেই সংশোধিত এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রকাঠামো যে তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিকভাবে ভুল ছিল, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তার চূড়ান্ত প্রমাণ।

ইতিহাসের আরেকটু পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, চতুর্দশ শতকে দিল্লি সালতানাতের ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারানি তার তারিখ-ই-ফিরোজ-শাহী গ্রন্থে বাংলাকে বলগাকপুর হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

বলগাকপুর শব্দের অর্থ বিদ্রোহের শহর বা বিদ্রোহের আবাসভূমি।

এই উপাধির যৌক্তিক কারণ ছিল বাংলার ভৌগোলিক দূরত্ব এবং এই অঞ্চলের শাসকদের বারবার দিল্লির কেন্দ্রীয় শাসন অস্বীকার করে নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করা। তুঘরিল খানের বিদ্রোহ কিংবা পরবর্তীতে ঈশা খাঁ, ও বারো ভূঁইয়াদের দিল্লির আধিপত্য বিস্তারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ইতিহাস সর্বজনবিদিত।

১৯৪৭ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শরৎচন্দ্র বসুর একীভূত সার্বভৌম বাংলা প্রস্তাবটি মূলত ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবেরই প্রতিফলন ছিল। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল যখন এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন, তখন তিনি বাংলার এই ঐতিহাসিক বলগাকপুর চরিত্রের কথাটিই মাথায় রেখেছিলেন। তিনি জানতেন, বাংলা একীভূত থাকলে তা দিল্লির একক নিয়ন্ত্রণে থাকবে না এবং তা যেকোনো সময় স্বাধীন হয়ে যেতে পারে।

অর্থাৎ কাঠামোগতভাবে ১৯৪০ সালের মূল লাহোর প্রস্তাব অনুসরণ করে বাংলা একটি আলাদা রাষ্ট্র হলে মুসলমানদের কোনো ক্ষতির সম্ভাবনা ছিল না। একীভূত বাংলা হোক বা বর্তমান বাংলাদেশ, উভয় ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রটি হতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ।

সম্প্রতি ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং কলকাতায় ঈদ বা গরু কোরবানি নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশে স্বাধীনভাবে গরু খেতে পারার জন্য জিন্নাহকে যে কৃতিত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং তাকে মহামানব হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী তিনি আদৌ এর যোগ্য কিনা তা কাঠামোগত বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

১৯৪৭ সালে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা বাস্তবায়িত হতে পারেনি এই কেন্দ্রীয় হঠকারিতা এবং ভূ-রাজনৈতিক হিসাবনিকাশের কারণে। জিন্নাহ প্রথমে একীভূত বাংলার পক্ষে মত দিলেও তা ছিল মূলত কংগ্রেসকে চাপে ফেলার কৌশল, কারণ তিনি জানতেন কংগ্রেস এটি মেনে নেবে না।

পরবর্তীতে জাতীয় কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভার সরাসরি ভেটো এবং মাউন্টব্যাটেনের বাইনারি বিভাজন পরিকল্পনার কারণে যখন একীভূত স্বাধীন বাংলা প্ল্যান আলোর মুখ দেখল না, তখন একপ্রকার বাধ্য হয়েই ভারতের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ বলয়ে যুক্ত না হওয়ার কৌশল হিসেবে পাকিস্তানের সাথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও একীভূত বাংলা প্ল্যানের কো-অথর সোহরাওয়ার্দী, প্রাদেশিক মুসলিম লীগের জেনারেল সেক্রেটারি ও একীভূত বাংলা প্ল্যানের মূল আর্কিটেক্ট আবুল হাশেম এবং ১৯৪০ সালের মূল লাহোর প্রস্তাব উত্থাপনকারী এ কে ফজলুল হক।

এখানে স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, জিন্নাহর একান্ত অনুগত খাজা নাজিমুদ্দিন যিনি ছিলেন ঢাকার উর্দুভাষী এলিটদের প্রতিনিধি এবং প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা আকরাম খাঁ, তারা উভয়েই শুরু থেকেই একীভূত বাংলার বিরোধী ছিলেন। মওলানা আকরাম খাঁ মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের সাথে পুরোপুরি একাত্ম হয়ে তার দৈনিক আজাদ পত্রিকার মাধ্যমে একীভূত বাংলার বিরুদ্ধে জনমত গঠনের কাজ করেছিলেন।

সুতরাং, আজ যদি নিজস্ব ধর্মীয় স্বাধীনতা বা গরু খাওয়ার অধিকারের জন্য কাউকে কৃতজ্ঞতা জানাতেই হয়, কাঠামোগতভাবে সেই ব্যক্তি জিন্নাহ নন।
এই কৃতজ্ঞতা প্রাপ্য সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশেম এবং এ কে ফজলুল হকের মতো নেতাদের, যারা অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে তৎকালীন বাস্তবমুখী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

অবশ্য অনেকের এই জিন্নাহ প্রীতির মূল কারণ ঐতিহাসিক সততা নয়, বরং পাকিস্তানের প্রতি তাদের রাজনৈতিক প্রীতি।

সরাসরি এই কথাটি বলতে না পেরে তারা বিভিন্নভাবে ১৯৪৭ সালের রেফারেন্স টেনে নিজেদের ন্যারেটিভ চালানোর চেষ্টা করছেন।

জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের সহযোগী প্ল্যাটফর্মগুলো ইদানীং ১৯৪৭ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করছে, ফেসবুকে প্রমোটেড পোস্ট দেওয়া হচ্ছে, যার মানে এখানে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বিনিয়োগ রয়েছে।

এর মূল লক্ষ্য হলো ১৯৪৭ সালের দেশভাগকে বড় করে দেখানোর মাধ্যমে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং পাকিস্তানের সেই কাঠামোগত পতনকে অবমূল্যায়ন করা।

ঐতিহাসিক তথ্য হলো, ১৯৪৭ সালে যারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, দীর্ঘ বঞ্চনার পর ১৯৭১ সালে তারাই পাকিস্তানের এককেন্দ্রিক কাঠামোর বিরুদ্ধে আন্দোলন করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছেন।

সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক স্ববিরোধিতা হলো, ১৯৭১ সালের মতো ১৯৪৭ সালেও জামায়াতে ইসলামী স্বাধীন পাকিস্তান বা ভারত কোনোটিরই পক্ষে ছিল না, তারা সরাসরি দেশভাগের বিরোধিতা করেছিল।

লজিক্যাল কনক্লুশন হলো, যারা ১৯৪৭ সালের সংগ্রামকে ধারণ করেন তারাই ১৯৭১ সালের সংগ্রামকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়েছেন। কাঠামোগতভাবে যাদের ১৯৭১ নেই, তাদের ১৯৪৭ সালের কৃতিত্ব নেওয়ারও কোনো আইনি বা যৌক্তিক অধিকার নেই।

সাইদ নাঈম
২৯.০৫.২০২৬
শোলক, বরিশাল


মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.