| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ঘটনা একঃ
পার্কের ছোট্ট বেঞ্চটায় একা বসে আছে শুভ্র। প্রচন্ড ঘামছে। হয়ত গ্রীষ্মের ভয়ানক গরমে, হয়তবা অন্য কোন কারনে। ঘাম মুছতে মুছতে হাতের রুমালটা পুরো কাকভেজা হয়ে গেছে। মাথায় হাজারটা চিন্তা কিংবা দুঃশ্চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে। শুভ্র জানেনা আজ তার ভাগ্যে কি পরিণতি অপেক্ষা করছে। রূপকথার রাজকুমারের মত জয় করে স্বপ্নের রাজকন্যার হাতে হাত রেখে ফিরে যাবে তার আপন রাজ্যে নাকি ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে মাথা নিচু করে ফিরে যাবে একাই।
মহাবিশ্বের সবকিছুই অনিশ্চিত। হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তাবাদ (The Uncertainity Principle) আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সুপ্রতিষ্ঠিত একটি তত্ত্ব। কেউ যদি একটি কণার গতিবেগ নির্ভুলভাবে জানতে চায় তাহলে সে কণাটির অবস্থান কখনই নিশ্চিতভাবে জানতে পারবেনা এবং বিপরীতেও ব্যপারটা একইভাবে সত্য। আর একেকটা মানুষতো মহাবিশ্বের সেইসব অসংখ্য ক্ষুদ্র কণাই বয়ে বেড়ায় আজীবন।
খুব সাবধানে বুকপকেটে আগলে রাখা কালো গোলাপটা ঠিক আছে কিনা দেখে নিল শুভ্র। কালো গোলাপ সহজে পাওয়া যায়না। শায়রাকে দিবে বলে প্রায় এক সপ্তাহ আগে অর্ডার দিয়ে বারশ টাকা দিয়ে গোলাপটা কিনেছে সে। শায়রার ঠিক দুইটা বাজে আসার কথা। লম্বা শ্বাস টেনে নড়ে বসল শুভ্র। নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে নিতে হবে। হাতঘড়িতে চোখ বুলিয়ে নিল সে।
একটা বায়ান্ন বাজে। আর মাত্র আট মিনিট বাকী। আসবেতো ও?
ঘটনা দুইঃ
আচমকা ঝাঁকুনিতে তন্দ্রাভঙ্গ হল হাসানের। কখন ঘুমিয়ে গেছে বুঝতেই পারেনি সে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে । প্রচন্ড গরম পড়েছে। বাসের সস্তা ফ্যান সামাল দিতে পারছে তার খুব অল্পই। হাসানের এ.সি.ওলা বাসে চড়ার সামর্থ্য নেই। প্রাইভেট কোম্পানির ছোট্ট একটা পোস্ট, ক’টাকাইবা বেতন। পানসে মুখে বাসের সিট থেকে উঠে দাঁড়াল সে। ড্রাইভারের রুক্ষ গলা শোনা গেল এইসময়।
“ওই বজলু, দেখ সব ঠিক আছে নাকি? মরার ইঞ্জিন স্টার্ট লয়না কেন!”
বাসের নিচ থেকে চেঁচিয়ে উঠল বজলু -
“হ ওস্তাদ, তেমন কিছুনা হয়নাইক্কা। এইবার বিসমিল্লাহ্ কইয়া ইঞ্জিন স্টার্ট মারেন।”
কয়েকবারের চেষ্টাতেই ইঞ্জিনের গর্জনে কেঁপে উঠল গোটা বাস। মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল হাসান। অনেকদিন পর গ্রামে যাচ্ছে সে। মায়ের সাথে দেখা হয়না প্রায় তিন মাস হয়ে গেল। কিন্তু মনে হয় যেন এক যুগ পার হয়ে গেছে। মা কত আশা করে অপেক্ষা করেন তার ছোট্ট ছেলেটা কবে বাড়ি ফিরবে। কবে পারবেন ছেলের মাথায় আদর করে হাত বুলিয়ে দিতে বা নিজের হাতে খাইয়ে দিতে কিংবা মাকে ভুলে গেছে বলে মিথ্যে অভিমান দেখাতে। তার প্রতিটা দিন কাটে ছেলের অপেক্ষায়। মার কথা মনে পড়তেই বুকে তীব্র কষ্ট অনুভত হল হাসানের। মার জন্যে অনেক কষ্টে টাকা বাঁচিয়ে এবার একটা সুতির শাড়ি কিনেছে সে। মা নিশ্চয়ই শাড়িটা পেয়ে কাঁদবেন আর পাগল ছেলেটাকে বকা দিবেন অযথা টাকা নষ্ট করার জন্যে। কিন্তু হাসান জানে মা খুবই খুশি হবেন। শাড়ির জন্যে না, নিজের ছোট্ট ছেলেকে কাছে পেয়ে। মার কাছে তার সন্তানেরা সবসময় ছোট্টই রয়ে যায়।
আর একটু পরেই হাসান পৌছে যাবে তার গন্তব্যস্থলে। এইত আর মাত্র আট মিনিট লাগবে।
ঘটনা তিনঃ
আফটার শেভ লাগাতেই গালের ছোট্ট কাঁটা জায়গাটায় ছ্যাঁৎ করে জ্বলে উঠল। আয়নার দিকে ঘাড় উঠিয়ে তাকাল মার্ক। প্রতিদিনকার অভ্যাসমত নিজেকে খুঁটিয়ে দেখা শুরু করল সে। চোখে অসংখ্য নির্ঘুম কাটানো রাতের ক্লান্তির ছাপ। সুদর্শন চেহারায় বয়সের ভাঁজ স্পষ্ট বোঝা যায়। বেক ব্রাশ করা চুলে পাক ধরতে শুরু করেছে বহু আগেই। কেউ দেখলে হয়ত কল্পনাও করবেনা পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতিভাবান বিজ্ঞানীদের মধ্যে সে একজন।
মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে তার আবিষ্কার করা ‘মার্কস ইকুএশন’; ‘মহান ঐক্যবদ্ধ তত্ত্ব’ (Grand Unified Theory) প্রতিষ্ঠার পথে মানবজাতিকে একধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। একটার পর একটা আবিষ্কার উপহার দিয়ে সে সমৃদ্ধ করে গেছে বিজ্ঞানকে। নিজেকে নিয়ে গেছে অনন্য এক উচ্চতায়। কিন্তু বিজ্ঞান বিজ্ঞান করতে করতে বিয়ে থা এর করা হয়ে উঠেনি। এই অসাধারণ মেধাবী মানুষটি সত্যিকার অর্থে খুবই নিঃসঙ্গ সময় পার করে। শহরের কোলাহল এর যান্ত্রিকতা থেকে দূরে মিনেসটার বিশাল অট্টালিকার সমৃদ্ধ নিজস্ব লাইব্রেরিতে বইয়ের ভিতর মাথা গুজে দিয়ে আর জটিল জটিল সব হিসাব কষেই তার বেশিরভাগ সময় কাটে। এ নিয়ে মার্কের অবশ্য কোন আফসোস নেই। রুটিনমাফিক জীবনেই অভ্যস্ত সে।
সময় হয়ে গেছে। মানবসভ্যতার ইতিহাসের সবচাইতে ঘটনাবহুল দিন আজ। কিন্তু পুরো পৃথিবীর একজন মানুষই সে সম্পর্কে অবগত। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে কাপড় বদলে নিল মার্ক। তারপর মন্থর গতিতে হেটে চলল লাইব্রেরীর দিকে। নাহ, প্রতিদিনকার মত আজ আর কোন জটিল গাণিতিক হিসাব করবেনা সে। অনেকদিনের পুরনো ইজি চেয়ারটায় গা এলিয়ে দিয়ে বসে ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিবে আর তখন,
তার সবচাইতে প্রিয় গানটা বাজবে ঠিক আট মিনিট ধরে।
ঘটনা 0 :
ঠিক এই মূহুর্তে প্রায় চার দশমিক ছয় বিলিয়ন বছর আগে জন্ম নেয়া পৃথিবী থেকে আট আলোক-মিনিট দূরে অবস্থিত, লক্ষ লক্ষ বছর ধরে পৃথিবীর রসদ যোগানো সূর্য নামে পরিচিত বিশাল অগ্নি-গোলকটা হঠাৎ নিভে যায় কোন এক অজ্ঞাত কারণে। সূর্যকে বিদায় জানানো শেষ আলোক কণাটা পৃথিবীতে পৌছাতে সময় লাগবে আর মাত্র আট মিনিট। তারপর...
ঘটনা ? :
আট মিনিট পড়ে হয়ত কোন এক সমান্তরাল বিশ্বে (parallel universe), শুভ্র পার্কের ছোট্ট বেঞ্চটায় বসে আছে শায়রার হাত ধরে। হাসান ফিরে গেছে তার মায়ের কাছে। মার্ক ও তার স্ত্রী লাইব্রেরীতে বসে আছে হাতে হাত রেখে, আর মার্কের সবচাইতে প্রিয় গানটা তখনও বেজে চলেছে।
©somewhere in net ltd.