নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

চেতনায় আন্দোলন

আন্দোলন একটি নিরন্তর বাস্তবতা... কখনো অধিকার আদায়ের জন্য আর কখনো অন্যের অধিকার কেড়ে নেয়ার জন্য.... আমি আছি সেখানে, যেখানে বিপ্লব আছে, বিপ্লবীরা আছে....

চেতনায় আন্দোলন

আন্দোলন একটি নিরন্তর বাস্তবতা... কখনো অধিকার আদায়ের জন্য আর কখনো অন্যের অধিকার কেড়ে নেয়ার জন্য.... আমি আছি সেখানে, যেখানে বিপ্লব আছে, বিপ্লবীরা আছে....

চেতনায় আন্দোলন › বিস্তারিত পোস্টঃ

ফারাক্কার অভিশাপ: মরুকরণের পথে দেশ

৩০ শে মে, ২০১৩ রাত ৯:২৪



বাংলাদেশ তার জন্ম লগ্ন থেকেই ভারতের সাথে বিভিন্ন সময় পানি সমস্যা নিয়ে বিরোধে জড়িত। ১৯৭৬ সালে ঐতিহাসিক লং মার্চ, বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক সরাসরি আলোচনা ও কূটনৈতিকভাবে সমাধানের প্রচেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কোন প্রচেষ্টাই কাজে আসে নি। বরং ফারাক্কা সমস্যার সমাধান করতে গেলে ভারত আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের দাবী করে। স্বাভাবিক কারণেই বাংলাদেশ জোর করে কোন কিছু বলতে পারে না। আন্তর্জাতিক নদী সংক্রান্ত আইনের দাবি বা¯Íবায়নের কথা বলা হলেও ভারত তাতে কোন গুরুত্ব দেয়নি। অসমভাবে ৩০ বছরের জন্য নদীর পানি বন্টন চুক্তি হলেও ভারত বাংলাদেশের প্রাপ্য অংশ কখনোই দেয়নি। অপরদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রবাহ যখন সবচেয়ে কম থাকে তখন ভারত প্রায় সম্পূর্ন পানি প্রত্যাহার করে নেয়। এই নীতি শুধু ফারাক্কা নয় বরং ভারত যে ৫২ টি নদীতে বাঁধ দিয়েছে তার সবগুলোর ক্ষেত্রেই করে থাকে।

ভারতের একতরফা গঙ্গার পানি সরাবার কারণে যে শুধু বাংলাদেশের পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে তা নয়; বরং এর ফলে বাংলাদেশের কৃষি, শিল্প, বন ও নৌ-পরিবহন ব্যাবস্থা ব্যাপক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে। এ বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আসে ২৯ অক্টোবর, ১৯৫১ সালে তখন তৎকালীন পাকি¯Íান সরকার গ্রীষ্মকালে পদ্মা নদী হতে বিপুল পরিমাণ পানি পশ্চিমবঙ্গের ভাগরথি নদী পুনরুজ্জীবিত করার জন্য অপসারণ করার ভারতীয় পরিকল্পনার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ভারত জবাব দেয় তাদের এই পরিকল্পনা প্রাথমিক পর্যায়ে আছে এবং এর ফলাফল সম্পর্কে পাকি¯Íানি উদ্যেগ শুধু মাত্র তত্ত¡ীয় ব্যাপার। সেই থেকে পদ্মার পানি বন্টন নিয়ে লম্বা আলাপ-আলোচনার জন্ম দেয়। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ভারত-পাকি¯Íান এই বিষয় নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে অনেক আলোচনা করে। কিন্তু এই আলোচনা যখন চলছিল তখন ভারত ফারাক্কা বাঁধের নির্মান কাজ অব্যহত রাখে এবং ১৯৭০ সালে এর কাজ সমাপ্ত করে। এ বাঁধ বাংলাদেশ-ভারত সিমান্ত হতে ভারতের প্রায় ১৮ কিলোমিটার অভ্যন্তরে অবস্থিত। ফারাক্কা বাঁধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ হলো- বাঁধের দৈর্ঘ্য ২.২৫ কিলোমিটার, সংযোগ খালের দৈর্ঘ্য ৪৩ কিলোমিটার, সংযোগ খালের পানি প্রবাহের ক্ষমতা ৪০,০০০ কিউসেক, গেটের সংখ্যা ১০৯টি, প্রতি গেটের প্রবাহ ক্ষমতা ৭০৯ কিউসেক, হুগলী-ভাগিরথীর প্রবেশস্থানে বাঁধের দৈর্ঘ্য ২২৪ মিটার।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্য ৫৪টি আন্তর্জাতিক নদী রয়েছে। ভারত বিভিন্ন সময়ে তার উন্নয়ন প্রকল্পের নামে ৫৪টি নদীর মধ্য ৫২টি নদীতেই বাধ নির্মান করে। যখন শুষ্ক মৌসুমে পানি হ্রাস পায় তখন এসব নদীর প্রবাহ একেবারে বন্ধ করে দেয়। বাদ থাকে ব্রহ্মপুত্র ও সুরমা (মেঘনা) নদী। ব্রহ্মপুত্র নদীতে বাধ নির্মান না করলেও ভারত স্পার নির্মানের মাধ্যমে ১০ হাজার কিউসেকের ও বেশী পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।

১৯৭৪ সালে ভারত ফারাক্কা বাঁধ পরীক্ষামূলকভাবে চালু করার জন্য বাংলাদেশের কাছে প্র¯Íাব দেয়। এই মর্মে ১৯৭৫ সালের ২১শে এপ্রিল থেকে ৩১শে মে অবধি ৪১ দিনের জন্য গঙ্গা নদী থেকে ১১,০০০-১৬,০০০ কিউসেক পানি অপসারিত করে ফিডার খাল দিয়ে প্রবাহিত করার ব্যাপারে বাংলাদেশ সম্মত হয়। কথা ছিল এর পরে চূড়ান্ত চুক্তি না সই হওয়া পর্যন্ত ভারত ফারাক্কা দিয়ে কোন পানি অপসারণ করবে না। ভারত সেই প্রতিশ্রæতি ভঙ্গ করে এককভাবে ১৯৭৫, ১৯৭৬ এবং ১৯৭৭ সালে ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে পানি সরাতে থাকে। হাজার বছর ধরে প্রবাহমান পদ্মা এভাবে অবরুদ্ধ হওয়ার ফলে নিদারুন পরিবেশ প্রতিক্রিয়া পুরো পদ্মা অববাহিকায় প্রতিভাত হয়। ১৯৭৬ সালের মে মাসে জাতিসংঘে বাংলাদেশ ভারতের এই অপকর্মের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে। বাংলাদেশের প্রতি এই অন্যায় পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত বাংলাদেশের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়। উলেøখ্য, ঐ বছরই মে মাসে ঐতিহাসিক ফারাক্কা মার্চ অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ এবং ভারতের মাঝে পাঁচ (১৯৭৭-১৯৮২) বছরের জন্য বন্টন চুক্তি হয়। ঐ চুক্তি মোতাবেক বাংলাদেশকে ফারাক্কা পয়েন্ট থেকে ৮০% পানি দেয়ার ব্যবস্থা হয়। উলেøখ্য, খরার মওসুমে ফারাক্কা পয়েন্টে পানি নিম্নতম প্রবাহ ৫৫,০০০ কিউসেক লক্ষ্য করা হয়েছে। অথচ ঐতিহাসিক প্রবাহ ১৯৪৯-১৯৬০ এই ন্যূনতম প্রবাহ ৮০,০০০ কিউসেকের বেশি। ফারাক্কার উজানে ভারত কর্তৃক ৩০,০০০-৪০,০০০ কিউসেক পানি অপসারণই এই অবস্থার জন্য দায়ী। বাংলাদেশ দীর্ঘস্থায়ী চুক্তির জন্য নেপালকে অন্তর্ভূক্ত করার প্র¯Íাব দেয় কিন্তু ভারত তাতে নারাজ।

১৯৮২ সালের পর ভারত চুক্তি নবায়ন করতে অস্বীকার করে। শুধু সাময়িক বোঝাপড়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রয়োজনের সম্পূর্ণ অপ্রতুল পানি ফারাক্কার বাঁধের মধ্য দিয়ে আসতে থাকে। ফারাক্কা এবং ফারাক্কার উজান থেকে পানি অপসারণের কারণে হার্ডিঞ্জ ব্রীজের কাছে পরিমাপিত পদ্মার প্রবাহ ভয়াবহ পর্যায়ে নেমে আসে (১১,০০০ কিউসেক) এবং ১৯৯৩ সালে এই প্রবাহের চরম অবনতি ঘটে (৯,০০০ কিউসেক)।

১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের সাথে ফারাক্কা পয়েন্ট প্রবাহ ভিত্তিতে ‘৩০ বছর’ মেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে বিভিন্ন প্রবাহ পরিস্থিতি অনুযায়ী বন্টন ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয় এবং ১৯৭৭-১৯৮৯ সাল অবধি গঙ্গার স্বাভাবিক প্রবাহকে বেঞ্চ মার্ক হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। লক্ষণীয়, এই সময়টাতে ভারত ইতিমধ্যেই ফারাক্কার উজান থেকে ব্যাপক হারে পানি অপসারণ শুরু করে। সুতরাং ফারাক্কা পয়েন্টে পানি ভাগাভাগি শুভংকরের ফাঁকি ছাড়া আর কিছুই না। এই চুক্তিতে বাংলাদেশকে খরার মওসুমে ৩৫,০০০ কিউসেক পানি দেয়ার গ্যারান্টি রয়েছে অথচ খরার সময় পদ্মা এবং তার শাখা প্রশাখাদের বাচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় নূন্যতম ৬০,০০০ কিউসেক। প্রশ্ন হচ্ছে ভারত ফারাক্কার উজানে বিপুল পরিমাণ পানি সরিয়ে কি কোন কাজে লাগাচ্ছে? না ! ভারত শুধু এক নদীর পানি সরিয়ে আরেক নদীতে প্রবাহ করছে। ফলে উত্তর প্রদেশ ও বিহারে দেখা দিয়েছে নিদারুন জলাবদ্ধতা। বিহারে ‘গঙ্গা মুক্তি আন্দোলন’ জোর দানা বাঁধছে। ফারাক্কা থেকে পানি সরিয়ে ফিডার খালের মধ্য প্রবাহিত করে কলকাতা বন্দরে পলি সঞ্চয়ন ও কোন ক্রমে রোধ করা যায়নি। এখন কলকাতার অভিজ্ঞ মহল পশ্চিম বঙ্গের সুন্দরবনের মধ্য নৌপথ সৃষ্টি করে কলকাতা বন্দরকে চালু রাখার সুপারিশ করছেন। গেল বছর ফারাক্কার দুটি গেট ভেঙ্গে গেছে। বাংলাদেশের ভিতর বেশি পানি প্রবেশ করছে এই নিয়ে পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী এবং সেখানকার মিডিয়া হৈচৈ করছে। মমতা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে গঙ্গা ও তি¯Íার পানি নিয়ে লোক দেখানো বচসা করছে।

নদীর পানি বন্টন বিশেষজ্ঞ ড. অ্যারন উলফ এবং ড. জশুয়া নিউটন তাঁদের “ঈধংব ঝঃঁফু ড়ভ ঞৎধহংনড়ঁহফধৎু উরংঢ়ঁঃব জবংড়ষঁঃরড়হ: ঞযব এধহমবং জরাবৎ ঈড়হঃৎড়াবৎংু” বই-এ বাংলাদেশের প্রতি অন্যায্য আচরণের কারণ হিসেবে উলেøখ করেছেন “টহবয়ঁধষ ঢ়ড়বিৎ ৎবষধঃরড়হংযরঢ়, রিঃযড়ঁঃ ংঃৎড়হম ঃযরৎফ ঢ়ধৎঃু রহাড়ষাবসবহঃ, পৎবধঃব ংঃৎড়হম ফরং-রহপবহঃরাব ভড়ৎ পড়ড়ঢ়বৎধঃরড়হ”। ভারতের তুলনায় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক দিয়ে খাটো। ভারত সে অবস্থার সুযোগ নিয়ে শক্তিশালী তৃতীয় পক্ষ তো দুরের কথা নেপালের মত ছোট দেশকেও আলোচনায় আনতে নারাজ। অথচ গঙ্গার জলপ্রবাহে নেপাল থেকে আগত নদী (কোশী ইত্যাদি) সমূহের অবদান অসামান্য। প্রসঙ্গতঃ ভারত ব্রক্ষপুত্রের পানি ঘুরিয়ে নিয়ে গাঙ্গেয় অববাহিকায় আনার তোগলকি পায়তারা করছে। ব্রক্ষপুত্রের উৎস চীনের তিব্বত। সামরিক দিক দিয়ে প্রায় শক্তিশালী পাকি¯Íানের সাথে ভারত সুবোধ বালকের মত সিন্ধু ও অন্যান্য নদীর সুসম পানি বন্টন মেনে নিয়েছে। একটি নদীর পানির ব্যবহার করার আগে বিবেচনা করতে হবে ঐ নদী প্রণালীবদ্ধের স্বাভাবিক প্রবাহের জন্য কতটা পানির প্রয়োজন। সেটি বাদ দিয়ে ব্যবহারের কথা ভাবতে হবে অর্থাৎ নদী হবে নিরবধি। উৎস থেকে সাগর সঙ্গম অবধি নদীকে বিবেচনা করতে হবে অখন্ড সামগ্রিক সত্ত¡া। এই মোতাবেক সংশিøষ্ট সকল দেশসমূহ নিয়ে গঠন করতে হবে ঐ নদীর ব্যবস্থাপনা কমিশন। মেকং, ড্যানিয়ুব এবং অন্যান্য নদীর ক্ষেত্রে যেমনটি হয়েছে। অন্যথা হলে সমগ্র অববাহিকার মানুষ পরিবেশ বিপর্যয়ের শিকার হবে এবং তারা ঐ ধরনের অবিমৃষ্যকারিতার বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। এটাই ইতিহাসের লিখন। শুধু গঙ্গাকেই নয়, ভারত বাংলাদেশ অভিমুখী সবকটি নদীকেই বাঁধ দিয়ে অবরুদ্ধ করার পায়তারা করছে। স¤প্রতি বরাক নদীর উপর টিপাইমুখ বাঁধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে গিয়েছে। ২০০৪ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনোমহন সিং টিমাইমুখ নামক স্থানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা বলে সেখানে বাধ নির্মানের জন্য ভিত্তি স্থাপন করে। ভারতের জলকমিশন ১৯৮৪ সালে প্রথম টিপাইমুখ বাঁধের প্র¯Íাব করে। যদিও তা প্রত্যাখ্যাত হয় তথাপি ১৯৯৫ সালে ব্র²পুত্র বোর্ড একটি প্রতিবেদন তৈরী করে এবং ১৯৯৯ সালে উত্তর পূর্ব বিদ্যুৎ কর্পোরেশন এর কাছে হ¯Íান্তর করে। ২০০৩ সালে তা অনুমোদন লাভ করে। ২০০৪ সালের ২৩ নভেম্বর ড. মনমহনসিং ভিত্তি প্র¯Íর স্থাপানের ঘোষণা দেন। ২০০৬ সালে ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার সুযোগে ভারতের কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ মন্ত্রিও ভিত্তি প্র¯Íর স্থাপন করে। টিপাইমুখ হবে সব বিবেচনায় বাংলাদেশের জন্য টাইম বম্ব। ভূকম্পনপ্রবন এই অঞ্চলটিতে অল্পমাত্রার কম্পন ঘটলে বাঁধে ফাটল দেখা দিবে এবং প্রাণঘাতী জলরাশি ভারতের সংশিøষ্ট অঞ্চলসহ বাংলাদেশের প্রায় পুরো পূর্বাঞ্চলকে নিশ্চিহ্ন করে দিবে। ইন্সটিটিউট অব অয়াটার মডেলিং (আসামের) পরিচালিত এক সমীক্ষায় বলা এ বাঁধ চালু হলে বরাক নদীর অমলশিদ পয়েন্টে পানি প্রবাহ কমে যাবে। জুন মাসে ১০% জুলাইয়ে ২৩% আগষ্টে ১৬% সেপ্টেম্বর ১৫% পানি কমে যাবে। একই সময়ে সুরমা নদী, কানাইঘাট ও সিলেট স্টেশনে পানির গড় উচ্চতা হ্রাস পাবে .৭৫ থেকে .২৫ মিটার পর্যন্ত। এর ফলে নদীতে যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাবে। সুনামগঞ্জ, সিলেট. মৌলভিবাজার ১০ হাজার হেক্টর জলাভূমি একেবারে শুকিয়ে যাবে এবং এই এলাকার হাওড়গুলো তার অতীত ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারবে না।

পানি প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে ভারতের দাবিগুলোর প্রথমেই যে কথা চলে আসে তা হল কলিকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষা। কলিকাতা বন্দরের যাত্রা আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর পূর্বে। এতদিন পেরিয়ে গেলেও এর পূর্বে কেন নাব্যতা সংকট নিয়ে প্রশ্ন আসল না। অথচ ভারত পাকিস্থান বিভক্ত হবার পর এই সমস্যা দেখা দিল। ভারতের ২য় যুক্তি হল সেচ সুবিধা। এক্ষেত্রে যে কথা প্রথমেই চলে আসে তাহল সেচ সুবিধার জন্য কি আন্তর্জাতিক নদীর পানি প্রত্যাহারই একমাত্র অবলম্বন না অন্য কোন উপায়ও ছিল। অথচ দেখা যায় নদী অববাহিকা বাদে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই সেচ সুবিধার ভূগর্ভ¯Í পানির উপর নির্ভর করে থাকে। আর নদী অববাহিকায় সেচ কাজের জন্য নদীর পানির উপর নির্ভর করে থাকে। ভারতের প্রধান উদ্দেশ্য হল এই নদীর পানি প্রত্যাহার করে নিয়ে গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশের বৃষ্টিহীন এলাকায় সেচ প্রদান। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় যে ভৌগলিকভাবে হাজার বছর ধরে যে সব এলাকায় বৃষ্টিপাতসহ অর্থনৈতিক ক্রিয়াকর্ম কম এবং একই কারণে জনবসতিও কম সেই এলাকায় সেচদানের জন্য ভারত এমন এলাকা থেকে পানি প্রত্যাহার করে নিয়ে যাবে যার অর্থনৈতিক কর্মকাÐ, কৃষি, যোগাযোগ ব্যবস্থা এমনকি অ¯িÍত্বও গড়ে উঠেছে নদীকে কেন্দ্র করে।

শুধু বাংলাদেশের ÿতিই নয় ফারাক্কা বাঁধের ফলে ভারতের অভ্যন্তরেও জনগণের বিরুদ্ধে পরিবেশ যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ভারতের প্রখ্যাত লেখিকা ও নর্মদা নদী বাঁচাও আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী অরুন্ধুতী রায় তার অসংখ্য লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরেছেন ভারতের অভ্যন্তরে বাঁধ নির্মাণের ফলে পরিবেশ বিপর্যয় এবং আনুষঙ্গিক মানবিক সমস্যার করুণ চিত্র। বাঁধ নির্মাণ ভারত সরকারের পুরানো বাতিক। নদী দেখলেই বাঁধ দেয়ার বাসনা নেহেরুর জমানা থেকেই চলে আসছে। অরুন্ধুতীর হিসেব অনুযায়ী গত পঞ্চাশ বছরে ৫০০০ ছোট বড় বাঁধ দেয়ার ফলে উদ্বাস্তু হয়েছে ৪ কোটি মানুষ। লক্ষ লক্ষ একর আবাদি জমি বিলুপ্ত হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় মাত্রারিক্ত ও লাগামহীন খনিজ আহরণের ফলে ভারতের সমগ্র কেন্দ্রীয় অঞ্চলে (পশ্চিম বঙ্গ, বিহার, ঝড়খন্ড ইত্যাদি) ঘটেছে ভয়াবহ পরিবেশ ভারসাম্যহীনতা। এ বিষয়ে কিছুদিন আগে আল জাজিরা টেলিভিশনে দেখানো রিপোর্টটি রীতিমত হৃদয়বিদারক। এখানকার মানুষ আগে থেকেই অবহেলিত এবং পশ্চাদপদ। তারা ¯্রফে জীবন বাঁচানোর জন্য তুলে নিয়েছেন অস্ত্র। ভারতের এক তৃতীয়াংশ জায়গা জুড়ে মাওবাদীদের নেতৃত্বে চলছে গেরিলা যুদ্ধ। খ্যাতনামা তরুণ ভারতীয় লেখক অরবিন্দ আদিগা তার ‘ডযরঃব ঞরমবৎ’ উপন্যাসে দক্ষ হাতে তুলে ধরেছেন বিহারের সামাজিক পরিস্থিতি।

উজানের কোন দেশের ভাটির দেশকে না জানিয়ে আন্তর্জাতিক নদীর পানি প্রত্যাহার করা জাতিসংঘ কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক রীতি-নীতির সুস্পষ্ট লংঘন। অথচ ভারত প্রথম থেকেই ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়ে বিশ্বকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে এ কাজটি করে যাচ্ছে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে। এ থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের করণীয় হচ্ছে-

১. ফারাক্কার অশুভ প্রভাব সম্পর্কে ব্যাপক জনমত এবং জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা। কাদা ছোড়াছুড়ির বিভেদাত্মক রাজনীতির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে জাতীয় স্বার্থে সরকার, বিরোধী দল সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে এ সম্পর্কে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

২. ফারাক্কার কারণে বাংলাদেশের ক্ষয়-ক্ষতির কথা বিশ্বের দরবারে তুলে ধরে বিশ্ব জনমত গড়ে তোলা। প্রয়োজনবোধে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক বিচারালয়ের দ্বারস্থ হওয়া।

৩. চীন, ভারত, নেপাল ও ভুটানসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পানি সমস্যার সমাধানে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা। সাথে সাথে এ লক্ষ্যে ‘আঞ্চলিক নদী কমিশন’ গঠন করা ও আন্তর্জাতিক নদীর পানি ব্যবহারের নিয়ম-নীতির বা¯Íব প্রয়োগ ঘটানো ও তদারকি করা।

৪. দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে ভারতকে চাপ প্রয়োগ করা, যাতে ভারত তার নব পরিকল্পিত একতরফা আন্ত:নদী সংযোগ প্রকল্পের কাজ বাতিল করে।

৫. আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা। মেকং নদী কমিশনের মতো বাংলাদেশও একটি কূটনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। মেকং নদীর পানি কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, লাওস ও ভিয়েতনাম সুষ্ঠুভাবে বণ্টন করে নিচ্ছে। ইউরোপের দানিয়ুব নদীর পানি পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে ১২টি দেশ ভোগ করছে। নীল নদের পানি ভোগ করছে মিশর, সূদান ও ইথিওপিয়া। এমনকি ‘চিরশত্রু’ পাকিস্তানের কাছ থেকে সিন্ধু নদীর পানি ভারত ভোগ করছে ৩০ বছর আগ থেকে। এ অভিজ্ঞতাকে বাংলাদেশ কাজে লাগাতে পারে।

৬. ভারত যেন সবসময় গঙ্গার পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রন্ত না করে সেজন্য দু’দেশের প্রয়োজনীয় সমঝোতায় উপনীত হওয়া ও তা যথাযথভাবে বা¯Íবায়ন করা।

৭. গঙ্গা নদীর উপর ফারাক্কা ছাড়াও তি¯Íা নদীর উপর গজলডোবা বাঁধ ভেঙ্গে ফেলা ও সুরমা-বরাকের উপর ‘টিপাইমুখ বাঁধ’ নির্মাণ বন্ধ করার জন্য এÿুনি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

৮. ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে ৫ কোটি মানুষ, গজলডোবা বাঁধের প্রভাবে ৪ কোটি মানুষ এবং টিপাইমুখ বাঁধের প্রভাবে ৫ কোটি মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্র¯Í হবে এবং বাংলাদেশের বৃহত্তম নদী পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা চিরদিনের মত হারিয়ে যাবে। পরিবর্তিত হবে জলবায়ু ও প্রাকৃতিক পরিবেশ, ধ্বংস হবে মানুষ, পশু-পক্ষী, মাছ ও অন্যান্য সম্পদাদি। অতএব সরকারি ও বেসরকারি সকল প্রকার প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এগুলি ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে দেশীয় জনমত ও বিশ্ব জনমত গড়ে তোলা সবার আগে জরূরী।

এ ÿেত্রে আমাদেরও কিছু দুর্বলতা রয়েছে। যেমন, বিগত ৪০ বৎসরে আমরা আমাদের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বকে সুসংহত করতে ব্যর্থ হয়েছি। শুধু ভারত কেন অন্যান্য শক্তিধর দেশের কাছে আমাদের রাজনিতিবিদ, আমলা, কূটনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবিরা সেবাদাসের মত আচরণ করেছেন। দেশের যৎসামান্য তেল ও গ্যাস অবিশ্বাস্য শর্তে ইজারা দিয়েছেন। স্বাধীনতা শহীদদের কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মনে হয় শুনতে পাই করুণ আক্ষেপ ‘ইতিহাস যেন নীরব সাক্ষী তুমি, আমরা চেয়েছি স্বাধীন স্বদেশ ভূমি।’ দেশপ্রেমের ভিত্তিতে জাতীয় বিকাশের অঙ্গীকার কোন বিমূঢ় আষ্ফালন নয়। এই মর্মে জাতীয় অর্থনীতিকে বিকশিত করার অভিলক্ষ্যে জ্ঞান বিজ্ঞানের সকল শাখাকে পরিপূর্ণ রূপে বিকশিত করার প্রয়োজন রয়েছে। স্বনির্ভরতার ভিত্তিতে পরিবেশ বান্ধব কৃষি ও শিল্প বিকাশের নিরিখে দেশীয় বিজ্ঞান গবেষণাকে জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে। এশিয়ার যে’কটি দেশ অতি দ্রæত সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন করেছে তার প্রত্যেকটির পেছনে চালিকা শক্তি হলো দেশীয় সমস্যার প্রেক্ষিতে বিজ্ঞান গবেষণার উন্নতি। জাতীয় বিকাশের অন্যতম শর্ত হলো অনৈক্য ও বিভাজন উপাদানের নূন্যতম উপস্থিতি। এই প্রেক্ষিতে ভারত ও পাকি¯Íানের তুলনায় স্ট্রাটেজিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের অবস্থান অনেক ভালো। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া অবধি এই বিশাল জনগোষ্ঠি প্রায় একই ভাষা, ঐতিহ্য, আচার-আচরণের সূত্রে গ্রথিত। এতদসত্তে¡ও গণতন্ত্রের কন্ঠরোধ, জাতীয় অনৈক্য, চরম দুর্নীতি, জানমালের নিরাপত্তাহীনতা, দ্রব্যমূল্যের আকাশচুম্বী অবস্থান ও শিক্ষা ক্ষেত্রে চরম নৈরাজ্য প্রত্যবেক্ষন করে মনে হয় এক অবলুপ্তির অমানিশা বাংলাদেশকে গ্রাস করেছে। দেশের এই ক্রা¯িÍ লগ্নে তরুণ প্রজন্মকেই এগিয়ে আসতে হবে দেশ ও জাতিকে বাঁচানোর জন্য। শপথ নিতে হবে-

ফারাক্কার অভিশাপের পর এবার এল টিপাই মুখ

প্রতিরোধের জন্য আজ পেতে দিতে হবে বুক

পানির বদলে রক্ত দিয়ে না হয় আজ নদীগুলো ভাসুক

রক্তের ¯্রােতে তলিয়ে যাক তাদের টিপাইমুখ।

৩৯ বছর আগে, ১৯৭৬ সালের ১৬ই মে, ফারাক্কায় অবরুদ্ধ বাংলাদেশের জীবন রেখা পদ্মা নদীকে অবমুক্ত করার মহান অভিলক্ষ্যে মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে সংগঠিত হয়েছিল ঐতিহাসিক ফারাক্কা মার্চ। বাংলাদেশের আনাচে কানাচে থেকে সমাগত ৫০ হাজার প্রত্যয়দীপ্ত পদাতিকের রাজশাহী থেকে কানসাট সীমান্ত অবধি ৪৪ মাইল পদযাত্রা শেষে বিশাল জনসমুদ্রে অশতিপর বৃদ্ধ মাওলানা বিশ্বজনতার প্রতি বলেছিলেন, ‘গঙ্গার পানিতে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যার ন্যায়সঙ্গত দাবি মেনে নিতে ভারত সরকারকে বাধ্য করার জন্য আমাদের আন্দোলন, আমি জানি, এখানেই শেষ নয়’। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে আরো বলেন, ‘ভারত সরকারের জানা উচিত, বাংলাদেশীরা আলøাহ ছাড়া কাউকে ভয় পায় না, কারও হুমকিকে পরোয়া করে না। যেকোন হামলা থেকে মাতৃভূমিকে রক্ষা করা আমাদের দেশাত্মবোধক কর্তব্য এবং অধিকার’। গত ৩৬ বছরে ঐতিহাসিক মার্চের ধারাবাহিকতায় দেশে এবং বিদেশে জনমত সংগঠিত হয়েছে, হচ্ছে। মরণ বাঁধ ফারাক্কার বিরুদ্ধে বাংলার জনগণের প্রতিরোধ সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে এবং থাকবে।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.