নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নৈপথ্যে

আহমেদ জিসান

আমি সালেহ আহমেদ, পড়ছি যন্ত্রকৌশল বিভাগ, চট্রগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়গুলোর প্রতি স্বাভাবিক কৌতূহল থেকে ব্লগিং এর শুরু।

আহমেদ জিসান › বিস্তারিত পোস্টঃ

জেনো’র প্যারাডক্স- ‘একিলিস এবং কচ্ছপ’ এর দৌড়

১১ ই নভেম্বর, ২০১৫ দুপুর ১:৩২

গণিতের অন্যতম বিখ্যাত আর বহুল আলোচিত এক ধাঁধাঁ এটি। প্রাচীন ইটালীয়ান দার্শনিক জেনো তখনকার সময়ের প্রায় ৪০টি অসাধারণ গাণিতিক প্যারাডক্স দিয়ে যান যার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত আর জনপ্রিয় এই ‘একিলিস এবং কচ্ছপ’ প্যারাডক্স।
বিখ্যাত ট্রোজান যুদ্ধের গ্রীক বীর একিলিস আর এক কচ্ছপের মাঝে দৌড় প্রতিযোগীতা হচ্ছে। বীর হিসেবে একিলিসের যথেষ্ঠ সুনাম। সুতরাং সে ঠিক করল ছোট্ট এই কচ্ছপের সাথে প্রতিযোগীতায় সে কছপের চেয়ে (মাত্র) দ্বিগুণ বেগে দৌড়াবে। আর রেসের শুরুতে কচ্ছপ ‘ফেয়ার প্লে’ বজায় রাখার জন্য গ্রীক বীরের চাইতে ১ মিটার সামনে থেকে দৌড় শুরু করতে চাইল। শর্ত অনুযায়ী প্রতিযোগীতা শুরু হল।


উপরের ছবিটির মত, কচ্ছপ শুরু থেকে যতক্ষণে ০.৫ মিটার অতিক্রম করল, একিলিস অতিক্রম করল ১ মিটার, অর্থাৎ কচ্ছপটির আগের অবস্থানে। কারণ শুরুতেই বলা হয়েছে একিলিস কচ্ছপের দ্বিগুণ বেগে দৌড়াচ্ছে। দুজনের মধ্যে দূরত্ব এখন (১.৫-১) ০.৫ মিটার। কচ্ছপ যতক্ষণে পরবর্তী ০.২৫ মিটার গেল, একিলিস ততক্ষণে আগের অবস্থান থেকে ০.৫ মিটার এগিয়েছে। অর্থাৎ এখন দুজনের ব্যবধান (১.৭৫-১.৫) ০.২৫ মিটার।

তো শুরু থেকে প্রত্যেকটি অবজার্ভেশন এ একিলিস এবং কচ্ছপের মধ্যে ব্যবধান পর্যায়ক্রমে ১ মিটার, ০.৫ মিটার, ০.২৫ মিটার ইত্যাদি। লক্ষ্য করি, প্রত্যেকবার ব্যবধান আগের ব্যবহারের অর্ধেক হচ্ছে। এদের মধ্যে ব্যবধান কমছে ঠিকই কিন্তু ব্যবধান শূণ্য হচ্ছেনা, বরং একটি গুণত্তর ধারা সৃষ্টি করছে (১, ০.৫, ০.২৫, ০.১২৫, ……) যেটির উপাদান যত ক্ষুদ্রই হোক, কখনো শুণ্য হবেনা, যদিও একিলিস দৌড়াচ্ছে কচ্ছপের দ্বিগুণ বেগে! অর্থাৎ এভাবে অনন্তকাল দোড়ালেও একিলিস কখোনই কচ্ছপটিকে পেছনে ফেলতে পারবেনা!!!!!!!

ব্যাখ্যাঃ

এই প্যারাডক্সটির সমাধান আমাদের দৈলন্দিন বাস্তবতা থেকেই গাণিতিক হিসেব নিকাশ ছাড়া অনেক সহজেই অনুমান করা যায়। কেননা, একিলিসের বেগ যেহেতু কচ্ছপের দ্বিগুণ, একটি নির্দিষ্ট সময়ে একিলিস এর অতিক্রান্ত দূরত্ব অবশ্যই কচ্ছপের চাইতে বেশী হলবে। সুতরাং কিছু সময় পরেই একিলিস এর মোট অতিক্রান্ত দূরত্ব কচ্ছপের মোট অতিক্রান্ত দূরত্বে্র চাইতে পুরোপুরি ১ মিটার বেশী হবে, অর্থাৎ তারা মূহুর্তের জন্য এক সারিতে পাশাপাশি অবস্থান করবে এবং এরপর থেকে তার সাথে কচ্ছপটির ব্যবধান বাড়তে থাকবে। কিন্তু সমস্যাটি দার্শনিক জেনো এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যে আমাদের চিন্তার ধারাটাই শুরু থেকে ভ্রান্তিকর পথে এগোতে থাকে!

সংখ্যারেখার যেকোন পূর্ণসংখ্যার মাঝে অসীম সংখ্যক দশমিক সংখ্যা রয়েছে যাদের কখনো গুণে শেষ করা অসম্ভব। একইভাবে বাস্তবে একটি নির্দিষ্ট দূরত্বকে ইচ্ছেমত যত খুশি তত (অসীম সংখ্যক) ভাগে ভাগ করা যায়, কিন্তু তাদের সম্মিলিত যোগফল কিন্তু ওই সসীম নির্দিষ্ট দূরত্বটিই। ব্যাপারটা আরেকটু সহজে বোঝা যায় এভাগে- একটি কুমড়াকে যদি প্রতিবার অর্ধেক করে কেটে যেকোন একটি টুকরোকে রেখে অপরটিকে যদি আবার অর্ধেক করা হয় এবং এভাবে যদি অনন্তকাল কাটতে থাকা হয় তাহলে কুমড়াটির অসীম সংখ্যক বিভাজন সম্ভব। কিন্তু সবগুলো টুকরোর যোগফল কিন্তু ওই একটি কুমড়াই!!
এই প্যারাডক্সে দুভাবে উপরে বর্ণিত সহজ সরল হিসেবের পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। প্রথমত একটি সসীম দৈর্ঘ্য বা দূরত্বকে অসীম সংখ্যক ভাগে ভাগ করে, দ্বিতীয়ত দূরত্বে্র প্রতিটি অংশের জন্য আলাদা আলাদা সময় গনণা প্রবর্তন করে। জেনো’র প্যারাডক্সে একিলিস এর অতিক্রান্ত দূরত্বগুলোর যোগফল-
১+০.৫+০.২৫+০.১২৫+……(অসীম পর্যন্ত)= ২.০০ মিটার! (অসীম ধারার সমষ্টি)
একইভাবে সমান সময়ে কচ্ছপটির মোট অতিক্রান্ত পথ-
০.৫+০.২৫+০.১২৫+……(অসীম পর্যন্ত)= ১.৫ মিটার!
দেখা যাচ্ছে একটি নিদৃষ্ট সময় পর একিলিস আর কচ্ছপের মধ্যে কোন দূরত্ব থাকবেনা! অর্থাৎ এর পর মুহুর্ত থেকে একিলিস এগিয়ে যাবে, এবং এটিই বাস্তবে ঘটবে। কিন্তু প্যারাডক্সে বর্ণিত নিয়মে আমাদের একিলিস কিংবা কচ্ছপের অতিক্রান্ত মোট পথ বের করার জন্য অসংখ্যবার দূরত্ব যোগ করে যেতেই হবে, যেটি কখনো শেষ হবার নয়। আর এই কারণেই অনন্তকাল পরেও একিলিস এর কচ্ছপকে পেছনে ফেলা সম্ভব নয়!

দৃশ্যত অসীমসংখ্যক সংখ্যা যোগ করার এই সহজ সাধারণ সমাধানটির মধ্যেই ‘অসীম’ এর সৌন্দর্য নিহিত। এই ধরণের ‘কনভারজেন্ট’ অসীম ধারার (যার প্রত্যেকটি পদের মান আগের পদের চাইতে নিদৃষ্ট অনুপাতে কম) প্রত্যেকটি পদ আলাদা করে যোগ করতে থাকলে সেই যোগ কখনোই শেষ হবেনা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধারাটির মোট যোগফল কত হবে তা আমরা বলে দিতে পারি সুত্রের সাহায্যে। যেমন কুমড়াটিকে ভাগ করতে থাকলে তা অনন্তকাল ধরে করা যাবে, কিন্তু সব মিলিয়ে মোট কুমড়ার সংখ্যা অর্থাৎ যোগফল একটি কুমড়াই!
এবার আসি সময় ব্যবধানকে আসীম সংখ্যক ভাগে ভাগ করা বিষয়ে। আমরা জানি একিলিস রেস এ এগিয়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত অতক্রান্ত দূরত্ব ২ মিটার। স্বাভাবিকভাবেই এই দুই মিটার এর প্রথম অর্ধেক সে একটি সসীম সময়ের মধ্যে শেষ করলে বাকি অর্ধেকও একই সময়ে শেষ করবে, যেহেতু তার বেগের কোন পরিবর্তন হচ্ছেনা। কিন্তু জেনোর প্যারাডক্সে এই সময় ব্যাবধানকে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর ভাগে ভাগ করে ফেলার কারণে সময় ‘প্রবাহিত’ হওয়ার হার আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে যেটি বাস্তবে কখনোই সম্ভব নয়! কারণ সময় সবসময় একই ‘গতি’তে প্রবাহিত হয়। সুতরাং সসীম সময়কালকে এভাবে অসীম সংখ্যক ভাগে ভাগ করা গাণিতিকভাবে সম্ভব হলেও বাস্তবে অসম্ভব! আর এই কারণেই প্যারাডক্সটিকে গাণিতিকভাবে অনন্তকাল ধরে চলতে থাকা একটি প্রক্রিয়া মনে হলেও বাস্তবে তা সসীম।

আরেকটি প্রাসঙ্গিক ধাধার মাধ্যমে লেখাটি শেষ করি- বিখ্যাত ‘থম্পসনের ল্যাম্প’। একটি টেবিল ল্যাম্পকে ৬০ সেকেন্ড জ্বালিয়ে রেখে পরের ৩০ সেকেন্ড বন্ধ করে রাখা হল। আবার একে ১৫ সেকেন্ড জ্বালিয়ে রেখে পরের ৭.৫ সেকেন্ড বন্ধ করে রাখা হল। এভাবে প্রতিবার আগের সময়ের অর্ধেক সময় ধরে এই জ্বালানো-নেভানো প্রক্রিয়া চলতে থাকল। প্রত্যেকটি ধাপের সময়কাল চিন্তা করলে দেখতে পাই, এটিও একটি কনভার্জেন্ট অসীম ধারা, যার অসীমতক যোগফল ১২০ সেকেন্ড বা ২ মিনিট-
৬০+৩০+১৫+৭.৫+৩.৭৫+………… = ১২০ সেকেন্ড
আমার প্রশ্ন হচ্ছে, ঠিক ২ মিনিট বা ১২০ সেকেন্ড পর-
১. বাতিটি কি অবস্থায় আছে? জ্বালানো অথবা নেভানো?
২. যদি শুরুতে বাতিটিকে জ্বালিয়ে না রেখে ৬০ সেকেন্ড নেভানো অবস্থায় প্রক্রিয়াটি শুরু করা হত, তাহলে প্রথম প্রশ্নের উত্তর অন্যরকম হত কি না?

মন্তব্য ২ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (২) মন্তব্য লিখুন

১| ১১ ই নভেম্বর, ২০১৫ বিকাল ৩:০০

দরবেশমুসাফির বলেছেন: জেনো’র প্যারাডক্স ডেমোক্রিটাস এর এটম মতবাদের মাধ্যমে সমাধান হয়ে গেছে। তারপরও অবশ্য এর মজা কমে যায় নি।

বি দ্রঃ "আচিলিস" বানানটি ভুল আসল বানান "একিলিস"।

১১ ই নভেম্বর, ২০১৫ সন্ধ্যা ৭:০৩

আহমেদ জিসান বলেছেন: সেটাই…প্যারাডক্সটির সৌন্দর্য্য আসলেই প্রতিবার মুগ্ধ করে।আর ধন্যবাদ সংশোধনীর জন্য। আমি নিজেও নিশ্চিত ছিলামনা।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.