নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

১৪৩

সাইবার সোহেল

আমি একজন অতি সাধারন বাংলাদেশী। আমি আমার দেশ ও দেশের মানুষকে খুব ভালবাসী। আগ্রহী যে কেউ আমার সাথে বন্ধুত্ব করতে পারেন।

সাইবার সোহেল › বিস্তারিত পোস্টঃ

কেপ ভার্দে বনাম স্পেন: ০-০, কিন্তু আমরা কবে পারবো?!!!

১৬ ই জুন, ২০২৬ ভোর ৪:৩৯

গতকাল আটলান্টায় যা ঘটেছে, সেটা শুধু একটা ফলাফল না, একটা গল্প। বিশ্বকাপে প্রথমবার খেলতে আসা কেপ ভার্দে, মাত্র ৫ লাখ মানুষের একটা দ্বীপদেশ, পুরো ৯০ মিনিট আটকে রাখলো ২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনকে। স্পেন বল দখলে রাখলো, সাতটা শট গোলে মারলো, কিন্তু গোলরক্ষক ভোজিনহার (৪০ বছর বয়স!) দেয়ালের সামনে সব আটকে গেল। শেষ পর্যন্ত ০-০।
খেলাটা দেখতে দেখতে মনে একটা প্রশ্ন এসেই গেল— যেটা প্রতি বিশ্বকাপেই বাংলাদেশী ফুটবলপ্রেমীদের মনে আসে। কেপ ভার্দের মতো একটা দেশ, যাদের পুরো জনসংখ্যা ঢাকার একটা থানার চেয়েও কম, তারা বিশ্বকাপে খেলে। আর আমরা, ১৭ কোটি মানুষের দেশ, এখনো এশিয়ার মাঝারি সারির দলগুলোর সাথেই হাঁসফাঁস করি। তাহলে আসল পার্থক্যটা কোথায়— টাকায়, প্রতিভায়, নাকি অন্য কিছুতে?
চলুন তিনটা দেশকে পাশাপাশি রেখে দেখি।
তিনটা দেশ, তিন রকম গল্প
**স্পেন** নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই— ইউরোপের ফুটবল-সাম্রাজ্যগুলোর একটা, লা মাসিয়া-লেভান্তে-আথলেটিকোর মতো একাডেমি থেকে প্রতি বছর বিশ্বমানের খেলোয়াড় বেরিয়ে আসে, পুরো দেশের অর্থনীতি, মিডিয়া আর সংস্কৃতি ফুটবলকেন্দ্রিক।
**কেপ ভার্দে** আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের কাছে আটলান্টিক মহাসাগরের ১০টা দ্বীপের একটা দেশ। জনসংখ্যা মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখের মতো। অর্থনীতির আকার বছরে প্রায় ২.৮ বিলিয়ন ডলার— অনেক বাংলাদেশী শহরের বাজেটের চেয়েও ছোট। মাথাপিছু আয় মাঝারি (নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ), প্রাকৃতিক সম্পদ বলতে গেলে নেই, পর্যটন আর মৎস্য শিকারই মূল চালিকাশক্তি।
**বাংলাদেশ** জনসংখ্যায় কেপ ভার্দের চেয়ে প্রায় ৩০০ গুণ বড়, অর্থনীতির আকারও কেপ ভার্দের তুলনায় শতগুণ বড়। অথচ ফিফা র‍্যাংকিংয়ে আমরা এখন প্রায় ১৮০তম, আর কেপ ভার্দে— ৬৪তম। মানে যে দেশের জনসংখ্যা আমাদের চেয়ে ৩০০ গুণ ছোট, তাদের ফুটবল র‍্যাংকিং আমাদের চেয়ে ১১৫ ঘর ভালো।
এই পরিসংখ্যানটাই বলে দেয়— এখানে টাকা বা জনসংখ্যা প্রধান ফ্যাক্টর না।
তাহলে কেপ ভার্দে কীভাবে পারলো?
১. ডায়াস্পোরা— বিদেশে জন্ম নেওয়া "দেশপ্রেমিক" খেলোয়াড়রা...
কেপ ভার্দের ইতিহাসে শত বছর ধরে মানুষ পর্তুগাল, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডসে অভিবাসী হয়ে গেছে। ফলে কেপ ভার্দিয়ান বংশোদ্ভূত হাজারো ফুটবলার ইউরোপের বড় লিগ আর একাডেমিতে বেড়ে উঠেছে। কেপ ভার্দে ফেডারেশন এই খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করে, তাদের কেপ ভার্দের জার্সি পরানোর জন্য রাজি করায়। এই দলটার ভোজিনহা-ই হোক বা অন্য কেউ— অনেকেই ইউরোপের প্রফেশনাল কাঠামোয় তৈরি হওয়া খেলোয়াড়।
বাংলাদেশও এই পথে হাঁটা শুরু করেছে— সেটা নিয়ে নিচে আলাদা একটা অংশে বিস্তারিত আলোচনা করছি।
২. কনফেডারেশনের বাস্তবতা— প্রতিযোগিতার মাঠ ভিন্ন
এটা একটা স্পর্শকাতর কিন্তু জরুরি পয়েন্ট। কেপ ভার্দে আফ্রিকা মহাদেশ (CAF) থেকে বাছাই পর্ব পার হয়ে এসেছে— বাছাইয়ে তারা মরোক্কো, ক্যামেরুনের মতো শক্তিশালী দলকে পেছনে ফেলে গ্রুপ-চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আফ্রিকার বাছাই প্রক্রিয়ায় মাঝারি মানের একটা দলের জন্য সুযোগের জায়গা তৈরি হয়।
আর বাংলাদেশ পড়ে এশিয়ায় (AFC)— যেখানে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান, সৌদি আরব, অস্ট্রেলিয়া, কাতারের মতো এশিয়ার ফুটবল-পরাশক্তিরা আছে। AFC-র বাছাই প্রক্রিয়া এমনভাবে সাজানো যে নিচের সারির দলগুলোর জন্য টপ লেভেলে ওঠার পথ অনেক বেশি দীর্ঘ আর কঠিন। তাই "কে কতটা যোগ্য" এই প্রশ্নের পাশাপাশি "কোন মহাদেশের কোন গ্রুপে পড়েছে" সেটাও একটা বড় ফ্যাক্টর।
৩. জাতীয় অগ্রাধিকার— ফুটবল কি "প্রধান খেলা"?
কেপ ভার্দেতে ফুটবলই একমাত্র জাতীয় আবেগ। প্রতিভাবান কিশোর-কিশোরীর প্রথম এবং প্রধান স্বপ্ন ফুটবলার হওয়া। বাংলাদেশে সেই জায়গাটা ক্রিকেট দখল করে রেখেছে— মিডিয়া কাভারেজ, স্পন্সরশিপ, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, অভিভাবকদের আগ্রহ— সবকিছুর সিংহভাগ যায় ক্রিকেটে। এর মানে এই নয় যে ফুটবলপ্রেমী কম, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ আর মনোযোগের সিংহভাগ অন্যদিকে।
৪. কাঠামো বনাম সম্পদ
কেপ ভার্দের মতো ছোট দেশের জন্য সমন্বয় করা সহজ— একটা ছোট ফেডারেশন, সীমিত খেলোয়াড় পুল, কিন্তু স্পষ্ট লক্ষ্য আর একটা ঘরোয়া কোচিং স্টাফ যারা ডায়াস্পোরা স্কাউটিংয়ে মনোযোগ দিয়েছে। বাংলাদেশে সম্পদ (জনসংখ্যা, টাকা, স্টেডিয়াম) থাকলেও তা প্রায়শই গ্রাসরুট ফুটবল উন্নয়ন, দীর্ঘমেয়াদি একাডেমি কাঠামো, বা স্বচ্ছ পরিচালনার দিকে পরিকল্পিতভাবে যায় না বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন।
বাংলাদেশও কি এখন কেপ ভার্দের পথেই হাঁটছে?
আশার বিষয় হলো— উপরে যে "ডায়াস্পোরা-মডেল"-এর কথা বললাম, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন সেই পথেই হাঁটা শুরু করেছে, আর তার ফল ইতিমধ্যে চোখে পড়ার মতো।
লেস্টার সিটি ও শেফিল্ড ইউনাইটেডে খেলা **হামজা চৌধুরী**, কানাডার লিগে খেলা **শমিত সোম**, ইতালির সেরি ডি-তে খেলা মাত্র ১৮ বছর বয়সী **ফাহামিদুল ইসলাম**— এরা প্রত্যেকেই ব্রিটিশ-বাংলাদেশী বা প্রবাসী বাংলাদেশী পরিবারে জন্ম নেওয়া, ইউরোপ-আমেরিকার পেশাদার একাডেমিতে গড়ে ওঠা খেলোয়াড়। এদের সাথে আছেন তারিক কাজী, জায়ান আহমেদ, কাজেম শাহ এবং আগে থেকেই খেলা জামাল ভূঁইয়ার মতো প্রবাসীরাও। সম্প্রতি আরও দুই প্রবাসী ফুটবলার দলে যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
এক ম্যাচে একসঙ্গে পাঁচ-ছয়জন প্রবাসী খেলোয়াড় মাঠে নামার দৃশ্য বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি। হামজার অভিষেকের পর থেকে দলের খেলায়, র‍্যাংকিংয়ে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— সমর্থকদের আগ্রহে যে পরিবর্তন এসেছে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের ফিফা র‍্যাংকিং যেখানে নিচের দিকে নামছিল, সেখানে এখন কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ স্পষ্ট।
তবে একটা বাস্তবতাও মাথায় রাখা জরুরি— কেপ ভার্দে এই মডেলটা দশকের পর দশক ধরে নিয়মিতভাবে চালিয়ে, একটা প্রতিষ্ঠানিক স্কাউটিং নেটওয়ার্ক তৈরি করে আজকের জায়গায় এসেছে। বাংলাদেশের জন্য হামজা-শমিত-ফাহামিদুলরা হলো সেই যাত্রার সূচনা— একটা "প্রথম পদক্ষেপ", শেষ গন্তব্য নয়। প্রশ্ন হলো, এই মোমেন্টামটাকে বাফুফে কি একটা টেকসই, দীর্ঘমেয়াদি স্কাউটিং ও উন্নয়ন কাঠামোয় রূপ দিতে পারবে, নাকি এটা সাময়িক উদ্দীপনা হয়েই থেকে যাবে— সেটাই আগামী কয়েক বছরে বোঝা যাবে।
তাহলে কে "বেশি যোগ্য"— ধনী, নাকি সংগঠিত? :-B
এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো— **শুধু ধনী হওয়া বিশ্বকাপে যাওয়ার টিকিট নয়, আর শুধু গরিব হওয়া বাধাও নয়।** কেপ ভার্দে প্রমাণ করেছে যে একটা ছোট, কম সম্পদের দেশও যদি (১) তার ডায়াস্পোরাকে কাজে লাগায়, (২) একটা স্পষ্ট ফুটবল-পরিচয় ও কৌশল গড়ে তোলে, এবং (৩) কনফেডারেশনের প্রতিযোগিতামূলক বাস্তবতাকে নিজের পক্ষে ব্যবহার করতে পারে— তাহলে বিশ্ব ফুটবলে চমক দেখানো সম্ভব।
বাংলাদেশের জন্য বার্তাটা তাই আশাবাদী হতেও পারে— সমস্যাটা মূলধনের নয়, পরিকল্পনা ও অগ্রাধিকারের। জনসংখ্যা আর অর্থনীতি যেখানে সহায়ক হতে পারতো, সেটাকে কাঠামোগত উন্নয়নে রূপান্তর করতে পারলে, "কেপ ভার্দে মোমেন্ট" বাংলাদেশের জন্যও অসম্ভব নয়।
আপাতত, কেপ ভার্দের এই অর্জনকে স্যালুট জানানোই উচিত— ছোট দেশের বড় স্বপ্নের একটা জলজ্যান্ত উদাহরণ হিসেবে।
আর অপেক্ষায় আছি, কবে শুধু ক্রিকেট বিশ্বকাপ নয় যেন দ্রুতই ফুটবল বিশ্বকাপেও বাড়িতে বাড়িতে জাতীয় পতাকা দেখতে পাই...। B-)

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.