নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

কবি ও সম্পাদক--কুয়াশা

দ্বীপ ১৭৯২

দ্বীপ সরকার। জন্মঃ ১লা মার্চ ১৯৮১ ইং। গ্রাম-গয়নাকুড়ি। বগুড়া জেলার শাজাহানপুর থানা। পিতা-মৃত হাবিবুর রহমান। মাতা-আলহাজ্ব আছিয়া বিবি। মুসলিম পরিবারে জন্ম। গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন ১৯৯৯ ইং। সম্পাদিত লিটেল ম্যাগ, কুয়াশা। প্রকাশিত বই ৫টি। ভিন্নভাষার গোলাপজল ২০১৮। ডারউইনের মুরিদ হবো ২০১৯। ফিনিক্স পাখির ডানা ২০২০। জখমগুচ্ছ ২০২৩। বুবুন শহরের গল্প ২০২৪।

দ্বীপ ১৭৯২ › বিস্তারিত পোস্টঃ

আমিনুল ইসলামের কবিতায় বহুমাত্রিক স্বরের ব্যঞ্জনা।। দ্বীপ সরকার

০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৫





আমিনুল ইসলামের কবিতায় বহুমাত্রিক স্বরের ব্যঞ্জনা
দ্বীপ সরকার


বাংলা কবিতার সাম্প্রতিক ধারায় কবি আমিনুল ইসলাম এমন এক নাম, যিনি দৃঢ়ভাবে নিজের স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করে নিয়েছেন। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে পাঠ, সাধনা ও ভাষার প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে তাঁর কবিতার ভুবন নির্মাণ করেছেন। উত্তরবাংলার জীবন, নদী, স্মৃতি, গ্রাম ও নাগরিক টানাপোড়েন তাঁর কবিতায় এক ধরনের গভীর মানবিক ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছে। কবির জন্ম ১৯৬৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর,চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। কবির প্রকাশিত মোটগ্রন্থ সংখ্যা ৩৩টি। কবি বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সম্মাননা/পুরস্কার অর্জন করেছেন। বগুড়া লেখক চক্র পুরস্কার, দাগ সাহিত্য পুরস্কার, কবিকুঞ্জ পদক, আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার এবং আরো কিছু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। নব্বই দশকের কবিতায় আমরা যে বৈশিষ্ট্যগুলো দেখি—উচ্চকণ্ঠ রাজনৈতিক ঘোষণার বদলে নগর ও গ্রামের দ্বৈত অভিজ্ঞতার স্মৃতি ও সময়ের ভাঙন। এই বৈশিষ্ট্যগুলো আমিনুল ইসলামের কবিতায় সুস্পষ্টভাবে উপস্থিত। কবিতার বিষয় ও ভাষা শৈলীতে সহজ ও সাবলীল। একটি কবিতায় একাধিক চিন্তা ও বৈচিত্র্য, বহুমাত্রিকতা কবিকে একটি নতুন স্বর ও শৈলীর দিকে পাঠককে আকৃষ্ট করে। একারণেই কবি আমিনুল ইসলামকে বহুমাত্রিক স্বরের কবি বললে ভুল হবে না।

কবিতায় বহুমাত্রিক স্বরের ব্যঞ্জনা

কবি আমিনুল ইসলাম শব্দের জৌলুসে বিশ্বাসী নন; বরং শব্দের ভেতরের নীরব শক্তিকে কাজে লাগান। কবিতার ভেতর দিয়ে হাঁটলে তা নিশ্চিত বুঝা যায়। অজস্র ঘোরের মতো ঝাপসা পথ; অথচ পাঠক এক সময় গন্তব্য খুঁজে পান। কবির কবিতায় বহুমাত্রিক স্বর— উদাহরনস্বরুপ কিছু কবিতার উদ্ধৃতি তুলে ধরা যেতে পারে।

‘দোহাাই তোমার ভুলিনিকে নীলুফর
তেমনি থাকার প্রয়াস বিরামহীন
বাতায়ন খুলে দৌড় দিতে চায় ঘর
চেপে ধরি চোখ যেই জাগে নিদহীন”
[‘একাকী, অবরেণ্য’, বাছাই কবিতা]

এই কবিতাটি মূলত ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় পৌঁছানো এক অন্তর্মুখী যাত্রার দিকে ইঙ্গিত করে। কবিতার প্রথম স্তবকে ব্যক্তিগত আবেগ ও স্মৃতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও এক অনুপস্থিত সত্তাকে সম্বোধন করে—যা প্রেম, স্মৃতি বা হারিয়ে যাওয়া মানবিক সম্পর্কের প্রতীক। ব্যক্তিগত অস্থিরতা ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে। ‘বাতায়ন খুলে দৌড় দিতে চায় ঘর’ ও ‘চেপে ধরি চোখ যেই জাগে নিদহীন’—এই পঙ্ক্তিগুলোতে ঘর ও শরীর দুটোই অস্থির হয়ে ওঠে। অনিদ্রা এখানে কেবল শারীরিক সমস্যা নয়, বরং মানসিক অস্বস্তির লক্ষণ। এখানে কবি নিঃসঙ্গতাকে বেছে নেন এবং নিলুফর যে কবির স্মৃতিদগ্ধ করে তুলেছে তা স্পষ্ট।

‘হেকিমি দাওয়ায়— অন্যথা তার নেই
লখার বাসর রচেছি শপথে এঁটে
বায়ু ছাড়া আর অনুমতি কারো নেই
দুঃখের প্রহরী দাঁড়িয়ে বাহির গেটে’
[‘একাকী, অবরেণ্য’, বাছাই কবিতা]

এই স্তবকে যাপমান জীবনে প্রেম,বাসর,অসুখ—এ যেনো নির্মমতার সংসারে জীবনকে বয়ে নিয়ে চলা। তবু কবি প্রেমকে শপথে এঁটে ধরে আছেন। এটাই কবিকে প্রেমিক করে তোলার দলিল। মৃতবৎ শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত শপথের বাইরে যাবেন না। এই প্রেম এবং প্রতিজ্ঞা আরোপিত নয় বরং স্বেচ্ছায় গ্রহণ করা।

‘সাঁঝের আকাশে এখনো কি ফোটে তারা?
রাতের নদীতে এখনো কি জাগে ঢেউ?
খোলা বাতায়ন এখনো কি চায় সাড়া?
আমাকে পোড়াতে এখনো কি পোড়ে কেউ?’
[‘একাকী, অবরেণ্য’, বাছাই কবিতা]

এসব প্রশ্ন প্রকৃতির সঙ্গে নিজের নিস্তব্ধতার তুলনা। সাঁঝের আকাশ, রাতের নদী,খোলা বাতায়ন। সব শেষে আক্ষেপ ছুড়ে দেন ‘আমাকে পোড়াতে এখনো কি পোড়ে কেউ?’ কবিতার মাঝখানে এসে ফের কবিতার মোড় ঘুরে নেয় অন্যদিকে। এটাই কবিতার বহুমাত্রকিতার স্বর। কবি বলেন,

‘কতদিন হলো— নই মিছিলের মুখ!
কতদিন হলো— নই কোনো শিরোনাম!
কতদিন হলো— হই নাকো উৎসুক!
কতদিন হলো— ডাকহীন এই নাম!’
[‘একাকী, অবরেণ্য’,—বাছাই কবিতা]

প্রেম থেকে সরে এসে সরাসরি রাজনীতির মাঠে। তিনি আর আন্দোলনের সামনের সারিতে নেই, সংবাদেও নেই। এ যেন এক স্বেচ্ছা নির্বাসন। প্রকট হতাশা কবিকে গ্রাস করলেও এখানে এসে কবি রাজনৈতিক অস্থিরতার চিত্রকল্প নিয়ে আবির্ভূত হোন।

‘টেবিলে দেরিদা ফুকো ওপরের তাকে
চোখ মেলে চায়— হারাল কি কবি খেই!
প্রভাত চৌধুরী রয়েছে হাতের কাছে
অঞ্জন সেনও— কোনো কথা উঠলেই!’
[‘একাকী, অবরেণ্য’ বাছাই কবিতা]

এখানে কবি বুদ্ধিবৃত্তিক মেটাফোরিকাল ইঙ্গিতে আলাদা করে কিছু বুঝাননি বরং পূর্বের স্তবকের সাথে পরস্পর সম্পর্কিত বক্তব্যের অংশ। মিছিল,রাজনীতি এসব ব্যাক্তিগত অস্থিরতার ভেতর থেকেও কবি দেরিদা-দের জীবনের আশে পাশে পেতে চান। কবি কোনো অবস্থাতেই খেই হারাতে চান না। কারণ মিশেল ফুকো, জ্যাক দেরিদা, প্রভাত চৌধুরী, অঞ্জন সেন প্রমুখ ভাষাবিদ-কবিগণ শিল্পসাহিত্যে উত্তরআধুনিক তত্ত্বের অনুসারী। আমিনুল ইসলাম নিজেও উত্তর আধুনিক কবিতার বৈশিষ্ট্য ও প্রকরণ সম্পর্কে সম্যক অবহিত। সেসব অনুসরণও করেন। কিন্তু তিনি পৃথিবীতে বড়ো ধরনের অন্যায় সংঘটিত হতে দেখলে কবিতা সম্পর্কিত সাম্প্রতিক কালের সকল ইজম বা তত্ত্বের খোলস ভেঙে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন , তার কবিতার পঙক্তিতেও সেই প্রতিবাদী স্বরের ছাপ পড়ে। নিলফর নামক প্রেমিকার কাছে শুধু প্রেমের জন্য শপথবদ্ধ কবি শেষপর্যন্ত বিপ্লব-প্রতিবাদের কাছেও ধরা দেন। তিনি হয়ে ওঠেন একইসঙ্গে প্রেমিক ও বিপ্লবী। কবি হিসেবে এটা তার সৎসাহসেরই প্রতীক এবং অসাধারণ বহুস্বরের ইঙ্গিত বহন করে।

‘তথাপি আমার কানে পাকে তালগোল
বুকে এসে ভিড়ে ভিটেমাটির শোক
জল কাঁটাতার ভেঙে চলে আসে রোল
কিসের বাগান? সবাই আপন লোক।

সুদূরে বোমায় মরছে শিশু ও নারী
একই ঘটনা মাঝখানে এশিয়ার
গণতন্ত্র আজ জঙ্গলের অনুসারী
যত বড়ো সে যে তত বড়ো থাবাা তার।’
[‘একাকী, অবরেণ্য’, বাছাই কবিতা]

মধ্য এশিয়ার চলমান অস্থিরতা, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, কালচারাল হেজেমনি, সম্প্রসারণবাদী যুদ্ধ, অন্যায় যুদ্ধের নিরীহ শিকার শিশু—নারী মৃত্যু, পথভ্রষ্ট গণতন্ত্র, ঘৃণাবাদী বিভাজনের কাঁটাতার— এসব কবিকে নানাভাবে তাড়িত করেছে। গণতন্ত্র যেন সত্যি সত্যি মানুষের হাতে নেই বরং জঙ্গলে চলে গেছে। তথাপি কবি বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও কাউকে পর ভাবতে পারেন না। চারপাশে অজস্র শোক, ব্যাথা, দুঃখ ক্রমে ব্যক্তিগত গণ্ডি ছাপিয়ে বৈশ্বিক রূপ নেয়। গণতন্ত্রকেও প্রশ্ন করা হয়—যেখানে ক্ষমতা যত বড়ো, তার থাবাও তত ভয়ংকর। পৃথিবীর যেসব বড়ো বড়ো শক্তিশালী দেশ এতদিন গণতন্ত্রের জন্য বিখ্যাত ছিল এখন সেসব দেশ সাম্রাজ্যবাদী-উপনিবেশবাদী হয়ে উঠেছে এবং সেসব দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা বহুকৌণিক ও অভূতপূর্ব নিপীড়নের শি কারে পরিণত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে উদ্ধেশ্যের দিক হতে গণতন্ত্র হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনব্যবস্থা যেখানে একইসঙ্গে সংখ্যালঘুর ন্যাায্য অধিকার ও নিরাপত্তার গ্যারান্টিও থাকে। কিন্তু এখন গণতন্ত্র হয়ে পড়েছে দুর্বলদের নিশ্চিহ্নকরণের রাষ্ট্রীয় হাতিয়ার। এইভাবে কবিতাটিতে ফুটে ওঠা অন্তরঙ্গ একাকিত্ব, ব্যক্তিগত প্রেম, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস—আসলে বিচ্ছিন্ন কোনো অনুভূতি নয়,—এসবই বিশ্বব্যাপী মানবিক সংকটের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একই কবিতায় বহুমাত্রিক এজেন্ডা, বহুমাত্রিক স্বরের উপস্থিতি—কবিতাটিকে বাড়তি সৌন্দর্য দান করেছে। এটা কবির সফল শৈল্পিক বিচিত্রতার ইঙ্গিতবাহী।

‘তন্ত্র থেকে দূরে’ কবির আরেকটি অসাধারণ কাবতা। পরিহাস, শ্লেষ, বিদ্রুপ, আক্ষেপ প্রভৃতি কাব্যালংকার সহযোগে তীব্রতর কাব্যভাষা কবিতাটির মূল শক্তি ও ঐশ্বর্য। কবিতার প্রথম স্তবক শুরু হয়েছে এভাবে,

‘কাঁচাফলে কিল নয়— অগ্নিগর্ভ নল
দিন যায়— পচন ধরে আড়ালে আবডালে,
ফোঁটে বোমা,
উড়ে যায় খোসা— ভূতি-বীজ,
তার সাথে সোনার ছেলেদের কয়টি নষ্টকরোটি’
[‘তন্ত্র থেকে দূরে’, বাছাই কবিতা]

কবিতাটি শুরু হয়েছে সমকালীন রাষ্ট্রব্যবস্থা, নগরসভ্যতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভণ্ডামির বিরুদ্ধে এক গভীর প্রতিবাদী উচ্চারণস্বরূপ। কবিতাটি রাজনৈতিক অসন্তোষ, মানুষের ভবিষ্যৎ, নৈতিকতা ও জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষার বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি হাজির করে। ‘কাঁচাফলে কিল নয়—অগ্নিগর্ভ নল’। এখানে দ্বন্দ্ব, আগ্নেয়াস্ত্র, বোমা ও সংগঠিত ধ্বংসের রূপকে ইঙ্গিত করে। ‘সোনার ছেলে’ অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিভ্রান্ত শিকার তরুণ প্রজন্ম। এই কথার মধ্যে সন্ত্রাস নির্ভর রাজনীতির প্রতি ইঙ্গিত ও আঘাত আছে।

‘জ্যেষ্ঠভ্রাতা খিস্তি পাড়ে, নষ্টভ্রাতা চতুর্মুখ;
রাষ্ট্রজ্ঞানী হতবুদ্ধি;
মুখ ঢাকে আব্রাহাম লিংকন;
লম্বোদর এ শহর চার্বাকের ঘি গিলে বেসামাল,
খুলে পড়ে পাতলুন।
নক্ষত্রখচিত গোষ্ঠীগোশালায়
পরান্নে জাবর কাটে বুদ্ধিজীবী।
এ নগরে এজমালি বৃক্ষের গোড়ায় জল দেবে কে?’
[‘তন্ত্র থেকে দূরে’ বাছাই কবিতা]

এখানে কবি এই পচনের মানবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক রূপ উন্মোচন করেন। ক্ষমতাবানরা অশালীন, খিস্তি পাড়ে—আর নষ্টরা টিকে থাকার জন্য ধূর্ত। ‘রাষ্ট্রজ্ঞানী হতবুদ্ধি’ যারা দিশা দেখানোর কথা—তারাই বিভ্রান্ত। এমনকি গণতন্ত্রের প্রতীক আব্রাহাম লিংকনের মুখও ঢেকে যায় লজ্জায়। ভোগবাদী নগরসভ্যতা এতটাই সর্বগ্রাসী যে চার্বাকের বস্তুবাদকেও গিলে ফেলে। কবিতায় ‘ এজমালি বৃক্ষ’ হচ্ছে জনস্বার্থ যা রক্ষার জন্য কেউ নেই। তার অবস্থা ভাগের মা গঙ্গা পায় না প্রবাদের মতো। কবি সেটাকে ‘এজমালি বৃক্ষ’ বা ‘অভিভাবকহীন বিষয়’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এভাবে ‘জনগণের স্বার্থ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ’ রক্ষায় ব্যর্থপ্রায় রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি প্রশ্ন ছুঁড়েন কবি। তবে নিচের স্তবকে কবিতার নাটকীয় মোড় নেয়। কবি এধরনরে ব্যর্থ রাষ্ট্র ও নষ্ট সমাজব্যবস্থার ছেড়ে মুক্ত উদার প্রকৃতির কোলে আশ্রয় নিতে ইচ্ছা ব্যক্ত করেন।

‘তার চেয়ে চলো যাই ফেলে আসা বটের ছায়ায়
স্বোপার্জিত তৃণে বাঁধি ভালোবাসার দুইচালা ঘর।
ভুল হলে আছে তো বাবুই— নিসর্গের কনসালট্যান্ট
আয়োজিত উৎসবের জারজ কথার চেয়ে
বেহেতর অনেক মুখরিত হয়ে শোনা
শ্যামা-দোয়েলের কণ্ঠে মুক্ত কবিগান।’
[‘তন্ত্র থেকে দূরে’, বাছাই কবিতা]

কবির অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা,পড়াশোনা,চিন্তার গভীরতা প্রভৃতি অনুমান করা যায় “সুয়েজ খালের ওপর তোমার মুখোমুখি” কবিতাটির ভেতর দিয়ে গেলে। এটি একটি ইতিহাস, রাজনীতি ও মানবিক সেতুবন্ধনের মিথলোজিকাল কবিতা। কবিতা কেবল অনুভূতির প্রকাশ নয়। অনেক সময় তা ইতিহাস, ভূগোল, রাজনীতি ও ব্যক্তিগত অস্তিত্বের এক গভীর সংলাপের ভূমিকায় অবতীর্ন হয়। ‘সুয়েজ খালের উপর তোমার মুখোমুখি’ কবিতাটি তেমনই এক বহুমাত্রিক শিল্পভাষ্য, যেখানে প্রেম ব্যক্তিগত অনুভূতির সীমা ছাড়িয়ে সভ্যতা—অস্থিরতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক মানবিক সেতু। কবিতার প্রধান চরিত্র নেফারতিতি,আখেনাতেন, তুতেনখামুন, নেতানিয়াহু, টমাহক, মাহমুদ দারবিশ—বৈশ্বিক ইতিহাস, রাজত্ব, ক্ষমতা এবং সামাজ্যবাদিতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী স্লোগানের প্রতীক। এখানে পশ্চিমা অঞ্চলের সভ্যতা, ইতিহাস, সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য উপকরণ যুদ্ধ, অস্থিরতা, অশান্তি ইত্যাদি কবিকে ভীষণভাবে বেদনাক্রান্ত ও তাড়িত করে। সুয়েজ খাল বিশ্ববাণিজ্য ও ভূ—রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল—যেখানে ভূমধ্যসাগর ও লোহিতসাগর মিলিত হয়। কবি এই খালকে রূপক হিসেব তুলে ধরেছেন প্রিয় মানুষের মুখকে, যে মুখ জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী অনিশ্চিত সীমারেখায় দাঁড়িয়ে কবিকে আশ্রয় দেয়। ফলে প্রেম এখানে কেবল আবেগ নয়; এটি অস্তিত্ব রক্ষাকারী এক শক্তি। কবিতার প্রথম স্তবকেই প্রেম ও ভূগোল একাকার হয়ে যায়।

‘জীবন ও মরণের ঠিক মাঝখানে তুমি এসে ধরে আছো হাত
যেভাবে সুয়েজ খাল ভূমধ্যসাগরকে বেঁধেছে
লোহিতসাগরের সাথে স্রোতেলা দুহাত বাড়িয়ে তার।

আমি নেফারতিতির আবক্ষ মূর্তির দিকে চাইলেই
প্রত্নরঙা সেই মুখমণ্ডলে জড়িয়ে যায়
তোমার মুখের প্রভাতসুন্দর আলো;
নীলনদের ঢেউ নিয়ে খেলতে অভ্যস্ত হাওয়া এসে
সেই মুখের উপর ছড়িয়ে দেয় তোমার আলুলায়িত চুল;
সিনাইয়ের সম্ভাবনা ঘেঁষা নেতানিয়াহুদের অগ্নিচোখের
আড়ালে দুটি মুখ রচনা করেছে এক অনন্য উৎপ্রেক্ষা;
সেই উৎপ্রেক্ষার ঠাঁই নেই উত্তর আধুনিক কবিদের
হাতে মাপা সিলেবাসে; হোঁচট খায় আমার নিজের দৃষ্টিও।’
[‘সুয়েজ খালের ওপর তোমার মুখোমুখি’,কাশবনে কুড়িয়ে পাওয়া কবিতা]

জীবন ও মরণের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা প্রিয় মানুষটি কবির হাত ধরে রাখে, যেমন করে বিখ্যাত সুয়েজ খাল সেতুবন্ধন রচে রেখেছে ভূমধ্যসাগর এবং লোহিতসাগরের মাঝে । এই তুলনায় প্রেমের ভূমিকা হয়ে উঠেছে মধ্যস্থতাকারী—যা বিচ্ছিন্নতাকে সংযোগে রূপ দেয়। ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্য দিয়েই কবি বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সংলাপ শুরু করেন। ইতিহাসের মিশরীয় সভ্যতার গভীরে প্রবেশ করে নেফারতিতির সাথে তুলনা করেন কবির প্রেম। নেফারতিতি প্রত্নসৌন্দর্যের চূড়ান্ত রূপ। প্রাচীন মিশররে কিংবদন্তি রানি,রাজা ফারাও আখেনাতেনের স্ত্রী। আখেনাতেনের মৃত্যুর পর নেফারতিতি সিংহাসনে আরোহণ করে নিজে শাসনভার বহন করেন এবং সম্রাজ্ঞী হিসেবে তার শাসনামল সাংস্কৃতিক বিকাশ ও সমৃদ্ধির জন্য তার মতোই বিখ্যাত। নেফারতিতির আবক্ষ মূর্তি, নীলনদ, সিনাই—এসব চিহ্ন প্রাচীন সভ্যতার প্রতীক ও মিথ। কিন্তু এই ইতিহাস ঐতিহ্য নিছক অতীত হিসেবে উপস্থিত নয়। প্রিয় মানুষের মুখের আলো, চুলের নড়াচড়া, নিঃশ্বাসের স্পর্শ এসে সেই ইতিহাসকে জীবন্ত করে তোলে। কবি তার চিন্তার ভেতর দিয়ে অবারিত হেঁটে ব্যক্তিগত প্রেমকে ইতিহাসের চরিত্র হিসেবে উপস্থিত করিয়েছেন—যা কবিকে দক্ষ কারিগরের ভূমিকায় দাঁড় করিয়ে দেয়। যুদ্ধ, আগ্রাসন ও দখলের বাস্তবতা প্রেমের পরিসরে ঢুকে পড়ে। কবিতার ভেতর প্রেম, রাজনীতি, বৈশ্বিক যুদ্ধ, অস্থিরতা, যুদ্ধের বিপরীতে প্রেমের সৌন্দর্য প্রভৃতির ছবি ফুটে শৈল্পিক সৌকর্যে ফুটে উঠেছে—যা কবির বহুমাত্রিক স্বরের চূড়ান্ত উদাহরণ।

‘মন বলে, যদি একবার চোখ পড়তো মহামতি দারবিশের,
টমাহক শাসিত আজকের এই পৃথিবী পেয়ে যেতো
‘রিটা অ্যান্ড দ্য রাইফেল’ এর চেয়েও সুন্দর
একটি ত্রিমাত্রিক ব্যঞ্জনার অভিনব প্রেমের কবিতা।

এই স্বীকারোক্তি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে কবি প্রেমকে একটি কাঠামোর ঊর্ধ্বে স্থাপন করেন। প্রেম এমন এক অভিজ্ঞতা, যা ভাষা ও দৃষ্টিকেও হোঁচট খাওয়াতে বাধ্য করে। মাহমুদ দারবিশের প্রসঙ্গ প্রেমকে বিশ্বকবিতার ধারায় যুক্ত করেছে। দারবিশ যেমন যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতে প্রেমকে কবিতার কেন্দ্রে এনেছিলেন, তেমনি এই কবিতার প্রেম টমাহক শাসিত বর্তমান পৃথিবীতে এক ‘অভিনব’ কাব্যিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এখানে প্রেম হয়ে উঠেছে নৈতিক ও নান্দনিকের চরম চিত্রকল্প। ফিলিস্তনী কবি মাহমুদ দারবিশের বিখ্যাত কবিতা ‘রিটা অ্যান্ড দ্য রাইফেল’ যা ফিলিস্তিনী কবি দারবিশ এবং ইজরায়েলের গোপন গুপ্তচর— ইহুদী যুবতি রিটার মধ্যকার প্রেম ও বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনি জন্য বিশ্বখ্যাত। ছদ্মনামধারী রিটার আসল নাম ছিল তামার বেন-আমি। কবি এখানে ‘রিটা অ্যান্ড দ্য রাইফেল’ কবিতার প্রসঙ্গ এনে আগ্রাসনবিরোধী বিরোধী প্রেমিক অবস্থান তুলে ধরেছেন। কারণ প্রকৃত প্রেমের উচ্চারণ হচ্ছে সহিংসতার বিপরীতে মানবতার ভাষা।

‘দোহাই খাপুর পিরামিডের, দোহাই বিধ্বস্ত গাজার,
তোমার এই সর্বজয়ী প্রেমকে আমি ছড়িয়ে দেবো
কক্ষপথ ধরে ধরে এক দিগন্ত থেকে অন্য দিগন্ত
অভিকর্ষের বর্ণমালায় রচিত পৃথিবীর ভালোবাসার ভাষায়....’
[‘সুয়েজ খালের ওপর তোমার মুখোমুখি’, কাশবনে কুড়িয়ে পাওয়া কবিতা]

শেষ স্তবকে কবিতা ব্যক্তিগত সীমানা ছাড়িয়ে সম্পূর্ণ বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে। মিশরের পিরামিড এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার উল্লেখ মূলত সভ্যতার গৌরব ও ধ্বংস পাশাপাশি দাঁড়ায়। কবি ঘোষণা করেন, তিনি এই প্রেম ছড়িয়ে দেবেন এক দিগন্ত থেকে অন্য দিগন্তে। প্রেম এখানে আর ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়; এটি পৃথিবীর টিকে থাকার ভাষা। কবিতাটিতে প্রেম, যুদ্ধ, নেতানিয়াহু, ধ্বংসপ্রাপ্ত গাজা পরস্পর গভীর সম্পর্ক স্থপন করেছে—যা বহু বৈচিত্রের লক্ষণ ও দর্শনের উপস্থিতি। কবি আমিনুল ইসলাম কখনো সখনো কবিতার ভেতর এমন ঘোর সৃষ্টি করেন—পাঠকের সেখান থেকে গন্তব্যে ফিরতে কষ্ট হয়। একটি কবিতায় বহু সংকেত, বহু ইঙ্গিত—কবি সেখানে বিভিন্ন রূপে আবির্ভূত হোন। এমনি আরেকটি কবিতা হচ্ছে ‘প্রাচীনতম রাজত্বের কথা’।

‘সর্বগামী শয়তান যেখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে
গালে দিয়ে হাত
যেমনি থাকে ভূগোলচারী মানুষ
কাছে গিয়ে চীনের মহাপ্রাচীরের,
হে তন্ত্র, সেখানেও তোমার রাজত্ব।
[‘প্রাচীনতম রাজত্বের কথা’, মতিহারী ভালোবাসা]

কবিতাটি কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্র, শাসক বা সময়কে নির্দেশ করে না। এটি ক্ষমতা, দমন ও নিয়ন্ত্রণের এক চিরন্তন ব্যবস্থাকে রূপকের মাধ্যমে উন্মোচন করে। কবিতার মুল ভাবার্থ খুঁজতে গিয়ে পাঠক হোঁচট খেতে পারে। এখানে ‘রাজত্ব’ শব্দটি ঈশ্বরের রাজত্বকেও চিহ্নিত করা যায় আবার কোন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ভূখণ্ডের রাজত্বকেও চিহ্নিত করা যেতে পারে। এটাই এই কবিতা বিশেষত্ব এবং ঘোরের জায়গা। কবি কোনো এক রাজত্বকে বুঝিয়েছেন, তা গভীর চিন্তা ও অনুসন্ধানের দিকে ধাবিত করে । হতে পারে, কাঠামোগত ও ঐতিহাসিক আধিপত্য হিসেবে, যা সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষের ওপর চেপে বসে আছে। কবিতায় ‘সর্বগামী শয়তান’ এমন এক প্রতীক, যা সর্বত্র বিচরণশীল অশুভ শক্তির ইঙ্গিত দেয়। এই শয়তান যেখানে দাঁড়িয়ে থাকে ‘গালে দিয়ে হাত’ বা ‘চীনের মহাপ্রাচীরে’ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে—সেখানেই তার স্বাভাবিক উপস্থিতি। ‘হে তন্ত্র, সেখানেও তোমার রাজত্ব’। এখানে ‘তন্ত্র’ এক অস্পষ্ট, ইঙ্গিতময় রাজা। ‘তন্ত্র’ই মূলত কবিতার অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক। ‘তন্ত্র’ এমন একটা প্রতীকী সত্তা—যা প্রতিরক্ষা, সীমারেখা ও প্রাচীরের ইঙ্গিত বহন করে। ফলে রাজত্বের সর্বব্যাপী উপস্থিতি প্রতিষ্ঠিত হয়।

‘তোমার রাজত্বের কোনো সীমা নেই,
পরিসীমা নেই,
সেখানে অস্ত যায় না সূর্য
ডোবে নাকো চাঁদ
সবখানেই তার কেন্দ্র— লাল নীল হলুদ;
সেই রাজত্বের কোথাও বহু কিছু প্রত্নগন্ধময়,
কোথাও—বা নতুন বোতলে পুরোনো মদ;
খরার সাথে যেমন রোদের সম্পর্ক,
তেমনি পালিত সৈন্যসামন্তের সাথে তোমার,
এ কথা বোঝার জন্য
কোনো বিশেষজ্ঞ হওয়া লাগে না।
আর সবখানেই তোমার সাস্ত্রী রক্ষী ওয়াচ টাওয়ার।’
[‘প্রাচীনতম রাজত্বের কথা’,মতিহারী ভালোবাসা]

এই স্তবকে রাজত্বের সীমাহীনতা আরও স্পষ্ট হয়। কবি বলেন, এই রাজত্বের কোনো সীমা বা পরিসীমা নেই—এটি ভৌগোলিক মানচিত্র মানে না। সেখানে সূর্য অস্ত যায় না, চাঁদ ডোবে না—অর্থাৎ সময়ও এখানে স্থবির। দিন-রাতের স্বাভাবিক ছন্দে সবখানেই তার কেন্দ্র। কবি রাজত্বের অভ্যন্তরীণ চরিত্র বিশ্লেষণ করেন এখানে। কোথাও এই রাজত্ব ‘প্রত্নগন্ধময়’—অর্থাৎ পুরোনো, আদিম পদ্ধতিতে ভর করা। আবার কোথাও ‘নতুন বোতলে পুরোনো মদ’—এখানে চলমান অসভ্য রাজনীতি, রাজত্ব ও আধুনিকতার মুখোশে শোষণের স্পষ্ট ভাষ্য। ক্ষমতা রূপ বদলায়, কিন্তু চরিত্র বদলায় না। ‘খরার সাথে যেমন রোদের সম্পর্ক’ তেমনি ‘পালিত সৈন্যসামন্তের সাথে তোমার’। এখানে ‘তোমার’ একটি অনুপস্থিত রাজার উপমান। এই বাস্তবতা বোঝার জন্য কোনো বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই—কারণ এটি নগ্ন সত্য। আর এই পুরো ব্যবস্থার প্রহরী হিসেবে সর্বত্র দাঁড়িয়ে থাকে ‘ওয়াচ টাওয়ার’—নজরদারি, ভয় ও নিয়ন্ত্রণের প্রতীক। এই স্তবক আগের দুই স্তবকের ভাবকে কাঠামোগত রূপ দেয়। এখানে ‘বিশেষজ্ঞ হওয়া লাগে না’—আরেকটি অদৃশ্য ইঙ্গিত—যেখানে পাঠক নিরন্তর খুঁজে ফিরবে। শেষ স্তবকে কবিতা প্রশ্নের মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ নেয়। কবি সরাসরি রাজত্বকে সম্বোধন করে প্রশ্ন করেন,

‘হে প্রাচীনতম রাজত্ব, তুমিই বলো,
যারা তোমার হাতে হয়ে আসছে
শোষিত, নিপীড়িত ও প্রবঞ্চিত,
যুগে হতে যুগ,
শতাব্দী থেকে শতাব্দী,
তাদের পালাবার পথ কোথায়?
আর যদি চিচিং ফাঁক এর তরিকায়
কোনো পথ আবিষ্কৃত হয়ও,
সে পথ বেয়ে তারা যাবেই—বা কোথায়? কোথায়?’
[‘প্রাচীনতম রাজত্বের কথা’, মতিহারী ভালোবাসা]

যারা যুগে যুগে শোষিত, নিপীড়িত ও প্রবঞ্চিত হয়ে আসছে, তাদের পালাবার পথ কোথায়? এখানে সময়ের ধারাবাহিকতা (যুগ হতে যুগে, শতাব্দী থেকে শতাব্দী) দেখায়, এই দমন কোনো সাময়িক ঘটনা নয়। এমনকি যদি ‘চিচিং ফাঁক’ এর মতো কোনো ফাঁকফোকর অর্থাৎ সামান্য মুক্তির সুযোগ আবিষ্কৃত হয়ও, কবি সংশয় প্রকাশ করেন— সেই পথ ব্যবহার করে তারা সত্যিই যাবে কোথায়? এই প্রশ্ন কবিতাকে এক গভীর নৈরাশ্যের স্তরে পৌঁছে দেয়। সব মিলিয়ে, ‘প্রাচীনতম রাজত্বের কথা’ একটি রাজনৈতিক কবিতা হয়েও কেবল রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ক্ষমতার চিরন্তন স্বরূপ, সভ্যতার ভেতরে প্রোথিত দমনযন্ত্র এবং মানুষের মুক্তিহীন ঘূর্ণিপথকে উন্মোচন করে। রাজত্বের বিষয়ে অনিবার্য প্রশ্ন, কে সেই রাজা? কবি নিবিড়ভাবে এবং স্বেচ্ছায় সৃষ্টি করেছেন এই অনুসন্ধানী মোহ। কবি আমিনুল ইসলামের সাহিত্যকর্ম বাংলা কবিতায় সংযত উচ্চারণ ও গভীর আত্মসচেতনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। তিনি নব্বই দশকের কবি হয়েও কোনো দলগত প্রবণতায় আবদ্ধ নন। বরং সময়, স্মৃতি ও মানুষের অস্তিত্বগত সংকটকে সাবলীল ভাষায় কবিতায় রূপ দিয়েছেন। ভাষার মিতব্যয়িতা, অনুভবের গভীরতা এবং ভাবনার স্বচ্ছতা তাঁকে সমকালীন বাংলা কবিতায় এক স্বতন্ত্র ও দীর্ঘস্থায়ী কণ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অধিকাংশ কবিতায় সম্মোহনের ঘোর, ব্যঞ্জনার বহুমাত্রিকতা, ইঙ্গিতের বহুবিচিত্রতা, বহুমুখী চিত্রকল্প ইত্যাদির উপস্থিত লক্ষ করা যায়।

কাব্যভাষার প্রাতিস্বিকতা

কবিতার ভেতর দিয়ে দীর্ঘদিনের পথ চলা একজন কবির অভিজ্ঞতার চাবিকাঠি। ঠিক তখনই নখের ডগায় আবিস্কৃত হতে থাকে কবিতার মুলমন্ত্র। কবিতার মুলমন্ত্র মুলত কবিতার ভাষা, কবিতার ভাব, যাপিত জীবনের সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্যের চিত্র ও চিত্রকল্প, কবিতায় উপমা, রূপকের ব্যহার। মূলত এগুলোই কবিতার শ্রীবর্ধনের মানদণ্ড। আমিনুল ইসলামের অধিকাংশ কবিতার অবয়ব সুবিস্তৃত এবং দীর্ঘ হলেও কবিতায় অজস্র চিত্রকল্প,উপমার আশ্রয় ঘটিয়েছেন। নতুন শব্দ তৈরি, শব্দের ভাঙন থেকে আরেক নতুন শব্দ গঠন—কবিতার শ্রীবৃদ্ধিতে অভিজ্ঞতার মিশ্রণ ঘটাতে পেরেছেন। শব্দ ও ভাবের ব্যঞ্জনা পরস্পরের যোগসাজসে কবিতার সুর, অর্থ ও দর্শন কখনো ব্যক্তিগত নয়—বরং তা বৈশ্বিক পর্যায়ে উত্তীর্ণ করে। এখানে কিছু অভিনব শব্দ, চিত্রকল্প এবং উপমা তুলে ধরা হলো।

কবিতায় ব্যবহৃত শব্দ ব্যবহারে অভিনবত্ব

ট্রেনের হুইসেল, দাবিদাওয়ার চিৎকার, ধূপছায়া ছবি, ঝগড়া বানু, গাংচিলের ডানা, দোআঁশ বুক, লম্পটের লোভ, শিশ্নজোট, প্রণয়রঙা জোট, জোছনাগন্ধী নাম, স্নাতকমুখী দিন, বুদ্ধিজীবীরোগ, নদীর লিরিক, নদীমাতৃক উপহাস, বরাদ্দকৃত দৌড়, নদীর অভিজ্ঞান, হিমালয়সত্য, বন্ধ্যা সহবাস, কথার জোছনা, কমিউনিস্ট বারুদ, উড়াল প্রেম, ঘুড়িবালক, পাতাবাহার মন, উসকাঠি, ডালিমদানা অধর, মাননীয় নিতম্ব, ট্রাম্প মুখ, নাফের জল, ডোরাকাটা ছায়া, ঘ্রাণতফাত, সবুজ শব্দেরা, বহুগামিতার সুপারস্টার, সোনালি আমানত, ভালোবাসার সিরাতুল মুস্তাকিম, ডিপ্লোমেটিক ব্যাগ, বিগবাংক বিস্ফোরণ, মেকাপলেসমুখ, আদমসিঁড়ি।


কবিতায় ব্যবহৃত অভিনব চিত্রকল্প

‘কুয়াশার কামিজ পরা গোলাপের বাগান’, ‘লোভের টেবিলে উচ্ছল চাহিদা ও জোগানের ঢেউঢেউ যুবতিরেখা!’, ‘তোমার আলো আলো আলখাল্লার নিচে ঘুমায় কত হন্তারক আন্ধকার!’ ‘ডিলিট বাটন চেয়ে চেয়ে গিলছে লোভে ঢোক’, ‘জগৎশেঠের রাত্রে খুঁড়ো কবর সিরাজের।’, ‘আচরণবিধির কাঁটাতারে আটকে ছিল তোমার ওড়নার উড়াল ছুঁতে যাওয়ার দিন’, ‘নিশুতিরাতে মোগলদের গল্প শোনায় মোগলটুলী, / টিকাটুলী, চকবাজার, খিলজি রোড ইত্যাদি নামের সড়কগুলি’, ‘শ্রাবণের হাতে উল্টে দেয়া একখানা আত্রাই’, ‘একটি সত্যিকারের ক্ষণ—/ দাঁড়িয়ে আছে উদ্বোধিত হওয়ার অপেক্ষায় / হাতে নিয়ে সময়ের অনুনমোদিত দাওয়াত পত্র’, ‘ ভি-চিহ্ন আঁকা আঙুলে ছুঁয়ে মেঘের মিনার’, ‘শিক্ষার্থী বিকেল ফিরে বুকে নিয়ে বনসাই পাঠ’, ‘ ইলামিত্রের নাতনি নিয়ে কণ্ঠে ন্যায়ের দাবি/ কালের গুদাম খুলে ফেলে ওড়ায় যুগের চাবি’, ‘অ্যারিস্টটলের সাদা সংজ্ঞাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে/তুমি আসলে হলুদ ব্যতিক্রম’, ‘অতঃপর জাকারবার্গের রিসাইকেল বিনের ঝুড়ি থেকে ফেলে দাও/ঝাটা দিয়ে মাউসের’, ‘গুগলের পাতা উল্টালে শরমিন্দা হয়ে ওঠে লীনাও’, ‘রাস্তার পাশে আহত দৃশ্য হয়ে উঠি’, ‘যমুনার জল ছুঁয়ে হাওয়া হয়ে ওঠে আবদুল আলিম’, ‘তোমার ঠোঁটে আঙুরখেতের গোলাপি বিলবোর্ড ’, ‘আমি ঘুমোতে গেলে সে তার খামখেয়ালি হাত রাখে’, ‘টয়োটা সোফায় শরীরের ক্লাসমেট শরীর’, ‘কানখাড়া ফেরেশতাদের আসমান / ঝুঁকে আসে ধুলিমাখা মানুষের পৃথিবীর দিকে’, ‘ঝড়ের গতিতে তুমিই প্রথম চুমু দিলে’, ‘তোমার ব্লাউজ বদলানোর দৃশ্য দেখে মুগ্ধ ওয়াল্টনের ড্রেসিং টেবিল’, ‘হারের কথা লুকিয়ে রাখি হার্ডডিক্স’, ‘মজিদ দাদার মন নিয়ে দাঁড়িয়ে আমি/বদ্বীপের বটবৃক্ষ’, ‘পাতাবাহার মন উল্টিয়ে এটিও দেখেছি বহুবার’, ‘হে জননী, বিষুবরেখায় হেলান দিয়ে চোখ মেলে দ্যাখো’, ‘ইউনিফর্মের রেশনে জমা হয় শায়েস্তা খানের কাল’, ‘গাঙের বাতাসে ওড়ে নাকডাকা ভোর’, ‘স্তনে মুখ দিয়ে ঘুমিয়ে পড়া চাঁদ’, ‘মানুষের রাষ্ট্র মানে—বারুদের পাহারায় ডলারের মাতবরি’, ‘তাকিয়ে আছে হেরেমের দলবিহীন নারীর দল’, ‘কুয়াশার আব-ই রওয়ানে ঢেকে আছে/ প্রশান্ত সমুদ্রের নিতম্ব’, ‘সমুদ্রের নাভি থেকে ভেসে আসে/ হামব্যাক তিমির মহামিলনের গান।’, ‘বুকের বোতাম খুলে ডেকে নেবে করচের শাখা’, ‘ অলখে অলখে কেটে যায় কোলাহল ঘেরা নৈঃসঙ্গ্যের তাজমহলে / সমাহিত যাবতীয় সকাল দুপুর সাঁঝ’, ‘ জলভেজা হাওয়ার দেওয়ালে পাল হয়ে ওঠা শিবগঞ্জ সিল্কের দোপাট্টা’, ‘ আমার গোপন ভ্রান্তির কৃষ্ণপক্ষে তার সেই চোখই / হয়ে ওঠে তিন ব্যাটারির টর্চলাইট’ প্রভৃতি।

কবিতায় ২টি চিত্রকল্পের ব্যবহারের উদাহরণ
১.
‘ব্যাংকচুরির রাত অন্ধকারের চাবুক মেরে
তাড়িয়ে দিয়েছে বইচুরির দিন: পালাও শালার ছিচকে চোরের দল!
চেয়ারে বসে ফেসবুকে ব্যস্ত মাঝবয়েসী লাইব্রেরিয়ান
এই সুযোগে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে বসে অদৃশ্য হাত মুছে দিতে প্রস্তুত তামাটে পাতার প্রিন্ট...’

২.
মার্কিন ফাইটারের ঈগল-ইঞ্জিনে রাঙা হাত বুলিয়ে
ইজরাইলি সৈন্যদের বোমার ঝুড়ির গন্ধ শুঁকে এবং
আইএমএফ এর চক্রবৃদ্ধি সুদের খাতায় ফুঁ লাগিয়ে
সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নভিটায় নেমে আসে ভালোবাসা—
পরনে পুরোনো জামা, মাথায় রাজহাঁসের রুপালি
পালক।
৩.
অতীতের মেঠোপথ আজ বর্তমানের ফ্লাইওভার
ছুটছে দিন---ছুটছে রাত—
অকটেন হয়ে জ্বলছে হৃদ-যুগের ভালোবাসা
৪.
দ্যাখো, বগলে ইট রেখে হেঁটে চলেছে দিন,
মাথায় গোল করে বাঁধা শেখ ফরিদের পাগড়ি
৫.
ইতিহাসের টর্চ নিয়ে দুচোখ মেলে দ্যাখো—
বিজয়ী মীরজাফরের মাথায় নয়,
পরাজিত সিরাজের শিরেই
কোহিনূর মুকুট ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে মহাকাল।

কবিতায় ব্যবহৃত উপমা/রূপক

‘বেহুলার মতো তুমিও’, ‘তীরবিদ্ধ ঘোড়ার মতো আমি’, ‘ট্রাম্প ট্রাম্প মুখ’, ‘তুমি তো সেই অদ্ভুতী চাঁদ’, ‘আলো মানে মুখোশের মেলা’, ‘স্কুলসহপাঠিনীর মতো কোরাসে উচ্ছল’, ‘শীতের বৃষ্টির মতো সন্ধ্যা নেমে এসেছিল’, ‘পিতা একটি উচ্চারিত সুখের নাম’, ‘প্রাচীন প্রথার মতো কেঁপে উঠেছিল’, ‘সূর্যের মতন নিরপেক্ষ’, ‘বাগানের মতো ভালোবাসা’, ‘ভাতের হাঁড়ির মতো স্নেহবৎসলা’, ‘নদীবর্তী অনার্য জুটির মতো’, ‘নতুন চরের মতন দোআঁশ বুকের জমিন’, ‘নাসাচালিত স্যাটেলাইট ক্যামেরার মতো’, ‘জেলগেটে মালা পাওয়ার মতো খুনি’, ‘ধানের গোছার মতো সাম্যবাদী’ প্রভৃতি।

অভিনব উপমার ব্যবহার
১.
শেয়াল আর আঙুর ফলের মতন আমার একটা চাকরি ছিল;
২.
কিন্তু সেদিনের ক্লাস টেনের সেই আঞ্জু আপার হাওয়ায় দোলা
ওড়নার মতো বাগানবিলাস নয়, বারোয়ারি ফ্ল্যাট-ভবনের গেটে হাসে
স্বৈরাচার কবলিত গণতন্ত্রের মতো মলিনমুখ কতিপয় গেটম্যান:
৩.
মেহেদী হাসানের গজলের মতো সম্মোহনের সুর ছিল বাতাসে
৪.
মৃত্যুর অন্তত একদিন আগে আমাকে কি সতর্ক করে দেবে ঘড়িটা সেই মিথ্যাবাদী রাখালের মতো: পালাও!
৫.
সম্রাট আকবরের বুকের মতো আমাদের মুক্ত বিশ্বাসের উঠোনে সানগ্লাস পরে এসেছে
ভুল ভালোবাসা, আমরা তাকে পিঁড়ি পেতে দিয়েছি,
৬.
এবং তোমার কথার শেষে প্রতিবারই কেঁপে ওঠে
স্বরাষ্ট্রসচিবের পিয়নের মতন তিনটি বিস্ময়চিহ্ন!!!
৭.
আমাদের গণতন্ত্রের শৈশবের জামাকাপড়ে
হাওয়ার মতো মিশে আছে তোমার দরদিহাতের ছোঁয়া।
৮.
আবার কোনো কোনো ঝড়ের রাতে
তুমি কীভাবে যেন বুঝে যাও—এই মুহূর্তে আমার মেঘনা চায় না
তোমার পদ্মার উথাল পাথাল আদর!
৯.
হিজলের সার্কিট হাউস নিয়ে
বুকে পাখপাখালির ওলোক্স উৎসবে মুখরিত টাঙ্গুয়ার হাওড়
১০.
গফুর বলদ পোষে, জমিদার পালিছে মিডিয়া।

১১.
আমি প্রেমিক বলে হৃদয়ের গন্ধ চিনতে পারি
যেমনটি পারতেন ইবনে সিনা খোশবুর উৎসকে
তার রাডারের মতো নাক লাগিয়ে চাহারবাগের হাওয়ায়;

সবশেষে বলা যায়, কবি আমিনুল ইসলাম বাংলা কবিতার সেই বিরল কণ্ঠগুলোর একজন, যিনি গভীরভাবে পাঠকের চেতনায় প্রবেশ করেছেন। তাঁর কবিতা উচ্চকণ্ঠে বিপ্লবের ডাক না দিলেও ভেতরের মানুষটিকে ধীরে ধীরে নাড়িয়ে দেয়। তিনি শব্দকে ব্যবহার করেন প্রদর্শনের জন্য নয়, অনুভবের জন্য। অলংকারের বাহুল্য প্রদর্শনের জন্য নয়,ভাষার মধ্য দিয়ে জীবনের অনিবার্য সত্যগুলোকে স্পষ্ট করেছেন এবং সেটাই তার কাব্যচর্চার মূল শক্তি। আমিনুল ইসলামের কবিতায় ব্যক্তিমানুষের সংকট, সমাজের চাপ, স্মৃতি, প্রেম, নিঃসঙ্গতা ও সময়—সবকিছুই এক ধরনের স্বচ্ছ অথচ বিষণ্ন আবহে ধরা পড়ে। এই ভাবনার আবহই তাকে সমসাময়িক কবির ভিড় থেকে আলাদা করেছে। আর সেটা হলো কবিতায় বহুমাত্রিকতা,বহুস্বরের ব্যঞ্জনা। কবিতার অবয়ব দীর্ঘ হলেও পাঠক যে আবহ ও ঘোরের মধ্যে নিপতিত হন—সেটাও এক রকমের আকর্ষণ তৈরি করে। বাহুল্য শব্দ নয়,বাহুল্য অলংকার নয় বরং আবেগ অনুভূতিতে এক রকমের নাড়া দেয়—কবিতার ভাষা দর্শণ যার মুলকেন্দ্রে থাকে। বাংলা কবিতার ধারায় আমিনুল ইসলাম হয়তো আলোচনার কেন্দ্রে সবসময় থাকেন না, কিন্তু যাঁরা কবিতাকে গভীরভাবে পড়েন, অনুভব করেন—তাঁদের কাছে তিনি অপরিহার্য। বলা যায়, তিনি সেই কবি যিনি সময়ের চাপে,পারিপার্শিকতার চাপে নিজেকে বদলাননি। বরং নিজের স্বর,স্বাতন্ত্র চিন্তার আনুকুল্যে থেকে নিজের পথেই হেঁটেছেন। এই ধারাবাহিকতাই তাঁকে একজন গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।


মন্তব্য ২ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (২) মন্তব্য লিখুন

১| ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:২২

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: আপনি যদি আপনার রিসার্চ পেপার আমাদের
কাছে উপস্হাপন করেন তাহলে,
আমরা বেকুব হয়ে থাকব,
কারন এই ব্যাপারে আমাদের জ্ঞান সীমিত ।

....................................................................
আপনার পরিশ্রম সার্থক হোক ।

০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৩৫

দ্বীপ ১৭৯২ বলেছেন: অনেক কবি লেখক আছেন এখানে।তারা মতামত জানাতে পারবে।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.