নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সাদনূর সালেহীন স্বপ্নীল

সাদনূর সালেহীন স্বপ্নীল › বিস্তারিত পোস্টঃ

ছোটগল্পঃ দ্বিতীয় মৃত্যু

০৮ ই জানুয়ারি, ২০১৫ রাত ১০:০৯

মেয়েটি আমার আঙুল স্পর্শ করে শোনা যায় না এমন স্বরে বলল,"ফ্যালাঞ্জেস!"

তারপর ফ্যালাঞ্জেসগুলো গুনতে শুরু করল,বুড়ো আঙুলে দুইটা পেল আর অন্য চারটাতে মোট ১২ টা পেল।বইয়ের সাথে মিলিয়ে দেখতেই মেয়েটার মুখে সুন্দর একটা হাসি ফুটে ওঠে।মিলেছে,১৪ টাই থাকার কথা।

তার টেস্ট করা শেষ হয়েছে...সবগুলো টেস্টেই আমি পাশ। ৩০ হাজার টাকা দিয়ে আমাকে কিনে সে লস খায়নি।আমি পুরোপুরি ফিট,শতভাগ নিখুত একটা কঙ্কাল!!

মেয়েটার বাবা ঘরে ঢুকলো।মাথায় কাচপাকা চুল,ক্লিন শেইভড,চোখে মোটাফ্রেমের চশমা।এই শিতের মধ্যেও পাতলা একটা গেঞ্জী পরা,ঘরে কি হীটার লাগানো... শুধু হাড্ডি দিয়ে আমি কিছুই অনুভব করতে পারিনা,না শীত... না গরম!! গাছের পাতা না থাকলে শীত,বৃষ্টি হলে বর্ষা আর ফুল ফুটলে বসন্ত।এইভাবে আমি মরে গিয়েও বেচে আছি।

মেয়ের বাবা মেয়ের মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বলল,"সব ঠিক আছে মা??"

"হুম বাবা... মিলিয়ে দেখেছি"

"এপ্রোনটা পড়ে আয় মা,তোর কঙ্কালের সাথে তোর একটা ছবি তুলে দেই!"

মেয়েটা এপ্রোন পরছে।এই কাজটা সবাই করে... গত ২০ বছরে তিনবার আমার মালিক বদল হল।সবাই প্রথমেই আমাকে নিয়ে একটা ছবি তুলে।আমার আফসোস হয় তখন,বেচে থাকতে কত চেষ্টা করেছিলাম একটা ক্যামেরা কিনে ফেলতে,পারিনি বলে একটা পাসপোর্ট সাইজের ছবি ছাড়া আর কোন ছবিই তোলা হল না!

ছবি তোলা শেষে মেয়েটা আমাকে আমার নতুন বাক্সে ভাজ করে রেখে দিল। আমি আমার হাত পা মেরুদন্ড আর বুকের হাড়গুলোর ওপর মাথা রেখে চুপচাপ শুয়ে রইলাম।

আমি মরে গিয়েছিলাম আজ থেকে ২০ বছর আগে,আত্মহত্যা করেছিলাম।ইয়াসমিনকে ছাড়া বেচে থাকা আমার অর্থহীন মনে হয়েছিল।ইয়াসমিনকে আমি বিয়ে করতে পারিনি,সেই জন্য আমি ইয়াসমিনকে কোন দোষ নেই।বেকার ছেলের কাছে কেউ মেয়ে দেয়না, সেইম এজ রিলেশন টেকেনা এজন্যই।

আমার মরে যাওয়ার ডিসিশন টা ঠিক ছিল,কিন্তু মরে যাওয়ার পদ্ধতিটা ভুল ছিল। গভীর রাতে ব্রীজ থেকে লাফিয়ে না পড়ে আমার উচিত ছিল নিজের রুমে বসে হাতের রগ কেটে ফেলা।ফাসিতে ঝোলাটা আমার মেয়েলি মনে হয়,কিংবা উচিত ছিল পিস্তল জোগার করে ইয়াসমিনের বাসার সামনে এসে নিজের মাথায় গুলি করা।তাহলে ব্যাপারটা আরো বেশী নাটকীয় হতো।

ইয়াসমিন হয়তো তার বিয়েটা ভেঙে দিত,সারাটা জীবন বিয়ে না করেই কাটিয়ে দিত!!মরে গিয়েও একটা প্রেমকাহিনীর নায়ক হয়ে বেচে থাকতাম!এইভাবে চোরের মত মরে গিয়ে কোন লাভই হল না আমার।

আত্মীয় স্বজনের কাছে আমি নিখোজ, ডাক্তারদের কাছি প্রথমে বেওয়ারিশ লাশ ও পরে কঙ্কাল,স্রেফ কঙ্কাল।একটা স্কাল আরেকটা ট্রাঙ্কের সমষ্টিমাত্র!!

মেয়েটার কাল ভাইবা।

আমার ফিমারটা হাতে নিয়ে মিলিয়ে মিলিয়ে পড়ছে।এই হাড়ের সাথে কি কি মাসল থাকে,কোন কোন নার্ভ থাকে...কোন নার্ভের কি ফাংশন!হঠাত ফোন এল।মেয়েটা ফোন ধরেই বলল,"তোকে না বলসি আর ফোন না দিতে?"

"ক্যান?"

"আমি রিলেশনে যেতে চাই না..."

"দুইদিন আগে না হ্যা বললি!"

'এখন আবার না বলতেসি।"

"আমাকে তুই হাতের পুতুল পাইছিস??একবার হ্যা,আরেকবার না??"

"দ্যাখ রাতুল, আমরা সেইম এজ... সেইম এজ রিলেশন কখনো সাকসেসফুল হয়না... আর এইটা তোর সাময়িক আবেগ।তোর এস্টাবলিশড হতে ১০ বছর লাগবে,এই ১০ বছর ......

মেয়েটি জোরে জোরে বলতে থাকে...আমার করোটির মধ্যকার গর্ত দুটি চেয়ে থাকে মেয়েটির দিকে... "সেইম এজ" শব্দটা শুনলেই করোটির ভেতরে অন্ধকার জমাট বেধে যায়।ভালবাসা,ইয়াসমিন,ব্যার্থতা,হতাশা,পাপ,ব্রীজ,পানি... নিশ্বাস , অক্সিজেন... স্মৃতিগুলো ঘুরতে থাকে।হাত টা যদি শরীর থেকে আলাদা না হত আমি মাথা চেপে ধরতাম!! আর সহ্য হয়না,মরে গিয়েও শান্তি নেই!!

"কার সাথে কথা বলছিস রে?"

"কারো সাথে না...মা তুমি যাও"

"ফোনটা আমাকে দে তো"

গম্ভীর আর রাগী মুখটার দিকে আমি বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম... ওরা কি বলছে আর শুনছি না। ইয়াসমিন... আমি ইয়াসমিনের মেয়ের কেনা কঙ্কাল!! নিয়তি আমাকে এইভাবে ঠকাল!!

ওদের পরিস্থিতি একসময় ঠান্ডা হয়ে আসে,মেয়ে তার মায়ের বুকে মুখ গুজে কাদে।খানিক বাদে মেয়ের বাবা এসে দুজনকেই টেনে নেয়।মেয়ে আর তার মা, দুজনই পরম নির্ভরতায় কাচপাকা চুলের সেই পুরুষটির বুকে মাথা রাখে... যেই পুরুষটি আমি হতে পারিনি বলে ২০ বছর আগে নদীর গভীরে অক্সিজেনের অভাবে মরে গেছিলাম!

এইবারে আমার মায়ের কথা মনে পড়ে... না জানি আমার বুড়ো মা ঝাপসা চোখে এখনো জানালায় তাকিয়ে থাকে,ভাত বেড়ে বসে থাকে আমি বলে।

হয়তো আমার মা মরেই গেছে,কঙ্কাল হয়ে শান্তিতে শুয়ে আছে মাটিতে।

আমার মা নিশ্চয় কল্পনাও করেনি জগতের সবটুকু অশান্তি অস্থিতে ধারন করে আমি মোটাকাগজের এক বাক্সের ভেতর নিজের হাড়ের উপর শুয়ে থাকি।

বিবর্ন,কুতসিত,নোংরা এই রুঢ় বাস্তবতা দেখে আমার খুব কাদতে ইচ্ছা করে,কিন্তু আমার দেহে যে আজ কিছুই নেই,ল্যাক্রিমাল গ্রন্থিটাও নেই যে একটু চোখের পানি ফেলে হালকা হব!

আরও একটা বার মরতে ইচ্ছা করছে!!

মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ০৯ ই জানুয়ারি, ২০১৫ রাত ১২:১৬

পাতা ঝরার দিনে বলেছেন: কি ভয়ানক!!!

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.