| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
দীপক ৭৪ রায়
Dipak Ray, Kalirhat, Krishnagar, Nadia, WB, India, Ph. 9775179985 Mail. [email protected]আমি লিখি, লেখার চেষ্টা করি। যা বিশ্বাস করি না, তা লিখি না। শিক্ষকতা আমার পেশা, লেখালেখি-সাংবাদিকতা নেশা। আমার লেখার সমালোচনা হলে, আমি সমৃদ্ধ হই।
মাটি খুঁড়ে পাওয়া বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে জানা যায় বাংলায় মূর্তিপুজোর প্রচলন অনেকদিনের। কিন্তু আগে সেইসব মূর্তি ছিল পাথরের। মাটির প্রতিমা দিয়ে পুজো করার রীতি এসেছে অনেক পরে। ধারনা করা হয়, পাথর দূর্লভ ও মূল্যবান হয়ে পড়ার জন্যেই মাটির মূর্তির সূচনা হয়। বঙ্গদেশে কলকাতার সাবর্ণ চৌধুরী বাড়ির মূর্তিপুজোকেই বলা যেতে পারে প্রামান্য সবচেয়ে প্রাচীন পুজো। সেটা হলে বাংলার মূর্তিপুজোর ইতিহাস বড় জোর চারশো বছরের। তার আগে, বা সেই সময় হিন্দু বাঙ্গালীদের মধ্যে হয়তো মূর্তিপূজো হত, কিন্তু তার কোন প্রামান্য নথি পাওয়া যায় নি এখনো। ঠিক একইভাবে বাংলার মূর্তি নির্মাণ কারখানার বয়সও মোটামুটি চারশো বছরেরই। সেই সময় কুমোর বা পাল সম্প্রদায় মূর্তি বা প্রতিমা নির্মাণে নয়, খ্যাতি ছিল তাদের হাঁড়ি, কলসি, পুতুল ও অন্যান্য নিত্যব্যবহার্য বাসনপত্র তৈরির জন্যই। কিন্তু কালে কালে মূর্তিপুজোর প্রচলন বাড়তে থাকে, সমস্ত হিন্দু দেবতার মূর্তি তৈরীতে তারা লিপ্ত হয়। আর সেই মূর্তি তৈরী কেবল কলকাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে ছড়িয়ে পড়ে সারা বাংলায়।
বাণিজ্যিক কারণে মুঘল বাদশাহ ঔরাঙ্গজেবের আমন্ত্রণে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কুঠিয়াল জোব চার্নক সুতানুটি গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলেন ১৬৯০ সালের আগস্ট মাসে। সেই সূত্র ধরে কয়েক বছরের মধ্যেই সুতানুটির পাশের গ্রাম কলকাতাতে প্রতিষ্ঠিত হল কোম্পানির প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। সেই সময়তেও কলকাতা গ্রামই ছিল। এই গ্রামের নগরায়ণ শুরু হয় পলাশির যুদ্ধের ঠিক পরে পরেই। কোম্পানির ব্যবসার টানে, কাজের আশায় গ্রামাঞ্চলের নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত, ব্যবসায়ী মানুষ তখন ধীরে ধীরে কলকাতায় ভীড় করতে শুরু করে। তখনো কিন্তু তাদের কলসি, হাঁড়ির জোগান আসতো সেই কুমোরপাড়া থেকেই। ইতিমধ্যে বাংলার নদিয়া জেলা, বিশেষতঃ কৃষ্ণনগর থেকে কিছু কুমোর সম্প্রদায়ের মানুষ বসতি গড়েন কলকাতার কুমোরপাড়াতে। একসময় তার নাম হয়ে যায় কুমোরটুলিতে, সেই নাম আজও বহাল তবিয়তেই আছে।
কিন্তু দিন বদলের ফলে, কোম্পানী যখন বাজারে কাঁসা, পিতলের বাসন আনতে শুরু করে, তখন সমস্যায় পড়েন কুমোরটুলির কারিগরেরা। মাটির বাসনের বাজার মন্দা দেখে কেউ কেউ কৃষ্ণনগরের শিল্পীদের কাছ থেকে পুতুল গড়ার কাজ শিখে টিঁকে ছিলেন। আর যারা সেটা পারলেন না, চলে গেলেন অন্যত্র। পলাশির যুদ্ধের পরে বাংলার মূল শাসন ক্ষমতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে চলে যাওয়ায় সমগ্র পূর্ব ভারতের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে ওঠে কলকাতা। ইংরেজদের সঙ্গে বাণিজ্য করে এক শ্রেণির মানুষের হাতে জমে উঠতে থাকে প্রভূত ধনসম্পত্তি। আর সে যুগে যেহেতু বিত্ত ভোগ করার প্রচুর আয়োজন তেমন কিছু ছিল না, তাই সেই সময়ের হিন্দু বিত্তজনের কাছে মূর্তিপুজোই হয়ে ওঠে বৈভব প্রদর্শনের অন্যতম মাধ্যম। কলকাতায় যত বাড়তে থাকে ধনীর সংখ্যা, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে মূর্তিপুজোর সংখ্যাও। সেই দেখাদেখি কলকাতার গন্ডী ছাড়িয়ে মূর্তিপুজো ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র বাংলায়। সেই সব ধনী বাবুদের বাড়িতে প্রতিমা তৈরির কাজে ডাক পড়তে লাগলো কুমোরটুলির মূর্তিশিল্পীদের। আর এইভাবেই কেটে গেল গোটা আঠারো ও উনিশ শতক।
তবে এই দীর্ঘ সময়ে মূর্তি তৈরীতে অনেক বদল ঘটেছে। সময়ের সাথে সাথে মূর্তির রূপবৈচিত্র্যের হেরফের ঘটেছে। আগে ছিল একক পারিবারিক উদ্যোগের বাড়ির পুজো। বিভিন্ন পুরাণগ্রন্থের বর্ণনা অনুসারে মূর্তি তৈরী হত। তবে অঞ্চলভেদে মূর্তির গায়ের রং, চেহারা ছিল আলাদা। সময়ের সাথে সাথে সেসব গেল বদলে। যখনই দলবদ্ধ, পাড়াগত, সাবজনীন মূর্তিপুজো শুরু হল, তখন থেকেই মূর্তিপুজো উতসবের রূপ পেলো। পুরানের, ইতিহাসের, শাস্ত্রের দেবতারা নেমে এলেন বাস্তবের মাটিতে। আর তাই এখন যতটা না মূর্তিপুজো নিয়ে মাতামাতি, তার চেয়ে বেশি মানুষ মেতে ওঠে মূর্তিপুজোকে কেন্দ্র করে অন্যান্য অনুষ্ঠানে, মূর্তিপুজো সেখানে গৌন হয়ে যায়।
©somewhere in net ltd.