নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

নিভন্ত এই চুল্লীতে মা একটু আগুন দে , আরেকটু কাল বেঁচেই থাকি বাঁচার আনন্দে।

জ্যোতির্ময় ধর

পাঠক

জ্যোতির্ময় ধর › বিস্তারিত পোস্টঃ

সাংবাদিক ডিরোজিও

০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:২৩



উনিশ শতকের দ্বিতীয় পর্বে , রামমোহন যুগের উপান্তে বাংলাদেশে যে নবজাগরণ ঘটেছিল তার প্রাণ পুরুষ ছিলেন পর্তুগীজ বংশোদ্ভূত তরুণ শিক্ষক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও । তিনি ছিলেন বিশ্বমানবতার পূজারি , আন্তর্জাতিকতায় বিশ্বাসী ও মুক্ত সাংবাদিকতার অনুগামী একজন সমাজ সংস্কারক । ১৮২৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে তাঁর আয়োজনে অনুষ্ঠিত Academic Association নামের পাঠচক্রের মাধ্যমে বাংলার তরুণ সিংহশাবকদের গগনভেদী গর্জন শোনা যেত তৎকালীন সমাজের যাবতীয় ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে , নৈতিক ভন্ডামি ও নোংরামির বিরুদ্ধে , কুপ্রথা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে , বিচারবুদ্ধিহীন শাস্ত্রবচনের বিরুদ্ধে প্রাণহীন চিরাচরিত আচার অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে , জাতিভেদ ও পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে , রাষ্ট্রিক অর্থনৈতিক ও মানসিক জড়ত্বের বিরুদ্ধে এমনকি সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের বিরুদ্ধে পর্যন্ত । ডিরোজিও ছিলেন কোলকাতার স্বনামধন্য বিদ্যাপীঠ হিন্দু কলেজের শিক্ষক ও তাঁর ছাত্রদের এই নবযুগমন্ত্রে দীক্ষিত করেছিলেন । হিন্দু কলেজে ইংরেজি শিক্ষালাভ করে নবযুগের পাশ্চাত্য ভাবধারার সংস্পর্শে এসে তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশে পাশ্চাত্য আদর্শ-সংঘাতের ফলে সমাজে যে জাগরণের চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছিল, স্বভাবতই তার প্রতিভু হয়ে উঠেছিলেন ডিরজিওর অনুসারী কিছু নবীন তরুনের দল । ডিরজিওর অনুসারি এই তরুন ছাত্রগোষ্ঠীকে ডিরোজীয়ান বলা হত এবং "ইয়ং বেঙ্গল" নামে বাংলার যে তরুণদল ইতিহাসে সুখ্যাত ও কুখ্যাত , তাঁরা ডিরোজীয়ান । এই তরুণদের মধ্যে প্রায় সকলেই অসাধারণ প্রতিভাবান ছিলেন ও তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় , দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় , রামগোপাল ঘোষ , রাধানাথ শিকদার , রামতনু লাহিড়ী , গোবিন্দচন্দ্র বসাক প্রমুখ । একুশ শতকেও আমরা যে সমাজে বাস করি সেখানে প্রতিনিয়ত হাজার কুসংস্কার , অন্ধবিশ্বাসের সম্মুখীন হতে হয় এবং করতে হয় অদৃশ্য বা দৃশ্যমান শক্তিকে নির্বিচার ভক্তি । দ্বিমত বা প্রশ্ন তোলার জায়গা নেই । অথচ সেই সময়ে ডিরজিও পরিচালিত Academic Association এর পাঠচক্রে আলোচিত হত যুক্তি বড় না অন্ধবিশ্বাস বড় , বিশ্বাসে মেলায় বস্তু না ক্ষুরধার বুদ্ধির আলোকে ও তর্কে , অবাধ ব্যক্তি স্বাধীনতা না বাধ্য সমস্টিবশ্যতা কোন টা কাম্য ? ডিরোজিওর চিন্তাভাবনা এবং ছাত্রদের মধ্যে তার প্রভাবের কারণে রক্ষণশীল হিন্দু অভিভাবকরা আপত্তি জানান, ফলে হিন্দু কলেজের পরিচালকরা তাঁকে ১৮৩১ সালে তাঁকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন ।

Academic Association এর আলোচনার ভেতর দিয়ে সত্যের দুর্গম দ্বীপে বাংলার তরুণদের দুঃসাহসিক অভিযান চলতে থাকলো অনিরুদ্ধ গতিতে । এবার স্বদেশী বীণার ছেঁড়া তারে ডিরোজিও নিজেই সুর বাঁধলেন । তাঁর উদ্যোগে ও ডিরোজীয়ানদের সম্পাদনায় ১৮৩০ সালে Academic Association এর মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হল "The Parthenon " এই "The Parthenon " ছিল বাঙালীদের দ্বারা সম্পাদিত প্রথম ইংরেজি পত্রিকা । "The Parthenon" মাত্র দু সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল । প্রথম সংখ্যার বিষয়বস্তু ছিল স্ত্রীশিক্ষা , হিন্দুধর্ম , মূর্তিপূজা , বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ইত্যাদির আলোচনা ও সমালোচনা । দ্বিতীয় সংখ্যা ছাপানো হয়েছিল বটে , কিন্তু গ্রাহকের কাছে পাঠানো হয় নি । প্রথম সংখ্যা দেখেই গোঁড়া হিন্দুরা এতদূর শংকিত হয়েছিলেন যে দ্বিতীয় সংখ্যা মুদ্রাঙ্কিত হলেও তাঁদের প্রবল বিরোধিতার কারনে সংখ্যাটি গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয় নি । তবে পত্রিকা বন্ধ হলেও ডিরোজীয়ানদের সত্যানুসন্ধানের ইচ্ছা নিবারিত হয় নি ।

শিক্ষকতা ছেড়ে ডিরোজিও সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় আত্মনিয়োগ করলেন । সামাজিক আন্দোলনের ও জনমত গঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার সংবাদপত্র তিনি তা জানতেন তাই পত্রিকার মাধ্যমে তাঁর মতামত ও আদর্শ প্রচারের জন্য প্রস্তুত হলেন । নিজের সমস্ত সম্বল উজাড় করে ১৮৩১ সালে প্রকাশ করলেন "The East India" নামে ইংরেজি দৈনিক । তিনি এ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন । সেই পত্রিকায় অনেক বকধার্মিকের মুখোশ খুলে দেওয়া হত । যেমন আগস্ট ১৮৩১ এ ভাদ্রোৎসব উপলক্ষ্যে ব্রাহ্মসমাজের উদ্যোগে পণ্ডিত বিদায় এর ব্যবস্থা হয়েছিল। দুশো ব্রাহ্মণ পন্ডিত ও তাঁদের ছেলেদের দুটাকা থেকে ষোল টাকা হারে দক্ষিনা দেওয়া হয় । (১৯২ বছর আগে টাকার অংকটা নেহায়েত কম নয় ) । "The East India" পত্রিকায় লেখা হয়ঃ ব্রাহ্ম্যসভা কি ব্রাহ্মণদের ভেলকিবাজির মঞ্ছ ? আমরা তো জানতাম , তা নয় । কারণ এই সভার প্রতিষ্ঠাতা হলেন রামমোহন রায় । তিনি মানবপ্রেমের পূজারী । শুনতে পেলাম সমাজের পরিচালকরা এমন কাজ নাকি হামেশাই করে থাকেন । দয়াধর্ম প্রশংসনীয় কাজ , সন্দেহ নেই । কিন্তু আমাদের জিজ্ঞাসাঃ এক সময়ে কাউকে উঁচুতে তোলা আর নিচুতে নামানোর কি অর্থ আছে ? আসলে এ হলো সম্পূর্ণ আজগুবি কান্ড । ওই পত্রিকাতেই হিন্দু সমাজকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছিলঃ রক্ষণশীল , আধা উদারপন্থী আর উদারপন্থী । কথা ও কাজের মিল না থাকলে তার সমালোচনা করা ছিল রি পত্রিকার অন্যতম কাজ । তার সমাদক সমীপেষু অংশে এমন চিঠি ছাপা হতো । বড়লোকের বাড়িতে দুর্গাপূজার সময় বড়লাট , ছোটলাট থেকে প্রধান বিশপ ও অন্যান্য খ্রিস্টান ধরমযাজকদের উপস্থিতি নিয়ে এমন একটি চিঠি ছাপা হয়েছিল । সাংবাদিকতার এই ঐতিহ্য ডিরোজিওকে বিশিষ্ট ও স্মরণীয় করে রেখেছে ।

"ইন্ডিয়ান গেজেট"-এর সম্পাদক জন গ্রান্টের আহ্বানে তিনি সেখানে সাব-এডিটর হিসেবে যোগ দেন । হিন্দু কলেজের শিক্ষক থাকা অবস্থায় ১৮২৬ সালে, ডিরোজিও "ইন্ডিয়ান ম্যাগাজিন" নামে একটি জার্নাল প্রতিষ্ঠা করেন বলে জানা যায় । এই জার্নালের মাত্র পাঁচটি সংখ্যা প্রকাশিত হওয়া সত্ত্বেও, এটি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে । ১৮২৯ সালের আগস্ট থেকে চালু হওয়া মাসিক জার্নাল "ক্যালিডোস্কোপ"-এর সাথেও তাঁর যোগাযোগ ছিল । তিনি কেবল একজন দক্ষ শিক্ষক বা বক্তাই ছিলেন না বরং একজন শক্তিশালী লেখকও ছিলেন। তৎকালীন ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা ব্যবস্থায় ছাত্রদের প্রথম এবং প্রধান কর্তব্য ছিল শিক্ষকদের কথা চুপচাপ শোনা । কিন্তু ডিরোজিওই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি তার ছাত্রদের তাদের চিন্তাভাবনা স্বাধীনভাবে প্রকাশ করার, কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করার এবং যুক্তিসঙ্গতভাবে সমস্যার সমাধান করার পূর্ণ সুযোগ দিয়েছিলেন । তিনি তার ছাত্রদের শ্রেণীকক্ষের চার দেয়ালের বাইরে নিয়ে এসে বিতর্কিত সমাজ বিনির্মাণে অংশগ্রহণের জন্য জোর দিয়েছিলেন । তিনি কেবল সঠিক কথা বলতে শেখাতেন না বরং লিখতেও উৎসাহিত করেছিলেন । তার লক্ষ্য ছিল সমাজের আমূল সংস্কারের জন্য নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া । ডিরোজিওর পরে তার অনুসারীরা সফলভাবে তার কাজটি এগিয়ে নিয়ে যান এবং সাধারণ মানুষের জীবনের সমস্যা সমাধানের উপর যথেষ্ট আলোকপাত করেন এবং জনকল্যাণের পথ প্রশস্ত করেন । এর জন্য তাঁদের গণমাধ্যমের সাহায্যের প্রয়োজন ছিল । ডিরোজিও তার ছাত্রদের মনে যে নতুন শিক্ষার আলো প্রজ্বলিত করেছিলেন তা পরবর্তীতে বিভিন্ন মাধ্যমে সমাজে স্থান পেয়েছিল ।

১৮৩১ সালের মে মাসে ডিরজিওর উৎসাহে তাঁর সুযোগ্য ছাত্র কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ করলেন ইংরেজি পত্রিকা " The Enquirer " । পত্রিকাটির উদ্দেশ্য ঘোষণা করে প্রথম সংখ্যায় কৃষ্ণমোহন লেখেন " Having thus launched our bark under the denomination of Enquirer, we set sail in quest of truth and happiness".

১৮৩১ সালের ৩১ মে ডিরোজীয়ান দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়কে দ্বিভাষিক সাপ্তাহিক হিসাবে "জ্ঞানান্বেষণ" প্রকাশের লাইসেন্স দেওয়া হয় । এই পত্রিকাটি ১৮ জুন, ১৮৩১ থেকে কাজ শুরু করে । জ্ঞানান্বেষণ পত্রিকার আদর্শ প্রচারিত হল এই সংস্কৃত শ্লোকটিতেঃ

এহি জ্ঞান মনুষ্যানামজ্ঞান তিমিরংহর ।
দয়া সত্যঞ্ছ সংস্থাপ্য শঠতামপি সংহর ।।


আরেকটি দ্বিভাষিক সাময়িকী, "Bengal Spectator " , ১৮৪২ সালের এপ্রিল মাসে ডিরোজীয়ান রামগোপাল ঘোষ কর্তৃক প্যারীচাঁদ মিত্র এবং আরও কিছু ইয়ং বেঙ্গল সদস্যের সহায়তায় প্রকাশিত হয়েছিল । এটি একটি মাসিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হতে শুরু করে কিন্তু পরে ১৮৪২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে পাক্ষিক পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়। ১৮৪৩ সালের মার্চ থেকে এটি একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় পরিণত হয়। ১৮৪৩ সালের ২০ নভেম্বর দ্বিতীয় খণ্ডের ৩৯তম সংখ্যা প্রকাশের পর এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

"The Quill" ছিল একটি ইংরেজি সংবাদপত্র যা হিন্দু কলেজের কিছু ছাত্র ১৮৪২-৪৩ সালের দিকে প্রকাশ করেছিল বলে জানা গেছে। শিবনাথ শাস্ত্রীর উল্লেখ থেকে আমরা জানতে পারি যে ডিরোজীয়ান তারাচাঁদ চক্রবর্তী ছিলেন এর সম্পাদক । ডিরোজীয়ান কাশীপ্রসাদ ঘোষ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ও সম্পাদিত "দ্য হিন্দু ইন্টেলিজেন্সার" একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিল । ১৮৪৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর, এটি ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত চলেছিল । এটি লর্ড ক্যানিংয়ের "গ্যাগিং অ্যাক্ট"-এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে এটি প্রত্যাহারের দাবি জানায় । কিন্তু শীঘ্রই সমর্থন না পেয়ে এর প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়া হয় ।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত কর্তৃক প্রণীত "জার্নালের ইতিহাস" বইটিতে আমরা "জ্ঞান সিন্ধু তরঙ্গ " নামের একটি মাসিক পত্রিকার উল্লেখ পাই, যা ১৮৩২ সালে ডিরোজীয়ান রসিককৃষ্ণ মল্লিক কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছিল। তবে এটি ছিল খুবই স্বল্পস্থায়ী একটি পত্রিকা।

রাধানাথ সিকদার ছিলেন ডিরোজিওর অন্যতম মেধাবী ছাত্র । প্রথম থেকেই গণিতের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল এবং পরবর্তীকালে তিনি উচ্চতর গণিতে আশ্চর্যজনক দক্ষতা অর্জন করেন । অন্যান্য ডিরোজীয়ানদের মতো তিনিও দেশবাসীর উন্নয়নমূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন । হিন্দু নারীদের জ্ঞানার্জনের জন্য, তিনি ১৮৫৪ সাল থেকে "মাসিকপত্রিকা" প্রকাশ শুরু করেছিলেন । এর বিস্তৃত বৈচিত্র্যময় এবং সমৃদ্ধ প্রবন্ধগুলি সহজ স্থানীয় ভাষায় লেখা হয়েছিল যাতে সকলেই তা বুঝতে পারে । তিনি বেথুন সোসাইটিতে অনুষ্ঠিত নারী শিক্ষার উপর আলোচনায়ও অংশগ্রহণ করেছিলে ন। তিনি কিশোরী চাঁদ মিত্র এবং প্যারী চাঁদ মিত্রের সাথে সমগ্র বাংলায় বাল্যবিবাহ, এবং বহুবিবাহের বিরুদ্ধে জোরালো প্রচারণা চালিয়েছিলেন।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা স্পষ্টভাবে দেখতে পাই , ইয়ং বেঙ্গল সদস্যরা তাদের সকল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এবং সংবাদপত্র, সাময়িকী এবং জার্নাল প্রকাশের মাধ্যমে মাতৃভূমির মানুষের কল্যাণের জন্য সম্পূর্ণরূপে নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন । ইয়ং বেঙ্গল গ্রুপ এর ডিরোজীয়ানরা পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও সাহিত্যের জ্ঞান প্রয়োগ করে তৎকালীন হিন্দু সমাজের সংস্কার করতে চেয়েছিলেন । তাঁরা উদারনৈতিক ধারণা, মানবতাবাদ অনুশীলনে দৃঢ় প্রত্যয়ী ছিলেন। কিন্তু তৎকালীন গোঁড়া হিন্দু সমাজ তাদের গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিল না এবং হিন্দু সমাজের প্রচলিত রীতিনীতির বিরোধিতা করার কারণে ইয়ং বেঙ্গল সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল । প্রতিবাদের চিহ্ন হিসেবে তারা প্রকাশ্যে নিষিদ্ধ খাবার ও পানীয় খেত । "সমাচারচন্দ্রিকা" এবং "সংবাদপ্রভাকর" এর মতো রক্ষণশীল পত্রিকাগুলো তাঁদের কার্যকলাপ নিয়ে হৈচৈ করেছিল । তাদের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল যে তারা হিন্দু-বিরোধী , উশৃঙ্খল ও বেপরোয়া । কিন্তু ইয়ং বেঙ্গলদের নিয়ে এগুলো অতিরঞ্জিত তথ্য বলে প্রতীয়মান হয় । ইংরেজি শিক্ষায় তাদের অগ্রগতি হওয়া সত্ত্বেও, তাঁরা স্থানীয় ভাষা শিক্ষা বিস্তারে গভীর আগ্রহী ছিল এবং ব্যাপক হারে বাংলায় বই এবং জার্নাল প্রকাশ করেছিলেন । তারাচাঁদ চক্রবর্তী প্রাচীন হিন্দু গ্রন্থ অনুবাদ করেছিলেন , কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৩৭ সাল থেকে খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারক থাকার পরেও একজন মহান সংস্কৃত পণ্ডিত ছিলেন এবং হিন্দু দর্শনের সাথে সংস্কৃত সাহিত্য অধ্যয়ন করেছিলেন, রামগোপাল ঘোষ "তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা"-এর বাংলা লেখাগুলিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন , সাধারণ গৃহিণীদের সহজে বোধগম্য করার জন্য, প্যারীচাঁদ মিত্র এবং রাধানাথ শিকদার "মাসিকপত্রিকা" প্রকাশ শুরু করেছিলেন, যা একটি সহজ কথ্য বাংলা পত্রিকা । প্রকৃতপক্ষে, সাধারণভাবে ইয়ং বেঙ্গলদের তাঁদের মাতৃভাষার প্রতি তীব্র ভালোবাসা ছিল এবং এর বিকাশে আগ্রহী ছিলেন । ইয়ং বেঙ্গলকে হিন্দু-বিরোধী হিসেবে অভিযুক্ত করাও সঠিক নয়, কারণ এটা সত্য যে তাদের প্রাথমিক প্রতিবাদ মূলত হিন্দুদের অযৌক্তিক এবং অন্ধ ধর্মীয় রীতিনীতির বিরুদ্ধে ছিল । তাঁদের মধ্যে মাত্র কয়েকজন খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন । স্কটিশ মিশনারি আলেকজান্ডার ডাফ ইয়ং বেঙ্গল ছাত্রদের খ্রিস্টধর্মে রূপান্তরিত করার ব্যাপারে অনেক আগ্রহী ছিলেন কিন্তু তাঁদের মধ্যে প্রতিটি ধর্মের প্রতি সন্দেহের প্রবণতা দেখে হতাশ হয়েছিলেন ।


ডিরোজিও এবং তাঁর অনুসারীরা তৎকালীন বঙ্গ সমাজকে কুপমন্ডুকতা, অজ্ঞতা, নিরক্ষরতা, বেকারত্বের অন্ধকার থেকে মুক্ত করার জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছিলেন । তাদেরকে হিন্দু গোঁড়া সম্প্রদায়ের সমাজপতিদের হাতে নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল । কিন্তু তারা সমাজের অগ্রগতির পথে সমস্ত বাধার বিরুদ্ধে নিজেদের পরিচালিত করেছেন । সাংবাদিকতা এবং সাহিত্য সহ প্রতিটি সম্ভাব্য ক্ষেত্রে দক্ষতার সাথে অবদান রেখেছেন । ডিরোজিওর সময়কালে বাংলার তরুণেরা মুক্ত বিহঙ্গের মতো ডানা মেলেছিল। জ্ঞানের কাছে অজ্ঞানতার , যুক্তিবুদ্ধির কাছে অদৃশ্য কাল্পনিক শক্তির , আলোর কাছে অন্ধকারের পরাজয় যে আগামীকাল অনিবার্য এ সত্যও তাঁদের কাছে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল । তারুন্যের মনের আকাশে যে দীপ ডিরোজিও জ্বালিয়েছেন , তা আর নিস্প্রভ হবে না , মুক্তচিন্তার নির্মল হাওয়ায় তার শিখা ক্রমেই উজ্জলতর হবে ।


REFERENCES
[1]. Duff, Alexander, “India, and India Missions, Including Sketches of the Gigantic System of Hinduism, Both in Theory and Practice; Also Notices of Some of the Principal Agencies Employed in Conducting the Process of Indian Evangelization”, Edinburgh, J. Johnstone, 1939
[2]. Edwards, Thomas, “Henry Derozio, The Eurasian Poet, Teacher And Journalist”, Calcutta: W. N. & Co., 1884
[3]. Haldar, M. K., “Renaissance and Reaction: From Rammohun to Bankimchandra”, Calcutta: Minerva Associates, 2011
[4]. Mitra, Pearychand, “A Biographical Sketch of David Hare”, Stanhope Press, 1877
[5]. Mitra, Pearychand, “A Biographical Sketch of David Hare”, Stanhope Press, 1877
[6]. Moitra, S. C., “Selections from Jnananneshan”, Calcutta: Prajna, 1979
[7]. Mukhopadhyay, S.S., “Derozio Remembered: Birth Bicentenary Celebration Commemoration”, Kolkata: Punascha Publication, 2008
[8]. Sarkar, Susobhan, “On the Bengal Renaissance”, Kolkata: Papyrus, July, 1979
[9]. Sengupta, Nitish, “History of the Bengali-speaking people”, Kolkata: Ubs Publishers Distributors Ltd, 2001
[10]. “The Calcutta Christian Observer”, Calcutta: Baptist Mission Press, 1832.

মন্তব্য ০ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.