| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
অষ্টাদশ শতাব্দীর বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে জড়িয়ে আছে এক বিশ্বখ্যাত মহাকবির নাম , য়োয়ান উলফগ্যাঙ ফন গ্যোয়েটে। ফাউস্ট- এর রচয়িতা গ্যোয়েটে। জীবদ্দশায় তাঁর বিজ্ঞানচর্চার স্বীকৃতি তিনি বড় একটা পাননি । বরং সাহিত্যকীর্তির ঔজ্জ্বল্যে ঢাকা পরে গেছে কবির বিজ্ঞানীসত্ত্বা । জীববিজ্ঞান , ভূবিদ্যা , পদার্থবিদ্যা ও বিশেষভাবে অস্থিবিদ্যায় (osteology) তাঁর গবেষণা আজ আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীমহলে স্বীকৃত। গ্যোয়েটের দর্শন ছিল প্রকৃতি নির্ভর । তিনি প্রকৃতি বিজ্ঞানের গবেষণায় সরাসরি পর্যবেক্ষণের পক্ষে ছিলেন । কল্পনা দিয়ে , অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে ও সর্বপরি আত্মিক সত্ত্বা দিয়ে প্রকৃতিকে না দেখতে পারলে , গণিত বা যন্ত্রপাতি কোন কাজেই আসে না -এই ছিল তাঁর মত । যন্ত্রপাতি বা গণিতকে বিন্দুমাত্র ব্যাবহার না করে উদ্ভিদবিদ্যা ও প্রাণীবিদ্যায় যে মৌলিক অবদান তিনি রেখেছেন তার সমতুল্য উদাহরণ ইতিহাসে বিশেষ মেলে না ।
গ্যোয়েটের বিজ্ঞানী জীবনে সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছিল জীবদেহের গঠনতন্ত্র সংক্রান্ত গবেষণায় । বিশেষ করে তুলনামূলক শরীর সংস্থান ( Comparative Anatomy ) বিষয়ে । মানুষের মুখমণ্ডল ও করোটির গঠন নিয়ে গবেষণা তাঁকে ভাবাতো । অস্থির গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা করে মেরুদণ্ডী প্রাণীদের আচরণগত বৈশিষ্ট্য বোঝা সম্ভব এটা উনি উপলব্ধি করেছিলেন । নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ফলে তাঁর মনে এই বিশ্বাস তৈরি হয়েছিল যে মানুষ ও অন্যান্য মেরুদণ্ডী ও স্তন্যপায়ী প্রাণীদের কঙ্কালের গঠনতন্ত্রে কোথাও একটা মিল আছে । আর তাই , অন্যান্য মেরুদণ্ডী প্রাণীদের করোটির অস্থিতন্ত্রে intermaxillary bone থাকলেও মানুষের মুখমণ্ডলের হাড়ে তা নেই – তাঁর সময়ের এই তত্ত্বকে গ্যোয়েটে মেনে নিতে পারেন নি । তাই ১৭ ৮৬ সালে এই বিষয়ে বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন । তিনি দেখালেন মানুষের চোয়ালেও এই intermaxillary bone আছে । উপরের চোয়ালের দুটি মুল অংশের মদ্যে সংযোগ রক্ষাকারী হাড়টির নাম intermaxillary bone এবং এর সাথে যুক্ত থাকে মুখের সামনের ধারালো দাঁতগুলো । দাঁতের গঠনের পরিবর্তনের সাথে এই intermaxillary bone – এরও আকার বদলে যায় । কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে এই হাড় থাকে না এই কথা সত্য নয় । এই সব যুক্তি দেখিয়ে গ্যোয়েটে মানুষের করোটির হাড় বিষয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ সত্য আবিষ্কার করলেন । এটাই উনার জীবনের সর্বপ্রথম বৈজ্ঞানিক আবিস্কার। আজও মানুষের দেহে ভ্রূণ অবস্থায় (foetus) তাঁর আবিষ্কৃত intermaxillary bone এর অস্তিত্ব লক্ষ করা যায় , বড়ো হওয়ার সাথে সাথে যেটি রূপান্তরিত হয়ে অন্য হাড়ের সাথে মিশে যায় । প্রথম দিকে স্বীকৃতি না পেলেও গ্যোয়েটের এই আবিষ্কার আজ Anatomist-দের কাছে স্বীকৃতি লাভ করেছে। অস্থিসংস্থান সংক্রান্ত অনুসন্ধান থেকে অঙ্গসংস্থান (Morphology) বিষয়ে তিনি আরেকটি তত্ত্বের সূচনা করেন । মেরুদণ্ডী প্রাণীর কঙ্কালের গঠনসংক্রান্ত নিজের চিন্তাগুলোকে গ্যোয়েটে ১৭৯০ সালে “Essay on the shapes of Animals” নামে এক টুকরো প্রবন্ধের আকারে প্রকাশ করেন । এই প্রবন্ধের মূল বক্তব্য ছিল যে , সমস্ত মেরুদণ্ডী প্রাণীর কঙ্কালকেই একটি সরল ন্যূনতম কাঠামোর আকারে ভাবা সম্ভব , যে কাঠামোটি সমস্ত মেরুদণ্ডী প্রাণীর ক্ষেত্রে একিই রকম । মানুষের কঙ্কালের সাথে কুকুর , ভেড়া বা ছাগলের কঙ্কালের কঙ্কালের অনেক তফাৎ সত্ত্বেও কোথাও একটা মিল খুজে পাওয়া যায় এদের মধ্যে । সব কটি প্রজাতি (species) ও গণের ( genus) প্রাণীদের ক্ষেত্রেই দেখা যাবে এমন কোন একটি সাধারন আকার (form) – তাঁর এ বিশ্বাস ছিল দৃঢ়মূল । তিনি প্রমান করতে চেয়েছিলেন যে জীবনের প্রয়োজনেই প্রাণীদেহের আকার ( Shape) ও কাঠামো (form) তে পরিবর্তন আসে। পরিবেশের সাথে সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ( adaptation) প্রাকৃতিক নিয়ম প্রাণীদেহের মৌলিক কাঠামোকে বজায় রেখেই প্রয়োজনীয় রুপান্তর ঘটায় ও সেই কারনেই বিভিন্ন কাথামোর রূপান্তরের একটা সীমানাও আছে – যেমন তেমন ভাবে যে কোনও আকার প্রাণীদেহ গ্রহণ করতে পারে না – অঙ্গসংস্থানগত এই সব পরিবর্তনগুলো সর্বদাই একটি ভারসাম্যের নিয়ম ( Law of compensation and balance of growth) মেনে চলে । শারীরিক কাঠামোয় একদিকে বৃদ্ধি ঘটলে অন্যদিকে কিছু একটা হ্রাস পাবে এবং balance of growth বজায় থাকবে । গ্যোয়েটেই সর্বপ্রথম প্রাণীকূলের মধ্যে আকার ও ক্রিয়াকলাপের (function) ভিত্তিতে আলাদা অথচ জৈব প্রক্রিয়ার দিক থেকে সহধর্মী (homologous) অঙ্গগুলোকে গুরুত্ব দিয়েছেন – যেমন মানুষের ফুসফুস , মাছের বায়ুথলি ( air bladder) , মানুষের বাহু ও পাখির ডানা ইত্যাদি । Comparative Anatomy- র সমসংস্থানগত অঙ্গের ( homologous organs ) ধারনাকে তিনিই সর্বপ্রথম আদর্শগত (idealistic) ধারনা থেকে মুক্ত করে প্রয়োগগত (practical) ডারউইনীয় ধারনায় রূপান্তরিত করেন । ১৮২০ সালে প্রকাশিত “ General Introduction to Comparative Anatomy “ প্রবন্ধে তিনি তাঁর এ সংক্রান্ত ধ্যানধারণা প্রকাশ করেন ।
উদ্ভিদের রূপান্তর (Metamorphosis of Plants) নিয়ে রয়েছে কবির বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ । তাঁর সময়কার উদ্ভিদবিজ্ঞানী Carolas Linnaeus এর লেখা “Philosophia Botanic এবং Systema Plantarum খুব মন দিয়ে অধ্যয়ন করেছিলেন গ্যোয়েটে । উদ্ভিদ জগতের মধ্যে Linnaeus এক ধরনের শৃঙ্খলা (order) দেখতে পেতেন । এই শৃঙ্খলার ভিত্তিতে তিনি উদ্ভিদ জগতকে কয়েকটি শ্রেণী (Class) ও উপশ্রেণীতে (sub class) এ বিভক্ত করেছিলেন । কিন্তু এই সব শ্রেণী ও উপশ্রেণীগুলির মধ্যে যে আন্তঃ সম্পর্ক থাকতে পারে তা তিনি ভাবেন নি । উদ্ভিদজগতের অন্যান্য সব ধর্মাবলীর দিকে তাকালেই ধরা পড়ে যে বিভিন্ন শ্রেণীর উদ্ভিদের মধ্যে কেবল আন্তঃ সম্পর্কই নয় , একটি বিকাশের ( development) এর প্রক্রিয়াও বর্তমান । এ নিয়ে প্রকাশিত হয় তাঁর গবেষণা প্রবন্ধ “ the ordering of plants by families in an ascending , gradually developing advance “। তাঁর কল্পনায় তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন সেই প্রাথমিক কাঠামো সম্পন্ন সরলতম উদ্ভিদ ( “Urpflangze”) , যা থেকে প্রকৃতি হাজারো জটিল উদ্ভিদকে গড়ে তুলেছে । এই বিষয়ে পর্যবেক্ষণ শুরু করেন ও তা থেকেই উদ্ভিদ জগতের বিকাশ সংক্রান্ত তাঁর ধারণাগুলো আরো সুসংবদ্ধ হয়ে ওঠে । ১৭৯০ সালে তাঁর দীর্ঘ প্রবন্ধ “ Attempt to Explain the Metamorphosis of plants” প্রকাশিত হয় । পেশাদার বিজ্ঞানীদের কাছে তাঁর এই প্রবন্ধটি সব চাইতে বেশী সমাদৃত হয়েছিল্। উদ্ভিদবিদ্যা সম্পর্কে তাঁর সমস্ট কাজ “ History of my study in Botany” প্রবন্ধে তিনি লিখে রেখে গেছেন । ব্রিটিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী Agens Arber গ্যোয়েটের এইসব লেখালেখি নিয়ে ১৯৪৬ সালে ইংরেজিতে প্রকাশ করেন “Goethe’s Botany”। প্রাণীজগৎ ও উদ্ভিদজগতের বিভিন্ন গঠনগত বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা করে গ্যোয়েটে যে বিকাশ বা রূপান্তরের (development of metamorphosis) তত্ত্ব উপস্থিত করেছেন , এজন্য তাকে ডারউইনের অভিব্যক্তিবাদের পূর্বসূরী হিসেবে গন্য করা হয় ।
গ্যোয়েটে নিজে তার জীবনের সব চাইতে সেরা গবেষণা বলে যে বিষয়টিকে ভাবতেন তা ছিল আলো সংক্রান্ত । “ Theory of Colours “ নামের এই গ্রন্থে তিনি এ বিষয়ে তাঁর সব কাজ লিপিবদ্ধ করে গেছেন । আলোকবিজ্ঞানে তাঁর ধারনা নিউটনীয় ধারনার বিরোধী ছিল। তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে নিউটনীয় মতবাদ অনুযায়ী যদি সাদা আলো প্রিজমের মধ্য দিয়ে যাবার পর সাতটি রঙে ভেঙ্গেই যাবে তা হলে প্রিজমের মধ্য দিয়ে সাদা দেওয়ালের দিকে তাকালে সাদাই দেখায় কেন ? তাঁর মনে হল যে এই ঘটনার ব্যাখ্যা নিউটনের তত্ত্বে পাওয়া যাবে না । যদিও নিউটনের তত্ত্বেই এর ব্যাখ্যা ছিল /। সাদা দেওয়াল সাদা আলোর কোন জোরালো উৎস নয় , বরং জানালা দিয়ে আসা সূর্যের আলো বেশি জোরালো। তাই প্রিজমের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় আলোর ভেঙ্গে যাওয়া মানুষের চোখে তখনই রঙের অনুভূতি তৈরি করে যখন তা যথেষ্ট তীব্র হয় । সাদা আলো সাতটি রঙের সমষ্টি এবং কাঁচের প্রিজমের মধ্যে দিয়ে সাদা আলো পাঠালে তা ঐ সাতটি রঙে ভেঙ্গে যায় – নিউটনের এই ধারনাকে নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন যে ভিন্ন ধর্মী আলোর সাথে রঙের কোন সম্পর্ক নেই , আলো অন্ধকারের সমন্বয়ে অর্থাৎ সাদা , কালোর সমন্বয়ে রঙের উদ্ভব ঘটে । আলোর , অর্থাৎ সাদার তীব্রতা গড়ে তোলে হলুদ রঙ এবং অন্ধকার বা কালোর তীব্রতা গড়ে তোলে নীল । এবার এই হলুদ আর নীল মিশে হয় সবুজ । লাল- এর অবস্থান নীল ও হলুদের মাঝামাঝি , অর্থাৎ নীল বা হলুদের একটি পরিবর্তিত রূপের নাম লাল । তিনি সারা জীবনের সাহিত্য কর্মের জন্য যে সময় ব্যয় করেছিলেন তার চাইতেও অনেক বেশী সময় তিনি দিয়েছিলেন এই theory of colours এর ব্যপারে অধ্যয়ন ও পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্যে । কিন্তু তা সত্ত্বেও পরবর্তীকালে Fresnel , Maxwell ও Lorentz এর গবেষণা নিউটনের তত্ত্বকেই সঠিক বলে প্রমাণ করেছে ।
গ্যোয়েটের জীবৎকালে তাঁর প্রতিভা , গবেষণা পদ্ধতি ও তাঁর বৈজ্ঞানিক প্রকাশনাগুলো উষ্ণ সংবর্ধনা পায় নি । কিন্তু তিনি তাঁর বিজ্ঞান্সাধনা পরিত্যাগ করেন নি এবং ১৮৩২ সালে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিজ্ঞান সাধনা অব্যাহত রেখেছেন ।
রেফারেন্সঃ ডগলাস মিলার প্রণীত Goethe : Scientific Studies
©somewhere in net ltd.
১|
০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৬:০৮
ডঃ এম এ আলী বলেছেন:
মুল্যবান তথ্য সমৃদ্ধ পোস্টটির জন্য ধন্যবাদ ।
ঠিকই বলেছেন বিজ্ঞান সাধক গ্যোটে কেবল একজন প্রখ্যাত জার্মান কবি ও সাহিত্যিকই ছিলেন না, বরং
প্রকৃতি ও বিজ্ঞানেরএকনিষ্ঠ সাধকও ছিলেন। তিনি উদ্ভিদবিদ্যা, শারীরস্থান (বিশেষ করে মানুষের আন্তঃজঙ্ঘাস্থি
বা intermaxillary bone আবিষ্কার), ভূতত্ত্ব এবং আলোকবিজ্ঞান (Color Theory) নিয়ে গভীর গবেষণা
করেন, যা তাঁর সামগ্রিক চিন্তাধারায় প্রকৃতি ও শিল্পের মিলন ঘটিয়েছিল।
গ্যোটে উদ্ভিদের রূপান্তর বা 'Metamorphosis of Plants' তত্ত্বের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে উদ্ভিদের সব
অঙ্গই পাতার পরিবর্তিত রূপ , আমিউ একটি কীজের অংকোরদগম থেকে বড় হয়ে উঠার দৃশ্য দেখে তাই ভাবি।
নিউটনের আলোকতত্ত্বের বিরোধিতা করে তিনি 'Theory of Colours' নামে যে গ্রন্থটি রচনা করেন, তা
রঙের অনুভুতি এবং মনোবৈজ্ঞানিক দিক নিয়ে আলোচনা করে ।
তিনি মানুষের করোটিতে 'ইন্টারম্যাক্সিলারি অস্থি' আবিষ্কার করেন, যা প্রজাতিগুলোর মধ্যে বিবর্তনীয় সম্পর্ক
বুঝতে সাহায্য করে ।
গ্যোটে প্রকৃতির একটি সামগ্রিক ও জৈব দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্বাস করতেন, যেখানে বিজ্ঞান ও দর্শন পরস্পরবিরোধী ছিল
না ।
এই মহান বিজ্ঞান সাধকের প্রতি রইল শ্রদ্ধাঞ্জলী ।
আপনার প্রতি রইল শুভেচ্ছা