| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
রোজার সংজ্ঞা:
------------------------
রোজা ( روزہ) ফার্সিভাষা থেকে বাংলাভাষায় প্রবেশকৃত একটি বিদেশি শব্দ। শাব্দিকঅর্থে রোজার বাংলা হচ্ছে দিন। যদিও এটা সরাসরি আরবিশব্দ সাউম ( صوم ) এর অর্থ প্রকাশ করে না,কিন্তু রোজাদ্বারা ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ সাওমই উদ্দেশ্য।আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ীصومশব্দটি
বাবে নাসারার ক্রিয়ামূল,যার অভিধানিক অর্থ 'ইমসাক' কোন কিছু থেকে বিরত থাকা। আল্লামা রাগেব ইস্পাহানী এর মতে, কাজ থেকে বিরত থাকা।
ইংরেজিতে যাকে Fastingবা Islamic Fasting অথবা Holy Fastইত্যাদি বলা হয়।
পারিভাষিক সংজ্ঞায় আল্লামা মুহাম্মদ আলী সুবনী তার রওয়িউল বয়ান গ্রন্থে বলেন, ইবাদতের নিয়তে ফজরের উদয় হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার এবং স্ত্রী সহবাস হতে বিরত থাকাকে রোজা বলা হয়।
সুবহেসাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যস্ত সময়টুকু যেহেতু দিনের অংশ,সেহেতু সাওমকে ফার্সিভাষায় রোজা বলা হয়,কেননা রোজা অর্থ দিন, আর সাওমের এইসকল বর্ণিত বিষয় থেকে বিরত থাকার সময়সীমাও সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দিনের অংশ। সুতরাং সাওম এর শাব্দিক অর্থ রোজা না হলেও সঙ্গতকারণে ফার্সিভাসায় রোজাদ্বারা সাওমই বুঝানো হয়।
সাওম শব্দের সাধারণ অর্থ হচ্ছে বিরত থাকা। তাইতো চুপ বা নিস্তব্ধ থাকাকে সিয়াম বলে। আর যে ব্যক্তি চুপ থাকে তাকে সায়েম বলে। আল্লাহ তায়ালা হযরত মরিয়ম আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘটনা তুলে ধরে বর্ণনা করেন, ফাইম্মা তারাইন্না মিনাল বাশারি আহাদান ফাকুলি ইন্নি নাজারতু লির রাহমানি সাওমান ফালান উকাল্লিমাল ইয়াওমা ইনসিয়ান।
অর্থ : (সন্তান ভূমিষ্ঠের পর) যদি মানুষের মধ্যে কাউকে তুমি দেখ (কোনো প্রশ্ন বা কৈফিয়ত করতে) তবে তুমি বলো, ‘আমি দয়াময় আল্লাহর উদ্দেশে সাওম বা রোজা (কথা বলা থেকে বিরত থাকতে) মানত করছি। সুতরাং আজ আমি কিছুতেই কোনো মানুষের সঙ্গে কথা বলবো না। (সুরা মারইয়াম : আয়াত ২৬)
কোরআন কারিমের এ আয়াতের শিক্ষনীয় ঘটনা : হযরত মরিয়ম আলাইহি ওয়া সাল্লামের গর্ভে সন্তান জন্ম লাভের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, শিশুর ব্যাপারে তোমার কিছু বলার প্রয়োজন নেই। তার জন্মের ব্যাপারে যে কেউ আপত্তি তুলবে তার জবাব দেবার দায়িত্ব এখন আমার (আল্লাহর)। উল্লেখ্য, বনি ইসরাঈলের মধ্যে মৌনতা বা কথা বলা থেকে বিরত থাকার পদ্ধতি অবলম্বনের রোজা রাখার রীতি ছিল।]
বলা বাহুল্য এখানে ‘সওম’ এর অর্থ হলো কথা বলা থেকে বিরত থাকা
কারণ প্রিয় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘কেবল পানাহার থেকে বিরত থাকার নামই সিয়াম নয়; বরং অসারতা ও অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকার নামই হলো (প্রকৃত) সিয়াম। সুতরাং যদি তোমাকে কেউ গালাগালি করে অথবা তোমার প্রতি মুর্খতা দেখায়, তাহলে তুমি (তার প্রতিকার বা প্রতিশোধ না নিয়ে) তাকে বলো যে, আমি সায়েম, আমি রোযা রেখেছি, আমি রোযা রেখেছি। (মুস্তাদরেকে হাকেম, ইবনে হিব্বান)
যখন রোজা ফরজ হয়:
--------------------------------
প্রথম কোন রোজা ফরজ ছিল এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন, ১০ মহররম অর্থাৎ আশুরায় রোজা ফরজ ছিল, আবার কারও কারও মতে, ‘আইয়ামুল বিজ’ অর্থাৎ প্রত্যেক চন্দ্র মাসে ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা ফরয ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন মদিনায় হিজরত করলেন তখন আইয়ামুল বিজের রোজা রাখতেন। হিজরতের দ্বিতীয় বর্ষে অর্থাৎ দ্বিতীয় হিজরিতে উম্মতে মুহাম্মদির জন্য রোজা ফরজ করা হয়। এ সময় এ আয়াত নাজিল হয় ‘রমজান মাস, এ মাসেই নাজিল করা হয়েছে কোরআন মানুষের জন্য হেদায়েত, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন এবং হক ও বাতিলের পার্থক্যকারী। অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস পাবে, সে যেন এ মাসে সিয়াম পালন করে। তবে কেউ রোগাক্রান্ত হলে অথবা সফরে থাকলে এ সংখ্যা অন্য সময় পূরণ করবে। আল্লাহ চান তোমাদের জন্য যা সহজ তা, আর তিনি চান না তোমাদের জন্য যা কষ্টকর তা, যেন তোমরা সংখ্যা পূর্ণ করো এবং আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করো, তোমাদের সৎপথে পরিচালিত করার জন্য এবং যেন তোমরা শোকর করতে পার।’ (সূরা বাকারা : ১৮৫)।
এ আয়াত নাজিলের পর আশুরার রোজা অথবা আইয়ামুল বিজের রোজা পালনের ফরজিয়াত মানসুখ হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর হিজরি দ্বিতীয় সনে রোজা ফরজ হওয়ার আগ পর্যন্ত দু’ধরনের রোজার প্রচলন ছিল। ক. আইয়ামুল বিজ অর্থাৎ প্রত্যেক চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখা। খ. আশুরার দিন অর্থাৎ ১০ মহররমের দিন রোজা রাখা। বিখ্যাত সাহাবি হজরত আব্বাস (রা.) এর বর্ণনা থেকে জানা যায়, আগে রোজা ছিল এক সন্ধ্যা থেকে আরেক সন্ধ্যা পর্যন্ত। রাতে ঘুমানোর পরে পানাহার ও জৈবিক চাহিদা পূরণ করা বৈধ ছিল না।
হিজরি দ্বিতীয় সনে রোজা ফরজ হওয়ার পর থেকে উম্মতে মুহাম্মদি দীর্ঘ এক মাসব্যাপী রোজা পালন করে আসছে। পবিত্র রমজানের রোজার ক্ষেত্রে পাঁচটি পালনীয় দিক রয়েছে। ১. চাঁদ দেখে রোজা রাখা, ২. সকাল হওয়ার আগে রোজার জন্য নিয়ত করা, ৩. পানাহার ও জৈবিক বিশেষ করে যৌন চাহিদা পূরণ করা থেকে বিরত থাকা, ৪. ইচ্ছাকৃত বমি করা থেকে নিবৃত্ত থাকা ও ৫. রোজার পবিত্রতা রক্ষাকরা
রোজার ইতিহাস:
-----------------------
পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পার। [২:১৮৩]
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা আলুসি (রহ.) তার তাফসির গ্রন্থ রুহুল মাআনিতে বলেন, ‘এখানে পূর্ববর্তীদের বলতে হজরত আদম
জরত ঈসা (আ.) পর্যন্ত সব যুগের মানুষকে বোঝানো হয়েছে।’
হজরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দি ওই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘রোজার হুকুম যুগ যুগ থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে।’ (ফাওয়ায়িদে ওসমানি)।
তাফসিরের বর্ণনায় রয়েছে, আদম (আ.)-এর সৃষ্টির পর তাঁকে 'নিষিদ্ধ ফল' আহার বর্জনের যে আদেশ দিয়েছেন- এটাই মানব ইতিহাসের প্রথম সিয়াম সাধনা। ইতিহাসে আরো পাওয়া যায়, আদম (আ.) সেই রোজা ভাঙার কাফ্ফারাস্বরূপ ৪০ বছর রোজা রেখেছিলেন।
আর ওই নিষিদ্ধ ফলের প্রভাব আদম (আ.)-এর পেটে ৩০ দিন বিদ্যমান ছিল বলে আদম (আ.)-এর শ্রেষ্ঠ সন্তান মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতকে আল্লাহ তাআলা এক মাস রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। ইতিহাসে এ-ও পাওয়া যায়, ওই ফলের প্রভাবে হজরত ইব্রাহিম (আ.) থেকে শুরু করে হজরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সব যুগে ৩০টি রোজা ফরজ ছিল।
হজরত মুসা (আ.)ও ৩০ দিন রোজা রেখেছিলেন। তুর পাহাড়ে যাওয়ার পর আল্লাহ তাআলা তাঁকে আরো অতিরিক্ত ১০টি রোজা রাখার আদেশ দেন। ফলে তাঁর রোজা হয়েছিল মোট ৪০ দিন। হজরত ঈসা (আ.)ও মুসা (আ.)-এর মতো ৪০ দিন রোজা রাখতেন। হজরত ইদ্রিস (আ.) গোটা জীবন রোজা রেখেছিলেন। হজরত দাউদ (আ.) এক দিন পর পর অর্থাৎ বছরে ছয় মাস রোজা রাখতেন।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে তিনদিন করে রোজা রাখার বিধান প্রচলিত ছিল। হজরত ইবনে মাসউদ, হজরত ইবনে আব্বাস, হজরত মুআজ, হজরত কাতাদা, হজরত আতা ও হজরত যাহহক (রহ.) এর বর্ণনা থেকে জানা যায়, তিনদিন করে রোজা রাখার নিয়ম হজরত নুহ (আ.) থেকে শুরু হয় এবং হজরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত প্রচলিত থাকে।
তবে এ বিষয়ে অনেকে দ্বিমত পোষণ করেন। ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, ইহুদিরা ৪০ দিন রোজা রাখত। খ্রিস্টানরা রোজা রাখত ৫০ দিন। সর্বশেষ নবী ও রাসূল হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর উম্মতদের জন্য ৩০ দিন রোজা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। (সূত্র: বায়হাকি শরিফ ও ফাতহুল বারি)।
মানুষের জন্য রমজান মাসের সিয়াম বা রোজাই প্রথম রোজা নয়। কারণ, সিয়াম বা রোজা হলো এমন এক ইবাদত, যা মানুষ সৃষ্টির পর থেকেই আল্লাহ তায়ালা বান্দার জন্য ফরজ করেছেন। ইয়াহুদি ও খ্রিস্টানরা নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট জিনিস থেকে বিরত থেকে রোজা পালন করতেন। তাওরাত ও ইঞ্জিলের বর্তমান সংস্কারগুলো থেকেও জানা যায় যে, আল্লাহ তায়ালা রোজাকে পূর্ববর্তী বান্দাদের ওপর ফরজ করেছিলেন।
হযরত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় আগম করলেন, তখন দেখলেন, মদিনার ইয়াহুদিরা আশুরার দিনে রোজা পালন করছে। তখন তিনি তাদের জিজ্ঞাস কররেন, ‘এটা কি এমন দিন যে, তোমরা রোজা রাখছ?’ ইয়াহুদিরা বললো, ‘এ এক মহান দিন। এ দিনে আল্লাহ তাআলা মুসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার কাওমকে পরিত্রাণ দিয়েছিলেন এবং ফিরাউন ও তার কাওমকে পানিতে ডুবিয়ে ধ্বংস করেছিলেন। তাই মুসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যেই এই দিনে রোজা পালন করেছিলেন। আর তাইতো আমরাও এ দিনে রোজা পালন করি।
এ কথা শুনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘মুসার স্মৃতি পালন করার ব্যাপারে তোমাদের চাইতে আমরা অধিক হকদার।’ সুতরাং তিনি ওই দিনে রোজা রাখলেন এবং সবাইকে রোজা রাখতে নির্দেশ দিলেন।
অপর আয়াতে আল্লাহ বলেন
أَيَّامًا مَّعْدُودَاتٍ ۚ فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضًا أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ ۚ وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينٍ ۖ فَمَن تَطَوَّعَ خَيْرًا فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ ۚ وَأَن تَصُومُوا خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ
গণনার কয়েকটি দিনের জন্য অতঃপর তোমাদের মধ্যে যে, অসুখ থাকবে অথবা সফরে থাকবে, তার পক্ষে অন্য সময়ে সে রোজা পূরণ করে নিতে হবে। আর এটি যাদের জন্য অত্যন্ত কষ্ট দায়ক হয়, তারা এর পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাদ্যদান করবে। যে ব্যক্তি খুশীর সাথে সৎকর্ম করে, তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি রোজা রাখ, তবে তোমাদের জন্যে বিশেষ কল্যাণকর, যদি তোমরা তা বুঝতে পার। [২:১৮৪]
বিশ্লেষণ:
আলোচ্য আয়াতদ্বয়ে এই উম্মতের ঈমানদারগণকে উদ্দেশ্য করে আল্লহতায়ালা রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করেন। রোজা হলো একমাত্র আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির জন্য পানাহার ও যৌনাচার হতে বিরত থাকা। এর দ্বারা আত্নার পরিশুদ্ধি ও স্বভাবের পরিমার্জনা অর্জিত হয়।আল্লাহতায়ালা এই নির্দেশের সাথে সাথে আরো বলেন-তোমাদের পুর্ববতী উম্মতগণের ওপর ও রোজা ফরজ করা হয়েছিলো।তারা তা পালন করতে যত্নবান ছিলো।
হাদীস থেকে ব্যাখ্যা:
”গণনার কয়েকটি দিনের জন্য অতঃপর তোমাদের মধ্যে যে, অসুখ থাকবে অথবা সফরে থাকবে, তার পক্ষে অন্য সময়ে সে রোজা পূরণ করে নিতে হবে। আর এটি যাদের জন্য অত্যন্ত কষ্ট দায়ক হয়, তারা এর পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাদ্যদান করবে।”এ নির্দেশ আসার পর সাহাবীগনের কেউ কেউ সাওম পালনে সক্ষম হওয়ার পরও তাদের কেউ কেউ সাওম ত্যাগ করে একদিনের পরিবর্তে মিসকিনকে খাওয়াতো।এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ”আর সাওম পালন করাই তোমাদের জন্য উত্তম” এ আয়াতটি নাযিল হয় যা পূর্বের হুকুমকে রহিত করে এবং সবাইকে সাওম পালনেরই নির্দেশ দেয়া হয়। [রেফারেন্সঃ বুখারী, হাদিস নং: ১২৮১]
বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রোজা:
-----------------------------------
হিন্দু” বা “বৌদ্ধরা” না খেয়ে থাকলে তাকে বলা হয় “উপবাস”।মুসলিমরা রোজা রাখলে তাকে বলা হয় “সিয়াম”।খ্রিস্টানরা না খেয়ে থাকলে তাকে বলা হয় “ফাস্টিং”।বিপ্লবীরা না খেয়ে থাকলে তাকে বলা হয় “অনশন”।আর ,মেডিক্যাল সাইন্সে উপবাস করলে তাকে বলা হয়,”অটোফেজি“।
রোজা কি? রোজা শব্দের অর্থ বিরত থাকা! সুবেহ সাদিক থেকে সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত কে পানাহার থেকে বিরত থাকাকে আমরা সাধারনভাবে রোজা বলে থাকি।
বেলজিয়ান কোষ বিশেষজ্ঞ ক্রিসচিয়ান‘ডে দুভে আবিষ্কার করেন লাইসোজোমের। তার আবিষ্কার থেকেই ১৯৫৫ সালে লাইসোজোম শব্দের উৎপত্তি।‘ডে দুভের আবিষ্কারের হাত ধরে ১৯৬৩ সালে “অটোফেজি” শব্দের উৎপত্তি হয়। অটোফেজি হল সে কৌশল যার মাধ্যমে জীব কোষ আভ্যন্তরীণ পরিবেশের আবর্জনা পরিষ্কার করে।
জাপানী বিজ্ঞানী Yoshinori Ohsumi ২০১৬ সালে নোবেল পান অটোফেজির উপরে কাজ করে।
এবার নিশ্চই প্রশ্ন আসে অটোফেজি জিনিষটা কি?
আমাদের শরীরের সুস্থ কোষগুলো যখন অসুস্থ কোষগুলোকে খেয়ে দেহকে সুস্থ রাখে একেই অটোফেজি বলে।
এবার নিশ্চই প্রশ্ন আসবে কিভাবে মানুষের অটোফেজি হয়?
অটোফেজি এর কারণ হচ্ছে মানুষের দেহকে অতিরিক্ত চাপে রাখা! আর মানুষের দেহকে অতিরিক্ত চাপে রাখতে সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল “অটোফেজি” বা “রোজা” বা “উপবাস”।
এছাড়া এক্সারসাইজের মাধ্যমেও কিছুটা অটোফেজি হয়।
এখন দেখা যাক অটোফেজি কেনো দরকার?
আমাদের শরীরের নষ্ট হয়ে যাওয়া বা অসুস্থ কোষগুলোকে পরিষ্কার করাটা জরুরি। অটোফেজি ছাড়া শরীরের নষ্ট হয়ে যাওয়া কোষ পরিষ্কারের আর কোন পদ্ধতি নেই। অটোফেজি ক্যানসার হওয়া থেকে বিরত রাখে, হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিসের বিরুদ্ধে কাজ করে, পারকিনসন ডিজিজ প্রতিরোধ করে এছাড়াও নানা উপকারে আসতে পারে!
ওসুমির গবেষণার ফলশ্রুতিতে অটোফেজি নিয়ে গবেষণার দ্বার উন্মোচিত হয়। পরবর্তী গবেষকগণ অটোফেজি প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাতের সাথে পারকিন্স, আ্যলজাইমারস, ক্যান্সারের মত রোগের সূত্রপাত জড়িত তা প্রমাণ করেন। ওসুমির মূল্যবান গবেষণা ছাড়া এই দুরারোগ্য ব্যাধিগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আমাদের এখনও হয়ত অজানা থেকে যেত। তিনি অটোফেজি গবেষণা ক্ষেত্রের জনক হিসেবেই বর্তমানে বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছেন। বিজ্ঞানে অটোফিজের এই ধারণাটা প্রকৃতপক্ষে রোজাকেই সমর্থন করে।
তাছাড়া প্রখ্যাত জার্মান চিকিৎসাবিদ ড. হেলমুট লুটজানার-এর The Secret of Successful Fasting অর্থাৎ উপবাসের গোপন রহস্য। এই বইটিতে মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গের গঠন ও কার্যপ্রণালী বিশ্লেষণ করে নিরোগ, দীর্ঘজীবী ও কর্মক্ষম স্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হলে বছরের কতিপয় দিন উপবাসের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। ড. লুটজানারের মতে, খাবারের উপাদান থেকে সারাবছর ধরে মানুষের শরীরে জমে থাকা কতিপয় বিষাক্ত পদার্থ (টকসিন), চর্বি ও আবর্জনা থেকে মুক্তি পাবার একমাত্র সহজ ও স্বাভাবিক উপায় হচ্ছে উপবাস। উপবাসের ফলে শরীরের অভ্যন্তরে দহনের সৃষ্টি হয় এবং এর ফলে শরীরের ভিতর জমে থাকা বিষাক্ত পদার্থসমূহ দগ্ধীভূত হয়ে যায়। উল্লেখ্য যে, ‘রমযান' শব্দটি আরবির ‘রমজ' ধাতু থেকে উৎপত্তি। এর অর্থ দহন করা, জ্বালিয়ে দেয়া ও পুড়িয়ে ফেলা। এভাবে ধ্বংস না হলে, ঐসব বিষাক্ত পদার্থ শরীরের রক্তচাপ, একজিমা, অন্ত্র ও পেটের পীড়া ইত্যাদি বিভিন্ন রোগব্যাধির জন্ম দেয়। এছাড়াও উপবাস কিড্নী ও লিভারের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং শরীরে নতুন জীবনীশক্তি ও মনে সজীবতার অনুভূতি এনে দেয়।
রোজা পালনের ফলে মানুষের শরীরে কোন ক্ষতি হয় না বরং অনেক কল্যাণ সাধিত হয়, তার বিবরণ কায়রো থেকে প্রকাশিত 'Science Calls for Fasting' গ্রন্থে পাওয়া যায়। পাশ্চাত্যের প্রখ্যাত চিকিৎসাবিদগণ একবাক্যে স্বীকার করেছেন, "The power and endurance of the body under fasting conditions are remarkable : After a fast properly taken the body is literally born afresh."
অর্থাৎ রোজা রাখা অবস্থায় শরীরের ক্ষমতা ও সহ্যশক্তি উল্লেখযোগ্য : সঠিকভাবে রোজা পালনের পর শরীর প্রকৃতপক্ষে নতুন সজীবতা লাভ করে।
রোজা একই সাথে দেহে রোগ প্রতিষেধক ও প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। রোজাব্রত পালনের ফলে দেহে রোগ জীবাণুবর্ধক জীর্ণ অন্ত্রগুলো ধ্বংস হয়, ইউরিক এসিড বাধাপ্রাপ্ত হয়। দেহে ইউরিক এসিডের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে বিভিন্ন প্রকার নার্ভ সংক্রান্ত রোগ বেড়ে যায়। রোজাদারের শরীরের পানির পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার ফলে চর্মরোগ বৃদ্ধি পায় না।
আধুনিক যুগের চিকিৎসা বিজ্ঞানে রোজার ব্যবহারিক তাৎপর্য উপলব্ধি করেই জার্মান, সুইজারল্যান্ড প্রভৃতি দেশে ব্যবস্থাপত্রে প্রতিবিধান হিসেবে এর উল্লেখ করা হচ্ছে।
ডা. জুয়েলস এমডি বলেছেন, ‘‘যখনই একবেলা খাওয়া বন্ধ থাকে, তখনই দেহ সেই মুহূর্তটিকে রোগমুক্তির সাধনায় নিয়োজিত করে।’’
ডক্টর ডিউই বলেছেন, ‘‘রোগজীর্ণ এবং রোগক্লিষ্ট মানুষটির পাকস্থলী হতে খাদ্যদ্রব্য সরিয়ে ফেল, দেখবে রুগ্ন মানুষটি উপবাস থাকছে না, সত্যিকাররূপে উপবাস থাকছে রোগটি।’’
তাই একাদশ শতাব্দীর বিখ্যাত মুসলিম চিকিৎসাবিজ্ঞানী ইবনে সিনা তার রোগীদের তিন সপ্তাহের জন্য উপবাস পালনের বিধান দিতেন।
রমযান মাসে অন্যমাসের তুলনায় কম খাওয়া হয় এবং এই কম খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে দীর্ঘজীবন লাভের জন্যে খাওয়ার প্রয়োজন বেশি নয়। কম ও পরিমিত খাওয়াই দীর্ঘজীবন লাভের চাবিকাঠি। বছরে একমাস রোজা রাখার ফলে শরীরের অনেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিশ্রাম ঘটে। এটা অনেকটা শিল্প-কারখানায় মেশিনকে সময়মত বিশ্রাম দেয়ার মত। এতে মেশিনের আয়ুষ্কাল বাড়ে। মানবদেহের যন্ত্রপাতিরও এভাবে আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি পায়।
ডা. আলেক্স হেইগ বলেছেন, ‘‘রোজা হতে মানুষের মানসিক শক্তি এবং বিশেষ বিশেষ অনুভূতিগুলো উপকৃত হয়। স্মরণশক্তি বাড়ে, মনোসংযোগ ও যুক্তিশক্তি পরিবর্ধিত হয়। প্রীতি, ভালোবাসা, সহানুভূতি, অতীন্দ্রিয় এবং আধ্যাত্মিক শক্তির উন্মেষ ঘটে। ঘ্রাণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি প্রভৃতি বেড়ে যায়। এটা খাদ্যে অরুচি ও অনিচ্ছা দূর করে। রোজা শরীরের রক্তের প্রধান পরিশোধক। রক্তের পরিশোধন এবং বিশুদ্ধি সাধন দ্বারা দেহ প্রকৃতপক্ষে জীবনীশক্তি লাভ করে। যারা রুগ্ন তাদেরকেও আমি রোজা পালন করতে বলি।’’
বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী সিগমন্ড নারায়াড বলেন, ‘রোজা মনস্তাত্ত্বিক ও মস্তিষ্ক রোগ নির্মূল করে দেয়। মানবদেহের আবর্তন-বিবর্তন আছে। কিন্তু রোজাদার ব্যক্তির শরীর বারংবার বাহ্যিক চাপ গ্রহণ করার ক্ষমতা অর্জন করে। রোজাদার ব্যক্তি দৈহিক খিচুনী এবং মানসিক অস্থিরতার মুখোমুখি হয় না।’’
প্রখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী ুটডতটঢঢণভ সাহেব মনের প্রগাঢ়তা ও বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশে রোজার ভূমিকা প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘রোজার অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে কি পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করা হলো তার ওপর বুদ্ধিবৃত্তির কর্মক্ষমতা নির্ভর করে না। বরং কতিপয় বাধ্যবাধকতার উপরই তা নির্ভরশীল। একজন যত রোজা রাখে তার বুদ্ধি তত প্রখর হয়।’’
ডাঃ এ, এম গ্রিমী বলেন, ‘‘রোজার সামগ্রিক প্রভাব মানব স্বাস্থ্যের উপর অটুটভাবে প্রতিফলিত হয়ে থাকে এবং রোজার মাধ্যমে শরীরের বিশেষ বিশেষ অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে ওঠে।’’
ডাঃ আর, ক্যাম ফোর্ডের মতে, ‘‘রোজা হচ্ছে পরিপাক শক্তির শ্রেষ্ঠ সাহায্যকারী।’’
ডাঃ বেন কিম তাঁর ’’এর্ট্রধভথ তমর দণটর্ফদ’’ প্রবন্ধে বেশ কিছু রোগের ক্ষেত্রে উপবাসকে চিকিৎসা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এরমধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ (হাঁপানী), শরীরের র্যাশ, দীর্ঘদিনের মাথাব্যথা, অন্ত্রনালীর প্রদাহ, ক্ষতিকর নয় এমন টিউমার ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে তিনি বলেন, উপবাসকালে শরীরের যেসব অংশে প্রদাহ জনিত ঘা হয়েছে তা পূরণ (Šণযটধর) এবং সুগঠিত হতে পর্যাপ্ত সময় পেয়ে থাকে। বিশেষত খাদ্যনালী পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাওয়াতে তার গায়ে ক্ষয়ে যাওয়া টিস্যু পুনরায় তৈরি হতে পারে। সাধারণত দেখা যায় টিস্যু তৈরি হতে না পারার কারণে অর্ধপাচ্য আমিষ খাদ্যনালী শোষণ করে দূরারোগ্য (ইর্লমধববলভণ ঢধ্রণট্রণ) সব ব্যাধির সৃষ্টি করে ডাঃ বেন কিম আরো বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন উপবাস কিভাবে দেহের সবতন্ত্রে (ওর্হ্রণব) স্বাভাবিকতা রক্ষা করে।
প্রখ্যাত চিকিৎসক ডাঃ জন ফারম্যান ‘‘এর্ট্রধভথ টভঢ ঋর্টধভথ তমর দণটর্ফদ’’ প্রবন্ধে সুস্বাস্থ্য রক্ষায় উপবাস এবং খাবার গ্রহণের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে উপবাসের স্বপক্ষে মত দিয়েছেন।
এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে লক্ষণীয় রমযানের রোজা রাখার সুফল পাওয়া যায় না মূলত খাদ্যাভ্যাস ও রুচির জন্য।
বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক ডাঃ নূরুল ইসলাম বলেছেন, ‘‘রোজা মানুষের দেহে কোন ক্ষতি করে না। ইসলামে এমন কোন বিধান নেই, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। গ্যাষ্ট্রিক ও আলসার এর রোগীদের রোজা নিয়ে যে ভীতি আছে তা ঠিক নয়। কারণ রোজায় এসব রোগের কোন ক্ষতি হয় না বরং উপকার হয়। রমযান মানুষকে সংযমী ও নিয়মবদ্ধভাবে গড়ে তুলে।
১৯৫৮ইং সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ডাঃ গোলাম মুয়াযযম সাহেব কর্তৃক ‘‘মানব শরীরের উপর রোজার প্রভাব’’ সম্পর্কে যে গবেষণা চালানো হয়, তাতে প্রমাণিত হয় যে, রোযার দ্বারা মানব শরীরের কোন ক্ষতি হয় না। কেবল ওজন সামান্য কমে। তাও উল্লেখযোগ্য কিছুই নহে, বরং শরীরের অতিরিক্ত মেদ কমাতে এরূপ রোজা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের খাদ্য নিয়ন্ত্রণ (ঊধর্ণ উমর্ভরমফ) অপেক্ষা বহুদিক দিয়েই শ্রেষ্ঠ। ১৯৬০ ইং সালে তার গবেষণায় প্রমাণিত হয় যে, যারা মনে করে রোজা দ্বারা পেটের শূলবেদনা বেড়ে যায়, তাদের এ ধারণা নিতান্ত অবৈজ্ঞানিক। কারণ উপবাসে পাকস্থলীর এসিড কমে এবং খেলেই এটা বাড়ে। এ অতি সত্য কথাটা অনেক চিকিৎসকই চিন্তা না করে শূলবেদনার রোগীকে রোজা রাখতে নিষেধ করেন। ১৭ জন রোজাদারের পেটের রস পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, যাদের পাকস্থলীতে এসিড খুব বেশি বা খুব কম রোজার ফলে তাদের এ উভয় দোষই নিরাময় হয়েছে। এ গবেষণায় আরো প্রমাণিত হয় যে, যারা মনে করেন রোজা দ্বারা রক্তের পটাসিয়াম কমে যায় এবং তাতে শরীরের ক্ষতি সাধন হয়, তাদের এ ধারণাও অমূলক। কারণ পটাসিয়াম কমার প্রতিক্রিয়া প্রথমে দেখা যায় হৃদপিন্ডের উপর অথচ ১১ জন রোজাদারের হৃদপিন্ড অত্যাধুনিক ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম যন্ত্রের সাহায্যে (রোজার পূর্বে ও রোজা রাখার ২৫ দিন পর) পরীক্ষা করে দেখা গেছে রোজা দ্বারা তাদের হৃদপিন্ডের ক্রিয়ার কোনই ব্যতিক্রম ঘটে নাই।
সুতরাং বুঝা গেল যে, রোজার দ্বারা রক্তের যে পটাসিয়াম কমে তা অতি সামান্য এবং স্বাভাবিক সীমারেখার মধ্যে। তবে রোজা দ্বারা কোন কোন মানুষ কিছুটা খিট খিটে মেজাজী হয়। এর কারণ সামান্য রক্ত শর্করা কমে যায় যা স্বাস্থ্যের পক্ষে মোটেই ক্ষতিকর নয়। অন্য কোন সময় ক্ষিধে পেলেও এরূপ হয়ে থাকে।
রোজা থেকে শারীরিক ফায়দা লাভের জন্যে রোজাদারদের প্রতি ডাঃ আমীর আই, আহমদ আনকাহর কতিপয় মূল্যবান পরামর্শ দিয়েছেন, সেগুলো নীচে দেয়া হলো ঃ
১. যদি আপনি বিত্তবান হোন তবে অধিক ভোজন ও চর্বিযুক্ত খাদ্য পরিহার করে চলুন। রোজা রেখে সুস্থ থাকুন- এ প্রতীক গ্রহণ করুন।
২. সহায় সম্বলহীন আপন ভাইকে সাহায্য করুন।
৩. রমযান মাস সম্পদশালীদের জন্যে নিবেশ আর গরীবদের জন্য ভালো খাবার মাস মনে করুন।
৪. দিনের বেলা ক্ষুৎপিপাসার তাড়না থেকে মুক্তি পেতে হলে রাতে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাদ্য পরিহার করুন।
৫. খাদ্য ভালোভাবে চিবিয়ে খান।
৬. খাবার ব্যবস্থা করতে না পারলে শুধুমাত্র দুধের উপর নির্ভর করতে পারেন।
৭. যথাসম্ভব ইফতার তাড়াতাড়ি আর সেহেরী দেরীতে খাওয়া ভালো।
৮. সেহরী খেয়ে সটান না হয়ে বিনিদ্র রজনী যাপন করুন। তাতে খাদ্য ঠিকমত হজম হয়।
৯. ইফতারের পর চটপটি জাতীয় এবং ঠান্ডা জিনিস অধিক পরিমাণে গ্রহণ করবেন না।
১০. সারাদিন কাজে লিপ্ত থাকুন। ক্ষুৎপিপাসা ভুলতে চেষ্টা করবেন না।
১১. রমযান মাসে নেক কাজ ও ত্যাগ তিতিক্ষার যে অভ্যাস আপনার মাঝে সৃষ্টি হয়েছে, তা সবসময় চালু রাখুন।
১২. জীবনের চড়াই উৎরাই সবসময় রোজার দাবিকে সমুন্নত রাখুন।
১৩. কু-চিন্তা ও ধ্যান-ধারণা থেকে মুক্ত থাকুন। কুচিন্তা বিষসদৃশ যা স্বাস্থ্যকে ধ্বংস করে দেয়। কুচিন্তা ও কুধারণার উপশম না ওষুধে হয় না খাদ্যে।
১৪. মুসলমান নিজেদের জীবনে স্বল্পতুষ্টি, তাওয়াক্কুল শান্তি ও মনের সন্তুষ্টির মত বেশিষ্ট্যসমূহ বাস্তবায়িত করার মধ্য দিয়ে রমযানের বরকতের পর্যবেক্ষণ করবে। এর মধ্যেই সাহসের বিস্তৃতি ও মনের শান্তি এবং এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে মানুষের আরোগ্য লাভের গুপ্ত রহস্য।
১৫. রমযানের সিয়াম সাধনায় মুসলমান হবে স্বাস্থ্যবান এবং পুণ্য ও পবিত্র আত্মার অধিকারী।
উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশের মানুষ ইফতার ও সাহরীতে সহজপাচ্য খাবার গ্রহণ না করে মুখরোচক মশলাদার খাবার গ্রহণ করে। এতে পাকস্থলীর এসিডিটি, আলসার, বদহজম আরো বেড়ে যায়।
তিরমিজি শরীফে এসেছে রাসূল (সা.) মাগরিবের নামাজের পূর্বে কয়েকটি তাজা খেজুর দ্বারা ইফতার করতেন। খেজুর না থাকলে কয়েক কোশ পানিই পান করতেন। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘‘যখন তোমাদের কেউ ইফতার করে সে যেন খেজুর দ্বারা ইফতার করে। কেন না এতে বরকত রয়েছে। যদি খেজুর না পায় তবে যেন পানি দ্বারা ইফতার করে। কারণ পানি হলো পবিত্রকারী।'
উপমহাদেশে ইফতারের রকমারি আয়োজন থাকলেও তাদের সারাবিশ্বের মুসলমানদের খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করা উচিৎ। সাধারণত পানি, খেজুর, মুড়ি, ফলের রস, চিড়ার পানি, (বা এ দ্বারা তৈরি খাবার), দুধ ইত্যাদি দিয়ে ইফতারের আয়োজন করা যেতে পারে।
রমযানে দুই খাবার গ্রহণের মধ্যবর্তী সময় কম থাকায় পাকস্থলী গুরুপাক খাবার দিয়ে বোঝাই না করাই উত্তম। আসল বিষয় হলো রমযানের উদ্দেশ্য পূরণে রকমারি খাবার আয়োজন রোজার সুফলকে ম্লান করে দেয়।
রোযা রাখার ব্যাপারে বিধি নিষেধ :
-------------------------------------------------
রোযা রাখার ব্যাপারে আমরা মাঝে মাঝে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। এমন অনেক অসুস্থ্য ব্যক্তি আছেন যাদের রোযা রাখলে আরো অসুস্থ্য হয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। তাদের রোজা রাখার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা উচিৎ নয়।
আবার ঠিক ততটা অসুস্থ্য নয় কিন্তু অসুস্থ্যতার উল্লেখ করে রাযা না রাখাও বৈধ নয়। কুরআনে রয়েছে, ‘‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি রোগগ্রস্ত অথবা সফরে থাকে, সে যেন অন্য দিনসমূহে এই সংখ্যা পূর্ণ করে। (সূরা বাকারাহ)
রাসূল (সা.) সফররত রোজাদারদেরকে কখনো কখনো তিরস্কার করেছেন। এক্ষেত্রে স্মরণ রাখা দরকার, প্রয়োজনীয় ও জরুরি ক্ষেত্রে সফর হলে এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে। শুধুমাত্র বেড়ানোর উদ্দেশ্যে এই নিয়ম গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশেষ কিছু রোগে যেমন-উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ইত্যাদি ক্ষেত্রে সতর্কতার সাথে রোজা রাখতে হবে। কেননা এসব এমন ধরনের অসুস্থতা যা সম্পূর্ণ আরোগ্য হয় না। ফলে রোগী রমযান ছাড়া অন্যসময় এসব রোজা পূর্ণ করতে পারে না।
ডা. ফারাদেই আজিজি এবং ডা. শিয়াকোলা ডায়াবেটিস রোগীদের উপর এক বিশেষ জরিপ চালান। সেখানে কিছু রোগীকে রোজা রাখার ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয় এবং কিছু রোগীকে অনুৎসাহিক করা হয়। Šটবটঢটভ এর্ট্রধভথ টভঢ ঊধটঠর্ণণ্র বণফফর্ধল্র' এ শিারোনামে ওয়েব সাইটে তারা এ রোগীদের জন্য বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন।
যে সব ডায়াবেটিক রোগী ইনসুলিনের উপর নির্ভরশীল নয় অর্থাৎ মুখে ওষুধ এবং পরিমিত খাদ্যাভ্যাস এবং শরীর চর্চা করে থাকেন তাদের রোজা রাখতে তেমন কোন অসুবিধা হয় না, এক্ষেত্রে সাহরীর কিছু সময় পূর্বে ওষুধ সেবন করতে হবে এবং ইফতারের তালিকায় শর্করা ও স্নেহ জাতীয়ত খাদ্যের পরিমাণ কম রাখতে হবে। এছাড়া তাদের নিয়মিত গ্লুকোজ পরীক্ষা করতে হবে যাতে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রার তারতম্য অস্বাভাবিক না হয়ে যায়।
যে সব রোগী শুধুমাত্র ইনসুলিনের উপর নির্ভরশীল অর্থাৎ এ ছাড়া অন্যকোন উপায়ে রক্তের চিনির মাত্র নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না তাদের খুবই সতর্কতার সাথে রোজা রাখতে হবে। এসব রোগীর চিনির মাত্রা খুব নিচে নেমে গিয়ে রোগী শকে (ঔহযমথফহডণবধড ওদমডপ) চলে যেতে পারে। সেজন্য শকের যে সব লক্ষণ রয়েছে সেগুলো রোগীকে খুব সাবধানতার সাথে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যেমন-অনেক ঘামতে থাকা, অস্থিরতা অনুভব করা, মাথা ঘোরা, চোখে ঝাপসা দেখা ইত্যাদি। এসব রোগীর যেকোন সময় এধরনের সমস্যা হতে পারে বিধায় সবসময় ডায়াবেটিক রোগীর অঊ কার্ড বহন করতে হবে। নিয়মিত প্রস্রাব (খরধভণ ওলথণর) পরীক্ষা করা ও সব সময় একজন ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ রাখতে হবে। এইসব রোগীকে রোযা রাখতে উৎসাহিত করা হয় না।
রোজা না রাখাই ভালো ঃ
১. শুধুমাত্র ইনসুলিন নির্ভরশীল রোগী।
২. খুব নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না (রক্তের গ্লুকোজ) এমন রোগীর
৩. যে সব ডায়াবেটিক রোগী অন্যকোন জটিল রোগে আক্রান্ত যেমন-বুকে ব্যথা এবং অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ
৪. যাদের ডায়াবেটিসজনিত জটিলতা রয়েছে
৫. সন্তান সম্ভাবা ডায়াবেটিক মা।
৬. যাদের ডায়াবেটিসের সাথে ঘন ঘন ইনফেকশনের ইতিহাস রয়েছে
৭. এমন বয়স্ক রোগী যারা ডায়াবেটিসজনিত অসুস্থতা ব্যাখ্যা করতে পারেন না।
৮. রমযান মাসেই যদি দুই থেকে তিনবার রক্তে গ্লুকোজ মাত্রা খুব কম বা বেশি হয়ে থাকে
অনেক রোগী রয়েছে যারা অধিক ওজন সংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছে তারাও রোজা রাখার ক্ষেত্রে অনেক সাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। রমযান শুধু দৈহিক অসুস্থতাই নয়, যারা অনেকদিন ধরে মানসিক অবসন্নতা বা বিভিন্ন রকম দুশ্চিন্তায় আক্রান্ত তাদের জন্যও চিকিৎসা হিসেবে কাজ করছে। এরকম একটি জরিপে দেখা গেছে রোজা রাখার কারণে যেসব রোগী তাদের কথাবার্তা এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম নিময়-শৃক্মখলার মাধ্যমে অতিবাহিত করেছে তাদের ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য লাভ করা গেছে।
কুরআনের প্রতিটি বিধানই মানব জাতির জন্যে কল্যাণকর। গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে রোজার মধ্যে প্রভূত কল্যাণ নিহিত রয়েছে।
৮শ্রেণি মানুষের উপর রোজা ফরজ:
--------------------------------------------------
১. মুসলমান হওয়া।
মুসলিম ব্যক্তির জন্য রোজা রাখা ফরজ। রোজা কোন অমুসলিমের জন্য ফরজ নয়।
২. বালেগ হওয়া।
নাবালগের ওপর রোজা ফরজ নয়।
৩. সুস্থব্যক্তি হওয়া।
শারীরিক ভাবে অসুস্থ ব্যক্তির জন্য রোজা রাখার নিয়ম নাই। তবে সাধারন অসুখ বিসুখ হলে যদি সে রোজা রাখার উপযোগী হয় তবে সে রোজা রাখতে পারবে।
৪.সুস্থ মস্তিস্কের অধিকারী হওয়া।
পাগলের ওপর রোজা ফরজ নয়।
৫.স্বাধীন হওয়া।
পরাধীন নয় এমন ব্যক্তি হওয়া।
৬.সজ্ঞান হওয়া।
অর্থাৎ যিনি রোজা রাখবেন তিনি নিজ জ্ঞানে বা স্বেচ্ছায় আল্লাহর হুকুম পালন করবেন।
৭.মুকিম হওয়া।
অর্থাৎ স্তায়ীবাসিন্দা হওয়া। মুসাফিরের ওপর রোজা ফরজের ব্যপারে একটু ভিন্নতা আছে। যেমন কষ্টসাধ্য ভ্রমন হলে পরবর্তীতে রোজা আদায়ের বিধান আছে। আমি মনে করি বর্তমানে সফর অনেক আরামের সাথে করা যায় তাই সফর অবস্থায় একমাত্র কাহিল হয়ে না পড়লে রোজা রাখা উচিৎ।
৮.তাহীরা
অর্থাৎ-হায়েজ-নেফাস মুক্ত হতে হবে,এটা মহিলাদের ক্ষেত্রে।
নারীর যৌনাঙ্গ থেকে কোনো কারণ ছাড়া নির্দিষ্ট সংখ্যক দিন যে রক্ত বের হয়-তাকে হায়েয বলে।
তার সর্বনিম্ন মেয়াদ ৩দিনও সর্বোচ্চ মেয়াদ১০দিন।
আর সন্তান প্রসবের পর নারীর জরায়ূ থেকে যে রক্ত বের হয় তাকে নেফাস বলে।
নেফাসের সর্বনিম্ম কোনো মেয়াদ নেই,তবে সর্বোচ্চ মেয়াদ৪০দিন।
রোজার ফজিলত:
-------------------------
রোজার ফজিলত অঢেল, এর ছাওয়াব বহুগুণে বর্ধিত। আল্লাহ তাআলা রোজাকে তাঁর একান্ত বিষয় বলে উল্লেখ করে এ ইবাদতটিকে মহিমান্বিত করেছেন, এর আযমত বাড়িয়ে দিয়েছেন। আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত এক হাদীসে কুদ্সীতে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,‘আদম সন্তানের প্রতিটি আমলের ছাওয়াবই দ্বিগুণ করে দেয়া হয়। প্রতিটি সৎকাজ দশগুণ থেকে সাতশগুণ বাড়িয়ে দেয়া হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন: তবে রোজা ব্যতীত; কেননা রোজা কেবল আমার এবং আমিই এর প্রতিদান দিই। রোজাদার আমার জন্য তার লালসা ও খাদ্য পরিত্যাগ করে। রোজাদারের দুটি আনন্দ রয়েছে: একটি হলো রোজা ছাড়ার সময়, আর অন্যটি হলো তার রবের সাথে সাক্ষাতের সময়। আর রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট কস্তুরির সুগন্ধি থেকেও প্রিয়। (বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিম।)
রোজার রোকন: সাওমের রোকন একটি তা হলো রোজা ভঙ্গ করে এমন বস্তু পরিহার করা।
রোজার তিনটি শর্ত রয়েছে। ১. রোজা ফরজ হওয়ার শর্ত ৩টি যথা- ক. মুসলমান হওয়া, ২. জ্ঞানবান হওয়া ৩. প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া ২. রোজা আদায় হওয়ার শর্ত ২টি- ক. সুস্থ হওয়া খ. মুকীম হওয়া। রোজা আদায় শুদ্ধ হওয়ার শর্ত ২টি ক. মহিলাদের ক্ষেত্রে মিনস ও নেফাস থেকে পবিত্র হওয়া। খ. নিয়ত করা।
রোজার প্রকার:
---------------------
রোজা মোট ছয় প্রকার ১. ফরজ রোজা, যেমন রমজান মাসের । ২. ওয়াজিব রোজা, যেমন মান্নতের রোজা । ৩. সুন্নত রোজা, যেমন, আশুরার রোজা ৪. মুস্তহাব রোজা, যেমন আইয়ামে বীযের রোজা প্রতি সপ্তাহে সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা। রাখা। ৫. মাকরুহ রোজা, আশুরার ১টি রোজা রাখা। ৬. হারাম রোজা, যেমন দুই ঈদের দিনে রোজা এবং কুরবানির ঈদের পরের তিন দিন রোজা রাখা।
যেসব কারণে রোজা ভেঙ্গে যায়:
--------------------------------------------
১. ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো কিছু পানাহার করা। ২. স্ত্রী চুম্বন বা সহবাস দ্বারা বীর্যপাত হওয়া।
৩. ইচ্ছাকরে মুখভর্তি বমি করা। ৪. পাথর লোহার টুকরা বা ফলের আটি ইত্যাদি গিলে ফেলা। ৫. ইচ্ছাকৃতভাবে গুহ্যদ্বার বা ও যৌন পথ দিয়ে যৌন সঙ্গম করা বা ঢুস নেয়া। ৬. ইচ্ছাপূর্বক এমন জিনিস পানাহার করা যা খাদ্য বা ওষুধ রুপে ব্যবহার হয়। ৭. কান বা নাকের ভিতর ওষুধ দেয়া।
যেসব কারণে রোজা ভাঙলে কাযা ওয়াজিব হয়:
-------------------------------------------------------------------
১. ইচ্ছাকরে মুখভর্তি বমি করা। ২. কোনো অখাদ্য বস্তু খেয়ে ফেললে। ৩. স্ত্রীকে চুম্বন বা স্পর্শ করায় বীর্যপাত হলে। ৪. কুলি করার সময় অনিচ্ছায় পানি পেটে চলে গেলে। ৫. সন্ধ্যা বিবেচনায় সূর্যাস্তের আগে ইফতার করলে। ৬. ঢুস নিলে। ৭. জোরপূর্বক রোযাদারকে কেউ পানাহার করালে। ৮. কেউ যৌনাঙ্গ ব্যতিরেকে সঙ্গম করায় তাতে বীর্যপাত হলে। ৯. তরল ওষুধ লাগানোর কারনে তা পেটে বা মস্তিষ্কে পৌঁছে গেলে। ১০. সুবহে সাদেক মনে করে ভোরে পানাহার করলে। ১১. ঘুমন্ত অবস্থায় কিছু খেয়ে ফেললে। ১২. দাঁত থেকে ছোলা পরিমান কোনো কিছু বের করে গিলে ফেললে।
১৩. ভুলবসত কিছু খেয়ে রোযা ভঙ্গ হয়েছে ধারনা করে ইচ্ছাপূর্বক আবার খেলে।
যেসব কারণে রোযা ভাঙলে কাযা ও কাফফারা ওয়াজিব :
---------------
১. রোযা অবস্থায় ইচ্ছাপূর্বক স্ত্রী সহবাস করলে। ২. ইচ্ছাপূর্বক পুং মৈথুন ও হস্ত মৈথুন করা বীর্যপাত করলে। ৩. ইচ্ছাপূর্বক কোনো খাদ্য বা পানীয় গ্রহণ করলে। ৪. শিঙ্গা নিয়ে এ ধারনায় ইচ্ছাপূর্বক পানাহার করলে যে, এখন তো রোযা নষ্ট হয়ে গেছে।
রোযাদারের জন্য যা জায়েয:
-----------------------------------------
১. স্ত্রীর সঙ্গে স্বাভাবিক মেলামেশা করা বা চুমু দেওয়া। যদি বীর্যপাতের আশঙ্কা না থাকে। ২. গোফে তেল ব্যবহার করা। ৩. চোখে সুরমা লাগানো। ৪. মেসওয়াক করা। ৫. এমনভাবে কুলি করা যাতে পেটে পানি প্রবেশের আশঙ্কা না থাকে। ৬. সাবধানতায় নাকে পানি দেওয়া যাতে ভেতরে পানি চলে না যায়। ৭. গোসল করা। ৮. শিঙ্গা লাগানো, যদি এর দ্বারা রোজাদার দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা না থাকে। ৯. শরীরে ঢুস ব্যবহার করা। ১০. স্বামীর অশালীন কথাবার্তা শুনার আশঙ্কা থাকলে তরকারীর স্বাদ গ্রহণ করা। ১১. মুসাফির অবস্থায় অসহ্য কষ্ট হলে রোযা ছেড়ে দেওয়া।
১২. সন্তানকে দুধ পান না করালে যদি সন্তানের স্বাস্থ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে রোযা ছেড়ে দেয়া বৈধ: কিন্তু পরবর্তীতে কাযা আদায় করতে হবে। ১৩. প্রয়োজন মনে করলে সন্তানের মুখে খাবার চিবিয়ে দেওয়া। ১৪. অনিচ্ছাকৃত বমি করা।
রোজাদারের জন্য নাজায়েয কাজ:
-------------------------------------------------
১. যৌন সম্ভোগ ও হস্তমৈথুনের মাধ্যমে বীর্যপাত ঘটানো। ২. ইচ্ছাকৃত পানাহার করা।
৩. যথা খাদ্য মুখে দিয়ে স্বাদ গ্রহণ করা। ৪. শিঙ্গা লাগিয়ে রোযা নষ্ট হয়েছে মনে করে পানাহার করা। ৫. দাঁত থেকে কোনো খাদ্যকনা বের করে গিলে ফেলা। ৬. প্রয়োজন ছাড়া সন্তানের মুখে খাদ্য চিবিয়ে দেওয়া। ৭. মিথ্যা বলা, অশ্লীল কথা বা গালিগালাজ করা। ৮. ভুলক্রমে কিছু পানাহার শুরু করে রোযা ভঙ্গ হয়েছে মনে করে পেট পুরে পানাহার করা। ৯. সারাদিন রোযা শেষে ইফতারের সময় ইফতার না করা।
রোজা মাকরূহ হওয়ার কারণ:
------------------------------------------
১. গড়গড়িয়ে কুলি করা। কেননা এতে পেটে পানি প্রবেশের আশঙ্কা থাকে।
২. শরীরে তেল ব্যবহার করা। কেননা এত পশমের গোড়া দিয়ে তেল শরীরের অভ্যন্তরে ঢুকতে পারে। ৩. শিঙ্গা লাগানো। ৪. স্ত্রীকে চুম্বন করা। কেননা অনেক সময় এটা রোযাদারকে সঙ্গমের প্রতি ধাবিত করে। ৫. দাঁত থেকে বের করে কিছু চিবিয়ে খাওয়া। ৬. মিথ্যা কথা বলা। কেননা হাদিসে এসেছে মিথ্যা সকল পাপের মূল। ৭. অশ্লীল কথাবার্তা বলা। ৮. কাউকে গালি দেওয়া। ৯. অন্যের দোষ ত্রোটি বর্ণনা করা। ১০. মুখ দিয়ে কোনো ব¯ু‘র স্বাদ গ্রহণ করা। ১১. গরম বা রোদে বারবার কুলি করা। ১২. অধিক উষ্ণতার কারণে গায়ে ভেজা কাপড় জড়িয়ে রাখা।
সাহরি খাওয়ার বিধান:
--------------------------------
রোজা রাখার নিয়তে শেষ রাতে বরকত লাভের জন্য কিছু খাওয়াকে সাহরি বলা হয়। ইমাম তাবারানী (রহ.) বর্ণনা করেছেন রাসুল (সা.) বলেন, ‘সাহরি গ্রহণকারীর খাবারের হিসাব হবে না’। তাছাড়া সাহরি খাওয়া রাসুল (সা.) এর একটি সুন্নত। রাসুল (সা.) এর হাদীস শরীফে সাহরি খাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে। হজরত আনাস (রা
হতে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা সাহরি খাও, কেননা তাতে বরকত রয়েছে’। (বোখারী: ১৯২৩) রোজাদারের জন্য বরকতময় খাবার হল সাহরি খাওয়া। সাহরি খাওয়া সুন্নত। কোন কারণে সাহরি খেতে না পারলে সাহরি খাওয়া ছাড়াই রোযার নিয়ত করবেন। এতে রোজার ক্ষতি হবে না। অর্ধ রাতের পর থেকে সুবহে সাদিকের পূর্ব পর্যন্ত যে কোনো সময়ে সাহরি খাওয়া হলে সুন্নত আদায় হয়ে যাবে। শেষ রাতে সাহরি খাওয়াই উত্তম। রাসুল (সা.) সাধারণত দেরি করে সাহরি খেতেন, তাই রাতের শেষ প্রহরে সাহরি খাওয়া সুন্নাত। রাসুল (স.) বলেন, ‘আমার উম্মত কল্যাণের সাথে থাকবে যতদিন তারা তাড়াতাড়ি ইফতারি করবে এবং সাহরি দেরি করে করবে’। (আহমদ)
ইফতারের বিধান:
-------------------------
ইফতার শব্দের অর্থ ভঙ্গ করা বা ভেঙ্গে ফেলা। আমিমুল ইহসান (র
বলেন, রোজাদারের জন্য ইফতার হল তার পানাহার করা। শরীয়তের পরিভাষায় সারাদিন রোজা পালন শেষে সূর্যাস্ত হওয়ার পর পর পানি, শরবত, খেজুরসহ প্রয়োজনীয় খাবারের মাধ্যমে রোজা ভঙ্গ করাকে ইফতার বলা হয়। রাসুল (সা.) বলেন, রোজাদারের জন্য দুইটি আনন্দময় মুহূর্ত রয়েছে ১. ইফতারের সময় ২. আখারাতে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের সময়’। (বোখারী ও মুসলিম) ইফতার খেজুর দিয়ে করা সুন্নাত। আবু ইয়ালা (রহ.) বলেন, “রাসুল (সা
তিনটি খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। খেজুর ব্যতিত অন্যান্য ফলমূল দ্বারা ইফতার করা যাবে তবে খেজুর দ্বারা ইফতার করা ভাল। রাসুল (সা
বলেন, “তোমাদের কেউ যখন ইফতার করে সে যেন খেজুর দিয়ে করে কেননা তা বরকতময় যদি খেজুর না থাকে তবে পানি দিয়ে কেননা তা পবিত্র”। (আবু দাউদ, ২৩৫৬-পৃষ্ঠা)
ইফতারির পূর্বে রোজাদারের দোয়া মহান আল্লাহ তায়ালা কবুল করেন। হজরত ওমর (রা
হতে বর্ণিত রাসুল (সা
বলেন, “ ইফতারির সময় রোজাদারের দোয়া কবুল করা হয়। তাই ইফতারির সময় দোয়া পড়তে হয় “আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু ওয়াআলা রিযকিকা আফতারতু”। (আবু দাউদ)
তারাবির বিধান:
------------------------
তারাবি পড়া সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ আর তারাবির নামাজ জামাতে পড়া সুন্নতে মুয়াক্কাদায়ে কিফায়া। যে ব্যক্তি পরে যোগ দেয়ার কারণে কিছু তারাবিহ রয়ে গেছে তিনি ইমামের সাথে বিতর পরে নিবেন, অতপর অবশিষ্ট তারাবির নামাজ আদায় করবেন। অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেকে হাফেজ হোক বা না হোক ইমাম বানানো ঠিক নয়। বালেগ ইমামের পিছনে নামাজ আদায় করতে হবে। যে তারাবি পড়াবে তার নিকট থেকে আয়াতের অর্থ কিংবা সারসংক্ষেপ জেনে নেওয়া ভাল। যখন থেকে সাহাবিরা এই পড়া শুরু করেন তখন থেকে তারা দুই সালামের পর অর্থাৎ চার রাকাত নামাজের পর বিশ্রাম নিতেন। তাই এই নামাজের নাম তারাবি নামাজ করা হয়েছে। (ফতহুল বারী)
২৭-০৪-২০১৯ইং
©somewhere in net ltd.