নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

গোবিন্দলগোবেচারা

গোবিন্দলগোবেচারা › বিস্তারিত পোস্টঃ

ভারতের সঙ্গে রুপিতে বানিজ্য - কি লাভ? কি ক্ষতি?

২৫ শে মে, ২০২৪ সকাল ৯:১৮

বেশ কয়েক মাস আগে পত্রিকায় খবর এসেছিল বাংলাদেশ ভারত ডলারের পরিবর্তে রুপিতে বাণিজ্য করতে সম্মত হয়েছে। ব্লগে পুরাতন লেখা ঘাটাঘাটি করতে যেয়ে এই বিষয়ে কিছু লেখা এবং কমেন্ট দেখলাম।
দুঃখজনক হলেও সত্য , অন্যান্য বেশিরভাগ লেখার মত এক্ষেত্রেও দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই লেখা এবং কমেন্টগুলো এসেছে। বিষয়টি কেন ভালো বা কেন খারাপ নিরপেক্ষ দৃষ্টি থেকে কেউ বলেছেন বলে মনে হলো না। শুধুমাত্র হাসান কালবৈশাখী নামের একজন ভদ্রলোক সত্যের কাছাকাছি কমেন্ট করেছেন; তবে কমেন্টেরসঙ্গে কিছু রাজনৈতিক লেজ জুড়ে দিয়ে ওনার বক্তব্যটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেছেন।

আমাদের রিজার্ভ কেন যথেষ্ট বা যথেষ্ট না, বাণিজ্য ঘাটতি কিভাবে দূর হবে, রুপিতে বাণিজ্য করলে কি লাভ কি ক্ষতি বিষয়গুলো নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করতে ইচ্ছে হলো।

পৃথিবীর কোন দেশে স্বয়ংসম্পূর্ণ না, অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করতে হয়। এই বাণিজ্য গুলো সাধারণত ডলার ,ইউরো , পাউন্ড ইয়েন এ সমস্ত কারেন্সিতে হয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ৭৫ পার্সেন্ট ডলারে হয়ে থাকে। (কেন হয়, সেটি একটি ভিন্ন প্রসঙ্গ । এ বিষয়ে বড় পোস্ট লেখা সম্ভব এই লেখার উদ্দেশ্যে সেটা না) ।
আমাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বরাবরই রপ্তানির চাইতে আমদানি বেশি ছিল। এটিকে সাধারণভাবে আমরা বাণিজ্য ঘাটতি বলি। সর্বশেষ ২০২২ সালে আমাদের নিট আমদানি ছিল প্রায় ৯৭ বিলিয়ন ডলার, রপ্তানি ষাট বিলিয়ন ডলার। ঘাটতি প্রায় ৩৭ বিলিয়ন ডলার । (২০২৩ এর হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি) ।

ঘাটতিটা কিভাবে পূরণ হয়?

ঋণ , অনুদান এবং রেমিটেন্স - মূলত এই তিন খাত থেকে ঘাটতি পূরণ করা হয় । উল্লেখ্য আমাদের রেমিটেন্স বছরে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার । (দেখা যাচ্ছে এই টাকাটাও ঘাটতি পূরণের জন্য উপযোগী না।, কেননা ঘাটতি সাঁইত্রিশ বিলিয়ন ডলার। তবে লোন করার সুযোগ থাকলে ঘিয়ের দাম যত হোক না কেন সমস্যা হয় না।)

১৯৯১ সালের হিসাব ২০২৪ সালে দিলে চলবে না। ৯১ সালে আমাদের নিট আমদানি ছিল দুই বিলিয়ন ডলার রপ্তানি ছিল অর্ধ বিলিয়ন ডলার (কাছাকাছি সংখ্যায়) । ২০-২২ বছরে অর্থনীতির আকার অন্তত ২০ গুণ বেড়েছে।

আমাদের দেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য রিজার্ভ কতখানি থাকা দরকার? মোটামুটি ভাবে ধরে নেওয়া হয় তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মত রিজার্ভ থাকলে তা নিরাপদ। (কেন তিন মাস সেটাও এই লেখার মূল বিষয় না, এখানে আর আলোচনা করলাম না) ।
৯১ সালের শুরুতে আমাদের রিজার্ভ তিন মাসের আমদানি মেটানোর মত ছিল না। পরবর্তীতে অবশ্য এটা চার মাসের আমদানি ব্যায় মেটানোর মত অবস্থায় উন্নীত হয়। পরবর্তীতে লাগাতার ৩০০ দিনের হরতালে রিজার্ভ বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

২২ সালে আমাদের আমদানি ব্যয় ছিল মাসে গড়ে আট বিলিয়ন ডলারের মত। সরকার বিভিন্ন রকমের নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাখার কারণে এই আমদানি এখন কমে সাড়ে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছিতে নেমে এসেছে। (এখন রিজার্ ভ ১৩-১৪ বিলিয়ন ডলার, প্রতিমাসে এক বিলিয়ন ডলারের মত কমছে । রিজার্ভ এখন তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের চাইতে কম। ডলার পাচার রোধ করতে পারলে এখনো বড় সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারব) ।

একজন গৃহকর্তা যদি অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে বাচ্চার লেখাপড়া বন্ধ করে দেয় তবে দীর্ঘমেয়াদে তা উপকারের চাইতে অপকার বয়ে আনবে। আমদানিতে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কারণে ভবিষ্যতে অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে। হেভি মেশিনারি আমদানি করতে না পারলে রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক বহুবার বলেছে ডলার পাচার হচ্ছে। পাচারটা আংশিক রোধ করতে পারলেও রিজার্ভের ক্ষয় কিছুটা আটকানো যেত।

২০২২ সালে ভারতে আমাদের রপ্তানি দুই বিলিয়ন ডলার আর আমদানি ১৪ বিলিয়ন ডলার। বাণিজ্য ঘাটতি ১২ বিলিয়ন ডলার। (ভারতের অনুকূলে , আমাদের প্রতিকূলে।)

ভারত আমাদের সাথে ডলারের বদলে রুপিতে বাণিজ্য করলে ভারতের কি লাভ বা আমাদের কি লাভ? এই বারো বিলিয়ন ডলার রুপিতে আমরা কিভাবে পরিশোধ করব? এত রুপি কোথায় পাবো?
এই কটি প্রশ্নের উত্তর দিতে যেয়ে বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন জ্ঞানীগুণীরা মনের মাধুরী মিশিয়ে অনেক কথা বলেছেন।

যা হোক বাংলাদেশে একমাত্র দেশ না ভারত যার সাথে ডলারের বদলে রুপিতে বাণিজ্য করতে চাচ্ছে। মালয়েশিয়ার সাথে ভারতের এই বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। রাশিয়ার সাথে রুপিতে বাণিজ্য অলরেডি শুরু হয়ে গিয়েছে। তবে ভারত রাশিয়ার বাণিজ্যের ক্ষেত্রে রাশিয়া থেকে ভারতের আমদানি বেশি , রপ্তানি কম। অর্থাৎ আমাদের উল্টো অবস্থা। এখানে কি অন্য রকমের কিছু ঘটবে?

ভারতে আমাদের যে সমস্ত প্রতিষ্ঠান আমদানি রপ্তানি দুটোই করে থাকে (যেমন প্রাণ-আরএফএল) তারা রুপিতে রপ্তানি করতে পারবেন এবং সমপরিমাণ রুপির জিনিস আমদানি করতে পারবেন, ঘাটতিটুকু ডলারে দিতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় বাণিজ্যঅলরেডি শুরু হয়ে গিয়েছে ।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যদি প্রাণ দুই বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে এবং ৩০০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে তবে ১৭০০ মিলিয়ন ডলার ঘাটতিটা ডলারে দিতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংক তার রিজার্ভ থেকে এই দায় মেটাবে)। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে রিজার্ভ রুপিতে কখনো ছিল না , এবং ভারতকে রুপিতে ঘাটতিটা পরিশোধ করার আমাদের সুযোগ নেই।

লাভ কার হল? ভারতের? না আমাদের? কি লাভ হলো?

দুই দেশেরই লাভ হলো।

কিভাবে?

ভারত থেকে পণ্য কেনার সময় আমরা যখন ডলারে কিনি তখন ডলার-রুপির এক্সচেঞ্জ রেটের উপরে একটা কমিশন দিতে হয়। একইভাবে ডলার-টাকার এক্সচেঞ্জ এর রেট এর উপরে আর একবার কমিশন দিতে হয়। যেমন এখন এল সি খুলতে ডলার প্রতি খরচ হয় ১২৩-১২৪ টাকা, কিন্তু ব্যাংকগুলো যখন রপ্তানি আয় নগদয়ন করে তখন ডলারের বিনিময়ে পাচ্ছে ১১৫ থেকে ১১৭ টাকা। ডলার প্রতি পাঁচ টাকা লস হলে দুই বিলিয়ন ডলারের দশ বিলিয়ন টাকা লস।

১৪ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ১২ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি। এটার উপরে কমিশন দিতে হবে। কিন্তু যেই দুই বিলিয়ন ডলার ঘাটতি ছিল না, তা কমিশনের বাহিরে রয়ে যাবে। ফলে দুই পক্ষই লাভবান হবে।
উল্লেখ্য ভারতের সাথে রাশিয়ার যে চুক্তি ছিল তার রাশিয়ার জন্য লাভজনক ছিল না।
ভারত রাশিয়া বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাণিজ্য ঘাটতি ভারতের বিপক্ষে, রাশিয়ার অনুকূলে। এই ক্ষেত্রে ভারত রাশিয়াকে ডলারের বদলে রূপি দেওয়া শুরু করেছিল। রাশিয়ার হাতে বিপুল পরিমাণ রুপি, কিন্তু রাশিয়ায় এই রূপি খরচ করতে পারছে না। কেননা অন্য কোন দেশ রুপী নিতে রাজি না।
বাংলাদেশ ভারত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাণিজ্য ঘাটতি বাংলাদেশের অনুকূলে আসার কোন সম্ভাবনা দেখিনা। যদি কোন লাল শুক্রবারে এই ঘটনা ঘটেও যায় চুক্তি অনুসারে ঘাটতিটা বাংলাদেশ ডলারে পাবে, রূপিতে না। ফলে এক্ষেত্রে বাংলাদেশের কোন ক্ষতি নাই।

তবে রুপিতে বাণিজ্যের জন্য এক্ষেত্রে ভারতের একটা পরোক্ষ লাভ আছে। ভারত চেষ্টা করছে আন্তর্জাতিক পরাশক্তি হওয়ার। যদি রুপিকে একটি আন্তর্জাতিক ভাবে বিনিময়যোগ্য কারেন্সি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তবে তা মোদি সরকারের জন্য আর একটা সাফল্য হবে।
২০২২ সালে ভারতের নেট আমদানি প্রায় ৯০০ বিলিয়ন ডলার আমদানি প্রায় ৮০০ বিলিয়ন ডলার । বাংলাদেশের সাথে ২ বিলিয়ন ডলারের আমদানি রপ্তানি রুপিতে হলে ভারত এমন কোন জায়গায় পৌঁছে যাবে না, যে আমরা দাবি করতে পারি সরকার দেশ বিক্রি করে ভারত উদ্ধার করে দিয়েছে।

মন্তব্য ২ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (২) মন্তব্য লিখুন

১| ৩১ শে আগস্ট, ২০২৫ রাত ১১:১৬

খায়রুল আহসান বলেছেন: আপনার আলোচনাটি ভালো লেগেছে। চমৎকার আলোচনা করেছেন। +

০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৫ রাত ৯:৪৯

গোবিন্দলগোবেচারা বলেছেন: আপনার উত্সাহ মূলক মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.