নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

বোকা মানুষের কথায় কিই বা আসে যায়

বোকা মানুষ বলতে চায়

আমি একজন বোকা মানব, সবাই বলে আমার মাথায় কোন ঘিলু নাই। আমি কিছু বলতে নিলেই সবাই থামিয়ে দিয়ে বলে, এই গাধা চুপ কর! তাই আমি ব্লগের সাহায্যে কিছু বলতে চাই। সামু পরিবারে আমার রোল নাম্বারঃ ১৩৩৩৮১

বোকা মানুষ বলতে চায় › বিস্তারিত পোস্টঃ

রন্তু\'র কালো আকাশ (পর্ব ১-১৪ ফিরে দেখা)

১৭ ই জুন, ২০১৫ বিকাল ৫:৪০



অনেক আগে একটা ছোট গল্প লিখেছিলাম, মনে পড়ে রুবি রায়, সেখানে ব্লগার মশিকুর ভাই কমেন্টে একটা কথা বলেছিলেন, 'আপনার ভেতর লেখক আছে ভাই'। সেই ছোট্ট একটা কথা মনের মাঝে দাগ কেটে গিয়েছিল। সেই থেকে মাঝে মাঝে চেষ্টা (চেষ্টা না বলে অপচেষ্টা বলা উচিত) করি গল্প লেখার, সবই ছোট গল্প। বছর খানেক আগে এই রন্তু সিরিজ শুরু করি কোন একটা বড় কিছু লেখার আশায়। শুরু থেকে সহ ব্লগারদের উৎসাহ আমায় প্রেরণা দিয়ে গেছে এই গল্প এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু মশিকুর ভাই যেন কোথায় হাওয়া হয়ে গিয়েছিলেন। সম্প্রতি তাকে ফিরে পেয়েছি। অন্য একটা পোস্টে এসে উনি জানালেন রন্তু সিরিজের ১-৫ পর্ব নিয়ে যে পোস্টটা ছিল সেটা উনি পড়েছেন, যদি পারি ৬-১৫ পর্ব নিয়ে যেন একটা পোস্ট দেই। উনার কথা আমি কিভাবে ফেলতে পারি? তাই আজকের এই রিপোস্ট। রন্তু সিরিজের সাথে যারা থেকেছেন তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা; হাসান মাহবুব, ডি মুন, স্বপ্নবাজ অভি, এহসান সাবির, স্নিগ্ধ শোভন, আলম দীপ্র, ঢাকাবাসী, মুনতাসির নাসিফ (দ্যা অ্যানোনিমাস), সুমন কর, লাইলী আরজুমান খানম লায়লা, সচেতনহ্যাপী, কলমের কালি শেষ, সোহানী, জাফরুল মবীন, শ্রেষ্ঠা, মনিরা সুলতানা, দিশেহারা রাজপুত্র সহ সকল পাঠক যারা রন্তুকে ভালবেসেছেন, রন্তুর সাথে থেকেছেন। অনেকে নিয়মিত পড়ে গেছেন, কিন্তু কমেন্ট করে জানান দেন নাই, সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আশা রাখি তিন চার দিন পর থেকে নিয়মিত আবার রন্তু সিরিজের লেখা পোস্ট করতে পারব। ততক্ষণ পর্যন্ত ভালো থাকুন। যারা আগের পর্বগুলো পড়েন নাই, হাতে সময় থাকলে পড়ে নিতে পারেন এখান থেকে। যারা পুরো সিরিজটা আবার ঝালিয়ে নিতে চান, তারাও পড়তে পারেন। আমিও কিন্তু পোস্ট করেই পড়া শুরু করে দিব। :) সাথে থাকুন, পাশে থাকুন।



১.
রন্তু বারবার জানাল দিয়ে বাহিরের খোলা মাঠের দিকে তাকাচ্ছে, তার দৃষ্টি মাঠের শেষ প্রান্তের যে নারিকেল-সুপারির গাছের সারি তার উপরে ঐ আকাশের দিকে। না কোন সুতো কাটা ঘুড়ির দিকে নয়, সে বারবার আকাশের কালো মেঘের দিকে তাকাচ্ছে। আজো কি বৃষ্টি হবে, আকাশ জুড়ে কালো মেঘের আনাগোনা এখন জটলা পাকিয়ে ঘন হয়েছে। আজো কি বাবা আসবে না! বাবা! লোকটাকে বাবা বলে ডাকতে কেমন সংকোচ হয়ে। কেমন যেন খুব চেনা কিন্তু বড় অচেনা মনে হয় তাকে। টুকরো টুকরো কিছু স্মৃতি মনের আনাচে কানাচেতে উঁকি দিয়ে যায়, কিন্তু সেই স্মৃতিগুলো জোড়া দিয়ে একটা গল্প হয় না। শুধু কিছু আবছা আবছা স্মৃতি।

হঠাৎ পাশের জনের খোঁচায় রন্তু সম্বিৎ ফিরে পেল যেন, ছেলেটার দিকে তাকালো সে। ছেলেটি ইশারায় সম্মুখে ম্যাডামের দিকে তার দৃষ্টি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলো। নাসরিন ম্যাডাম কড়া চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছেন, কতক্ষণ তাকে ডেকেছেন আল্লাহ্‌ই জানেন। রন্তু ভয় পেল, নাসরিন ম্যাডাম খুবই ভালো একজন টিচার, ক্লাসের প্রতিটি বাচ্চাকে খুবই স্নেহ করেন। রন্তুকে কেন জানি ম্যাডাম খুব বেশী আদর করেন, সেই নাসরিন ম্যাডাম কেমন রাগী রাগী চোখে তাকিয়ে আছেন। রন্তু শুনলো ম্যাডাম তাকে কি যেন বললেন। সে ভয়ে কখন কেঁদে দিয়েছে নিজেও টের পায় নাই। শার্টের হাতায় চোখ মুছতেই ম্যাডামের গলার আওয়াজ তার কানে এল,

‘এই রন্তু কাঁদছিস কেন?’
‘না ম্যাডাম কাঁদছি না তো’
‘তাহলে চোখ মুছছিস কেন?’ বলে ম্যাডাম রন্তুর দিকে এগিয়ে এলেন
‘কি হয়েছে রন্তু? জানালা দিয়ে বাইরে কি দেখছিলি?’
‘আ...কা...শ...’
‘আকাশ! তুই আবার আকাশ দেখা শুরু করলি কবে থেকে?’ বলে নাসরিন ম্যাডাম জানাল দিয়ে বাইরের পানে চেয়ে দেখলেন আকাশে প্রচুর মেঘ জমেছে, ঝুম বৃষ্টি হতে পারে। দ্রুত বাচ্চাদের ছেড়ে দেয়া দরকার, তার ক্লাসই শেষ পিরিয়ড; তাই তিনি ছেড়ে দিলেই বাচ্চাদের ছুটি।

‘কিরে আকাশ দেখে কান্না করতে হয়?’ রন্তু মাথা নেড়ে অসম্মতি জানালো।
‘বাবা আসবে আজ?’ বলে নাসরিন ম্যাডাম মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন রন্তুর।
রন্তুর চোখে এবার যেন জলের বাণ ডাকলো। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। ম্যাডাম তাকে বসিয়ে ডেস্কে গিয়ে বাচ্চাদের আগামী দিনের হোম টাস্ক দিয়ে ছুটি দিয়ে দিলেন। আর ক্লাস হতে বের হবার সময় রন্তুকে গিয়ে বললেন,
‘তোর বাবাকে আমার সাথে দেখা করতে বলবি। ঠিক আছে? এবারো ভুলে যাস না যেন...’। রন্তু ঘাড় নেড়ে সম্মতিসূচক জবাব দিল।
‘আর হ্যাঁ, কথায় কথায় এতো কাঁদিস কেন? ছেলে মানুষদের এত কাঁদতে হয় না বোকা ছেলে, বুঝলি?’। এবারো রন্তু ঘাড় নেড়ে সম্মতিসূচক জবাব দিল। রন্তু নিজেও কাঁদতে চায় না, কিন্তু কোথা থেকে জানি শুধু কান্নারা চোখে চলে আসে।

আসলে রন্তুর ঠিকই মনে ছিল, গতবার বাবা যখন এল, সে ইচ্ছা করেই বলে নাই। তার লজ্জা করে, স্কুলের প্রতিটি টিচার, প্রতিটি ছেলে মেয়ে তার সমস্যার কথা জেনে গেছে। জেনে গেছে যে তার বাবা-মা আলাদা হয়ে গেছেন। সবাই কেমন দৃষ্টিতে যেন তার দিকে তাকায়, ম্যাডামরা কেমন যেন একটু বেশী বেশী আদর করেন এখন তাকে। রন্তুর খুব লজ্জা লাগে, খুব। সবাই কেমন করে যেন তাকায়, আর সেই তাকানো দেখলেই তার কান্না পায়। রন্তু তার বেঞ্চে বসে রইল, ক্লাসের সব ছেলে মেয়ে বের হয়ে গেলে পরে সে বের হলো। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেল স্কুলের মাঠ পেরিয়ে মূল ফটকের দিকে। মূল ফটক দিয়ে বের হয়ে সেই প্রতি দিনকার ঘুঘনিওয়ালা, আমসত্ত-আচার বিক্রেতা, মালাই আইসক্রিমওয়ালা বুড়ো চাচা আর চানাচুররর... বলে চেচাতে থাকা সেই চানাচুর মামা। সবার সামনেই ছেলেমেয়েদের ভীড়। সাথে রয়েছে বাচ্চাদের নিতে আসা বাবা-মা’দের ভীড়। এত্ত এত্ত ভীড় ঠেলে তার দু’চোখ তার বাবাকে খুঁজতে লাগলো।

রন্তু এখন ক্লাস টু’তে পড়ে। সে যখন স্কুলে ভর্তি হল, তার কিছুদিন পর থেকে সে তার মা’র সাথে নানাবাড়ী’তে থাকতে লাগলো। প্রথমে রন্তু ভেবেছিল তারা বেড়াতে এসেছে, কিন্তু কয়েকদিন পর যখন সে মাকে জিজ্ঞাসা করলো তারা বাড়ী কবে যাবে? মা তাকে ঠাস করে একটা চড় মেরে বলেছিল, ‘এটা কি বাড়ী না? এটা কি বস্তি? বদ ছেলে কোথাকার?’। রন্তু চড় খেয়ে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল, সে তখন কিছুই বুঝতে পারে নাই মা তাকে কেন চড় মারলো। ধীরে ধীরে রন্তু বুঝতে পেরেছে তারা আর তাদের বাসায় ফিরে যাবে না। বাবা-মা’র ঝগড়া হয়েছে, কিন্তু কেন তা রন্তু জানে না। সেই তখন থেকে রন্তু নানাবাড়ী’তেই আছে।

এই ক্লাস টু’তে উঠার পর থেকে হঠাৎ করেই বাবা মাসে দুয়েকবার রন্তু দেখতে স্কুল ছুটির পর স্কুল গেটে আসতে লাগলো। নানু তাকে একদিন ডেকে বলল, ‘শোন তোমার বাবা স্কুল গেটে আসবে আজ, তার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে। সে তোমাকে বাসায় দিয়ে যাবে’। সেই থেকে মাসে একবার কি দু’বার বাবা তার সাথে দেখা করতে আসে। বাবা আসলে রন্তুর কেমন যেন অদ্ভুত অনুভূতি হয়, সে চুপচাপ থাকে। বাবা কেমন গম্ভীর হয়ে তাকে প্রশ্ন করতে থাকে, পড়ালেখা করে কি না, দুষ্টুমি করে কি না, মা তাকে মারে কি না... আরও কত হাবিজাবি প্রশ্ন। রন্তু মিনমিন করে সে সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যায়।

বাবাকে দেখলে রন্তুর কেমন অস্বস্তি শুরু হয়, বাবা তার হাত ধরে যখন হাঁটতে থাকেন রাস্তা ধরে তার খুব ভালো লাগে তখন। সবচেয়ে মজা হয় বাবা যখন বড় রাস্তার খাবার হোটেলে নিয়ে গিয়ে তাকে পরাটা-মিষ্টি-দই খেতে দেয়। পরাটা তার খুবই পছন্দের খাবার, কিন্তু বাবার সামনে সেগুলো নিয়ে সে বসে থাকে। নাড়াচাড়া করে কিছুক্ষণ, কিন্তু মুখে দেয় না। বাবা তখন খুব রাগী রাগী মুখে ধমকে উঠেন, তারপর নিজ হাতে তার মুখে সেগুলো তুলে দেন। রন্তুর লজ্জা করে এত্ত মানুষের মাঝে এভাবে খেতে আবার কেমন এক ভালো লাগাও কাজ করে।

ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি শুরু হয়েছে, রন্তু কি করবে ভেবে না পেয়ে দৌড়ানো শুরু করলো বড় রাস্তাটার দিকে। প্রায় আধঘণ্টা হবে রন্তু স্কুল গেটে দাঁড়িয়ে ছিল, সারাক্ষণ তার খুদে চোখদুটি ছলছল দৃষ্টি নিয়ে বাবা নামের মানুষটিকে ইতিউতি খুঁজেছে। কিন্তু বাবা আজ আসেনি, গত মাসেও বৃষ্টির কারণে বাবা আসে নাই। পরপর দুমাস হল বাবা এলো না। রন্তু দৌড়ে বড় রাস্তায় এসে সেই খাবার হোটেলে ঢুকে পড়ল। প্রতিটি টেবিলে চোখ ঘুরিয়ে কোথাও বাবাকে না পেয়ে তার খুব কান্না পেল। চোখে হতে গড়িয়ে পড়া জল শার্টের ভেজা হাতায় মুছতে লাগলো। হোটেলে গেটে জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর মাঝ হতে একজন বলল,
‘এই খোকা কাঁদছো কেন?’

‘কই? কাঁদছিনাতো...’ বলে রন্তু সেই মানব জটলা ঠেলে রাস্তায় নেমে এল। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা রন্তুকে ভিজিয়ে দিতে লাগলো। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা রন্তুর ছোট ছোট অশ্রুকে গ্রাস করে নিতে লাগলো তার বিশাল জলাধারে। রন্তু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, কেন? সে নিজেও জানে না। এতো কান্না নয়, এ হল রন্তুর কালো আকাশ হতে ঝরে পরা বৃষ্টিকনা। রন্তুর জীবনের কালো আকাশে যে অনেক মেঘ জমেছে এই ছোট্ট সময়েই।


২.
বৃষ্টির ফোঁটাগুলো খুব তীক্ষ্ণ আজ, রন্তুর শরীরে সূচের ন্যায় বিঁধছে। একটু শীত শীত অনুভূতি, কিন্তু রন্তুর সেদিকে খেয়াল নেই। কিছুক্ষণ ফুঁপিয়ে কেঁদে এখন অনেকটা শান্ত সে। সামনে বৃষ্টির ঘোলাটে পর্দা ভেদ করে কোন সুদূর পাণে তার দৃষ্টি তা বোধগম্য নয়। একটানা বৃষ্টিতে সে ভিজে ভিজে হেঁটে চলেছে। হঠাৎ করে রাস্তার জমে থাকা পানির নীচের কোন এক খানাখন্দে হোঁচট খেয়ে সে পড়ে গেল এবং তখন বুঝি তার সম্বিৎ ফিরে এল। হঠাৎই তার খেয়াল হল তার ব্যাগের বইখাতা সব ভিজে একাকার। হায় হায় কি হবে এখন! ভাবতেই তার আবার কান্না পেতে লাগলো।

রন্তু খেয়াল করলো সে বাড়ীর রাস্তা ছাড়িয়ে অনেক দূর চলে এসেছে, সে আবার উল্টা পথে হাঁটা শুরু করলো। রন্তু নানু বাসায় আসার পর প্রথম কয়েকদিন মা অথবা নানু তাকে স্কুলে আনা নেওয়া করেছে। এরপর একটা বুয়া ঠিক করা হল, কিন্তু প্রথম দিনই ঘটনা ঘটলো। বুয়া রন্তুকে স্কুল থেকে আনতে দেরী করলো, আর রন্তু নিজে নিজে বাসায় চলে আসলো। মা আর নানু তাকে সেই কি বকাটাই না দিল! কিন্তু লাভ হল একটাই, রন্তুকে স্কুল থেকে আনা নেওয়া করার জন্য আর কাউকে কষ্ট করতে হল না। সে প্রতিদিন একা একা বাসা থেকে স্কুল যাওয়া আসা করতে লাগলো। যদিও প্রথম দিকে নানু আর মা তাকে রোজ সাবধান করে দিত, কারো সাথে রাস্তায় কোন কথা না বলতে অথবা কেউ কিছু দিলে যেন সে না খায় ইত্যাদি ইত্যাদি। এখন কেউ আর এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। রন্তু নিয়ম করে রোজ স্কুলে যায়, আসে।

বাসার দরজায় রন্তু খুব হালকা করে কড়া নারে, কলিং বেল পর্যন্ত তার হাত যায় না। অনেকক্ষণ কড়া নাড়ার পর গেট খুলল নানু, রন্তুকে দেখেই তিনি হা হা করে উঠলেন।
‘এই ছেলে তুই এই বৃষ্টিতে ভিজে এসেছিস কেন? তোর বাবা কই...?’ বলে নানু দরজার বাইরে কাউকে খুজলেন। কাউকে সেখানে খুঁজে না পেয়ে তিনি আবার রন্তুর দিকে দৃষ্টি দিলেন।
‘কিরে তোর বাবা আজ আসে নাই?’
রন্তু মাথা নিচু করে ঘাড় নেড়ে জানালো যে, বাবা আজ আসে নাই।
‘আমি এই জন্যই শায়লাকে বলি, ছেলেকে তার বাবা কেন মায়া দেখাতে স্কুলে আসবে। নিকম্মাটার যদি এতই ছেলের জন্য মায়া লাগে তো নিয়ে যা না তোর কাছে বাবা... সেই মুরোদতো নেই...’ নানু গজগজ করতে করতে ভেতরে চলে গেলেন।

রন্তুর এসব কথা শুনতে মোটেও ভালো লাগে না। নানু কেন জানি বাবাকে দুচোখে একদমই দেখতে পারে না, বাবার নাম শুনলেই কেমন রেগে যায়। বাবা সম্পর্কে খুব বাজে বাজে কথা বলতে থাকে। রন্তুর কেন জানি বাবার জন্য খুব মায়া লাগে। কেন? সে নিজেও জানে না। বাবাকে ঘিরে তার তেমন জমাট স্মৃতি নেই, কিন্তু তারপরও বাবার জন্য তার খুব মায়া লাগে।
হঠাৎ করেই নানুর গলার স্বরে রন্তু সজাগ হয়।

‘এই যে রাজপুত্র, নবাবজাদা... ব্যাগটা খুলে দেন। বইপত্রতো সব ভিজিয়ে ছারখার করে নিয়ে এসেছেন। এগুলো শুঁকোতে দেই, আর আপনি গিয়ে ভেজা জামা কাপড় পাল্টে দ্রুত গোসল করে আসেন। এইবার যদি জ্বর আসে... রন্তু... তোকে ঐ বড় রাস্তার পাশে মসজিদের গেটে শুইয়ে দিয়ে আসবো...’
নানুর কথা শুনে রন্তু ফিক করে হেসে দিল। নানু রেগে গেলে উল্টাপাল্টা কিসব যে বলে, শুনলেই রন্তুর খুব হাসি পায়।
‘এই বাঁদর কোথাকার, হাসছিস কেন? কি বললাম কথা কানে যায় না? হায় খোদা শায়লা নিজেও পুড়লো, আমাকেও পোড়ালো...’ বলে নানু গজগজ করতে করতে আবার ভেতরে চলে গেল।

রন্তু পায়ে পায়ে গোসলখানার দিকে গেল। জামা কাপড় খুলে কল ছেড়ে দিতেই বালতিতে জল পড়তে লাগলো, কেমন গরম মনে হচ্ছে কল হতে বের হওয়া জল জলগুলোকে। রন্তু খেয়াল করেছে বৃষ্টিতে ভেজার পর গোসলখানার জল কেমন গরম লাগে, কি আশ্চর্য! অন্যসময় কিন্তু এমন হয় না, কিন্তু বৃষ্টিতে ভেজার পরপরই কেন যেন এমন লাগে। রন্তু দ্রুত গায়ে ঝপাঝপ পানি ঢালতে লাগলো। দরজায় নানুর আওয়াজ পেয়ে রন্তু ঘুরে তাকালো। নানু তার জন্য শুকনো জামা কাপড় নিয়ে দাঁড়িয়ে। রন্তুর সাথে কিছুক্ষণ চেঁচামেচি করে, এখানে সাবান দাও, তো সেখানে ভালো মত পানি দাও... উফ! নানুর যন্ত্রণা ভালো লাগে না।

গোসল শেষ করে শুকনো জামা গায়ে দিয়ে রন্তু খেতে বসলো। মা’কে কোথাও দেখা গেল না। রন্তু খুব ভয়ে ভয়ে ছিল, মা তাকে না আজ মেরেই ফেলে। গত সপ্তাহে সে স্কুলের হোমওয়ার্ক করে নাই, ম্যাডাম ডায়েরিতে তা লিখে রিপোর্ট করে দিয়েছিল গার্ডিয়ানের সিগনেচার এর জন্য। রন্তু মা’কে সেই ডায়েরি দেখাতেই মা কেন জানি খুব ক্ষেপে উঠলো। রন্তুকে আচ্ছা মত চড় মারতে লাগলো, এমন মার রন্তু তার জীবনে কখনো আগে খায় নাই। মা একসময় রন্তুরকে মাটিতে ফেলে তার উপর বসে তাকে মারতে লাগলো। মায়ের নখের আঁচড় লেগে রন্তুর বাঁ চোখের নীচের দিকে ছড়ে গিয়ে রক্ত বেড়িয়ে গিয়েছিল। নানু এসে মা’কে না থামালে মা বোধহয় তাকে মেরেই ফেলতো। রন্তু দ্রুত খাওয়া শেষ করে বিছানায় চলে আসলো। তার কেমন যেন ঘুম পাচ্ছে।

ঘর অন্ধকার, কেমন যেন কালো একটা জগৎ। রন্তু’র ঘুম ভেঙ্গেছে এই কিছুক্ষণ আগে। প্রথমে সে কিছুতেই চোখ খুলতে পারছিল না, অনেক কষ্টে চোখ খুলল। পুরো ঘর অন্ধকার, এখন কয়টা বাজে? রন্তু ঠাওর করার চেষ্টা করল। সে স্কুল থেকে ফিরেছে দুপুর বারোটা নাগাদ। গোসল খাওয়া শেষে সে যখন বিছানায় গেল তখন দুপুরের আজান দিচ্ছে। ওমা! সে নিজে অবাক হল, কতক্ষণ ঘুমিয়েছে সে? এখন কি রাত হয়ে গেছে? সবাই কি ঘুমিয়ে পড়লো নাকি? রন্তু’র খুব শীত করছে। তার গায়ে কে যেন একটা পাতলা কাঁথা দিয়ে গেছে, মা অথবা নানু হয়তো। তারপরও রন্তুর খুব শীত শীত করছে। মা’র কথা মনে হতেই রন্তুর খুব ভয় হতে লাগলো। আজ সে স্কুল থেকে ফেরার সময় সব বইপত্র ভিজিয়ে ফেলেছে। গত মাসে অংক বইটা হারিয়ে ফেলায় মা তাকে কত বকাঝকা দিল, আর আজতো সে সব বইপত্র ভিজিয়ে ফেলছে। আজ আর তার রক্ষা নেই, ভাবতেই রন্তুর খুব কান্না পেল।

কান্না ভেজা চোখ মুছতেই তীব্র আলো চোখে লাগলো, চোখে আলোটুকু সয়ে আসতেই রন্তু দেখতে পেল তার মা এই ঘরে এসেছে। ভয়ে ভয়ে রন্তু মা’র মুখের দিকে তাকালো। মা রন্তুর পাশে বিছানায় বসে তার কপালে হাত রাখলো।
‘রন্তু সোনা, খুব জ্বর এসেছে যে? বৃষ্টিতে কেন ভিজলে?’ মা’কে খুব শান্ত এবং মিষ্টি দেখাচ্ছে। রন্তু কোন কথা বলল না।
‘আজো বাবা আসে নাই’ শায়লা’র কথায় রন্তু ঘাড় নেড়ে জানালো যে না আসে নাই।
‘রন্তু সোনা, বাবাকে তোমার খুব ভালো লাগে?’
‘জানি না...’
‘জানি না মানে কি? তোর বাবা, তোর তাকে ভালো লাগে কি না সেটা তুই জানবি নাতো কে জানবে? আমি?’
মায়ের কথা শুনে রন্তু ফিচ করে হেসে দিল।
‘এই যে জ্বর বাঁধালি, এখন যদি নানু তোকে সত্যি সত্যি মসজিদের গেটে দিয়ে আসে? তো কেমন হবে?’ মা কেমন দুষ্টুমি মাখা স্বরে বলল।
‘জানি না...’
রন্তুর উত্তর শুনে শায়লা একটু হেসে উঠলো।
‘কিরে তোর সব উত্তর কি আজকে ‘জানি না’ দিয়েই হবে?’
‘মা পাখাটা বন্ধ করে দাও না... শীত করে...’
‘ওমা, পাখাতো বন্ধই। দেখি জ্বর বোধহয় আরো বেড়েছে... দেখি জলপট্টি নিয়ে আসি...’ বলে শায়লা উঠে যেতে নিতেই রন্তু তার ছোট্ট হাত দুটি দিয়ে তাকে টেনে ধরলো।
‘মা... ওমা...’
‘আবার কি হল?’ শায়লা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে রন্তুর দিকে তাকালো।
‘আমি আর বৃষ্টিতে ভিজবো না, সত্যি... এইযে তোমায় ছুঁয়ে বললাম’
‘হুম বুঝলাম...’
‘মা আমার বইগুলো না সব ভিজে গেছে, তুমি আমাকে মেরো না। আমি আর বইখাতা নষ্ট করবো না’ বলেই রন্তু ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।

শায়লা ছেলের পাশে বসলো। রন্তু এখনো ফুঁপিয়ে কাঁদছে। শায়লা রন্তুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। জানালা দিয়ে দূরে ঐ আকাশে একটুকরো চাঁদ মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছে। কিন্তু আকাশে প্রচুর মেঘ থাকায় চাঁদ বারবার হারিয়ে যাচ্ছে মেঘেদের আড়ালে। শায়লার কাছে তার ছেলে রন্তু ঐ চাঁদের মত দামী। ঠিক হল কি ভাবনাটা? শায়লা নিজেকেই প্রশ্ন করে। ঐ চাঁদের জীবনে অমাবস্যা আছে, কলঙ্ক আছে। রন্তুর জীবনে সেগুলো আসুক শায়লা তা চায় না। কিন্তু না চাইতেও ঐ কালো মেঘের দল যেমন চাঁদটাকে ঢেকে দিচ্ছে, তেমনি রন্তুর জীবনেও না জানি কতশত কালো মেঘের দল ধেয়ে আসছে। ভাবতেই দুফোঁটা অশ্রুজল শায়লার চোখ হতে আবার ঘুমিয়ে পড়া রন্তুর গায়ে গিয়ে পড়ল।


৩.
শায়লাদের এই বাড়িটা একতলা। শায়লার বাবা সরকারী কেরানী ছিলেন, তাই পৈত্রিক এই ভিটায় তিনি কোন দালান তুলতে পারনে নাই। একতলা এই পুরানো আমলের বাড়ী’র মাঝখানে উঠান রেখে চারিদকে ঘরগুলো তৈরি হয়েছিল। উঠোনে এখনো একটা নারিকেল গাছ আছে, যা শায়লার দাদী নিজ হাতে লাগিয়েছিল। মোট চারটে ঘর চারদিকে রেখে মাঝখানে উঠোন। পূবপাশের ঘরটা শায়লার, বিয়ের আগে শায়লা এই ঘরটাতেই থাকতো। জাভেদের সাথে বিয়ের পর থেকে ঘরটা ফাঁকাই ছিল, শায়লার বড় ভাই ভাড়া দিতে চেয়েছিল কিন্তু মা দেয় নাই। শায়লার বিয়ের মাস ছয়েক আগেই তার বাবা মারা গেলেন। শায়লা কলেজে যাওয়া আসার পথে জাভেদের সাথে দেখা হত, জাভেদ কলেজের রাস্তায় বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিত। সেই থেকে কখন কীভাবে পরিচয়, পরিণয় এবং দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে। সব আজ কেমন ঝাপসা লাগে শায়লার কাছে।

রন্তু এখনো বেঘোরে ঘুমুচ্ছে, কাল রাতে জ্বর আরও বেড়েছিল, সারারাত মাথায় জলপট্টি দিয়ে দিয়ে পার করেছে। ছেলেটা যে কার মত হল আল্লাহ্‌ই মালুম। শায়লা বা জাভেদ কারো সাথেই ছেলের স্বভাব চরিত্র মিল খায় না। জাভেদের কথা মনে পড়তেই শায়লার মুখ ইস্পাত কঠিন হয়ে ওঠে। জাভেদ একটা মানুষ নয়, মানুষ নামের হিংস্র পশু সে শায়লার কাছে। বিয়ের আগে কতশত ভালোবাসার গান...! বিয়ের পর একে একে বের হয়ে আসলো তার আসল রূপ। অল্পতেই রেগে যাওয়া আর রাগলে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে শায়লার গায়ে হাত তোলা... এ ছিল নিত্যকার ব্যাপার। মজার ব্যাপার ছিল, রাগ কমে আসলে জাভেদের হাস্যকর আচরণগুলো। কতশত পাগলামি যে করতো, কানে ধরা, নিজেকে নিজে চড় মারা আরও কত কি। প্রথম প্রথম শায়লা খুব স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিলো ব্যাপারগুলোকে। অনেকের খুব রাগ থাকে, রাগ কমলে আনুশোচনা হয়; জাভেদকেও শায়লা তেমনই ভেবেছিল। কিন্তু দিন দিন অবস্থা খারাপের দিকে যেতে লাগলো, জাভেদের মধ্যে নতুন রোগ দেখা দিল সন্দেহ বাতিকগ্রস্থতা। অবস্থা এতটাই খারাপের দিকে গেল যে, একরাতে জাভেদ কুকুর-বেড়ালের মত পেটালো শায়লাকে, তুচ্ছ এক সন্দেহের কারণে। অমানুষিক প্রহারে শায়লা অচেতন হয়ে পড়েছিল, হঠাৎ চেতনা ফিরতে দেখে ঘর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। জাভেদ নিজে নিজের হাত থেতলে দিয়েছে। শায়লা দৌড়ে কাছে যেতেই তাকে হাসি মুখে বলল, ‘শায়লা দ্যাখো, এই হাত...এই হাত তোমার গায়ে তুলেছি আমি! তাই এই হাতকে শাস্তি দিলাম...’। এই বলে কেমন অপ্রকৃতস্থ মানুষের ন্যায় হাসতে লাগলো।

সেদিন সকালের আলো ফুটতেই শায়লা রন্তুকে নিয়ে মায়ের বাসায় চলে আসে। জাভেদ বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছে তাকে বুঝিয়ে ফেরত নিয়ে যেতে, কিন্তু শায়লা রাজী হয় নাই। সেই রাতে জাভেদের চোখে যে পশুর চাহনি দেখেছে সে, সেই চাহনিকে শায়লার বড্ড ভয়। বছর খানেকের মাথায় মিউচুয়ালি ডিভোর্স হয়েছে তাদের, জাভেদ কোনরকম ঝামেলা করেনি। মাঝে মাঝে স্কুলের গেটে এসে রন্তুকে দেখে যায়, কখনো-সখনো বাসার গেট পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে যায়।

শায়লা দ্রুত নিজের ব্যাগ গুছিয়ে রন্তুকে এক নজর দেখে নিয়ে বাসা হতে বের হল, গত আট মাস হল সে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে পারসোনাল এসিস্টেণ্ট এর চাকুরী করছে। কলেজের গণ্ডি না পেরুতেই বিয়ে, একাডেমীক কোয়ালিফিকেশন না থাকায় এর চেয়ে ভালো কিছু সে আশাও করে নাই। এই যবটাও পেয়েছে তার এক কাজিনের বাবার অফিসে, ঐ আঙ্কেলেরই পিএ হিসেবে। শায়লাদের বাসাটা একটু গলির ভেতরের দিকে, বড় রাস্তা পর্যন্ত গিয়ে রিকশা নিতে হয়। আজ লেট হয়ে গেছে, শায়লা দ্রুত পা চালাল।
রন্তু’র ঘুম ভাঙ্গলো বেলা দশটার পরে, এখন তেমন জ্বর নেই, কিন্তু কাশছে সমানে। ঘড়ির কাটা দশটা পেরুনো দেখে রন্তু চিৎকার করে নানুকে ডাকতে লাগলো। রন্তুর নানু ছিলেন রান্না ঘরে, দৌড়ে আসলেন...
‘এই ছাগল কোথাকার, এত চেঁচাচ্ছিস কেন?’
‘এখন কয়টা বাজে তুমি দেখনি? আমার যে স্কুল মিস হয়ে গেল...’
‘হয়েছে আমার স্কুলওয়ালা, এতোই যখন স্কুলের চিন্তা তখন বৃষ্টিতে ভেজার সময় মনে ছিল না? জ্বর বাঁধিয়ে উনি এখন স্কুলগিরি ফলাচ্ছেন’
রন্তুর মনে পরে গেল কাল বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে সে বাসায় ফিরেছে এবং জ্বর এসে হানা দিয়েছে তার শরীরে।
‘নবাবজাদা এখন কি জ্বর আছে?’ বলে নানু এগিয়ে এসে কপালে হাত দিলেন।
‘হুম, খুব অল্প। নে, এখন বিছানা থেকে ওঠ। দাঁত ব্রাশ করে হাত মুখ ধুয়ে আয়’

রন্তু বিছানা থেকে নামলো।

‘আর শোন নাস্তায় দুধ পাউরুটি... কোন ঘ্যানর ঘ্যানর করবি না খবরদার, নাইলে পিটিয়ে তক্তা করে দিবো।’
দুধ পাউরুটির কথা শুনেই রন্তুর গা গুলিয়ে উঠলো। ইয়াক, এসব মানুষ খায়? উহ... নানুকে নিয়ে আর পারা গেল না। রন্তুর জ্বর হলেই
তাকে এই বিচ্ছিরি খাবারটা খেতে দেয়, ধুর ভাল্লাগে না। রন্তু বাথরুমের দিকে পা বাড়ালো।

ফ্রেশ হয়ে নাস্তা শেষ করার পর রন্তুর হাতে কোন কিছু করার ছিল না, শুয়ে থাকতে আর ভালো লাগে না। এখনো হালকা হালকা শীত লাগছে, কিন্তু কেমন আরামও লাগছে। একবার ভাবলো ড্রইং খাতাটা নিয়ে বসে, কিন্তু মন টানলো না। সে চলে এলো ছাদের উপরে চিলেকোঠার ঘরে, ছোট মামার ডেরায়। শায়লারা দুই ভাই এক বোন। বড় ভাইয়ের পর শায়লা, আর শায়লার বছর পাঁচেকের ছোট আরেক ভাই। রন্তুর ছোট মামা শিবলি, ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পরে, রন্তুর খুব পছন্দের মানুষ ছোট মামা। ছোট মামার ঘরে ঢুকে দেখে মামা দুই বন্ধুকে নিয়ে দাবা খেলায় মশগুল। গুটি গুটি পায়ে মামার ঘরে ঢুকলো রন্তু।
‘আরে রন্তু সাহেব যে, কি খবর? জ্বর সাহেব কি আছেন না গেছেন?’
রন্তুর ছোট মামাটা না খুব মজার, রন্তুকে সব সময় সাহেব বলে ডাকেন। মামার বন্ধুগুলোও তাকে রন্তু সাহেব বলেই ডাকে।
‘গেছেন...’ বলেই রন্তু একটা হাসি দিল।
‘তো, ভালই চালাকি শিখেছিস তাই না? জ্বর বাঁধিয়ে স্কুল কামাই...’
‘মোটেও না, আমি স্কুল কামাই দিতে চাই নাই। মা-নানু কেউ আমাকে ঘুম থেকে ডেকে দেয় নাই।’
‘আহালে... আর তুই যে কাল বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর বাঁধালি’

রন্তু কোন উত্তর দিল না, সে একমনে মামাদের দাবা খেলা দেখতে লাগলো। কিছুদিন হল রন্তু ছোট মামার কাছ থেকে দাবা খেলা শিখেছে। মামা যখন একা থাকে, দুপুরের পরটায় বিকেলের শুরুর বেলা, তখন মাঝে মাঝে রন্তুকে নিয়ে দাবা খেলা শেখায়। রন্তু সবসময় তিন চালে মামার কাছে হেরে যায়। মামাটা না খুব পচা, প্রতিবার তাকে তিন চালে হারিয়ে দেয় শুধু। তবে মামার দোষ না, মামা প্রতিবার তাকে শেখায় কোন ঘুটি প্রথমে চাললে কখনো কেউ তিন চালে হেরে যায় না। কিন্তু রন্তু প্রতিবারই ভুলে যায় আর তিন চালে হেরে যায়।
মামার এক বন্ধু হঠাৎ বলল, ‘রন্তু সাহেব, কাল তোমার বাবাকে দেখলাম সকাল বেলা, বৃষ্টিতে এক দোকানে দাঁড়িয়ে’। বাবার কথা উঠতেই রন্তুর মনটা খারাপ হয়ে গেল, বাবার উপর খুব অভিমান হল। রন্তু যদি ভিজে ভিজে বাসায় ফিরতে পারে, বাবা কি ভিজে ভিজেই রন্তুর সাথে দেখা করতে আসতে পারলো না। রন্তু ছোট মামার ঘর থেকে ছাদে চলে এলো। সকালের রৌদ্রজ্জ্বল আকাশ, কিছু ধবধবে সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। কোন এক বাসা হতে কেউ লাল রঙের একটা ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। ঘুড়িটাকে দেখে রন্তুর মনে হল, সে যদি ঐ ঘুড়িটার মত উড়ে উড়ে ঐ সুদূর আকাশে হারিয়ে যেতে পারতো। অনেক দূরে, কোথায় তা রন্তুর জানা নেই।


৪.
আজ বেশ কয়েকদিন পর স্কুলে এসেছে রন্তু। দু’দিন জ্বরে ভুগেছে, এরপর মাঝে ছিল বৃহস্পতিবার, নানু বলল স্কুলে আজ আর যাওয়ার দরকার নেই, একেবারে সামনে রবিবার থেকে যেয়ো। টানা পাঁচদিন! পাঁচদিন স্কুল আসে নাই রন্তু, আর তাতেই তার কেমন কেমন যেন লাগছে। একটু কেমন যেন, ছোট্ট মাথায় সেই কেমন কেমনটা ধরা দেয় না। এখন টিফিন টাইম, ছেলে-মেয়েরা সব স্কুলের মাঠে ধুলো উড়িয়ে খেলছে। রন্তু মাঠের উত্তর পাশটাতে যে ছাতিম গাছটা আছে, তার তলায় বসে আছে। ইদানীং তার খেলতে মন চায় না, টিফিনের এই সময়টায় এই ছাতিম গাছের নীচে বসে থাকতে তার ভালো লাগে। বসে বসে রন্তু অনেক কিছুই ভাবে। এই যেমন ভাবছে কীভাবে ছোট মামাকে দাবা খেলায় হারানো যায়, পারলে তিন চালে। এরকম একেকদিন একেক ভাবনা আসে মনে। মাঝে মাঝে রন্তু ভাবে তার বাবা-মা আবার মিলেমিশে গেছেন, আর তাদের মধ্যে রাগ নেই, আড়ি নেই। যেমন তোতোনের সাথে এখন আর তার আড়ি নেই, মিল হয়ে গেছে। তোতোনের সাথে কি ঝগড়াটাই না হয়েছিলো রন্তুর!

টিফিনে রন্তু তেমন কিছুই একটা খায় না, ভোর বেলা নানু ঘুম থেকে উঠে তার জন্য নাশতা রেডি করে দেয়। অবশ্য শুধু তার জন্যই না, মা আর ছোট মামা’র জন্যও রেডি করে। এত্ত সকালবেলা এত্তগুলো খাবার খেতে মোটেও ভালো লাগে না রন্তু’র। নানুটা মহা দুষ্টু, জোর করে তাকে রোজ একগাদা খাবার খাইয়ে দিবে। আর তাই রন্তু স্কুলে টিফিন নিয়ে আসে না, যদিও নানু এক্ষেত্রেও জোরাজুরি করে অনেক। মাঝে মাঝে রন্তু’র আম্মু তাকে পাঁচ টাকা কি দশ টাকা দিয়ে দেয়, কিন্তু রোজ না। বেশীরভাগ দিনই রন্তু টাকাগুলো খরচ করে না, রেখে দেয় তার পুরোনো জ্যামিতি বক্সটার ভেতর। মাঝে মাঝে আমসত্ত্ব আর মালাই কুলফি খায়, এই দুটো খুব ভালো লাগে রন্তুর। ঘণ্টা বাজছে, টিফিন পিরিয়ড শেষ, সবাই ক্লাসের দিকে ছুটছে। পুরো মাঠ জুড়ে যেন ধুলোর তুফান।

ক্লাসে আসতেই রন্তু দেখল সবাই বই নিয়ে পড়ায় খুব ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে, ঘটনা কি? আজও! আবার! উফ... রন্তুকে বিমর্ষ দেখালো। এখন মারজিনা ম্যামের ক্লাস, উনি জেনারেল নলেজ ক্লাস নেন, সপ্তাহে দুইদিন, বৃহস্পতিবার আর রবিবার। প্রায় সপ্তাহেই তিনি হঠাৎ কুইজ নেন, আগের দিন বলে দেন না যে নেক্সট ক্লাসে কুইজ হবে। রন্তু গত বৃহস্পতিবার স্কুলে আসে নাই, তাই সে জানে না গত ক্লাসে কুইজ হয়েছল। আর জানলেই বা কি? ম্যাম কোথা থেকে যে উদ্ভট উদ্ভট সব প্রশ্ন করেন, কেউ বুঝে উঠতে পারে না। পুরো সাধারণ জ্ঞান বই পড়ে শেষ করে ফেললেও কোন লাভ হয় নাই, ম্যাম এই আচমকা টেস্টে যেসব প্রশ্ন করেন, সেগুলো ঐ বইগুলোয় খুঁজে পাওয়া যায় না। আর মজার ব্যাপার হল, ম্যাম পরে বোর্ডে সেইসব প্রশ্ন এবং উত্তর লিখে দেন। সেগুলো স্টুডেন্টদের তুলে নিতে হয় খাতায় এবং নেক্সট ক্লাসে সেগুলো তিনি পড়া ধরেন। আজ যেমন ধরবেন!

রন্তু চুপচাপ তার সিটে গিয়ে বসে রইল, পাশ থেকে তোতোন কয়েকবার তাকে ওর খাতা থেকে পড়তে বলল, কিন্তু রন্তুর মন চাইছে না। এইসব ছাইপাশ পড়তে ভালো লাগে না তার, আর এগুলো থেকে একটাও ফাইনাল এক্সামে আসবে না। আসবে সেই সাধারণ জ্ঞান বই থেকেই। একটু পর মারজিনা ম্যাম ক্লাসে এলেন, উনি সবসময়ই একটু দেরী করে ক্লাসে আসেন। ক্লাসে ঢুকেই তিনি বললেন, ‘এই যে লিটল লিটল বিচ্ছুরা, পড়া শিখে এসেছো?’ সবাই সমস্বরে উত্তরে জানালো হ্যাঁ। রন্তু বোকার মত ঘাড় নেড়ে না জানালো এবং মারজিনা ম্যামের তা চোখ এড়াতে পারলো না।
‘কি ব্যাপার রন্তু, ঘাড় নাড়ছো কেন?’
‘ম্যাম আমি গতদিন আসি নাই, তাই পড়া পড়ে আসি নাই।’
‘আচ্ছা তাই নাকি? ইয়েস, ইয়েস... গতদিন তোমাকে দেখি নাই। তো কোথায় গিয়েছিলে? মামা বাসা বেড়াতে? নাকি খালা বাসা?’ ম্যাম হেসে উঠলেন।
‘ম্যাম...জ্বর...জ্বর এসেছিলো...’
‘ও আচ্ছা! গুড গুড... ভালো বাহানা স্কুল কামাই দেবার। এখন বলো ইথুপিয়ার রাজধানীর নাম কি?’
‘ম্যাম জানিনা...’
‘না জানলেতো হবে না... যা ক্লাসের বাইরে গিয়ে নীল ডাউন হয়ে বসে থাক’

রন্তু মুখ গোঁজ করে দাঁড়িয়ে রইলো, সে মরে গেলেও এমনটা করতে পারবে না। বাইরে নীল ডাউন হওয়া মানে পুরো স্কুলের ছেলে মেয়েদের দেখা।

‘কিরে? কথা শুনিস না?’... মারজিনা ম্যাম কাছে এসে উনার ভয়াবহ শাস্তিটি দিলেন। দুই আঙ্গুলের মাঝখানে কাঠ পেন্সিল রেখে জোরে আচমকা চাপ দিলেন। মট করে একটা শব্দ রন্তুর চিৎকারের শব্দে ঢাকা পরে গেলো। ম্যাম রন্তুকে ছেড়ে দিয়ে অন্যদের দিকে মনোযোগ দিলেন। রন্তু তার আঙ্গুলের দিকে তাকিয়ে দেখে ফুলে টোল হয়ে আছে জায়গাটা, কেমন নীল হয়ে গেছে। প্রচণ্ড ব্যাথা হচ্ছে, ব্যাথায় রন্তুর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।

রন্তু ব্যাথা নিয়ে কোনমত ক্লাস শেষ করল, ক্লাশ শেষ হতেই ওয়াশরুমে গিয়ে অনেকক্ষন পানি দিল ফুলে ওঠা আঙ্গুলটায়। পরের দুইটা ক্লাস কোনমতে পার করলো, একটুও মন বসাতে পারে নাই ক্লাসে। ম্যাথ রন্তুর খুবই প্রিয় সাবজেক্ট, সেই ম্যাথ ক্লাসেই সে মনোযোগ দিতে পারলো না। আজ ছিল জ্যামিতির ক্লাস, আঁকাঝোঁকার সাথে গনিত, রন্তুর খুব ভালো লাগে। কিন্তু আজ সেই জ্যামিতি ক্লাসেও রন্তুর মন বসে নাই। স্যারের কোন কথাই যেন মাথায় ঢুকছিলো না। ছুটির ঘণ্টা পড়তে রন্তু যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো।

আজ অনেকক্ষণ রন্তু একা একা ক্লাসে বসে রইল। সব ছেলে মেয়ে বের হয়ে গিয়ে যখন প্রায় মাঠ ফাঁকা, তখন সে মেইন গেটের দিকে পা বাড়াল। হাতে খুব ব্যাথা হচ্ছে, মারজিনা ম্যামটা এমনই, কিচ্ছু বুঝতে চায় না। তার জ্বর ছিল শুনেও বিশ্বাস করলো না, তাকে শাস্তি দিয়ে দিল। স্কুল এক্সামে কিন্তু জেনারেল নলেজে রন্তুই হাইয়েস্ট মার্কস পায়। রন্তু হঠাৎ আকাশে ঘুড়ি দেখল, নীল-সাদা ডোরাকাটা ঘুড়ি। ঘুড়ি দেখলেই রন্তুর খুব ভালো লাগে, মনে হয় সে যদি ঘুড়ি হতে পারতো! তবে ঐ ঘুড়ির মত নীলাকাশে উড়ে উড়ে সুদূরে হারিয়ে যেত।

স্কুল গেট দিয়ে বের হতেই রন্তু খুব অবাক হল। রাস্তার অপর পাশে রন্তুর বাবা জাভেদ দাঁড়িয়ে আছে। বাবাকে দেখে রন্তু যারপরনাই খুশী হল, কিন্তু সাথে সাথে প্রচণ্ড অভিমানও হল। এতদিনে সময় হল বাবার, সেই দুই মাস আগে এসেছিলো, আর আজ এলো। রন্তুকে বাবার বুঝি আর মনে পরে না! অভিমান করে রন্তু বাবাকে না দেখার ভান করে সোজা হাটতে লাগলো।

জাভেদ কিন্তু রাস্তার অপর পাড়ে দাঁড়িয়ে ছেলের কাণ্ড দেখছিল। ছেলেকে হাঁটা আরম্ভ করতে দেখে দৌড়ে গিয়ে ছেলের হাত ধরতেই রন্তু ‘উফ’ করে উঠলো। সেই আঙ্গুলটায় জাভেদের হাতের চাপ পড়েছিল।
‘কি হল রন্তু, এমন করছো কেন?’
‘কৈ, কিছু হয়নিতো। তুমি কবে এলে?’
‘আমি কবে এলাম? তুমি কিন্তু গেট থেকে বের হয়েই আমাকে দেখেছো...’
‘নাহতো...!’ রন্তু কপট অভিনয় করলো।
‘আমার সাথে মিথ্যে কথা বলবে না রন্তু। আমি মিথ্যে কথা একদম পছন্দ করি না’

রন্তু কিছু বলল না। মনে মনে বলল, তুমি যে দুই মাস এলে না? তোমার জন্য গতদিন ভিজে ভিজে বাসায় গেলাম, তিনদিন জ্বরে ভুগেছি... তুমি খুব খারাপ বাবা, তুমি খুব খারাপ।

‘কি হল রন্তু? কথা বলছ না কেন? আমার রাগ উঠাবে না কিন্তু...”
কথাটা বলেই জাভেদ থেমে গেল। রন্তু কেমন হিংস্র চোখে তার দিকে তাকালো মনে হল? নাহ, এ হয়তো তার দেখার ভুল। ঐতো রন্তু, মাথা নিচু করে হাঁটছে তার সাথে সাথে, এখনো রন্তুর কচি সরু হাতটি তার হাতে ধরা। দীর্ঘ দুই মাস পর ছেলেকে দেখছে, শায়লাকে দেখেনা কত দিন? জাভেদের রাগ! তার রাগ তাকে শেষ করে দিল। স্ত্রী, ছেলে, সংসার... সব। সব তছনছ হয়ে আজ এক যন্ত্রণার জীবন সে ভোগ করছে। তার এই যন্ত্রণা কি কেউ বুঝবে? কেউ বুঝবে না। অথচ তারই সন্তান, রন্তু কি সুন্দর, শান্ত, চুপচাপ প্রকৃতির হয়েছে। জাভেদ ছেলের হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছে পিচ ঢালা পথ ধরে কোন অজানায়? এতো কাছে থেকেও সে আজ রন্তুর কত দূরে।


৫.
জাভেদ যে মেস বাড়িটায় থাকে তা মোটামুটি ভালোই বলা চলে, গতমাসে সে এখানে উঠেছে। এটাকে মেস বাড়ী বলা উচিত নয়, বাড়ী বলতে ঠিক যেমনটা বুঝায়, এটা ঠিক তেমনটা নয়। রুবেল নামের চাটগাঁও এর এক ছেলে ঢাকায় বদলী হয়ে এসেছে, প্রাইভেট ব্যাংকের চাকুরী, উঁচু পদে মোটা অংকের সেলারি। তাই বাধ্য হয়ে ঢাকায় আসতে হয়েছে। গুলশান-১ এ তার অফিস বলে, মহাখালী ওয়্যারলেস গেটের কাছের তিন রুমের এই ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে, তার একজন পার্টনার দরকার ছিল, টাকার সমস্যা না, সমস্যা ভদ্রলোক খালি বাসায় একা থাকতে ভয় পান। জাভেদের স্কুল ফ্রেন্ড মনিরও রুবেলের সাথে ঐ ব্যাংকে চাকুরী করে, তবে একটু নীচের পোষ্টে। যাই হোক, সেই সুত্র ধরে জাভেদের এই ফ্ল্যাটে ওঠা।

আগের কোন মেস বাড়ীতেই তার এডজাস্ট হচ্ছিল না, এক জায়গায় এক বোর্ডারের সাথে হাতাহাতি পর্যন্ত হয়েছে। মনির বলে, তার নাকি ধৈর্য কম এবং উগ্র মেজাজ আর রাগ; শায়লাও বলতো। কি জানি? জাভেদের মনে হয় কেউ আসলে তাকে বুঝতে পারে না, বোঝার চেষ্টা করে না। সে যে জিনিশগুলো অপছন্দ করে, তার চারিপাশের মানুষগুলো সবসময় সেই কাজগুলোই বেশী করে করবে। আর জাভেদ তাতে রিঅ্যাক্ট করলেই সে খারাপ হয়ে যায়, সত্যি আজব এই পৃথিবী!

আর এই এডজাস্ট করতে না পাড়ার জন্য আজ সে একা, সম্পূর্ণ একা, মুক্ত, পিছুটানহীন এক মানুষ, সুখী মানুষ। সুখী! সুখী কি তাকে বলা যায়? অথবা পিছুটানহীন? জাভেদ নিজেই মাঝে মাঝে নিজেকে বুঝতে পারে না। মাঝ রাতে যখন ঘুম ভেঙ্গে অবুঝ শিশুর মত সে ডুকরে কেঁদে উঠে, কেন? কোন অজানা কষ্টে। আগের মেসের রুমমেট একদিন মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে জাভেদকে কাঁদতে দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। কি হয়েছে জিজ্ঞাসা করতে বলেছিল দুঃস্বপ্ন দেখেছি। পিছুটান কি সে নিজে এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে না? নইলে কেন ছুটে যায় রন্তুর স্কুলে? সত্যি মাঝে মাঝে নিজের কাছেই নিজেকে বড় অচেনা লাগে জাভেদের।

এই মধ্য দুপুরে জাভেদের কিছু করার নেই। জাভেদ টুকটাক ব্যাবসা করতো আগে, বিয়ের আগে দিয়ে ভালোই জমে উঠেছিল ব্যাবসা। সব গুছিয়ে নিয়ে বিয়ে করেছিল শায়লাকে। কিন্তু বিয়ের পর থেকে কোন কিছু আর ভালো হতে লাগলো না। একটু আধটু মনোমালিন্য ধীরে ধীরে বাক-বিতন্ডতায় রূপ নিলো। রন্তু জন্মের পর কিছুদিন ভালোই চলছিল, এরপর কথায় কথায় ঝগড়া শুরু হল জাভেদ আর শায়লা’র মাঝে। জাভেদ মানসিকভাবে সারাক্ষণ ভীষণ অস্থিরতার মধ্যে কাটাতে লাগলো, ব্যাবসা গেল খারাপের দিকে। শায়লা তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর গ্রামের বাড়ীর সাথেও যোগাযোগ বন্ধ করে দিল, ব্যাবসা গুটিয়ে নিল। সব কিছুর সাথে গুটিয়ে নিল নিজেকেও। ব্যাংকে কিছু টাকা জমানো আছে তা দিয়ে এখন চলছে জীবন। একে কি চলা বলে? এতো জীবনকে বয়ে চলা।

জাভেদের চোখ গেল ফোনটার দিকে, রন্তুকে একটা ফোন করলে কেমন হয়? এতক্ষণে নিশ্চয়ই স্কুল থেকে ফিরে নাওয়া খাওয়া শেষ করে ফেলেছে ছেলেটা। জাভেদ ডায়াল ঘুরালো, ওপাশে রিং হচ্ছে।
‘হ্যালো?’ ফোন ধরেছে শায়লার মা। জাভেদ কোন শব্দ করলো না।
‘হ্যালো? এই কে? কথা বলছো না কেন?’
‘আমি জাভেদ...’
‘তুমি ফোন করেছো কেন?’ ওপাশ থেকে রাগী কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
‘একটু রন্তুর সাথে কথা বলতাম...’
‘দেখো, তোমাকে আগেও বলেছি, এখনো বলছি। রন্তুর প্রতি তোমার এই আলগা আদর দেখানো বন্ধ কর। ছেলেকেতো নিজের কাছে নিয়ে রাখার মুরোদ নেই, তবে এই আদিখ্যেতা কেন?’
‘না...মানে...’
‘রাখো তোমার মানে। আর তোমার কাছে এই ছেলে থাকলে সেও তোমার মত পাগলই হবে। শোন আজকের পর আর কখনো তুমি ফোন করবে না। আর স্কুলে গিয়ে ছেলের সাথে দেখা করার নামে দয়া করে রন্তুর মাথায় তোমার পাগলামির বীজ ঢোকানো বন্ধ কর...’ বলেই ভদ্রমহিলা খট করে ফোন রেখে দিলেন।

জাভেদ ঘরের লাগোয়া এক চিলতে বারান্দাটায় এসে দাঁড়ালো, চোখ জ্বালা করছে। প্রচণ্ড ক্রোধে মাথার রগগুলি দপদপ করছে। লোহার গ্রিলে প্রচণ্ড আক্রোশে ঘুষি বসিয়ে দিয়ে একদলা থুথু বাইরের রাস্তার দিকে ছুড়ে ফেলল। এই বিশাল পৃথিবীতে এতো নিঃসঙ্গতা কেন? কেন কেউ কেউ তার মত এতো একলা, এতো অসহায়। কেন জীবনের গল্পগুলো ছিঁড়ে যাওয়া বইয়ের পাতার মত এতো বেশী এলোমেলো হয়ে গেল।


৬.
প্রশ্নগুলো দেখে রন্তুর খুব হাসি পাচ্ছে, আজ থেকে স্কুল ফাইনাল শুরু হয়েছে। পরীক্ষা দিতে রন্তুর খুব ভালো লাগে, প্রিপারেশন যেমনই থাকুক না কেন, পরীক্ষা দেয়া তার কাছে একটা মজার খেলা। যে খেলায় হার-জিত আছে, পাশ করলে জিতে গেল আর ফেল হলে হার। আর প্রিপারেসশন ছাড়া পরীক্ষায়তো আরও বেশী মজা। কিন্তু রন্তুর খুব ভালোই প্রিপারেশন আছে, নানু আর মা’য়ের যন্ত্রণায় ভালো প্রিপারেশন না নিয়ে উপায় আছে? সারাক্ষণ শুধু পড় আর পড়। রন্তু ঘণ্টাখানেক পড়লেই যেখানে তার সব পড়া হয়ে যায়, সেখানে মা-নানু তাকে রোজ ঘড়ি ধরে রাতের বেলা ঘণ্টা তিনেক বইয়ের সামনে জোর করে বসিয়ে রাখে। রন্তু আর কি করবে? ভালো ছেলের মত বইয়ের সামনে বসে থেকে ভাবনার জগতে যায় হারিয়ে, যেমনটা রোজ টিফিন টাইমে স্কুল মাঠের ছাতিম গাছটার নীচে বসে ভাবনার জগতে হারায়।

আজ গনিত পরীক্ষা, প্রথমদিনই গনিত। অন্যান্যবার প্রথমে বাংলা-ইংরেজি হয়ে পরে গনিত পরীক্ষা হয়, এবার উল্টো নিয়ম, প্রথম দিনই গনিত। এতে অবশ্য রন্তুর কোন সমস্যাই হচ্ছে না, গনিত তার খুবই প্রিয় বিষয়। তার বইয়ের যে কোন অংক সে চোখের পলকে করে ফেলতে পারে। কিন্তু মা কখনোই একথা বিশ্বাস যায় না, জোর করে নিয়মিত রন্তুকে অংক করায়। উফ কি যে বিরক্তিকর... কিছু অংকতো দেখেই উত্তর বলে দিতে পারে সে আজকাল, মুখস্ত হয়ে গেছে। যদিও মুখস্ত করা রন্তুর পছন্দ নয়, কিন্তু একেতো সহজ সহজ অংক, তার উপর বারে বারে করা। রন্তুর ছোট মামা রন্তুকে ক্লাস থ্রি আর ফোর এর গনিত বই এনে দিয়েছে, লুকিয়ে লুকিয়ে ঐ বইগুলোর ম্যাথ করে অবসর সময়ে রন্তু। সেইগুলোও প্রায় সব করে ফেলেছে। এটা খুবই গোপন খবর, রন্তু আর ছোট মামা ছাড়া আর কেউ এই খবর জানে না। ছোট মামা রন্তুকে কথা দিয়েছে রন্তু যদি ছোট মামাকে দাবা খেলায় কখনো হারাতে পারে, তাহলে তাকে ক্লাস ফাইভের গনিত বইও এনে দিবে। আর তাইতো সে সময় সুযোগ পেলেই ছোট মামার রুমে চলে যায়, যদি একটু দাবা খেলা যায়। যদিও বা খেলার সুযোগ হয়, সে প্রতিবারই হারে, তাও মাত্র তিন চালে বেশীরভাগ সময়।

রন্তু অতি দ্রুত অংক করে যাচ্ছে, সবকটা প্রশ্নই অনেকবার করে তার করা আছে। এই প্রশ্নের প্রতিটি অংকই তার করতে মন চাচ্ছে, কিন্তু অপশন রয়েছে, যে কোন ৫টি বা ১০টি এমন করে দেয়া। ইচ্ছা থাকলেও সব প্রশ্নের উত্তর তার দেয়া যাবে না। ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যেই তার সব উত্তর করা শেষ হয়ে গেছে। খুব বিরক্তিকর লাগা সত্ত্বেও একবার রিভিশন দিয়ে নিল, প্রতি এক্সামের আগের রাতে মা বার বার কিছু কমন কথা কানের সামনে ঘ্যানর ঘ্যানর করবে, প্রশ্ন মনোযোগ দিয়ে লিখবে, সব উত্তর ঠিক করে লিখবে, হাতের লেখা যেন খারাপ না হয়, সব লেখা শেষ হলে কমপক্ষে তিনবার রিভিশন দিয়ে দেখবে কোন ভুল আছে কি না... । উফ! একবার রিভিশন দিতেই হাই উঠে রন্তুর, আর তিনবার!!!

রন্তু হাত ঘড়িটা দেখলো, দুই ঘণ্টা শেষ হতে মিনিট পাঁচেক তখনও বাকী। এই ঘড়িটা গত এক্সামে মা কিনে দিয়েছে, কালো রঙ্গের লেদার বেল্টের ঘড়ি, রন্তুর একটুও পছন্দ হয় নাই ঘড়িটা। আগের ঘড়িটা রন্তুর খুব পছন্দের ছিল, গত জন্মদিনে বাবা তাকে ঘড়িটা গিফট করেছিল। বাবা তখন সবেমাত্র তার সাথে মাসে দুয়েকবার করে স্কুল গেটে দেখা করতে আসা শুরু করেছে। জন্মদিনের দুইদিন আগে বাবা ঘড়িটা নিয়ে এলো। তাকে যখন বলল, “এটা তোমার জন্মদিনের গিফট” রন্তু অবাক হয়ে বলেছিল, “আমার জন্মদিনতো আজ নয়, আগামী পরশু...”। বাবা বলেছিল, “পরশু যদি তুমি না আসো স্কুলে, অথবা আমিই যদি না আসতে পারি...”। ঘড়িটা দেখে মা কিছুই বলল না, কিন্তু নানু মুখ গোমড়া করে রেখেছিল। তার কয়েকমাস পরই মা এই ঘড়িটা কিনে দেয়, আর বাবার দেয়া ঘড়িটা কোথায় যেন রেখে দিল। মা’কে কয়েকবার সেই ঘড়ির কথা জিজ্ঞাসা করেছে রুন্তু, মা বলে, “আছে আমার কাছে, নতুন ঘড়িতে কি সমস্যা?”

দ্বিতীয় ঘণ্টার ঢং ঢং শব্দ হতেই রন্তু সীট ছেড়ে উঠে খাতা হাতে ম্যাডামের দিকে এগিয়ে গেল খাতা জমা দিতে। ম্যাডাম খাতা জমা নিয়ে খুলে চেক করলেন সব উত্তর করেছে কি না? দেখে সন্তুষ্ট হলে পরে তাকে ক্লাসরুম ছেড়ে বের হতে পারমিশন দিলেন। রন্তু তার সীট হতে পেন্সিল-কলম-জ্যামিতি বক্স সব নিয়ে বাইরে বের হয়ে এল। জ্যামিতি বক্সটা একটু বড়, তাই পকেটে ঢুকে না। বাকী জিনিশগুলো পকেটে ঢুকিয়ে ফেলে জ্যামিতি বক্স হাতে স্কুল গেটের দিকে এগিয়ে গেল। রন্তু যখন ক্লাস হতে বের হচ্ছিল, সবাই কেমন অবাক আর ঈর্ষা নিয়ে তাকে দেখছিল। তার ক্লাসের সবাই জানে সে ম্যাথে খুব ভালো, তাই অনেকেই তাকে খুব হিংসেও করে।

পুরো স্কুল মাঠ ফাঁকা, পরীক্ষার দিনে এমনিতেও মাঠে কেউ খেলে না, দৌড়ায় না, সবাই এই কদিন খুব সিরিয়াস হয়ে যায়। রন্তুর খুব ইচ্ছে করছিলো পুরো মাঠ জুড়ে খুব জোরে দৌড়োয়, কিন্তু সেই ইচ্ছাকে দমন করে সে গেটের দিকে এগিয়ে গেল। এক ঘণ্টা আগে বাড়ী ফেরা, যদি ছোট মামা বাসায় থাকেতো তার সাথে এই সময়টা দাবা খেলা যাবে। রন্তু খুশীতে একা একাই হেসে উঠলো। স্কুলের মেইন গেট দিয়ে রাস্তায় বের হতেই রন্তু অবাক হয়ে দেখলো তার বাবা, জাভেদ, গেটের উল্টো দিকের রাস্ততায় একটা দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বাবাকে দেখে রুন্তু একটা মিষ্টি হাসি দিল যা সে সচরাচর করে না, আজ পরীক্ষা ভালো দিয়ে মনটা খুব উৎফুল্ল। বাবার কাছে যেতেই রন্তু দেখলো বাবাকে কেমন যেন বুড়ো বুড়ো দেখাচ্ছে। কয়েকদিনের না কামানো দাড়ি আর চোখের নীচের কালি, এই দুইয়ে মিলে জাভেদকে সত্যি সত্যি অনেক বুড়ো দেখাচ্ছিল। কেমন ঠাণ্ডা লেগে বসে যাওয়া কণ্ঠে জাভেদ ছেলের পরীক্ষার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে করতে হাঁটতে লাগলো। অন্যান্য দিনের মত আজ খাবার হোটেলে না নিয়ে গিয়ে, উল্টো দিকে হাঁটা শুরু করলো।
‘রন্তু চল শিশু পার্ক থেকে ঘুরে আসি, যাবে?’
‘হু...’
‘বাসায় মা-নানু বকবে নাতো?’
‘উঁহু...’
‘তা হলে চল যাওয়া যাক...’
একটা রিকশা ডেকে বাবা-ছেলে রিকশায় উঠে বসলো। রন্তুর খুব কান্না পাচ্ছে, বাবার সাথে এই প্রথম কোথাও বেড়াতে যাচ্ছে, কি যে আনন্দ হচ্ছে! আনন্দে কেন কান্না পায়? রন্তু জানে না। রিকশা নিউমার্কেট পেরুনোর সময় জাভেদ ছেলেকে নিয়ে নেমে পড়লো। ছেলেকে কোন একটা কিছু কিনে দিবে, কে জানে আর কখনো যদি দেখা না হয় ছেলের সাথে। রন্তু অবাক হল মাঝ পথে মার্কেটে কেন? বাবার মেজাজ-মর্জি বোঝা দায়। রন্তু খুশী মনে বাবার হাত ধরে হাটতে লাগলো। জাভেদের মনে হল রন্তু যেন কোন বলিষ্ঠ এক পুরুষালী হাত দিয়ে তার বাঁ হাতের কবজিটা ধরে রেখেছে। নীরবে যেন বলছে এ বন্ধন কভু ছিন্ন হবার নয়... কিন্তু জাভেদ জানে, জীবনের সব বন্ধন মিছে... সব মিছে মায়া...।


৭.
হালকা শীত পড়েছে, খুব ভোর বেলা এখন হালকা কুয়াশা দেখা যায়। এই হালকা কুয়াশা কেমন যেন একটা দৃষ্টি বিভ্রম সৃষ্টি করে। কখনো কখনো একজন মানুষ নিজের অজান্তেই হয়তও আরেকজন মানুষের হৃদয়ে এই কুয়াশার ন্যায় বিভ্রম তৈরি করে। শায়লার কাছে ইরফান একটা কুয়াশাচ্ছন্ন বিভ্রম বৈ অন্য কিছু কি? শায়লা নিজের কাছে নিজে প্রশ্ন করে করে দিন ক্ষয়ে যাচ্ছে। সেই সাথে একটু একটু করে খসে পড়ছে তার বিবেক-আবেগে’র বালি-পাথরের বাঁধ। আজকের এই শীত শীত সকালে মনটা খুব বিষণ্ণ, একেবারেই অফিস যেতে মন চাচ্ছে না।

শুরুতে ইরফানের সাথে সহকর্মী হিসেবে জাস্ট বন্ধুত্বপূর্ণ সৌহার্দ ছাড়া আর কিছু ছিলনা। শায়লা কোম্পানি এমডি’র পার্সোনাল এসিস্ট্যাণ্ট হওয়ায়, তার সাথে অফিসের সকল ডিপার্টমেন্টের উপরের দিককার পদস্থদের সাথে পরিচয় হতে থাকে। ইরফান হল ফাইন্যান্সের জিএম। আইবিএ থেকে ফাইন্যান্সে বিবিএ-এমবিএ করে লন্ডন থেকে সিএফএ করে এসেছে। এতো মেধাবী এবং ব্রিলিয়াণ্ট একটা লোক, কিন্তু তার আচার ব্যাবহার দেখে কেউ আঁচ করতে পারবে না। যেমন মিশুক, তেমনি মন খোলা আমুদে মানুষ। কখনো কখনো তার ডিপার্টমেন্টের এক্সিকিউটিভ লেভেলের কারো ডেস্কে বসে তাকে খোশ গল্প করতে পর্যন্ত দেখা যায়। আর তার সাথে প্রকৃতি প্রদত্ত পুরুষালী সৌন্দর্য তাকে করেছে হাজারের ভিড়ে আলাদা একজনে।

ফাইন্যান্সের কাজে ইরফানকে প্রায় রোজ দিনই বারে বারে এমডি স্যারের রুমে আসা যাওয়া করতে হয়। কখনো তার নিজের প্রয়োজনে, কখনো এমডি স্যার ডেকে পাঠায়। আর এই নিত্যদিনকার অফিসিয়াল কর্মব্যাস্ততার ফাঁকে ফাঁকে শায়লার সাথে ধীরে ধীরে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে ইরফানের। জবে ঢোকার আগে অফিসিয়াল পিএ’র চাকুরী নিয়ে নানান ভয়াবহ কাহিনী নানান জনের কাছে শুনেছিল সে। কিন্তু এই অফিসের পরিবেশ একেবারেই ব্যাতিক্রম। যাই হোক বন্ধুত্বের সম্পর্ক গাঢ় হতে হতে কখন যে অন্যদিকে মোড় নেয়া শুরু করলো, শায়লা বুঝতে পারে নাই। গতকাল ইরফান তাকে প্রপোজ করে বসেছে, শায়লা কোন প্রতিউত্তর না দিয়ে বাসায় চলে এসেছে। সেই থেকে শায়লার মনোজগৎ যেন এক আজব কুয়াশার ন্যায় ঘোলাটে ঘোরের মাঝে ডুবে আছে।

শায়লা খাটের এক প্রান্তে বসে ছেলে দেখছে। রন্তু বিছানায় উপুর হয়ে শুয়ে দুই হাতে ভর দিয়ে বই পড়ছে। ছেলেটার বার্ষিক পরীক্ষা চলছে, কিন্তু পড়া শোনায় এতটুকু মনোযোগ নাই। জোর করে ধরে ধরে পড়তে বসাতে হয়। পড়তে বসলে আধঘণ্টা-একঘণ্টায় তার সব পড়া শেষ। এতো ফাঁকিবাজ হয়ে যাচ্ছে দিনদিন ছেলেটা! কিন্তু পরীক্ষায় রেজাল্ট খুব একটা খারাপ করছে তা নয়, বরং আশানুরুপ। কিন্তু এখন থেকে পড়াশোনায় মনোযোগী না হলে উপরের ক্লাসে উঠার পর তার এডজাস্ট করতে সমস্যা হবে, পড়াশোনার লোডের সাথে টাইমিং এর সামঞ্জস্য করতে হিমশিম খাবে। কিন্তু এতোটুকুন ছেলে কি আর এতসব বুঝে। রন্তু’র দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শায়লা চোখ ভিজে উঠে। নিজেকে খুব অসহায় লাগছে, বড্ড বেশী অসহায়।

মা উঠে রান্না ঘরের দিকে যেতেই রন্তু হাফ ছেড়ে বাঁচলো। আজ কোন এক্সাম নেই, মাঝখানে একদিনের এই গ্যাপ যে কেন দেয় এক্সামগুলোতে রন্তু ভেবে পায় না। আজ সারাদিন নানুর ঘ্যানর ঘ্যানর শুনতে হবে, ‘রন্তু পড়, কাল এক্সাম’। রন্তু অবশ্য একটা বুদ্ধি বের করেছে, ছোট মামাকে সে তার দলে টেনেছে। ছোট মামার কাছে পড়া বুঝতে যাচ্ছে নানুকে এই বলে সে দশটার দিকে চলে যাবে ছোট মামার চিলেকোঠার ঘরটায়। মামা পড়া ধরবে, রন্তু সব পটাপট উত্তর দিতে পারলে মামার সাথে দাবা খেলা যাবে। রন্তু ঘড়ির দিকে তাকালো, এখন সকাল আটটা, মা নয়টার মধ্যে বেড়িয়ে যাবে। তারপরও আরও একঘণ্টা বই সামনে নিয়ে বসে থাকা... উফ!

রন্তুর খুব ইচ্ছা করছে বাইনোকুলারটা নিয়ে ছাঁদে যেতে। গত সপ্তাহে বাবা তার ম্যাথ এক্সামের দিন স্কুল গেটে দেখা করতে এসে তাকে নিয়ে ঘুরতে বেড় হয়। কথা ছিল তারা শিশু পার্ক যাবে, কিন্তু হঠাৎ করেই বাবা ডিসিশন চেঞ্জ করে কি মনে করে রিকশা ঘুড়িয়ে তাকে নিয়ে গেল নিউমার্কেট। সেখান থেকে এই বাইনোকুলারটা তাকে কিনে দিয়েছে। বাইনোকুলারটা রন্তুর খুব পছন্দ হয়েছে, খুব দূরের সব জিনিষই কত বড় হয়ে কাছে চলে আসে। রন্তু বাবাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘বাবা রাতের বেলা কি তারাগুলোও এটা দিয়ে দেখা যাবে?’। বাবা বলেছে না, তারা দেখতে টেলিস্কোপ লাগে। রন্তু একবার ভাবলো বাবাকে বলে, টেলিস্কোপ কিনে দাও তাহলে। কিন্তু তা কি আর রন্তু বলতে পারে? বাবা দেখা করতে আসলে রন্তুর কেমন যেন অদ্ভুত অনুভূতি হয়, খুব ভালো লাগে, খুব... কিন্তু কেমন এক জড়তাও কাজ করে। বাবাকে মনে হয় অনেক দূরে দাঁড়িয়ে থাকা খুব কাছের কোন একটা মানুষ।

ছোট মামা বাইনোকুলারটা খুব পছন্দ করেছে, মজা করে বলেছে আমাকে তুই এইটা দিয়ে দিলে আমি রোজ তোর কাছে দাবা খেলায় হেরে যাবো। মামাটা যে কি সব বলে না। তবে মজার কথা হল, মামা প্রমিজ করেছে রন্তুর এক্সাম শেষ হলে তাকে স্টেডিয়াম নিয়ে যাবে, বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলা দেখাতে। তখন নাকি খুব কাজে দিবে বাইনোকুলারটা। মামা অবশ্য আরও একটা কথা বলেছে, সেটা গোপন রাখতে হবে, কাউকে বলা যাবে না। এই বাইনোকুলার নিয়ে মামা কোথায় যেন পাখি দেখতে যাবে, কোন মতেই নানু যেন না জানতে পারে। রন্তু প্রমিজ করেছে, আর রন্তু’র প্রমিজ মানে...প্রমিজ।


৮.
হুট করে কোন কিছু বদলে গেলে কেমন যেন একটা অজানা অস্বস্তি লাগে সবারই। নিত্যদিনকার কর্মকাণ্ডের পূর্ব নির্ধারিত নির্দেশ যেন অবচেতনেই সবার মনে গেঁথে যায়। আর তাই এই নির্ধারিত কর্মযজ্ঞে ব্যাতয় ঘটলে মানুষ মাত্রই কেমন অস্বস্তি অনুভব করে। হুট করে মানিয়ে নিতে গিয়ে অনুভূত অদ্ভুত অচেনা এক অসামঞ্জস্য। রন্তুর ফাইনাল এক্সাম শেষ হয়েছে গতকাল। ফলে আজ সকালেও যখন প্রতিদিনকার মত ভোরবেলাই ঘুম ভেঙ্গে গেল, তখন রন্তু বিছানায় বসে ভাবতে লাগলো কি করা যায়। প্রথমে প্রতিদিনের রুটিনমত স্কুল যাওয়ার জন্য তৈরি হওয়ার উদ্দেশ্যে বিছানা হতে নেমেছিল; কিন্তু বাথরুম অভিমুখে যাওয়ার সময় মনে পড়ে গেল আজ স্কুল যাওয়ার তাড়া নেই। আজ শুক্রবারও নয়, তার উপর ফাইনাল এক্সাম শেষ হল গতকাল, তাই আজ কোন পড়ার চাপও নেই। তাই বিছানায় বসে বসে রন্তু কেমন যেন অথৈ সাগরে পড়ে গেল এই ভেবে ভেবে যে কি করা যায় এতো সকালে।

বিছানা হতে নেমে রন্তু গুটি গুটি পায়ে বাইরে বের হয়ে এল, সিঁড়ি বেয়ে ছাঁদের চিলেকোঠায় ছোট মামার ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালো। রন্তুর ছোট মামা শিবলি দরজা খুলে রেখে ঘুমায়। এই নিয়ে নানুর সাথে কতবার যে মামার ঝগড়া হয়েছে। ছোট মামা কিছুতেই দরজা বন্ধ করে ঘুমুতে পারে না; তার নাকি মনে হয় দরজা বন্ধ করে ঘুমালে সে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়বে আর কোনমতেই ঘর হতে বেড়িয়ে কাউকে ডাকতে পারবে না। শেষে তার লাশ নাকি দরজা ভেঙ্গে বের করতে হবে। অন্যদিকে নানুর কথা কোনদিন চোর-ডাকাত এসে সব লুটে নিয়ে যাবে, সাথে যাওয়ার সময় ছোট মামাকে খুন করে রেখে যাবে। যে মৃত্যুর ভয়ে দরজা খোলা রাখা, সেই মৃত্যু নাকি খোলা দরজা দিয়েই ঢুকবে মামার ঘরে। রন্তু বড়দের বেশীরভাগ কথাবার্তা বুঝতে পারে না। তাদের কথাবার্তার বেশীরভাগেরই কোন মানে নেই, রন্তুর ধারনা বড়দের বুদ্ধি একটু কমই হয়। কিন্তু তার স্কুলের টিচারদের তো বুদ্ধিমানই মনে হয়। রন্তু সবশেষে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে তা হল তার বাসার সবার বুদ্ধি কম, এমন কি বাবারও।

সেদিনের পর থেকে রন্তুর বারবার বাবার কথা মনে পড়ে, হঠাৎ করেই কেন যেন বাবার প্রতি মায়া জন্মেছে ছোট্ট মনের মণিকোঠায়। কিন্তু সেদিনের পর বাবার এখনও দেখা পায় নাই। অবশ্য এখনও মাসখানেক সময় পার হয় নাই। বাবাতো মাসে একবার দেখা করতে আসে। ইদানীং রন্তু তার আঁকার খাতায় বাবার একটা ছবি আঁকার চেষ্টা করছে, কিন্তু কিছুতেই পারছে না। বাবার চেহারা মনে করতে গেলেই কেমন গুলিয়ে যায় সব কিছু। কখনো বাবার চোখের জায়গায় মা’র চোখ চলে আসে। কখনো নানুর হাসি, কখনো ছোট মামার মুখের অবয়ব। রন্তুর ছোট্ট মাথায় ধরে না কেন এই বিভ্রম ঘটছে। আসলে যতটা কাছে থাকলে একটা মানুষের মুখচ্ছবি আমাদের হৃদয়পটে বসে যায়, ততটা সময় বাবার সাথে কাটানোর সৌভাগ্য রন্তুর হয় নাই। সেই চার বছর বয়সে বাবা-মা ঝগড়া করে আলাদা হয়ে গেলে পরে বিগত বছর দুয়েকের বেশী সময় ধরে রন্তু তার মা শায়লার সাথে আছে নানু বাড়িতে।

ছোট মামাটা কেমন কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে আছে, দেখে মনে হয় একটা কাপড়ের পুঁটলি। রন্তুর নানু ছোট মামাকে এভাবে ঘুমিয়ে থাকতে দেখলেই বলবে কাপড়ের পোঁটলা। রন্তুর তখন খুব মজা লাগে, সে মাঝে মাঝে মামাকে পোঁটলা মামা বলে ডাকে। মামার মুড ভালো থাকলে মামা কিছু বলে না, কিন্তু মুড খারাপ থাকলে রন্তু’কে ধরে কান মলা দিয়ে দেয়। রন্তু মামাকে ঘুম থেকে না তুলে ছাঁদে হাঁটতে লাগলো ধীর পায়ে। কুয়াশা পড়ে ছাঁদটা কেমন ভেজা ভেজা হয়ে আছে। হালকা বাতাস বইছে, তাই রন্তুর শীত শীত লাগছে। এখন মোটামুটি শীতকাল বলা যায়, মা রন্তুর গরম কাপড় বের করে দিয়েছেন। কিন্তু রন্তু মনে করে পড়ার কথা ভুলে যায়, আজ যেমন ছাঁদে আসার আগে মনে ছিল না। এখন আবার নীচে নামতে মনে চাচ্ছে না, কিন্তু শীতও ভালোই গায়ে লাগছে। রন্তুর শীতকাল মোটেও ভালো লাগে না, কারণ, শীত এলেই তার চামড়া শুকিয়ে ফেটে চৌচির হয়ে যায়। নানু বলে ‘ফাটা বাঙ্গী’, এই বলে তাকে খুব ক্ষ্যাপায়। আর শীত এলেই রন্তুকে রুটিন করে গ্লিসারিন, তেল, লোশন মেখে বাবু সেজে শীত কাপড় গায়ে চাপিয়ে ঘুরে বেড়াতে হয়। এতো আয়োজনের সময়টুকু রন্তুর খুবই যন্ত্রণাদায়ক মনে হয়। অবশ্য একবার সব শেষ করে ফিটফাট বাবু সেজে গেলে পড়ে ঘুরে বেড়াতে ভালোই লাগে। এখন খুব মিস করছে সেই ফিটফাট রূপ, ঠাণ্ডায় হাত-পা, নাক-কান যেন জমে যাবে। রন্তু ফের ছোট মামার ঘরে চলে আসলো, আস্তে করে মামার পাশে শুয়ে পড়ে মামার লেপের তলায় নিজেকে ঢেকে দিল।

‘কিরে, এতো সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে এখানে কেন?’ মামার কথায় রন্তু কিছুটা চমকে গেল, একটু কি ভয়ও পেল? সে ভেবেছিল মামা গভীর ঘুমে।
‘ঘুম ভেঙ্গে গেল যে...’
‘ঘুম ভেঙ্গে গেলে আবার জোড়া লাগিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে হয় এটা জানিস না?’
‘যাহঃ তা আবার হয় নাকি? কিসব যে তুমি বল না মামা...’
‘শোন রন্তু আমাকে ঘুমাতে দে, ঝামেলা করলে মাথায় একটা গাট্টা মারবো মনে থাকে যেন।’
‘ওমা! আমি কি তোমায় কিছু বলেছি নাকি? আমিতো ঠাণ্ডা লাগছিল বলে তোমার লেপের তলায় ঢুঁকে পড়লাম’
‘ঠিক আছে মুখ বন্ধ, যতক্ষণ ইচ্ছা বসে থাক, শুয়ে থাক... কিন্তু নো কথা... ওকে?’
‘ওকে...’ রন্তু বসে বসে ছোট মামার ঘরখানি দেখতে লাগলো। রাজ্যের জিনিসে মামার রুমখানি ঠাসা। এত্ত এত্ত বইপত্তর, তার সাথে নানান যন্ত্র, খেলার সরঞ্জাম, ম্যাগাজিন... আরও কত কি! কিন্তু রন্তুর কাছে ঘরটা খুব ভালো লাগে, মনে হয় তার যদি এমন একটা ঘর থাকতো! মামার দেয়ালে দুলতে থাকা ক্যালেন্ডারের পাতায় লাল রঙে ষোল তারিখ দেখে রন্তুর মনে পড়ল কাল বাদে পরশু দিনই ষোলই ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস! সাথে সাথে ছোট মামাকে হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে ঠেলতে লাগলো।

‘রন্তু! মারবো কিন্তু একটা গাট্টা... ঠেলছিস কেন?’
‘মামা... ষোল তারিখ...’
‘কিসের ষোল তারিখ?’
‘বিজয় দিবস...’
‘হুমম বিজয় দিবস, তো ধাক্কাচ্ছিস কেন?’
‘পতাকা লাগাবে না মামা?’
‘হুমম...’
‘কবে?’
‘উফ রন্তু ঘুমাতে দে... পতাকা আগামীকাল লাগাবো। আর একটা কথা বললে কিন্তু কান ধরে নীচে দিয়ে আসবো, আর আগামী এক সপ্তাহ উপরে আসার ভিসা ক্যান্সেল হয়ে যাবে’

মামার এই কথা শুনে রন্তু ভয় পেল, সে মামার ‘ভিস ক্যান্সেল’ শাস্তি খুব ভয় পায়। আর তাই চুপ করে কিছু সময় বসে থেকে ধীর পায়ে প্রায় নিঃশব্দে খাট থেকে নীচে নেমে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। ঘরে হতে বের হবে এমন সময় মামা লেপের তলা থেকে মাথা বের করে রন্তুকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘বিকেল বেলা রেডি থাকিস, চকবাজার যাবো পতাকা কিনতে’। বলেই কচ্ছপের মত আবার মাথাটা ভেতরে ঢুকিয়ে নিল। রন্তু খুশী মনে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আগত দুতিন দিনের সম্ভাব্য আনন্দমুখর দিনের কথা ভেবে ভেবে উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। কি কি করবে ভেবেই হয়রান হতে হতে হঠাৎ মনে হল, ইস... এসময় যদি বাবাও তাদের সাথে পতাকা সাজাতে চলে আসতো, তবে কতই না মজা হত। বাবার সাথে কখনো পতাকা সাজানো হল না রন্তুর। এরকম আরও কতশত না পাওয়ার অনুভূতি গড়ে উঠবে রন্তুর জীবনে বাবাকে ঘিরে? আগত সময়ই তা বলে দিবে। রন্তুদের জীবনে না পাওয়ার হিসেব করেই পাওয়ার হিসেব মিলাতে হয় যে।


৯.
কুয়াশাভেদ করে গুচ্ছ গুচ্ছ সূর্যকিরণ ছাদের উপর এসে পড়ছে, আকাশে লম্বা লম্বা ইয়া মোটা মোটা আলোর রেখাগুলো অদ্ভুত এক নকশা তৈরি করছে। রন্তু অনেকক্ষণ ধরে এই রোদের খেলা দেখতে লাগলো। ছাদের শেষ মাথায় টাঙানো বাংলাদেশের পতাকাখানি কেমন নেতিয়ে আছে, দূর থেকে ভেজা ভেজা মনে হচ্ছে। রন্তু বুঝতে পারলো সারারাতের কুয়াশায় ভিজে নেতিয়ে আছে পতাকাটি। গত পরশু বিজয় দিবস ছিল। তার আগের রাতে রন্তু তার ছোট মামার সাথে কি মজা করে রাতের বেলা ছাদে পতাকা সাজিয়েছে। পাটের চিকন দড়িতে ছোট ছোট লাল-সবুজের পতাকা একটা একটা করে আটকে দিয়ে পতাকার মালা বানিয়ে সারা ছাদজুড়ে সাজিয়েছে অনেক রাত পর্যন্ত। মা-নানু দুজনেই ছাদে এসেছিল রাতের বেলা। সবচেয়ে মজার কথা রাতের বেলা রন্তু ছাদে থাকার জন্য কোন বকাঝকা খায় নাই দুজনের কারো কাছ থেকে। ইস... রোজ রোজ কেন এমন হয় না। আজ সকাল বেলা ছাদে এসে বার বার তার এই কথাই মনে হচ্ছিল।

ভাল জিনিসগুলো সবসময় হুট করে শেষ হয়ে যায়, যেমন হাওয়াই মিঠাই। রন্তুর খুব প্রিয় ছিল হাওয়াই মিঠাই, কিন্তু এখন সে আর ওটা পছন্দ করে না। হুট করেই মজা শেষ হয়ে যায়। রন্তুর জীবনে আনন্দ অনেক কম বলেই কিনা জানা যায় না, সে ক্ষণস্থায়ী কোন আনন্দে আগ্রহ পায় না এই ছোট বয়সেই। ছয় পেরিয়ে সাতে পড়তে যাওয়া রন্তু কীভাবে যেন এই বয়সেই অদ্ভুত এক মানসিক জগত নিয়ে বড় হচ্ছে। ছোট শিশু মনে এগুলো ধরা না দিলেও তার কেমন নীরবতা’র প্রতি অদ্ভুত একটা টান তৈরি হয়েছে। আর আট দশটা ছেলেমেয়ের মত শিশুসুলভ চাঞ্চল্য তার মাঝে খুঁজে পাওয়া ভার। আজ এই সকালের প্রথম লগ্নে খোলা ছাদে কুয়াশার চাদরের নীচে দাঁড়ানো রন্তু’র ভাবনাগুলো একটু সচেতনভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে অতি অল্প বয়সেই কেমন অদ্ভুত এক পরিপক্ক মনোজগৎ গড়ে উঠেছে তার মাঝে।

রন্তু ধীর পায়ে পতাকা যে বাঁশটিতে টাঙানো হয়েছে তার নীচে গিয়ে দাঁড়ালো। তার ছোট্ট হাত দিয়ে বাঁশটিকে নাড়াচাড়া করে ভিজে নেতিয়ে পড়া পতাকাটিকে বাতাসে উড়ানোর চেষ্টা করল কিছুক্ষণ। শেষে ব্যর্থ হয়ে ছাদের পাঁচিল এর দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে চোখ দিল, এখনো মানুষজনের তেমন আনাগোনা আরম্ভ হয় নাই। ফাঁকা রাস্তা, নেতিয়ে পড়া পতাকা, বিজয় দিবসের উৎসবমুখর সময় শেষে আজকের সকালবেলার এই মনখারাপ করা সকালবেলা... সবকিছু মিলে রন্তু’র কেন যেন খুব মন খারাপ হল; সাথে খুব কান্না পেল। আর আজব করা ব্যাপার হল কান্না পেলেই রন্তুর ইদানীং খুব বাবার কথা মনে হয়। কেন এতো বাবাকে দেখতে ইচ্ছে করে?

সেদিন মা খাটে শুয়ে গল্প করতে করতে কি কারনে যেন হঠাৎ করেই রন্তুকে জিজ্ঞাসা করল তার কাকে সবচেয়ে বেশী ভালো লাগে? রন্তু কিছুই না ভেবে অকপটে বলে বসল, ‘বাবাকে...’। কিন্তু কথাটা বলেই মনে হল এই উত্তরে মা খুশী হয় নাই, কষ্ট পেয়েছে। রন্তুর তখন খুব মন খারাপ হয়েছিল, রন্তু মা’কে খুব ভালবাসে, খুব। কখনো মা’কে বুঝতে দেয় না। মা বাসায় থাকলে অদ্ভুত একটা ঘ্রাণ নাকে আসে রন্তুর, রন্তু এই ঘ্রাণের নাম দিয়েছে ‘মা ঘ্রাণ’। এই পৃথিবীতে রন্তু সবচেয়ে বেশী ভালোবাসে তার মা’কে। কিন্তু সেদিন মা কেন তার উপর অখুশী হল রন্তু ভেবে পায় না। তার বাবা’কে খুব ভালো লাগে এটা কি দোষের? বাবা মানুষটা কেমন অদ্ভুত! রন্তুর কাছে তার বাবাকে সিনেমার কোন নায়কের মত মনে হয়। মাঝে মাঝে যার দেখা পাওয়া যায় রন্তু’র স্কুল গেটে। কেমন গম্ভীর হয়ে থাকে, রাগী রাগী কণ্ঠে কথা বলে। রন্তুর কিন্তু বাবার সেই রাগী রাগী কণ্ঠস্বর শুনে খুব হাসি পায়, কিন্তু সে হাসি চেপে রাখে অনেক কষ্টে। সে এই হাসি চেপে রাখার একটা উপায় খুঁজে বের করেছে। তা হল দাঁত দিয়ে জিহবা চেপে রাখা। আর এটা করতে গিয়ে সে বাবা’র সাথে দেখা হওয়ার সময়টায় প্রায় কথাই বলতে পারে না। বাব খুব রেগে যায় সে কোন প্রশ্নের উত্তর না দিলে, তখন রন্তু খুব ভয় পেয়ে যায়। সেই রাগী বাবাকে রন্তুর খুব অচেনা মনে হয়, খুব অচেনা।

কিছুক্ষণ ছাদে মুখ গোমড়া করে ঘোরাঘুরি করে নীচে নেমে এল রন্তু। মা আজ অফিস যায় নাই, খাটে লেপের তলায় শুয়ে আছে, চোখ খোলা, ঘরের সাদা দেয়ালে কি যেন একমনে দেখে আছে। রন্তু চুপটি করে গিয়ে মায়ের পাশে বসল।

‘কিরে? এখনতো স্কুল নেই, রোজ সকাল সকাল উঠে যাস যে... ঘুম ভেঙ্গে যায় বুঝি?’
‘হুমম’
‘অভ্যাস... সবই অভ্যাস’ বলে মা কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেল। রন্তু মা’কে ইদানীং বুঝতে পারে না, কেমন অচেনা মনে হয়। কথা বলতে বলতে হঠাৎ করেই কেমন মুড বদলে যায়। রন্তু’র ছোট মন আর মস্তিস্ক এই পরিবর্তন ধরতে পারে না। রন্তু’র মা শায়লা, এক অদ্ভুত মানসিক দ্বিধা’র মধ্যে রয়েছে। দিন দিন সে অফিসের ফাইন্যান্সের জিএম, ইরফানের সাথে তার সম্পর্কটা বন্ধুত্ব থেকে এগিয়ে অন্য দিকে মোড় নিচ্ছে তা সে বুঝতে পারছে প্রতিনিয়ত টের পাচ্ছে। কিন্তু শায়লার মনে হয় তার কিছুই করার নেই, অজানা এক অদৃশ্য শক্তি তাকে টেনে টেনে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত সম্পর্কের দিকে প্রতিদিন হু হু করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কোন প্রতিরোধ করার শক্তি যেন তার নেই, নিয়তির লিখন যেন লিখে চলেছে শায়লার জীবনগাঁথা। সেই কৈশোর পেড়িয়ে তরুণী হওয়ার সময়টায় প্রেম করে পারাবারিক সম্মতিতে বিয়ে করেছিল জাভেদকে। কত ভালবাসার সেই সম্পর্ক! কিভাবে সব বদলে গেল? বদলে গেল জাভেদ, বদলে গেল সে নিজেও... বদলে গেল তাদের জীবনটাই। মাঝে মাঝে শায়লা ভাবে কি স্বপ্ন একেছিল আর কি বাস্তবে হয়ে গেল। কোথায় কতদূর চলে গেছে জাভেদ আর সেই সাথে তাদের সেই ভালবাসা; শুধু চিহ্ন হয়ে রয়ে গেছে তাদের সন্তান রন্তু।

শায়লা’র খুব কষ্ট লাগে তার ছয় বছরের ছোট্ট ছেলে রন্তুর জন্য। তাদের দুইজনের ভুলের কি চরম মাশুল এই শিশু রন্তুকে দিতে হচ্ছে। এই অপরাধবোধ শায়লা প্রতিদিনই কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে, আর সেই অনুতপ্ত ক্ষণগুলোতে খুব কষ্ট হয় শায়লার। আজ এই সকাল বেলা ঘুম ভেঙ্গেই খুব মন খারাপ হয়ে গেল। গতকাল ইরফান তাকে স্পেশাল লাঞ্চের দাওয়াত দিল, খুব নামকরা এক রেস্টুরেন্টে। আজ দুপুরে তাদের সেখানে খাওয়ার কথা, শুধু শায়লা আর ইরফান, ইরফান বলল স্পেশাল ট্রিট, তার পক্ষ থেকে শায়লাকে। শায়লা’র কেমন যেন অস্বস্তি লাগছিল, সে বুঝতে পারছিল বিশেষ কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে আগামীকাল দুপুরে। আর তাই আজ ঘুম ভাঙ্গতেই সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে আজ অফিস যাচ্ছে না। অসুস্থতার কথা বলে দিবে অফিসে ফোন করে। সে জানে ইরফান খুব অবাক হবে, কষ্ট পাবে, কিন্তু শায়লা ভেবে পাচ্ছে না সে কি করবে? চোখ জ্বালা করে অশ্রু’র দল উঁকি দিচ্ছে। এইসময় ছেলে এসে তার সামনে বসায় তার কষ্ট যেন আরও বহুগুন বেড়ে গেলে। ছেলেকে কাছে টেনে নিয়ে ছেলের মাথায় হাত বুলাতে লাগলো শায়লা। রন্তু মায়ের কাছ থেকে হঠাৎ পাওয়া বাড়তি আদর উপভোগ করতে লাগলো মায়ের গায়ে হেলান দিয়ে। সকালবেলার মন খারাপ ভাবটা হুট করেই কোথায় যেন হারিয়ে গেল, মনটা খুব ভাল হয়ে উঠল। শুধু একটা আক্ষেপ শিশু মনে জেগে রইল... এখন যদি পাশে বাবাও থাকতো, তবে কি ভালই না হত। রন্তু মনে মনে বলল, ‘এই যে বাবা, তুমি কি শুনছো? প্লিজ রাগ না করে চলে আস না এখানে... প্লিজ... প্লিজ... প্লিজ...’


১০.
মানুষের মন বড় আজব এক বস্তু, এর ভাবার্থ বোঝা বড় দায়। মন কখন কি ভাবে, কি করে, কোন পথে ধাবিত করে জীবনের গতিপথ তা ঠাওর করা বুঝি মানুষের কম্ম নয়। মানুষ হিসেবে সে শুধু পারে মন নামক এক পাষণ্ডের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে। খুব কম মানুষই এই শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে পেরেছে, যারা পেরেছে তারা মানব সমাজে দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে, হয়েছে বরেণ্য, স্বনামধন্য, সাধারণ থেকে অসাধারণ। কিন্তু শায়লার মত আটপৌরে জীবনের মানুষেরা সবসময় এই মনের কাছে হেরে গিয়ে বেঁচে থাকে, আর তাই মনের কাছে পরাজয়’কে নিয়তি হিসেবে ভেবে নিয়ে নিজেকে প্রবোধ দেয়।

গত তিনদিন হল শায়লা অফিস কামাই করছে, অফিসে ফোন করে জানিয়েছে অসুস্থতার কথা। এখনো সিক লিভ, ক্যাজুয়াল লিভ মিলে প্রায় বিশের উপর ছুটি পাওনা আছে তার, তাই এটা নিয়ে কোন দুশ্চিন্তা নেই। কিন্তু এমডি স্যার শায়লার উপর অনেক নির্ভর করেন, স্যার তাকে পিএ হিসেবে ট্রিট করেন না, আপন মেয়ের মতই স্নেহ করেন। তাই, অনেকটা নির্ভর করেন দৈনন্দিন কাজে শায়লার উপর। তাই সে অফিস মিস করলে এমডি স্যারের বড় অসুবিধা হয়ে যায়। শায়লা এটা জানে, তাই অফিস মিস করাতে খুব খারাপ লাগছে স্যারের জন্য। কিন্তু শায়লা নিরুপায়, সে নিজে বুঝতে পারছে মানসিকভাবে সে প্রচণ্ডরকম দ্বিধায় ভুগছে। ইরফানের স্বপ্নময় ভালবাসার হাতছানি তাকে প্রলুব্ধ করছে অতি গোপনে, কিন্তু বাস্তবতার ইস্পাত কঠিন দেয়াল তাকে বেঁধে রাখছে সারাক্ষণ।

গত তিনদিন হল একরকম বিছানাতেই আছে শায়লা, শীতের দিন বলে লেপমুড়ি দিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকতে খুব একটা খারাপ লাগছে না। কিন্তু সমস্যা হল শায়লার মা একটু অবাক হচ্ছে মেয়ের এই হঠাৎ পরিবর্তন দেখে। মেয়ের গায়ে জ্বর নেই, অন্য কোন শারীরিক অসুস্থতাও নেই, কিন্তু মেয়ে শরীর ভালো লাগছে না বলে তিনদিন হল অফিস যাচ্ছে না। শায়লার মা মহা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন, মেয়েকে কয়েকবার জিজ্ঞাসা করেও কিছু জানা যায় নাই। অফিসে কোন ঝামেলা হয়েছে কি না? বেশ কয়েকবার জিজ্ঞাসা করেছেন, মেয়ে প্রতিবারই বলছে কিছু হয় নাই। কাজ করতে করতে নাকি হয়রান হয়ে গেছে, তাই একটু রেস্ট নেয়া। উনি আর কিছু বলেন নাই মেয়েকে, কিন্তু উনি বুঝতে পারছেন কোথাও কোন একটা সমস্যা হয়েছে, মেয়ে তার কাছে লুকাচ্ছে। এতো সমস্যার মাঝে আবার নতুন কোন সমস্যা এসে দেখা দেয় এই চিন্তায় তার নিজেরও আর কিছু ভালো লাগছে না।

শায়লা নিজেও ভেবে পাচ্ছে না আসলে সে কাকে ফাঁকি দিতে বাসায় বসে আছে? তার এই লুকিয়ে থাকা’র কোন মানে নেই সে নিজেও জানে। কিন্তু সে যে নিজেই নিজের মনের কাছে হেরে বসে আছে। মনের আয়নায় নিজের মুখোমুখি দাঁড়াতে তার খুব ভয় হয়, সে জানে নিমিষেই ধরা পড়ে যাবে তার হৃদয়ের গোপন কুঠিরে ইরফানকে ঘিরে বইতে থাকা চোরাস্রোত। তবে একি নিজের কাছ থেকে নিজের লুকিয়ে বেড়ানো নয়। শায়লা এসব ভাবতে গেলেই তার মাথাটা ভীষণ যন্ত্রণা করছে। উফ... জীবনে কেন এতো কষ্ট, কেন?

“মা, তোমার কি আবার মাথা ব্যাথা করছে?” রন্তু ঘরের দরজার কাছ থেকে ভীতু ভীতু চোখে জিজ্ঞাসা করল। গতকাল মা তাকে কড়া করে একটা ধমক দিয়েছে, কানের কাছে ঘ্যানর ঘ্যানর না করার জন্য। তারপর থেকে রন্তু মা’কে এড়িয়ে চলছে, কখন জানি ধরে আবার মারতে আরম্ভ করে। নানু বলেছে, মা’র শরীর খারাপ করেছে, মা’কে জ্বালাতন না করতে। রন্তু খুব মজা পেয়েছে নানুর কথায়, মা’কে রন্তু জ্বালাতন করতে যাবে কোন দুঃখে? নানু’র কথার কোন আগা মাথা নেই... তবে রন্তু মায়ের মুখ দেখে বুঝতে পারছে মার শরীর খারাপ, সাথে মনও খুব খারাপ, অফিস যায় নাই কয়দিন ধরে।
“কেন? তুই কি ডাক্তার? মাথা ব্যাথার ওষুধ দিবি?” মা হেসে জিজ্ঞাসা করল। রন্তু একটু অবাক হল, গত দুইদিনে এই প্রথম মা’কে হাসতে দেখল।
“বড় হয়ে যদি ডাক্তার হই, তাহলে দিব”
“তার মানে ততদিন আমার মাথা ব্যাথা থাকবে?”
“আমি কি তাই বলেছি নাকি?”
“থাক থাক, তোকে আর বলতে হবে না। ছোট মামা বাসায় নাই?”
“উঁহু... একটু আগে বন্ধুদের সাথে বেড়িয়ে গেল।”
“হুমম...”
“আচ্ছা মা... ডাক্তার হওয়া কি খুব কঠিন? ছোট মামা বলেছে, ডাক্তারী পড়া নাকি খুব কঠিন?”
“কিভাবে বলি? আমিতো ডাক্তারি পড়ি নাই... কঠিন হলে কঠিন, তরল হলে তরল। এদিকে আয়তো রন্তু...”

মায়ের দিকে রন্তু এগিয়ে গেল, মায়ের পাশে খাটে বসল। শায়লা ছেলের হালকা কোঁকড়ানো চুলে হাত বুলিয়ে দিতেই মনে পড়ল জাভেদের কথা। ছেলের চুলগুলো হয়েছে ঠিক বাবার মত, ছেলের দৈহিক গড়নও বাবার মতই হবে। মুখের আদল পুরো বাবার মত, ঠিক যেন জাভেদের ছোট্ট একটা প্রতিকৃতি। কিন্তু ছেলের স্বভাব হয়েছে ঠিক বাবার উল্টো, শায়লা এতে কিছুটা হলেও নিশ্চিন্ত হয়, ছেলে বাবার মত মানসিক গঠনের না হলেই ভালো হয়। জাভেদের কথা মনে হলেই শায়লার চোখে এতো এতো স্মৃতি ছাপিয়ে একটি স্মৃতি ভেসে ওঠে, রক্তাক্ত হাত নিয়ে জাভেদের সেই ভয়ংকর হাসি ধরে রাখা মুখে বলা একটি কথা, “শায়লা দ্যাখো, এই হাত...এই হাত তোমার গায়ে তুলেছি আমি! তাই এই হাতকে শাস্তি দিলাম...”

রন্তু মায়ের কোলে ঘেঁষে বসে রইল চুপটি করে। মায়ের শরীরের মিষ্টি গন্ধ আর মায়ার ওমে বসে বসে সে এক কল্পনার জগতে হারিয়ে গেল। ইদানীং সে প্রায়ই এক খেলাটা খেলে, নিজের মনে সে বাবা আর মা’র সাথে কথা বলে। এই কথা কথা খেলাটা তার খুব ভালো লাগে। সে তার খেলা শুরু করে দিল...
“এই শুনছো, খুব মাথা ধরেছে, ঘরে কোন ট্যাবলেট আছে নাকি?” মা বলল বাবাকে উদ্দেশ্য করে।
“না নেই। শোন শায়লা, নিজে নিজে ডাক্তারি করে কোন ঔষধ খাবে না কখনো।” বাবা বলল।
“ইস... পণ্ডিত আমার। শোন রন্তুকে নিয়ে আজ একটু নিউমার্কেটের দিকে যেতে হবে” মা বলল বাবাকে উদ্দেশ্য করে।
“কেন? ও বুঝেছি... ওর জন্মদিনের ড্রেসটা আনতে তো?” বাবা রন্তুর দিকে চেয়ে মিষ্টি একটা হাসি দিল। মা দুই হাত দিয়ে মাথার দুই পাশ চেপে ধরল। রন্তু বাবা’র দিকে চেয়ে বলল,
“বাবা, তুমি মা’র মাথাটাতো একটু টিপে দিতে পার? তাই না?”
“না পারি না? তুমি দেখছ না আমার হাতে ময়দা মাখা... তোমাদের জন্য আলু-পরাটা বানাচ্ছি...”
“ইয়াক... আমি এটা খাই না...”
“তোমাকে কে দিচ্ছে...”
“ওমা! তুমি তো বললে তোমাদের জন্য বানাচ্ছি...”
“ঐটা তো কথার কথা”
“মা, ভালোই হল এখন থেকে বাবা রান্নাবান্না করবে, তুমি আর আমি আরাম করে খাব”

শায়লা ছেলের কথা শুনে খুব অবাক হল, রন্তু নিজের ভুল বুঝতে পেরে গুটিয়ে গেল। মনের ভেতরে কথা কথা খেলা খেলতে খেলতে কখনো জোরে কথা বলে ফেলেছে সে নিজেও টের পায় নাই। ইস... মা কি তাকে পাগল ভাববে? পাগল ছাড়া আর কে এমন উদ্ভটভাবে নিজের মনে কথা বলে? রন্তু মায়ের কোল হতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ছাঁদের দিকে দৌড় লাগাল। শায়লা হতভম্ব হয়ে বসে রইল, রন্তু নিজে নিজে কথা বলে সে আগেও খেয়াল করেছে। বিড়বিড় করে কি যেন বলে, শায়লার মা বলে বাবার মত পাগল হবে, হাজার হলেও বাবার রক্ত শরীরে, বংশের দোষ। শায়লার এসব শুনতে ভালো লাগে না, রন্তুর জীবনে কোন অমানিশার ছায়া সে দেখতে চায় না। কিন্তু রন্তুর আজকের কথা শুনে শায়লা বুঝতে পারছে ছেলে মনে মনে তার বাবাকে মিস করে খুব। না না বাবাকে নয়, একটা পরিবার মিস করে... যেখানে শায়লা আছে, জাভেদ আছে, রন্তু আছে, আর আছে মিষ্টি সুখের এতোটুকু পরশ... এতটুকু নয়... এত্তগুলান। কিন্তু সেই স্বপ্নের জীবনতো সেই অতীতে শুরুর আগেই শেষ হয়ে হারিয়ে গেছে কালের গহবরে। আজ কোথায় সে, কোথায় জাভেদ। এর বেশী আর শায়লা ভেবে উঠতে পারল না। দুচোখ বেয়ে অশ্রুধারা’র সাথে ডুকরে কেঁদে উঠলো সে চারদেয়ালের মাঝে।


১১.
আজ বহুদিন পর রন্তু এই হোটেলে ঢুকলো, সেই শেষবার বাবা যখন রন্তুর সাথে দেখা করতে এলো তারও আগে রন্তু এসেছিল এই হোটেলে। সেই বৃষ্টিভেজা দিনে, বাবাকে খুঁজতে অবুঝ শিশুমন রন্তুকে টেনে এনেছিল এই হোটেলে। সেদিন বাবাকে খুঁজে না পেয়ে অশ্রুসজল চোখে রন্তু এই হোটেলে থেকে বের হয়ে গিয়েছিল তুমুল বর্ষণের মাঝে। কিন্তু আজ রন্তু একা একা এসেছে, বাবার খোঁজে নয়, তার জ্যামিতি বক্সের ভেতরে জমানো টাকা দিয়ে মিষ্টি কিনতে। আজ রন্তুর রেজাল্ট দিয়েছে, বরাবরের মত ভালো রেজাল্ট করেছে। রেজাল্ট দেয়ার পরপরই তার মনে হয়েছে মিষ্টি কেনার কথা। বড়দের রেজাল্ট দেয়ার পর দেখা যায় কত মিষ্টি কেনা হয়, রন্তু’র শখ তার রেজাল্টেও মিষ্টি কেনা হোক। ইস... আজকে যদি বাবাটা দেখা করতে আসতো? কতই না মজা হত।

‘কি খবর রন্তু মিয়া, হাতে মিষ্টির প্যাকেট কেন?’
‘তুমি জানো না বাবা আজ আমার রেজাল্ট দিয়েছে’
‘ও হ্যাঁ তাইতো। তো কি ফেল করা হয়েছে নিশ্চয়ই’
‘বাবা!... আমি কখনো ফেল করেছি?’
‘ও হ্যাঁ তাইতো, রন্তু মিয়া তো খুব ভালো ছেলে, সে কখনো ফেল করতেই পারে না।’
‘বাবা তোমাকে না বলেছি আমাকে রন্তু মিয়া বলে ডাকবে না। মিয়া আমার নাম নাকি? বাসার দারোয়ান রহিম মিয়া চাচা’কে ডাকতে ডাকতে তুমি এখন আমাকেও রন্তু মিয়া ডাকছ... যাও তোমার সাথে কথা বলবো না’
‘আচ্ছা ভুল হয়েছে, আর রন্তু মিয়া বলে ডাকবো না। এখন থেকে তোকে রন্তু শেখ বলে ডাকবো, ঠিক আছে?’
‘আমি কি আরবের লোক নাকি বাবা, আমাকে শেখ বলে ডাকবে?’
‘ওমা! তুই দেখি আরবের লোকদের খবরও রাখিস’
‘হুমম... আমাদের সাধারণ জ্ঞান বইয়ে আরও অনেক কিছুই পড়ানো হয়। আমি আরও অনেক খবরই রাখি, হুহ...’

‘এই রন্তু কিরে একা একা বিড়বিড় করে কার সাথে কথা বলছিস?’ রন্তুর ছোট মামা শিবলি রন্তুর কাঁধে হাত রাখল, রন্তু কখন একা একা কথা বলতে বলতে বাসার কাছাকাছি চলে এসেছে সে নিজেও খেয়াল করে নাই। বাসার আগের বড় রাস্তার মোড়ে এখন রন্তু’র সাথে ছোট মামার দেখা। রন্তু খুব লজ্জা পেল, ছোট মামাও তাকে একা একা কথা বলতে দেখে ফেলল। কয়েকদিন আগে রাতের বেলা মা’ও দেখেছে। ছিঃ কি লজ্জা, সবাই তাকে পাগল ভাববে। রন্তু নিজের কাজে নিজেই খুব লজ্জিত হল। কিন্তু এই কথা কথা খেলা খেলতে রন্তু’র যে খুব ভালো লাগে। এই কাল্পনিক কথার জগতে রন্তু তার বাবা-মা’র সাথে তার স্বপ্নের কাল্পনিক এক জগত সাজায়, সেই জগত যেখানে রন্তু আর তার বাবা-মা তাদের নিজেরদের বাড়িতে অনেক সুখে বসবাস করছে।

রন্তু তার ছোট মামা শিবলির সঙ্গে একসাথে বাসায় ফিরল। নানু গেট খুলেই প্রশ্ন করল পাশ করেছিস? রন্তু’র মজা লাগলো। সে বরাবর ক্লাসে ফার্স্ট হয়ে আসছে, আর নানু সবসময় জিজ্ঞাসা করে পাশ করেছিস? নানু’র চিন্তা পাশ-ফেল নিয়ে, অন্য কিছুতেই নানুর কোন আগ্রহ নেই বুঝি। রন্তুর হাতে ছোট কাগজের প্যাকেট দেখে জিজ্ঞাসা করল, ‘এই ঠোঙায় কি?’। রন্তু নিচু স্বরে বলল, ‘মিষ্টি’। ‘ও... স্কুল থেকে দিয়েছে? বাহ ভালোই তো পাশ করলে মিষ্টিও দিচ্ছে ইদানীং স্কুলগুলো। ভালোই...’ রন্তু কিছু বলল না, নানুকে সত্যি কথা বললে নানু আবার বকাঝকা শুরু করে দিবে। তারচেয়ে আর কিছু না বলাই ভালো। রন্তু জামা-কাপড় ছাড়তে ভেতরের ঘরে চলে গেল।
রন্তু দুপুরের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল, বিকেল বেলা তার ঘুম ভাঙল। ঘুম থেকে উঠেই তার মন হল, আচ্ছা মাকে তো রেজাল্ট জানানো হয় নাই। মা কি বাসায় এসেছে? রন্তুর খুব ক্ষুধা পেয়েছিল, তাই আজ দুপুরের খাবার তাড়াতাড়ি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। সদ্য এই বিকেল বেলায় কিছু করার নেই রন্তুর। নতুন ক্লাসে উঠেছে, স্কুলে ভর্তি... নতুন বই কেনা... এগুলোর ঢের বাকী আছে। এখন এই ফাঁকা সময়ে রন্তুর কিছুই করার নেই। বিকেল বেলা ছাঁদে গিয়ে বসে রইল সে, ছোট মামা তার ঘরে নেই। ছোট মামা বলেছিল বিকেলে রন্তুর সাথে দাবা খেলবে, কিন্তু কোথায় গেল কে জানে?

রন্তুদের বাসার ছাদ থেকে পেছনের দিকের একটা মাঠ দেখা যায়, প্রায় দিনই রন্তু সেই মাঠের মাঝে ছেলেদের খেলা দেখে। এখন শীতকাল বলে ছেলের দল ক্রিকেট খেলছে, গরমের দিনে ফুটবল খেলতে দেখা যায়, চলে বর্ষা’র শেষ অবধি। এরপর একটু শীত শীত ভাব পড়লে শুরু হয় ক্রিকেট খেলার ধুম। ছোট্ট রন্তুর খুব ইচ্ছা হয় ঐ ছেলেপেলেদের সাথে মাঠে গিয়ে খেলতে, কিন্তু নানু বা মা কেউই তাতে সায় দেয় না। বলে আরও বড় হয়ে নাও, এখন ঐসব খেলায় যাওয়ার দরকার নেই। নানু বলে মজার করে, ‘ঐ ধামরা ধামরা ছেলেদের সাথে তুই খেলবি কি? তোকে এক কিক মেরে এই বাড়ীর ছাদে পাঠিয়ে দেবে’। রন্তু ছাদের রেলিঙ্গের দেয়ালে তার থুতনি রেখে খেলা দেখতে লাগলো।

শায়লা ছাদে উঠে দেখে রন্তু ছাদের রেলিঙ্গের দেয়ালে মাথা রেখে একমনে মাঠের দিকে চেয়ে আছে। দেখে বড়ই মায়া হল। ছেলেটা একা একা সারাদিন কাটায়, কোন খেলার সাথী নেই, নেই কথা বলার সাথী। শায়লার মা থাকে সংসারের কাজে ব্যস্ত, শায়লা অফিসে, শিবলির কলেজ না থাকলে যদি বাসায় থাকে তবে রন্তু ছোট মামা’র ঘরে গিয়ে সময় কাটায়। শিবলিও রন্তুকে খুব ভালোবাসে, খুব আদর করে, এইটুকু পিচ্চিটার সাথে দাবা খেলতে বসে পড়ে। মাঝে মাঝে ছুটির দিনে শায়লা ছাদে উঠে, এরকম বেশ কয়েকদিন সে আড়াল থেকে ওদের মামা-ভাগ্নের কথা শুনেছে। বড়দের মত কি রাশভারী কথাবার্তা এই পুচকেটার। শায়লার কলিজার টুকরা পুচকে সোনাটা।

শায়লা ধীর পায়ে রন্তুর কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। আস্তে করে নিজের বাম হাতটা রন্তুর কোঁকড়া চুলে বুলিয়ে দিল। রন্তু এতোটাই তন্ময় হয়ে খেলা দেখছিল যে কখন তার মা ছাদে এসেছে, কখন নীরবে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে টেরই পায় নাই। মায়ের হঠাৎ করে এই স্পর্শে সে ভীষণ রকমে চমকে গেছে। রন্তু হাসি মুখে মায়ের দিকে চেয়ে দেখল। মা ডান হাতে করে কতগুলো গ্যাসবেলুন ধরে আছে। রন্তু অবাক হল মা বেলুন নিয়ে ছাদে কেন? আজকে কি রন্তুর জন্মদিন? নে সেতো সামনের মাসে। তবে...
‘কি মা? বেলুন কেন?’
‘তোর জন্য নিয়ে এলাম... সুন্দর না?’
‘হুমম, সুন্দর। কিন্তু বেলুন দিয়ে আমি কি করব?’
‘এটাও একটা ভালো কথা। বেলুন দিয়ে কি করবি... এক কাজ করা যেতে পারে একটা একটা করে বেলুন ফুটিয়ে ফেল’
‘যাহ, শুধু শুধু বেলুন ফুটাতে যাব কেন? মা এগুলো কি গ্যাস বেলুন?’
‘হুমম, গ্যাস বেলুন। কেন?’
‘ওয়াও, তাহলে চল এইসব কটা বেলুন উড়িয়ে দেই।’
‘বেলুন উড়াতে মজা লাগে তোর?’
‘কি জানি কখনো উড়াই নি তো। মাঝে মাঝে আকাশে উড়ে যেতে দেখি। জানো মা কয়েকদিন আগে রাতের বেলা আগুন দেয়া গ্যাস বেলুন উড়েছিল আকাশে। ছোট মামা আর আমি দেখেছি। কি যেন নাম ছিল...’
‘ফানুশ... চল নীচে চল সন্ধ্যা হয়ে আসেছে।’

মায়ের সাথে ছাদ থেকে নামতে নামতে রন্তু দেখলো কে যেন আকাশে একটা লাল রঙের ঘুড়ি উড়িয়েছে। কেন জানি রন্তুর ঘুড়ি খুব ভালো লাগে, বিশেষ করে সুতো কাটা ঘুড়ি, যখন ছুটতে থাকে ঐ নীলাকাশে অজানা গন্তব্যের পাণে। আজকের এই গ্যাস বেলুনগুলোও ভালো লাগছে রন্তুর। তাহলে? গ্যাস বেলুন নাকি সুতোকাটা ঘুড়ি, কোনাটা বেশী ভালো লাগে তার? রন্তু নিজেও হয়ত জানে না, অথবা এভাবে ভাবে না। দুটোই বাঁধাহীনভাবে উড়ে যায় নীল দিগন্তপানে। কিন্তু দুটোই একসময় নেমে আসে পৃথিবীর বুকে। তবে গ্যাস বেলুন যতটা উপরে উঠে অবাক বিস্ময়ে পৃথিবীকে দেখার সুযোগ পায় সুতো কাটা ঘুড়ি কি ততটা পায়? কিন্তু রন্তু’র নিজেকে সুতো কাটা ঘুড়ি ভাবতে ভালো লাগে। একসময় সুতোর বাঁধনে নাটাইয়ের সাথে বাঁধা ছিল মায়াবী এক সম্পর্কের বাঁধনে, তারপর কোন এক ঝড়ে সম্পর্কের সুতো কেটে গিয়ে নীল আকাশের অজানা গন্তব্যে উড়াল দেয়া। পরিবার নামক নাটাইয়ের সাথে যে বাঁধনে রন্তু বাঁধা ছিল সেই বাঁধন ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে কি রন্তুও সুতো কাটা ঘুড়ি হয়ে ঘুরে বেড়াবে সমাজ নামক বিশাল আকাশে? সময়ই সব বলে দেবে...


১২.
মায়েদের গায়ে এক অজানা গন্ধ থাকে বোধহয় আর সেই গন্ধটি পায় শুধুমাত্র সেই মায়ের সন্তানেরা। এই গন্ধ এক মায়ার অদৃশ্য বন্ধনের গন্ধ, নাড়ির সম্পর্ককালীন যে গন্ধ মাতৃজঠর থেকে সন্তানের ইন্দ্রিয়ে বাসা বাঁধে। আশ্চর্য এক ঘোরলাগা মাদকতাময় সেই ঘ্রাণে প্রতিটি সন্তান খুঁজে পায় অপার্থিব এক সুখানুভুতি। এই মুহূর্তে রন্তু নিজ মনে মায়ের শরীরের সেই গন্ধটা উপভোগ করছে। ছোট্ট রন্তুর খুব ভালো লাগে মন ভালো করে দেয়া এই পরম প্রিয় গন্ধটি। রন্তু এই মুহূর্তে মায়ের হাত ধরে হাঁটছে নিউমার্কেটের ভেতরের পিচঢালা রাস্তা ধরে। মা সবসময় এই মার্কেটে শপিং করতে আসে। আজ রন্তু মায়ের সাথে এসেছে তার স্কুলের জন্য নতুন ড্রেস তৈরির মাপ দিতে। ছোট মামা যদিও মা’কে বলেছিল তার পরিচিত এক দোকানে নিয়ে গিয়ে জামা বানিয়ে দিবে, কিন্তু মা রাজী হয় নাই। সবসময় যে দোকান থেকে রন্তুর জামা তৈরি করিয়ে দেয় সেই দোকান থেকেই এবারো জামা বানাবে বলে মামাকে জানিয়ে দেয়।

রন্তু অবশ্য এতে খুব খুশী, কেননা মা’র সাথে যখনই নিউমার্কেট আসে মা তাকে নিউমার্কেট দুই নম্বর গেটের ফাস্টফুডের দোকান থেকে মেশিনে তৈরি কোণ আইসক্রিম কিনে দেয়। তাই এখান থেকে জামা বানালে দু’বার কোণ আইসক্রিম খাওয়া যায়, একবার মাপ দিতে যেদিন আসে আর আবার যেদিন জামা নিতে আসে। মা সবসময় জামা ডেলিভারি নেয়ার দিনও রন্তুকে নিয়ে আসে, নতুন জামা রন্তুর গায়ে চাপিয়ে দেখে নেয় সব ঠিক আছে কিনা? মা সবসময় রন্তু ধমক দেয়, রন্তু নাকি তালগাছের মত দিন দিন বড় হয়ে যায়। কোনদিন দেখা যাবে জামা’র মাপ দিয়ে গেল একরকম আর ডেলিভারি নেয়ার সময় সে বড় হয়ে যাওয়ায় তা আর তার গায়ে আঁটছে না।

শায়লা ছেলেকে নিয়ে হাঁটছে আনমনে। আজ তার মনটা ভালো নেই, ভালো নেই বলাটা বোধহয় ঠিক না, বলা যেতে পারে মেঘলা। বিষণ্ণ নয়, তবে তার খুব কাছাকাছি, সাথে এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি। গত কিছুদিন ধরে ইরফান আর তার সম্পর্ক নিয়ে অফিসে নানান কথা হচ্ছে, অথচ তেমন কোন সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক তাদের মাঝে আছে বলে সে মনে করে না। যদিও ইরফান আর শায়লা দুজনই দুজনকে পছন্দ করে, কিন্তু তাদের মাঝে আনুষ্ঠানিক কোন প্রেমালাপ হয়েছে এমনটা নয়, ইরফান তাকে আনঅফিশিয়ালি প্রপোজ করেছে এটা ঠিক। কিন্তু শায়লা কৌশলে সেই প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছে, এটা না করে তার আর কিই বা উপায় আছে। তার পেছনে ফেলে আসা জীবন, জাভেদের সাথে পেছনের স্মৃতিময় জীবন, স্মৃতিময় বলা যায় কি? স্মৃতি’র চেয়ে এখন বেশী মনে পরে দুঃস্মৃতির সময়গুলো। কত স্বপ্ন, কত ভালবাসার সম্পর্ক কিভাবে যেন কোন ফাঁকে দুঃস্বপ্ন আর যন্ত্রণার উপাখ্যান হয়ে গেল।

রন্তু’র মুখের দিকে চেয়ে শায়লা সব দুঃখ ভুলে থাকার চেষ্টা করে যায় অবিরত। মাঝে মাঝে খুব যখন অস্থির লাগে নিজের ভেতরটা, তখন মনে হয় এই কষ্টময় জীবন ছেড়ে দূরে কোথাও হারিয়ে যায়, অনেক দূরে। যেখানে তার কষ্টের অতীত ভুলেও উঁকি দিবে না কখনো। সেই অস্থির সময়ে মাঝে মাঝে ছোট্ট ছেলেটার উপর শায়লার খুব রাগ হয়, এই পিছুটান না থাকলে আজ তার জীবনটা কি আবার নতুন করে শুরু করা যায় না? কিই বা তার বয়স হয়েছে, এখনও ত্রিশ পেরোয়নি, তার সমবয়সী অনেক আত্মীয়া এখনো অবিবাহিত অবস্থায় হনহন করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর শায়লা কি না এই ছোট্ট সময়ে জীবনের সব রূপ দেখে যেন বুড়িয়ে গেছে। মনের এই দোলাচালের সময়ে যোগ হয়েছে ইরফান, না পারে ইরফানকে জীবনে টেনে নিয়ে আঁকড়ে ধরে নতুন করে সব শুরু করতে, না পারে তাকে ঝেড়ে ফেলে দিতে।
‘মা... মা... চশমা...’ চশমা’র দোকানের পাশ দিয়ে যেতে যেতে রন্তু শায়লা’র হাত নেড়ে ইশারা করল।
‘হুমম চশমা... তো কি হয়েছে’
‘তুমি বলেছিলে আমাকে চশমা কিনে দিবে’
‘কবে বলেছিলাম?’
‘রেজাল্ট যেদিন দিল... ওমা আজকে দাওনা কিনে...’
‘না... এই ছেলে তোর কি চোখে সমস্যা হয়েছে যে তুই চশমা পড়বি? এইটুকুন বয়সেই চশমা শখ। বড় হয়ে নে, তখন দেখবি এমনি এমনি চোখে চশমা দিতে হবে’
‘কেন? বয়স হলে কি চশমা পড়তে হয়? তো তুমি, ছোট মামা... তোমরা পড় না কেন?’
‘আমাদের চোখের পাওয়ার অনেক ভাল, তাই’
‘আমারও চোখের পাওয়ার ভাল’
‘তাহলে তো হলই, নো চশমা। চশমা হল চোখের সমস্যার জন্য বুঝেছিস’
‘হুমম... কিন্তু তুমি বলেছিলে আমায় চশমা কিনে দিবে’ রন্তু গাল ফুলিয়ে কথাগুলো বলে গম্ভীর হয়ে গেল। ছেলের জামার মাপ দিয়ে শায়লা মার্কেটে একবার চক্কর দিচ্ছিল। এই বিকেলবেলা বাসায় গিয়ে আর কি করার আছ? সেই চারদেয়ালে বন্দী হয়ে বসে থাকা। তারচেয়ে নিউমার্কেটের এই খোলামেলা চত্বরে ছেলেকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে ভালোই লাগছে। রন্তুকে নিয়ে দুই নাম্বার গেটের ফাস্টফুডের দোকানের দিকে হাঁটা আরম্ভ করতেই শায়লার নজরে এল। ইরফান দুই নাম্বার গেটের সেই ফাস্টফুডের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। শায়লা’র সাথে চোখাচোখি হতে সুন্দর করে একটা হাসি দিল, এই হাসি দেখলেই শায়লার বুকে একটা তরঙ্গ খেলে যায়। কিন্তু কেন? শায়লা কখনোই চায় না এমনটা হোক, তবু ইরফান তার সামনে আসলেই তার ভেতরে এই তরঙ্গের খেলা শুরু হয়ে যায়। অফিসে যখনই সে ইরফানের মুখোমুখি হয়, সে নিজেকে চেষ্টা করে স্বাভাবিক রাখতে। তার মনে হয় এই বুঝি তার আশেপাশের সবাই জেনে যাচ্ছে, সবাই তার প্রতিটি হৃদস্পন্দন শুনতে পাচ্ছে।

আর এখনতো ছেলে রন্তু সাথে রয়েছে। শায়লা’র কেন যেন খুব রাগ হচ্ছিল, ইরফান কেন এখানে এল? শায়লা আজ অফিস থেকে একটু আগে বের হয়েছে, সে যখন এমডি স্যারকে বলছিল আগে বের হয়ে যাবে আজ, ছেলেকে নিয়ে নিউমার্কেট যেতে হবে; তখন ইরফান সেখানে ছিল। আর সেই সুযোগটা সে নিয়েছে। গত সপ্তাহ দুয়েক শায়লা ইরফানকে যথা সম্ভব এড়িয়ে চলেছে। এতদিন দুজনার ভালো লাগা দুজন জানতো, অনুভব করতো, কিন্তু মুখ ফুটে কেউ কাউকে কিছু বলে নাই। কিন্তু সপ্তাহ দুয়েক আগে ইরফান যখন শায়লাকে সরাসরি তার মনের কথা বলে ফেলল, কেন জানি শায়লা’র কাছে ভালো লাগেনি। অদ্ভুত মানুষের মন, শায়লা কেন ব্যাপারটায় অসন্তুষ্ট সে নিজেও বুঝতে পারছে না। সে শুধু জানে, তার ভালো লাগেনি। ইরফান শায়লার মনোভাব বুঝে সরি বলেছে বেশ কয়েকবার, অফিসের বাইরে শায়লার সাথে দেখা করতে চেয়েছে, কিন্তু শায়লা সবসময়ই তা এড়িয়ে গেছে। শায়লা নিজের মনের এই দ্বৈত আচরণে নিজেই খুব মনঃকষ্টে আছে। সে নিজেকে সময় দিতে চায়, নিজের মনের সাথে তার আরও বোঝাপড়া করার দরকার আছে। ইরফান বুঝতে পারেছে না, ইরফানের এই অতি আগ্রহী হয়ে ওঠাটা শায়লার ভালো লাগছে না। সময়ের স্রোতে যদি তাদের গন্তব্য একই ঘাটে হয়ে থাকে, তবে তাই হবে। অন্যথায় না...

শায়লা রন্তুকে নিয়ে ফাস্টফুডের দোকানে পৌঁছতেই ইরফান এগিয়ে এল তাদের দিকে। শায়লা নিজেকে সামলে নিয়েছে মনে মনে, রন্তুর সামনে কোন ধরণের রিঅ্যাক্ট করা যাবে না। শায়লা জানে, তার ছেলে ছোট্ট হলে কি হবে, এই বয়সেই তার মানসিক গঠন অনেক পরিপক্ক। ছেলে বুঝতে পারে অনেক কিছুই, যা তার সমবয়সী ছেলেমেয়েরা বুঝবে না।
‘আরে ইরফান স্যার, আপনি এখানে’ শায়লা ইরফানকে দেখে অবাক হবার ভান করল।
‘এইতো, অফিস শেষে কিছু কেনাকাটা করতে চলে এলাম’
‘অফিস হতে এই মার্কেট একটু উল্টো পথ হয়ে যায় না? মৌচাক মার্কেটতো আপনার বাসার পথে... বিশেষ কিছু কেনাকাটা ছিল বুঝি...’ শায়লা ইচ্ছে করে ইরফানকে অপ্রস্তুত করে দিল।
‘হ্যাঁ, কিছু বই কেনার ছিল, নিউমার্কেট ছাড়া অন্য কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না বইগুলো।’
‘আমি এলাম ছেলের স্কুলের জামা বানাতে দিতে। রন্তু আঙ্কেলকে সালাম দিয়েছো?’ শায়লা রন্তুর দিকে চাইতে রন্তু ইরফানের দিকে ফিরে হাত তুলে সালাম দিল। ছেলের সালাম দেয়ার ভঙ্গি দেখে শায়লা হেসে ফেলল, তার সাথে ইরফানও হেসে উঠলো।
‘তো রন্তু, স্কুলের নতুন জামা বানাতে দেয়া হল?’
‘হুম...’
‘এখন কি কোণ আইসক্রিম খাবার পালা’
‘হুম...’
‘আমাকেও কি একটা আইসক্রিম খাওয়াবে তোমাদের সাথে?’
‘হুম...’
‘ওমা! তুমি কি সব কথার উত্তর ‘হুম’ দিয়েই দাও?’
‘হুম...’

রন্তুর হুম... শুনতে শুনতে আবারো শায়লা আর ইরফান হেসে উঠল। তাদের অজান্তেই পরিবেশটা হালকা হয়ে গেল। ইরফান তিনটে মেশিন কোণ আইসক্রিম এর অর্ডার দিয়ে রন্তুর কাছে এসে দাঁড়ালো। ঢাকা শহরে এখন এই দোকানেই একমাত্র মেশিন কোণ আইসক্রিম পাওয়া যায়। ইরফানের খুব পছন্দের জায়গা, শায়লারও... তবে তারা দুজনে কখনো একসাথে আইসক্রিম খায় নাই বাইরে কোথাও। আজ ইরফানের সাথে এই বিকেল বেলা নিউমার্কেটের এই চত্বরে কোণ আইসক্রিম খেতে খেতে শায়লা ভুলে যায় তার অতীত, তার দুঃখগাঁথা পেছনের জীবনের কথা। ইরফানকে ঘিরে মনে মনে কতশত কল্পনার খেলা তখন দানা বাঁধতে শুরু করেছে শায়লার হৃদয়ের গোপন ঘরে। এদিকে ইরফান ব্যস্ত রন্তুকে ঘিরে।
‘রন্তু কোণ আইসক্রিম নাকি চকবার আইসক্রিম কোনটা বেশী মজার বলতো?’
‘কোণ আইসক্রিম’
‘ওমা তুমি দেখি ‘হুম’ ছাড়াও কথা বলতে পার!’

রন্তু লজ্জা পেয়ে মাথা নামিয়ে নিল। লজ্জা পেয়েছে কিন্তু কথা বলার জন্য না। ইরফানকে কেন জানি রন্তুর বাবা বলে মনে হচ্ছে। বাবা তাদের সাথে থাকলে এমন করে হয়ত কথা হত রন্তুর সাথে। শেষ যেদিন বাবা স্কুলে দেখা করতে এল, সেদিন স্কুল হতে বাবার সাথে এই নিউমার্কেটে এসেছিল রন্তু। বাবা তাকে একটি বাইনোকুলার কিনে দিয়েছিল, জন্মদিনের অগ্রিম উপহার হিসেবে। তারপর আজ অনেকদিন হল বাবার সাথে আর রন্তুর দেখা হয় নাই। রন্তু মনে মনে এখন মাঝে মাঝে বাবার সাথে কথা বলে, তবে খুব সাবধানে। নানু, মা বা ছোট মামা দেখে ফেললে তাকে পাগল ভাববে বলে সে খুব সাবধান থাকে। আজ এই লোকটাকে কেন জানি রন্তুর বাবা বলে মনে হচ্ছে। বাবা বুঝি বহুদিন পর মা’র সাথে দেখা করতে এসেছে। রন্তু হাসি হাসি মুখ করে আইসক্রিমে মুখ দিল। শেষ বিকেলের মায়াবী আলোয় রন্তুর মুখখানি ঝলমল করতে লাগলো। পাশে শায়লা আর ইরফান নিজেদের মাঝে কথোপকথনে মত্ত। এই বিকেলে আগত কোন এক বিকেলের বীজ বপন হয়ে গেল কি? সেই আগত বিকেলে এরা তিনজন একসাথে আবার কোন আইসক্রিম পার্লারে আইসক্রিম খেতে খেতে জীবনের সব পঙ্কিলতাকে পেছনে ফেলতে পারবে কি না তা ভবিষ্যতই বলে দিবে।


১৩.
বাতাসের শো শো শব্দে পুরো রিকশাটা কেঁপে কেঁপে উঠছে, বৃষ্টির ফোঁটা থেকে রক্ষা পেতে যে প্লাস্টিকের পর্দাটা দেয়া ছিল সেটা হাত ফস্কে ছুটে গিয়ে পতাকার মত পতপত করে উড়ছে। বৃষ্টিটা বিপরীত দিক থেকে আসছে বলে রন্তুর পুরো শরীর ভিজছে না, শুধুমাত্র কোমরের নীচের অংশে ঠাণ্ডা বৃষ্টির ফোঁটা তীরের মত বিঁধছে। গোদের উপর বিষ ফোঁড়ের মত হাতে থাকা খাবারের প্যাকেটটা সামলাতে হচ্ছে রন্তুকে। এই প্যাকেট সামলাতে গিয়েই হাত থেকে পর্দাটা ছুটে গেল। রিকশার হুডের সাথে আটকানো থাকায় তা উড়ে চলে না গিয়ে রিকশার সাথে পতপত করে উড়ছে পতাকার মত।

আজ রন্তুর জন্মদিন, তাই ছোট মামা শিবলী’র সাথে পুরাতন ঢাকার চকবাজারে এসেছে কিছু খাবার দাবার আর বেলুনসহ আরও কিসব কিনতে। মিষ্টি আর বিস্কিটের প্যাকেট রন্তুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে মামা গেছে আগে থেকে অর্ডার করে রাখা কেকটা নিয়ে আসতে। বাসা থেকে বের হওয়ার পরপরই ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। তাই ছোট মামা রিকশা ছেড়ে না দিয়ে বেশী ভাড়ার বিনিময়ে রেখে দিয়েছিল রিকশাওয়ালাকে। ছোট মাম এই হালকা বৃষ্টি মাথায় নিয়েই সব দোকান থেকে সবকিছু কিনছিল আর এনে রন্তুর হাতে ধরিয়ে দিচ্ছিল। একবারের জন্যও রন্তুকে রিকশা হতে নামতে হয় নাই। কিন্তু ছোট কেক আনতে যাওয়ার পরপরই শুরু হলে তুমুল বৃষ্টি সাথে প্রচণ্ড বাতাস। রিকশাওয়ালা রন্তুকে বসিয়ে পাশের একটা দোকানের ঝাঁপের নীচে চলে গেল আশ্রয় নিতে। এখন রন্তু বসে বসে একা একা ভিজতে লাগলো।

শিবলী হাতে কেক নিয়ে কিংকর্তব্যবিমুর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, এই কাগজের বক্সে ভরা জন্মদিনের কেক নিয়ে কোন মতেই এই তুমুল বৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে রিকশা পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব নয়। সাথে ছাতাও নেই, আর ছাতা থাকলেও কোন লাভ হতে বলে মনে হয় না। উফ... বৃষ্টি হওয়ার আর সময় পেল না। রন্তুকে একা রিকশায় বসিয়ে রেখে এসেছে, তাই চিন্তা আরও বেশী। বৃষ্টিতে ভিজে গেল কিনা কে জানে? ছেলেটার আবার ঠাণ্ডার ধাত আছে, অল্পতেই সর্দিজ্বর বাঁধিয়ে বসে। তারউপর হাতে ধরিয়ে দিয়ে এসেছে খাবারের প্যাকেটগুলো।

প্রায় মিনিট দশকে ঝরার পর বৃষ্টি একেবারে থেমে গেল। শিবলী দ্রুত রিকশার দিকে হাঁটতে লাগলো হাতে কেক নিয়ে। আকাশে এখনো অনেক মেঘ রয়েছে, কালো মেঘ ভেদ করে মাঝে মাঝে বিজলী চমকাচ্ছে। রিকশার কাছে এসে দেখে রন্তু প্রায় ভেজা শরীরে রিকশায় বসে আছে। কিন্তু কোন এক দুর্ভেদ্য উপায়ে খাবারের প্যাকেটগুলো শুকনো আছে।
‘কিরে একেবারে যে ভিজে কাক হয়ে গেলি? পর্দা ছিল কই?’
‘পর্দা পতাকা হয়ে উড়ছিল’ ফিক করে হেসে উত্তর দিল রন্তু। তার সাথে সাথে রিকশাওয়ালাও হাসছে। যেন খুবই আনন্দের কোন খবর দিচ্ছে।
‘হাসি বের হবে একটু পরে, সর্দিজ্বর নিয়ে আবার বিছানায় থাকবি আর নানুর দেয়া দুধ পাউরুটি খাবি’ রন্তুকে খ্যাপানোর জন্য শিবলী কথাগুলো বলতে বলতে রিকশায় উঠে বসল। দুধ পাউরুটির কথা শুনতেই রন্তু মুখ কুচকে ফেলল। এই অপছন্দের খাবারটি প্রতিবার জ্বর এলেই নানু টাকে জোর করে খাইয়ে ছাড়বে। ছোট মামা উঠে বসতে রিকশাওয়ালা রিকশা চালাতে শুরু করল। কেক কেনার ফাঁকে ছোট মামা আরও অনেক কিছু কিনে ফেলেছে। হাতে অনেকগুলো আরও ছোট ছোট প্যাকেট ভর্তি ব্যাগ। ঝিরঝির ঠাণ্ডা বাতাস বইছে, কেমন একটা অদ্ভুত পরিস্কার চারিপাশ। রন্তু খেয়াল করে দেখেছে প্রতিবার বৃষ্টি শেষে চারিপাশ কেমন অদ্ভুত রকমের সুন্দর হয়ে যায়। মনে হয়ে টেলিভিশনে দেখা কোন সিনেমার দৃশ্য, কেন এমনটা মনে হয় রন্তু জানে না। কিন্তু প্রতিবার বৃষ্টি শেষে সে দৌড়ে ছাঁদে চলে যায়, অজানা কোন এক সুন্দরের টানে।

আধভেজা শরীরে রন্তু শিবলীর সাথে বাসায় ঢুকলো, নানু গেট খুলেই শুরু করল চেঁচামেচি। আজ কিন্তু রন্তুর সাথে নয়, চেঁচাচ্ছে ছোট মামার সাথে। আজ রন্তুর জন্মদিন আর এই দিনে ছেলেটাকে নিয়ে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজিয়ে আনায় নানু আচ্ছামত বকা দিচ্ছে ছোট মামাকে। রন্তু কোন কথা না বলে ভেজা জামাকাপড় ছাড়তে ভেতরে চলে গেল।

রন্তুর মা রন্তুর জন্য আজ স্পেশাল চিকেন ফ্রাই ভাঁজছে। রন্তু খুব পছন্দ করে চিকেন ফ্রাই। ছেলেটার পছন্দের তালিকা খুবই ছোট। খাবার দাবারে তেমন কিছু আগ্রহ দেখা যায় না, শুধুমাত্র এই চিকেন ফ্রাইটাই তার খুব পছন্দ। যখনই তাকে নিয়ে বাইরে গেছে চিকেন ফ্রাই আর আইসক্রিম এই দুটো পেলেই সে খুশী। তেমন কোন খেলনা বা অন্য কিছু কখনো চায় না। অবশ্য ছেলেটা যে ধরেনের চাপা স্বভাবের আর এই ছোট বয়সেই অনেক বেশী পরিণত তাতে করে কোন কিছু পছন্দের থাকলেও কখনো মুখ ফুটে বলবে না। রন্তু জামা পাল্টে রান্না ঘরের দাওয়ায় এসে দাঁড়ালো। মা মুরগীগুলোকে মেয়নেট করছে, রাতে খাবারের আগে গরম গরম ভেঁজে দেবে। রন্তুর চাহনী দেখে শায়লা বুঝলো ছেলের লোভ হচ্ছে চিকেন ফ্রাই এর জন্য, কখন খাবে এই চিন্তায় সে অধীর।
‘কিরে? লোভ হচ্ছে?’
‘হুম’
‘কাঁচা খাবি একটা? দেব?’
‘ইয়াক...’
‘ইয়াক কেন? এই জিনিষতো তেলে ভেঁজে দিলে ঠিকই গপাগপ খাবি’
‘তুমি খাও কাঁচা চিকেন’

রন্তু ছাঁদের দিকে পা বাড়ালো, আকাশে মেঘের দল সরে গিয়ে সূর্য উঁকি দিয়েছে। রন্তু ছাঁদের রেলিঙ্গে হেলান দিয়ে চারিপাশ দেখতে লাগলো। আজ রন্তু সাত বছর পূর্ণ করেছে, সে যে কবে বড় হবে? ছোট মামার মত বড়, তার আলাদা একটা ঘর থাকবে, ঠিক ছোট মামার ঘরের মত। সেই ঘর জুড়ে থাকবে রন্তুর নানান শখের জিনিষপত্রে ঠাসা। মা মাঝে মাঝে তার ঘরে ছুটে আসবে এটা সেটা খাবার নিয়ে, কখনো চা নিয়ে। সিগারেট... ইয়াক ছিঃ... ছোট মামাটা লুকিয়ে লুকিয়ে সিগারেট খায়, রন্তু দেখেছে। রন্তু কখনো সিগারেট খাবে না বড় হয়ে, বিশ্রী গন্ধওয়ালা এই জিনিশ মানুষ খায় কিভাবে? আচ্ছা বাবা কি সিগারেট খায়? রন্তুর জানা নেই... মাকে জিজ্ঞাসা করতে হবে।

বাবাও মাঝে মাঝে তার রুমে এসে সিগারেট খেতে পারে... সে নিষেধ করবে না। বাবা গম্ভীর হয়ে সিগারেট খাচ্ছে রন্তু যেন চোখে দেখতে পেল। ঠিক তখনই রন্তুর মনে পড়ল, বাবা এখন আর তাদের সাথে থাকে না। সেই কবে বাবা তাকে অগ্রিম জন্মদিনের গিফট কিনে দিয়ে চলে গেল, আর আসে নাই স্কুল গেটে দেখা করতে। বাবার জন্মদিনের সেই গিফটের কথা মনে হতেই রন্তু নীচে নেমে আসল। মায়ের কাছ থেকে চেয়ে বাইনোকুলারটা নিতে নীচে নামা, বাবা মাস দুয়েক আগে এই বাইনোকুলারটা তাকে জন্মদিনে অগ্রিম গিফট হিসেবে দিয়ে গেছে। এই বৃষ্টি শেষের চারিপাশটা বাইনোকুলারে দেখতে কেমন লাগবে ভাবতে ভাবতে রন্তু আবার মা’র কাছে গেল।
মা ঘর গুছাচ্ছে, একটু পর ছোট মামা বেলুন দিয়ে ঘর সাজাবে। মা’র পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল, কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। এর আগে বাবা’র দেয়া ঘড়িটার কথা বলায় একবার মা খুব বিরক্ত হয়েছিল। এখন বাইনোকুলারটা চাইলে মা না আবার রাগ করে।
‘কিরে? কিছু বলবি?’
‘হুম’
‘কি? বলে ফেল? জ্বর বাঁধিয়েছিস? দেখি এদিকে আয়...’ বলে শায়লা ছেলের কপালে হাত ছোঁয়াল, নাহ জ্বর আসে নাই।
‘কি বলবি বলে ফেল?’
‘মা... বাইনোকুলার...’
‘বাইনোকুলার? কিসের বাইনোকুলার?’
‘ঐ যে, বাবা দিল...’
‘ও...’ বলে শায়লা আলমারির উপরের তাক থেকে প্যাকেটটা নামিয়ে ছেলের হাতে দিল। রন্তু দেখল মা’র মুখ গম্ভীর হয়ে গেছে। রন্তু প্যাকেট হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মা রাগ করেছে রন্তু এখন বাবা’র দেয়া গিফটের বাইনোকুলারটা এখন চাওয়ায়। রন্তু শায়লার দিকে প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিয়ে মাথা নিচু করে বলল,
‘মা, প্যাকেটটা রেখে দাও।’
‘ওমা কেন?’
‘এমনি...’
‘এইমাত্র চাইলি, এখনই আবার ফেরত দিচ্ছিস... সমস্যা কি?’
‘না... ভেবেছিলাম ছোট মামা’র সাথে ছাঁদে গিয়ে বাইনোকুলার দিয়ে চারপাশটা দেখব। কিন্তু ছোট মামাইতো এখন ঘর সাজাবে বেলুন দিয়ে। তাই...’

শায়লা ছেলের হাত থেকে প্যাকেট নিয়ে আবার আগের জায়গায় রেখে দিল। ছেলেটা বাবার মায়া কাটাতে পারছে না, তার মনে বাবার জন্য বিশাল একটা অংশ রয়ে গেছে। জাভেদ যদি তা বুঝত... ছেলের দিকে চেয়ে সে নিজেকে বদলাতে পারত, তা সে করে নাই। তার নিজের ইগো, একরোখা স্বভাবের জন্য আজ শায়লা আর রন্তু থেকে সে কত দূরে। মানসিক সমস্যাকে সে জাভেদ কখনো স্বীকার করে নাই, স্বীকার করে চিকিৎসা করালে সব মানসিক রোগেরই সমাধান আছে। কিন্তু তার আগে যার রোগ তাকে বুঝতে হবে সে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। কিন্তু জাভেদ তা কখনোই মনে করে নাই। যদিও এখন তার মানসিক সমস্যা সারল কি না তা নিয়ে শায়লা মোটেও চিন্তিত নয়। কিন্তু এক সময় যাকে ভালোবেসেছে, সংসার করেছে, সেই মানুষটি’র এতটুকু কল্যাণতো সে কামনা করতেই পারে। শায়লা সবসময় চিন্তিত রন্তুকে নিয়ে। ছেলেটা মনে মনে বাবা-মা নিয়ে একটা পরিবার খুব মিস করে তা শায়লা এখন বুঝতে পারে। চাপা স্বভাবের বলে সে কাউকে কিছু বলে না, কিন্তু শায়লা মা হিসেবে তা বুঝতে পারে। কিন্তু সে কি করবে? জীবন যে মাঝে মাঝে খবু বেশী নির্মম। তাইতো আজ রন্তু আর সে জাভেদ হতে অনেক দূরে, একই শহরে থেকেও যোজন যোজন মাইল দূরে যেন।


১৪.
ব্যাথায় রন্তু কুঁকড়ে উঠলো, হাঁটুর কাছটায় চামড়া ছড়ে গিয়ে হালকা রক্ত বেড়িয়েছে। রন্তু দৌড়চ্ছিল ঠিকই, কিন্তু কিসে যেন পা একটু আটকে গিয়ে মনে হল পেছন থেকে জোরে কেউ ধাক্কা দিয়ে তাকে ফেলে দিল। ভারসম্য হারিয়ে প্রায় তিনচারটা ডিগবাজী মত খাবার পর সে স্থির হল। প্রথমে ব্যাথার চেয়ে লজ্জা পাচ্ছিল বেশী, ব্যাথার তীব্রতা ধীরে ধীরে উপলব্ধি হওয়ার পরপরই তার চোখ মুখ কুঁকড়ে উঠলো। অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে পায়ে, রন্তু ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। তার পা’টা না আবার ভেঙ্গে গেল, সে এই ভাঙ্গাটাঙ্গা খুব ভয় পায়। বছর খানেক আগে ছোট মামার পা ভেঙ্গেছিল, উফ... কি যে ভীষণ কষ্ট। রন্তু ভয়ে কেঁদে দিল। তার কান্না দেখে গেম টিচার ছুটে এল তার কাছে।
‘এই রন্তু, খুব বেশী ব্যাথা পেয়েছিস’
রন্তু মাথা নেড়ে জানালো হ্যাঁ।
‘ইস... চামড়া ছড়ে গেছে দেখি। দৌড়তে গিয়ে পড়ে গেলি কীভাবে?’
‘ম্যাডাম কে যেন পেছন থেকে মনে হল ধাক্কা দিয়েছিল’
‘আবার মিথ্যা কথা বলিস, গাধা কোথাকার। সবার শেষে ছিলি তুই, তোকে আবার কে ধাক্কা দিবে? আমিতো ভালো মতই সব দেখছিলাম।’
রন্তু কোন কথা বলল না, চুপচাপ চোখের জল ফেলতে লাগলো।
‘নে উঠে দাঁড়া এবার’
‘ম্যাডাম পারবো না, আমার পা ভেঙ্গে গেছে’
‘মানে! পা ভাঙলো কীভাবে? তুই দাঁড়া দেখি।’ ম্যাডাম হাত ধরে রন্তুকে দাঁড় করিয়ে দিলেন। রন্তু দাঁড়িয়ে কিছুটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটার পর দেখল সে ঠিকঠাক হাঁটতে পারছে।
‘এই তো হাঁটতে পারছিস, পা ভাঙল কোথায়? ভীতুর ডিম কোথাকার, কিছু হলেই ভ্যা করে শুধু কান্না আসে?’

রন্তু কোন কথা বলল না, চুপচাপ হেঁটে হেঁটে মাঠের কিনারের দিককার ছাতিম গাছটার নীচে এসে বসল। সে নিজে কিন্তু কোন খেলায় অংশ নিতে চায় নাই। এইসব দৌড়ঝাঁপ তার ভালো লাগে না, কিন্তু বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় তাকে অংশগ্রহণ করতেই হবে। এমনটাই নাকি নিয়ম, স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে সবাইকে অংশগ্রহণ করতে হয়। তাই গেম টিচার জোর করে তার নাম দৌড় প্রতিযোগিতায় দিয়ে দিয়েছে। রন্তুর এসব খেলা মোটেও ভালো লাগে না, তার ভালো লাগে গান, কবিতা, গল্প বলা এসব। রন্তু সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছে। তার ইচ্ছে ছিল সবকয়টায় নাম দেয়ার, কিন্তু একজন নাকি তিনটার বেশী বিষয়ে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। তাই সে কবিতা আবৃত্তি, ছবি আঁকা আর গল্প লেখা এই তিনটায় নাম দিয়েছে। আজ সকালে সে তার নিজের লেখা গল্পটা জমা দিয়েছে। রন্তু, মা আর বাবা, এই তিনজনকে নিয়ে একটা গল্প, যেখানে তারা সবাই মিলে সাগর দেখতে গেছে। সেখানে গিয়ে রন্তু হঠাৎ হারিয়ে গেল ভিড়ের মাঝে, তারপর অনেক কষ্টে তার বাবা-মা তাকে খুঁজে পায়। এই নিয়ে লেখা গল্প, রন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে লিখেছে।

আগামী পরশু স্কুল মাঠে মূল অনুষ্ঠান, আজ শেষ দিনের বাছাই চলছিল। রন্তুর ইচ্ছা ছিল যেমন খুশী তেমন সাজো প্রতিযোগিতায়ও অংশ নেয়ার। এখন আর কিছুই ভালো লাগছে না, ইচ্ছে হচ্ছে কবিতা, আর ছবি আঁকাটাও বাদ দিয়ে দিতে। কিচ্ছু ভালো লাগছে না। খুব কান্না পাচ্ছে, বাবাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। আজ কতদিন হয়ে গেল বাবাকে দেখেনা। কয়মাস? রন্তু হিসেব করে ভাবতে পারছে না। তার খুব কান্না পাচ্ছে, এই কান্নাটা এত্ত পচা না, যখন তখন চোখের কোণে এসে হাজির হয়।

দুইদিন পর, আজ স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। গতকাল সকল স্পোর্টস ইভেন্টের ফাইনাল হয়ে গেছে। আজ রন্তু তার মা শায়লার সাথে স্কুলে এসেছে। আজ রন্তুর দুটো ইভেন্ট রয়েছে, একটা ছবি আঁকা আর একটা হল কবিতা আবৃত্তি। রন্তু এখন বড় হলঘরটায় ছবি আঁকায় ব্যস্ত। এক ঘণ্টা সময়ে একটা বড় আর্ট পেপারে জলরঙ্গ দিয়ে ছবি আঁকা, রন্তু আঁকছে ‘আমাদের পরিবার’ নামের একটা ছবি। যেখানে একটা পরিবারে একটা ছেলে তার বাবা-মা তিনজন তিনটা ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। বাবা মা দুজনই বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে। আর ছেলেটা একটা ঘরের দরজায় মাথা নিচু করে বসে আছে। রন্তু কি কারণে এই ছবিটা আঁকছে তা হয়ত সে নিজেও জানে না। কিন্তু তার পারিপারিক জটিলতাই তার শিশু মনে এই ছবি এঁকে দিয়েছে।

শায়লা স্টেজের সামনে অভিভাবকদের জন্য যে চেয়ারপাতা নির্দিষ্ট স্থান আছে সেখানে একেবারে শেষের দিকে একটা চেয়ারে বসে আছে অনেকক্ষণ। আজ সকালবেলাই সে রন্তুর সাথে স্কুলে এসেছে। ছেলেটা গত পরশু দৌড়তে গিয়ে পা ছিলে ফেলেছে, সেই ব্যাথায় রাতে এল জ্বর। ছেলেটার যে কি হল খোদাই জানে, একটু কিছু হলেই জ্বর চলে আসে। আজ বলতে গেলে শায়লা জোর করে ধরে নিয়ে এসেছে, ছেলেতো আসতেই রাজী না। বলে, ‘আমি এসব কম্পিটিশনে যাব না’। শেষে শায়লার ধমকে রাজী হল, আজ রন্তুর ছবি আঁকা আর কবিতা আবৃত্তি করার কথা। ছবি আঁকা পর্ব শেষ, এখন চলছে কবিতা আবৃত্তি, একটা ছোট মেয়ে স্টেজে কি চমৎকার করে তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে... কবিতাটি আবৃত্তি করছে। এক পায়ে কথাটি বলার সময় সে একটা পা উঁচু করে রাখছে, সাথে মুখের অভিব্যক্তি মিলে খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। ডায়াসে দাঁড়ানো ম্যাডাম রন্তুর নাম ধরে বলতেই শায়লা নড়েচড়ে বসল। গুটি গুটি পায়ে রন্তু স্টেজে এসে দাঁড়াল, মাইক যখন এডজাস্ট করার জন্য টেকনিশিয়ান ব্যস্ত তখন শায়লা চমকে উঠলো। রন্তু’র মাঝে অবিকল জাভেদের প্রতিচ্ছবি, দাঁড়ানোর ভঙ্গী, ঘাড় একটু কাত করে মাথা নিচু করে কি যেন ভাবছে। ঠিক জাভেদের কপি যেন। শায়লা নির্বাক বসে রইল।

হঠাৎ করে মাইকে চমৎকার একটা কণ্ঠে আবৃত্তি শুরু হতেই শায়লা দেখতে পেল রন্তু কবিতা আবৃত্তি শুরু করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বীরপুরুষ’।
মনে করো, যেন বিদেশ ঘুরে
মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।
তুমি যাচ্ছ পালকিতে, মা, চ’ড়ে
দরজা দুটো একটুকু ফাঁক করে,
আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার ‘পরে
টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে।
রাস্তা থেকে ঘোড়ার খুরে খুরে
রাঙা ধুলোয় মেঘ উড়িয়ে আসে।।

সন্ধে হল, সূর্য নামে পাটে,
এলেম যেন জোড়াদিঘির মাঠে।
ধূ ধূ করে যে দিক-পানে চাই,
কোনখানে জনমানব নাই,
তুমি যেন আপন-মনে তাই
ভয় পেয়েছ – ভাবছ, ‘এলেম কোথা।’
আমি বলছি, ‘ভয় কোরো না মাগো,
ওই দেখা যায় মরা নদীর সোঁতা।’

আমরা কোথায় যাচ্ছি কে তা জানে -
অন্ধকারে দেখা যায় না ভাল।
তুমি যেন বললে আমায় ডেকে,
‘দিঘির ধারে ওই-যে কিসের আলো!’
এমন সময় ‘হাঁ রে রে রে রে’
ওই-যে কারা আসতেছে ডাক ছেড়ে!
তুমি ভয়ে পালকিতে এক কোণে
ঠাকুর-দেবতা স্মরণ করছ মনে...

এতোটুকু আবৃত্তি করে রন্তু থেমে গেল। শেষের দিকে তার গলা ধরে আসছিল, কান্না জড়ানো কণ্ঠে আবৃত্তি করতে করতে হঠাৎ থেমে গেল। শায়লা ততক্ষণে চেয়ার ছেড়ে উঠে স্টেজের দিকে এগিয়ে গেছে। অনুষ্ঠান পরিচালনা করছিলেন যে শিক্ষক তিনি এগিয়ে গিয়ে রন্তুকে ধরে স্টেজ থেকে নামিয়ে আনলেন। শায়লা গিয়ে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে একপাশের চেয়ারে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিল। রন্তু বেশ কিছুক্ষণ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে গেল, একসময় একটু ধাতস্ত হয়ে এলে শায়লা তাকে জিজ্ঞাসা করল, কি হয়েছিল? কবিতা কি ভুলে গিয়েছিল? নাকি ভয় পেয়েছিল? রন্তু কোন কথা না বলে শুধু ঘাড় নেড়ে জানিয়ে দিল, না এমন কিছু নয়।

কিন্তু রন্তু যে কথাটা মা’কে বলতে পারে নাই, তা হল... সে যখন কবিতা পাঠ করছিল বারবার তার বাবার কথা মনে হচ্ছিল। চারিদিকে বাবার মুখটা খুঁজতে খুঁজতে কবিতা আবৃত্তি করে যাচ্ছিল। আবৃত্তি করতে করতে যখন “এমন সময় ‘হাঁ রে রে রে রে’
ওই-যে কারা আসতেছে ডাক ছেড়ে!” এই অংশটা আবৃত্তি করছিল, তখন সে যেন দেখতে পেল বাবা ডাকাতের পোশাক পড়ে রন্তুদের দিকে তলোয়ার উচিয়ে হাঁ রে রে ডাক ছুঁড়ে এগিয়ে আসছিল। রক্তাক্ত চোখের বাবাকে দেখে রন্তুর খুব ভয় হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল পুরোটা কবিতা পড়তে পড়তে সত্যি বাবা ডাকাতের বেশে এসে রন্তু আর মাকে মেরে ফেলবে। বাবার এই রূপ রন্তুর মনে কেন এল রন্তু নিজেও জানে না। কিন্তু রন্তু বড় ভয় পেয়েছে, তারচেয়ে বড় কথা ভীষণ আঘাত পেয়েছে মনে। এমন কল্পনা রন্তুর মনোজগতে যে ঝড় তুলেছিল তা কেউ জানতে পারবে না, কক্ষনো না।

মন্তব্য ৩৭ টি রেটিং +৫/-০

মন্তব্য (৩৭) মন্তব্য লিখুন

১| ১৭ ই জুন, ২০১৫ সন্ধ্যা ৬:৩৩

কলমের কালি শেষ বলেছেন: চমৎকার আয়োজন । সকল পর্ব একবাক্সে বন্দি করেছেন । ছোট ছোট পর্বে বিশাল লেখা লিখে ফেলেছেন দেখি ! এখনিতো একটা পূর্ণাংগ উপন্যাসের মত লাগছে ।

নতুন পাঠকদের জন্য অনেক ভাল হয়েছে আর পুরনো পাঠকরাও উপকৃত হবে ।

শুভেচ্ছা বোমা ভাই । :)

১৭ ই জুন, ২০১৫ রাত ৮:২৫

বোকা মানুষ বলতে চায় বলেছেন: অনেক অনেক ধন্যবাদ ককাশে, বরাবরের মত সাথে থাকার জন্য। খুব ইচ্ছা আছে রন্তু সিরিজ নিয়ে আরও অনেক পর্ব লেখার, দেখা যাক কতটা পারা যায়।

ভালো থাকুন সবসময়, সাথে থাকুন, পাশে থাকুন।

২| ১৭ ই জুন, ২০১৫ রাত ৮:২৩

বিদ্রোহী ভৃগু বলেছেন: দারুন !

পুরোটা একটানে শেষ করতে গিয়ে অফিসে বেশ ফাঁকিই দিতে হল! অবশেষ মনে হল লস হয় নি!;)

++++++++++++++++++

১৭ ই জুন, ২০১৫ রাত ১০:৩৪

বোকা মানুষ বলতে চায় বলেছেন: ওয়াও!!! সত্যি বলছি, আপনার মন্তব্য পড়ে অজানা এক ভাললাগায় মনটা ভরে গেল, আনন্দে পুলকিত হলাম। অফিস ফাঁকি দিয়ে এই গল্প পুরোটা কেউ পড়ছে, ভাবতেই শিহরিত হতে হয়। ইচ্ছা হয় কোন একদিন মশিকুর ভাইয়ের সেই মন্তব্যটা সত্য হয়ে যাক, লেখক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি। পাঠকের মনের মাঝে রেখাপাত করে যায় এমন কিছু গল্প লিখি। তাই বুঝতেই পারছেন আপনার এই মন্তব্য আমার জন্য কতটা অনুপ্রেরণাদায়ী হয়েছে।

এত্ত এত্ত ভাললাগা আর ...... ভালো থাকুন প্রতি দিন, প্রতি ক্ষণ। শুভকামনা নিরন্তর।

৩| ১৭ ই জুন, ২০১৫ রাত ৯:০৬

জুন বলেছেন: এইবার ছাপিয়ে ফেল্লেই হয় । সেই প্রথম দিকে পড়তাম রন্তুর কালো আকাশ । তারপর ঝড়ের বেগে ব্লগে আসা যাওয়াতে আর পড়া হয়নি তাই উপরের তালিকায় জায়গা হয়নি আমার উৎসাহদাতা হিসেবে :(
যাই হোক এবার সবগুলো একসাথে পড়বো । খন্ড খন্ড পড়ে মজা পাই না বোকা মানুষ । তবে এবার বুকমার্ক করে গেলাম। রন্তুকে পড়েই ছাড়বো ইনশাআল্লাহ ।
+

১৮ ই জুন, ২০১৫ রাত ১২:০৮

বোকা মানুষ বলতে চায় বলেছেন: আহা... আপু মনঃ খারাপ করেন কেন? আপনি তো আমার অন্যতম প্রিয় একজন ব্লগার। আমার প্রিয় বিষয়ের ব্লগীয় গুরুজন। আপনার কারণেই ভ্রমণ সংকলন করা, যা এই মাসের সংখ্যায় ১২তম সংখ্যায় পৌঁছবে, অর্থাৎ এক বছর!!! অপেক্ষা করুণ, কিছু একটা আসছে, খুব শীঘ্রই :)

৪| ১৮ ই জুন, ২০১৫ রাত ১২:৩০

কামরুন নাহার বীথি বলেছেন: ব্লগার মশিকুর ভাই কমেন্টে একটা কথা বলেছিলেন, 'আপনার ভেতর লেখক আছে ভাই'। ১০০%খাটি কথা!!
আমি এই ব্লগে নুতন। একটা পর্বই পেয়েছি।
আমি লিখেছিলাম, "একটা কথা না বললেই নয়, পাঠক ধরে রাখার অসাধারণ ক্ষমতা আপনার !!! "
আমি আবারো তা' ই বলব!!!

১৮ ই জুন, ২০১৫ রাত ১২:৪০

বোকা মানুষ বলতে চায় বলেছেন: পোস্ট লেখার সময়, আপনার কথা মনে পড়েছিল। কোন একদিন, কোন এক পোস্টে হয়ত আপনার এই কথাটি দেখতে পাবেন, "একটা কথা না বললেই নয়, পাঠক ধরে রাখার অসাধারণ ক্ষমতা আপনার !!! " আপনি নতুন হলেও কিন্তু এরই মধ্যে সামু ব্লগে আমার মত অনেকের প্রিয় ব্লগার হয়ে উঠেছেন। আর যতদূর জানি, আপনি প্রথম আলো ব্লগের খুব জনপ্রিয় একজন ব্লগার। :) আশা করি আমাদের সাথেও ব্লগিং সেখানকার মতই উপভোগ করবেন।

অনেক অনেক ভালো থাকুন আপু, শুভকামনা নিরন্তর।

৫| ১৮ ই জুন, ২০১৫ রাত ১:৫৪

সচেতনহ্যাপী বলেছেন: প্রিয়তে রাখলাম ধীরে ধীরে পড়ার জন্য,রন্তু,শায়লা আর জাভেদের মানসিকতা বিশ্লেষন করে নিজের মত করে বুঝে নেওয়ার জন্য।।
জুনের মতই বলবো,আরো কিছু লিখে(সংযোজন,পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে) ছাপিয়ে ফেলুন।।
আরেকটি বাহুল্য কথা এত সাইকোলজি নিয়ে যে লোক ভাবতে বা বুঝতে পারে, সে কেনো এবং কিভাবে নিজেকে "বোকা" হিসাবে পরিচয় দিতে পারে??
ভাল এবং সুস্থ থেকে লিখে যান,দেখবেন আশে-পাশেই আমার ছায়া।।
আর হ্যাঁ আমার নামটা দেখে যে ভাল লাগছে,তা কি আর বলতে হবে?!!

১৮ ই জুন, ২০১৫ সকাল ১১:৫৭

বোকা মানুষ বলতে চায় বলেছেন: ধন্যবাদ হ্যাপী ভাই। রন্তু সিরিজ এখনই বই আকারে ছাপানোর ইচ্ছে নেই। রন্তুকে নিয়ে একটা ট্রিলজি টাইপের কিছু লেখা ইচ্ছা আছে, দেখা যাক পারি কিনা। সাহিত্যের মানদণ্ডে হয়ত এর কোন মূল্য নেই, কিন্তু আমার কাছে এই সিরিজের একটি ভিন্নতর মূল্য আছে যা ব্যাখ্যার অতীত।

আর আমার নিকের ব্যাপারে মূল কথাটা আপনাকে বলে যাই। আমি যখন এই নিক ওপেন করি, তখন আমার ইচ্ছা ছিল সমসাময়িক বিষয় নিয়ে স্যাটায়ার ধর্মী লেখা লেখার। তাই এমন একটা নিক নেয়া, কিন্তু মানুষ ভাবে এক, আর হয় আরেক। আমার একেবারে প্রথম দিকের দু'একটা লেখা পড়লে বুঝতে পারবেন। কিন্তু অনলাইনের নানান কুটিলতার ভয়াবহতা দেখে আমি আর ঐ পথে হাঁটি নাই। সাথে সেই সময়টায় আমার প্রচণ্ডরকমের ঘোরাঘুরি আমাকে উৎসাহিত করে ভ্রমণ নিয়ে নিয়মিত লিখে যেতে। আর এখন তো এই নিকের উপর মায়া পড়ে গেছে, এই নিকই আমার ব্লগীয় আইডেন্টিটি। এই হল বোকা মানুষ বলতে চায় নিকের মূল সারমর্ম।

ভালো থাকুন সবসময়, অনেক অনেক শুভকামনা রইল।

৬| ১৮ ই জুন, ২০১৫ সকাল ৯:১৯

শামছুল ইসলাম বলেছেন: আপনার নামটাকে সংক্ষিপ্ত করে মানুষ ভাই বলে ডাকতে চাই, আপত্তি থাকলে জানাবেন।
অস্তিত্বহীনের বিদায় কবিতাটা আমার অস্তিত্বে নাড়া দিয়ে জানিয়ে গেছে, আসছে মানুষ ভাই আসছে, সবাইকে জয় করতে।
প্রিয়তে নিলাম। আমি যেন ছোট রন্ত্তকে দেখতে পাচ্ছি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে হাঁটছে, আর মানুষ ভাইয়ের ভাষায়:

বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা রন্তুকে ভিজিয়ে দিতে লাগলো। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা রন্তুর ছোট ছোট অশ্রুকে গ্রাস করে নিতে লাগলো তার বিশাল জলাধারে।
++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++ ভাল লাগা।

যে কোন লেখার ক্ষেত্রে আমার মূল্যায়ন, হৃদয় দিয়ে হৃদি অনুভব। তাই যে লেখাটা বুঝতে পারি, হৃদয় ছুঁয়ে যায়, একনিঃশ্বাসে পড়ে ফেলি।
ভাল থাকুন।

১৮ ই জুন, ২০১৫ দুপুর ১২:৪৯

বোকা মানুষ বলতে চায় বলেছেন: রাতে ঘুম হয় না, তাই দিনের বেলা দেরী করে ঘুম থেকে উঠতে হয়। আজ ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার জন্য সারপ্রাইজ হয়ে অপেক্ষা করছে আপনার এই মন্তব্যগুলো। যতটা যত্ন নিয়ে আমি এই গল্পটুকু লিখেছি, তারচেয়ে অনেক অনেক যত্ন নিয়ে আপনি পাঠ করেছেন এই গল্পটি। যে নামে খুশী আপনি আমাকে ডাকতে পারেন, ভালবেসে যে নামেই ডাকা হোক, তার আবেদন আসলেই অমূল্য।

সত্যি কথা কি, আমি যখনই এই সিরিজের গল্প লিখেছি, আমি নিজেকে রন্তুর জায়াগায় দেখতে পেয়েছি। এমনও হয়েছে, অনেক পারিপার্শ্বিক পটভূমি, ঘটনা আমি মানস চোখে দেখেছি রন্তু হিসেবে নিজেকে কল্পনা করে, যার সবটুকু গল্পে তুলে ধরা হয় নাই। আমার মত কাঁচা হাতের লেখা আপনার হৃদয় ছুঁয়ে দিতে পেরেছে জেনে নিজেকে লেখক হিসেবে একবিন্দু সার্থক মনে হচ্ছে।

৭| ১৮ ই জুন, ২০১৫ সকাল ১০:০০

শামছুল ইসলাম বলেছেন: রন্ত্ত,শায়লা আর জাভেদের গল্পটাই পড়ছিলাম।
জাভেদের কথা গুলো বেদনা ছড়াচ্ছে:
নীরবে যেন বলছে এ বন্ধন কভু ছিন্ন হবার নয়... কিন্তু জাভেদ জানে, জীবনের সব বন্ধন মিছে... সব মিছে মায়া...।

জমে উঠেছে গল্প, জমে গেছে শামছুল ইসলাম মানুষ ভাইয়ের বলয়ে।

১৮ ই জুন, ২০১৫ দুপুর ১:৫৩

বোকা মানুষ বলতে চায় বলেছেন: আসলে জাভেদের মত কিছু চরিত্র কিন্তু আমাদের সমাজে বিদ্যমান। আপাত দৃষ্টিতে এরা ঘৃণ্য খলনায়কের মত মনে হলেও এদের মনস্তাত্ত্বিক জগতের ভিন্নতার কাছে এরা আসলে অসহায়। নিজের মানসিক জগতের কাছে হেরে যাওয়া এই মানুষগুলোর জন্য খুব মায়া লাগে, ভালবাসা জাগে হৃদয়ে। কেন? জানিনা...

৮| ১৮ ই জুন, ২০১৫ সকাল ১০:১৩

শামছুল ইসলাম বলেছেন: বিজয় দিবসের কথাটা এত সুন্দর ভাবে বলেছেন, খুব ভাল লাগছে:

মামার দেয়ালে দুলতে থাকা ক্যালেন্ডারের পাতায় লাল রঙে ষোল তারিখ দেখে রন্তুর মনে পড়ল কাল বাদে পরশু দিনই ষোলই ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস! সাথে সাথে ছোট মামাকে হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে ঠেলতে লাগলো।

১৮ ই জুন, ২০১৫ বিকাল ৩:০৪

বোকা মানুষ বলতে চায় বলেছেন: আমাদের সময়কার প্রতিটি শিশুর মনেই কিন্তু বিজয় দিবস আর বিজয় দিবসে ছোট ছোট কাগজের পতাকা দড়িতে লেই দিয়ে আটকে বাসার ছাদ সাজানোর স্মৃতি আমৃত্যু মনে থাকবে। ছোট বেলার যে কয়টা মধুর স্মৃতি মনের মাঝে উঁকি দেয়, তার মধ্যে বিজয় দিবসের স্মৃতি অন্যতম। আর তাই রন্তুর মাঝ দিয়ে সেই স্মৃতি ফিরিয়ে আনা। :)

৯| ১৮ ই জুন, ২০১৫ সকাল ১০:২৩

শামছুল ইসলাম বলেছেন: সহজ সরল উপমা, কিন্তু হৃদয়গ্রাহী:

ভাল জিনিসগুলো সবসময় হুট করে শেষ হয়ে যায়, যেমন হাওয়াই মিঠাই।

১৮ ই জুন, ২০১৫ বিকাল ৩:৫৭

বোকা মানুষ বলতে চায় বলেছেন: সহজ কথার অন্যরকম একটা আবেদন থাকে কি না...

ভালো সময়গুলোও কিন্তু অতি দ্রুতই শেষ হয়ে যায়।

১০| ১৮ ই জুন, ২০১৫ সকাল ১০:৩৮

শামছুল ইসলাম বলেছেন: মানুষ ভাই, চমৎকার সাজিয়েছেন মার ছবিটা:

মা বাসায় থাকলে অদ্ভুত একটা ঘ্রাণ নাকে আসে রন্তুর, রন্তু এই ঘ্রাণের নাম দিয়েছে ‘মা ঘ্রাণ’।

১৮ ই জুন, ২০১৫ সন্ধ্যা ৬:৪৭

বোকা মানুষ বলতে চায় বলেছেন: মায়ের শরীরের ঘ্রাণ, প্রতিটি শিশুর প্রথম এবং অতি প্রিয় একটি অনুভূতি। শৈশবে কমবেশি সবাই কিন্তু এই মা ঘ্রাণ এর সাথে পরিচিত। বড় হওয়ার সাথে সাথে কারো কারো সেই অতি শৈশবের স্মৃতিটুকু ধুসর হয়ে যায়, কারো মনে চিরদিন বসত গড়ে সেই প্রিয় স্মৃতি। আর রন্তুও এক্ষেত্রে ব্যাতিক্রম নয়, মায়ের শরীরের নির্জাসে যে শরীর বেড়ে ওঠে, সেই মায়ের শরীরের ঘ্রাণ কিন্তু ছড়িয়ে থাকে প্রতিটি ইন্দ্রিয়ের চোরা কুঠিতে।

১১| ১৮ ই জুন, ২০১৫ সকাল ১০:৫০

শামছুল ইসলাম বলেছেন: জাভেদের চরিত্রটা ক'টা লাইনে সুন্দর ফুটিয়েছেন:

জাভেদের কথা মনে হলেই শায়লার চোখে এতো এতো স্মৃতি ছাপিয়ে একটি স্মৃতি ভেসে ওঠে, রক্তাক্ত হাত নিয়ে জাভেদের সেই ভয়ংকর হাসি ধরে রাখা মুখে বলা একটি কথা, “শায়লা দ্যাখো, এই হাত...এই হাত তোমার গায়ে তুলেছি আমি! তাই এই হাতকে শাস্তি দিলাম...”

১৮ ই জুন, ২০১৫ রাত ৮:১৮

বোকা মানুষ বলতে চায় বলেছেন: নারীর গায়ে হাত তোলা কোন মতেই সমর্থন যোগ্য নয়। তারপরও জাভেদের মত মানসিক ভারসম্যহীন এবং সমস্যায় জর্জরিত মানুষ এই অপকর্ম করার পরেও অনুতপ্ত হয়। এতেই কিন্তু তার ভেতরের মনুষ্যত্ব কিছুটা প্রকাশ পায়।

জাভেদের জন্য আমার কেন জানি কিছুটা সফট কর্নার রয়েছে। তার জন্য খুব মায়া হয়... :(

১২| ১৮ ই জুন, ২০১৫ সকাল ১০:৫৮

শামছুল ইসলাম বলেছেন: রন্তুর চরিত্রটা দারুণ হচ্ছে:

এই কাল্পনিক কথার জগতে রন্তু তার বাবা-মা’র সাথে তার স্বপ্নের কাল্পনিক এক জগত সাজায়, সেই জগত যেখানে রন্তু আর তার বাবা-মা তাদের নিজেরদের বাড়িতে অনেক সুখে বসবাস করছে।

১৮ ই জুন, ২০১৫ রাত ১১:৫৫

বোকা মানুষ বলতে চায় বলেছেন: কল্পনায় কথা বলাটা কিন্তু খুব মজার, একা একা নানান চরিত্র কল্পনা করে তাদের সাথে কথা বলা... :)

১৩| ১৮ ই জুন, ২০১৫ সকাল ১১:০৮

শামছুল ইসলাম বলেছেন: পুরো প্যারটা মনের মধ্যে খোঁদাই হয়ে গেছে:

মায়ের সাথে ছাদ থেকে নামতে নামতে রন্তু দেখলো কে যেন আকাশে একটা লাল রঙের ঘুড়ি উড়িয়েছে। কেন জানি রন্তুর ঘুড়ি খুব ভালো লাগে, বিশেষ করে সুতো কাটা ঘুড়ি, যখন ছুটতে থাকে ঐ নীলাকাশে অজানা গন্তব্যের পাণে। আজকের এই গ্যাস বেলুনগুলোও ভালো লাগছে রন্তুর। তাহলে? গ্যাস বেলুন নাকি সুতোকাটা ঘুড়ি, কোনাটা বেশী ভালো লাগে তার? রন্তু নিজেও হয়ত জানে না, অথবা এভাবে ভাবে না। দুটোই বাঁধাহীনভাবে উড়ে যায় নীল দিগন্তপানে। কিন্তু দুটোই একসময় নেমে আসে পৃথিবীর বুকে। তবে গ্যাস বেলুন যতটা উপরে উঠে অবাক বিস্ময়ে পৃথিবীকে দেখার সুযোগ পায় সুতো কাটা ঘুড়ি কি ততটা পায়? কিন্তু রন্তু’র নিজেকে সুতো কাটা ঘুড়ি ভাবতে ভালো লাগে। একসময় সুতোর বাঁধনে নাটাইয়ের সাথে বাঁধা ছিল মায়াবী এক সম্পর্কের বাঁধনে, তারপর কোন এক ঝড়ে সম্পর্কের সুতো কেটে গিয়ে নীল আকাশের অজানা গন্তব্যে উড়াল দেয়া। পরিবার নামক নাটাইয়ের সাথে যে বাঁধনে রন্তু বাঁধা ছিল সেই বাঁধন ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে কি রন্তুও সুতো কাটা ঘুড়ি হয়ে ঘুরে বেড়াবে সমাজ নামক বিশাল আকাশে? সময়ই সব বলে দেবে...

১৯ শে জুন, ২০১৫ দুপুর ২:১৯

বোকা মানুষ বলতে চায় বলেছেন: এই পর্বটা কিন্তু হুট করে আগে থেকে কোন ভাবনা ছাড়াই লিখেছিলাম। ছোট বেলায় গ্যাস বেলুন আর ঘুড়ি, দুটোই ভালো লাগতো। কিন্তু কোনটা বেশী? সেই ভাবনা থেকেই এই প্যারাটুকু লেখা। :)

১৪| ১৮ ই জুন, ২০১৫ সকাল ১১:৪১

শামছুল ইসলাম বলেছেন: এই পর্যন্ত পড়ে রন্তুর মত আমিও স্থির হয়ে গেলাম, খুব..খুব.. মন ছুঁয়ে যাওয়া বর্ণনা:

এতোটুকু আবৃত্তি করে রন্তু থেমে গেল। শেষের দিকে তার গলা ধরে আসছিল, কান্না জড়ানো কণ্ঠে আবৃত্তি করতে করতে হঠাৎ থেমে গেল।

১৯ শে জুন, ২০১৫ দুপুর ২:৫৫

বোকা মানুষ বলতে চায় বলেছেন: আমিও... রন্তুর কান্না যেন আমারই কান্না হয়ে ধরা দিচ্ছিল। :(

১৫| ১৮ ই জুন, ২০১৫ সকাল ১১:৪৫

শামছুল ইসলাম বলেছেন: রন্তুর কালো আকাশ - এর ছায়ায় পুরো মনটা ছেঁয়ে গেছে, কিছুই ভাল লাগছে না।

১৯ শে জুন, ২০১৫ বিকাল ৩:৩৩

বোকা মানুষ বলতে চায় বলেছেন: আর আমি আছি রন্তুর মাঝে বুঁদ হয়ে ভাই।

আপনাকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতা, কষ্ট করে আমার পুরো এই গল্পটির সব কয়টা পর্ব পড়া এবং মন্তব্যে একের পর এক অনুভূতি শেয়ার করার জন্য। ভালো থাকুন সবসময়, অনেক অনেক ভাল। শুভকামনা জানবেন।

১৬| ১৮ ই জুন, ২০১৫ দুপুর ১২:২১

আহমেদ জী এস বলেছেন: বোকা মানুষ বলতে চায় ,



আগে কখনও পড়া হয়ে ওঠেনি । বিশাল লেখা তাই প্রিয়তে নিলুম ধীরে ধীরে পড়ার জন্যে ।।

১৯ শে জুন, ২০১৫ সন্ধ্যা ৭:৫৬

বোকা মানুষ বলতে চায় বলেছেন: ধন্যবাদ আহমেদ জী এস, আগ্রহ করে প্রিয়তে নিয়েছেন পড়ার জন্য... জেনে খুব ভালো লাগলো।

ভালো থাকুন সবসময়, অনেক অনেক শুভকামনা।

১৭| ২২ শে জুন, ২০১৫ দুপুর ১:৪০

কম্পমান বলেছেন: ভাই আপনি আসলে খুব খারাপ..................... আর কত ??? রন্তুর জন্য মন কেমন করছে। ভাই ওর কান্না একটু থামান............ নইলে আমি ও যে .........----------------------

২২ শে জুন, ২০১৫ বিকাল ৩:৪২

বোকা মানুষ বলতে চায় বলেছেন: আন্তরিকভাবে দুঃখিত প্রিয় কম্পমান। রাগে আবার কম্পন করিবেন না যেন। নতুন পর্ব পোস্ট করা হয়েছে, এখন থেকে আর এতো অপেক্ষায় রাখা হবে না আশা করি (যদিও প্রতিবার আমি এটা বলি, এবং ভঙ্গ করি :P

নো কান্না, বলতে চাইলেও বলা যাবে না। রন্তুর জীবনটাই বড় কান্নাময় যে...। :(

১৮| ১৩ ই জুলাই, ২০১৫ রাত ১:২২

মশিকুর বলেছেন:

আপনিতো এই পোস্ট দিয়ে আমাকে ধন্য করে দিলেন। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা জানা নাই...

'মনে পড়ে রুবি রায়' সম্পর্কে কিছু কথা না বললেই নয়.. হুম! আমি বলেছিলাম, 'আপনার ভিতরে লেখক আছে।' কিন্তু তারমানে এই না যে, আমি বলেছিলাম বলে আপনার মাঝে লেখক জন্ম নিয়েছে। আপনার মাঝে লেখক আগে থেকেই ছিল।

সে লেখায় আপনার পাঠক ধরে রাখার ক্ষমতা দেখেছি, সরল ভাবে ঘটনার বর্ণনা দেয়া দেখেছি, ছোট ছোট পর্যবেক্ষণ এক্ত্র করে মূল পয়েন্টের দিকে এগিয়ে যাওয়া দেখেছি, সবচেয়ে বড় কথা আপনি পাঠকের মত করে অর্থাৎ পাঠক যেমন চায় তেমন করে লেখেন। তাই হয়তো বলেছিলাম সে কথা :)

সেই কমেন্টা যে পুরোপুরি পজেটিভ সেন্সে ছিল, তাও কিন্তু না। কিন্তু আপনি সেখান থেকে পজেটিভ খুজে নিয়েছেন। এটা আপনার একটা অনন্য গুন। কমেন্টে নেগেটিভ যে উপাদান ছিল, আজ তা বলতে কোন বাঁধা নাই অবশ্য... গল্পটা অসম্পূর্ণ ছিল আগেই বলেছিলাম; তবে গল্পে 'গানটা'কে বেশী প্রাধান্য দেয়া হয়েছে বলে মনে হয়েছিল। গল্পের শেষটা জোর করে মিলানো হয়েছিল বলেও মনে হয়েছিল। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্বাভাবিক ভাবেই লেখার সমাপ্তি লেখক জানবেন; কিন্তু পাঠক যখন বুঝতে পারে যে, জোর করে মিলানো হয়েছে; তখন ব্যাপারটা কিন্তু অন্যরকম হয়ে যায়। আমার মতে গল্পকে ছেড়ে দেয়া উচিৎ, গল্প নিজেই নিজের মতন ফিনিশিং খুজে নিবে। তবে বর্তমানে আপনি এসব নিজে নিজেই কাটিয়ে উঠে পুরোদমে লেখক হয়ে উঠেছেন দেখছি :)

আরেকটা ভবিষ্যৎ বানী দিতে ইচ্ছা করতেছে। ব্লগে আপনার আন্তরিকতা দেখছি, অন্যের পোস্টে আপনার কমেন্ট দেখছি... আমি বলবো আপনি চালিয়ে যান, ঠিক এভাবেই... আপনি স্মরণীয় একজন ব্লগার হবেন(একদিন)। তবে লেখালেখিতে বিখ্যাত কেউ হতে চাইলে কিছুটা আবেগ(মনের) অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে... ঠিক লেখকদের মতন।
**************************************

এই পর্যন্ত 'রন্তু' পড়ে আমার কমেন্টঃ

১) বরাবরের মতন এক নিঃশ্বাসে পড়ার মতন লেখা।
২) হিউম্যান সাইকোলজি তথা বাচ্চাদের সাইকোলজি আপনি ভাল বুঝেন।
৩) গল্প কতক্ষন সময়কাল কভার করবে সে ব্যাপারে আপনার প্লান ভাল।
৪) এখন পর্যন্ত প্রতিটা ক্যারেক্টার ভালভাবে রান করছে অর্থাৎ সবকিছু ওকে।
৫) বাচ্চাদের নিয়ে লেখার সাহস প্রশংসনীয়; যেখানে সামুর গল্পগুলোর মধ্যে পতিতা, রগরগে বর্ণনা, সস্তা প্রেমের গল্প, মেয়েলি ধারনা ইত্যাদি ইত্যাদি বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে।

(১৫-২৫) একবারে পড়বো; গল্পের আমেজটা ধরা যায় তাহলে :)

ভাল থাকুন :)
**************************************
১) গল্পের ভিতর বৈচিত্র্য কম। অবশ্য বাচ্চাদের জীবনেও বৈচিত্র্য কম। সে হিসেবে রন্তুর বর্ণনায় আমি সন্তুষ্ট। তবে গল্পে ক্যারেক্টার কম মনে হয়েছে। সে হিসেবে বললাম বৈচিত্র্য কম। উপন্যাস হিসেবে আরও ক্যারেক্টার প্রয়োজন, তানা হলে ছোটগল্প হয়ে যাবে(বড় একটি ছোট গল্প) ত্যানা পেঁচানো সিরিয়ালের মতন। ইরফানের ক্যারেক্টারটার জন্য কাহিনীতে কিছুটা বাঁক এসেছে, আরও বাঁক দরকার।

২) গল্পে একমাত্র একটি বিষয়কেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। তা হলো রন্তুর আবেগ। ঠিক আছে! কিন্তু আরও কয়েকটা বিষয় লাইটের নিচে নিয়ে আসতে পারেন। আপনি চিন্তা করলেই হয়তো পেয়ে যাবেন...

১৩ ই জুলাই, ২০১৫ রাত ১:২৯

বোকা মানুষ বলতে চায় বলেছেন: সর্দি-জ্বর-শরীর এবং মাথা ব্যাথা নিয়ে আজ খুব কাহিল ছিলাম সকাল থেকে, তারাবিহর নামাজ আজ মিস করতে হল এই বডি পেইনের কারণে। রাতের বেলা আপনার এমন মন্তব্য পেয়ে অনেক অনেক ভালো লাগছে। ভালোলাগা নিয়ে আজ রাতে ঘুমোই, কাল বাকী কথা বলব।

ততক্ষণ ভালো থাকুন, অনেক অনেক শুভকামনা রইল। :)

১৩ ই জুলাই, ২০১৫ বিকাল ৪:০৩

বোকা মানুষ বলতে চায় বলেছেন: প্রথম কথা বলি, আপনাকে ধন্য করার কিছু নাই; যাহা সত্য তাহাই বলেছি। মনে আছে, টিনেজ বয়সের শেষে খুব স্বপ্ন দেখতাম একদিন অনেক বড় লেখক হব, এক নামে আমায় সবাই চিনবে। কিন্তু আর সব স্বপ্নের মত সেই স্বপ্নও অধরাই রয়ে গেল। কোথায় হারাল আমার লেখালেখির অভ্যেস। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশী সময় আর ঐদিকে পা মাড়াই নাই, ব্যস্ত ছিলাম নিজের রুটি রুজির নিশ্চয়তা দেয়ার মত একটা ক্যারিয়ার গড়ার জন্য। ২০১৩ সাল থেকে সামু ব্লগে যখন লিখতে শুরু করি ইচ্ছা ছিল দেশ এবং রাজনীতি নিয়ে স্যাটায়ারধর্মী লেখা লেখার। কিন্তু ব্লগের পরিবেশ দেখে সে আশায় গুঁড়ে বালি। এই সময়টায় আমি আবার পুরোদমে ভ্রমণে মশগুল ছিলাম, তাই নিয়মিত ভ্রমণ পোস্ট দিতাম, মাঝে মাঝে এইটা সেইটা। তো মনে পড়ে রুবি রায় লেখার পর আপনার ঐ মন্তব্য আমাকে সত্যি মনে করিয়ে দেয় সেই অনেক অনেক আগের স্বপ্নের কথাগুলো। আর তাই মাঝে মাঝে এখন গল্প লেখার চেষ্টা করছি, শুরু করেছি রন্তু সিরিজ। মজার ব্যাপার হল, এখন সারাদিন শুধু মাথায় গল্পের প্লট গিজগিজ করে, কোনটা রেখে কোনটা লিখব? :) দোয়া করবেন আমার সেই প্রথম প্রহরের স্বপ্ন যেন কোন একদিন ধরা দেয় আমার আঙ্গিনায়।

ব্লগে লেখালেখি প্রসঙ্গে বলি, আমি আসলে একেতো লিখি ছদ্মনামে, তার উপর কারো সাথে কখনো যোগাযোগ নেই। তবুও এই ব্লগের মানুষগুলোকে খুব চেনা আর কাছের মনে হয়। আমি আমার ব্লগিয় কমিউনিকেশন বাড়িয়েছি নিজের তাগিদ থেকেই, অন্যের লেখা পড়লে আমার লেখার উন্নতি ঘটবে। অন্যের পোস্টে উৎসাহ দিলে, সে আরেকজনের পোস্টে গিয়ে উৎসাহ দিবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, বর্তমানে সামু'র যে খারাপ সময় যাচ্ছে, সে সময়ে আমরা যারা হাতে গোনা কয়েকজন নতুন ব্লগার এখনো লিখে যাচ্ছি, তাদের আরও বেশী সক্রিয়তা থেকে কিন্তু এই ইন্টারেকশন। আমি পারলে সারাদিন সামুতে লগইন দিয়ে রাখি, এতে করে একজন ব্লগারের উপস্থিতি তো বাড়বে। স্মরণীয় ব্লগার বা এরকম কিছু হওয়ার ইচ্ছে নাই, সত্যি বলছি। সামুর কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো লেখালেখির জন্য এমন একটা প্লাটফর্ম আমাদের দেয়ার জন্য। মনে আছে এক যুগ আগেরও বেশী সময় হবে, যায় যায় দিন (সাপ্তাহিক) বিশেষ সংখ্যা বের করত, যার স্লোগান ছিল, "পাঠকই যার লেখক, লেখকই যার পাঠক"। সেটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পেয়েছি সামুকে। তাই কৃতজ্ঞতা সবসময়ই রইবে।

রন্তু সিরিজের ব্যাপারে পজেটিভ যে কথাগুলো বলেছেন এর পুরো কৃতিত্ব আমার তিন প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ, সমরেশ মজুমদার আর নিমাই ভট্টাচার্য। এদের গল্প পড়ে পড়ে আমার মধ্যে গেঁথে গেছে গল্প বলাটা কি অবলীলায় হালকা কথার ছলে করে যেতে হয়। আর ব্যাপ্তি নিয়ে বলব, যেহেতু প্রথম থেকেই ইচ্ছা ছিল উপন্যাসের মত কিছু লেখার, তাই প্রতি পর্ব ১২০০-১৩০০ শব্দের মধ্যে লেখার চেষ্টা করি।

গল্পে ক্যারেক্টার কম, এটা কিন্তু সবচেয়ে বেশী ফিল করি আমি। কারণ একেকটা পর্ব লিখতে গেলে ঘুরে ফিরে চারটি প্রাণীর কাছে আমাকে ফিরে যেতে হয়, রন্তু, শায়লা, শিবলি আর রন্তুর নানু। কিন্তু যেহেতু আপনাকে বলেছি আগে রন্তু নিয়ে আমার পরিকল্পনা, তাই এই সিরিজে রন্তুর জীবনে এর বেশী লোক সমাগম হবে না হয়ত। আর বাস্তবেও তাই হয়, আমার নিজের লাইফে দেখেছি, সেই ছোট্ট বয়সের স্মৃতি মনে করতে গেলে পাঁচ-দশটি চরিত্রের বেশী কারো কথা মনে পড়ে না। তবে এরপরের রন্তুর সিরিজগুলোতে দেখা যাবে এই রন্তুকে ঘিরে বহু মানুষের আবর্তন (যদি ট্রিলজি শেষ করতে পারি)। তবে আপনার কথাটি আমার মনে ধরেছে, চার পাঁচটি ক্যারেক্টারের মাঝে আবর্তিত হতে থাকলে পাঠকের একঘেয়েমি লাগতে বাধ্য। সামনে রন্তুর বড় মামা আসছে, আর ইরফান এবং জাভেদকেও পাওয়া যাবে দুটি পর্বে। যেহেতু রন্তুর কালো আকাশ সিরিজটা অনেকটা প্রিডিটারমাইন্ড, তার উপর আর মাত্র সাতটা পর্ব বাকী আছে, তাই আর কোন নতুন চরিত্র সংযোজন করতে চাচ্ছি না।

শেষের দুইটি পয়েন্ট চমৎকার করে তুলে ধরার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ মশিকুর ভাই। আপনার মত পাঠক সাথে পেলে একদিন লেখক হতেই হবে, আশা করি। অনেক অনেক ভালো থাকুন সবসময়, শুভকামনা নিরন্তর।


আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.