| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
গত কয়েক দিন ধরে নাসির সাহেব খুব বিরক্ত করছেন । হুটহাট কোত্থেকে যেন এসে হাজির হচ্ছেন । এসেই গুনে গুনে চার বার কাশি দেবেন । তারপর বসতে বসতে বলবেন, এক গ্লাস পানি দেবে ? পানি খাব । পানি খেলে গলাটা পরিষ্কার হবে । ডিরেক্ট সাপ্লাইয়ের পানি দেবে । এই পানিতে শেওলা শেওলা একটা গন্ধ পাই । মনেহয় যেন কুয়োর পানি খাচ্ছি ।
নাসির সাহেবের নিশ্চই এখন দিনকাল খারাপ যাচ্ছে । তা না হলে আমার কাছে আসার কথা নয় । কিংবা নতুন কোন দুই নম্বরি ব্যবসা খুলতে যাচ্ছেন । নাসির সাহেব যখনই কোন অনিশ্চয়তা মধ্য দিয়ে যান তখনই আমার কাছে ছুটে আসেন । উনার ধারণা আমি তাঁর ভবিষ্যৎ ধরতে পারি ।
একবার কি হল । তাঁর ছোট মেয়ের বিয়ে । বিশাল আয়োজন করেছেন তিনি । সরকার দলের জেলা পর্যায়ের দু’জন সিনিয়র নেতা আর বিরোধী দলের একজন সাবেক মন্ত্রী নিমন্ত্রণ পেয়েছেন সে বিয়েতে । আমাকেও নিমন্ত্রণ করেছেন তিনি । এটা তাঁর বহু দিনের শখ । ছোট মেয়ের বিয়ে দেবেন ধুমধাম করে । আমি নাসির সাহেবকে বললাম, চাচা আপনার ছোট মেয়ের বিয়ে হবে ধুমধাম করেই । তবে এ বিয়ে বেশি দিন টিকবেনা । ওর আরেটি বিয়ে হবে ।
কাকতালীয় ভাবে আমার ভবিষ্যৎবাণী মিলে গেল । ছেলের আরেকটি গোপন স্ত্রী আছে । একথা জানাজানি হয়ে গেল । উনার মেয়ে তিন দিনের মাথায় ফিরে এলো । তারপর এখনও বিয়ে হয়নি । সে আবার পড়ালেখায় মনোযোগী হয়েছে । এখন সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞানের উপর অনার্স করছে ।
আজ সকালে ঘুম থেকে উঠতেই বুয়া একটি চিঠি নিয়ে হাজির । চিঠি দিতে দিতে সে আমাকে বলে, ভাইজান আফনের নামে এই চিডি খান গত তিন দিন ধইরা আইসা বইসা আছে । কিন্তু আফনেরে বিরক্ত করতে নিষেধ করেছেন বইলা কিছু কইনাই । তয় গত কাইল রাইতে নিচের তলার আম্মা কইল এইডা নাকি খুব দরকারি চিডি ।
চিঠি হাতে নিয়েই দেখলাম এর এক পাশে অত্যন্ত যত্ন করে লিখা আশিকুর রহমান হিমেল, বাসানং-৩১০, গ্রীণরোড, ঢাকা । অপর পাশে লিখা রমনা থানা, ঢাকা । বোঝাই যাচ্ছে কেউ একজন আমাকে থানা থেকে লিখেছে । কিন্তু কে লিখতে পারে ? থানায় চাকুরী করে এমন কারও সাথে আমার পরিচয় নেই ।
হিমেল,
আশা করি আল্লাহর অশেষ কৃপায় ভালোই আছ । পর সমাচার এই যে গত সাত দিন হয় আমি পুলিশের হাতে ধরা থেয়েছি । এবার যে অভিযোগে আমাকে ধরা হয়েছে তা পুরোপুরি সত্যি নয় । আংশিক সত্যি । তবে তোমার ভবিষ্যৎবাণীতে কোন ভুল নেই । তুমি বলেছিলে, চাচা আপনি আগামী তিন মাসের মধ্যেই বড় ধরণের কোন বিপদে পড়বেন । বিপদে পড়তে আমার তিন মাসও লাগেনি । দুর্নীতি দমন কমিশন সরাসরি আমার নামে মামলা করেছে । আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত কর্মচারী আবিদ ব্যবসার সমস্ত টাকা মেরে দিয়ে ইন্ডিয়া পালিয়েছে । অথচ বজ্জাতটাকে আমি একদম চিনতে পারিনি । মনে হচ্ছে আমার পনের-ষোল বছরের জেল হয়ে যাবে । আমার উকিল এমনটাই আশঙ্কা করছে । সে বলছে এবার নাকি কোন কিছুতেই কিছু করতে পারবে না । সরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলে হয়তো কিছু করা যেত । কিন্তু টাকা কোথায় ? সব তো ঐ হারামজাদা আবিদ মেরে দিয়েছে । বাকী যা আছে সব আমার মেয়ে গুলোর নামে । আমি চাইনা ওদের ভবিষ্যৎ টলমলে হোক । আমি আমার মেয়ে দু’টোকে ভালোবাসি । ভীষণ ভালোবাসি । তোমাকে যখন আমি আমার মেয়ে দু’টো সম্পর্কে বলতাম তখন মিথ্যা বলতাম । বানিয়ে বানিয়ে বলতাম । সত্যি হচ্ছে এই যে ওরা আমার সাথে গত পাঁচ বছর ধরে কথা বলে না । কারণ পাঁচ বছর ধরেই ওরা জানে আমি লোক হিসেবে মোটেও ভালো না । এর আগে জানতে পায়নি । কথা না বললেও আমি ঠিকই বুঝতে পারি । ওরাও আমাকে ভীষণ ভালোবাসে । ভালোবাসার অনেক রং । কারও ভালোবাসার রং নীল আবার কারওটা ধূসর খয়েরী । এসব তোমার মুখ থেকেই শোনা । তুমি যখন আমাকে এসব কথা বলতে আমি তার মাথামন্ডু কিছুই বুঝতাম না । জেলে এসে এখন কিছুটা বুঝতে পারছি । মেয়ে গুলো আমার জন্য গত পরশু রুটি আর গরুর গোশত রান্না করে পাঠিয়েছিল । গত পাঁচ বছর পর খেলাম । এই রুটি গোশতের মধ্যে কি যেন এক যাদু মিশানো ছিল । খাওযার পর থেকে কেবলই মনে হচ্ছে আমি এগুলো না খেলে বাঁচব না । গত রাতে একটা স্বপ্ন দেখেছি । স্বপ্নে দেখি আমার আজীবণ জেল হয়েছে । জেলখানায় অন্য সব কয়েদীকে খাবার দেওয়া হচ্ছে । কিন্তু আমাকে খাবার দেওয়া হচ্ছে না । আমি ক্ষুধায় ছটফট করছি । এমন সময় তুমি আর ছুমাইয়া এসেছো আমাকে দেখতে । তোমার মাথায় বিয়ের পাগরী আর ছুমাইয়ার হাতে টিফিন ক্যারিয়ার ।
ইতি
নাসিরুদ্দীন
ঘুম থেকে উঠেই আমি প্রতিদিন প্রথম যে কাজটি করি তা হচ্ছে সিগারেট খাওয়া । তা না হলে সারাটা দিন মাথা ঝিম ঝিম করতে থাকে । ঠান্ডা মাথায় কোন চিন্তাই করতে পারিনা । কিন্তু আজ সেটি হয়নি । সিগারেটের প্যাকেটটি বোধহয় গত রাতে পাঞ্জাবীর ফুটো দিয়ে পড়ে গিয়েছে । মাথাটা ঝিম ঝিম করতে শুরু করেছে ।
এমন সময় দরজায় কেউ একজন কড়া নাড়ল । নাসির সাহেব জেলে না থাকলে ধরে নিতাম তিনি এসেছেন । কারণ তিনি ছাড়া আর অন্য কেউ আমার কাছে আসার কথা নয় । বিছানা ছেড়ে দরজা খুলে দিলাম । আমার সামনে হাসি হাসি মুখ নিয়ে দাড়িয়ে আছে সুমাইয়া । ওর এক হাতে সিগারেটের প্যাকেট । অন্য হতে টিফিন ক্যারিয়ার । আমার দিকে সিগারেটের প্যাকেটটি এগিয়ে দিতে দিতে সে বলল, এই নিন আপনার সিগারেট । গত রাতে আপনি ছাদে ফেলে এসেছিলেন । আপনি চলে আসার পর আমি যখন ছাদে যাই তখন এটিকে আবিষ্কার করেছি ।
প্যাকেট থেকে একটি সিগারেট বের করে জ্বাললাম । মাথা ঝিম ঝিম ভাব ধীরে ধীরে পালিয়ে যাচ্ছে । মুহূর্তেই দেখলাম সুমাইয়া আমার দিকে মায়া মায়া মুখ করে তাকিয়ে আছে । যেন আমি এ পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষ । নিশ্চই সে এখন কেঁদে ফেলবে ।
আমার বেশির ভাগ ধারণাই কাকতালীয় ভাবে মিলে যায় । তবে এ ধারণা মিলল না । সুমাইয়া খুব শক্ত টাইপ মেয়ে । এই টাইপ মেয়ের সহজে কাঁদেনা । এরা অনেক কঠিণ কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে পারে । আমার দিকে তাকিয়ে সুমাইয়া বলল, আমার সাথে যাবেন বাবাকে দেখতে ? কি করব ভেবে পাচ্ছি না । এটা যে অনেক কঠিন প্রশ্ন । আমি নিথর দাড়িয়ে আছি । সুমাইয়া আমার প্রহর গুনছে ।
©somewhere in net ltd.
১|
২৫ শে আগস্ট, ২০১৩ রাত ১২:০১
আতিকুর রহমান হীরা বলেছেন: কেমন লাগল গল্পটি ?