| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
মরমী সাধক খোদা বক্স শাহ- এর একুশে পদক রাখার জায়গা নাই।
মাত্র পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করে যিনি শৈশব জীবনের পাঠ চুকিয়েছেন। লেখাপড়া করবেন কি, তিনি ছিলেন মিষ্টি কণ্ঠের এক গানের কোকিল। যাদু ছিল তাঁর কণ্ঠে। যে দুরন্ত বালকটি সারাক্ষণ বনে-বাদাড়ে রাস্তাঘাটে শুধু গান গেয়ে বেড়াতেন। তাঁর গান শুনে মাঠের কৃষকেরা বলতো- এই ছেলের গলায় এতই মধুর সূর আছে যে, আমাদের কাজ বন্ধ করে তার গান শুনতে ইচ্ছে করে। এই কোকিল কণ্ঠের গানের জন্যই তিনাকে স্কুল শিক্ষকের বেত্রাঘাত সহ সমাজের অনেক বেরসিক মানুষের নিগ্রহের পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। এই সদৃশ্য সমাজ ব্যবস্থা একদিন তাঁকে একঘরে পর্যন্ত করে রেখেছিল। যাহোক সেই বালকটি পরবর্তীতে পালাক্রমে যাত্রাদলে বিবেকের গান গেতেন। এরপর একদিন গ্রামে বাউল গানের আসরে গানের সুর ও একতারার ছন্দে তিনি বিমোহিত হয়ে পড়েন। তখনকার প্রখ্যাত বাউল শিল্পীদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য যেসব শিল্পীদের সংস্পর্শে তিনি ছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন অমূল্য শাহ, বেহাল শাহ, সুখ চাঁদ শাহ। এইসব গুনী শিল্পীদের গানের আসরেই তিনি সুখ চাঁদ শাহ এর কাছে সংগীতে মুরিদান গ্রহন করেন।
এতোক্ষণ নিশ্চয় বুঝতে পারছেন আমি কোন গুণী শিল্পীর কথা বলছি। হ্যাঁ, তিনার বাবার নাম কফিল উদ্দিন বিশ্বাস মাতা- ব্যাশোরণ নিছা, তিনি বাংলা- ১৩৩৪ সালে চৈত্র সংক্রান্তির শুক্রবারে সুবেহ সাদিকের সময় চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার নাগদাহ ইউনিয়নের জাহাপুর গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। তিনিই হলেন দক্ষিণ বাংলার সনামধন্য বাউল কবি ও শিল্পী খোদা বক্স শাহ। যার পুরো নাম খোদা বক্স বিশ্বাস।
তিনি উচ্চ শিক্ষাই শিক্ষিত না হলেও তিনার মস্তিষ্ক এতোই ক্ষুরধার ছিল যে, তিনার বুকের মধ্যে লালন শাহ এর এক হাজার গান রেকর্ড করেছিলেন। যা তিনি পরবর্তীতে ৪০ বৎসর যাবৎ (১৩৪৭-১৩৮৭) এই গ্রাম বাংলার শহরে হাট বাজারে, রেডিও, টেলিভিশনে বিভিন্ন আসরে পরিবেশন করেছেন। শুধু তাই নয় তিনার সুদীর্ঘ ৪০ বছর সংগীত সাধনা কালে লালনগীতি সহ প্রায় দুই হাজার গান স্মৃতিপটে স্পষ্ট ছিলো বলে তিনি তাঁর জীবৎকালে জানিয়েছেন। তিনি শুধু শিল্পীই ছিলেন না, সেই সাথে ছিলেন একজন সফল গীতিকার ও সুরকার, তিনি লালন শাহ এর গানের প্রকৃত সুরকার ছিলেন যার ফলশ্রুতিতে তিনি প্রায় ৯৫০ টি গান উপহার দিয়ে আমাদের লোকজ বাংলা সংস্কৃতি মহিমান্নিত করে গেছেন। বিশ্বের বুকে বি¯তৃতি ঘটিয়েছেন আমাদের জাতীয় পদমর্যাদার। তিনার গানগুলো আধ্যাত্বিক তাৎপর্যে পরিপূর্ণ হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গানে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে বিশ্বমানবতার বাণী ও সুর ছন্দায়িত হয়েছে। আমরা যদি তাঁর জীবন পরিক্রমা নিয়ে গভীর ভাবে গবেষনা করি তবে দেখতে পাবো তিনি প্রকৃত পক্ষেই লালন শাহ-এর যোগ্য উত্তরসূরী।
আমরা যদি তাঁর কর্মের স্বীকৃতির দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই তিনি বাংলাদেশ জাতীয় শিল্পকলা একাডেমীতে ৫ বছর লালন সংগীতের প্রভাষক হিসেবে চাকুরী করেন। তিনি লালন পরিষদ কেন্দ্রীয় সংসদ থেকে প্রকাশিত লালন সংগীত স্বরলিপি গ্রন্থের ২৫ টি গানের স্বরলিপি সম্পন্ন করেন। গ্রন্থটি ১৯৮৬ সালের ৩১ মার্চ প্রকাশিত হয়। ১৯৮৫ সালে বাংলা একাডেমী লালন সংগীত বিশারদ হিসেবে তাঁকে ফেলোশীপ প্রদান করেন। ফেলো সংখ্যা-১৫৮। ১৯৮৩ সালে ১৫ জানুয়ারী ইছাপুর অনুশীলনী পাঠাগার তিনাকে সনদ পত্র প্রদান করে। পৌর প্রধান উত্তর ব্যারাপুর, পৌরসভা ২৪ পরগনা)। এছাড়াও ঐ একই সালের পৌষ মেলা উপলক্ষে শান্তি নিকেতন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সনদ পত্র প্রদান করে। ১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর রেডিও বাংলাদেশ কর্তৃক গুণীজন সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে সনদ পত্র প্রদান করা হয়। এছাড়াও বাংলা ১৩৯০ সালের ১৬ মাঘ চতুর্থ জাতীয় রবীন্দ্র সংগীত সম্মেলনে তাঁকে গুণীজন সম্বর্ধনা দেয়া হয়। শুধু তিনি মুঠো মুঠো পুরস্কারই পাননি, তিনিও দিয়েছেন অনেক। তিনি একাধারে বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী জাতীয় প্রেস ক্লাব, আকাশবানী ও দূরদর্শনে সংগীত পরিবেশন করে দেশ তথা ভারত বর্ষের সূধীজন, বুদ্ধিজীবি সকলকে বিমোহিত করেছেন। তিনার সুর ছন্দময় জীবনের শেষের দিকে অত্যন্ত দুঃখ-কষ্ট-যাতনার মধ্যে দিন যাপন করেছেন। তিনার রচিত গানের মাঝেই আমরা যেন শুনতে পাই তাঁর জীবনের যবনীকাপাতের মর্মস্পর্শী অনুকম্পা। তিনি গেয়ে গেছেনÑ
এ সংসার বৃক্ষের ছায়ায় বসে দিন কাটায়
ভাবি নাই দিনের একদিন সন্ধ্যা হবে
মিছে মায়ায় ভুলে আছি কেবল ভুলে
এসব ফেলে কোনদিন চলে যেতে হবে।
এই মায়াত্যাগী বাণীর রেশ ধরে ১৯৮৬ সালের শেষ দিকে হঠাৎ তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন। বেশ কিছুদিন তিনি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরে একটু সুস্থ হলে তিনি নিজ গ্রামে ফিরে আসেন,কিন্তু বেশি দিন তিনি সুস্থ থাকতে পারেননি। ১৯৮৯ সালের শেষ দিকে তিনি আবারো অসুস্থ হয়ে পড়েন, এসময় তিনার চিকিৎসা চলে চুয়াডাঙ্গা ও ফরিদপুর হাসপাতালে। কিন্তু তিনার যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে ! ১৯৯০ সালের ১৫ জানুয়ারী এই গানের কোকিল মহান সাধক মাত্র ৬৩ বছর বয়সে তিনি জীবনের সমস্ত ব্যস্ততার অবসান ঘটিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সাধকের শব দেহ তাঁর নিজস্ব আস্তানা জাহাপুর নিজ গৃহ পাশে সমাধিত করা হয়। মৃত্যু কালে তিনি এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তান রেখে যান।
পৃথিবী তথা বাংলার ইতিহাসে এক কলংকিত অধ্যায় এই যে, আমরা গভীর ভাবে লক্ষ্য করলে দেখবো ; অভাব-অনটন আর অর্থাভাবে অপূর্ণ চিকিৎসায় এই গুণী ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। আরো পরিতাপের বিষয়, তাঁর মৃত্যুর ১মাস ৭দিন পর তাঁেক বাংলা একাডেমী মরণত্তোর একুশে পদকে ভূষিত করে। এ প্রসংগে (সাপ্তাহিক খবরের কাগজ-৯ বর্ষ ১০ সংখ্যা ২৪ ফাল্গুন’৯৬, ৮ মার্চ ৯০) সালে প্রকাশিত প্রখ্যাত শিল্পি ফকির আলমগীরের অতি দুঃখজনক এবং অপ্রিয় সত্য অথচ সাহসী ন্যায় দন্ডধারীর ন্যায় বিদ্রুপাত্মক উক্তির মধ্য থেকে উল্লেখ করছি। তিনি বলেছিলেন-“এ অবস্থা আর কতদিন চলবে ?
একজন গুণী শিল্পি অর্থাভাবে, অনাহারে, অধ্যাহারে মানবেতর জীবন যাপন করবেন, কেউ ফিরেও দেখবেন না! অথচ বিনা চিকিৎসায় শত ছিন্ন মাদুরে শুয়ে ধূকে ধুকে মারা যাবার পর শুরু হয় টানাটানি। কেন জীবদ্দশায় এঁদের মূল্যায়ন করা হয় না? কেন তাঁর জীবদ্দশায় কর্মের স্মারক স্বীকৃতির পুরস্কারটি হাতে তুলে দেওয়া হয়না? যাতে তিনি অন্ততঃ এটুকু প্রশান্তি নিয়ে মরতে পারেন যে, আমার দেশ আমার সামান্য অবদানের জন্য আমাকে মূল্যায়ন করেছে”।
আজ আমরা একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে উক্ত কথার সাথে একত্ততা ঘোষণা করে বলতে চাই-আজ মরমী সেই সাধকের মৃত্যের ২০ বছর অতিবাহিত হয়েছে, তার একমাত্র সন্তান বাউল শিল্পি আব্দুল লতিফ শাহ অতি কষ্টে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে সামান্য কিছু অর্থ দিয়ে মরমী এই সাধকের কবর খানা বাঁিধয়েছেন মাত্র,কিন্তু অর্থাভাবে তার উপরে কোন ছাউনী আজ অবধি দিতে পারেন নি এবং আব্দুল লতিফ শাহ সরকারের কাছ থেকে উল্লেখ যোগ্য কোন আর্থিক সহায়তা না পাওয়ায় নিজের থাকার বসত বাড়ি পর্যন্ত আজ ভংগুর অবস্থায় এমনকি মরমী সাধকের সেই “একুশে পদক” রাখার মত জায়গা নেই, এমনি পরিস্থিতে আজ অত্র এলাকার জন মানুষের দাবি সাধক লালন শাহ-এর কবরস্থান যে ভাবে একটি লালন গবেষণাগারে পরিনত করে অবকাঠামোর উন্নয়ন করা হয়েছে তেমনি সেই লালনকে যিনি বুকে লালন করেছেন যাঁদের জন্ম না হলে লালন হয়ত অনেকটাই লুপ্ত থেকে যেত,সেই সাধক মরমী কবি একুশে পদক প্রাপ্ত খোদা বক্স শাহ-এর কবর খানার মাথার উপর একটি ছাউনী ও তার শায়িত স্থানে লালন ও খোদা বক্স শাহ গবেষণা কেন্দ্র ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন করার জন্য বর্তমান উদারপন্থি সরকার বাহারদুরের নিকট জোর আবেদন জানিয়েছেন। তা না হলে এই দরিদ্র পরিবারটি জাতীয় এই পদক সংরক্ষন করার স্থানের অভাবে হারিয়ে যাবে জাতীয় স্বীকৃতি। যা হবে এ জাতির জন্য এক কলংকিত অধ্যায় ও দুঃখ জনক ঘটনা। আমরা আশা করি বর্তমান উদারপস্থি সরকার বিষয়টির প্রতি সদয় দৃষ্টি দিয়ে দেশের জাতীয় জীবনে মাটি ও মানুয়ের জন্য যিনি অবদান রেখে গেছেন সেই খোদা বক্স সাঁই য়ের মাজারটির অবকাঠামোগত দিক পূর্ণাঙ্গ রুপ দানে সার্বিক ভাবে আর্থিক সহায়তা করবেন #

©somewhere in net ltd.